ফন্ট সাইজ:
থিম:
এসো নীপবনে হারাই দু'জনে

১৪তম পর্ব

লেখক: মিথিলা জামান নিভা

#এসো_নীপবনে_হারাই_দুজনে

পর্ব: ১৪

রূপকথা ভিলার সেই শান্তিপূর্ণ বসার ঘর। মুখোমুখি বসে আছে জাওয়াদ-রূপা। না, আজ জাওয়াদকে কেউ ডাকেনি। সে নিজেই এসেছে। যদিও সবাইকে বলেছে পাশেই একটা কাজ ছিলো। যাওয়ার পথে ভাবলো নেওয়াজ উদ্দিনের শরীরের অবস্থাটা জেনে যাওয়া যাক। নেওয়াজ উদ্দিন সরল মনে তা বিশ্বাসও করে ফেলে। তার সাথে আড্ডায় মাতিয়ে রাখতে চায় জাওয়াদকে। কতদিন পর তাকে পেয়েছে বলে কথা।

তবে রূপা শুধু বুঝতে পারে ঘটনা ভিন্ন। কেনো যেনো জাওয়াদের মুখটা দেখেই সে বুঝতে পেরেছে সে মিথ্যা বলেছে। রূপকথা ভিলার উদ্দেশ্যেই সে এসেছে। বেচারা মিথ্যা বলতে পারেনা। কপাল ঘেমে যাচ্ছিলো। আর রূপা দাদাজানের সেই আড্ডার মাঝে যেয়েই বুঝতে পারে তাদের ডাক্তার সাহেব আসলে নেওয়াজ উদ্দিনের খোঁজ নিতেও এখানে আসেনি। কেনো এসেছে রূপা বুঝতেও পেরেছে।

তৎক্ষনাৎ সে-ই বাঁচিয়ে নেয় ডাক্তার সাহেবকে। চা খাওয়ানোর কথা বলে বসার ঘরে ডেকে এনেছে।

জাওয়াদকে রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে দেখে রূপা মিটমিট করে হাসে। জাওয়াদ ধরা খাওয়া গলায় বললো,"হাসছেন যে?"

রূপা কেটলি থেকে কাপে চা ঢালতে ঢালতে বললো,"এমনিতেই। চিনি কতোটুকু দিবো? দুই চামচ?"

"না, এক চামচ।"

"হঠাৎ কমিয়ে দিলেন যে? আগে তো দুই চামচই খেতেন।"

জাওয়াদ বিড়বিড় করে বললো,"আগে এতো মিষ্টি কারো হাতের চা খাওয়া হয়নি তো। ডায়বেটিস বাঁধিয়ে ফেলবো নাকি এই বয়সে?"

রূপা কাপে একটা সুগার কিউব দিয়ে নাড়তে নাড়তে বললো,"কিছু বলছেন?"

"না না, আসলে সবারই চিনি কম খাওয়া উচিত। ডাক্তার হয়ে আমি যদি এতো বেশি চিনি খাই, আমার রোগীরা কি করবে তাহলে?"

দুইজন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চুপ করে বসে থাকে। একবার জাওয়াদ রূপার দিকে তাকায় আরেকবার রূপা জাওয়াদের দিকে। চোখাচোখি হতেই আবার চোখ নামিয়ে নিচ্ছে দু'জন। নীরব ভাষায় কথপোকথন চলে তাদের কিছু সময়।

"আপনি এদিকে ভিজিটে এসেছিলেন?"

জাওয়াদ থতমত খেয়ে বললো,"হ্যা ওই আর কি।"

জাওয়াদ আবার ঘামতে থাকে। রূপা ভিতর ভিতর হেসেই শেষ। ইশ! এই মানুষটা এতো সরল কেনো? এটুকু মিথ্যা বলতে যেয়েও অস্থির হয়ে যাচ্ছে।

"কোন বাড়িতে বলুন তো? না মানে এখন তো তেমন একটা ভিজিটে যান না আপনি। মারাত্মক কোনো সমস্যা হলেই শুধু যান মাঝে মাঝে। ধারেকাছে কোন বাড়ির মারাত্মক সমস্যা হলো, প্রতিবেশী হিসেবে জানা দরকার না?"

জাওয়াদের হঠাৎ বিষম লাগে। বুকে হাত দিয়ে কাশতে থাকে সে। রূপা তাড়াতাড়ি করে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেয় তার দিকে।

"কি হলো? কি হলো? পানি খান।"

জাওয়াদ এক নিঃশ্বাসে পানি খেয়েই উঠে দাঁড়ায়। না, এখানে আর বসা যাবে না। মেয়ে তো নয় যেনো বাজপাখি। তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি দিয়েই ভিতর থেকে সত্যটা বের করতে পারে।

"এ কি উঠলেন যে?"

"আমাকে এখন যেতে হবে। রোগীরা অপেক্ষা করবে আমার জন্য।"

"ও আচ্ছা, তাই?"

জাওয়াদ অসহায় চোখে রূপার দিকে তাকাতেই রূপা শব্দ করে হাসে। জাওয়াদ বুঝতে পারে সে আসলেই ধরা খেয়ে গেছে। শান্ত হয়ে যায় সে রূপার হাসির বিপরীতে।

"ডাক্তার সাহেব।"

"হু বলুন।"

"আপনি কি জানেন আপনি মানুষ হিসেবে কতটা সরল?"

"কি জানি, হতে পারে।"

"এতো সরল হবেন না। এই সরল মানুষদের অন্যেরা কষ্ট দেয়।"

জাওয়াদ হঠাৎ রূপার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,"আপনি দিবেন?"

আচমকা এমন প্রশ্ন আশা করেনি রূপা। তার মুখের কথা বন্ধ হয়ে যায় সহসাই।

"আমি কষ্ট পেতেও রাজি মিস রূপা। কিন্তু তা হতে হবে আমার নিজের মানুষের কাছ থেকে। আমাকে একান্ত নিজের করে যদি কেউ আমাকে যন্ত্রণা দিতে চায়, আমি সে যন্ত্রণা সহ্য করে নিতে একটুও দ্বিধাবোধ করবো না। কিন্তু দিনশেষে আমাকে আগলে রাখতে হবে, ঠিক আমার মায়ের মতো করে। শুধু আমাকে সামলে রাখলেই হবে, আমি বাকি পুরো দুনিয়া সামলাবো।"

রূপা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শেষ কথাটা বুকের কোথাও এসে ধাক্কা দেয়। এতোগুলা কথা রূপাকে বললো উনি? কিছু সময়ের জন্য মনে হয় শ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে তার।

"জাওয়াদ ভাইজান, আপনি কখন এলেন?"

হাতে এক বাটি তেঁতুল মাখা নিয়ে টুনি বসার ঘরে। সে জানে তার জাওয়াদ ভাইজান কখন এসেছে। সে ইচ্ছা করেই আসেনি। শুধু চাচ্ছিলো বড় আপার সাথে উনি কিছুক্ষণ একা গল্প করুক।

"এইতো টুনি এসেছিলাম, আবার চলেও যাচ্ছি।"

টুনি বাটিটা জাওয়াদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,"খাবেন? সে-ই চুক্কা।"

জাওয়াদ একবার বাঁকা চোখে রূপার দিকে তাকায়। রূপা এখনো সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে।

জাওয়াদ অতি ক্ষীণ গলায় বললো,"উহু, এতো মিষ্টির পর টক ভালো লাগবে না। এই স্বাদ আরো অনেকক্ষণ থাকুক।"

এরপর হেসে টুনির দিকে তাকিয়ে বললো,"না ওসব খাইনা।"

"জাওয়াদ ভাইজান আপনি আমার ভাই না?"

"কোনো সন্দেহ আছে নাকি তাতে?"

"তাহলে রসুরে বকে দিয়ে যান তো।"

জাওয়াদ ভ্রু কুঁচকে বললো,"কেনো? ও আবার কি করেছে?"

"আপনাদের কমপ্লেক্সের পাশেই লালন গানের আসর বসে। প্রতি বছর এই সময়। আগে বান্ধবীদের সাথে আসতাম। এবার রসুকে কতো করে বলছি নিয়ে যেতে। ও রাজিই হচ্ছে না।"

জাওয়াদ রূপার দিকে তাকিয়ে বললো,"রসু রাজি না হলে তোর বড় আপাকে সাথে নিয়ে চলে আসিস। আমিই নিয়ে যাবো।"

রূপা অবাক হয়ে জাওয়াদের দিকে ঘুরে তাকায়। সে কখন বললো যে সে যেতে চায়? অদ্ভুত লোক তো!

টুনি খুশিতে হাততালি দেয়। তার হাত থেকে তেঁতুলের বাটি পড়ে ঝনঝন শব্দ হয়। রূপা বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকায় দু'জনের দিকে।

জাওয়াদ দুষ্টুমি ভরা গলায় রূপার দিকে তাকিয়ে বললো,"মেয়েটা এতো করে চাচ্ছে। না গেলে কষ্ট পাবে না?"

রূপা জাওয়াদকে কথা শেষ কর‍তে না দিয়েই বললো,"তাই বলে আমি নিয়ে যাবো?"

জাওয়াদ কাঁধ উঁচু করে। রূপা চোখ কুঁচকে তাকায় তার দিকে। টুনি আবারও আঁচল চাপা দিয়ে হাসে।

জাওয়াদ ঠোঁট কামড়ে হাসতে হাসতে চলে যায়। রূপা রাগী চোখে টুনির দিকে তাকাতেই টুনি ছুটে পালায়। হঠাৎ রূপা কি মনে করে হেসে দেয়, একা একাই।

"সবসময় গোমড়া মুখে না থেকে মাঝে মাঝে তো এমন হাসতেও পারেন। বিশ্বাস করুন এতে বেশি সুন্দর লাগে আপনাকে।"

লাফিয়ে ওঠে যেনো রূপা।

"আপনি?"

টেবিলের উপর থেকে স্টেথোস্কোপটা নিয়ে গলায় ঝুলাতে ঝুলাতে জাওয়াদ বললো,"ফেলে রেখে গিয়েছিলাম। জানেনই তো, একটু ভুলোমনা আমি।"

রূপা কিছু বলতে যাবে তার আগেই জাওয়াদ বেরিয়ে যায়। সে এবার সত্যিই গেছে কিনা নিশ্চিন্ত হয়ে রূপা মাথায় দুই হাত চেপে সোফায় এসে বসে। ইশ! কি লজ্জা। একা একা হাসতে দেখে নিলো। কে জানে এবার পাগল ভাবে কিনা।

গানের আসর শুরু হয়ে গেছে। সন্ধ্যা ছয়টা বেজে চল্লিশ মিনিট। এখনো ওদের দেখা নেই। জাওয়াদ হাত ঘড়ির দিকে বারবার তাকায় তার পায়চারি করে। নেওয়াজ উদ্দিন রাতে বাড়ির মেয়েরা বাইরে থাকুক পছন্দ করে না। টুনির জোরাজুরিতে রাজি হয়েছে ঠিকই। কিন্তু এক ঘন্টার মধ্যে ফিরতে হবে। জাওয়াদ যদিও বলেছে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দিবে।

তারও প্রায় দশ মিনিট পর, পরপর দু'টো রিকশা এসে থামে জাওয়াদের সামনে। প্রথমটা থেকে নামে রসু আর টুনি। টুনিকে রসু একা ছাড়বে? মাথা খারাপ নাকি তার?

তাহলে কি রূপা আসেনি? জাওয়াদ উদগ্রীব হয়ে পরের রিকশাটার দিকে তাকায়। হইহই করতে করতে দীপা নামে। জাওয়াদ মন খারাপ করতেই যাবে ঠিক তখনই দেখে নামছে, হ্যা রূপা নামছে।

মোমবাতি আর মশাল জ্বালানো হয়েছে আসরে, কৃত্রিম কোনো আলো নেই। সেই ঝলসানো আলোয় রূপাকে দেখে পরপর দুইটা হৃৎস্পন্দন হারিয়ে ফেলে জাওয়াদ। রূপোরঙা পাড়ের কালো শাড়ি, কালো ব্লাউজ। চুলে আজ এলোমেলো খোঁপা, যেনো যে কোনো মুহুর্তে খুলে যাবে। কিন্তু একটুও অগোছালো লাগছে না তাকে এতে। আজ চোখের নিচে গাঢ় করে দেওয়া কাজল। যেনো চোখ দু'টো ফুটে আছে পদ্মের মতো। সেদিন জাওয়াদের দেওয়া কাঁচের চুড়ির মধ্যে কালো চুড়িও ছিলো। সেই চুড়িও শোভা পাচ্ছে নিটোল ফর্সা হাত দু'টোয়। সেই চুড়ির শব্দ আজও মেলোডির মতো বাজতে থাকে জাওয়াদের কানে। রুনরুন ঝুনঝুন, রুনঝুন রুনঝুন। জাওয়াদ জোর করেও ঘোর থেকে বেরোতে পারছে না। বরং চোরাবালির মতো আরো ডুবে যাচ্ছে। সত্যিই যেনো আজ সে রূপকথা।

সে নিজের মধ্যেই বিড়বিড় করে বললো,"প্রিয় অপরিচিতা, আজ কি আমাকে মেরে ফেলতে চান আপনি? শোকের পোশাক হিসেবে কালো রঙ বেছে নেওয়ার এই বুঝি কারণ? আমাকে মেরে আপনার কি লাভ বলুন তো? আসন্ন প্রলয়ের ভয় পাচ্ছেন? আমার তীব্র ভালোবাসা সহ্যের ভয়?"

"ও ভাইজান সাদা পাঞ্জাবিতে কিন্তু আপনারে সিনেমার নায়কের মতো লাগতেছে।"

আচমকাই ঘোর থেকে বেরিয়ে আসে জাওয়াদ। রূপার দিক থেকে চোখ সরিয়ে টুনির দিকে তাকায়। ইশ! মেয়েটা এতো হাসতে পারে। সারাদিন হাসছে, বিরামহীন, ক্লান্তিহীন। শুধু হেসেই যাচ্ছে, হেসেই যাচ্ছে।

"যাইবেন নাকি এখনো তাকায়ই থাকবেন?"

জাওয়াদ কপালে হাত দিয়ে বললো,"উফফ টুনি, আল্লাহর ওয়াস্তে তুই থাম এবার।"

টুনি আবারও হাসতে থাকে।

রসু, টুনি আর দীপা এগোয়। পিছন পিছন ধীর পায়ে জাওয়াদ আর রূপা। দুই ধারে অগণিত মোমবাতি জ্বলছে, মশালের চিড়বিড় শব্দ আর অদূরেই আসর থেকে ভেসে আসছে গান।

"মায়া নদী কেমনে যাবি বাইয়া,

রে রঙ্গীলা দেশের নাইয়া,

মায়া নদী কেমনে যাবি বাইয়া..,

মায়া নদী কেমনে যাবি বাইয়া

রে রঙ্গীলা দেশের নাইয়া।"

রূপা বুঝতে পারে এক জোড়া মুগ্ধ দৃষ্টি বিচরণ করছে তার চেহারায়। সেই দৃষ্টিতে না আছে কামুকতা, না আছে অন্য কোনো চাওয়া। শুধু মুগ্ধতা আর শুধুই মুগ্ধতা।

রূপা হঠাৎ একটু লজ্জা পেয়ে যায়। সে শাড়ির কুঁচি ঠিক করার বাহানায় বার বার শাড়ি আর আঁচল ধরে। জাওয়াদ সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।

এখানে চেয়ারের ব্যবস্থা নেই। মাটিতেই মাদুর বিছিয়ে সবাই বসেছে। আর যারা গান করছে তারা এক জোট হয়ে সামনেই কিছুটা উঁচু জায়গায় বসে।

রূপা এর আগে কখনো এমন কোথাও আসেনি। সে চারপাশটা দেখছে অবাক হয়ে। জাওয়াদ নিজেও কখনো আসেনি, কিন্তু তার দৃষ্টি শুধু একজনের উপরই নিবদ্ধ, আর কিছু দেখছে না সে।

এক পাশে রসু আর জাওয়াদ বসেছে। আরেক পাশে টুনি, দীপা আর রূপা৷ রূপা চুলের খোঁপা ঠিক করতে করতে কি মনে করে ওপাশের সাড়ির দিকে তাকাতেই চোখ নামিয়ে নেয়। জাওয়াদ নিজেও চোখ সরিয়ে সামনের দিকে তাকায়। কিছু কিছু পরিবেশ এমন হয় যে অকারণেই প্রেমে ফেলে দেয়। আলাদা করে কোনো কারণ দরকার হয়না। বোধহয় একই সুর বাজছে এ দু'টি প্রাণের মধ্যেও। জাওয়াদ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকায়। তবে এই কি ছিলো ভবিতব্য? এভাবেই প্রেম লেখা ছিলো? বেশ তবে তাই হোক।

'লালন ভ্রমর' বলে একজন বয়স্ক গায়ক উঠে বসে গানের আসরে। হাতের বাদ্যযন্ত্রটা কিছুক্ষণ বাজায় টুংটুং করে। সবাই কিছুটা বিরক্ত হয়ে যায়। দিব্বি ভালো গানবাজনা চলছিলো। শুধু টুংটাং এখন কে শুনতে চায়? শুধু রূপা বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে গায়কের দিকে। তার মন বলছে দারুণ কিছু শুরু করবেন উনি। সবসময় অধিক বাজনাই কি গানকে শ্রুতিমধুর করে দেয়? মোটেই না, গায়কী আর গায়কের অভিজ্ঞতাও অনেক সময় দারুণ কিছু উপহার দেয়।

সবাই যখন বিরক্তির শীর্ষে তখন গায়কের এক লাইনেই সবার নজর যেয়ে পড়ে তার উপর। মুহুর্তেই সবাই চুপ। কোনো এক মন্ত্রবলে যেনো তাদের চুপ করিয়ে দেয় সে।

"চাতক প্রায় অহর্নিশি,

চেয়ে আছে কালো শশী..."

ব্যস! সবাই ঠান্ডা। রূপার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। ঠিক যেমনটা সে ভাবছিলো, তা-ই।

"আমি হবো বলে চরণ দাসী,

হবো বলে চরণ দাসী।

ও তা হয়না কপাল গুণে,

ও তা হয়না কপাল গুণে।

আমার মনের মানুষেরও সনে,

আমার মনের মানুষেরও সনে।"

গায়ক একটু থামে। সবাই যেনো থমকে আছে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকা শত জোড়া দৃষ্টির দিকে একবার চোখ বুলিয়ে লালন ভ্রমর জোরে একটা টান দেয়।

"মিলন হবে কতোদিনে,

ও মিলন হবে কতোদিনে?

আমার মনের মানুষেরও সনে,

আমার মনের মানুষেরও সনে।"

গায়ক উঠে দাঁড়ায়। ঘুরে ঘুরে নাচে আর গান গাইতে থাকে। কিছু ভক্ত উঠেও নাচে। টুনির আগ্রহ যেনো বেশি। পারলে সে-ও নাচে শুধু রসুর রাগী মুখের দিকে তাকিয়ে সাহস পাচ্ছে না।

দীপার আগ্রহও কম না। সে হাততালি দিচ্ছে আর গলা মিলাচ্ছে গানের সাথে।

শুধু রূপা চুপ। কারণ সে বুঝতে পারছে জাওয়াদ তার উপর থেকে চোখ সরাচ্ছে না। ঠিক 'মনের মানুষেরও সনে' বলার সময় রূপাও বাধ্য হয়ে তাকায় জাওয়াদের দিকে। তার ঠোঁটের কোণে হাসি। এই হাসির মানে কি প্রশ্রয়? জাওয়ার ধরতে পারেনা। শুধু এই হাসিটা সে আজীবনের জন্য বুকের খাঁচায় আটকে রাখতে চায়। ঠিক যেমন বাচ্চারা তাদের পছন্দের পুতুলটা ময়লা হয়ে যাওয়ার ভয়ে শোকেসে অতি যত্ন করে তুলে রাখে, তেমন।

রূপা অতীত, পুরোনো সব কথা ভুলে কিশোরীদের মতো লজ্জা পায়। অন্য দিকে তাকিয়ে নখ খুটতে থাকে। কিন্তু আজ যেনো জাওয়াদ লাগামহীন। দশ নাম্বার বিপদ সংকেত শুনতে পাওয়া মাঝি মাঝনদীতে যেভাবে নৌকা বেয়ে যায়, জাওয়াদও তাই। খেই হারালেও তাকে কূলে পৌঁছাতে হবে। যেভাবেই হোক না কেনো।

ওদিকে লালন ভ্রমরের গানেই মত্ত তখন সবাই।

"মেঘের বিদ্যুৎ মেঘেই যেমন

লুকালে না পাই অন্বেষণ,

কালারে হারায়ে তেমন

ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে।।

আমার মনের মানুষের সনে

ও আমার মনের মানুষের সনে

মিলন হবে কত দিনে

ও মিলন হবে কতদিনে..

আমার মনের মানুষের সনে।।

যখন ও-রূপ স্মরণ হয়,

থাকে না লোক-লজ্জার ভয়-

লালন ফকির ভেবে বলে সদাই

ওই প্রেম যে করে সে জানে।

আমার মনের মানুষের সনে

ও আমার মনের মানুষের সনে.."

(চলবে....)

[পরের কয়েকটা পর্ব করলার জুস হবে, তাই আপাতত এটাই লাস্ট মিত্তি পর্ব। করলার জুস খাওয়া শেষ হলে আবারও মিত্তি প্রদান করা হইবে। শুধু মিত্তি খেলে ডায়বেটিস হবে না বলুন? মাঝে মাঝে স্বাস্থ্যের কথাও তো ভাবতে হবে, নাকি?! আর হ্যা আগামীকাল সম্ভবত নতুন পর্ব দিবো না। তার পরদিন থেকে আবারও যথারীতি আসবে। হ্যাপী রিডিং ডিয়ার রিডারস।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন