ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি ছিলে আমারই

৮ম পর্ব

লেখক: অহনা রহমান

(৮) 

রাতের বেলা। খেয়েদেয়ে চারজন গল্প করছে। গল্প বলতে সোনিয়ার মায়ের ব্যাপারে কথাবার্তা বলছে। কি অবস্থা ওনার, আগের চেয়ে অবনতি হয়েছে কি'না এসব আরকি। সোনিয়ার আজ মন খারাপ। আর সুখ তো বরাবরের মতোই চুপচাপ। সে ইচ্ছে হলে কথা বলছে না হলে বলছে না। 
সোনিয়ার কপালে আঘাত লেগেছিলো তখন। জায়গাটা ফুলে আছে। এজন্য মাথা টাও ব্যাথা করছে তার। ফজরের আজানে উঠছে আর এখনো দুই চোখের পাতা এক করতে পারেনি। ঘুম-ও আসছে অনেক। ওদিকে রিমা আর তিশা দুজন বকবক করছে। এখন তাদের কথা বলার বিষয়বস্তু হলো, কালকে তাদের ভার্সিটির প্রথমদিন। ঢাকার এক নামক প্রাইভেট ভার্সিটির ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছে চারজন। এই নিয়ে রিমা আর তিশা দুজন দারুন এক্সাইটেড। খুশিতে একপ্রকার আত্মহারা তারা। সুখ নির্বিঘ্নে ফোন টিপছে। আর সোনিয়া কাঁথা গায়ে শুয়ে আছে। রিমা আর তিশা ওদের মতো গল্প করছে। কিছুক্ষণ পর তিশা সুখকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"আচ্ছা সুখ, এখন তো ভার্সিটিতে পড়বো আমরা। কত কত ছেলে প্রপোজ পরবে। প্রেম করবি তো? নাকি এখনো আগের মতো সন্নাসী হয়ে থাকবি।" 
তিশার কথা শুনে সুখ যেন আকাশ থেকে পড়লো। এটা কেমন প্রশ্ন হলো? সে তো ম্যারিড। অতীতের সমস্ত কিছু ভুলে গেলেও এটা কখনো অস্বীকার করা সম্ভব নয়। আর তার যেহেতু বিয়ে হশো গেছে তাই অন্য সম্পর্কে জড়ানোর কথা ভাবাও পাপ। ভয়ংকর অন্যায়৷ কিন্তু একথা ওদের ও বলা যাবে না। সুখ তাই সম্পুর্ন কথাটা ইগনোর করে বলল,
"আগে ভার্সিটিতে তো যায়। তারপর দেখা যাবে।" 
সোনিয়ার এম্নেই মন মেজাজ ভালো না। তার উপর এমন খোঁচা মারা কথা শুনে ওর বেজায় রাগ হলো। তিশা আরও কিছু বলবে তার আগেই সোনিয়া বলল,
"আচ্ছা তোর কি লাইফে বিয়ে আর প্রেম ছাড়া কোন চিন্তা নেই?" 
তিশা কথাটা হাওয়ায় উড়িয়ে দেওয়ার মতো করে বলল,
"কি বলছিস ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাববো না? বিয়ে-ই তো হলো ভবিষ্যৎ আর তা নিয়ে আমি সর্বদা চিন্তিত থাকি। তোরা এসব বলে আমাকে এভাবে পথভ্রষ্ট করতে পারিস না!" 
সোনিয়া কিছু বলতে যাবে তার আগে সুখের ফোনে কল এলো। ফোন ওর হাতেই ছিলো। স্ক্রিনে থাকা নাম্বার দেখে মেয়েটা আৎকে উঠলো। এটা..? এটা আরকের নাম্বার!! সুখ ফোন রিসিভ করলো না। বরং কেটে দিলো। সোনিয়া হয়তো কিছু আঁচ করতে পেরেছে কিন্তু রিমা আর তিশা ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। রিমা বলল,
"কি হলো কে কল করেছে?" 
সুখ কিছু বলবে তার আগে আবারও কল এলো। এখন যদি সে কল কেটে দেয় তাহলে রিমারা অন্যকিছু ভাবতে পারে। তাই সুখ কল রিসিভ করলো। কিছু বললো না। ওপাশের মানুষটাও চুপ থাকলো কিয়ৎক্ষন। হয়তো উষ্ণ নিশ্বাসের শব্দ শুনছিলো। সুখ বিরক্ত হলো। এ কোন নাটক? কল দিয়ে কথা বলে না। সুখ মানুষটাকে চিনতে পেরেছে ঠিকই কিন্তু তা প্রকাশ করলো না। শেষে সে নিজেই বলে উঠলো, 
"কে বলছেন?" 
সুখের কথা শুনে ওপাশের লোকটা শব্দ করে হাসলো। একটা সময় ছিলো যখন সুখ খুব চাইতো লোকটা হাসুক আর ও তা মন ভরে দেখবে। লোকটা ওকে কষ্ট দিয়ে হলেও হাসুক। এই হাসি টা সুখের বড়ো প্রিয় ছিলো। কিন্তু আজ? আজ কেমন যেন অনুভূতি গুলো সব ফিকে হয়ে গেছে। আরও কেমন বিরক্ত লাগছে ওর। সুখ অধৈর্য হয়ে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,
"কে বলছেন? আর আমাকে কল করে হাসছেন কেন? আশ্চর্য!" 
সুখের কথা শুনে রিমা আর তিশা তাজ্জব বনে গেল। ওরা তো এসবের কিছুই বুঝতে পারছে না। দুজন পালাক্রমে একবার সুখের দিকে তাকাচ্ছে আবার নিজেদের দিকে তাকাচ্ছে। এদিকে সুখের মুখে বিরক্তের ছাপ আরও গাড় হলো। বিরক্ত পরিনত হলো রাগে। রেগেমেগে কিছু বলতেই যাবে তার আগে ওপাশ থেকে আরকে বলল,
 "Baby, baby, cool down. Don’t get angry now, hmm? The big surprise is still waiting! Are you ready little baby?" 
সুখের বুক কাঁপতে লাগলো অস্বাভাবিক ভাবে। ওর মনে হলো ও হয়তো এখনই স্ট্রোক করবে। হাত পা ও অসাড় হতে শুরু করলো। কন্ঠনালী থেকে একটা শব্দ ও আর বের হতে চাইলো না। সোনিয়া উঠে বসলো। সুখকে শক্ত রাখতে ওর হাত চেপে ধরলো। এদিকে এখানে কি হচ্ছে না হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না রিমা তিশা। ওদের কৌতূহল বাড়ছে বৈকি। সুখকে জানার জন্য মনে জাগছে নানা রকম প্রশ্ন। কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি সামাল দিতে সুখ তেজী স্বরে বলে উঠলো,
"স্যরি রং নাম্বারে কল করেছেন। আপনি যাকে ফোন করেছেন সে আমি নই। প্লিজ আর কল দিয়ে বিরক্ত করবেন না।" 
ঋত্বিক এবার আরও জোরে হেঁসে উঠলো। কেমন ঘোরলাগা কন্ঠে বলল,
"Easy there baby... don’t lose your temper just yet. Baby… I’ve kept a sweet punishment just for you — it’s called love. Yea it’s called love. 
 তুমি অলরেডি আমার ঘৃণা দেখেছো, ভালোবাসা দেখবে না?
And trust me baby, my love is far more dangerous." 
    
একনাগাড়ে এতো কথা বলে কল কেটে দিলো ঋত্বিক। সুখের অবস্থা তখন নাজেহাল। ওর মাথায় কিছুতেই আসছে না, দুইবছর পরে ঋত্বিক কেন এলো ওর জীবনে? কি চাই সে? কেনই বা বললো ভালোবাসার কথা? সুখ কান্না আটকে রাখতে পারে না। সোনিয়া কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো হাউমাউ করে। সোনিয়া সুখের কান্না দেখে ঢের বুঝলো কিছু একটা হয়েছে। তাই ও তিশা আর রিমা কে ইশারায় ওদের রুমে যেতে বলল। 
ওরা দুজন কষ্ট পেলেও চলে গেল। কেননা সুখ কান্না করছে। হ্যাঁ তারা দুজন একটু পেছনে কথা বলে তাই বলে এই নয় যে তারা সুখের ক্ষতি চাই। ওরা আর কথা না বাড়িয়ে চলে গেল। ওরা চলে যেতেই সোনিয়া সুখকে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে,
" কি হয়েছে পাখি? কে ফোন করেছিলো?" 
সুখের তখন কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেছে। তবুও ও ভাঙা কন্ঠে বলল, 
"কেন আমি ভালো থাকতে পারি না? যখনই ভাবি সব ভুলে নতুন করে শুরু করবো। তখনই কেন ভাঙা হয় আমাকে? আমি ও তো মানুষ, আমারও তো কষ্ট হয়।" 
সোনিয়া একের পর এক স্বান্তনার বাণী ছুড়তে লাগলো। কিন্তু কোন লাভ হচ্ছে না। তার বড্ড কষ্ট হচ্ছে। সে তো কোন পুতুল নয় যে যখন ইচ্ছে ছুঁড়ে ফেলবে আবার যখন ইচ্ছে কাছে নিতে চাইবে। কেন সে এমন ভেসে বেড়াচ্ছে মাঝ নদীতে যেমন কচুরিপানা ভাসে? হঠাৎ সুখের তার মায়ের কথা মনে পড়লো। হ্যাঁ হ্যাঁ! মা মরার পর থেকেই তো দুর্ভোগ শুরু। সুখ হাহাকার করে কাঁদতে লাগলো আর বললো, 
"আম্মু তুমি চলে যাওয়ার পর থেকে আমি আর ভালো থাকিনি। তুমি চলে গেলে সাথে আমার ভালো থাকাটা ও নিয়ে গেলে? কেন চলে গেলে আম্মু?" 
সুখের এমন কান্না দেখে সোনিয়া ও চোখের পানি ধরে রাখতে পারে না। আসলেই তো, মা হারা রা বোঝে মা না থাকার যন্ত্রণা। মা ছাড়া এই দুনিয়ায় আপন কেউ নেই, তা মা হারানোর পরেই বোঝা যায়। দুই টা মেয়ে। একজনের মা দুনিয়াতেই নেই অন্যজনের মা দুনিয়ায় থেকেও নেই। অথচ তাদের দুজনেরই এখন একটু যত্নের প্রয়োজন। মাকে প্রয়োজন। 
_______
ঢাকার সকালটা আজ অন্যরকম মনে হচ্ছে কেমন যেন। ধীরে উঠে আসা রোদ আর হালকা গরম বাতাস সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করছে তিশা আর রিমার মাঝে। তাদের জন্য শহরের প্রতিটি রাস্তা যেন নতুন দিনের উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়েছে।
আজ তাদের জীবনের সবচেয়ে প্রত্যাশিত দিন। শুধু ওদের দুজনের না। চার বন্ধু - সুখ, সোনিয়া, রিমা আর তিশা। স্কুল কলেজের দিন ফুরিয়ে, আজ তারা ঢাকার North South University এর নতুন ফ্রেশার। NSU এর ক্যাম্পাসটি ধানমণ্ডি ও গুলশানের মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থিত। ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় একপাশে লন আর ছায়া দিচ্ছে বড় গাছগুলো।
মধ্যবর্তী পথটি সিঁড়ি দিয়ে নীচে যায়, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা হেটে চলেছে, কেউ ব্যাগ কাঁধে, কেউ হাতে কফি। ডান পাশে Academic Block 1 এর কাঁচের বিল্ডিং, যেখানে প্রথম দিনের ওরিয়েন্টেশন এবং ক্লাস হবে। ভিতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ে Library, Cafeteria, Computer Lab, আর সামনে ছোট একটি খেলার মাঠ। দেয়ালে রঙিন পোস্টার— “Welcome Freshers – Spring 2020"
সবকিছু মিলিয়ে পরিবেশে একটা নতুন দিনের উচ্ছ্বাস। 
ওরা চারজন একসাথে গাড়ি থেকে নামল। সোনিয়া আর সুখ বরাবরে মতোই চুপ। আর রিমা আর তিশার ঠোঁট থেকে হাসিই সরছে না৷ দু'জনই দারুন এক্সাইটেড। তিশা রিমাকে বারবার খোঁচাচ্ছে আর বলছে,
 "দেখ ভাই মনে হচ্ছে সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আচ্ছা আমারে কেমন লাগছে বলতো?" 
রিমা আজ ভিষন আত্মবিশ্বাসী সে লম্বা চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলল,
"তোর কথা ছাড়, আমাকে কেমন লাগছে তাই বল।" 
"তুই আগে বল। আমাকে কেমন লাগছে?" 
"তুই বল।" 
"তুই বল।" 
ওরা দুইজন তর্কাতর্কি শুরু করে দিলো। সোনিয়া আর সুখ বিরক্ত হলো কিছুটা। কিন্তু কিছু বললো না। অবশ্য এদের বলেও লাভ নাই। 
এরপর তারা একসাথে মূল ফটক পেরিয়ে Academic Block 1–এ প্রবেশ করল। রিমা আর তিশা নেচে-কুঁদে হাঁটতে লাগলো। সোনিয়া রেগে তিশাকে বলল, 
"ভাই এটা তোর বেয়ায় বাড়ি না। এভাবে নেচে-কুঁদে চলার কি আছে?" 
ওরা দুজন মুখ গম্ভীর করে তাকালো সোনিয়ার দিকে। সোনিয়া সেসব তোয়াক্কা করলো না। তিশা আর রিমাকে বলল,
"ভাই তোরা আগে হাঁট। আমরা আসছি তোদের পেছনে।" 
তিশা মুখ ঝামটি মারলো। রিমার হাত ধরে নিয়ে টেনে চলে গেল। সোনিয়া আর সুখ মাথায় হিজাব করে আসলেও ওরা দুজন ওরনা ও পড়লো না। ব্যবহারই কেমন উগ্র টাইপের। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে Lecture Hall 405 এ প্রবেশ করল তারা। ক্লাসে ইতিমধ্যে প্রায় চল্লিশজন বসে। রিমা আর তিশা আগে গিয়ে বসলো পাশাপাশি। ওদের থেকে দুরত্ব বজায় রাখলো সুখরা। দেখা গেল কোন ক্লাসমেইট এর সাথে ফ্লার্ট করতে শুরু করলো। শেষে ওদের পাশে মানসম্মান যাবে সুখদের। এসব ভেবে ওরা সবার পেছনে গিয়ে বসলো। কিছুক্ষণ পর ক্লাসে স্যার এলো। সবাই দাঁড়িয়ে গেলেও সুখরা তখন গল্পে মজে ছিলো তাই খেয়ালই করলো না কে এসেছে। 
হঠাৎ একটা চেনা কন্ঠ তার কানে বাজলো। তড়িৎ সামনে তাকালো সে। সাদা শার্ট, কালো টাই ও কালো ব্লেজার পরিহিত ঋত্বিক কিয়ান খান হেঁসে হেঁসে কথা বলছে। তিনি বলেছেন, 
"Good Morning. How is everyone? I'am Mr. Kritik kiyan khan. I’m going to start teaching you English Composition from today.  
চোখের সামনে এসব দেখে সুখের দমবন্ধ হয়ে এলো। চোখগুলো ও যেন খুলে চলে আসবে। মাথার ভেতর চক্কর দিয়ে উঠলো আচমকাই। চোখের সামনে সব ঝাপ্সা হয়ে এলো ধীরে ধীরে। 
    
চলবে? 
গল্প : #তুমি_ছিলে_আমারই 
#অহনা_রহমান

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন