#আষাঢ়গগণে_প্রণয়াসক্তা
#তাহিরাহ্_ইরাজ
[১৭]
ঘড়ির কাঁটা দশ ছুঁইছুঁই। শীতের মিঠে রৌদ্র বিছিয়ে রয়েছে উঠোনে। বাংলা মাঘ মাস চলছে। রাতের কুয়াশা অনেকখানি কেটে গিয়েছে। তবুও বাতাসে রয়ে গিয়েছে শীতের হালকা কামড়। বাঁশঝাড়ের মাথা ছুঁয়ে মৃদু উত্তরী হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। বাড়ির আশেপাশে গাছে গাছে গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ। বাতাসে মিষ্টি ফুলের সুবাস। বাড়িতে আজ সকাল থেকেই অন্যরকম ব্যস্ততা। যেন ঈদের আমেজ। উঠোনের একপাশে নতুন করে ঝাড়ু দেয়া হয়েছে। বারান্দার রেলিং ধোয়ার পর চকচক করছে। বসার ঘরের সোফাগুলোতে নতুন কভার। জানালার পর্দা বদলে দেয়া হয়েছে। দু'টো ভিন্ন ভিন্ন ফুলদানিতে সাজানো ডালিয়া, লাল গোলাপ। ঘরে প্রবেশ করতেই মন ভরে যাচ্ছে স্নিগ্ধ সুগন্ধে।
হাতে ঝাড়ন নিয়ে এঘর-ওঘর ব্যস্ত পায়ে ছুটে বেড়াচ্ছে সুবহা। এটা ওটা ঝেড়ে পরিস্কার করছে। শান্ত অবয়ব তরুণীর। ভেতরে যেন অস্থির পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে। ঘরের জানালা নিকটবর্তী দাঁড়িয়ে বান্ধবী নিগার। হাতে শুকনো কাপড়। জানালার কাঠের ফ্রেম মুছতে মুছতে বলল,
" আর কতবার মুছবো বুইন? মুছতে মুছতে কাঠের ছাল চামড়া উঠে যাচ্ছে। "
" বাজে বকিস না তো। কোনায় কোনায় এখনো ময়লা আছে। ভালোমতো মুছে ফেল। "
" মুছতেই তো আছি। "
সুবহা এদিকে কথা বাড়াল না আর। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা ফুলদানির কাছে। আলতো করে ফুলদানি একবার ডানদিকে সরাল। আবার মনমতো না হওয়ায় বাঁদিকে রাখল। ইখফা টুলে দাঁড়িয়ে। বসার ঘরের দেয়ালে থাকা পেইন্টিং পরিষ্কার করছে নরম কাপড়ে। তার ফাঁকে ফাঁকে লক্ষ্য করছে সুবহার কাণ্ড। ফুলদানি ঠিকঠাক জায়গায় রেখে সুবহা চলে গেল ভেতরের একটা রুমে। নতুন বেডশিট বিছানো হয়েছে খাটে। চাদরের মৃদু অগোছালো ভাব ঠিক করে জানালা খুলে দিলো সুবহা। ফুরফুরে শীতল হাওয়া প্রবেশ করল ঘরে। সতেজ হাওয়ায় শ্বাস ছাড়ল সে। ঠোঁটে মুচকি হাসি। ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে ভেসে এলো হাঁকডাক।
" সুবু! এইদিকে আয় তো মা। "
সুবহা পিছু ঘুরে তাকাল। মাথার ওড়না ঠিকঠাক করে দ্রুত পায়ে ছুটে গেল রান্নাঘরে। শরীরে জড়িয়ে রাখা শীতের জন্য আরামদায়ক চাদর। রান্নাঘরে প্রবেশ করল সুবহা। সেখানে এক ভিন্ন ব্যস্তময় জগৎ। চুলায় পাশাপাশি দু'টো বড় হাঁড়ি। একটায় গরুর মাংস কষানো হচ্ছে। আরেকটায় অনেকগুলো ডিম সিদ্ধ হচ্ছে। ফুফু মাশিয়াত সবজি কাটছেন একপাশে। গরম মসলার সুগন্ধে পুরো রান্নাঘর মৌ মৌ করছে। শামীমা গরুর মাংস নাড়তে নাড়তে বললেন,
" সুবু মা। কাঁচের জিনিসপত্র সব ধোয়া হয়েছে? "
" হ্যাঁ ছোটমা। ধোয়ার পর মুছে রেখেছি আমি। "
" খুব ভালো করেছিস মা। "
সাফিয়া পেঁয়াজ কাটতে কাটতে বললেন,
" আচ্ছা, শরবত কি করতে বলবো? শীতের মধ্যে শরবত লাগবে? "
মাশিয়াত আপত্তি জানালেন,
" না ভাবী। শীতের মধ্যে আর শরবত লাগবে না। গরমকাল হলে চলতো। তাদের আসতে আসতে প্রায় যোহরের ওয়াক্ত হয়ে যাবে। সেসময় কেউ অত শরবত খাবে না। "
" আমিও সেটাই ভাবছিলাম। "
এই বলে সাফিয়া মেয়েকে বললেন,
" মা, প্লেটগুলো একটু গুনে নিয়ো তো। এতজন মানুষ। প্লেট যেন কম না পড়ে। "
" আমি গুনে নিয়েছি মা। প্রয়োজনের চেয়ে দুইটা করে বেশিই নিয়েছি। ইনশাআল্লাহ্ শর্ট পড়বে না। "
" খুব ভালো করেছো। তুমি গিয়ে তাহলে একটু বিশ্রাম নাও। ডাকলে এসো। "
" আমি ঠিক আছি মা। কিছু লাগলে বোলো। আমি গিয়ে দেখি ওরা ওদিকে কি করছে। "
" আচ্ছা। "
হঠাৎ উঠোন থেকে ভেসে এলো পলাশের উঁচু কণ্ঠস্বর। থমকে গেল সুবহা।
" মা! মেজো মামী! ও ছোট মামী! "
হাঁপাতে হাঁপাতে রান্নাঘরে ছুটে এলো পলাশ। মাশিয়াত ছেলের দিকে ঘুরে তাকালেন।
" কি হয়েছে? ষাঁড়ের মতো চিৎকার করছিস কেন? "
শ্বাস সামলে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল পলাশ। চোখেমুখে উত্তেজনার রেশ।
" বড় মামা ফোন দিয়েছে। "
" তাই নাকি? কদ্দূর ওনারা? "
" পদ্মা পাড় হয়েছেন। "
এক মুহূর্তের জন্য যেন পুরো বাড়ি স্তব্ধ হয়ে গেল। পরের মুহূর্তেই চারদিকে ব্যস্ততা দ্বিগুণ হলো।
" আয় হায়! আর তো বেশি বাকি সময় লাগবে না। ঘন্টাখানেকের মধ্যে চলে আসবে। "
সাফিয়া ননদকে বললেন,
" আপা, তাড়াতাড়ি সবজি বসিয়ে দিই। এরপর ডিম ভুনা করবো নে। "
" হ্যাঁ হ্যাঁ। তাড়াতাড়ি সবজি বসিয়ে দাও। "
ডিম সিদ্ধ হতে হতে মাশিয়াত ব্যস্ত ভঙ্গিতে সবজিগুলো কেটে ফেললেন। সুবহা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে এখনো। পলাশ চলে গিয়েছে সংবাদ পৌঁছে দিয়েই।
•
মধ্যাহ্ন প্রহর। শেষমুহূর্তে রান্নাঘরের ব্যস্ততা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাহিল, হাসনা, হেনা বারান্দায় দাঁড়িয়ে। অধীর আগ্রহে পায়চারি করে চলেছে। হঠাৎ কাছাকাছি ভেসে এলো গাড়ির শব্দ। বাড়ির বাইরে তাকিয়ে উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠল সাহিল,
" এসেছে এসেছে। "
হেনা ছুটে এসে কাছ থেকে আরো ভালো করে লক্ষ্য করল। ওই তো গাড়ি দেখা যাচ্ছে। এদিকেই আসছে। উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে উঠল সে,
" এবার সত্যি সত্যি এসেছে। "
এক নিমিষে পুরো বাড়ি যেন জেগে উঠল। ধুলোমাখা রাস্তা পেরিয়ে চকচকে কালো এসইউভি থামল বাড়ির উঠোনে। ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। চারদিকে নীরবতা। একে একে বাড়ির সদস্যরা উপস্থিত হলো উঠোনে। এসইউভির ড্রাইভিং সাইডের দরজা খুলে গেল। গাড়ি থেকে নেমে এলো আষাঢ়। সাদা শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। গাঢ় নীল জিন্স। পায়ে সাদা স্নিকার্স। চোখে হালকা ক্লান্তি। ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি। গাড়ির অপর পাশের দরজা খুলে নামলেন ফারুক সাহেব। পা রাখলেন গ্রামের মাটিতে। প্রাণ ভরে গভীর শ্বাস নিলেন।
" আহ্! এই সতেজতার জন্যই তো বারবার ছুটে আসি। "
ঠোঁটে মুচকি হাসি ওনার। এগিয়ে গেলেন আব্বার দিকে। এতক্ষণে পেছনের দরজা খুলে নেমেছে আয়ানা। পাঁচ বছর পর গ্রামে আগমন। দীর্ঘক্ষণ চারপাশে তাকিয়ে রইল সে। চোখের তারায় ভেসে উঠল একের পর এক পুরনো স্মৃতি। সাহিল, হেনা দৌড়ে ছুটে এলো ওদের কাছে।
" আষাঢ় ভাইয়া! আপা! "
সাহিল জড়িয়ে ধরল আষাঢ়কে। আষাঢ় মৃদু হেসে চুলগুলো এলোমেলো করে দিলো। হাসনা, হেনা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আয়ানার সামনে। মুচকি হেসে বলল আয়ানা,
" ওরে বাবা! কত বড় হয়ে গেছিস তোরা! "
হেনা অভিমানের সুরে বলল,
" আপা! এতদিন পর মনে পড়ল আমাদের? "
কানের লতি ধরে ক্ষমা চাইল আয়ানা,
" স্যরি। ভুল হয়ে গেছে। আর হবে না বনু। "
হাসনা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
" একথা আগের বারও বলেছিলে। এরপর আর মনে রাখোনি। "
" আপা স্যরি। প্লিজ! "
" ঠিক আছে। ঠিক আছে। এটাই শেষবার। আর ক্ষমা করতে পারবো না কিন্তু। "
" ঠিক আছে। এটাই শেষ। "
আষাঢ়, আয়ানা দুই ভাই-বোন তাফাজ্জল সাহেবের কাছে এগিয়ে গেল। একসাথে সালাম দিলো,
" আসসালামু আ'লাইকুম। "
" ওয়া আ'লাইকুমুস সালাম। "
নাতি-নাতনির মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন বৃদ্ধ,
" আল্লাহ্ তোমাদের সুখে রাখুক। "
আয়ানার মাথায় স্নেহশীল হাত রেখে বললেন,
" এতদিন পর এই বুড়োকে মনে পড়ল দিদিভাই? "
আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ল আয়ানা। দাদাভাইয়ের একহাত মুঠোবন্দী করে বিনীতভাবে ক্ষমা চাইল,
" মাফ করে দাও দাদাভাই। ওই.. কাজের ব্যস্ততায়.. "
মৃদু হাসলেন তাফাজ্জল সাহেব,
" ব্যস্ততা থাকবে দিদিভাই। এই বাড়িটা তোমাদেরই। যখন ইচ্ছা চলে আসবে। কেমন? "
" জ্বি। "
ফারুক সাহেব পাশে দাঁড়িয়ে। আব্বার চোখে অশ্রু চিকচিক করছে। ওনার দৃষ্টি এড়ায়নি।
" কেমন আছেন আব্বা? "
" আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছি। তোমাদের সবাইকে দেখে আরো ভালো লাগছে। "
ফিরোজ সাহেব জানতে চাইলেন,
" পথে কোনো অসুবিধা হয়নি তো ভাইজান? "
" না। আলহামদুলিল্লাহ্ বেশ ভালোভাবে এসেছি। ঢাকার জ্যাম পেরিয়ে আসতেই একটু সময় লেগেছে। "
শামীমা জানতে চাইলেন,
" ভাইজান, ভাবী কোথায়? ওনাকে দেখছি না যে। "
হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এলো। আষাঢ়, আয়ানার গোপনে চোখাচোখি হলো। ফারুক সাহেব হালকা নিঃশ্বাস ফেললেন,
" আফরোজা আসেনি। "
কিছুক্ষণ নীরবতা। সবাই অল্পবিস্তর বুঝতে পারল বিষয়টা। কেউ আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। পরিস্থিতি সামলে নিতে আষাঢ় মুচকি হাসল,
" একমাত্র মেয়ের বিয়ে। বুঝতেই পারছো তো। বিজি আছে। এসে পড়বে কয়েকদিনের মধ্যে। "
থমথমে পরিস্থিতি দূর করতে ইখফা দুষ্টু গলায় বলে উঠল,
" ভাইয়া, আজকে কিন্তু কোনোরকম ছাড় নেই। আগে খাওয়া-দাওয়া হবে। তারপর ঢেড় সাড়ে গল্প। "
দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল আষাঢ়,
" আল্লাহর ওয়াস্তে আগে পানি খাইতে দে বুইন। "
হেসে উঠল কেউ কেউ। সে হাসির মাঝেই এক কোণে, সবার আড়ালে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে সুবহা। মাথায় ওড়না। দু'হাত ওড়নার ভাঁজে জড়ানো। দীর্ঘ কয়েক মাস পর আবার মানুষটির দর্শন। কুশল বিনিময়ের এক ফাঁকে তাকাল আষাঢ়। মুহূর্তের জন্য চোখে চোখ পড়ল দু'জনের। সুবহা দ্রুত দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। নিঃশব্দে ঘুরে দাঁড়াল মায়ের পেছনে। আষাঢ় ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে। মেয়েটা এখনো আগের মতোই। দেখলেই পালাই পালাই।
•
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। বাড়িতে উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রশান্তিতে মোড়ানো। কোলাহল থেকে বেরিয়ে সরু পথ ধরে এগিয়ে গেল আয়ানা। কাঠের পুরনো দরজার সামনে থেমে গেল। স্থির পদযুগল। আঙ্গুলের ডগায় আলতো স্পর্শ করল দরজার পাল্লা। সময়ের আঁচড়ে রঙ কতখানি ফিকে হয়ে গিয়েছে। তবুও কত পরিচিত। আস্তে করে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল যুবতী। মুচড়ে উঠল মনের গহীনে। এটাই তার ঘর। শৈশব, কৈশোর এখানেই কেটেছে। পাঁচ বছর পর আজ আবার ফিরে আসা। আকারে ছোট ঘরটা। শহরের বিশালাকার রুমের তুলনায় খুবই ছোট। কিন্তু প্রতিটি কোণায় কোণায় জমে রয়েছে অগণিত মূল্যবান স্মৃতি।
পূর্বমুখী জানালা খুলে রাখা। সেদিকে এগিয়ে গেল আয়ানা। জানালার কাঠে হালকা আঁচড়ের দাগ। মৃদু হাসল সে। ছোটবেলায় রঙ পেন্সিল হাতে এখানে অসংখ্যবার ফুল-পাতা অঙ্কন করার বৃথা চেষ্টা করেছে। মায়ের বকুনি খেয়েছে। তবুও আঁকাআঁকি করেছে। জানালার বাইরে দৃষ্টি পড়ল তার। শীতের দুপুরে নিরিবিলি দাঁড়িয়ে সে-ই পুরনো শিউলি গাছ। শরৎকালে এই গাছের নিচে কতশত ফুল কুড়িয়েছে সে, ছোট্ট সুবহা। আর আষাঢ়? ফুল ছিঁড়ে ছিঁড়ে দুষ্টুমি করতো। জিভ বের করে ওদের ভেংচি কাটতো। কেঁদে ফেলতো সুবহা। সেসব মনে করে হালকা হাসল যুবতী। পরক্ষণেই মিলিয়ে গেল হাসি।
ঘরের এক কোণে কাঠের আলমারি। আলমারির গায়ে হাত বুলিয়ে দিলো আয়ানা। মসৃণ কাঠের গায়ে সময়ের ছাপ স্পষ্ট। কোথাও কোথাও বার্নিশ উঠে গিয়েছে। তবুও যেন সে-ই আগের কাঠ কাঠ গন্ধ বিদ্যমান। পুরো ঘরজুড়ে যেন বইয়ের গন্ধ, নতুন খাতার গন্ধ। সর্বোপরি ছেলেবেলার গন্ধ। আয়ানা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল পড়ার টেবিলের কাছে। কাঠের টেবিল। কোণায় ছোট্ট একটা দাগ। স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠল এক বিকেলের কথা। স্কুলের অঙ্ক হোমওয়ার্ক করতে ব্যর্থ হয়ে রাগের মাথায় কম্পাস দিয়ে খুঁচিয়েছিল টেবিলের এই অংশটি। জানতে পেরে বকেছিল বাবা। রাতে আবার চুপিচুপি আইসক্রিম কিনে দিয়ে মন ভুলিয়েছিল। পুরনো মধুর স্মৃতি মনে পড়তেই চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল নোনাজল।
বিছানায় এসে বসল আয়ানা। হাত বুলিয়ে দিতে লাগল বিছানা চাদরে। এ ঘরেই মাধ্যমিক পরীক্ষার আগের রাতগুলো জেগে পড়ালেখা করেছে। এ ঘরেই অদক্ষ, শিশু হাতে প্রথম ফ্রকের ডিজাইন এঁকেছে। এ ঘরেই ভবিষ্যতের কত স্বপ্ন বুনেছে। একদিন বড় হবে সে। নিজের পরিচয়ে পরিচিত হবে। আজ সে প্রতিষ্ঠিত। স্বপ্নের চাকরি রয়েছে। উজ্জ্বল ভবিষ্যতে নিজ অবস্থান রয়েছে। তবে নিজ শেকড়কে পিছু ফেলে এগিয়ে যেতে পারেনি। ব্যর্থ হয়েছে। হঠাৎ দৃষ্টি পড়ল দেয়ালের ওপর। ম্লান প্রায় কালো মার্কারের দাগ। উচ্চতা মাপার দাগ। প্রতি ছয় মাস পরপর আষাঢ় পিঠ সোজা করে দাঁড় করিয়ে এখানে উচ্চতা মেপে নিতো। বলতো,
' দেখি আপা। কে বেশি লম্বা? তুমি নাকি আমি? '
সে-ই দাগ আজো রয়ে গিয়েছে। বহুলাংশে মুছে গিয়েছে। তবে স্মৃতির পাতায় অটুট। দেয়ালে হাত রেখে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল আয়ানা। আজ আর উচ্চতা বাড়ে না। বয়স বাড়ে। দায়িত্ব-কর্তব্য বাড়ে। আর মাত্র কিছুদিন। কনের বেশে এই পৈতৃক ভিটা থেকে বিদায় নেবে সে। শৈশবে এই ঘরটিই ছিল তার গোটা পৃথিবী। আজ সেখানে অতিথির মতো দাঁড়িয়ে। চোখ বেয়ে নীরবে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। অন্তঃস্থলে অদ্ভুতুড়ে অনুভূতি হচ্ছে। ভয়, সংকোচ, অকারণ বিষন্নতা।
•
মাগরিবের নামাজ শেষ হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। জামায়াতে নামাজ আদায় করে বাড়ির বয়জ্যেষ্ঠ পুরুষরা নিজেদের মতো খোশ গল্পে ব্যস্ত বসার ঘরে। বাড়ির পশ্চিম দিকের ঘরে আজ যেন মেয়েলি আসর বসেছে। মেঝেতে পাতা নকশিকাঁথার ওপর গোল হয়ে বসেছে সবাই। আয়ানা, সুবহা, ইখফা, নিগার। সুবহার স্কুল, কলেজ জীবনের বান্ধবী মারিয়া, হানি। তাদের মধ্যখানে বড় থালায় ভাজা চিনাবাদাম, মুড়ি, নারকেলের নাড়ু, তিলের খাজা, চায়ের কাপ। হাসি-আড্ডায় সরগরম পুরো ঘর। ইখফা বাদাম ভাঙতে ভাঙতে জানতে চাইল,
" হ্যাঁ রে মারিয়া! শুনলাম কলেজে নাকি নতুন হ্যান্ডু স্যার এসেছে? "
মারিয়া ভেংচি কেটে বলল,
" হ্যান্ডু না ছাই। কি কড়া! বাবা রে! "
হানি সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
" কড়া না বলে ভ'য়ঙ্কর বল। জানিস, ইফু? স্যার প্রথম দিন এসেই সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। ক্লাসে কারো কাছে মোবাইল দেখলে, সোজা ক্লাস থেকে বের করে দেবেন। "
হেসে উঠল সবাই। নিগার দুষ্টু হেসে বলল,
" এমন ক্ষেপে যাচ্ছিস কেন? তোকেও বের করে দিয়েছিল নাকি? "
গলা খাঁকারি দিলো হানি। আমতা আমতা করে বলল,
" ওই না মানে.. "
" হ্যাঁ বল বল। "
" বিশ মিনিটের মতো দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। "
ঘরজুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল। মুচকি হাসছে আয়ানা। সচরাচর গাম্ভীর্যের সহিত ঘুরে বেড়ায়। এতদিন পর পরিবারের সঙ্গে নির্ভেজাল আড্ডা মন্দ লাগছে না বটে। নারকেলের নাড়ুতে কামড় বসিয়ে সুবহা বলল,
" এ তো কিছুই না। হানি আর কী করেছে, জানিস? "
" কী করেছে? "
ইখফাসহ বাকিরা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে। মিটিমিটি হাসছে সুবহা।
" হানি ইচ্ছাকৃতভাবে স্যারের ডেস্কে ওর খাতা রেখে এসেছিল। একটু অ্যাটেনশন পাওয়ার ধান্দা আর কি। এরপর.. "
হানি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানাল,
" বাজে কথা বলবি না তো। আমি মোটেও ইচ্ছা করে রেখে আসিনি। ভুল করে.. "
" আচ্ছা আচ্ছা। ভুল করে। এরপর স্যার কী করলেন?"
" কী করলেন? "
নিগার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
" পুরো ক্লাসের সামনে খাতা তুলে বললেন, যার হাতের লেখা তেলাপোকার মতো সুন্দর, সে এসে খাতাটা নিয়ে যাও। "
এক মুহুর্ত নীরবতা। অতঃপর ঘর কাঁপিয়ে হাসি। হানি রেগেমেগে কয়েকটা চিনাবাদাম ছুঁড়ে মা'রল সুবহার দিকে।
" শ'য়তাইন্না ছেড়ি! একদম আজেবাজে কথা বলবি না। স্যার মোটেও এমন কিছু বলেননি। "
ঠোঁট চেপে হাসছে সুবহা,
" বলেছিলেন তো। ভুলে গেছিস? "
আয়ানা বিস্ময়ে তাকিয়ে সুবহার দিকে! শান্ত, ভদ্র মেয়েটা। মাথা নিচু করে ঘুরে বেড়ায়। কণ্ঠস্বর বরাবর নিচুতে। তার এমন প্রাণোচ্ছ্বল রূপ-ও রয়েছে! জানা ছিল না তো। দূরে থেকে কতকিছুই মিস্ করে গিয়েছে সে। তার পরিবার। হানি এবার শোধ তুলতে পুরনো প্রসঙ্গ টেনে আনল,
" শুধু আমার কথাই বলবি? তোর কথাও কিছু বল। "
" আমার কথা আবার কী বলবি? "
" কেন? মনে নেই? ক্লাস এইটে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সময়? সবার সামনে কবিতা বলতে গিয়ে প্রথম লাইনই ভুলে খেয়ে ফেলেছিলি। "
" জ্বি না। আমি মোটেও ভুলে খেয়ে ফেলিনি। মাইক নষ্ট ছিল। "
মারিয়া টিটকারি মে'রে বলল,
" হ্যাঁ হ্যাঁ। মাইকে গণ্ডগোল ছিল। সে-ই সঙ্গে তোর দিমাগ মে।"
সুবহা নাড়ুর টুকরো ছুঁড়ে দিলো বান্ধবীর দিকে।
" হুশশ। "
আয়ানা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে! সুবহা এত প্রাণবন্ত, হাসিখুশি! মেয়েটা আজ সবার সঙ্গে গল্প করছে। হাসছে। হাত নেড়ে নেড়ে ঘটনা বলছে। কখনো আবার নিজেই হেসে কুঁকড়ে যাচ্ছে। ঘরের আবহাওয়া যেন ওর প্রাণোচ্ছ্বল রূপে উজ্জ্বল।
ঘরের বাইরে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আষাঢ়। হাতে মোবাইল। অফিসিয়াল মেসেজ চেক করছে একটা। হঠাৎ কানে এলো চেনা তবুও অচেনা হাসি। খিলখিল, প্রাণবন্ত সে হাসি! থেমে গেল পা। কুঁচকে গেল ভ্রু। পশ্চিম দিকের ঘরে তাকাল সে। দরজা আধখোলা। সেখান থেকেই হাসির শব্দ ভেসে আসছে। কৌতূহল সৃষ্টি হলো মনে। অজান্তেই এগিয়ে গেল। দরজার পাশে দাঁড়াল। ভেতরে চোখ পড়তেই অবাক! সাবুদানা! প্রাণ খুলে কথা বলছে মেয়েটা। মারিয়াকে খোঁচা দিচ্ছে। হাত নেড়ে নেড়ে কতকিছু বলছে। মুখে উজ্জ্বলতম হাসি। ঝলমল করছে চোখের তারা। আষাঢ় নির্বাক!
" এটা সাবুদানা? সে-ই কুট্টি দানা, যার কিনা আমার সামান্য প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে দিনরাত পাড় হয়ে যায়? "
ঘরের বাইরে আষু ভাইয়ার উপস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর সুবহা। নিজের মতো করে পটরপটর করে চলেছে। আষাঢ়ের ঠোঁট কেমন বেঁকে গেল।
" বাহ্! কথা বলতেও জানে? শুধু আমাকে দেখলেই বোবায় ধরে? ভালো। ভালো। "
সুক্ষ্ম ঈর্ষা খোঁচা দিয়ে চলেছে বুকের ভেতরে। ওদের সঙ্গে এত গল্প? এত হাসি? আর আমি? সামনে গেলেই,
' জ্বি.. না.. আচ্ছা.. '
নিজের অজান্তেই মুখ লটকে গেল আষাঢের। মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে ঘুরে দাঁড়াল সে। হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করে উঠল,
" ভালোই চলছে দিনকাল। আমাকে দেখলেই শুধু মুখে ঠাডা পড়ে। কালবৈশাখীর ঝড় ওঠে। "
থমথমে মুখে আষাঢ় চলে গেল সেখান থেকে। কেউই লক্ষ্য করল না তাদের অগোচরে এক ঈর্ষাকাতর যুবক প্রস্থান করেছে। স্রেফ আয়ানা এক ঝলক দরজার দিকে তাকাল। ক্ষণিকের জন্য পরিচিত এক ছায়া সরে যেতে দেখল যেন। চোখেমুখে তার প্রকাশ পেল কৌতূহল।
চলবে।
[ উহু উহু। কেউ একজন বুঝি জেলাস?
পাঠকবৃন্দ, কেমন লাগছে গল্পটি? জানাবেন কিন্তু। ধন্যবাদ সবাইকে পাশে থাকার জন্য। ]
📌 আমাদের গল্প গ্রুপে জয়েন হতে পারেন পাঠকবৃন্দ। সেখানে আমার লেখা গল্প-উপন্যাস সম্পর্কিত ছোট-বড় অনুভূতি ব্যক্তকরণ, গল্প নিয়ে আলোচনা, ভুলত্রুটি শুধরে দেয়া, রিভিউ প্রদান এবং গল্পের চরিত্র-দৃশ্য নিয়ে নিজস্ব মতামত পেশ করতে পারেন। এজন্য আর বিলম্ব না করে জয়েন করুন আমাদের গল্প সংক্রান্ত গ্রুপে...
▪️গ্রুপ লিংক -
https://facebook.com/groups/499389245208190/