#এসো_নীপবনে_হারাই_দুজনে
পর্ব: ১৭
এরইমধ্যে পার হয়ে গেছে বেশ কিছুদিন। প্রায় দুই মাসের কাছে। জাওয়াদের রূপার সাথে দেখা হয়নি আর। রূপা ইচ্ছা করেই যে তাকে এড়িয়ে চলছে তা জাওয়াদের কাছে স্পষ্ট। কিন্তু সে কারণ জাওয়াদের অজানা। তাদের মধ্যে এমন কোনো ঝামেলা হয়নি, কথা কাটাকাটি হয়নি। জাওয়াদের মা আর দুলু আপা ফিরে এসে সে কি প্রশংসা করলো রূপার জাওয়াদের সামনে। জাওয়াদ তো লজ্জায় বাঁচে না। ছেলের অবস্থা দেখে তো যা বোঝার হাফসা বুঝে যায়। পরবর্তীতে সে জাওয়াদকে কথা দিয়ে যায় যে জাওয়াদ যদি তার স্বপ্নকে ছুঁতে পারে তাহলে মা হিসেবে জাওয়াদকে তার পছন্দের মানুষকে উপহার দিবে। জাওয়াদ মা'কে বলেছে, 'মা পছন্দের মানুষ কোনো বস্তু নয় যে তাকে উপহার দিতে হবে। যদি রূপার মনে এমন কোনো ইচ্ছা না থাকে?' যদিও জাওয়াদের তখন পুরোপুরি বিশ্বাস ছিলো রূপার দিক থেকেও অনুভূতি প্রায় কাছাকাছিই।
হাফসাও ছেলেকে আশ্বস্ত করেছে যে সে প্রথমে নেওয়াজ উদ্দিনকে জানাবে। তার বড় নাতনীটাকে চাইবে তার ছেলের জন্য। রূপার মতামত তো অবশ্যই নেওয়া হবে।
কিন্তু এরপর থেকে কি হয়েছে জাওয়াদ জানে না। তবে কি মায়ের অতি আবেগী কথায় রূপা বুঝতে পেরেছে কিছু? আর সে রাজি নয় বলেই জাওয়াদকে এড়িয়ে চলছে? কিন্তু এ কথাটা তো খোলাখুলিও বলতে পারতো রূপা তাকে। কোনো বিষয় নিয়ে অন্য মানুষকে ধোঁয়াশায় রাখার মতো ছেলেমানুষী তো রূপা করেনা কখনো।
আগামীকাল জাওয়াদের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। পড়াশোনা যা করেছে তাতে সে মোটামুটি সন্তুষ্ট। কিন্তু একটা কাঁটাই বুক থেকে সরে যাচ্ছে না। শুধু খচখচ করে বিঁধেই চলেছে অহর্নিশ। গতকাল নেওয়াজ উদ্দিনকে রাস্তায় পেয়ে তার কাছ থেকে দোয়া নিয়েছে জাওয়াদ। নেওয়াজ বাড়িতে যাওয়ার জন্য চাপাচাপি করলেও সে যায়নি। ও বাড়িতে রোগী দেখতে যাওয়া ছাড়া আর যে কারণটা তার ছিলো, তা আর নেই। সে গেলে রূপা ঘর থেকেই বের হয়না।
বিকেলের দিকে আনমনে হাঁটছিলো সে রাস্তায়। কিছুই ভালো লাগছে না তার। এই জায়গাটার প্রতি মায়ায় পড়ে গেছে। ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হবে। তবে এই মায়ার পিছনে যে নারীর অবদান বেশি, সে আর তাকে দর্শন দিচ্ছে না। জীবন এতো নিষ্ঠুর কেনো?
ঢাকাতেই সিট পড়েছে তার। আজ রাতেই রওনা হয়ে যাবে সে। এক বন্ধুর মেসে উঠবে। মা যদিও বলেছে একটা রাতের জন্য নিজের বাড়িতে যেয়েই উঠতে। বাবা কি আর ঘর থেকে বের করে দিবে? কিন্তু জাওয়াদ রাজি হয়নি। সে নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, নিজের স্বপ্নকে না ছুঁয়ে ওই বাড়ি সে আর কোনোদিন পা রাখবে না। তাতে যদি সারাজীবন কেটে যায় তো যাবে।
আচমকাই মোড়ের মাথায় এক ঝলকের জন্য তার সেই কাঙ্ক্ষিত নারীকে দেখে থমকে যায় সে। তার দুনিয়া ঘুরে যায়। রূপা? হ্যা রূপাই তো। মেয়েটা এতো শুকিয়ে গেছে কেনো? চোখের নিচে কালি পড়েছে। কই এতোটা অগোছালো তো তাকে আগে কখনো লাগেনি জাওয়াদের। সবসময় পরিপাটি হয়ে থাকা মেয়েটাকে আজ এতো এলোমেলো কেনো লাগছে?
জাওয়াদ আর অপেক্ষা করতে পারে না। ছুটতে থাকে সে, যেনো উড়ছে। রূপার পিছনে দাঁড়িয়ে বড় বড় করে কয়েকটা শ্বাস নেয় সে। রূপা এখনো জানেনা জাওয়াদ তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে।
"রূপা।"
রূপা ভূত দেখার মতো চমকে উঠে পিছনে তাকায়। সাথে সাথে স্তব্ধ হয়ে যায় সে। জাওয়াদ? যার কাছ থেকে এতোগুলো দিন সে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলো? রূপা তো নিজেকে শক্ত করে ফেলেছিলো। কঠিন এক দুর্ভেদ্য প্রাচীরে নিজেকে বন্দী করে ফেলার কম চেষ্টা করেনি। সে এতোটাই দৃঢ় ছিলো যে সে ধরেই নিয়েছিলো জাওয়াদ কখনো তার সামনে এলে আর দূর্বল হয়ে পড়বে না। নিজেকে শক্ত রাখবে।
কিন্তু কোথায় কি? ওই গভীর চোখজোড়াতেই তো তার পৃথিবী এসে থমকে যায়। এমন দেখাচ্ছে কেনো মানুষটাকে? খোঁচা খোঁচা দাড়ি, উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি, মাথার চুলগুলোও মনে হচ্ছে কতোদিন কাটে না। এলোমেলো, রুক্ষ চুলগুলো বাতাসে উড়ছে৷ কিন্তু এতে তাকে আরো বেশি সুদর্শন লাগছে। রূপা খেয়াল করলো সে দূর্বল হয়ে পড়ছে। নিজেকে আটকাতে পারছে না। এ খুবই খারাপ ইঙ্গিত। খুব দ্রুত মানুষটার সামনে থেকে চলে যেতে হবে তাকে।
"ডাক্তার সাহেব যে! কেমন আছেন?"
কতোদিন পর ওই কণ্ঠস্বর। জাওয়াদ একটা শুকনো ঢোক চাপে।
"আপনি যেমন রেখেছেন।"
রূপার গলা কেঁপে ওঠে, পুরো শরীরটাই মৃদু দুলে ওঠে। বেশিক্ষণ এখানে দাঁড়ানো যাবে না।
"আমি একটু ব্যস্ত ডাক্তার সাহেব। আমাকে যেতে হবে। পরে কথা হবে, কেমন?"
রূপা তড়িঘড়ি করে পা বাড়াতে গেলেই জাওয়াদ তার সামনে এসে তার রাস্তা আটকায়। ধরা পড়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তাকে রূপা বিরক্তি রূপে প্রকাশ করে।
"কি হচ্ছে ডাক্তার সাহেব? বললাম তো আমি ব্যস্ত।"
"হোন আপনি ব্যস্ত। আমার কথা না শুনে আপনি কোথাও যেতে পারবেন না।"
রূপা অসহায় গলায় বললো,"পরে শুনবো।"
"না এখন। এখন মানে এখন।"
জাওয়াদের কণ্ঠে স্পষ্ট জিদ৷ রূপা নিরূপায় হয়ে যায়।
"বেশ! বলুন কি বলবেন।"
জাওয়াদ কোনো ভণিতা ছাড়াই বললো,"কি হয়েছে আপনার?"
"কি হবে?"
"বুঝতে পারছেন না কি হয়েছে?"
"না পারছি না। তারচেয়েও বড় কথা বুঝতে চাচ্ছি না।"
হঠাৎ জাওয়াদের মুখের অভিব্যক্তির পরিবর্তন হয়। তার মুখের কঠিন রেখা গুলো কোমল হয়ে আসে। রাগী অভিব্যক্তি পালটে হতাশা আর অসহায়ত্ব ভীড় করে মুখমণ্ডল জুড়ে। রূপা অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে নেয়।
"আমি জানিনা আপনার কি হয়েছে। আমি কোনো অন্যায় করে ফেলেছি? আসলে সবাই আমাকে বোকা বলে। আমি আসলেই বোকা। কি যে অন্যায় করেছি নিজেই বুঝতে পারছি না।"
রূপা গলার স্বর যথাসম্ভব কঠিন রেখে বললো,"আপনি এতোটাও বোকা নন যে অন্যায় করে ভুলে যাবেন।"
জাওয়াদ অবাক হয়ে বললো,"আসলেই আমি অন্যায় করেছি? কি করেছি?"
"কিছুই করেননি আপনি। শুধু শুধু এসব ভাবা বন্ধ করুন। দাদাজানের কাছে শুনলাম, আগামীকাল আপনার বিসিএসের প্রিলি পরীক্ষা। ওটা নিয়েই ভাবুন এখন।"
জাওয়াদ ঠোঁট কামড়ে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এই সুযোগে তাকে অপলক দেখে রূপা। বুকের বাম পাশের নিচটায় চিলিক দিয়ে ব্যথা করে ওঠে তার। নিজেই নিজেকে বুঝায় এই মানুষটা আসলেই একটা নিষ্কলুষ জীবন সঙ্গী ডিজার্ভ করে।
"আমার মনে হয় আপনার আর কিছু বলার নেই। এবার কি আমি যেতে পারি?"
জাওয়াদ মুচকি হাসে তার দিকে তাকিয়ে। মনে মনে বলে,'জীবন থেকে চলে যাওয়ার সময় তো অনুমতি চাননি রূপা। হঠাৎ এতো অনুমতি চাওয়ার আয়োজন যে?'
"আমার পরীক্ষার জন্য শুভ কামনা জানাবেন না? দোয়া করুন যেনো খুব তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যেতে পারি।"
রূপা অন্য দিকে তাকিয়ে নিজের গলার কাছে জমে থাকা কান্নাটুকু গিলে ফেলে।
"শুভ কামনা রইলো। আপনি যা চান, তাই যেনো পান।"
"তাই? সত্যিই তাই পাবো?"
এবার রূপার কণ্ঠটা একটু ধরে আসে।
"জি পাবেন।"
"বেশ! অপেক্ষায় থাকলাম নাহয়।"
রূপা আর এক মুহুর্ত দেরী করে না। এক প্রকার দৌড়ে ওখান থেকে চলে যায়, বলা চলে পালিয়ে যায়।
সে চলে যেতেই রাজ্যের অন্ধকার এসে ভীড় করে জাওয়াদের চোখের সামনে।
"রূপা তোমার প্রস্থানে আমি আমার সর্বনাশ দেখলাম কেবল। যা বলে গেলে ভেবেচিন্তে বললে তো? নিজেকে বন্দী করার দোয়া করে গেলে নিজে মুখেই? তবে তোমার কথাই যেনো সত্যি হয়। যা চাই তা যেনো রোজ ভোরে চোখ মেলেই পাশে দেখি। এক জীবনে এটুকু সহ্য করতে পারবেন না? আপনার বোকা ডাক্তার সাহেবকে নাহয় জোর করেই সহ্য করলেন।"
জাওয়াদ বিড়বিড় করে কথাগুলো বলে আকাশের দিকে তাকায়। আকাশের অবস্থা ভালো না। মেঘ জমে আছে ঈষাণ কোণে। গরম বাতাসের বদলে শীতল হাওয়া বইছে কেবলই। রাস্তার ধূলোগুলো উড়ছে নিরলস ভাবে। যে কোনো সময় বৃষ্টি নামবে বোধহয়।
জাওয়াদের ঘরে ফেরা দরকার। গুছিয়ে নিতে হবে সবকিছু। বাসস্ট্যান্ডেও পৌঁছে যেতে হবে তাড়াতাড়ি।
এখানে আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে বৃষ্টিতে ভিজতে হবে। এই অসময়ে সে বৃষ্টিতে ভিজতে চায়না। তাকে এখন অনেক শক্ত থাকতে হবে।
কিন্তু শরীরে শক্তি পায়না। ইচ্ছা করছে এখানেই, এই মাঝরাস্তাতেই শুয়ে পড়তে। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়ুক গায়ে। কিছু অনিয়ম হোক। সবার কাছে ভালো ছেলে হয়ে তো দেখলো। কেউ ওকে ভালোবাসে না, কেউ না।
ঠিক ছোটবেলার মতো অভিমান হয় তার। মায়ের আঁচলের গন্ধ নিতে ইচ্ছা করে। আচ্ছা রূপাকে কি কখনো বলা হয়েছে, তার শরীর থেকে মায়ের গন্ধই আসে? যেটা জাওয়াদ রূপা আশেপাশে থাকলেই টের পায়?
ঝড়ের বেগে ঘরে ঢোকার মুখেই দাদাজানের সামনে পড়ে রূপা। রূপার ঈষৎ লাল চোখ, মুখ দেখে শিউরে ওঠে নেওয়াজ। রূপা তাড়াতাড়ি করে নিজেকে সামলায়। আঁচল দিয়ে মুখ মোছে। জোর করে মুখে হাসি ফোটায়।
"দাদাজান, কিছু বলবেন?"
নেওয়াজ ক্ষীণ গলায় বললো,"টুনি বাপের বাড়ি গেছে কয়দিন রে?"
"এইতো দুই মাস হতে চললো দাদাজান। কেনো?"
"সে কি রে? এখনো এক মাস?"
"কেনো দাদাজান? খুব মনে পড়ছে ওকে?"
নেওয়াজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,"মনে পড়ছে, খুব মনে পড়ছে। আসলে মেয়েটা বড় ভালো। কতো গল্প করে সারাদিন আমার সাথে, সারাদিন হাসে। দেখতে ভালো লাগে। ও চলে যাওয়ায় একা হয়ে গেছি। ডাক্তারটাও আর আসে না আগের মতো। তোরাও আমার সাথে সেভাবে কথা বলিস না। সবসময় এতো ব্যস্ততা তোদের।"
মনটা আর্দ্র হয়ে যায় রূপার সাথে সাথে। দাদাজানের হাত ধরে তাকে বারান্দার একটা চেয়ারে এনে বসায়। নিজেও একটা টুল এনে তার সামনে বসে।
"আমি আছি তো দাদাজান। আজ বিকেলটা শুধু আপনার আর আমার। অনেক গল্প করবো আজ আমরা।"
নেওয়াজ কি মনে করে রূপার মাথায় হাত দিয়ে বললো,"তোমার মনটা কি আজকাল খুব বেশি খারাপ থাকে দাদু?"
রূপা চমকে ওঠে। এই মুহুর্তে সে দাদাজানের চোখের দিকে তাকাতে পারবে না। যেনো সত্যিই দাদাজান বুঝে যাবে সে কি লুকাতে চাচ্ছে। চোখের ভাষাতেই বুঝে ফেলবে ওর মন আর মস্তিষ্ক এখন কাকে নিয়ে লড়ে যাচ্ছে নিজেদের মধ্য।
"মন খারাপ করে না দাদু। সব ঠিক হয়ে যাবে। টাইম উইল হিল এভ্রিথিং।"
"আসলেই কি তা-ই দাদাজান? সময় কি আসলেই সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়? না দাদাজান, আমরা আসলে সময়ের সাথে নিজেদের খাপ খাওয়াতে শিখে যাই ওই প্রতিকূল পরিবেশে। এজন্য মনে করি আদতে আমরা সুখী। আসলে তা না।"
ঘোলাটে চোখে নেওয়াজ রূপার দিকে তাকায়। রূপা অদূরে তার পুরোনো স্কুলটার দিকে তাকিয়ে আছে। নতুন স্কুলের কাজ শুরু হয়েছে। এখান থেকে অল্প কিছুটা দূরে। এনজিও থেকেই সব ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এখানে আর ক্লাস হবে না। শিক্ষকদের বসার জন্য বা মিটিং এর জন্য রাখা হবে এটা। বাচ্চাগুলো নতুন ইউনিফর্ম পাবে, জুতা পাবে, ব্যাগ, বইখাতা পাবে। রূপা ভাবতেই অভিভূত হয়ে যায়। তবুও পুরোনো স্কুলঘরটা দেখে কোথায় যেনো স্মৃতির মন খারাপেরা ডালপালা মেলে ওড়ে।
"জানি কিছুই ঠিক হয়না। তবুও আমাদের বাঁচতে হয়। জীবন মানেই সংগ্রাম দাদু। তুমি এই সংগ্রাম থেকে পালাতে পারবে না।"
"কেনো এতো বড় ভুল করলাম দাদাজান? কেনো আপনাদের কথা একটাবার ভাবলাম না?"
"তুমি যে বুঝতে পেরেছো যে ভুল করেছো এটাই প্রয়োজন ছিল। পরবর্তীতে আর এই ভুল করবে না তুমি এই উপলব্ধি থেকে।"
"এ ভুলের কোনো ক্ষমা হয়না দাদাজান।"
"যে তোমার ভুলকে ফুল হয়ে ফোটাতে চাইবে, তার কাছে তোমার সব ভুলের ক্ষমা হয়ে যাবে। আমাদের কাছে হয়নি?"
রূপা মাথা নিচু করে বসে থাকে। জাওয়াদের মুখটা মনে পড়ছে। বাইরে তো বৃষ্টি নেমেছে, উনি ঘরে ফিরেছে তো ঠিকঠাক? আবার জ্বর বাঁধিয়ে না ফেলে!
(চলবে....)