#এসো_নীপবনে_হারাই_দুজনে
পর্ব: ২৭
জাওয়াদের পরিবার যখন হাসপাতালে প্রবেশ করে তখনও ভোর হয়নি। অনেকটাই আঁধার তখন বাইরে। হন্তদন্ত হয়ে ঢুকতেই এক অদ্ভুত সুন্দর অপার্থিব দৃশ্য দেখে তারা থমকে যায়। বারান্দার মেঝেতেই শিশু, নারী, পুরুষের মেলা বসেছে যেনো। ছোট বাচ্চাগুলো তাদের মায়েদের কোলে ঘুম। তাদের মুখে কান্নার দাগ জেগে উঠেছে। মায়েরাও কেউ নির্লিপ্ত বসে, কেউ বা কাঁদছে নিঃশব্দে। কেউ কেউ দুই হাত তুলে রবকে ডাকছে। কারো কোনো স্বার্থ নেই, নেই কারো রক্তের সম্পর্ক জাওয়াদের সাথে। তবুও কোথায় যেনো সবার সুর একসাথে এসে মিলে গেছে। তারা চিকিৎসা বিজ্ঞান বোঝে না, আর না তো বুঝতে চায় বাস্তবতা। তারা শুধু বোঝে তাদের অতি প্রিয় ডাক্তার সাহেবকে ফিরে আসতেই হবে সুস্থ হয়ে। তাদের এই ভালোবাসার মূল্য না দিয়ে এভাবে ডাক্তার সাহেব হাল ছেড়ে দিতে পারেন না।
এক কোণায় টুনির কাঁধে মাথা এলিয়ে রূপা বসে আছে। তাকে ওড়না দিয়ে বাতাস সজোরে বাতাস করছে দীপা। রূপাকেও অবচেতন লাগছে। একটু পর পর ফুঁপিয়ে উঠে শান্ত হয়ে যাচ্ছে সে।
মোরশেদ এসেই ডাক্তারকে ডেকে নেয়। হাফসা আর দুলু উদ্ভ্রান্তের মতো আইসিউয়ের দরজার সামনে জাওয়াদকে একটা নজর দেখার জন্য তড়পাতে থাকে। ফরহাদ মোরশেদের পিছন পিছন ডাক্তারের কাছে ছোটে।
যা কথা হওয়ার খুব দ্রুত হয়ে যায়। মোরশেদ করিৎকর্মা মানুষ। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আপাতত ঢাকাতেই চিকিৎসা চলবে যতক্ষণ না জাওয়াদের জ্ঞান ফেরে। জ্ঞান ফেরার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নেওয়া হবে। তবে এরইমধ্যে যদি কোমায় চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় তাহলে পরিকল্পনা পালটানো হবে। তখন সরাসরি সিঙ্গাপুরেই নিয়ে যাওয়া হবে।
ডাক্তার কিছুক্ষণ বোঝানোর চেষ্টা করে মোরশেদকে। তারা এখনই জাওয়াদকে যেতে দিতে কিছুটা নারাজ। তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে জাওয়াদকে উন্নত চিকিৎসা দিতে। তবে এখনই মুভ করা হলে খারাপ কিছু ঘটতেও পারে। মোরশেদ তার সিদ্ধান্তে অনড়। তার ছেলেকে সে পারলে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা দিতে চায়। তাতে দুনিয়া উলোটপালোট হয়ে গেলেও হোক।
হাল ছেড়ে দেয় ডাক্তাররা। রোগীর পরিবারের লোক চাইলে তাদের কিছু করার নেই। তবে এখনো ভেন্টিলেশনে রাখা আছে জাওয়াদকে। তারা এখনো আশার আলো দেখছে। তাদের বিশ্বাস জাওয়াদের জ্ঞান ফিরে আসবে। অন্তত পরের দিন দুপুর পর্যন্ত যেনো অপেক্ষা করা হয়। এরমধ্যে তারা তাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করে যাবে।
মোরশেদ প্রতিবাদ করতে গেলে ফরহাদ তাকে আটকায়। জাওয়াদের ভালোর জন্য এটুকু অপেক্ষা করতেই হবে তাদের। এরইমধ্যে হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা হয়ে যাক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সহ। মোরশেদ রাজি হয় অবশেষে। উপর উপর যতই হম্বিতম্বি করুক, ভিতরটা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে তার। অপরাধবোধ তীব্র হচ্ছে আরো। এই সন্তানকে সে দিনের পর দিন মানসিক চাপের মধ্যে রেখেছে। এক সময় ভুলতেই বসেছিলো জাওয়াদও একটা মানুষ। তারও অধিকার আছে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়া। কিন্তু আজ, এই অন্তিম মুহুর্তে এসে তার মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীর বিনিময়ে হলেও সে তার সন্তানকে ফেরত চায়। যা কিছু হয়ে যাক।
কম্পিত পায়ে একটা চেয়ারে এসে বসে সে। ফরহাদ তার পাশে এসে বসে তার হাতের উপর হাত রাখে। মোরশেদের কোনোদিকে নজর নেই। তার কানে একটা কথাই বাজছে শুধু 'বাবা আপনার ছেলে আজ থেকে সহকারী সিভিল সার্জন জাওয়াদ বিন আলম।'
মোরশেদ দুই হাতে মুখ ঢাকে।
"বাবা নিজেকে সামলান। আপনাকে এমন দেখলে মা আর দুলু আরো ভেঙে পড়বে। সবকিছু আমাদের হাতের বাইরে চলে যায়নি এখনো। একটু শক্ত থাকুন।"
মোরশেদ ভাঙা গলায় বললো,"আমার ছেলেটা আমাকে ক্ষমা করতে পারেনি ফরহাদ। মুখে যতো যা-ই বলুক, ওর কাছে আমি ক্ষমা পাইনি। এজন্যই তো আমার উপর দিয়ে এই নরকযন্ত্রণা যাচ্ছে। ফরহাদ আমি শ্বাস নিতে পারছি না কেনো? আমার বুকটা ভার হয়ে আসছে কেনো?"
ফরহাদ আরো জোরে চেপে ধরে মোরশেদের বাম হাতটা। মোরশেদকে স্বাভাবিক লাগছে না দেখতে।
"বাবা এরকম করবেন না দয়া করে। সব ঠিক হয়ে যাবে।"
হঠাৎ মোরশেদ উঠে বসে। বুকে হাত দিয়ে বার কয়েক লম্বা শ্বাস ফেলে সে।
"ফরহাদ আমি নামাজ আদায় করবো। সারাজীবন ধর্মকর্ম থেকে দূরে ছিলাম। দুই হাতে শুধু টাকা ইনকাম করেছি। কিন্তু দেখো আজ আমার সেই টাকা অর্থহীন। আমার এতো এতো টাকা দিয়েও আমি আমার সন্তানকে ফেরাতে পারছি না আমার কাছে। আচ্ছা ফরহাদ আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন?"
"অবশ্যই করবেন বাবা। উনি উনার সব বান্দাকে ভালোবাসেন। তার কাছে আত্মসমর্পণ করুন, মন খুলে সন্তানের সুস্থতা ভিক্ষা করুন তার কাছে। বাবা মায়ের চাওয়া উনি ফিরিয়ে দিবেন না।"
মোরশেদ টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায়। একটু পরেই ফজরের আজান দিবে। এখনো তাহাজ্জুদের সময় আছে বোধহয়। আজ সে সত্যিই আত্মসমর্পণ করবে রবের কাছে। তারই দুনিয়ায় থেকে তার বান্দার কিসের এতো বাহাদুরি? কেনোই বা এতো ধৃষ্টতা তাকে ভুলে যাওয়ার? মোরশেদ আর এক মুহুর্ত দাঁড়ায় না সেখানে।
জাওয়াদকে নিয়ে চলে যাওয়া হবে আর কয়েক ঘন্টা পর। এ কথা বাইরের সবার কানে গেছে। রূপা শুনে হতবিহ্বল। তার মানে জাওয়াদ তার কাছে থাকবে না? সে এখন কি করবে? তার তো এতোটাও অধিকার জন্মায়নি জাওয়াদের পাশে থাকার অনুমতি পাওয়ার মতো। প্রেমিকার জন্য ভালোবাসা থাকে কিন্তু অধিকারটা বোধহয় থাকে না। বুক ধড়ফড় করতে থাকে তার। কীভাবে বাঁচবে সে জাওয়াদকে পাঠিয়ে দিয়ে?
"রূপা।"
রূপা চোখ তুলে তাকাতেই দেখে দুলু দাঁড়িয়ে তার সামনে। দুলুকে দেখে মনে হচ্ছে সুনামি বয়ে গেছে তার উপর দিয়ে। সুন্দর, পরিপাটি মানুষটা আজ বিধ্বস্ত। সে জানেনা কীভাবে এতোটা রাস্তা এসেছে তারা। মা কে সামলাবে নাকি বাবাকে? নাকি নিজেকে? মনে হচ্ছে একটা দুঃস্বপ্ন দেখছে তারা। অচিরেই সেই দুঃস্বপ্ন ভেঙে যাবে।
রূপা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, দুলুই তার হাত ধরে।
"দিলারা আপা, আমি...."
রূপাকে থামিয়ে দেয় দুলু। রূপার হাত ধরে আলতো করে। মেয়েটার গায়ে জ্বর এসেছে। দুলু চমকে ওঠে, জ্বরে তো গা পুড়ে যাচ্ছে।
"আমার সাথে ওদিকে চলো। একটা কথা বলবো তোমাকে।"
রূপার পা আর চলে না। কি বলবে দুলু তাকে? এই পুরো ঘটনার জন্য তাকে দোষী বানাবে? তাতো বটেই। সে-ই তো দোষী। সে থাকতে কীভাবে এতো বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেলো? সে কেনো পারলো না নিজের জীবন দিয়ে হলেও তার প্রিয়তমকে বাঁচাতে?
রূপাকে একটা তুলনামূলক একটা ফাঁকা জায়গায় এসে দাঁড়ায় দুলু। রূপার এলোমেলো চুল, লাল হয়ে যাওয়া চোখমুখ, জ্বরে পুড়ে যাওয়া শরীর প্রমাণ করছে সে শুধু উপরেই নয় ভিতর থেকেও জ্বলছে। এতোটা ভালোবেসে ফেলেছে মেয়েটা তার ভাইকে?
"দিলারা আপা আমাকে আপনারা শাস্তি দিন। সর্বোচ্চ শাস্তি দিন আমাকে আপনারা। আমি দোষী, হ্যা আমি দোষী। আমি থাকতে কেনো উনার এতো বড় বিপদ হলো? আমি কেনো উনাকে বাঁচাতে পারলাম না?"
দুলু শান্ত গলায় বললো,"যা হয়েছে এখানে তোমার কোনো দোষ ছিলো না রূপা। এমনিতেই পেরেশানিতে আছো, এসব ভেবে নিজের উপর আর জুলুম করো না।"
রূপা অবাক হয়ে তাকায় দুলুর দিকে। দুই ভাইবোনের কি অসম্ভব মিল। অতি কঠিন পরিস্থিতিতেও কীভাবে যে শান্ত থাকতে পারে।
"এসব বাদ দাও। তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো। আমার মনে হয়েছে এই মুহুর্তে তোমার কাছ থেকে এই সিদ্ধান্তটা শোনা দরকার।"
রূপা উত্তর না দিয়ে আরো অবাক হয়ে তাকায় দুলুর দিকে।
"তুমি কি আমাদের সাথে ঢাকায় যেতে চাও? আমার মনে হচ্ছিলো তুমি চাও কিন্তু ভয়ে বা লজ্জায় বলতে পারছো না। আবার জাওয়াদকে ছাড়তেও পারছো না। আমাকে বলতে পারো। তুমি যদি চাও আমি একটা ব্যবস্থা করে ফেলবো।"
রূপা স্তম্ভিত হয়ে যায়। সে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে দুলুর দিকে তাকিয়ে থাকে। এরপর আচমকাই দুলুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। যতোটা সম্ভব মিশিয়ে নেয় নিজের সাথে। তার অতি উষ্ণ শরীরটাকেও নিজের সাথে জড়িয়ে নেয় দুলু। আলতো হাতে রূপার পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় সে।
"দিলারা আপা আমি আমার মা'কে হারিয়েছি অনেক বছর। আমার কেনো হঠাৎ মনে হচ্ছে আপনি আমার মা হয়ে ফিরে এসেছেন? আমি আপনাকে এভাবেই জড়িয়ে রাখি কিছুক্ষণ?"
"অবশ্যই রাখো রূপা। আমার মনে হয়েছে আমার ভাইটার তোমাকে এখন পাশে দরকার। ওর কাছে থাকা প্রয়োজন এখন তোমার। তোমারও ওকে দরকার।"
রূপা উত্তর দেয়না। গরম ভাপ বের হয় তার মুখ থেকে শুধু।
"সকালে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নিও। তোমার তো জ্বরও এসেছে অনেক। ওষুধ খেয়ে নাও।"
"কিচ্ছু লাগবে না আমার। উনি সুস্থ হয়ে গেলে আমার সব অসুখ সেরে যাবে।"
রূপা ঠোঁট কামড়ে কেঁদে দেয়। দুলু পরম মমতায় রূপার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। মেয়েটাকে এখন ছোট একটা বাচ্চার মতো লাগছে। যে তার অনুভূতি প্রকাশ করতে চাচ্ছে, নিজেকে ভেঙেচুরে হলেও। কিন্তু সামাজিক স্বীকৃতি বা অধিকার না থাকায় ভয় আর লজ্জা কাজ করছে। তার শাড়ির উপর থেকে কালচে রক্তের দাগ জমাট বাঁধছে। যেমন ভাবে তার ভালোবাসা জমেছে প্রতিনিয়ত।
দুপুর বারোটার মধ্যেই হেলিকপ্টার পৌঁছে যায়। প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রূপার হাত ধরে রেখেছে দুলু। জাওয়াদকে নেওয়া হলে রূপাকেও নিতে হবে। জাওয়াদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি তখনও। ওভাবেই অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। তবে ভাগ্যক্রমে রক্ত দেওয়া গেছে, শরীর রক্ত নিয়েছে মোটামুটি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই। এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আনন্দের খবর। তবে আর কোনো উন্নতি নেই তার অবস্থার।
দাদাজানের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রূপা। নেওয়াজ রূপার মাথায় হাত রাখে। রূপা জোর করে নিজেকে শক্ত রাখে। কোনোভাবেই দূর্বল হওয়া যাবে না দাদাজানের সামনে। এই মানুষটা নিজেই অসুস্থ। আর কতো চাপ নিবে সে এই বয়সে?
"দাদাজান আমি যাই উনাদের সাথে?"
নেওয়াজ শীতল গলায় বললো,"উনারা কি চান তুমি যাও?"
রূপা ঢোক চেপে বললো,"দিলারা আপা আমাকে বলেছেন। আমি যদি চাই আমি যেতে পারি উনাদের সাথে।"
"তুমি কি চাও?"
রূপা ছলছল চোখে নেওয়াজের দিকে তাকায়। নেওয়াজ জানে রূপা কি চায়। এই মুহুর্তে জাওয়াদের পাশে থাকা ছাড়া আর কি চাওয়ার আছে তার? যদিও তার মন সায় দিচ্ছে না রূপাকে এভাবে ছাড়তে। কিন্তু কি করবে সে? রূপা যে পাগল হয়ে যাবে না যেতে পারলে।
"বেশ যাও। আমিও কিছুক্ষণ পরই রওনা দিবো। উনাদের সাথে না গেলেও পরেই আমি যাচ্ছি।"
রূপা হতবাক হয়ে যায়।
"আপনিও যাবেন দাদাজান?"
"কি করবো বলো দাদু? তোমাদের যেমন আমি ছাড়া আর কেউ নেই, আমারও তো তোমরা ছাড়া আর কেউ নেই। কীভাবে তোমাকে একা ছেড়ে দিই? উনাদের সাথে এতো মানুষ যাওয়াটা উনাদের পছন্দ না হতে পারে। যতোই হোক, আমরা ডাক্তারের খুব আপন হতে পারি। কিন্তু উনাদের তো নই। তোমাকে যখন বলেছে তুমি যাও উনাদের সাথে। আমি বাসে আসছি একটু পরেই।"
"দাদাজান আপনি এতো ভালো কেনো?"
নেওয়াজ ম্লান হাসে, কিছু বলেনা। রূপার মাথাটা চেপে ধরে বুকের সাথে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জাওয়াদকে আইসিউ থেকে বের করা হবে। এতোক্ষণে কেউ তাকে দেখেনি। উপস্থিত সবাই ভীড় করেছে। ঠেলেও তাদের সরানো যাচ্ছে না। সবার গুঞ্জনে বাতাস ভারী হয়ে আছে। তাদের প্রিয় ডাক্তার সাহেবকে যেনো ছাড়তেই চাচ্ছে না তারা। কিন্তু তার পরিবারের লোক যখন চলে এসেছে তখন কারই বা কি বলার আছে? শুধু একটা নজর জাওয়াদের মুখটা দেখলেই তারা খুশি। তারা জানে না আদৌ ওই মুখ তারা আর দেখতে পাবে কিনা। শুধু জানে ওই মানুষটাকে ফিরতেই হবে সুস্থ হয়ে। এতো এতো মানুষকে চিকিৎসা দিয়েছে, কখনো কখনো বিনামূল্যেও দিয়েছে। সে এভাবে চলে যেতে পারেনা।
সকালেই হাসপাতালের ডাক্তারদের বোর্ড বসেছিলো। তারা কেউ-ই চাচ্ছে না চব্বিশ ঘণ্টা হওয়ার আগেই এভাবে রোগীকে মুভ করাতে। কিন্তু তাদের কিছুই করার নেই। এয়ার অ্যাম্বুলেন্স তৈরি। শেষবারের মতো একবার সব পরীক্ষানিরীক্ষা করে তাকে স্ট্রেচারে তোলা হবে।
তিনজন সিনিয়র ডাক্তার রয়েছেন আইসিইউতে। একজন প্রেশার চেক করছেন, আরেকজন হার্টবিট। সম্পূর্ণ পর্যবেক্ষণ চলছে এই মুহুর্তে।
আচমকাই জাওয়াদের পায়ের দিকে নজর পড়ে একজন জুনিয়র ডাক্তারের। সে হতভম্ব হয়ে বাকিদের দিকে তাকায়। মনিটরিং করছিলো একজন সিনিয়র ডাক্তার, সে স্ক্রিনের দিকে তাকায় চোখ বড় বড় করে। এরপর চোখ ঘুরিয়ে বাকিদের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হতে চায় আসলেই কি সে যা দেখছে তাই ঠিক? নাকি মনের ভুল? বাকিরাও একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে।
"ও মাই গড! সাচ অ্যা মীরাকল।"
জুনিয়র ডাক্তারটার চিকিৎসা জীবন বেশিদিন হয়নি। তার উচ্ছ্বাস যেনো বেশি। তার এটুকু চিকিৎসা জীবনে এমন ঘটনা দেখেনি সে এর আগে।
"স্যার উনি পায়ের আঙ্গুল নাড়াচ্ছেন। উনার জ্ঞান ফিরেছে।"
"দেখতে দাও আমাকে।"
প্রবীন একজন সার্জন জাওয়াদের নাড়ি স্পন্দন পরীক্ষা করে। স্ক্রিনের দিকে তাকায় আবার। তার নিজেরও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। রোগী সাড়া দিচ্ছে। তার পালস রেট এখনো সেভাবে স্বাভাবিক না হলেও আগের চেয়ে অনেকটাই ঠিক। মস্তিষ্ক সিগনাল পাঠাচ্ছে, অক্সিজেন পাঠানো শুরু করেছে অল্প অল্প।
ডাক্তাররা একে অন্যকে জাপটে ধরে। যেনো এরচেয়ে আনন্দের আর কিছুই না তাদের জন্য এখন। দুইজন জুনিয়র নার্স ছিলো তখন আইসিউয়ের ভিতর। চেনে না জানে না একজন মানুষের জন্য এটুকু সময়ে তাদেরও মায়া তৈরি হয়েছিলো। তার জন্য এতো এতো মানুষের ভালোবাসা দেখে তারাও অবাক। নার্স দুইজনও দুইজনকে জড়িয়ে খুশি কেঁদে দেয়। এমন একটা মুহুর্তকে উদযাপন না করলে যে জীবন বৃথা। তারা যে মানুষ, চিকিৎসক হয়েছে বলে তো মনুষ্যত্বকে বিকিয়ে দেয়নি।
রসু দ্রুত বাড়িতে গিয়েছিলো তার বড় আপার কিছু কাপড়চোপড় নিয়ে আসতে। যদিও রূপার এদিকে কোনো খেয়াল নেই। রসু নিজে থেকেই গিয়েছিলো।
সে যখন হাসপাতালের বারান্দায় এসে পৌঁছায় তখন যোহরের আজান দিচ্ছে। কিন্তু সে ভাবতে পারছে না এটুকু সময়ের মধ্যে কীভাবে এই পরিবেশ পালটে গেলো এভাবে? কি এক স্বর্গীয় পরিবেশের সূচনা হলো হঠাৎ? সবাই কেনো একযোগে কাঁদছে এভাবে? কষ্ট বা যন্ত্রণার কান্না না, সুখ সুখ কান্না। বাচ্চাগুলোর আনন্দ মুখর চিৎকারে কান পাতা দায়।
রূপা এক কোণায় দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। হাফসা আর দুলু একে অন্যকে জড়িয়ে আর্তচিৎকার। দীপা আর টুনিও ওদিকে। নেওয়াজ জোরে জোরে আজান দিচ্ছে এক পাশে দাঁড়িয়ে।
মোরশেদকে শক্ত করে ধরে দেখেছে ফরহাদ। কি আশ্চর্য! ডাক্তারদেরও যেনো খুশির বান ডেকেছে। কি হলো ওদের সবার হঠাৎ করেই?
মসজিদের মাইক থেকে তখন মুয়াজ্জিনের দরদ মাখা কণ্ঠ ভেসে আসছে।
'আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর' যার অর্থ 'আল্লাহ মহান'।
(চলবে....)