ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি ছিলে আমারই

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: অহনা রহমান

(৬) 

সোনিয়া! এক আকাশ সম দুঃখ মেয়েটার মনে। সে তার বয়সের তুলনায় দ্বিগুণ ম্যাচিউর। কিছু করুন আর কঠিন পরিস্থিতি-ই তাকে এতো ম্যাচিউর বানিয়েছে। ফজরের আজান পরেছে কিছুক্ষণ আগে। সোনিয়া উঠলো। প্রথমে সুখকে ডাকলো। কয়েকবার ডাকার পর সুখ উঠলে দুজনে একসাথে নামাজ আদায় করে নিলো। নামাজের পর সুখ ঘুমালেও সোনিয়া আর ঘুমালো না। সে উঠে রান্নাঘরের দিকে গেল। কেননা আজ তার কাজের দিন। সে সমস্ত কাজকর্ম করে কোথায় যেন যাবে। তাই আর দেরি করলো না। একহাতে সবকিছ করলো। রাতের এঁটো থালাবাসন ধোঁয়া থেকে শুরু করে ঘর ঝাড় দেওয়া। সকালে নাস্তা বানানো। এমনকি দুপুরের রান্নাটা ও সে করে রেখেছে। কার জন্য রেখে যাবে? সোনিয়া জানে সুখ তার কাজগুলো করে দিবে। আর রিমা, তিশাকে বললে ও করে দিবে। কিন্তু সোনিয়া কারও ভোগান্তির কারন হতে চাই না। আর সুখকে তো সে একটু বেশিই ভালোবাসে মেয়েটার মানসিক অবস্থা ভালো না৷ এ অবস্থায় ওর জন্য এসব কাজ ফেলে রাখা সোনিয়া পছন্দ করলো না। তাই নিজেই সবকিছু করলো। 
সমস্ত কাজকাম শেষ করতে প্রায় সাড়ে আটটার মতো বেজে গেলো। সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। এরপর দ্রুত গিয়ে তৈরী হলো। সাদা রঙের একটা থ্রিপিস পড়লো মেয়েটা। ওর মায়ের আবার সাদা কালার ভিষন পছন্দের। মায়ের সাথে দেখা করতে যাবে আর এটা পড়বে না তা আবার হয় নাকি? মা যদি একটু চিনতে পারে তাকে!! সে তৈরি হয়ে তারাতাড়ি বেরিয়ে পড়ে বাসা থেকে। যাওয়ার আগে সুখকে একটা ম্যাসেজ দিয়ে যায়। 
---
সোনিয়ার বাসা থেকে বের হতে বেজে যায় প্রায় নয়টা। সে আগে থেকেই উবার বুক করে রেখেছিলো। গাড়ি ততক্ষণে নিচে চলেও এসেছে৷ সে তাড়াতাড়ি গিয়ে গাড়িতে ওঠে। আজ দীর্ঘদিন পর মায়ের সাথে দেখা করবে। মনটা কেমন আনচান করছে তার। সোনিয়ার মনে পরে চার বছর আগের কথা। সোনিয়ার একটা জমজ বোন ছিলো সাইমা নামে। একদম সুখের মতো দেখতে। টকটকে ফর্সা সুন্দর। ছিলো দারুন চঞ্চল। সারাক্ষণ বাড়ি মাথায় তুলে রাখতো। এদিকে সোনিয়া আবার ছোট থেকেই চুপচাপ স্বভাবের। তারা দুই বোন ছিলো দুই দেহে এক প্রান এমন টাইপের। সারাক্ষণ বাড়ি মাতিয়ে রাখা মেয়েটা একদিন হুট করে চলে যায়। এতদুরে চলে যায়, যতদুরে গেলে মানুষ আর কখনো ফেরত আসে না। সাইমার হঠাৎ চলে যাওয়াতে সোনিয়া ভেঙে পড়ে। তার উপর তার মা অসুস্থ। এসব কারনেই সোনিয়া বয়স ছাড়ায় বেশি ম্যাচিউর। সোনিয়া যতবার সুখের সামনে যায় ততবারই সাইমার কথা মনে পড়ে ওর। তাই তো সুখকে এতো ভালোবাসে মেয়েটা। একদম নিজের জমজ বোন সাইমার মতো।
ততক্ষনে গাড়ি পৌছায় কাঙ্খিত স্থানে। সোনিয়া গাড়ি থেকে নেমে সোনিয়া বিল পে করে তাকায় সামনের দিকে। আপনাআপনি তার বুক চিরে বেড়িয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। মনে মনে ভীত হয় সে, আজও কি তার মা চিনবে না তাকে? সোনিয়া দাঁড়িয়ে আছে, NIMH (National Institute of Mental Health and Hospital) এর সামনে। গত তিনবছর ধরে সোনিয়ার মা এখানেই আছে। সোনিয়া এগিয়ে যায় সামনের দিকে। সোনিয়া টের পাচ্ছে সে যত এগোচ্ছে তার বুক তত বেশি কাঁপছে। আজ কতদিন হবে? একমাস? না না একমাসের বেশি সময় ধরে সোনিয়া তার মায়ের কাছে আসে না। আসলে আরও তার কষ্ট হয়। তার মা তাকে চিনতে পারে না। উত্তেজিত হয়ে যায়। হাতের কাছে যা সব থাকে তা ছুঁড়ে মারে। শেষবার যখন এসেছিলো সে, তখন ওর মা ওকে আঘাত করে বসে। সে জানে তার মা অসুস্থ তবুও মনের কোথাও না কোথাও থেকে তার দারুন কষ্ট হয়। এসবের জন্যই সোনিয়া আসে না। আজ ফজরের পরে মায়ের জন্য খুব মন কেমন করছিলো তাই তো এমন তাড়াহুড়ো করে চলে এলো।
------
সুখ উঠে সোনিয়া কে পেল না। তার বদলে দেখতে পেল সোনিয়ার ম্যাসেজ। "আমি মায়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। উঠে খেয়ে নিস।" 
সোনিয়ার ম্যাসেজ পেয়ে সুখের খারাপ লাগে। প্রচন্ড খারাপ। সোনিয়ার মনে হাজার দুঃখ থাকা সত্ত্বেও সে সুখের কথা চিন্তা করতে ভোলে না। সুখের মনে অপরাধবোধ অনুভব হয়। তাকে কি এবার একটু শক্ত হওয়া উচিৎ না? আর কত? দুঃখ দেওয়া মানুষের জন্য আর কত দুঃখ পাবে সে? তার তো বোঝা উচিৎ তার জন্যও একজন মানুষ খুব ভাবে। যে মানুষটা নিজে দুঃখে জর্জরিত তাকে আরও চিন্তায় ফেলা কখনোই ঠিক না। কিছুতেই না। 
সুখ এবার মনে মনে প্রতিজ্ঞা বধ্য হয়, সে আর এমন নির্জীব থাকবে না। সে তো সস্তা নয়। তাকে শক্ত হতে হবে। সবকিছু মোকাবিলা করতে হবে। সোনিয়ার করা এতোদিনের অবদানের এইবার প্রতিদান দিতে হবে। অতীত থেকে পালালে চলবে না তাকে অতীত মোকাবিলা করতে হবে। সুখ উঠে ফ্রেশ হয়ে নেয়। এরপর খেতে যায় টেবিলে। খাবার টেবিলে দেখা হয় রিমা আর তিশার সাথে৷ ওরা কালকের ঘটনা নিয়ে রেগে আছে। তাই সুখের সাথে কথা বললো না তেমন। সুখই আগ বাড়িয়ে তিশাকে বলল,
"কিরে আজ এতো চুপচাপ আছিস যে?" 
সুখের কথা শুনে রিমা আর তিশার খাওয়া থেমে যায়। ওরা হা করে তাকিয়ে থাকে সুখের দিকে। তিশার তো কাশি উঠে যায়। রিমা ওকে সামলাতে থাকে। ওদের কান্ড দেখে সুখ অবাক হয়। মনেমনে বলে, "এরা এমন করছে কেন?" 
তখনই রিমা বলে ওঠে,
"সুখ তোর শরীর খারাপ লাগছে?" 
সুখ বলল,
"আশ্চর্য! আমি অসুস্থ হলে তোদের সাথে খেতে পারতাম?" 
সুখের এই কথা শুনে রিমারা আরও অবাক হয়। হবে না-ই বা কেন? এই দুই বছরে তাদের কোন বিষয়ে সুখ কোন বিষয়ে ভ্রুক্ষেপ করেনি। সবসময়ই মন মরা হয়ে থাকতো। আর আজ কিনা সে জিজ্ঞেস করছে, তিশা চুপচাপ কেন? 
তবে ওরা দুজন খুশিই হলো সুখের কাজে। ওরা বুঝতে পারলো মেয়েটাকে সময় দিলে ও ঠিক স্বাভাবিক হবে। এরপর রিমা আর তিশা কথা বলতে থাকে। আর সুখ টুকটাক কথা বলে। মানুষ চাইলেই তো আর একদিনে পরিবর্তন হতে পারে না। অবশ্যই সময় লাগে। সুখের ও লাগবে। খাওয়া দাওয়া শেষে সুখ সোনিয়ার হয়ে থালাবাসন ধুয়েমুছে রাখে। এরপর নিজের রুমে যায়। 
সুখ রুমে গিয়ে আলমারি খুলে। সেই গোপন ড্রয়ার টা খুলে ঋত্বিকের ছবি বের করল। খাটের উপর আয়েশ করে বসে ঋত্বিকের ছবি টা দেখতে লাগলো মন দিয়ে। একটা সময় তাচ্ছিল্য হেসে বলল, 
"আমি জানি না আপনার সাথে দেখা হওয়া কাকতালীয় নাকি আপনার পরিকল্পিত। তবে আপনি যাই করেন না কেন মি.ঋত্বিক কিয়ান খান, এই স্পর্শীয়া আর আপনাকে ভালোবাসবে না। আর কষ্ট পাবে না আপনার জন্য।" 
সুখ খিলখিল করে হেঁসে ওঠে। অতি কষ্টে মানুষ হেঁসে ও ফেলে। সুখ তার জলজ্যান্ত প্রমান। তার তো কষ্ট হচ্ছে বুকের মাঝে। তবুও কেমন হাসছে দেখো। হাসিটা কষ্টের হলেও এই প্রাণখোলা হাসি সুখ বহুকাল হাসে না। 
হাসতে হাসতেই সুখের চোখে পানি আসে। নোনাপানি গুলো মুছে সুখ আবারও হাসতে থাকে। তার মনে পড়ে বিয়ের পরের দিনের কথা,
★
খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায় সুখের। পিট পিট করে চোখ মেলে সে। চোখ খুলতেই সে হতবাক হয়ে যায়। সে ফ্লোরে আছে। আশেপাশে তাকালে বুঝতে পারে সুখ ব্যালকনির ফ্লোরে আছে। কাল সারাদিনের বিয়ের ধকল তার উপর মানসিক অশান্তি খুব ক্লান্ত ছিলো সে। এজন্য রাতে শুয়ে পড়তেই চোখের পাতায় ঘুম চলে আসে। আর এমনিতেও সুখের ঘুম অত্যন্ত গভীর। ও ঘুমালে, পাশে যদি বোমব্লাস্ট ও হয় তা-ও জাগ্রত হতে পারে না। এই জন্যই তো রাতে কখন ব্যালকনিতে এসেছে বুঝতে পারেনি। সুখ উঠে বসে। টের পায় তার সমস্ত শরীর ব্যাথা করছে। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম হয়েছিলো তার। কখনো এভাবে নিচে মাটিতে ঘুমায়নি তো। তখনই মাথায় খেলে যায় আরেকটি প্রশ্ন। সে তো ঘুমিয়েছিলো তাহলে সে ব্যালকনিতে আসলো কিভাবে? তবে কি ঋত্বিক? সুখের মনে বারবার ঋত্বিকের নাম এলেও সে ওকে নিয়ে খারাপ ভাবতে চাই না। যেভাবেই হোক না কেন বিয়েটা হয়ে গেছে। এখন আর সেটা খণ্ডানো যাবেনা। তার চেয়ে বরং মানিয়ে নিতে হবে। ঋত্বিক নিজের ভালোবাসা হারিয়েছে তার তো রাগ হবেই। সুখ মনকে বারবার বোঝায়, 
"আরে উনি এতটাও খারাপ নয় যে আমাকে একা ব্যালকনিতে রেখে যাবে। হয়তো আমি নিজেই এসেছিলাম ঘুমের মধ্যে। উনি টায়ার্ড ছিলেন তাই হয়তো ঘুমিয়ে গিয়েছেন বুঝতে পারেননি।" 
সুখ উঠে দাঁড়ায়। রুমের ভেতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই দেখতে পায় ভেতর থেকে দরজা আটকানো। সে কয়েকবার দরজা ধাক্কায়। কিন্তু লাভ হয় না। দরজা খুলে না। সুখ ভাবতে বসে এখন সে কি করবে? তার মন আবার ডেকে বলে, 
"ঋত্বিক-ই তোকে এখানে রেখে গেছে। নাহলে এই দরজা ভেতর থেকে আটকানো কেন?" 
সুখ নিজের মনের অযাচিত ভাবনা আসতে দিতে চাই না। সে একটু জোরেই চেঁচিয়ে উঠলো, 
"কেউ আছেন? দরজা খোলেন। আমি এখানে আছি।" 
ভেতর থেকে কেউ সাড়াশব্দ দেয় না। সুখ বারবার ডাকতে থাকে এভাবে। একপর্যায়ে সে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে৷ তার কষ্ট হয়। দমবন্ধ করা অনুভূতি হয়। মাকে মিস করতে থাকে সে। আজ মা না থাকার জন্যই তার কপালে এমন দুর্ভোগ। এভাবে সময় গড়িয়ে যায়। সুখ কিছুক্ষণ পরপরই ডাকতে থাকে। ঘন্টাখানেক পরে ঋত্বিক দরজা খুলে। সুখ তখন নিচেই বসে ছিলো। পরনের শাড়ি টা এলোমেলো হয়ে আছে। সুন্দর মসৃণ কোমড় অনেকটাই দৃশ্যমান। হাঁটুর কাছাকাছি শাড়ি উঠে গেছে। সে তো খেয়ালই করেনি। ঋত্বিক দরজা খুলেই ধমকে ওঠে,
"তোর এই শরীর দেখানোর জন্য দরজা খুলতে বলছিস?" 
হঠাৎ ঋত্বিকের এহেন কথায় তাজ্জব বনে যায় সুখ। সে ভাঙা কন্ঠে বলল,
"এসব কি বলছেন? আর আমি এখানে কেন?" 
ঋত্বিক সুখের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছিলো তৎক্ষনাৎ। সুখের কথার প্রতিত্তোরে সে অন্যদিকে ফিরে বলে,
"নির্লজ্জ! শাড়ি না পরে থাকলেই বেশি ভালো দেখাতো৷ আচ্ছা একটা কথা বলতো? তোর এই শরীরের ক্ষুধা মেটাতে অন্য কাউকে পেলি না? আজকাল তো বাজারে অনেক কিছুই পাওয়া যায়। সেগুলো ট্রায় করতি।" 
সুখ লজ্জায় মাথা তুলতে পারে না। তার এতক্ষণে খেয়াল হয় শাড়ির অবস্থা। সে দ্রুত শাড়ি টেনেটুনে ঠিক করে নেয়। কান্না রা সব দলা পাকিয়ে আসছে। কিন্তু সে ঋত্বিকের সামনে কেঁদে উপহাসের পাত্রি হতে চাই না। ধরা গলায় বলে,
"আমি খেয়াল করিনি।" 
ঋত্বিক কথা না বাড়িয়ে দরজা ছেড়ে দাঁড়ায়। সুখ দ্রুত উঠে রুমে চলে আসে। লাগেজ খুলে একটা লাল থ্রিপিস বের করে ওয়াশ রুমে ঢুকে পড়ে। এরপর কাঁদতে থাকে প্রান খুলে। 
★
সুখের চোখে পানি আসে। সেগুলো মুছে নিয়ে বলে,
"আমি চরিত্রহীনা ছিলাম না ঋত্বিক। আপন মানুষদের থেকে বাঁচতে আপনাকে বিয়ে করেছিলাম। আর ওই একটা ভুলই আমার জীবনটাকে তচনচ করে দিয়েছে।" 
চলবে? 
গল্প: #তুমি_ছিলে_আমারই 
#অহনা_রহমান

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন