ফন্ট সাইজ:
থিম:
এসো নীপবনে হারাই দু'জনে

২য় পর্ব

লেখক: মিথিলা জামান নিভা

#এসো_নীপবনে_হারাই_দুজনে

পর্ব: ২

রোজ খুব ভোরেই ঘুম ভাঙে রূপার। ঘুম ভেঙেই রোজ দাদাজানের কুরআনের তিলাওয়াত শোনে। রূপাও আর দেরি করেনা। ওযু করে নামাজে বসে যায়। দীপা অঘোরে ঘুমাচ্ছে, তাকে ডাকলেও উঠবে না এখন। ঠিক আটটায় উঠবে। এরপর পাগলের মতো ছুটে ছুটে তৈরি হবে, কোনোরকমে নাশতা করেই কলেজের জন্য বেরিয়ে যাবে। রূপা কতো করে বলেছে একটু আগে ঘুম থেকে উঠলেই তো নাশতাটা ঠিকভাবে করা যায়। কে শোনে কার কথা।

নামাজ শেষ করেই এক কাপ চা নিয়ে জানালার পাশে এসে বসে রূপা। পাশের ছোট্ট টেবিলে ফুলদানির পাশে বাবা মায়ের একটা ছবি। রূপা ছবিটা হাতে নিয়ে নরম আঁচল দিয়ে ওটা মোছে। প্রায় আট বছর হতে যাচ্ছে তাদের পরপারে চলে যাওয়ার৷ সেই বিভীষিকাময় দিনটা, যেদিন বাবা মা একই সাথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। এখনো দিনটার কথা ভাবলে রূপা কেঁপে ওঠে, শিউরে ওঠে বাবা মায়ের মুখ মনে পড়লে।

পিছন থেকে দীপা তাকে জড়িয়ে ধরতেই বেশ ভালোই চমকে যায় রূপা। ঘড়িতে সময় মাত্র সাতটা দশ। মহারানী আজ এতো তাড়াতাড়ি উঠে গেলো যে?

রূপা চোখ মুছে জোর করে হাসে।

"কি ব্যাপার? আজ তো সূর্য ঠিকমতোই উঠেছে, পূর্বদিকেই। কিন্তু আমাদের বাড়ির আদুরে বিড়ালটা কি বুঝে এতো সকালে উঠে গেলো?"

দীপা একটা হাই তুলে বললো,"এভাবে বলো না আপা। আমি মাঝে মাঝেই তাড়াতাড়ি উঠে যাই। তুমি মনে করে দেখো, এইতো সেদিনও..."

রূপা দীপার দিকে ঘুরে বললো,"কোনদিন?"

"ওইতো..."

দীপা মনেই করতে পারে না কোনদিন। বোকার মতো হেসে দেয় ফিক করে। রূপা দীপার চুল এলোমেলো করে দেয়। দীপার গায়ের রঙ রূপার মতো ধবধবে ফর্সা নয়। একটু শ্যামলা, বাবার গায়ের রঙ পেয়েছে ও। কিন্তু শ্যামবর্ণের মাঝেও তার সৌন্দর্য ভূবনভোলানো। সকালের পবিত্র আলোয় তাকে আরো বেশি সুন্দর লাগে।

"তাড়াতাড়ি উঠেছিস যখন হাতমুখ ধুয়ে নে। আজ সবাই একসাথে নাশতা করবো, একটু শান্তি করে।"

দীপা কিছু বলতে যাবে তার আগেই দরজায় কেউ এসে দাঁড়ায়। ওরা দুইবোন তাকাতেই দেখে টুনি মিটমিট করে হাসছে দাঁড়িয়ে। সে আবার আজ পাটভাঙা নতুন হলুদ শাড়ি পরেছে। বয়স মাত্র সতেরো কি আঠারো তার। পাটকাঠির মত শরীরের উপর এমন পাটভাঙা শাড়ি বেঢপ লাগার কথা, কিন্তু লাগছে না। তাকে সুন্দর মানিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে এই সকালে সে গোসলও দিয়েছে, তার চুল ভেজা।

"কি ব্যাপার টুনি? তুমি কি কিছু বলবে?"

রূপার প্রশ্নে টুনি হ্যা-সূচক মাথা নাড়িয়ে আবার হাসে। এই মেয়েটা শুধু হাসে।

"কি বলবে বলো।"

"আইজ সকালের নাশতাডা আমি বানাই বড় আপা?"

রূপা আর দীপা চোখ চাওয়াচাওয়ি করে। টুনি এ বাড়িতে এসেছে মাস খানিক হবে। আপাতত তার একটাই পরিচয়, সে রসুর বউ। তাদের বিয়ে কীভাবে হয়েছে, কেনো হয়েছে সব পরবর্তীতে জানানো হবে। তবে কথা সেখানেই নয়, রসু তার স্ত্রীকে দিয়ে কুটোটি নাড়াতে চায়না। তার দাবী যার যে কাজ দেওয়ার জন্য তাকে দেওয়া হয়, সে করবে। কিন্তু তার স্ত্রী কোনো কাজ করবে না। স্ত্রীর ভরণপোষণও সে দিবে, তার আয় দিয়ে। কিন্তু টুনি কোনো কাজ করবে না।

ওরা টুনিকে দিয়ে এমনিতেও কোনো কাজ করাতো না, রসু না বললেও।

রূপা সুন্দর করে হেসে বললো,"দরকার নেই টুনি। তুমি বিশ্রাম করো। নাশতা আমিই বানাবো। তাছাড়া তুমি বোধহয় জানো না, দাদাজান আমার বানানো নাশতা ছাড়া খান না।"

টুনি আঁচল মুখে চেপে হেসে বললো,"জানি।"

"তাহলে নাশতা নিয়ে ভাবতে হবে না। তুমি নিজের ঘরে যাও। নাশতা তৈরি হয়ে গেলে আমি তোমাকে ডাকবো।"

টুনি একইভাবে হাসতে হাসতে চলে যায়।

তার দিকে তাকিয়ে দীপা হতাশ গলায় বললো,"আপা এই টুনি মেয়েটা কি পাগল? মাথায় সমস্যা ওর?"

"এসব কি কথা? পাগল হতে যাবে কেনো?"

"দেখো না, সবসময় হাসছে। কোনো কারণ ছাড়াই হেসে কুটিকুটি হয়ে যাচ্ছে। পাগল ছাড়া এমন কেউ করে?"

রূপা নিজের চুল খোঁপা থেকে ছাড়িয়ে হাত দিয়ে আঁচড়াতে আঁচড়াতে বললো,"শোন দীপা, সুখী সুখী ভাবে হাসতে পারা একটা বড় ব্লেসিং। এইযে আমরা জোর করেও হাসতে পারিনা, এটা আমাদের জন্য কষ্টকর। যারা হাসতে পারে তাদের উলটে আমাদের পাগল মনে হয়। কিন্তু এটা ঠিক না। তুই যে সারাদিন মুখ ভোঁতা করে বসে থাকিস, আমি নিশ্চিত টুনি তোকে পাগল ভাবে।"

দীপা কপট রাগ করতে যেয়েও পারেনা, হেসে দেয়। আপার কথায় রাগ করা যায়না, শুধু মুগ্ধ হয়ে শুনতেই ইচ্ছা করে।

টেবিলে দ্রুত হাতে নাশতা গোছাচ্ছে রূপা। দীপা আজও দ্রুত খাচ্ছে। যেনো ট্রেন মিস হয়ে যাবে তার দ্রুত না খেলে। পাশের চেয়ারে পত্রিকা পড়ছে নেওয়াজ। রসু আর টুনির খাবার রসু ঘরে নিয়ে গেছে। বিয়ের পর থেকে ভয়ে রসু নেওয়াজ উদ্দিনের সামনে আসে না, টুনিকেও আসতে দেয়না। পাছে এক বিশাল ধমক খেয়ে বসে তার বালিকা বউটি। এ নিয়েও রয়েছে বিস্তর কাহিনী, আস্তে আস্তে বলা হবে।

"আস্তে খা দীপা, গলায় বাঁধবে তো।"

"আমার কলেজের দেরি হয়ে যাচ্ছে, আর তুমি বলছো আস্তে খেতে?"

রূপা বিরক্ত হয়ে আর কিছু বলেনা। আজ সে দ্রুত উঠলেও টেবিলে আসতে আসতে সে-ই দেরিই করেছে।

নেওয়াজ উদ্দিন পত্রিকায় মুখ গুঁজেই বললো,"এই দীপাটার চেহারাছবিই হয়েছে শুধু ওর বাপের মতো। বাকিসব ওর মায়ের মতোই। নীলুফার এমন ছিলো। সবকিছুতেই তার সীমাহীন ব্যস্ততা আর ছুটোছুটি।"

দীপা দাদাজানের কথা কানে নিলোনা, কখনোই নেয়না আজ আবার কেনো?

রূপা গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বললো,"আর আমি কার মতো হয়েছি দাদাজান?"

নেওয়াজ পত্রিকা ভাঁজ করে চায়ের চুমুক দিয়ে বললো,"তুই দেখতে হয়েছিস অবিকল তোর মায়ের মতো। প্রথম মেয়ে সন্তান সাধারণত তার বাবার মতো দেখতে হয় কিন্তু তুই বিপরীত। তবে তোর আচরণ সম্পূর্ণ তোর বাবার মতোই। ও এমন ধীরস্থির আর বুদ্ধিমান ছিলো। যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতো খুব ভেবেচিন্তে।"

রূপা হঠাৎই থেমে যায়। ঘোলাটে চোখে অন্যদিকে তাকায় সে। আসলেই কি সে তার বাবার মতো হয়েছে? বাবা যে সব সিদ্ধান্ত কতো ভেবেচিন্তে নিতো। কিন্তু রূপা তো জীবনের বড় একটা সিদ্ধান্ত হুট করে নিয়ে নিলো, এরপর ভয়াবহ ভাবে ঠকে গেলো।

রূপা নিজেকে সামলাতে শাড়ির আঁচল চেপে ধরে। দাদাজান বা দীপাকে তার এই বিষাদে ছেপে যাওয়া মুখ দেখাতে চায়না।

ঠিক তখনই দরজায় কেউ শব্দ করে। সবাই একযোগে সেদিকে তাকায়। রূপা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে নিজেই এগিয়ে যায় দরজার দিকে।

"ডাক্তার সাহেব, আপনি?"

জাওয়াদ থতমত খেয়ে যায় অকারণেই। ছিমছাম মেয়েটিকে আজ অন্যরকম লাগছে। তার অবাক দৃষ্টি জাওয়াদের ইতস্ততা বাড়িয়ে দেয়।

"আসলে কি লজ্জার কথা বলুন তো। গতকাল স্টেথোস্কোপটা ফেলে চলে গিয়েছি। এখান থেকে যাওয়ার পর অন্য একটা কাজ পড়ে যাওয়ায় ওটার কথা আর মনেই নেই। আবু কে পাঠাতাম নিতে কিন্তু ওর আবার গতকাল থেকে খুব জ্বর। জানি বিরক্ত করলাম কিন্তু কি যে করবো। আমি দুঃখিত।"

রূপা আরো অবাক হয়ে বললো,"রসুকে যে আমি গতকালই বললাম ওটা আপনাকে দিয়ে আসতে। দেখেছেন কেমন ফাঁকিবাজ হয়েছে?"

"না না ভুলটা আসলে আমার।"

রূপা কিছু বলতে যাবে তার আগেই নেওয়াজ উদ্দিনের গলা শোনা যায় ভিতর থেকে।

"কে রে রূপা? কে এসেছে?"

রূপা ওদিকে ফিরে গলার স্বর বাড়িয়ে বললো,"দাদাজান ডাক্তার সাহেব এসেছেন।"

নেওয়াজের মনটা ভালো হয়ে যায় হঠাৎই।

"ডাক্তার এসেছে? তা ওকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিস কেনো? ভিতরে নিয়ে আয়। নাশতা করবে আমাদের সাথে।"

রূপা বিচলিত হয়। নিজেদের খাওয়াদাওয়ার সময় বাইরের একজনের উপস্থিতি কেমন যেনো লাগে। দাওয়াতের সময়ের কথা ভিন্ন। কিন্তু এখন? দীপা যেভাবে চেয়ারের উপর পা তুলে বাচ্চাদের মতো খাচ্ছে, ডাক্তার দেখলে তো ভিমড়ি খাবে!

জাওয়াদ দ্রুত বললো,"না না আমি কিছু খাবো না। আমাকে ওটা দিয়ে দিন, আমি চলে যাই। পরে একদিন এসে স্যারের সাথে আড্ডা দিবো।"

রূপা কি করবে বুঝতে পারে না৷ নেওয়াজ আবারও হাঁকডাক করছে। বোধহয় নিজেই উঠে আসবে আবার লাঠি ভর দিয়ে।

উপায়ান্তর না পেয়ে রূপা বাধ্য হয়ে বললো,"আসুন না, অন্তত দাদাজানের সাথে দেখা করে যান।"

জাওয়াদ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। নিজের উপর নিজের সীমাহীন রাগ হয়। কেনো যে এতো ভুলোমনা সে। পূর্বেও তার এই স্বভাবের জন্য অনেকবার বিপাকে পড়েছে সে।

"এসো ডাক্তার এসো।"

"আসলে মানে..."

দীপা বাঁকা চোখে জাওয়াদের দিকে তাকায়। জিজ্ঞাসু চোখে বোনের দিকে তাকাতেই রূপা তাকে ভদ্রভাবে খাওয়ার ইশারা করে। দীপা তার ইশারাকে পাত্তা দেয়না।

"আসলে দাদাজান উনি কাল উনার স্টেথোস্কোপটা এখানে রেখে চলে গেছে। আমি রসুকে বলেছিলাম পৌঁছে দিতে। ও বোধহয় ভুলে গেছে।"

নেওয়াজ রাগী গলায় বললো,"বিয়ে করে সাপের পাঁচ পা দেখেছে বদমায়েশটা। ওকে দেখছি আমি।"

রূপা বিড়বিড় করে বললো,"দাদাজান কি বলছেন? চুপ থাকেন।"

বাইরের একজন মানুষের সামনে দাদা আর বোনের এহেনো আচরণে রূপা কি করবে ভেবে পায়না। পালাতে পারলে বাঁচে।

দীপা মুখে রুটি পুড়তে পুড়তে বললো,"এ আবার কেমন ডাক্তার? এমন ভুলোমনা হলে ডাক্তারি করবেন কীভাবে উনি? কবে না ডায়রিয়া রোগীকে ভুলে ম্যালেরিয়ার ওষুধ দিয়ে বসেন।"

জাওয়াদের বিষম লাগে হঠাৎ। নেওয়াজ দীপার দিকে কঠিন চোখে একবার তাকিয়ে জাওয়াদকে নিজের পাশের চেয়ারে বসায়। রূপা তাড়াতাড়ি করে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেয় জাওয়াদের দিকে। এই মেয়ের জন্য কবে না নাক কাটা যায় তাদের। এমন ঠোঁটকাটা কেনো যে এই মেয়েটা।

দীপা আর দাঁড়ায় না। কোনোরকমে পানি খেয়েই ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যায়। রূপা দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয় তাকে। ওদিকে ডাক্তারের কাশি এখনো থামেনি। ডাক্তারকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে খুব শৌখিন ঘরের ছেলে। সম্ভবত শহরের, তার বাচনভঙ্গি শুনে বোঝা যায়। রূপা ভেবে পায়না এমন একজন মানুষ তাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কি করছে? এদিকের সুযোগ সুবিধা তো তেমন না, বেতনও কম। রোগীরাও ঠিকমতো টাকা দেয়না। যদিও এদিকের মানুষ খুব ভালো কিন্তু অন্যান্য সুযোগ তো কম। রূপা চিন্তা ঝেড়ে ফেলে সাথে সাথে। তাতে তার কি? যার যেখানে ইচ্ছা যাক! শুধু এই দীপাটার উপর রাগ হচ্ছে ভীষণ। মেয়েটা যে কোথায় কখন কি বলতে হয় কবে শিখবে, কে জানে।

প্রতিদিন বিকাল হতে না হতেই এক ঝাঁক মানব ফুলের কলকাকলীতে মুখর হয়ে যায় 'রূপকথা ভিলা' এর আঙিনা। রূপা উঠোনের পাশেই একটা টিনের চালার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে দুই হাত বুকে বেঁধে, তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি। বাচ্চাগুলো ছুটে ছুটে আসছে সেদিকে। তাদের রূপকথা আপাকে একবার করে জড়িয়ে ধরেই ঢুকে যাচ্ছে ঘরে। সেখানে পাতা বেশ কিছু বেঞ্চ, সবাই সারি বেঁধে বসে বেঞ্চে। সবাই ঢুকে গেলে রূপা ঢোকে, দাঁড়ায় ব্লাকবোর্ডের সামনে। সবাই একবার জোরে চিৎকার করে ওঠে,'আসসালামু আলাইকুম রূপকথা আপা।"

রূপা মিষ্টি করে হেসে সালামের উত্তর দেয়। এরপর চক হাতে এগিয়ে যায় বোর্ডের দিকে। বাচ্চাগুলো এক থেকে বিশ পর্যন্ত লেখা শিখে গেছে, আজ একুশ থেকে শিখবে। এই সুবিধাবঞ্চিত বাচ্চাগুলোর কাছে শিক্ষিকা বলতে রূপকথা ওরফে রূপা-ই। এদের বাবা মায়েরা কেউ দিনমজুর, কেউবা মানুষের বাড়িতে কাজ করে। দিন আনে দিন খায়, সেখানে বাচ্চাদের পড়াশোনা শেখানো তাদের কাছে বিলাসিতা। অগত্যা বড় হয়ে ছেলেরা হয়ত দিনমজুর বা গ্যারেজের মেকানিক হয় কিংবা নেশার জগতে হারিয়ে যায় আর মেয়েদের খুব কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। কিছু মাস আগে গ্রাজুয়েশন শেষে যখন রূপা দাদাজানের কাছে চলে আসে পুরোপুরি তখনই সে সিদ্ধান্ত নেয় এই বাচ্চাগুলোর জন্য সে কিছু করবে। অন্তত অক্ষরজ্ঞানটুকু শেখাবে। দাদাজান শিক্ষক মানুষ, রূপার এই সিদ্ধান্ত শুনতেই খুশি হয়ে যায়। এই টিনের ঘরের ব্যবস্থা তখনই হয়ে যায়। রূপা বাড়ি বাড়ি যেয়ে যেয়ে বাচ্চার বাবা মায়েদের বুঝিয়ে ওদের এখানে আনে। প্রথম প্রথম সবাই না করলেও আস্তে আস্তে রূপার ডাকে অনেকেই সাড়া দেয়। এখন রূপার ছাত্রসংখ্যা প্রায় পঁচিশ। এই ছোট্ট ঘরে বেশ অসুবিধাই হয়ে যাচ্ছে তার। নেওয়াজ বলেছে ঘরটা বড় করে দেওয়া হবে অতি শীঘ্রই।

রূপা সারাদিন অপেক্ষা করে থাকে এই বিকেলটুকুর জন্য। এই বিকেলটুকুই তার সমস্ত মন খারাপ, কষ্ট এক নিমিষেই উড়িয়ে দেয়। যখন ছোট্ট কণ্ঠস্বর গুলো একযোগে চিৎকার করে ওঠে রূপকথা আপা বলে, তখন কি যে একটা শান্তি লাগে মনে।

নেওয়াজের ডাকে বেশ কিছুদিন পর রূপকথা ভিলাতে এসেছে জাওয়াদ। হাতের কিছু কাজ কোনোরকমে সেরেই দ্রুত চলে এসেছে সে। শরীরটা আবার বেশি খারাপ হয়ে গেলো কিনা উনার।

তবে গেট থেকে ঢুকতেই এমন এক দৃশ্য দেখে থমকে যায় সে। ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট্ট শিশুরা একটা টিনের ঘর থেকে বের হচ্ছে। রূপা ওই ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। একেকটি বাচ্চা বের হচ্ছে আর রূপাকে জড়িয়ে ধরছে। রূপাও আলতো করে পরম মমতায় তাদের কপালে চুমু এঁকে দিচ্ছে ঝুঁকে এসে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

বাচ্চাগুলোর পোশাক দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা নিতান্তই নিম্নবিত্ত ঘরের কিংবা ছিন্নমূলের। তাদের আধময়লা শরীর দেখে দেখে যেখানে সবাই নাক কুঁচকায়, সেখানে রূপা এমনভাবে তাদের জড়িয়ে ধরছে যেনো নিজেরই সন্তান ওরা।

জাওয়াদ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে দেখে পুরোটা দৃশ্য। সবাই একে একে বেরিয়ে গেলে রূপা ঘরের তালা আটকে বাড়ির দিকে এগোয়। সন্ধ্যার আগে আগে প্রকৃতিতে অন্যরকম একটা আলো ছড়িয়ে যায়, গোধূলির এই আলোটা ভীষণ সুন্দর। রূপাকে এই আলোয় একটা সদ্য ফোঁটা সূর্যমুখীর মতো লাগছে।

পরক্ষণেই নিজের উপর অতি বিরক্ত হয় জাওয়াদ৷ এ কেমন বাজে ব্যাপার? সে এতোক্ষণ কীভাবে এক স্বল্পপরিচিতা নারীর দিকে তাকিয়ে রইলো? ছি ছি!

আসলে জাওয়াদ রূপার রূপের দিকে নয় বরং রূপার সরলতার দিকেই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলো। আজকাল এমন কাঁহাতক দেখা যায়?

"আরে ডাক্তার সাহেব যে। কেমন আছেন?"

জাওয়াদ ঘোর থেকে বেরিয়ে বললো,"জি ভালো, আপনি?"

"ভালো। তা আপনি এখন এখানে? আবার কিছু ফেলে গিয়েছেন?"

রূপা মুখ টিপে হাসে। জাওয়াদ ভেবাচেকা খেয়ে যায়। এরা কি ওই ঘটনা কোনোভাবেই ভুলবে না? ভুল তো মানুষ মাত্রই হয়।

"জি না, স্যার ফোন করেছিলেন। উনি আসতে বললেন। সব ঠিক আছে তো? উনার শরীর এখন কেমন?"

রূপা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। দাদাজান কি দিন দিন বাচ্চা হয়ে যাচ্ছে? দিব্বি সুস্থ শরীর তবুও ডাক্তারকে ডেকে আনার কোনো মানে হয়? আজ সকালেই আলমারি থেকে দাবার কোর্ট বের করতে দেখেছে রূপা তাকে। কে জানে ডাক্তারের উপর আবার কি মধুর অত্যাচার চালাতে শুরু করবে দাদাজান এবার। এমন সহজ সরল হলে কীভাবে হবে এই ডাক্তারের? আশ্চর্য!

(চলবে......)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন