🌸 প্রকাশ্যে ভালোবাসি 🌸
পার্ট — ৫
বিকেলের মিষ্টি রোদটা তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছিল। চৌধুরী বাড়ির বিশাল বাগানজুড়ে হালকা বাতাস বইছিল। সবাই মিলে বাগানের এক পাশে বসে গল্প করছিল। কেউ চা খাচ্ছিল, কেউ গল্প করছিল, আবার কেউ ছোট্ট ইরার দুষ্টুমি দেখছিল। ইরা একবার এদিকে দৌড়াচ্ছে, আবার ওদিকে দৌড়াচ্ছে। আরিশ বারবার তাকে সাবধানে চলতে বলছিল। কিন্তু ইরা যেন কারও কথাই শুনছে না। অরু আর অনু পাশাপাশি বসে গল্প করছিল। অনু হঠাৎ অরুর কানে কানে বলল, —আপু, তোমাকে আজ অনেক খুশি লাগছে। অরু অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, —কই? আমি তো এমনিই আছি। অনু মুচকি হেসে বলল, —না, কিছু একটা তো হয়েছে। অরু চোখ ছোট করে বলল, —তুই বেশি বুঝিস। অনু হেসে বলল, —আপু, আমি কিন্তু সব বুঝি। ঠিক তখনই পেছন থেকে ইরহানের কণ্ঠ ভেসে এল, —কী বুঝিস? অনু একটু চমকে উঠে বলল, —কিছু না ভাইয়া। ইরহান অরুর দিকে তাকিয়ে বলল, —তুই আবার কী নিয়ে ওর সঙ্গে ফিসফিস করছিলি? অরু বলল, —আপনার এত জানার কী আছে? ইরহান হেসে বলল, —আছে তো। অরু ভ্রু কুঁচকে বলল, —কী আছে? ইরহান কিছুক্ষণ অরুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, —তুই আমার সামনে বসে অন্য কারও সঙ্গে এত কথা বলবি, সেটা আমার ভালো লাগে না। অরু অবাক হয়ে বলল, —আপনি কি তাহলে চান আমি কারও সঙ্গেই কথা না বলি? ইরহান হেসে বলল, —তা বলিনি। তবে আমার সঙ্গে একটু বেশি কথা বলবি। অরু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, —আপনি সবসময় এমন কথা বলেন কেন? ইরহান শান্তভাবে বলল, —কারণ তুই আমার কাছে অন্যরকম। কথাটা শুনে অরু আর কিছু বলতে পারল না। সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। অনু পাশ থেকে সব শুনে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। ইরহান সেটা দেখে বলল, —তুই হাসছিস কেন? অনু বলল, —না ভাইয়া, কিছু না। অরু তাড়াতাড়ি বলল, —অনু, তুই ভেতরে যা তো! অনু হেসে বলল, —আচ্ছা আপু, বুঝেছি। আমি যাচ্ছি। অনু উঠে চলে যেতেই ইরহান অরুর দিকে তাকিয়ে বলল, —তুই লজ্জা পাচ্ছিস? অরু বলল, —একদম না। —তাহলে মুখ লাল কেন? —গরম লাগছে। ইরহান চারপাশের দিকে তাকিয়ে বলল, —এখানে তো বাতাসই চলছে। অরু বিরক্ত হয়ে বলল, —আপনি চুপ করবেন? ইরহান হেসে ফেলল। অন্যদিকে ইহান আর অনু বাগানের অন্য পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ইহান হাতে থাকা পানির বোতলটা অনুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, —তুমি পানি খাবে? অনু মাথা নেড়ে বলল, —না, লাগবে না। ইহান বলল, —সকাল থেকে তোমাকে ঠিকমতো পানি খেতে দেখিনি। অনু অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, —আপনি এত খেয়াল রাখেন? ইহান একটু থেমে বলল, —হ্যাঁ। অনু মুচকি হেসে বলল, —কেন? ইহান উত্তর না দিয়ে বলল, —আগে পানি খাও। অনু বোতলটা নিয়ে পানি খেল। তারপর বলল, —ধন্যবাদ। ইহান বলল, —শুধু ধন্যবাদ বললেই হবে? অনু অবাক হয়ে বলল, —তাহলে কী বলব? ইহান হেসে বলল, —কিছু না। তুমি হাসলেই হবে। অনু লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। একটু পর ইরা দৌড়ে এসে অনুর হাত ধরে বলল, —অনু আপু, চলেন! আমাকে আরিশ ভাইয়ার কাছে যেতে হবে। অনু হেসে বলল, —কেন? ইরা বলল, —উনি আমাকে ফুল দেখাবেন। অনু বলল, —আচ্ছা, যাও। ইরা দৌড়ে আরিশের কাছে চলে গেল। আরিশ তখন বাগানের গাছের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ইরা গিয়ে বলল, —আরিশ ভাইয়া, ওই ফুলটা আমার চাই। আরিশ ফুলটার দিকে তাকিয়ে বলল, —ওটা তো অনেক ওপরে। তুমি একটু অপেক্ষা করো। সে সাবধানে ফুলটা নিয়ে ইরার হাতে দিল। ইরা খুশি হয়ে বলল, —আপনি সবচেয়ে ভালো! আরিশ হেসে বলল, —এত সহজে আমাকে ভালো বলে দিলে? ইরা বলল, —হুম। কারণ আপনি আমার কথা শোনেন। আরিশ মুচকি হেসে বলল, —তাহলে তোমার কথা সবসময় শুনব। ইরা খুশি হয়ে বলল, —সত্যি? —সত্যি। একটু দূরে দাঁড়িয়ে অরু ওদের দেখে হাসছিল। ইরহান পাশে এসে বলল, —ইরা কিন্তু আরিশকে বেশ পছন্দ করে। অরু হেসে বলল, —ও তো ছোট। ইরহান বলল, —ছোট হলেও নিজের মানুষ চিনতে ভুল করে না। অরু বলল, —আপনি আবার শুরু করলেন! ইরহান হেসে বলল, —আমি কী করলাম? অরু কিছু না বলে সামনে তাকিয়ে রইল। এদিকে রাফি বাগানের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। মিরা আসতেই রাফির চোখ তার দিকে আটকে গেল। মিরা সেটা লক্ষ্য করে বলল, —এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? রাফি তাড়াতাড়ি বলল, —কই? তাকাইনি তো। মিরা হেসে বলল, —তাহলে আমি আসতেই আপনি চুপ হয়ে গেলেন কেন? রাফি বলল, —তুমি সামনে থাকলে কী বলব বুঝতে পারি না। মিরা একটু অবাক হয়ে বলল, —আমার সামনে কথা বলতে পারেন না? রাফি হেসে বলল, —পারতাম। কিন্তু ইদানীং তোমাকে দেখলে কথাগুলো গুলিয়ে যায়। মিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, —আপনি আজকাল অনেক অদ্ভুত কথা বলেন। রাফি বলল, —হয়তো কারণটা তুমিই। মিরা লজ্জা পেয়ে বলল, —আমি যাচ্ছি। রাফি হেসে বলল, —যাও। তবে বেশি দূরে যেও না। মিরা পেছন ফিরে বলল, —কেন? রাফি বলল, —তোমার সঙ্গে আবার কথা বলতে ইচ্ছে করবে। মিরা আর কিছু না বলে হেসে চলে গেল। সন্ধ্যা নামার আগেই সবাই ঘরের ভেতরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অরু সবার শেষে দাঁড়িয়ে ছিল। ইরহান এসে বলল, —তুই এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? অরু বলল, —এমনিই। ইরহান বলল, —চল ভেতরে। অরু হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর যাওয়ার পর ইরহান বলল, —অরু। অরু থেমে বলল, —জি? —আজকে তোকে একটা কথা বলব। অরু তাকিয়ে বলল, —কী কথা? ইরহান একটু চুপ করে থেকে বলল, —তুই হয়তো এখন বুঝবি না। কিন্তু তুই আমার কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা একদিন নিজেই বুঝে যাবি। অরু চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, —আপনি আমাকে এত গুরুত্ব দেন কেন? ইরহান মৃদু হেসে বলল, —কারণ তুই আমার জীবনের এমন একটা মানুষ, যাকে আমি হারাতে চাই না। অরুর চোখে তখন অদ্ভুত এক অনুভূতি। সে কিছু বলতে চেয়েও পারল না। শুধু নিচু গলায় বলল, —চলুন। ইরহান হেসে বলল, —চল। দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। সামনে ছিল তাদের পরিবার, চারপাশে ছিল আপন মানুষগুলো, আর তাদের মাঝেই ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল কিছু না-বলা অনুভূতি। কেউ তখনও প্রকাশ্যে কিছু বলেনি, কিন্তু চোখের ভাষা যেন সবকিছু বলে দিচ্ছিল। হয়তো ভালোবাসা এমনই—শুরুতে চুপচাপ আসে, তারপর একদিন সবার সামনে নিজের পরিচয় দিয়ে বলে ওঠে, “হ্যাঁ, এটাই আমার মানুষ।” ❤️
চলবে🌸🌸🌸