ফন্ট সাইজ:
থিম:
এসো নীপবনে হারাই দু'জনে

২০তম পর্ব

লেখক: মিথিলা জামান নিভা

#এসো_নীপবনে_হারাই_দুজনে

পর্ব: ২০

"সুপ্রিয় অপরিচিতা,

আপনাকে কখনো এমন সম্বোধন করতে হবে ভাবিনি। আপনার প্রতি ঠিক যেই মুহুর্ত থেকে আমার সুপ্ত অনুভূতিগুলো তীব্র হয়েছে, তখন থেকেই আপনাকে আমি পড়তে চেয়েছি খোলা বইয়ের মতো। আমারই ধৃষ্টতা যে আমি ভেবেই নিয়েছিলাম আপনাকে আমি চিনেছি, বুঝেছি, পড়েছি। কিন্তু আপনি কি করলেন এটা রূপা? আমাকে কাপুরুষদের কাতারে ফেলে দিলেন? যাকে নিজের ভাঙা মনটা মেরামতের দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলেন তাকে মেরুদণ্ডহীন ভেবে বসলেন? আপনার কেনো মনে হলো যে আপনার ভয়ংকর অতীতের কথা শুনে আপনার হাত ছেড়ে দিবো আমি মাঝরাস্তায়? তবে এই চিনেছিলেন আমাকে? আমার তো কোনো অপরাধ ছিলো না এখানে। তবে আমাকে কেনো শাস্তি দিলেন? আপনি বলুন, আমি এই শাস্তি পাওয়ার যোগ্য ছিলাম?

এই কাজটা যদি দীপা কিংবা টুনি করতো তবুও মানতাম। কিন্তু আপনি? এই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন নারীটিকে আমি সম্মান করেছি বরাবরই। সেই আপনি আমাকে এভাবে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারলেন? আপনার চোখে আমি আমার জন্য ভালোবাসার ব্যাকুলতা দেখেছি৷ যাকে ভালোবাসলেন তাকেই শাস্তি দিলেন? তবে আপনার সাথে ওই কুলাঙ্গারটার তফাৎ রইলো কি, জানাবেন তো!

আমি দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছি। এই বুঝি আমার শাস্তি মওকুফ হবে, এই বুঝি রূপকথা ভিলা তে আপনি ডাকবেন আমাকে। আমার পাশাপাশি দীর্ঘ ক্রোশ পার হতে চাইবেন। কিন্তু আমি তো ভাবতে পারিনি আপনার চোখে আমি কেবলমাত্র একটা কাপুরুষ, যার অপরাধ সে তার ভালোবাসাকে মূল্যায়ন করতে পারবে না।

আমি গতকাল সারারাত দু'চোখের পাতা এক করতে পারিনি। বারবার শুধু একটা কথাই মনে হয়েছে, ভালোবাসাই কি তবে আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিলো? আর যার শাস্তি পেতে হলো আমাকে এভাবে?

আবার এ-ও ভেবেছি, তবে আমার কাছ থেকেও কি আপনি ঠকে যাওয়ার ভয় করেছেন? আবেগের বশে আমাকে ভালোবেসে পরে মনে হয়েছে যে ঠিক পূর্বের ঘটনার মতোই আপনাকে যত্ন করে ঠকাবো আমি? হয়তো এটা আমারই ব্যর্থতা, আমি আপনাকে বুঝাতে পারিনি যে আমি আপনার পূর্বের প্রেমের মতো কাপুরুষ কিংবা কুলাঙ্গার নই। আমি ভালোবাসলে ঠকাতে জানিনা। আপনার জীবনে আমি দ্বিতীয় পুরুষ হলেও আমার জীবনে তো আপনি প্রথম নারী। আমার প্রতিটা হৃৎস্পন্দন প্রেম শিখেছে আপনার সংস্পর্শে এসে। আমি কীভাবে আপনাকে ভুলতে পারি রূপা? আপনাকে ভোলার সাধ্য আমার এক জীবনে হবে না।

আপনি পাপী নন রূপা। একটা ভুল সিদ্ধান্ত আপনাকে কলুষিত করে দিতে পারে না। আপনার জীবনের দ্বিতীয় পুরুষ হতে আমার আপত্তি নেই, তবে আমি শেষ পুরুষটি হতে চাই। আপনার ভালোবাসার, প্রতিটা অনুভূতির একচ্ছত্র অধিপতি হবো আমি। বাদবাকি দুনিয়ার কথা ভাবার সময় বা ইচ্ছা কোনোটাই আমার নাই।

তবে হ্যা, একজন নিরপরাধ মানুষকে অকারণে যে শাস্তি দিলেন আপনি তার প্রায়শ্চিত্ত আপনাকে করতে হবে। আমি আমার ভালোবাসার প্রতি প্রতিশোধ নিতে চাইনা। কিন্তু আপনার এতটুকু উপলব্ধি হওয়া প্রয়োজন ভালোবাসার কাছে কোনো বাঁধা কাজ করে না। এটা আপনাকে বুঝতে হবে। আমি সহসাই ধরা দিবো না। আমার জন্য আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে রূপা।

আমি ফিরবো, হয়তো কাল অথবা পরশু অথবা তারও পরে। কিন্তু এতটুকু কথা দিতে পারি যে আমি আপনার কাছে ফিরবোই। আপনার কোনো অযুহাত সেদিন জাওয়াদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। এ প্রতিজ্ঞা জাওয়াদ নিয়েছে। আর জাওয়াদ যে প্রতিজ্ঞা নেয় তা ভাঙে না।

আপনার সাথে আমার আবার দেখা হবে রূপা। আমার ভালোবাসার অত্যাচারে জর্জরিত হওয়ার প্রস্তুতি রাখুন। গত রাতে আপনাকে ছেড়ে দিয়েছি, অধিকার ছিলো না তাই। তবে যেদিন ফিরবো অধিকার আদায় করেই ছাড়বো। সেইদিন আর ছাড় পাবেন না আপনি।

ইতি,

...........

সম্বোধনের জায়গাটা ফাঁকা রাখলাম, ওটা আপনি লিখে নিবেন।

পুনশ্চঃ সাময়িকের বিদায়ের পর যখন জাওয়াদ তার অধিকার আদায়ের জন্য ফিরবে সেদিন সে তার রূপকথাকে কালো পাড়ের সাদা শাড়িতে দেখতে চায়। কারণ জাওয়াদের কাছে সাদা রঙের মালকিন একমাত্র তার রূপা, তা রূপকথা, তার স্বপ্নদর্শিনী প্রিয়ংবদা।'

মন্ত্রমুগ্ধের মতো পুরো চিঠিটা শেষ করে রূপা। একবার, দুইবার, তিনবার এভাবে করে বেশ কয়েকবার পড়ে ওটা। পড়তে পড়তে মুখস্ত হওয়ার উপক্রম হয়। নিষিদ্ধ ইচ্ছেগুলো দলবেঁধে হানা দেয় মনের গোপন কুঠুরিতে।

কয়েকবার পড়া শেষ করে চিঠিতে নাক ডুবিয়ে দেয় রূপা। লম্বা করে শ্বাস নেয়। মনে হচ্ছে তার প্রিয় ডাক্তার সাহেবের ঘ্রাণ পাচ্ছে সে ওটা থেকে। চিঠিটা গালে চেপে বসে থাকে সে ওভাবেই। ওদিকে যে কতো বেলা বাড়ছে তার খেয়াল নেই রূপার।

হঠাৎ নিচতলা থেকে শোরগোলের শব্দ পেয়ে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ায় সে। রসু আর দীপার কণ্ঠ পাওয়া যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেনো চিৎকার করে কাঁদছে ওরা। বাড়িতে দুইজন অসুস্থ মানুষ, দাদাজান আর টুনি। কার কি হলো? অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে ওঠে তার। চিঠিটা দ্রুত শাড়ির আঁচলের সাথে গিঁট দিয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড়ির দিকে এগোয় সে। দীপার চিৎকার বেড়েছে। রূপার পা যেনো আর চলতে চায়না ভয়ে।

টুনির ব্যথা উঠেছে, পানিও ভেঙেছে। অথচ ওর ডেট আরো কয়েকদিন পর। বাড়ির সবাই হতবিহ্বল। নেওয়াজ উদ্দিন সাথে সাথেই সরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স খবর দিয়েছে। ডেলিভারি সেখানেই হবে। অ্যাম্বুলেন্স এখনো এসে পৌঁছায়নি। রসু একবার রাস্তায় যাচ্ছে অ্যাম্বুলেন্স এলো কিনা দেখতে, আরেকবার ছুটে ঘরে আসছে টুনির কাছে।

দীপা টুনির পায়ে তেল মালিশ করে দিচ্ছে দ্রুত হাতে। নেওয়াজ উদ্দিন টুনির হাত ধরে কাঁপছে।

রূপা যেনো আর এগোতে পারে না। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শরীরটা খুব দূর্বল লাগছে তার৷ মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে এবার সে।

টুনি ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে রূপাকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকে। রূপা আলুথালু পায়ে ছোটে তার কাছে। হাঁটু গেড়ে টুনির বিছানার কাছে বসে সে৷ টুনির হাতটা চেপে তার কপালে চুমু এঁকে দেয় রূপা।

"বড় আপা।"

"বলো টুনি, এইতো আমি।"

"বড় আপা আমার কিছু হয়ে গেলে আমার বাচ্চাটারে আপনি দেখবেন কথা দেন। আপনার স্কুলে পড়াবেন ওরে আর জাওয়াদ ভাইজানের মতো ডাক্তার বানাবেন। কথা দেন বড় আপা।"

উপস্থিত সবাই শিউরে ওঠে টুনির কথায়। রসু তখন রাস্তায়। দীপা ঠোঁট কামড়ে কেঁদে দেয়। নেওয়াজও পাঞ্জাবির হাতায় চোখ মোছে।

"এসব কি কথা টুনি? একদম এসব বলবে না। ভালো কথা চিন্তা করো। তোমার সন্তান সুস্থভাবে তোমার কোলে আসবে, তুমিও সুস্থ থাকবে। এখন এগুলো বলার সময় না টুনি।"

তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেও টুনি হেসে দেয়। কি সুন্দর, নিষ্পাপ সেই হাসি। রূপা অবাক হয়ে দেখে। হাসিটা একটুও পাল্টায়নি তার।

"আর হ্যা আপনাদের রসু পাগলাটারেও সামলে রাখবেন। খুব অনিয়ম করে ও। ঠিকমতো সময় খায়না, ঘুমায় না। এরকম চলতে থাকলে তো অসুস্থ হয়ে যাবে ও।"

রূপা ঢোক চেপে নিজেকে সামলে বললো,"তোমার রসুকে সামলাতে তোমাকেই লাগবে টুনি। ও আমাদের কারো কথাই শোনেনা। আমাদের মায়ের কথা শুনতো শুধু। আর এখন তোমার কথা। তাই ওকে ভালো রাখতে চাইলে, তোমার সন্তানকে ভালো রাখতে চাইলে তোমাকে ফিরে আসতে হবে টুনি। দয়া করে এসব আর বলো না। আমাদের আর কষ্ট দিও না।"

টুনি হাসে, তার সেই চিরচেনা সুন্দর হাসি। রূপার ঠোঁট কেঁপে ওঠে। টুনির আজকের হাসিটা এতো সুন্দর লাগছে কেনো? মনে হচ্ছে যেনো ঝিলের জলে একটা পদ্ম ফুটেছে কেবল।

এরপর মিনিট দশেকের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স চলে আসে। টুনিকে উঠানো হয় অ্যাম্বুলেন্সে। যাওয়ার আগে সে নেওয়াজের দিকে তাকিয়ে হাসে ছোট্ট করে।

"যাই দাদাজান?"

নেওয়াজ ভাঙা গলায় বললো,"যাই বলতে নেই বুবু, বলো আসি।"

টুনি ব্যথা চেপে জোর করে হেসে বললো,"আসি দাদাজান?"

"এসো বুবু, খুব তাড়াতাড়ি এ বাড়ির ছোট্ট সদস্যকে নিয়ে ফিরে এসো।"

নেওয়াজের রাত থেকেই বেশ জ্বর। সে যেতে চাইলেও রসু আর রূপা তাকে নিচ্ছে না। দাদাজানের সাথে অগত্যা দীপাকেও থাকতে হয়। টুনির সাথে রসু আর রূপাই অ্যাম্বুলেন্সে ওঠে।

অ্যাম্বুলেন্সটা চলে যায়। নেওয়াজের হাত জড়িয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে দীপা। দু'জনের কারোই ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করছে না। কেমন খা খা করছে ঘরটা। যতক্ষণ না অ্যাম্বুলেন্সটা দৃষ্টির আড়াল না হয় ততক্ষণ ওরা ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে।

এরপর একটা লম্বা শ্বাস ফেলে নেওয়াজ দীপার দিকে তাকায়।

"আমাকে ঘরে নিয়ে চল দাদু। আমি নামাজে বসবো। যতক্ষণ না আমার বুবুর সুসংবাদ শুনি, ততক্ষণ আমি জায়নামাজ থেকে উঠবো না।"

দীপা কান্না ভেজা কণ্ঠে বললো,"চলুন দাদাজান, আমিও আপনার পাশে বসে নামাজ পড়বো।"

বাসের ঢুলুনিতে বরাবরই তন্দ্রা আসে জাওয়াদের। আজ তার চোখে কোনোও ঘুম নেই। সারারাত ঘুমাতে না পারলেও কোনোভাবেই দু'চোখ বন্ধ করতে পারছে না সে। চোখ জ্বালা করছে বারবার। আবু ভাই কি চিঠিটা রূপাকে পৌঁছে দিতে পারলো? রূপা কি পড়েছে সেই চিঠি? নাকি না পড়েই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে?

আরো বড় একটা সিদ্ধান্তও সে নিয়েছে রাতেই। সে জানেনা এটা ঠিক করলো নাকি ভুল। শুধু জানে এখন সে নিজের নিয়ন্ত্রণেই নেই। সে কি করছে না করছে তা যেনো অন্য কারো হাতে। অন্য কেউ তাকে পরিচালনা করছে।

টুনির জন্যও কেমন দুশ্চিন্তা হচ্ছে তার। যদিও সবাইকে সে জানিয়েছে টুনি একদম সুস্থ, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু রিপোর্টে সে দেখেছে টুনির আয়রন লেভেল অনেকটাই কম। ওষুধ চলছে, মাঝে মাঝে স্যালাইনও চলছে। তবুও ভয়টা থেকেই যায়।

জাওয়াদ টুনিকে বলেছে তার ডেলিভারির আগে জাওয়াদ চলে আসবে, তার পাশে থাকবে। কিন্তু জাওয়াদ জানে তা বোধহয় সম্ভব না। কিন্তু এই মুহুর্তে এসে তার মনে হচ্ছে টুনির জাওয়াদ ভাইজানকে দরকার এখন তার পাশে। তার ভাইজান থাকলেই টুনি যেনো সাহস পেতো। জাওয়াদ টুনিকে আজকাল তার দুলু আপার বাইরে আর কিছু ভাবতে পারেনা। দুলু আপাও যেমন তার বোন, টুনিও যেনো তাই।

মানুষের মন কি অদ্ভুত না? দু'টো বছর আগেও যাদের সে চিনতো না, আজ তাদের জন্য কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে তার। ইচ্ছা করছে সব ছেড়েছুড়ে ওই ছোট্ট শহরটাতেই ঘাঁটি গেড়ে বসতে। ছোট্ট একটা জীবন, কি হবে এটাকে এতো জটিল করে?

আগামীকালই মৌখিক পরীক্ষা। আর এখন জাওয়াদের মনে হচ্ছে তার শরীর, মন, মস্তিষ্ক পুরোপুরি ভেঙে গেছে। সে সবকিছু যেনো ভুলে যাচ্ছে। একটা বই সামনে রেখেছে শেষ সময়ের কিছু প্রস্তুতির জন্য। সব কেমন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। শেষমেশ তীরে এসে তরী ডুবিয়ে দিবে নাতো? রূপাকে যে সে কথা দিয়েছে, সে ফিরবে। বিজয়ী বেশেই ফিরবে। কথা রাখতে পারবে না সে? নাকি শেষ পর্যন্ত বাবা জয়ী হবে? ইউরোপের কোনো এক দেশে কিনা তার আসল চিকিৎসক জীবন শুরু হবে? জাওয়াদ আর কিছু ভাবতে পারেনা। সিটে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে। এই মুহুর্তে মস্তিষ্ক দুই ভাগ হয়ে গেছে। এক ভাগ রূপাকে ভাবছে, স্নিগ্ধতায় মোড়ানো প্রেম নিয়ে। আরেক ভাগ টুনিকে ভাবছে, একরাশ দুশ্চিন্তা ও ভ্রাতৃত্বের টান নিয়ে। কি এক আজব কারখানা মানুষের মন।

টুনিকে ওটিতে নেওয়া হয়েছে অনেকক্ষণ, এখনো ওদিকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। রসু একনাগাড়ে পায়চারি করছে বারান্দায়। একটা চেয়ারে জবুথবু হয়ে বসে রূপা। বারবার সজল চোখে সে রসুকে দেখছে। তার নিজের চিত্তও অশান্ত। কিন্তু রসুর সামনে এখন শক্ত থাকতে হবে।

টুনির বাড়িতে খবর পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তারা কেউ শহরে নেই। টুনির মামাবাড়িতে বেড়াতে গেছে সব। তারা জানতো টুনির ডেট আরো কিছুদিন পর। খবর শোনার সাথে সাথেই রওনা দিয়েছে তারা।

"বড় আপা।"

"হুম বল রসু।"

"ওরে এখনো বের করতেছে না ক্যান? আপনি একটু ওদের যেয়ে কন, আমার বাচ্চা লাগবে না। আমার টুনিরে হইলেই হবে। টুনি বাঁইচা থাকুক শুধু। আমি আর কোনোদিন বাচ্চা নিতে চাইবো না।"

এই বলে রসু অন্যদিকে ফিরে মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়।

রূপা উঠে দাঁড়ায় রসুর পাশে।

"এখন এগুলো বলার সময় না রসু। টুনি আর বাচ্চা দুইজনই সুস্থ থাকবে। হাবিজাবি চিন্তা বাদ দে।"

রূপাকে অবাক করে দিয়ে রসু গলার গামছাটা দিয়ে মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে। রূপা ঠোঁট কামড়ে তাকায় তার দিকে।

"এতীম একটা ছেলেরে আপনার আম্মায় ঠাঁই দিছিলো তার ঘরে। কোনোদিন বুঝতে দেয় নাই আমি তার ছেলে না, আমি একটা এতীম ছেলে। আমি ভুলেই গেছিলাম কে আমার আপন বাপ, কে-ই বা আমার আপন মা। বাপ মা দুইজনরেই পাইছিলাম আপনাদের বাড়ি আইসা। তারা আমারে থুইয়া চইলা গেলো। এখন কি টুনিও আমারে থুইয়া চইলা যাইবো বড় আপা? আমি যারেই নিজের বলে আপন করতে চাই তারাই ক্যান আমারে থুইয়া পালায়, বড় আপা কইতে পারেন? আমি-ই কি কুফা?"

রূপা ছলছল চোখে রসুর দিকে তাকায়। তার কাঁধে আলতো করে হাত রাখে।

"মানুষ কখনো কুফা হয়না রে রসু। এগুলো মানবসৃষ্ট কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই না। আল্লাহ আমাদের রিযিকে ঠিক যতটা লিখে রেখেছেন আমরা ততটাই পাবো। এর বেশিও না, এর কমও না। মানুষের ভালোবাসা পাওয়াও একটা রিযিক। তোর রিযিকে বাবা মায়ের ভালোবাসা ছিলো না, তাই পাসনি। তবে আজকের পর তুই আরেক বাবা অথবা মা পাবি। যাকে তুই মনপ্রাণ ভরে বাবা বা মা বলে ডাকবি। সে একান্তই তোর, তোর অংশ। আর রইলো টুনির কথা? টুনি আমাদের রেখে কোথাও যাবে না। তাই এসব না ভেবে দোয়া কর। আর কিছুক্ষণ পরেই তোর সব দুশ্চিন্তার অবসান ঘটবে।"

রসু ক্লান্ত চোখে রূপার দিকে তাকায়। রূপা ছোট্ট করে হেসে তাকে আশ্বস্ত করে।

একেকটা মিনিটকেও ওদের যেনো এক ঘন্টা লাগছে। ওদিকে নেওয়াজ আর দীপাও অপেক্ষা করছে একটা খবর শোনার, আর খবরটা যেনো ভালো হয়। কি এক দুর্বিষহ সময় চলছে ওদের।

সূর্য যখন কেবলই মধ্য গগণে পৌঁছেছে, ঠিক তখনই এক নবজাতকের চিৎকার ভেসে আসে ওটির ভিতর থেকে। সেই নিষ্পাপ, মিষ্টি স্বর যেনো রসুকে বরফের মতো জমিয়ে দেয়। রূপা মুখে হাত চেপে কাঁদে, কাঁদতে কাঁদতে আবার হাসে। রসুর দিকে তাকাতেই দেখে সে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নড়াচড়াও করতে পারছে না।

শুধু বিড়বিড় করে বলে,"আমার টুনি ঠিক আছে তো?"

হালকা একটু ঝিমুনি মতো এসেছিলো জাওয়াদের। এক ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে যায় তার। উঠেই দেখে সে ঢাকা পৌঁছে গেছে। কিন্তু তার মনটা হঠাৎ এমন আর্দ্র হয়ে গেলো কেনো? কি এক ভালো লাগার পরশ ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে। হ্যা ঠিকই তো, এটুকু সময়ে যে সে একটা স্বপ্নও দেখে ফেলেছে। টুনি তার দিকে তাকিয়ে হাসছে, তার সেই চিরচেনা হাসি।

"ভাইজান দেখেন আমার একটা ছানা হয়েছে। টুনটুনির ছানা।"

টুনটুনির ছানাকে দেখে জাওয়াদ বিমুগ্ধ হয়ে যায় স্বপ্নের মধ্যেই। কিন্তু টুনি এমন সাদা শাড়ি পরেছে কেনো? তাকে অপরিচিত লাগছে কেনো এমন? মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে কথা বলছে ও।

"আমার ছানাটারে আপনার মতো ডাক্তার বানাবেন না ভাইজান? ও ভাইজান, বলেন না। বানাবেন না?"

জাওয়াদ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাস থেকে নামে। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে তার। অদ্ভুত এক টানাপোড়েনে বড্ড অস্থির লাগছে তার।

(চলবে.....)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন