ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি ছিলে আমারই

২২তম পর্ব

লেখক: অহনা রহমান

(২২)

ঋত্বিকের মাথা ছিরে যাচ্ছে। দম বন্ধ লাগছে তার। একটু আগের সাজানো গোছানো স্ট্যাডিরুম এখন পরিনত হয়েছে ধ্বংস্তুপে। বইগুলো সব চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। টেবিল চেয়ার ভাঙা। বইয়ের তাক ভাঙা। তার হাত থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে। সে কিছুতেই থামাতে পারছে না নিজেকে। সুখকে সে এভাবে মেরেছে এটা ভাবলেই তার নিজের প্রতি ঘৃণা হচ্ছে। ঋত্বিক জানে সে তার জানামতে যা করেছে সেসব ও অন্যায়। সে সুখকে কথার আঘাতে জ্বালাতে চেয়েছে। কিন্তু নারীর গায়ে হাত তোলার মতো.... 
ঋত্বিক আবার স্বজোরে ঘুষি মারে দেয়ালে। অন্য হাতটাও থেতলে যায় তাতে। ঋত্বিকের নিজের উপর রাগ কিছুতেই কমছে না। কিছুক্ষণ আগে......
"সুখ আমি স্বজ্ঞানে তো এসব করিনি। তুমি নিজেই তো বলেছো আমি মাতাল ছিলাম। তাহলে? সুখ আমি মন থেকে বলছি আমি অনুতপ্ত। সুখ আমি আমার ভালোবাসা দিয়ে নতুন সৃতি তৈরী করে নিবো। আমার ভালোবাসার অতলে হারিয়ে যাবে তোমার এসব খারাপ সৃতিগুলো। তবু আমাকে একটা বার ক্ষমা করো।"
সুখ দাঁড়িয়ে মন দিয়ে শুনছিলো ঋত্বিকের কথা। সে হেঁসে ফেললো এই পর্যায়ে। 
"আচ্ছা মানলাম। এই আঘাতের কথা ভুলে গেলাম আমি। কিন্তু, আপনার সজ্ঞানে করা অপরাধের কি শাস্তি চান আপনি?"
"কোন ভুলের কথা বলছো?" 
    
" আমি থাকতে, আমাদের বেডরুমে prostitute আনলেন তখন? একজন স্ত্রী হয়ে কিভাবে সহ্য করেছিলাম জানেন?"
ঋত্বিকের চোখ বড় হয়ে গেল আপনাআপনিই৷ সে আবার কবে এমন করবো। prostitute? ঋত্বিক এতটা জঘন্য নয়। কিছুতেই হতে পারে না। 
"What nonsense are you talking about? Are you out of your mind? prostitute এটার মানে জানো তুমি?"
ঋত্বিক এগিয়ে যায় দুইকদম। হাতের আজলায় সুখের মুখখানা ধরে বলল,
"সুখপাখি, তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে পাখি। বিশ্বাস করো...!!" 
ঋত্বিক কিছু বলার আগে সুখ বলল,
"মনে করুন মিস্টার ঋত্বিক, মনে করুন। আমাদের বিয়ের তখন দুইমাস মেইবি। আপনার নানি মারা গিয়েছিলো। আমার পরীক্ষা ছিলো তাই যায়নি। আমি শুয়েছিলাম আপনার রুমে। তারপর...... 
আর বলবো না আমি। এইবার আপনি ভাবুন কি করেছিলেন সেদিন। বাই দা ওয়ে, বে*শ্যা বলে আপনিই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ।"
ঋত্বিকের মাথা হ্যাং হয়ে গেছে। সুখের বলার সাথে সাথেই ঋত মনে পরে যায় সেদিনের ঘটনা। তার একটু ভুলের জন্য সুখ আজ এতোবড় মিথ্যা নিজের মধ্যে সত্য হিসেবে পুষে রেখেছে। ঋত্বিআক সবটা এক্সপ্লেইন করতে যাবে তার আগেই সুখ বলল,
"এখন যদি মনে করি, তো এরকম ছোটবড় হাজারটা অন্যায় আমি দেখাতে পারবো যা আপনি সজ্ঞানে করেছিলেন। কিন্তু কথা বাড়াতে চাই না আর। আমার যা বলার বলা শেষ। এখন শেষ কথা হলো, আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি ঋত্বিক। কিন্তু আপনার কাছে আর ফিরে যেতে চাই না। আপনার কাছাকাছি এলেই আমার অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মনে পরে। আমার হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করে দেয় সময়ে অসময়ে। আমি সবসময় নিজেকে সামলে উঠতে পারি না। এখন আপনি যদি বলেন যে আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবেন, তো দিতে পারেন। আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই আপনার থেকে। আসছি আমি!"
সুখ ঋত্বিককে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই প্রস্থান করলো। সুখের যাওয়ার পর কিছুসময় ঋত্বিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো। শান্ত হয়ে। হঠাৎ সে গর্জে উঠলো। এক নিমিষেই শেষ করে দিলো সাজানো গোছানো স্ট্যাডি রুম। চেয়ার উঠিয়ে টেবিলের উপর বারি মারলো সে। সুখ যে তাকে ডিভোর্স দেওয়ার কথা বলেছে এ যেন মেনেই নিতে পারছে না ঋত্বিক। মুদ্রার দুইপিঠ সমান হয় না। সুখ যেদিন অসুস্থ হয়েছিলো, একবার যদি তার জ্ঞান ফিরতো সে দেখতে পেতো। যেই লোকটা তাকে স্ত্রী হিসেবে মানে না, তাদের বিয়েটাকে মানে না। সেই লোকটাই ওর শিওরে বসে জলপট্টি দিচ্ছে। সেইবার যখন, ঋত্বিকের বাবা মা সুখকে বাড়িতে রেখে ট্যুরে গেল। ঋত্বিক সেদিন সন্ধ্যায় ফিরে এসেছিলো বাড়িতে। কিন্তু সে সুখের সামনে আসেনি। এমন অনেক কথা-ই আছে যা সুখ জানে না। 
ঋত্বিকের নিজের উপর রাগ হচ্ছে ভিষন। বারবার সুখের পিঠের দাগগুলো চোখে ভাসছে। আর সে হিতাহিতজ্ঞানশুন্য হয়ে নিজেকে আঘাত করছে। 
-------- 
কেটে গেল প্রায় এক সপ্তাহ। মনোরম একটা পরিবেশে বসে আছে দুজন। চারিদিকে সবুজের সমারোহ। নদীর পাড়ে বসে আছে সোনিয়া আর শৈল। অনেকক্ষণ আগেই তারা এসেছে এখানে। ভার্সিটির পরে শৈল সোনিয়াকে কফির অফার করেছিলো। কিন্তু সোনিয়া তা চাইনি। সোনিয়ার ইচ্ছেতেই শৈল তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হতে চলল। শৈল বলল,
"আমার সম্পর্কে তো সব জানেনই। বাড়িতে আমার বৃদ্ধ দাদা দাদী রয়েছে। আশা করা যায়, তাদের সাথে থাকতে আপনার কোন অসুবিধা হবে না।"
সোনিয়া জানে শৈল কি বোঝাতে চায়। তারপরও সে না জানার ভান করে বলল,
"আমি তাদের সাথে থাকবো কেন?"
শৈল সোনিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ করেই ফিক করে হেঁসে উঠলো। বলল,
"আর কতদিন অন্যের বাড়িতে ভাড়া থাকবেন? এবার আপনার নিজের একটা বাড়ি হওয়া উচিৎ।" 
সোনিয়া শৈলের আড়ালে মুচকি হাসলো। মুখে বলল,
"আসলেই একটা বাড়ি হওয়া দরকার। কিন্তু কি আর করার? আমি তো এখনো স্টুডেন্ট। আগে পরাশোনা শেষ করি, তারপর চাকরি বাকরি করে নিজে একটা বাড়ি কিনবো। মাকে নিয়ে আর সুখকে সেখানে থাকবো।" 
শৈল ভেংচি কাটলো। সোনিয়ার বাসায় তাকে নেবে না শুনে হতাশই হলো ছেলেটা। শৈল বাসার কথা না বলে সোনিয়ার চাকরির কথা বলল,
"আপনার হাসবেন্ড থাকতে, আপনি কেন কষ্ট করে চাকরি করবেন? আপনার বাড়ি দরকার? সেটা আপনার হাসবেন্ড কে বললেই তো হলো। "
"আমার হাসবেন্ড কে কোথায় পেলেন আপনি? আমি তো জন্মগত সিঙ্গেল মানুষ।"
"আপনি কি কিছুই বুঝতে পারছেন না সোনিয়া?"
"কিসের কথা বলছেন?"
"সত্যি বুঝছেন না?"
"না তো।"
শৈল হতাশ হয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলল। মনেমনে ভেবে ফেলল দারুণ কিছু আইডিয়া। 
----------
আজ একটা সপ্তাহ ধরে ঋত্বিকের সাথে দেখা হয় না সুখের। সেদিন ঋত্বিকের বাসায় দেখা হয়েছে সুখের আর হয়নি৷ ভার্সিটিতে আসে না ঋত্বিক। সুখের একদিন চিন্তা হচ্ছিল বলে সে ঋত্বিকের নাম্বারে কল করেছিলো। কিন্তু ঋত্বিকের নাম্বার টাও বন্ধ। 
বিষন্ন বিকেলে সুখ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার ভালো লাগছে না কিছুই। কিসের জন্য তার এতো মন খারাপ সে নিজেও জানে না৷ কেউ কেউ হৃদয়ে এমনভাবে থাকে, যেন চলে যাওয়ার পরও নিঃশব্দে বেঁচে থাকে প্রতিটি নিঃশ্বাসে।
মানুষ ভুলে যেতে শেখে, কিন্তু হৃদয় শেখে না। সে শুধু অপেক্ষা করতে জানে। অনুপস্থিত এক উপস্থিতির জন্য। 
হঠাৎ তার পিছনে তিশা এসে দাঁড়ালো। রিমাও এলো। 
"সুখ তোর মন খারাপ?"
ওদের হঠাৎ ডাকে চমকে ওঠে সুখ। তিশার ইদানীং বেশ মন খারাপ। ক্যাম্পাসে গেলে যেই মেয়েটা সবসময় আনন্দ উচ্ছ্বাসে মেতে থাকতো সেই মেয়েটা-ই এই কয়েকদিন ভার্সিটিতে গিয়ে মন মরা হয়ে বসে থাকে। কারো জন্য অপেক্ষা করে। ছটফট করে ভেতরে ভেতরে। সুখ বুঝতে পারে তিশার ছটফটানি। কিন্তু কার জন্য এতো যন্ত্রণা পাচ্ছে মেয়েটা তা সুখ জানে না। অনেকবার জিজ্ঞেস করার পরও তিশা বলেনি। তিশা সত্যি টা বলে দিলে কি হতো কে জানে? 
"না রে মন খারাপ না। তোর মন খারাপ কি'না সেটা বল।" 
তিশা মলিন হাসে। একতরফা ভালোবাসাতে বুঝি এমন কষ্ট? সেই মানুষটা জানেও না তারজন্য কেউ একজন এতটা কষ্ট পাচ্ছে।
একতরফা ভালোবাসা একটা অভিশাপ, যেখানে তুমি প্রতিদিন তাকে হারাও, অথচ সে জানেই না তুমি তাকে ভালোবাসো। 
চলবে? 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন