#আষাঢ়গগণে_প্রণয়াসক্তা
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[১৪]
" দাঁড়া। "
পুরুষালি গম্ভীর স্বরে থেমে গেল পা। পিছু ফিরে তাকাল সুবহা। আষাঢ় কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে। এভাবে তাকিয়ে আছে কেন? ভেবে কোনো ধারণা লাভ করতে পারল না সুবহা।
" এই পুলি পিঠা তুই বানিয়েছিস? "
মৃদু কন্ঠে উত্তর এলো,
" না। "
" না? ইফু যে বলছিল আজকে তুই পুলি পিঠা বানিয়েছিস। "
" শুধু পুর বানিয়েছি। আর কিছু না। "
পিঠায় কামড় দিয়ে মাথা নাড়ে আষাঢ়,
" ভালোই তো। ছোটবেলায় আমার পাত থেকে পিঠা পুলি কেড়ে নিতি। এখন নিজেই বানাস। গুড! "
সাহিল হতবাক! ভাইয়া এসব কী বলছে!
" আপু পিঠা চুরি করতো? "
হেনা হেসে উঠল,
" সত্যি? আমার না ঠিকঠাক মনে নেই। "
সুবহার গাল মুহূর্তেই লাল হয়ে গেল। কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। এভাবে তাকে পিঠা কেড়ে নেয়ার অপবাদ দেয়া হচ্ছে? শামীমা রান্নাঘর থেকে উঁচু গলায় বলে উঠলেন,
" আষাঢ়, মিথ্যা বলিস কেন? খাবারদাবার কেড়ে নেয়া তোর স্বভাব ছিল। শুধু শুধু মেয়েটাকে লজ্জা দিস না। "
" ছোটমা, তোমার লজ্জাবতী ভাতিজিকে অত ডিফেন্ড করো না। সে কম চুন্নী ছিল না। মনমতো খেতে না পারলে আমাকে খালি চিমটি দিতো। "
মাথা নিচু। মৃদু, স্পষ্ট কন্ঠে প্রতিবাদ জানায় সুবহা,
" আমি সবসময় চিমটি দিতাম না। "
" তাই নাকি? একবার কি জোরে কামড় দিয়েছিলি মনে আছে? এক খাবলা মাংস তুলে নিয়েছিলি। এখনো দাগ রয়ে গেছে আমার বিউটিফুল স্কিনে। "
নাটকীয় ঢঙে চরম অসহায়ত্ব প্রকাশ করল আষাঢ়। সত্যিই যেন তার ফর্সা ত্বকে এখনো ছোট ছোট দাঁতের দাগ বসে রয়েছে। এমন ঘোরতর মিথ্যা অপবাদে নাকের ডগা ফুলে গেল তরুণীর। সাহিল অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে।
" আল্লাহ্! আমার শান্তশিষ্ট আপু এত দুষ্টু ছিল? কামড়াকামড়ি করতো? বিশ্বাস ই হচ্ছে না। "
সুবহা ফট করে মিনমিনে গলায় বলে উঠল,
" ছোটবেলার কথা এত করে বলতে হবে না। "
দুষ্টু হাসল আষাঢ়। মজা নিতে ছাড়ল না,
" কেন? শরম লাগে? হু? হু? "
নাকের ডগা টুকটুকে লাল হয়ে যাচ্ছে। আষু ভাইয়া এখনো সে-ই ত্যাদড় আছে। খালি উল্টাপাল্টা কথা বলে তাকে ফাঁ'সিয়ে দেয়। অসহায় ভঙ্গিতে বড় বড় পা ফেলে রান্নাঘরে চলে গেল সুবহা। ত্যাড়াবাঁকা হাসছে আষাঢ়। রাজিন পাশ থেকে নিচু গলায় বলে উঠল,
" খামোখা মেয়েটাকে লজ্জা দিচ্ছিস কেন? "
অত্যন্ত নিরীহ দৃষ্টিতে তাকাল আষাঢ়। চিতই পিঠা গলাধঃকরণ করতে করতে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
" আমি? আমি আবার কি করলাম? "
ইখফা মুখ লটকে বলল,
" ভাইয়া বরাবরই এমন। খালি ক্ষ্যাপায়। "
" এই যে পেটুক রাণী। চুপচাপ খা। "
আষাঢ় এমন স্বরে বলল, হেসে উঠল বাকিরা। ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে ইখফা। সে পেটুক? তাহলে ছোটবেলায় জুনিয়র গোপাল ভাঁড় ছিল কে?
•
পাশের ইউনিয়নে আজ শরৎকালীন গ্রামীণ মেলা। প্রতি বছর এ মেলা আয়োজিত হয়। আশপাশের গ্রাম থেকে বহু মানুষ আসে এখানে। আজ সকাল থেকে তাফাজ্জল সাহেবের বাড়িতে ছোটদের উৎফুল্লতার বন্যা বয়ে যাচ্ছে। মেলায় যাবে তারা। সকাল থেকে সাহিল বারবার প্রশ্ন করে চলেছে,
" আমরা কখন যাবো? "
শেষ দুপুর থেকে সাজগোজে ব্যস্ত হাসনা, হেনা। ইখফা ওদের সাজাতে মগ্ন। মেয়েটা ভালো সাজাতে পারে। সুবহা পাশের খাটে বসা। এই মুহূর্তে হাসনা, হেনার রুমে তারা। হেনার রঙঢঙ দেখছে সে। ওড়নার সঙ্গে মিলিয়ে একই রঙের চুড়ি, কানের দুল পড়েছে হেনা। তরুণী মুচকি হাসে ছোট বোনকে দেখে। ঠিক সেসময় ঘরের বাইরে থেকে শোনা গেল পলাশের বিদ্রুপাত্মক কণ্ঠ,
" কিরে? হলো তোদের? মেলায় যেতে এত সাজতে হয় নাকি? "
হেনা ভ্রু কুঁচকে প্রত্যুত্তর দিলো,
" ওমা! সাজবো না? বছরে দুই, একবারই তো মেলা হয়। "
" হ্যাঁ হ্যাঁ। আর সে-ই মেলায় তোদের মতো ভূতনী দেখে বাচ্চা পোলাপান কাঁদে। ভ্যাঁ ভ্যাঁ ভ্যাঁ। "
" ভাইয়া! "
হেনার কাঁচুমাচু মুখ দেখে ঠোঁট চেপে হাসে সুবহা। ইতিমধ্যে রেডি সে। তাড়া দেয় এবার,
" তোদের হলো? এবার ওঠ। ছোট চাচু বকবে কিন্তু। "
তাড়াহুড়ো করে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে হাসনা। ওড়না ঠিক করতে করতে বলে,
" হ্যাঁ হ্যাঁ। হয়ে গেছে। চলো। "
-
আসরের নামাজ শেষে সকলে রওনা হলো। ভ্যানে পৌঁছাল মেলা নিকটস্থ স্থানে। বাকিটা পায়ে হাঁটা পথ। সামনে পথপ্রদর্শক হিসেবে হাঁটছেন ফজল সাহেব। ওনার পেছনে হাঁটছে আষাঢ়, রাজিন, পলাশ। ক্রমান্বয়ে তাদের পেছনে হাসনা, হেনা, সাহিল। সবার শেষে ধীরপায়ে হাঁটছে সুবহা, ইখফা। রাস্তার দুই পাশে ধানক্ষেত। হালকা বাতাসে ঢেউ খেলে চলেছে ধানের শীষ। দূর থেকে ভেসে আসছে মাইকের উঁচু আওয়াজ,
" আসুন.. আসুন.. দেখে যান.. এই গ্রামের সবচেয়ে বড় মেলা.. "
হাঁটতে হাঁটতে মেলায় উপস্থিত হলো সকলে। মেলার প্রবেশমুখে রঙিন কাগজের পতাকা। বাঁশের তৈরি ফটক। একে একে ভেতরে প্রবেশ করল তারা। এ যেন অন্য এক জগৎ! কি নেই এ মেলায়? একপাশে মাটির হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি হচ্ছে। অন্যপাশে বাঁশ-বেতের ঝুড়ি, যাবতীয় জিনিসপত্র। পশ্চিম দিকের দোকানে কাঠের খেলনা। দক্ষিণ দিকে রঙিন বেলুন, হাতপাখা, বাঁশি, কাঁচের চুড়ি ইত্যাদির দোকান। হরেকরকম জিনিসের আরো অনেকগুলো দোকান রয়েছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বাহারি খাবারের সুগন্ধ! জিলাপি ভাজার মিষ্টি সুবাস। গরম গরম ভাজা চিনাবাদাম। চটপটি। ঝালমুড়ি। আরো কত কি! শিশুদের উচ্ছ্বাস চারপাশে। বিক্রেতাদের হাঁকডাক। সব মিলিয়ে সে এক দৃষ্টিনন্দন প্রাণচাঞ্চল্য! রাজিন চারদিকে তাকিয়ে হতবাক! এ প্রথমবারের মতো গ্রামীণ মেলা দেখছে সে। অস্ফুট স্বরে আওড়ে ওঠে,
" ওয়াও! বিউটিফুল! "
-
শুরু হলো মনমতো কেনাকাটা। সাহিলের জন্য কেনা হলো লাল রঙের ক্রিকেট বল। ক্রিকেট ব্যাট। হাসনা, হেনার জন্য একই রকম লাল-সাদা কাঁচের চুড়ি। আনন্দে আত্মহারা দুই বোন। একে অপরের চুড়ির সঙ্গে মিলিয়ে দেখছে। একদম সেম সেম। তাদের মতো জমজ। আজকের সকল কেনাকাটা আষাঢ়ের তরফ থেকে ট্রিট। তাই তো ভাই-বোনরা ধুমছে মনমতো কেনাকাটা করছে। সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে।
-
সামনে নাগরদোলা। আষাঢ়ের হাত ধরে আদুরে গলায় আবদার করল সাহিল,
" ভাইয়া! "
" হ্যাঁ বল। "
" আমি নাগরদোলায় চড়বো। "
" নাগরদোলায় উঠবি? ভয় পাবি না তো? "
" আমি ভয় পাই না। আমি তো সাহসী বাচ্চা। আপু বলেছে। "
" আচ্ছা? তোর আপু আবার বাতাসে উড়তে উড়তে ভয় পাবে না তো? "
আড়চোখে সুবহার দিকে তাকিয়ে বলে আষাঢ়। সুবহা বিড়ালের মতো সুন্দর চোখে তাকিয়ে। পারছে না শুধু বিড়ালের মতো, তাদের ছোটবেলার মতো খামচি দিতে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খালি তাকেই টিজ করা হচ্ছে। সে-ই বহুবছর আগের মতো।
" ওকে, লেটস্ গো এভ্রিওয়ান। "
আষাঢ় স্বমহিমায় ঘোষণা দিলো। অতঃপর.. সাহিল, হাসনা, হেনা, ইখফা, সুবহা, রাজিন, পলাশ সবাই চড়ল নাগরদোলায়। আষাঢ় নিজেও সঙ্গ দিল। ধীরে ধীরে অনেক উঁচুতে উঠল নাগরদোলা। পাখির চোখে যেন ধরা দিলো পুরো গ্রামের দৃশ্য। ধানক্ষেত, খেজুরগাছ। ছোট ছোট টিনের ঘর। দূরে মসজিদের মিনার। মোবাইলে একের পর এক ছবি তুলতে লাগল আষাঢ়। একেকটা ঝাঁকুনির সঙ্গে বুকভাঙা চিৎকার বেরিয়ে আসতে চাইছে। চোখমুখ খিচে ভয়কে জয় করতে ব্যস্ত রাজিন। পাশে বসা পলাশের হাত শক্ত করে খামচে ধরেছে। তা দেখে মিটিমিটি হাসছে আষাঢ়। অপরদিকে সে হাসিতে ক্ষে'পে আগুন হচ্ছে রাজিন। জোর করে ম'রার ঘরে এনেছে এই বান্দা। আল্লাহ্ বাঁচাও!
-
বেশকিছু রাইডে চড়ল ছোটরা। ফজল সাহেব ইতিমধ্যে চলে গিয়েছেন। কাজ পড়েছে ওনার। সকলের তত্বাবধায়ক এখন আষাঢ়। ক্লান্ত শরীরে তারা গিয়ে হাজির হলো শরবতের দোকানে। আষাঢ় শরবত-ওয়ালাকে বলল,
" কাকু, সবার জন্য আখের রস দাও তো। "
সবাইকে আখের রস খাওয়াল আষাঢ়। এরপর অন্য দোকান থেকে ঝালমুড়ি, গরম গরম জিলাপি কিনে দিলো।
-
মেলায় পুরোটা সময় ধরে নীরব সুবহা। সেভাবে মুখ ফুটে কিছু চাইছে না। জোর দিয়ে কিছু কিনছেও না। ছোটদের আনন্দ দেখেই খুশি। আষাঢ় অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করেছে। ওরা ছেলেরা সাথে রয়েছে। মেয়েটা এজন্য সংকোচে ভুগছে? আড়ষ্ট বোধ করছে? চাচুও তো নেই।
হাঁটতে হাঁটতে একটা দোকানের সামনে থেমে গেল আষাঢ়। দোকানজুড়ে হস্ত নির্মিত বিভিন্ন জিনিসপত্র। সুতির রুমাল, বইয়ের বুকমার্ক। কাপড়ের ছোট থলি, পাটের দড়ি, হাতপাখা। হাতে বোনা চাদর, নকশিকাঁথা। আরো অনেক কিছু রয়েছে। দোকানের এক কোণায় কাঠের তাকে ঝুলছে মিহি সুতোয় হাতে বোনা বেশকিছু বুকমার্ক। একটা বুকমার্কের নিচে নীল সুতো দিয়ে বাঁধা ছোট সাদা রঙের পালক। একেবারে সাধারণ। কিন্তু অপূর্ব! বহু বছরের পুরনো কোনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল। সে-ই চাঁদের আলোয় মাখা উঠোনের স্মৃতি। আষাঢ় বুকমার্কটা হাতে তুলে নিল। দোকানদার বললেন,
" হাতে বানানো বাবা। "
মাথা নাড়ল আষাঢ়। হালকা পিছু ঘুরে তাকাল। সুবহা স্বল্প দূরে দাঁড়িয়ে। টুকটাক কথা বলছে পাশে থাকা ইখফার সঙ্গে। ডেকে উঠল আষাঢ়,
" সাবু! "
ডাক শুনে এদিকে তাকাল সুবহা। আষাঢ় হাতের ইশারায় কাছে ডাকল। আড়ষ্টতায় জমে গেল তরুণী। শুকনো ঢোক গিলল। হঠাৎ ডাকছে কেন? ধীরপায়ে সে এগিয়ে গেল কাছে। আষাঢ় বাড়িয়ে দিলো বুকমার্ক।
" নে। তোর জন্য। "
সুবহা বিস্মিত! ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে অপূর্ব সুন্দর বুকমার্কের দিকে।
" আমার? "
" হ্যাঁ। "
" কিন্তু? "
" কোনো কিন্তু নয়। নে এটা। "
দুষ্টুমি করে বলল,
" বই পড়তে ভালোবাসি না? বড় হতে হতে মস্তবড় পড়ুয়া আই মিন বইপ্রেমী হয়ে গেছিস তো। নে, এটা বইয়ের ভেতর রাখিস। সুন্দর লাগবে। "
সুবহা কিছুটা চমকেছে! সে তো এতবছর বাদে গ্রামে আসার পর আষু ভাইয়াকে কখনো বলেনি যে, সে বই পড়তে ভালোবাসে। ভাইয়া জানল কী করে? আষাঢ় বুঝল ওর গোপন প্রশ্ন। মুচকি হেসে বলল,
" কাল রাতে তোর রুমের বাইরে দিয়ে যাওয়ার সময় দেখেছিলাম। ঘরের মধ্যে তো আস্ত বইয়ের গোডাউন বানিয়ে ফেলেছিস। "
সুবহা ধীরে ধীরে বুকমার্কটা হাতে নিল। আঙুল দিয়ে আলতো করে সাদা পালক ছুঁয়ে দেখল। হঠাৎ মনে পড়ে গেল এগারো বছর আগের সেই ছোট্ট নীল ফিতায় বাঁধা সাদা পালকের কথা। সে-ই পালক আজও যত্ন করে রেখে দিয়েছে সে। লহমায় বক্ষপিঞ্জরে মৃদু কম্পন অনুভূত হলো। আষু ভাইয়া এ বিষয়ে কিছুই জানে না। তবুও? আবারো পালক! কি অদ্ভুত মিল! ভাইয়া কী আজও সে-ই উপহারগুলোর কথা মনে রেখেছে? এই বুকমার্ক দেখে তার কি কিছুই মনে পড়েনি? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ভুলে গিয়েছে? ফিকে হয়েছে পুরনো দিনের স্মৃতি। তরুণীর ঠোঁটের বাঁকে ফ্যাকাশে মুগ্ধতা প্রকাশ পেল। আস্তে করে বলল,
" অনেক.. সুন্দর! "
" পছন্দ হয়েছে? "
ইতিবাচক মাথা নাড়ল সুবহা। এবার আর 'লাগবে না' বলল না। না কোনোরকম অজুহাত দিল। শুধু আঙুলের মাঝে বুকমার্কের প্যাকেট যত্ন করে ধরে রাখল। যেন মূল্যবান কোনো উপহার।
মাগরিবের আজান দিয়েছে। আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে দূরের মসজিদ থেকে। মেলার কোলাহলের মাঝেও সেই ধ্বনি শুনতে পেল ওরা। ধীরে ধীরে বাড়ির পথ ধরল। সবার হাতে ছোট-বড় কেনাকাটার ব্যাগ। আর সুবহা? সুবহার হাতেও ছোটখাটো একটা প্যাকেট। তাতে ছোট্ট সাদা পালক লাগানো বুকমার্ক। বুকমার্কের দাম হয়তো বেশি নয়। তবুও তার কাছে অমূল্য।
•
রাতের ভোজন পর্ব শেষ হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। বাড়ির কোলাহল ধীরে ধীরে থেমে গিয়েছে। আকাশে গোল চাঁদ। জোৎস্নার আলোয় আচ্ছাদিত বাড়ি। শিউলি গাছের নিচে সাদা ফুলগুলো যেন ছোট ছোট তারার মতো বিছিয়ে আছে। বাড়ির সামনের লম্বা বারান্দায় পুরোনো কাঠের ইজি চেয়ার। আধশোয়া হয়ে আছেন তাফাজ্জল সাহেব। হাতে তসবীহ। ধীরে ধীরে আঙুলে তসবীর দানা ঘুরছে। বয়সের ছাপে মানুষটির শরীর নুইয়ে দিয়েছে। চাহনি স্থির। পায়ের শব্দ শুনে মুখ তুললেন তিনি। আষাঢ় দাঁড়িয়ে। দুই হাতে দু'টো গরম গরম চায়ের কাপ।
" চা! "
তাফাজ্জল সাহেব মুচকি হাসলেন। আষাঢ় একটা মোড়া টেনে দাদাভাইয়ের পাশে বসল। চায়ের কাপ এগিয়ে দিলো। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিলেন তাফাজ্জল সাহেব। তৃপ্তি ছড়িয়ে পড়ল মনে।
" তুমি বানিয়েছো? "
" হুম। ভালো হয়েছে? "
" হ্যাঁ, বেশ ভালো হয়েছে। ভীনদেশে গিয়ে অনেককিছুই শিখেছো! "
" প্রয়োজন ভেদে শেখা হয়েছে। তুমি তো জানো সব। "
" হুম। ওই দেশে কি কি শিখেছো তা তো জানি। এবার বলো তো একটু। এত বছরে মাতৃভূমির ঠিক কী কী ভুলে গিয়েছো? "
ক্ষণিকের জন্য চুপ রইল আষাঢ়। তারপর বলতে লাগল,
" মাতৃভূমিকে কখনো ভোলা যায় দাদাভাই? কানাডা গিয়ে সবচেয়ে বেশি মিস্ করেছি আমাদের এই বান্ধাবাড়ী। এই বাড়ি, এই উঠোন, আমাদের এই হাসিখুশি বিশাল পরিবার। সবটা খুব মিস্ করেছি। "
তাফাজ্জল সাহেব সস্নেহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে,
" দাদুভাই! মানুষ যত দূরেই যাক না কেন, নিজের শেকড়ের গন্ধ কখনো ভুলতে পারে না। "
কথাটা শুনে মাথা নাড়ল আষাঢ়। দাদাভাইয়ের সঙ্গে সে একমত। তাই তো বিলেতে গিয়েও কখনো ভুলতে পারেননি শেকড়ের গন্ধ। দাদা-নাতি দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ। কানে ভেসে বেড়াচ্ছে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার গান। দূরে কোথাও রাতজাগা কুকুরের শব্দ। হঠাৎ আষাঢ় ডাকল,
" দাদাভাই? "
" হুম? "
" তোমার কি কষ্ট হয়? "
তাফাজ্জল সাহেব প্রশ্নবোধক চোখে তাকালেন,
" কিসের কষ্ট? "
" এই যে.. আমরা সবাই একসাথে আর থাকি না। "
কথাটা শুনে বৃদ্ধের হাত থেমে গেল। চায়ের কাপে স্থির হলো আঙুল। অনেকক্ষণ পরে তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
" একটু তো কষ্ট হয়। "
দৃষ্টি নিবদ্ধ বাড়ির উন্মুক্ত উঠোনে। তাফাজ্জল সাহেব বলে চলেছেন,
" এই বাড়িটা যখন বানিয়েছিলাম, তখন আমার একটা স্বপ্ন ছিল। "
আষাঢ় চুপচাপ শুনছে।
" ভেবেছিলাম.. আমার ছেলেরা, তাদের ছেলেমেয়েরা.. সবাই এই বাড়িতে বড় হবে। একসাথে থাকবে। খাওয়া-দাওয়া করবে। ঈদ করবে। আনন্দ করবে। "
মৃদু হাসলেন তিনি,
" আলহামদুলিল্লাহ্! অনেক বছর আল্লাহ্ আমাকে সেই সুখ দিয়েছিলেন। "
কিছুক্ষণ নীরবতা। খুব আস্তে করে বললেন,
" কিন্তু সবসময় তো মানুষের সব ইচ্ছা পূরণ হয় না। "
আষাঢ়ের বুকে হালকা মোচড় দিয়ে উঠল। সে জানে.. এই ভাঙনের সূত্রপাত তার পরিবার থেকে। মায়ের জেদের কারণে। নিচু গলায় বলল আষাঢ়,
" দাদাভাই? "
" হুম? "
" আমাদের চলে যাওয়াতে.. তুমি খুব কষ্ট পেয়েছিলে, তাই না? "
তাফাজ্জল সাহেব নাতির দিকে তাকালেন। মুখে দরদী হাসি। হাত বাড়িয়ে আষাঢ়ের মাথায় রাখলেন।
" তোমার কি মনে হয়? "
" মনে হয় সব আমার জন্য হয়েছে। "
বৃদ্ধ সঙ্গে সঙ্গে নেতিবাচক মাথা নাড়লেন,
" একদম না। "
" কিন্তু? "
" আমার কথা শোনো দাদুভাই। "
গলাটা একটু ভারী হয়ে এলো ওনার।
" একটা সংসার কখনো একজন মানুষের জন্য রাতারাতি ভাঙে না। অনেক ঘটনা, অনেক প্রতিকূলতা, অনেক না-বলা কষ্ট জমে জমে অবশেষে একদিন দেয়ালে বড় ফাটল ধরে।"
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,
" তুমি তখন ছোট ছিলে। নিজের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিয়ো না। "
আষাঢ়ের মুখাবয়ব ম্লান। সে চায়ের কাপ পাশে রাখল। ধীরে ধীরে দাদাভাইয়ের হাত নিজের দুই হাতের ভেতর নিল। দাদাভাইয়ের হাতের চামড়া কুঁচকে গেছে। শিরাগুলো স্পষ্ট। সময় বড় নি'ষ্ঠুর। কম্পিত গলায় বলল আষাঢ়,
" তুমি বুড়ো হয়ে গেছো দাদাভাই। "
হেসে উঠলেন তাফাজ্জল সাহেব,
" বয়স হয়েছে তো। "
" এতটা বুড়ো কবে হলে? আমি তো আমার ইয়ং দাদাভাইকে রেখে গিয়েছিলাম। "
বৃদ্ধ আবেগী চোখে তাকিয়ে,
" মাঝখানে অনেক বছর কেটে গিয়েছে দাদুভাই। আমি তো তোমাকে দেখছি। যে পিচ্চি ছেলেটাকে নিয়ে একসময় যখন তখন হাত ধরে হাটে বাজারে গিয়েছি। সে-ই দাদুভাই কত বড় হয়ে গেছে! আমার হাত ধরে আজ এখানে বসে আছে। অতীতের জন্য নিজেকে দোষারোপ করছে। এত বড় হয়ে গেছো তুমি? "
আষাঢ়ের কণ্ঠস্বর আবেগে রুদ্ধ। তাফাজ্জল সাহেব বললেন,
" জানো দাদুভাই? যৌথ পরিবার মানে শুধু একসাথে থাকা নয়।.. যৌথ পরিবার মানে একজনের সুখে দশজনের হাসি। একজনের দুঃখে দশজনের ভরসার কাঁধ। "
চোখ তুলে চাঁদের দিকে তাকালেন তিনি।
" ঘর আলাদা হতে পারে। শহর আলাদা হতে পারে। কিন্তু মন যদি আলাদা না হয় তাহলেই পরিবার বাঁচে। "
আষাঢ় নীরবে শুনে গেল। বৃদ্ধ আবার বললেন,
" তোমরা ভাইবোনেরা কখনো একে অপরের হাত ছেড়ো না। ছোটদের আগলে রেখো। বড়দের খোঁজ নিয়ো। আর.. "
মলিন হেসে নাতির গালে হাত বুলিয়ে দিলেন তিনি।
" এ বাড়িকে কখনো ভুলে যেয়ো না। "
আষাঢ় নিজেকে সামলাতে পারল না আর। মোড়া থেকে নেমে দাদাভাইয়ের হাঁটুর কাছে বসে পড়ল। আলতো করে কোলে মাথা রাখল। সে-ই ছোটবেলার মতো। তাফাজ্জল সাহেব কিছু বললেন না। যত্নশীল, স্নেহপ্রবণ হাতে নাতির চুলে বিলি কাটতে লাগলেন। অনেক বছর পর সেই স্পর্শ আবার ফিরে পেল আষাঢ়। চোখ দু'টো নীরবে হালকা ভিজে উঠল।
•
দুপুরবেলা। আকাশজুড়ে তুলোর মতো সাদা মেঘ। হালকা রোদ। দোতলা টিনের ঘরের পেছনাংশ। লম্বা সরু স্থান। ফাঁকা সে স্থানটি মরিচা ধরা টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা। টিনের বেড়ার ওপাশে টহলরত ঘন গাছপালা। গাছের পাতা গলিয়ে সূর্য কিরণ খেলা করে চলেছে জমিনের বুকে। বাড়ির পেছনের এই অংশটি মূলত হাঁটাচলা, লাকড়ি রাখা, কখনোবা গুরুত্বপূর্ণ কাজে একসময় ব্যবহৃত হতো। এখন আর হয় না। গাছপালায় ঘেরা সে স্থানটি বাড়ির পরিত্যক্ত ঢেঁকি ঘরের ডান পাশে অবস্থিত। নিকটেই একটি মৃ'তপ্রায় পুকুর। আজ যেন ছোটোখাটো উৎসব বসেছে সেখানে। বহু বছরের পুরনো স্মৃতিচারণ হচ্ছে। সকাল নাগাদ ঘোষণা দিয়েছেন ফজল সাহেব,
" পিকনিক হবে আজ। "
অবিলম্বে উল্লাসে মেতে উঠেছে তরুণ প্রজন্মের সদস্যরা।
-
বাঁশের মাচার নিচে ইট জুড়ে বানানো হয়েছে দুইটা চুলা। একটাতে গরুর মাংস রান্না হচ্ছে। আরেকটায় খিচুড়ি। পাশেই বড় ডেকচিতে রান্না করা দেশি মুরগির ঝোল। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, বেগুন কাটা হচ্ছে। হাসনা পেঁয়াজ কাটতে কাটতে প্রায় কেঁদে ফেলেছে। হেনা পাশে দাঁড়িয়ে। দুষ্টু হেসে বলল,
" কিরে কাঁদছিস কেন? পেঁয়াজের জন্য নাকি আষাঢ় ভাইয়ার জন্য? "
চোখ মুছতে মুছতে জানাল হাসনা,
" দু'টোই। "
এদিকে শামীমা, সাফিয়া রান্নায় ব্যস্ত। সুবহা তাদের সহকারী হিসেবে রয়েছে। প্রয়োজনে অল্পস্বল্প হেল্প করছে। মাথায় ওড়না টানা। এই মুহূর্তে বেশ যত্ন সহকারে বড় খুন্তি দিয়ে গরুর মাংস নাড়ছে সুবহা। আষাঢ় কয়েকবার পাশ কাটিয়ে গেল। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। মেয়েটা প্রয়োজনের বাইরে তেমন কথা বলে না। শুধু একবার চোখ তুলে তাকায়। আবার চোখ নামিয়ে নেয়। অদ্ভুত একটা মেয়ে!
পেরিয়ে গেল বেশকিছু সময়। খিচুড়ি রান্না প্রায় শেষের দিকে। চুপিচুপি পেছন থেকে উদয় হল আষাঢ়। হঠাৎ করে ঢাকনা তুলে ফেলল। পাশে দাঁড়িয়ে সুবহা। অবাক হয়ে গেল!
" কী করছো? "
ডেকচির ভেতরে উঁকি দিয়ে বলল আষাঢ়,
" চেক করছি। "
" কী? "
" পুড়েটুড়ে গেল কিনা। "
" পুড়লে গন্ধ পেতে। "
ত্যাছড়া হাসল আষাঢ়,
" আমাকে টেকনিক শেখাতে এসো না মেয়ে। গন্ধ ছাড়াই কয়েকশো গজ দূর থেকে টের পাই। "
খিচুড়ি চেক করে বেশ ভাব ধরে চলে গেল আষাঢ়। সেদিকে তাকিয়ে একাকী বিড়বিড় করে উঠল সুবহা,
" চাপাবাজ! "
-
রান্না শেষ হতে হতে দুপুর প্রায় দুইটা। গোসল, নামাজ কালাম সেরে বাড়ির উঠোনে জমায়েত হয়েছে সকলে। আমগাছের নিচে বড় বড় চাটাই বিছানো। একেকজনের কলাপাতায় সাজানো যার যার পছন্দমাফিক আইটেম। ভাত। খিচুড়ি। গরুর মাংস। মুরগির ঝোল। বেগুন ভাজা। টমেটোর চাটনি। যার যা পছন্দ আর কি। সামনাসামনি দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে বসেছে সবাই। প্রথম লোকমা মুখে দিয়ে চোখ বড় বড় রাজিনের।
" আমি আর ঢাকা ফিরছি না। "
চলবে।
📌 আমাদের গল্প গ্রুপে জয়েন হতে পারেন পাঠকবৃন্দ। সেখানে আমার লেখা গল্প-উপন্যাস সম্পর্কিত ছোট-বড় অনুভূতি ব্যক্তকরণ, গল্প নিয়ে আলোচনা, ভুলত্রুটি শুধরে দেয়া, রিভিউ প্রদান এবং গল্পের চরিত্র-দৃশ্য নিয়ে নিজস্ব মতামত পেশ করতে পারেন। এজন্য আর বিলম্ব না করে জয়েন করুন আমাদের গল্প সংক্রান্ত গ্রুপে...
▪️গ্রুপ লিংক -
https://facebook.com/groups/499389245208190/