ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি ছিলে আমারই

৪র্থ পর্ব

লেখক: অহনা রহমান

(৪) 

স্বাভাবিক ভাবে কেটেছে দুইদিন। ঋত্বিকের সাথে আর দেখা হয়নি সুখের। হবেই বা কিভাবে? সে কি বাসা থেকে বের হয়েছে নাকি? নিজেকে সম্পুর্ন ঘরবন্দী করে ফেলেছে সে। কারও সাথে কথাও বলেনি ঠিকভাবে। উদাস হয়ে থেকেছে প্রতিটি সময়। সোনিয়া বোঝাতে বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে ওকে ছেড়ে দিয়েছে ওর মতো করে। পুরোনো ক্ষত তাজা হয়েছে একটু তো অশ্রু ঝড়তেই হবে।
তখন মাঝরাত। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু ঘুম নেই সুখের চোখে। সে কপালের মাঝখানে হাত দিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। পাশে থাকা সোনিয়া ও ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ আগে। সুখের কিছুতেই ঘুম আসছে না। বারবার মনে পড়ছে দুইদিন আগের ঘটনা৷ মানে শপিংমলে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা। সে বুঝতে পারছে না ঋত্বিকের সাথে দেখা হওয়া কি নেহাৎই কাকতালীয়? নাকি ঋত্বিক আবার সেই পুরোনো হিসেব মেটাতে এসেছে। 
সুখ আবারও ভাবে। ঋত্বিকের সাথে তার সংসার ছিলো দুই বছরের। তার মধ্যেও কি ঋত্বিকের প্রতিশোধ নেওয়া শেষ হয়নি? সুখের প্রচুর ভয় হয়। যদি এখন আবার ঋত্বিক তাকে নিতে চাই? আইনত বা ধর্মীয়ভাবে সে এখনো ঋত্বিকের স্ত্রী। কেননা তার সাথে ঋত্বিকের ডিভোর্স হয়নি এখনো। সুখই ডিভোর্সের ভয়ে পালিয়ে এসেছিলো। সমাজে ডিভোর্সি হয়ে বেঁচে থাকবে না বলেই তো এমন কাজ করেছিলো সে। বিয়ে মানুষের জীবনে একবারই হয়। সুখের বিয়ে হয়ে গেছে ঋত্বিকের সাথে। ঋত্বিক স্ত্রী হিসেবে না মানলেও সুখ তো তাকে স্বামী রূপে গ্রহন করেছিলো। তাকে ভালোবেসেছিল। তার ভালোবাসা পাওয়ার আশায় ছটফট করেছিলো। সুখ চেয়েছিলো আমৃত্যু ঋত্বিকের স্ত্রী হয়েই বেঁচে থাকবে। আর কখনো কোন পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করবে না। তাই ঋত্বিক যতই কষ্ট দিক না কেন সুখ কখনোই ধৈর্যহারা হয়নি। কিন্তু এটাও সত্যি যে সুখ আর ফিরবে না সেখানে। যে স্থান সে একবার ত্যাগ করেছে সেখানে কখনোই ফিরবে না। সে ঋত্বিক কে ঘৃনা না করলেও এখন আর ভালো বাসে না। তার শুধু আফসোস হয়। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরোয়। কেন সে কষ্ট দেওয়া মানুষ টাকে আজও ঘৃণা করতে পারলো না!
সুখ শোয়া থেকে উঠে বসে। কি যেন একটা চিন্তা করে ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত তখন দেড়টা। বিছানা থেকপ নেমে আলমারির কাছে যায়। আলমারি খুলে একটা গোপন ড্রয়ার খুলে। ড্রয়ারটার ভেতরে ছিলো ঋত্বিকের অসংখ্য ছবি। সেখান থেকে সুখ একটা বের করে। নীল রঙের ড্রিম লাইটের আলোই দেখা যায় সেই অসম্ভব সুন্দর পুরুষের মুখ। কালো রংয়ের একটা টিশার্ট গায়ে তার। চোখে কালো সানগ্লাস। গালে হালকা হালকা চাপদাড়ি৷ সুখ মানুষটার মুখে টা ছুঁয়ে দেয়। আজ অনেকগুলো দিন পর এমন করছে সে। আগে প্রায়ই করতো এরকম। যখনই সুখের বেশি কষ্ট হতো তখন সে ঋত্বিকের ছবি বের করে দেখতো। ছুঁয়ে দিতো ছবিতে থাকা মানুষকে। সুখের চোখ গলিয়ে অশ্রু আসে। খুব সন্তর্পণে মুছে নেয় তা। কাঁদলে তো চলবে না তার। তাকে শক্ত হতে হবে। আসন্ন ঝড় মোকাবিলা করতে হবে। নাহলে হয়তো আবারও তাকে ভাঙতে আসবে নিষ্ঠুর পুরুষ। সুখ হাতের ছবিটা আগের জায়গায় রেখে দেয়। সবকিছু ঠিকঠাক করে চলে যায় বিছানায়। চোখ বন্ধ করে নেয়। বহুবছর ধরে সুখের চোখজোড়া ও বেইমানি করছে তার সাথে। চোখ বন্ধ করলেই সামনে আসে যন্ত্রণাদায়ক সৃতি। আবার সময়ে অসময়ে পর মানুষের জন্য কাঁদে। 
সুখ এপিঠ ওপিঠ করতে থাকে। ঘুম কিছুতেই আসছে না চোখের পাতায়। আহা কি নিদারুণ রাত! 
______
 সকাল ১০ টা বাজে। রিমা আর তিশা ড্রয়িংরুমে বসে টিভি সামনে রেখে মোবাইল ঘাটছে। আর সোনিয়া বাহিরে রান্নাঘরে আছে। আজ সুখের রান্নার দিন। সুখ অসুস্থ তাই সোনিয়া করে দিচ্ছে ওর কাজগুলো। সোনিয়া এমনই করে সবসময়। সুখের কাজ অর্ধেকই সে করে দেয়। সোনিয়ার মারা যাওয়া জমজ বোনটা ও তো সুখের মতোই ছিলো! 
আজ সুখ একটু দেরি করেই উঠলো। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে রুমে আসতেই, তার মনে পরে আজ তার রান্নার দিন। সে জানে সোনিয়া এতক্ষণে অর্ধেক কাজ শেষ করে ফেলেছে। তবুও সুখ রান্নাঘরে যায়। সোনিয়া তখন কাটাকুটি করছে। সুখ গিয়ে দেখে পেঁয়াজ কেটে সোনিয়ার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে অনবরত। সোনিয়ার সুন্দর মুখখানা লাল হয়ে গিয়েছে। সুখ সোনিয়ার কাছে গিয়ে বলল,
"আমাকে একটু ডাকলেই পারতি। একা একা এতো কাজ করিস তোর ও তো কষ্ট হয়।" 
সোনিয়া ফিক করে হেঁসে উঠলো। যেন সুখ কত মজার একটা জোক্স বলেছে। সোনিয়ার এহেন কান্ডে সুখ কিছুই বললো না। সে ভাবলেশহীন হয়ে তাকিয়ে থাকলো। সোনিয়া হাসি থামিয়ে বলল,
"আমার কষ্ট বুঝলে তুই আগে নিজেকে ঠিক করতিস সুখ।" 
সুখ প্রতিত্তোর করতে পারে না। সে তো জানে সোনিয়া ওকে স্বাভাবিক করার জন্য কতটা পরিশ্রম করে। আজকাল রক্তের সম্পর্ক তাই মানুষ রাখে না। আর রক্তের কোন সম্পর্ক ছাড়ায় সোনিয়া নিঃস্বার্থ ভাবে কতটা ভালোবেসেছে সুখকে। সুখ কি তার প্রতিদান দিতে পেরেছে? নিজেকে কি একটুও ঠিক করতে পেরেছে সুখ? পারেনি। তার ক্ষত গুলো যে একটু বেশিই গভীর। যা থেকে আজও মুখ ফেরাতে পারেনি সুখ। নিজ মনে এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। সোনিয়ার ততক্ষণে সব কাটাকুটি করা শেষ। সুখকে চুপ থাকতে দেখে সোনিয়া তাকায় ওর দিকে। 
"রাগ করেছিস?" 
সুখ ছোট্ট করে জবাব দেয়, 
"উহুম।" 
"ডাইনিংয়ে খাবার আছে। গিয়ে খেয়ে নে।" 
সোনিয়ার কথার তোয়াক্কা না করে সুখ ঠায় বসে রইলো। নরম কন্ঠে বলল,
"আমি রান্না করি?" 
সোনিয়া মানা করলো না। ছোট্ট করে বলল, 
"কর।" 
সোনিয়া সুখকে রেখে চলে গেল রান্নাঘর থেকে। সোনিয়ার এভাবে চলে যাওয়ায় সুখ দুঃখ পেলেও কিছু বলল না। কি বলার আছে তার? সোনিয়ার অভিমান করা তো স্বাভাবিক। কত ভাবেই না বুঝিয়েছে তাকে। কিন্তু সে-ই তো শোনেনি কোন কথা। 
সুখ এবার রান্নায় মনোনিবেশ করে। গ্যাসে কড়াই বসিয়ে সবে তেল দিয়েছে। তখনই রান্নাঘরে সোনিয়া এলো। হাতে তার খাবারের প্লেট। সে সুখের জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। কিন্তু কোন কথা অপচয় না করে সে পরোটা ছিড়ে ভাজি দিয়ে সুখের মুখের কাছে নেয়। 
গম্ভীর কন্ঠে বলল,
"হা কর।"
সুখ বাধ্য মেয়ের মতো হা করলো। এরপর আস্তে আস্তে সমস্ত খাবার টা সুখকে খাইয়ে দিলো সোনিয়া। মাঝখানে আর একটা কথাও বললো না। সুখও বললো না। খেয়েদেয়ে সুখ রান্না করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সোনিয়া ও সোখানে দাঁড়িয়ে থেকে এটা ওটা এগিয়ে দিয়ে সাহায্য করতে থাকলো। এভাবেই গড়ালো সময়। 
দুপুরে গোসল করে চারজন একসাথে নামাজ আদায় করে নিলো। অন্যদিন হলে রিমা আর তিশা নিজেদের রুমে চলো যেতো বিশ্রামের জন্য। কিন্তু আজ সোনিয়ার সারাদিন মন খারাপ দেখে ওরা সুখদের রুমেই থাকলো গল্প করার জন্য। সুখের মন অন্যান্য দিনের মতোই উদাস। সে ওদের কথায় ততটা কর্নপাত না করে শুয়ে শুয়ে আপন মনে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। সোনিয়া দুই একটা কথা বলছে ওদের সাথে। হঠাৎ ঘর কাঁপিয়ে সুখের ফোন বেজে উঠলো। এতে অবাক হলো সকলেই। কেননা সুখের ফোনে খুব একটা কল টল আসে না। এখন আবার কে কল করলো? সুখ বালিশের পাশ থেকে ফোনটা বের করলো। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলো অজানা নাম্বার। সুখ কল রিসিভ করলো না। এমনিতেও সে অচেনা নাম্বার খুব একটা রিসিভ করে না। আর সবচেয়ে বড় কথা সুখের ফোনে কলই আসে না। তা ধরবে কিভাবে? 
সুখ ফোনটা রেখে আবার আগের ন্যায় নিজ কাজে মন দিলো। আর সোনিয়া-রা ও গল্প মত্ত হলো। কিছুক্ষন পর আবারও ফোনটা বেজে উঠলো। সুখের এবার কিছুটা খটকা লাগে। সে কল রিসিভ করবে কিনা ভাবতে থাকে। ততক্ষণে কল কেটে যায়। সে হাফ ছেড়ে বাঁচে। কিন্তু আর কয়েক সেকেন্ড পরই ৩য় বারের মতো আবার কল আসে ফোনে। এবারে সুখ সহ ওরা তিনজনই বেশ বিরক্ত হয়৷ সুখ কল রিসিভ করে। হ্যালো বলতেই, ওপাশ থেকে যে কন্ঠ শুনতে পায় তাতে সুখের অন্তর আত্মা কেঁপে উঠে। সে কানের কাছ থেকে ফোন সরিয়ে স্ক্রিনের নাম্বারটার দিকে চোখ বোলায়। তখনই ওর বুকের ভেতর ধ্বক করে ওঠে। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা ফের কানের কাছে নেয়। তখনই শুনতে পায় পরিচিত সেই কন্ঠস্বরকে।
"How long do you think you can run away from me, Sukhpakhi. or should I say, Sporshiya?
Your final destination is me.
And in the end, you’ll have to come back to me."
কিছুক্ষণ থেমে আবারও বলে, 
The punishment isn’t over yet. But this time your punishment will be a little different, little girl. Ready?" 
চলবে?
গল্প : #তুমি_ছিলে_আমারই 
®️ #অহনা_রহমান

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন