ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি ছিলে আমারই

১৩তম পর্ব

লেখক: অহনা রহমান

(১৩) 

"তুমি কি এটা চাচ্ছো যে আমি তোমার আসল পরিচয় দিয়ে দিই? মিসেস ঋত্বিক কিয়ান খান!" 
"আপনি কি আমাকে হুমকি দেওয়ার চেষ্টা করছেন?" 
"এখানে চেষ্টার কি আছে? আমি তো হুমকিই দিচ্ছি। আমার সাথে কথা বলো। নাহলে সবাই কে বলে দেবো তুমি আমার কি হও।" 
ঋত্বিকের কথায় সুখের গা জ্বলে উঠলো। হাতের ফোনটা একবার ছুঁড়ে মারতে চাইলো। কিন্তু বহুকষ্টে নিজের রাগ সংবরণ করে নিলো সে। কেননা ঋত্বিক যদি সত্যি একাজ করে, তাহলে এরচেয়ে ও বেশি অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হবে সুখকে। এজন্য সে নিজেকে ধাতস্থ করে লিখলো,
"আচ্ছা আপনি কি বুঝতে পারছেন না,আমি বিরক্ত হচ্ছি আপনার সাথে কথা বলতে। " 
"তুমি কি আমাদের বিয়ের সময়ে জানতে না, আমি বিয়ে করতে চাই না? তারপর যখন আমার সাথে সংসার করলে, তখন কি জানতে না তোমার সবকিছু তে আমি বিরক্ত হচ্ছিলাম।"
সুখ জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকলো। নিজেকে কিছুতেই আর কন্ট্রোল করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু এটা ভার্সিটি প্রাঙ্গন। এখানে ফোন ছুঁড়ে মেরে বা কান্নাকাটি করে নিজেকে হাসির খোরাক বানাতে চাই না সুখ। এই পর্যন্ত পাঁচটা নম্বর ব্লক করেছে ঋত্বিকের। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। পুনরায় নতুন কোনো নাম্বার দিয়ে বিরক্ত করছে ওকে। শেষে এই সমস্যার সমাধান করতে সুখ ঋত্বিকের সাথে কথা বলছে। 
"কি চাইছেন আপনি? কেন করছেন এরকম?"
"সত্যি বলবো?" 
সুখের আবার মেজাজ চটলো। এখন কি মিথ্যা বলার সময়? আশ্চর্য! 
"হুম।" 
"তাহলে আবার জিজ্ঞেস করো।"
"কি জিজ্ঞেস করবো?" 
"কি চাই আমি?" 
ক্যাম্পাসে একটা মাঠের মধ্যে বসা ছিলো সোনিয়া আর সুখ। সোনিয়া খাবার খাচ্ছে। আর সুখ ঋত্বিকের সাথে কথা বলছিলো ম্যাসেজে। তিশা আর রিমা ভার্সিটি ঘুরে দেখছে। ঋত্বিকের এমন কথায় নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারলো না সুখ। আচমকা আক্রমণ করলো সোনিয়ার উপর। সোনিয়ার হাতে খামচি মেরে বলল,
"সোনিয়ার বাচ্চা ওরে চুপ করতে বল কিন্তু।" 
সুখের হঠাৎ এমন কান্ডে হকচকিয়ে উঠল সোনিয়া। সাথে তাজ্জব বনে গেল। সুখের থেকে হাত ছাড়িয়ে বলল,
"ভাই তুই তো আমাকে মেরে ফেলছিলি। কি হয়েছে সেটা বল।" 
সুখ কিছু না বলে ফোনটা সোনিয়ার দিকে ছুঁড়ে মারলো। সোনিয়া একেক করে ঋত্বিক আর সুখের ম্যাসেজ গুলে দেখলো। সবশেষে বলল,
"ব্লক করে দে নাম্বার।" 
সুখ বলল,
"এই পর্যন্ত পাঁচ টা দিয়েছি।" 
"আবার দে।" 
সোনিয়ার কথা শুনে সুখ ঋত্বিকের নাম্বার ব্লকলিস্টে যুক্ত করলো সাথে সাথে। এরপর ফোঁস করে একটা তপ্ত শ্বাস ফেলল। সোনিয়াকে বলল,
"চল এখানে আর ভালো লাগছে না। বাসায় যায়। সে কি? ক্লাস তো এখনো রয়েছে। আর রিমা তিশা ও কোথায় গিয়েছে জানি না।" 
সুখের উত্তর দেওয়ার আগেই ওর ফোনে আবার আননোন নাম্বার থেকে ম্যাসেজ এলো।
"শোনো না সুখপাখি। তোমাকে ডিস্টার্ব করতে ৩০০ খানা সিমকার্ড কিনেছি। কয়টা নাম্বার ব্লাকলিস্টে ফেলবে শুনি?" 
সুখ সোনিয়ার উপর রাগ ঝাড়তে লাগলো। কানের কাছে চেঁচিয়ে বলল,
"সোনিয়ার বাচ্চা আমার কিন্তু আর ধৈর্য কুলাচ্ছে না। ওকে কিন্তু নিষেধ কর। বহুকষ্টে নিজেকে সামলিয়েছি আমি৷ এখন আবার ক্ষত গুলোতে আঘাত করতে নিষেধ কর।" 
সোনিয়া দুহাতে কান চেপে ধরে বলল,
"বাসায় যাওয়ার আগে কানের ডাক্তার দেখাতে হবে দেখছি। আচ্ছা তুই ওনার সাথে শান্ত হয়ে কথা বলে দেখ কি বলে। কি চাইছে।" 
এরইমাঝে আবার ম্যাসেজ এলো।
"তোমাকে রাগলে যে এতো সুন্দর লাগে আগে তো দেখিনি।" 
"কি চাইছেন আপনি?" 
"আচ্ছা এইবার বলেই ফেলি, কি চাইছি।" 
"হ্যাঁ বলুন। বলে আমাকে উদ্ধার করুন।" 
"প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছি আমি।" 
"দুই বছর অত্যাচার করে প্রতিশোধ নেওয়া হয়নি বুঝি?" 
ঋত্বিক ম্যাসেজের আর উত্তর দিলো না। তার কেবিনের জানালা দিয়ে দেখতে লাগলো সুখকে। এরপর আনমনেই বলল,
"ঘৃনা আর ভালোবাসার মধ্যে পার্থক্য বোঝো তো সুখপাখি?" 
------
বাকি ক্লাস শেষ করে সুখদের বাসায় ফিরতে ফিরতে বেজে গেল ২ টা। বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া করে নিলো সবাই। সুখ খেলো না। ওরা বারবার বলার পরও খেলো না সুখ। বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে। তার ভালো লাগছে না কিছুই। হঠাৎ করে ঋত্বিকের তার জীবনে ফিরে আসা, এটা মোটেও মানতে পারছে না সুখ। সুখ পাশে থাকা অবহেলিত ফোনটা হাতে নিলো। কিছু একটা ভেবে কললিস্টে গিয়ে একটা নাম্বারে কল করলো সে। কয়েকবার রিং হওয়ার পর কল রিসিভ করলেন ওপাশের মানুষটা। 
"আসসালামু আলাইকুম আব্বু।" 
ওপাশের মানুষ টা নরম গলায় বললেন,
"ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছিস মা?" 
"এই তো ভালো। আব্বু আপনি কেমন আছেন?" 
"এই তো ভালো। ঋত্বিক আর কিছু বলেছে নাকি?" 
এরপর সুখ সবটা খুলে বলল রেজাউল খানকে। সবকিছু শুনে রেজাউল খান বললেন,
"শোন মা, তুই এসবে পাত্তা দিস না। কয়েক বছর আগে তোকে একটা বলেছিলাম মনে আছে? বলেছিলাম, এখন সময় ঋত্বিকের তুই ধৈর্য ধর তোর ও একদিন এরকম সময় আসবে। তোর সেই সময় চলে এসেছে মা। এখন আমি সবটা তোর উপর ছেড়ে দিলাম।" 
"কিন্তু আব্বু, এসব কারনে আমি অনেক ডিস্টার্ব হয়ে আছি৷ আমি এখনো আগের ট্টমা থেকে বের হতে পারিনি৷ এখন আমি কি করবো? কি করতে পারি? কি করার আছে এখানে?" 
"ও তোকে বলেছে না, প্রতিশোধ নিতে চাই?"
"হুম।" 
"প্রতিশোধ তুই নিবি এখন। ও যা যা করেছে তোর সাথে, সেসবের প্রতিশোধ নেওয়ার সময় এসে গেছে। পরে ঋত্বিক যদি তোর যোগ্য হয়, তবে আমি নিজে তোদের মিলিয়ে দেবো। কিন্তু তার আগে তুই কখনো নরম হোস না। এখন তোকে শক্ত হতে হবে, মন শক্ত করতে হবে।" 
"কিন্তু....!" 
"কোনো কিন্তু নয়। আমি যা বলেছি তাই শোন। ওকে পাত্তা দিস না। ও যেটা করেছে সব ফিরিয়ে দিবি এখন। নাহলে কিন্তু মা আমি হেরে যাবো। তোকে ঢাকায় পাঠিয়েছি শুধুমাত্র ওকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। ওর অহংকার, দম্ভ চুর্ণ করার জন্য । ও দুই বছরে কষ্ট পেয়েছে, তুই ও পেয়েছিস। শোধবোধ! এখন আগে যেগুলো করেছে সেগুলো ফিরিয়ে দিতে হবে।" 
"আচ্ছা আব্বু।" 
"আচ্ছা রাখি তবে। তোর কোন টেনশন নেই মা৷ আমি আছি তোর সাথে, তোর আম্মু আছে।" 
কল কেটে গেল৷ সুখ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। তার ভালো লাগছে না কিছুই। তার অবস্থা এখন এমন, এমন খাবার সে মুখে দিয়েছে। না পারছে ফেলতে, না পারছে গিলতে। 
-------
"আচ্ছা সুখ, আরকে স্যার কে কি তুই চিনিস?" 
তিশার এমন প্রশ্নে আৎকে উঠলো সুখ। সোনিয়া হলো অবাক। সুখ ব্যাতিত কেউই ওইসময় ঋত্বিকের কথাটা খেয়াল করেনি। 
সুখ কাঁপা কন্ঠে বলল, 
"কি বলছিস এসব? আমি কিভাবে চিনবো স্যারকে?" 
"না মানে, আমার কেন যেন মনে হলো, ওই সময় স্যার তোকে মিসেস না যেন কি একটা বলেছে।"
সুখ কি বলবে বুঝতে পারছে না। সে নিজের ভেতরের ভয় উত্তেজনা লুকিয়ে বলল,
"আরে ভুল শুনেছিস তুই। কই আমি তো এসব শুনিনি।" 
তিশা কিছুক্ষণ ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সুখের দিকে। সে স্পষ্ট শোনেনি কথাটা। সোনিয়া প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল,
"কিরে? আমরা তো শুনলাম না। তুই মনে হচ্ছে একটু বেশিই খেয়াল করছিস স্যারকে।" 
সোনিয়ার কথা শুনে তিশা লজ্জা পেল। ও একবার ভাবলো, সবাইকে বলে দিবে ওর পছন্দের কথা। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলো, এখনই সব বলা যাবে না। আর কিছুদিন যাক তারপর বলবে। তিশা নিজেই এখন প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলো। সে বলল,
"চল বিকেলে ঘুরে আসি কোথাও থেকে।" 
রিমা বলল,
"কোথায় যাবি?" 
"চল কোন রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে আসি।" 
তিশার কথায় সবাই সায় জানালো। সুখও যেতে চাইলো। আর কতকাল ঘরকুনো থাকবে। সে মেনে নিয়েছে রেজাউল খানের কথা। সে ঋত্বিকের কাছ থেকে প্রতিশোধ নেবে। সব হিসাব কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নেবে সে। আর তার জন্য নিজেকে পরিবর্তন করা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।  
-------
সন্ধ্যার দিকে চার বান্ধবী বেরুলো একটা নামি-দামি রেস্টুরেন্টের উদ্দেশ্যে। রেস্টুরেন্টে পৌঁছিয়ে খাবার অর্ডার করে চারজন বসে গল্প করতে লাগলো। হঠাৎ তিশা সোনিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"একটু ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকা তো।" 
তিশার কথা শুনে সোনিয়া কিছু না ভেবে হালকা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো। মুহুর্তেই অবাক হলো সে। শৈল বসে। ঠোঁটে সিগারেট গোঁজা । একদৃষ্টিতে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। নিরলস ভঙ্গিতে। চারপাশের কোন কিছুই যেন শৈলের চোখে পড়ছে না। সে শুধু সোনিয়াকে দেখে যাচ্ছে। প্রথম দফায় সোনিয়া অবাক হলেও পরমুহূর্তে নিজেকে ঠিক করে জোরপুর্বক মুচকি হাসলো সে। শৈলর মাঝে কোন পরিবর্তন দেখা গেল না সোনিয়ার হাসিতে। সে তাকিয়েই থাকলো অপলক হয়ে। ঠোঁটে গুঁজে রাখা সিগারেট টা হাতে নিয়ে একটান দিলো। 
সোনিয়া বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না সেদিকে। অস্বস্তিতে হাত পা অসাড় হয়ে আসছে তার। সামনে বান্ধবীদের দিকে তাকিয়ে আরও বেশি লজ্জা পেল মেয়েটা। সবগুলো কেমন অস্বাভাবিক ভাবে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সোনিয়া বোকা হেঁসে বলল,
"উনি হলেন শৈল। সেদিন আম্মুর হসপিটালে দেখা হয়েছিলো।" 
সুখ, তিশা, রিমা সবাই একত্রে বলে উঠলো, 
"হ্যাঁ হ্যাঁ। বুঝেছি। তারপর? তারপর?" 
সোনিয়ার ভিষন অস্বস্তি হলো। পাশে ফিরে দেখলো শৈল এখনো ওর দিকে তাকিয়ে আছে। এবার সোনিয়া সাহস সঞ্চয় করে বলল,
"কেমন আছেন শৈল? কিছু বলবেন?" 
শৈল দুপাশে মাথা নাড়লো। সে কিছু বলতে চাই না। এতক্ষণে তার যেন টনক নড়লো। সে বুঝলো এতক্ষণযাবত কি করেছে সে। এতে লজ্জিত হলো সে। আর কিছু না বলে সামনে ওর বন্ধুদের সাথে আড্ডায় যুক্ত হলো। 
চলবে? 
গল্প : #তুমি_ছিলে_আমারই
®️ #অহনা_রহমান

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন