(১৯)
"আর যদি না যায়?"
"সুখ আমি কিন্তু সিরিয়াস। আমি সত্যিই কিন্তু আসবো ওখানে।"
সুখ বিরক্তিতে 'চ' শব্দ করলো। একবার তাকালো ঋত্বিকের দিকে। সে এখনো জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সুখের দিকে তাকিয়ে। সুখ তাকাতেই হাত দিয়ে ইশারা করলো, সে আসছে। সুখ কয়েক সেকেন্ড ভাবলো। এখন যদি ঋত্বিক আসে এখানে, ব্যাপারটা মোটেও ভালো হবে না। সুখ বলল,
"ওকে পাঁচ মিনিট সময় দিন আসছি।"
"পাঁচ মিনিট নয়, পাঁচ সেকেন্ড। "
"এই যে শুনুন, আমি আপনার কাছে বাঁধা নই। আপনি যা বলবেন সেটাই আমাকে শুনতে হবে।"
ঋত্বিকের কথার টোন পাল্টে গেল মুহুর্তেই। সে নরম কন্ঠে বলল,
"কিন্তু আমি তো তোমার কাছে বাঁধা। তুমি আমার বিয়ে করা বউ। তোমাকে ছাড়া যে আমার চলবে না সোনা।"
সুখ কেশে উঠলো। বিষম খেলো। একনাগাড়ে কাশতেই লাগলো। উপর থেকে সুখের অবস্থা দেখে ঋত্বিক বাঁকা হাসলো। কিছুক্ষণ পরই আবার চোয়াল শক্ত হলো। কেননা, সুখের কাশি দেখে আশিক পানির বোতল এগিয়ে দিয়েছে ওর দিকে। আর সুখ ঝোঁকের বসে সেটা গ্রহনও করেছে। ঋত্বিকের মেজাজ খারাপ হলো। এই মেয়েটা কি বুঝতে পারছে না কিছু?
সুখ পানি খেয়ে খানিকটা শান্ত হলো। আশিককে সৌজন্যমুলক ধন্যবাদ দিয়ে আবার তাকালো দোতলায়। জানালার কাছে ঋত্বিক নেই। সুখের আর বুঝতে বাকি রইলো না, ঋত্বিক সত্যি আসছে এখানে। সুখ এক মুহুর্ত ও বসে থাকলো না। আশিককে বোকা বানিয়ে রেখে ও উঠেই এক দৌড় লাগালো ভবনের দিকে। আশিক তাজ্জব বনে তাকিয়ে রইলো সুখের যাওয়ার পানে।
সুখ সর্বশক্তি দিয়ে দৌড়াচ্ছে সিঁড়ি দিয়ে। একতলার মাঝামাঝি সিঁড়িতে হঠাৎ ধাক্কা লাগে একজনের সাথে। সুখ পড়ে যেতে নেই। কিন্তু মানুষ টা খুব যত্নে ধরে নেই ওকে। আগলে নেই নিজের বুকের মাঝে। সবকিছু এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল যে সুখ কিছু বুঝে উঠতেই পারলো না। কয়েক সেকেন্ড পর তার খেয়াল হতেই সে সরে যায় মানুষটার কাছ থেকে। চোখ তুলে তাকায় সামনের দিকে। ঋত্বিক কে সামনে দেখে সুখের অন্তর কেঁপে উঠলো তখনই। সে কিছু না বলে, ঋত্বিককে পাশ কাটিয়ে চলে গেল ক্লাসরুমের দিকে। ঋত্বিক কে যেন মানুষ বলেই গন্য করলো না সুখ। বেচারা ঋত্বিক সেদিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলল। কি আর করার! বউ এখন প্রতিশোধ নিচ্ছে। যা করবে সহ্য করে নিতে হবে। তাছাড়া আর উপায় নেই।
ক্লাসরুমে গিয়ে সুখ আর সোনিয়া যেখানে বসে, সেখানেই বসলো সুখ। একদম পিছনে।
ওকে দেখে রিমা আর তিশা অবাক হলো বৈকি! কেননা সুখ তো বলেছিলো ক্লাস করবে না। তাহলে এখন এলো কেন? তিশা সুখের কাছে জিজ্ঞেস করলো। সুখ কিছু বলার আগেই ঋত্বিক ঢুকলো ক্লাসে। আজও তার পরনে কালো শার্ট । তিশা ঋত্বিক কে দেখেই নিজ স্থানে বসে পড়লো। সে আর উঠতেই পারবে না এখান থেকে। ঋত্বিককে দেখলেই তিশার বুকে ঢোল বাজে। কখন জানি আবার সবাই শুনতে পায় সে শব্দ। এই নিয়ে ভিষন ভয়ে আছে তিশা। কিন্তু যাকে দেখে এতটা ছটফটানি সে কি আদৌও কখনো খেয়াল করেছে তিশাকে? করেনি। হয়তো এ জীবনে কখনো করবেও না।
ঋত্বিক ধীর পায়ে ক্লাসরুমে এলো। সবাই তাড়াতাড়ি দাঁড়ালেও সুখের ভেতরে কোন হেলদোল দেখা গেল না ঋত্বিক কে নিয়ে। সে ক্লাসে এসে টেবিলে মাথা রেখে অন্যদিকে ফিরে পরে রইলো। ঋত্বিক এসেছে বলে সবাইকে দাঁড়ানো দেখে সেও সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে দাঁড়ালো। ঋত্বিকের দৃষ্টি শুধুই সুখের দিকে। সে বাঁকা হাসলো সুখের কান্ডে। মেয়েটা এতটা ত্যাড়া কবে হলো? কই দুই বছরে তো ঋত্বিক কখনোই বুঝতে পারেনি।
ক্লাস টাইম শুরু হলে ঋত্বিক লেকচার দিতে শুরু করলো। আর বারেবারে তাকালো সুখের দিকেই। আশেপাশেও তাকালো। কিন্তু সেটা, মানুষের সন্দেহ দুর করার জন্য। সুখের দিকে বারবার তাকালে যদি মানুষ সন্দেহ করে, এজন্যই সে ঘুরেফিরে তাকাচ্ছে আর ক্লাস করাচ্ছে। সুখ সামনের দিকেই তাকানো তবে একবারও তাকালো ঋত্বিকের দিকে। হঠাৎ করে সুখ সামনের দিক থেকে ফোনের দিকে নজর দিলো। সোনিয়া কল করেছে। এতেও ঋত্বিক জ্বলেপুড়ে ছাড়খাড় হয়ে গেল যেন। সে কপাল কুঁচকালো, সুখকে চুপেচাপে কথা বলতে দেখে। সেও ধীরেধীরে শক্ত মুখে হেঁটে গেল সুখের দিকে। মুলত তার ভয় হলো, ওই বাইরের ছেলেটা যদি কল দেয়? ঋত্বিক সুখের সামনে এসে দাঁড়ালো নিঃশব্দে। সুখ তখন টেবিলের তলে মাথা দিয়ে কথা বলছে ফোনে। ঋত্বিক সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো। কয়েক মিনিট পর কথা বলা শেষে সুখ সোজা হয়ে বসতেই চমকে উঠলো। সে দেখলো সারা ক্লাসের ছেলেমেয়েরা তার দিকেই তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। আর ঋত্বিক শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর, সবাইকে শান্ত হতে বলে ঋত্বিক সুখকে বলল,
"এটা ক্লাসরুম, কথা বলার জায়গা নয়। কথা বলতে হলে বাইরে চলে যান।"
এবার জোরে জোরে বলল,
"আরেকটা কথা, আমার ক্লাস চলাকালে কেউ ফোন ইউজ করতে পারবেন না, যদি না গুরুতর দরকার হয়। দরকার হলে বাহিরে চলে যাবেন।"
ঋত্বিকের কথায় যেন সুখ আকাশের চাঁদ হাতে পেল। সে চাঁপা স্বরে বলল,
"স্যরি স্যার। আমার আর্জেন্ট কল আসছে। বাহিরে যেতে হবে।"
ঋত্বিক দাঁতে দাঁত চেপে রাখলো। নিজের কথাতে নিজেই ফেঁসে গেল সে। এখন তো কিছু করার ও নেই। সে অনুমতি দিলো সুখকে বাইরে যাওয়ার।
---------
হসপিটালে করিডোরে হাঁটছে সোনিয়া। একা নয়। সাথে আছে স্বল্প পরিচিত একজন যুবক। শৈল আর সে হাঁটছে। তাদের কোন গন্তব্য নেই। সোনিয়ার মায়ের শরীরটা ভালো নেই। আজকাল তাকে সামলানো-ই দায় হয়ে পড়েছে। সোনিয়াকে ডাকা হয়েছিলো এ বিষয়ে পরামর্শ করার জন্য। মুনিয়াকে এখানে রাখতে গেলে আরও টাকা দেওয়া লাগবে। নাহলে বাসায় নিতে হবে। সোনিয়া কিছুটা সময় চেয়ে বের অফিস রুম থেকে।
করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় দেখা শৈলের সাথে। কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। তখন থেকেই তারা শুধু পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে।
একটা সময় নীরাবতা ভেঙে শৈল প্রশ্ন করলো,
"কে থাকে এখানে?"
"আমার মা।"
সোনিয়া কথার জবাব দিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করলো,
"আপনার?"
"আমার বাবা।"
"কবে থেকে?"
"বহুবছর। এই ধরুন প্রায় চৌদ্দ বছর। "
" ওরে বাবা, এতো বছর?"
সোনিয়া অবাক হলো সাথে দীর্ঘশ্বাস ও ছাড়লো। শৈল বলল,
"হ্যাঁ।"
সোনিয়া কি একটা ভেবে বলে বসলো,
" আর আপনার মা কোথায়?"
শৈল দাঁড়িয়ে গেল। সোনিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
"চলুন এক কাপ কফি খেতে খেতে বলি?"
বাসায় কোন কাজ নেই সোনিয়ার। তাছাড়া সুখরাও ভার্সিটিতে। এখন যাওয়ায় যায়! সোনিয়া রাজি হলো। সে আর শৈল চললো রেস্টুরেন্টের উদ্দেশ্যে। হয়তো এখান থেকেই যাত্রা শুরু হবে কোন এক সুন্দর সম্পর্কের।
-------
সুখ ক্লাস রুম থেকে বেড়িয়ে এলো। কিন্তু যাবে টা কোথায়? সোনিয়ার সাথে যা কথা বলার তা তো বলা শেষ। সে তো ঋত্বিকের সামনে থেকে সরে আসার জন্যই এমন করলো। হাঁটতে হাঁটতেই সে ঠিক করলো, এখন বাসায় যাবে। বাসায় গিয়ে একটা ঘুম দেবে। কালকে এমনিতেই তার ঘুম হয়নি। এরকম একটা হাসবেন্ড আর দুইটা শয়তান ভাই থাকলে কি আর ঘুমানো যায়? যেই ভাবা সেই কাজ, সে বেরিয়ে গেল ক্যাম্পাস থেকে। ওহ, বেরোতে আর পারলো কই। গেট পেরোনোর আগেই আশিক এসে উদয় হলো সুখের সামনে।
"এই যে মিস রোজ, তুমি তখন দৌড়ালে কেন ওভাবে?"
সুখ নাক ঘষতে লাগলো। বেজায় বিরক্ত লাগছে তার। সে শক্ত কন্ঠে বলল,
"আপনার সমস্যা কি? তখন থেকে মিস রোজ, মিস রোজ করছেন? আপনি জানেন, আমি মিস না মিসেস?"
আশিক মুচকি হেঁসে বললো,
"তুমি গোলাপের মতোই সুন্দর। তাই নাম রেখেছি রোজ। আর মিস না মিসে জানি কি'না? জানি। তোমার বিয়ে হয়নি। কোন বয়ফ্রেন্ডও নেই।"
সুখ হেঁসে ফেললো। কিন্তু কিছুই বললো না। বলার প্রয়োজনই মনে করলো না। সে হাঁটা ধরলো। কিন্তু বাঁধ সাধলো আশিক।
"রোজ কোথায় যাচ্ছো?"
এই রোজ নামটা শুনলেই সুখের মেজাজ গরম হচ্ছে। সে ঝাঁঝালো স্বরে বলল,
"এই যে শুনুন। আমার নাম স্পর্শীয়া সুখ। ডাকতে হলে এই নামেই ডাকবেন। খবরদার! আমাকে ওই রোজ নামে ডাকবেন না।"
"ওয়াও! আই লাইক ইট! তেজি মেয়ে ভিষন পছন্দ আমার। যাইহোক, আপনার নাম টা কিন্তু জোস৷"
সুখ আর দাড়ালো না। তার যা বোঝার বোঝা শেষ। এই ছেলে সস্তা ফ্লার্ট করতে এসেছে। সুখ খুব দ্রুত ক্যাম্পাস ছাড়লো। কেননা, কখন জানি আবার ওই ঋত্বিকের বাচ্চা দেখে ফেলে।
চলবে?
গল্প : #তুমি_ছিলে_আমারই
লেখনীতে : #অহনা_রহমান