#এ_দেখা_শেষ_না_হোক #পর্ব - (০৩)
#writer_sumaiya_akter_sathi
--
সাদা ডুপ্লেক্স রাজকীয় বাড়িটির গেটের সামনে দাড়িয়ে আছে এক ভদ্ৰ মহিলা। পরনে তার জামদানি শাড়ি। গায়ে হালকা পাতলা স্বৰ্নের গহনা মোড়ানো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোনো বংশীয় ঘরের বউ তিনি। মহিলাটি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনে ডুপ্লেক্স বাড়িটির দিকে। এক বারের জন্যও হয়তো সে চোখের পলক ফেলেনি। দৃষ্টি তার এক জায়গাতেই সীমাবদ্ধ। চোখ দুটো ক্ৰমশ ভিজে আসছে তার। চোখের পাতা না চাইতেও বুঝে আসছে বারবার।
গাড়ি থেকে বের হলেন মোশাররফ হোসেন। তার স্ত্রীকে বাড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তিনিও তাকালেন বাড়িটির দিকে। মোশাররফ হোসেন এগিয়ে গেলেন তার স্ত্রীর কাছে। স্ত্রীর এক হাত নিজের দু হাতের মুঠোয় নিলেন। আলতো ভাবে স্ত্রীর হাত স্লাইড করতে করতে বললেন,তুমি চাইলে আমিও তোমার সাথে যেতে পারি। স্ত্রীর কাঠখাট জবাব আসলো,
- না আমি একাই যাবো। তুমি বাচ্চাদের কাছে থাকো। ওরা ঘুমাচ্ছে। উঠে আমাদের কাউকে না দেখতে পেলে গাবড়ে যাবে।
মোশাররফ হোসেন আর কিছু বললেন না। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে তার মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করলেন। পরপর বলেন, ঠিক আছে। আমি এখানে অপেক্ষা করছি। তুমি ভেতরে যাও। বলে স্ত্রীর হাতে একটা শুকনো চুমু একে দিলেন তিনি। স্ত্রীর হাত আগলা করে দিলে সে চলে যায়। মোশারফ হোসেন চেয়ে আছেন স্ত্রীর যাওয়ার পানে। তার স্ত্রী গেট পেড়িয়ে ভেতরের দিকে যাচ্ছে। তিনি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সেদিকে।
মালিহা বেগম চুলায় চা বসালেন। বিকেলে তাদের বাসায় সবাই মোটামুটি চা খায়। কেউ খায় দুধ চা,কেউ বা রং চা। আয়ান বাদে এ বাড়ির বাকি সবাই চা পাগল। মালিহা বেগম ট্ৰে তে চায়ের কাপ গুলো সাজিয়ে নিলেন। ট্ৰে তে কিছু কুকিজ আইটেমও রাখলেন তিনি। মালিহা বেগম ট্ৰে হাতে নিয়ে রান্নাঘর ত্যাগ করলেন। পা বারালেন ড্রয়িং রুমের দিকে।
ড্ৰয়িং রুমে তখন আছিয়া বেগম ও তার চার ছেলে উপস্থিত ছিলো। বিয়ের কথাবার্তা বলছিলেন তারা।পাশে বসে টিভি দেখছে বাচ্চারা। মালিহা বেগম যখনই ট্ৰে নিয়ে ড্ৰয়িং রুমের দিকে পা বাড়ালেন। তখনই আচমকা তার পা দুটো থেমে যায়। ভুত দেখার মতো চমকে উঠেন তিনি। তার পা দুটো যেনো হাটার শক্তি হারিয়েছে। চোখ দুটো বড় হয়ে গিয়েছে তার। এটা সে কি দেখছে ? তার চোখকে সে কোনো ভাবেই বিশ্বাস করাতে পারছে না। তার হাত দুটো ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে। এমন সময় থাস করে তার হাতে থাকা চাযের ট্ৰে টা মেজেতে পরে যায়। কাচ ভাঙ্গার ঝনঝন শব্দে স্তব্ধ হয়ে উঠে ড্ৰয়িং রুম।
উপস্থিত সবাই মালিহা বেগম এর দিকে চেয়ে আছেন। সবাই হতবাক। কেউ কিছুই বুঝলো না। সবার মনে একই প্রশ্ন। মালিহা বেগমের কি হলে হঠাৎ?
মালিহা বেগমের দৃষ্টি তখনো বাড়ির দরজায় সীমাবদ্ধ। মুসকান টিভি দেখছিলো এতক্ষণ। মালিহা বেগম এর এ অবস্থা দেখে বসে থাকতে পারলো না। মা কে একই ভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে ছুটে আসলো মায়ের কাছে। মালিহা বেগম কে ধরে দু-পা পিছিয়ে দিয়ে বলে, মা ঠিক আছো তুমি? আঘাত পাও নি তো কোথাও?
মালিহা বেগম মেয়ের কথার কোনো জবাব দিলেন না। তার দৃষ্টি তখনও দরজার দিকে। মালিহা বেগম শুধু আঙ্গুল তুলে দরজার দিকে ইশারা করলেন। উপস্থিত সবাই মালিহা বেগমের দৃষ্টি অনুসরণ করে দরজার দিকে তাকায়।
জলপাই রঙ্গা গোলাপি পাড়ের শাড়ি পড়ে দাড়িয়ে আছেন এক মহিলা। মহিলাটি বেশ সুন্দরী। গায়ের রং ফর্সা। মাথার চুলগুলোর মাঝ বরাবর সিথি করে পেছনে খোপা করে রাখা। হাতে কানে গলায় স্বর্নের কিছু গহনা। দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে তাকে। মহিলাটি ভেজা চোখে সকলকে দেখছে।
মহিলাটিকে দেখে শাজাহান শিকদার,আনোয়ার শিকদার,জয়নাল শিকদার, আরমান শিকদার সহ আছিয়া বেগম সকলে বসা থেকে উঠে দাড়ালো।সবাই আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে রইলো দরজায় দাঁড়ানো মহিলাটির দিকে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবাই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মহিলাটির দিকে।
মুসকান কিছুটা অবাক হলো মহিলাটিকে দেখে। সবার দিকে তাকিয়ে দেখলো একবার। মালিহা বেগম এর মতো তাদেরও একই অবস্থা। সবাই যেনো বাকরুদ্ধ। কথা বলতে ভুলে গিয়েছে তারা।শুধু সকলের নিশ্বাস এর শব্দ ভেসে আসছে ড্ৰয়িং রুম থেকে। সকলের নিরবতা ভেঙ্গে মুসকান বলল,
- মা কে উনি? সবাই উনাকে দেখে এভাবে কেনো তাকিয়ে আছে ?
মালিহা বেগম এবারও মেয়ের কথার কোনো উওর দিতে পারলো না। তার চোখ দুটো ইতিমধ্যে ভিজে উঠেছে। চোখের পানি কোনো ভাবেই আটকাতে পারছেন না তিনি।
মুসকান মায়ের কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে শাজাহান শিকদার কে বলল, বাবা। তুমি বলো না কে উনি?
শাজাহান শিকদার সহ উপস্থিত সকলে নিশ্চুপ। মুসকান এবার তার চাচাদের বলে, চাচ্চু তোমরা তো অন্তত কিছু বলো। কে উনি?কি তার পরিচয়?তোমরা কেনো কিছু বলছো না? তোমরা কি ওনাকে চিনো? আছিয়া বেগম এবার ভেজা কন্ঠে চিৎকার করে বলে ওঠলেন,
- ও পরী। এ বাড়ির মেয়ে। আমির শিকদার এর মেয়ে। এটাই ওর পরিচয়।
মুসকান,আদি,নুপুর,অভি সহ উপস্থিত সকলে অবাক হলো দাদির কথা শুনে। কি বলছে দাদি? এ বাড়ির মেয়ে মানে? আমির শিকদার এর মেয়ে মানে? উনি কি তাহলে তাদের ফুপ্পি?
মুসকান এবার আছিয়া বেগম এর কাছে গিয়ে বলল, এ বাড়ির মেয়ে? মানে আমাদের ফুপ্পি হন উনি রাইট? তাহলে ফুপ্পি এতোবছর কোথায় ছিলো দাদি? আমরা তো ছোটো থেকে ফুপ্পিকে কখনো দেখিনি। কেনো দেখিনি কোথায় ছিলো ফুপ্পি এতোদিন?
আছিয়া বেগম আর কোনো কথাই বললেন না। ছুটে চলে গেলেন দরজার দিকে। দুহাতে বুকে জড়িয়ে ধরলেন পরীকে। শব্দ করে কেঁদে উঠলেন আছিয়া বেগম। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েকে নিয়ে মেজেতে বসে পরলেন তিনি। পরী নিজেও মাকে জরিয়ে ধরে কেঁদে ওঠে। পচিঁশ বছরের চাপা কষ্ট আজ তাদের চোখের পানিতে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে। উপস্থিত সকলের চোখে পানি। মায়ের কান্না হয়তো পৃথিবির কোনো সন্তানই সয্য করতে পারেনা।
আছিয়া বেগম হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমার পরী মা। আমার মা। আমার মেয়ে পরী। কোথায় ছিলি তুই মা? পঁচিশ বছর কই ছিলি তুই মা? তোর মাকে কি তোর একটুও মনে পরে নাই ? বল না?এতো পাষাণ কেমনে হইলি তুই? পরপর কতোগুলো চুমু একে দিলেন পরীর সমস্ত মুখে। পরী দূকরে কেঁদে উঠলো। পঁচিশ বছরে সে মায়ের ভালোবাসা পায়নি। পায়নি মায়ের স্পর্শ। কান্নার পরী কিছুই বলতে পারছে না।
মালিহা বেগম ইতিমধ্যে চলে এসেছে আছিয়া বেগম আর পরীর কাছে। আছিয়া বেগম পেশারের রোগী। বেশি কান্না করলে অসুস্থ হয়ে পরবেন তিনি। জ্ঞানও হারাতে পারেন। মালিহা বেগম মুসকান কে ডেকে দুজনকে উঠিয়ে নিয়ে আসলেন ড্ৰয়িং রুমে। আছিয়া বেগম আর পরীকে সোফায় বসিয়ে দেয়। মালিহা বেগম নিজেও পরীর পাশে বসে পরলো। পরীকে জড়িয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠলো। বললো, এতোদিন তুমি কোথায় ছিলে পরী? পঁচিশ বছর পর তোমার মনে পরলো আমাদের কথা?
পরী কিছু বলতে যাবে তার আগেই শাজাহান শিকদার গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন, কেনো এসেছো এ বাড়িতে?
পরী অসহায় চোখে তাকালো শাজাহান শিকদারের দিকে। সেই আগের মতোই আছেন তিনি। শুধু চেহারায় আর চুলে বয়সের ছাপটা পরেছে। বাকি তিন ভাইয়ের দিকেও চেয়ে দেখলেন একবার। কেউ কোনো কথা বলছে না। পরী বসা থেকে উঠে দাড়াল। বলল, ভাইজান আমি তো..
- এতো বছর পর এ বাড়িতে এসে কি বোঝাতে চাচ্ছো ? তুমি এ বাড়িতে যে উদ্দেশ্যেই আসো না কেনো কান খুলে শুনে রাখো পরী। তোমার উদ্দেশ্য কখনোই পূরণ হবে না। এই বলে দিলাম আমি।
পরী নিজের কথা শেষ করতে পারলো না। তার আগেই শাজাহান শিকদারের কড়া কথা শুনতে হলো তাকে। মাথা নিচু করে আছে পরী। তার চোখ থেকে অনবরত পানি গড়িয়ে পরছে। তার ভাইরা কি তাকে লোভী ভাবছে? ভাবছে হয়তো। ভাবাটাই তো স্বাভাবিক। পরী হাত দিয়ে চোখের জ্বল মুছে নিলো। বলল,
- আমি কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এ বাড়িতে আসিনি ভাইজান। আমি শুধু একবার আমার মা কে দেখতে এসেছি। দেখা হয়ে গিয়েছে । আসছি আমি। আর হ্যা ভাইজান। আমার ভুলের জন্য আমাকে মাফ করে দিয়ো তোমরা। আসছি।
এই বলে দরজার দিকে পা বাড়ায় পরী। দু পা এগোনোর সাথে সাথে আছিয়া বেগম এর কন্ঠস্বর ভেসে আসে, দাড়াও পরী। আছিয়া বেগম এর কথা শুনে পরীর পা থেমে গেলো। আছিয়া বেগম বসা থেকে উঠে দাড়ায়। এতোক্ষণ সে সব কিছুই শুনেছে। তার মেয়েকে যে অপমান করা হয়েছে এ বাড়িতে। সেটা সে খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পেরেছে। আর এটাও সে বুঝতে পেরেছে এ বাড়িতে তার মেয়ের কোনো জায়গা নেই। আছিয়া বেগম এসে পরীর সামনে দাড়ায়। বলে, আমিও তোমার সঙ্গে যাবো পরী। নিবে না আমায় তোমার সাথে ?
মায়ের কথা শুনে পরীর চোখ আবারো অশ্ৰুসিক্ত হয়। পরী তার মায়ের দিকে চেয়ে বলে, তুমি কি সত্যি আমার সাথে যাবে মা? আছিয়া বেগম পরীর চোখ মুছে দিয়ে বলল, হ্যা যাবো। তুই যেখানে নিয়ে যাবি আমি সেখানেই যাবো। পরী এবার দু হাতে আছিয়া বেগম কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আবারো কেঁদে উঠলো মেয়েটা।
উপস্থিত সবাই আছিয়া বেগমের চলে যাওয়ার কথা শুনে অবাক হয়। আছিয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। কি বলছেন তিনি? শাজাহান শিকদার এর চোখে অগ্নিশিখা । মনে হচ্ছে তিনি চোখ দিয়েই গিলে খেয়ে ফেলবেন পরীকে। শাজাহান শিকদার এবার রেগে গিয়ে বলে,
- এসব তুমি কি বলছো মা? তুমি কেনো ওর সাথে যাবে? আর এই মেয়ে কেনো এসেছে এ বাড়িতে? একবার আমাদের নাক চোখ কেটে কি শান্তি হয়নি ওর? এসেই আবার অশান্তি লাগিয়ে দিয়েছে আমাদের সংসারে। বের হয়ে যেতে বলো এই মেয়েকে। আর তুমি ওর সাথে কোথাও যাবে না মা।
কথাগুলো একনাগারে বলে থামলো শাজাহান শিকদার। আছিয়া বেগম পরীর ছেড়ে পরীর হাত শক্ত করে ধরে বলে, যে বাড়িতে আমায় মেয়ের জায়গা নেই সে বাড়িতে আমি আর এক মুহূর্ত থাকতে চাই না। চল পরী। এই বলে আছিয়া বেগম পরীকে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়ায়। উপস্থিত সবাই তাদের দিকে চেয়ে আছে। কি থেকে কি হচ্ছে কেউ যেনো কিছু বুঝে উঠতে পারছে না।
মুসকান দৌড়ে গিয়ে আছিয়া বেগম এর সামনে দাড়ায়। আছিয়া বেগম এর দিকে চেয়ে বলে, দাদি প্লিজ তুমি এমটা করোনা। আমাদের ছেড়ে এভাবে তুমি যেয়ে না। প্লিজ দাদি। মুসকান এর দেখা দেখি বাকি বাচ্চারাও এসে ঘিড়ে ধরেছে আছিয়া বেগম কে। অভি, আদি, নুপুর সবাই পথ আটকে দাড়িয়ে আছে আছিয়া বেগম আর পরীর। তারা কেউ যেতে দিবে না আছিয়া বেগম কে।
আনোয়ার শিকদার, জয়নাল শিকদার,আরমান শিকদার সবাই চেয়ে আছে শাজাহান শিকদার এর দিকে। তারা সবাই জানে শাজাহান শিকদার এর রাগ সম্পৰ্কে। তাই কেউ কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। সবাই অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শুধু।
মালিহা বেগম সাহস নিয়ে এগিয়ে আসলেন শাজাহান শিকদার এর কাছে। কান্না মেশানো কন্ঠে বলল, তুমি কিভাবে পারছো নিজের বোনকে এভাবে তাড়িয়ে দিতে? তোমার কি একবারও বুক কাপঁছে না? তোমারই তো বোন । ভাই হয়ে কিভাবে পারছো এতোটা নিৰ্দয় হতে?
শাজাহান শিকদার এবার মালিহা বেগম এর উপর রেগে চিল্লিয়ে বলেন, না বুক কাপঁছে না আমার। ওর মতো বোন আমার প্ৰয়োজন নেই। যে বোন বাড়ির মান ইজ্জত সম্মানের কথা চিন্তা করে না। অন্য ছেলের হাত ধরে পালিয়ে যায় সে বোনের কোনো প্ৰয়োজন নেই আমার। ওকে বেড়িয়ে যেতে বলো এ বাড়ি থেকে।
মালিহা বেগম কিছু বলতে যাবেন তার আগেই আছিয়া বেগম থামিয়ে দিয়ে বলে, থামো মালিহা। আর কিছু বলবে না তুমি। আমার মেয়ে যেহেতু এ বাড়িতে থাকতে পারবে না। তাই আমি আমার মেয়ের সাথে চলে যাচ্ছি। মুসকান, নুপুর, আদি, অভির উদ্দেশ্য বললো, সামনে থেকে সরে দাড়াও তোমরা । মুসকান এবার কাদো কাদো গলায় বলর,
- দাদি। তুমি চলে গেলে আমরা কিভাবে থাকবো? বাড়িটা একদম খালি খালি হয়ে যাবে। কে আমাদের আদর করবে? কে আমাদের শাসন করবে? কে আমাদের গল্প শুনাবে? কে আমাদের বকাঝকা করবে? তুমি আমাদের ছেড়ে যেয়ো না দাদি। প্লিজ দাদি।
শাজাহান শিকদারের দিকে তাকিয়ে বলে,বাবা প্লিজ তুমি দাদিকে আটকাও। দাদিকে যেতে দিয়ো না। প্লিজ বাবা। শাজাহান শিকদার কিছু বললেন না। সব বাচ্চারা একসাথে আছিয়ে বেগম কে বলতে লাগলো, দাদি প্লিজ যেয়ো না তুমি। প্লিজ দাদি। আছিয়া বেগম এতক্ষণ শক্ত থাকলেও এবার সত্যিই তার চোখে পানি চলে আসলো । সত্যিই তো। এই বাচ্চাগুলো তাকে ছাড়া কিভাবে থাকবে? সেও বা কিভাবে থাকবে এদের ছাড়া?
পরী ছলছল চোখে চেয়ে রইল বাচ্চাগুলোর দিকে। তার খুব মায়া হলো এই বাচ্চাগুলোর উপর। পরী বুঝতে পারলো তার মা যদি পরীর সাথে চলে যায়। তাহলে এই বাচ্চাগুলো অনেক বেশি কষ্ট পাবে। পরী পচিঁশ বছর না থাকলেও টের পেলো তার মা এই বাচ্চাগুলোর মাঝেই বেঁচে ছিলো। পরী আছিয়া বেগম এর হাত ধর বলে, মা ওরা তো নিষ্পাপ। তুমি আমার সাথে চলে গেলে ওরা অনেক বেশি কষ্ট পাবে। ওদের মনে কষ্ট দিয়ে আমি তোমাকে কিভাবে নিয়ে যাই বলো মা ?আছিয়া বেগম এবার কান্না মেশানো কন্ঠে বলে উঠলেন,
- ওরা যেমন আমি না থাকলে কষ্ট পাবে। তেমনি আমিও কষ্ট পাবো তুই না থাকলে। পচিঁশ টা বছর আমি কিভাবে কাটিয়েছি কেউ কখনো জানতে চেয়েছে? এক সন্তান হারা মায়ের মনে কি চলে?সেটা কি কেউ কখনো ভেবে দেখেছে? সবাই সবার রাগ জেদ নিয়ে পরে ছিলো।কেউ কখনো মায়ের মনের খবর জানেনি,বোঝেনি। আমি তোদের মা।তোদের ছোট থেকে বড় করেছি। নিজের হাতে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি। নিজে না খেয়ে তোদের খাইয়েছি। আমার সব সন্তান আমার কাছে সমান। আমি আমার ছেলেদের যেমন ভালোবাসি। তেমনি মেয়েকেও ভালোবাসি। আমার ছেলে মেয়ে সকলে আমার কাছে সমান।
থেমে আবারো বলেন, আমি মা হয়ে পচিঁশ টা বছর নিজের সন্তানকে দেখিনি। স্পৰ্শ করতে পারিনি। আমার মেয়ে বেচে আছে নাকি মরে গেছে সেটাও জানতে পারিনি কখনো। একটা মায়ের কাছে এর থেকে দুঃখের আর কি হতে পারে?
আর আজ যখন আমি আমার মেয়েকে ফিরে পেয়েছি। তখন তোমরা ওকে তাড়িয়ে দিচ্ছো?আমার মেয়েকে এ বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে বলছো? আমি মা হয়ে এটা কিভাবে মেনে নিবো? আমার মেয়ে এ বাড়িতে না থাকলে আমিও আর এ বাড়িতে থাকবো না। এক মুহূর্তও না।
শাজাহান শিকদার অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে রইল মায়ের দিকে। তার মায়ের চোখে পানি। পৃথিবীর কোন সন্তান মায়ের চোখে পানি দেখে ঠিক থাকতে পারে? শাজাহান শিকদার এর মনে হচ্ছে তার মায়ের বলা প্ৰতিটি কথা তার বুকে এসে আঘাত হানছে। শাজাহান শিকদার এবার বলে, মা তুমি ভুল বুঝছো আমাদের। আমরা তোমাকে...। শাজাহান শিকদার কিছু বলার আগেই আছিয়া বেগম বলে উঠলো,
- ভুল? কিসের ভুল? তোমরা যেটা করেছে সেটা ভুল নয়। সেটা অন্যায়। পরীকে তুমি কিভাবে এ বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে বলো? তাও আবার আমি বেচে থাকতে? ভুলে যেয়ো না এটা আমার স্বামীর বাড়ি। তোমরা চার ভাই যেমন আমির শিকদার এর সন্তান। তেমনি পরীও আমির শিকদারেরই সন্তান। তোমাদের যেমন এ বাড়িতে অধিকার আছে। তেমনি পরীর সম্পূৰ্ণ অধিকার আছে এ বাড়ির উপর। এটা হয়তো তোমরা ভুলে যাচ্ছো বারবার।আজ যদি তোমাদের বাবা বেঁচে থাকতেন? তাহলে কি তোমরা পরীর সাথে এই ব্যবহারটা করতে পারতে?
_________
গরমে মাহিরার ঘুম ভেঙ্গে যায়। মাহিরা গরম একদমই সয্য করতে পারেনা। মাহিরা চোখ মেলে আসে পাশে তাকায়। বোঝার চেষ্টা করে সে কোথায় আছে। আশে পাশে তাকিয়ে বুঝলো সে গাড়ির ব্যাক সিটে আছে। এতোক্ষণ এখানেই ঘুমিয়েছে সে। তার পাশে পত্যয় ঘুমাচ্ছে। প্ৰত্যয়ের পাশে বসেই তার বাবা হাতে কিছু একটা দিয়ে বাতাস করছে। মাহিরা কে উঠে যেতে দেখে মোশাররফ হোসেন বলে উঠলেন,
- এ কি আম্মু? উঠে গেলে যে? ঘুম হয়নি ঠিকমতো?
মাহিরা হাসি মুখে চেয়ে আছে তার বাবার দিকে। তার কাছে তার বাবা এই পৃথিবীর শ্ৰেষ্ট বাবা। এই যে সন্তানের গরম লাগছে বলে বাবা বাতাস করে দিচ্ছে। এটা মাহিরার কাছে বেশ ভালো লাগলো। মাহিরা হাসি মুখে বললো, ঘুম হয়েছে আব্বু। বাট অনেক গরম লাগছিলো তাই ঘুমটা ভেঙ্গে গিয়েছে। আশে পাশে চোখ বুলিয়ে মাহিরা তার মাকে খুজলো। মাকে দেখতে না পেয়ে বলল, আম্মু কোথায় আব্বু? মোশাররফ হোসেন কি বলবেন মেয়েকে? কিছু একটা ভেবে বলেন, একটা কাজে গিয়েছে। একটু পরই এসে পরবে। মাহিরা আর কিছু বললো না। বেশ গরম লাগছে তার। মাহিরা গাড়িতে বসেই মাথার হিজাব খুলে ফেললো।
মোশাররফ হোসেন দীৰ্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলেন, গাড়ির এসিটা দেখছি নষ্ট। হাতের কাছেও কিছু পাচ্ছিলাম না। যেটা দিয়ে তোমাদের বাতাস করবো। একটা শক্ত কাগজ পেয়েছি সেটা দিয়েই বাতাস করছিলাম। সরি আম্মু । আমার তোমাদের এসি গাড়ীতে আনা উচিত ছিলো। এর পর থেকে আর কোনো ভুল হবে না। প্ৰমিস করছে বাবা।
মাহিরা বাবার এমন বাচ্চামি কথা শুনে ফিক করে হেসে দেয়। হেসে বলে, তুমি এতো ভালো কেনো আব্বু? ইশ্ পৃথিবীর সব বাবারা যদি তোমার মতো হতো। মেয়ের এমন কথা শুনে মোশাররফ হোসেনও কিছুটা হাসেন। মাহিরাকে আর কিছু না বলে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কিছু খাবে আম্মু?
মাহিরা বাহিরে তাকালো। গাড়ির কাচ আগে থেকেই নামানো ছিলো। হয়তো তার বাবা নামিয়েই দিয়েছিলো বাতাস আসার জন্য। মাহিরা রোডের অপর পাশে একটা আইসক্রিম এর দোকান দেখতে পায়। তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলে, আব্বু আমি আইসক্রিম খেতে চাই।
মোশাররফ হোসেন মুচকি হেসে বললেন, আচ্ছা আম্মু। তুমি একটু বসো।আমি আইসক্রিম নিয়ে আসছি। মোশাররফ হোসেন গাড়ি থেকে বের হতে নিলে মাহিরা বাধা দিয়ে বলে, না আব্বু। তুমি বসো ভাইয়ের কাছে। আমি গিয়ে আইসক্রিম নিয়ে আসছি। আমার যেটা যেটা ভালো লাগবে আমি বেছে বেছে সেই আইসক্রিম গুলো নিয়ে আসবো। প্লিজ আব্বু।
মাহিরার কথা ফেলতে পারলেন না মোশাররফ হোসেন। পকেট থেকে টাকা বের করে মাহিরার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, সাবধানে রাস্তা পার হবে আম্মু। ঠিক আছে? মাহিরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। তারপর গাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। সাবধানে রাস্তা পাড় হয়ে রোডের অপর পাশে আসে। মাহিরা আইসক্রিম এর দোকানে এসে বেছে বেছে কিছু আইসক্রিম নেয়।
বিকালে আয়ান কফি খায়। মালিহা বেগম বেশ অনেকক্ষণ আগে কফি পাঠিয়েছে। আয়ান তার হাতের কাজ শেষ করে কফি নিলো। জানালার পাশে দাড়িয়ে কফির মগে চুমুক দিচ্ছে আয়ান। হঠাৎ কাচের জানালা বেধ করে তার চোখ আটকালো রাস্তার ওপাশে। একটা মেয়ে দাড়িয়ে আছে দোকানের সামনে। মেয়েটি উল্টো ঘুরে দাড়িয়ে আছে তাই আয়ান মেয়েটির মুখ দেখতে পেলো না। মেয়েটির পিঠ ভৰ্তি চুল কোমড়ের নিচ পৰ্যন্ত ছড়িয়ে আছে। পিঠে ছড়ানো চুল গুলো দেখা যাচ্ছে মেয়েটির। মেয়েটি হাত নাড়িয়ে দোকানদার কে কিছু বলছে। বা কিছু দিতে ইশারা করছে।
আয়ান হাতে কফির মগ নিয়ে দাড়িয়ে আছে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটির দিকে। বিকেলের মিষ্টি রোদের আলোয় মেয়েটির কালো চুলগুলো চিকচিক করছে। হালকা মৃদু হাওয়ায় মেয়েটির কিছু চুল উড়ছে। সূর্যমুখি ফুল যেমন বিকেলের রোদে সূর্যের বিপরীতে মুখি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।তেমনি মেয়েটিও আয়ানের বিপরীত মুখি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আয়ান আনমনে বলে ওঠে, সানফ্লাওয়ার।
মেয়েটিকে একটিবার দেখার আকাঙ্গক্ষা জেগে উঠে আয়ানের মনে। আয়ান দাড়িয়ে রইল একই ভাবে। তার মন বারবার বলছে মেয়েটি যেনো একবার ঘুড়ে দাড়ায়। সে দেখতে চায় কে এই মেয়েটি? যে কিনা সূর্যমুখি ফুলের মতো তার সামনে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আয়ান ভেবে নিলো মেয়েটিকে না দেখা পর্যন্ত সে এখান থেকে এক পা ও নড়বে না। কিন্তু মেয়েটি তো ঘুরছে না। আর কতোক্ষণ এভাবে দাড়িয়ে থাকবে সে? আচ্ছা এটা কি তার পার্সোনালিটির সাথে যায়?
ভাবতে ভাবতে আয়ানের ফোন বেজে উঠলো। আয়ান শব্দ পেয়েও সরলো না। ফোন বেজে বেজে কেটে গিয়েছে। আয়ান এখনো দাড়িয়েই আছে সেভাবেই। কল কেটে আবারো ফোনে কল আসে। আয়ান এবার বেশ বিরক্ত হয়।এতোবার কে কল দেয় ভাই? আয়ান না চাইতেও জানালার কাছ থেকে সরে আসে। অফিসের কল ভেবে বিছানা থেকে ফোনটা হাতে তুলে নেয়। ফোনের স্কিনে তাকিয়ে দেখে রাফসানের কল। আয়ানের রাগ বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায় । আয়ান রেগে ফোন রিসিভ করে রাফসান কিছু বলার আগেই বলে ওঠে,
- ওই শালা। এতোবার কল দিচ্ছিস কেন ? তুই কি আমার বউ লাগিস? যে এতোবার আমাকে কল দিবি?
রাফসান থতমত খেয়ে গেলো আয়ানের এমন কথা শুনে। মনে মনে ভাবলো এর আবার কি হলো?একবার শালা বলছে। তো একবার বউ? রাফসান কাশি দিয়ে বলল, এতোবার কই দোস্ত ?মাত্র দুইবারই তো কল দিলাম।
আয়ান রেগে বলে, দুইবার কেন কল দিবি? দেখেছিস যখন প্ৰথম কল ধরিনি। আবার কেন কল দিতে গেলি? রাফসান অসহায় গলায় বলে, সরি দোস্ত। আমি বুঝতে পারিনি। রাগ করিস না প্লিজ। কি হয়েছে দোস্ত ? ঠিক আছিস তুই?
আয়ান এবার একটু শান্ত হয়ে বলে, কিছু হয়নি। বল কেনো ফোন দিয়েছিস? রাফসান আয়ান কে শান্ত হয়ে যেতে দেখে বলে, কখন আসবি তুই? সেটা জানার জন্যই কল দিছিলাম। একটু পর আসবো। বলেই ফোন কেটে দেয় আয়ান। রাফসান আর কিছু বললো না। সে জানে এ ছেলে তাড় ছিড়া। মাথা গরম হলে কে ওর কি হয় সব ভুলে যায়।
এদিকে মাহিরা দোকানে এসে বেশ ঝামেলায় পরলো। সে কিছু আইসক্রিম আর চকলেট কিনেছে । কিন্তু মাহিরা যখন দোকানদার কে হাজার টাকার নোট দেয়। দোকানদার সাফসাফ জানিয়ে দেয়, তার কাছে ভাংতি নেই। মাহিরা আশে পাশে তাকিয়ে দেখলো সব অপরিচিত মানুষ জন। হঠাৎ একটা ছেলে এসে মাহিরার পাশে দাড়ায়। ছেলেটা সিগারেট কিনতে এসেছে দোকানে। মাহিরা ছেলেটাকে দেখে বলল, ভাইয়া আপনার কাছে কি এক হাজার টাকা ভাংতি হবে? ছেলেটা মাহিরার দিকে একটু ভ্ৰু কুচকে তাকায়। তারপর মানিব্যাগ বের করে এক হাজার টাকা ভাংতি করে দেয় । মাহিরা খুশি হয়ে বলে, থ্যাংক ইউ ভাইয়া। ছেলেটা হেসে চলে যায়। মাহিরা দোকানদারের টাকা মিটিয়ে রোড পেরিয়ে ফিরে আসে গাড়ির কাছে।
আয়ান ফোন রেখে আবারো জানালার কাছে আসে। জানালার কাচ বেধ কর রোডের ওপাশে নজর দেয়। কিন্তু এবার সে আর রোডের ওপাশে কাউকে দেখতে পেলো না। আয়ান আশে পাশে চোখ ঘুড়িয়ে খুজলো মেয়েটিকে। মেয়েটির আর দেখা মিললো না। বরং দেখতে পেলো তাদের বাড়ির সামনে একটা কালো গাড়ি দাড়িয়ে আছে। সে মেয়েটিকে দেখতে না পেয়ে বেশ বিরক্ত হলো। এক মিনিটের ভেতরে মেয়েটা কোথায় হারিয়ে গেলো? আয়ান মনে মনে রাফসান কে ইচ্ছা মতো গালি দিলো। সামনে থাকলে এখনই রাফসানকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতো সে। রাগে এক জানালার সব পৰ্দা টেনে দেয় আয়ান।
__________
আছিয়া বেগম এর কথা শুনে চার ভাইয়ের কেউ কিছু বলতে পারলো না। সবাই মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে শুধু। শাজাহান শিকদার এবার আছিয়া বেগমের সামনে এসে দাড়ালো। নিচু স্বরে বলল, আমাকে মাফ করে দাও মা। আমি কখনো বুঝিনি তোমার মনের অবস্থা। কখনো বুঝিনি তোমার মনের কষ্ট। নিজের অজান্তেই তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি মা। প্লিজ মা তুমি আমাকে মাফ করে দাও। বলে শাজাহান শিকদার দু হাটু ঘেড়ে বসলো মায়ার পায়ের কাছে।
শাজাহান শিকদার দু হাত জুড়ে ক্ষমা চাচ্ছেন আছিয়া বেগম এর কাছে । প্লিজ মা আমাদের ছেড়ে যেয়োনা তুমি। বাবা তো সেই কবেই চলে গিয়েছে আমাদের ছেড়ে। তুমি ছাড়া আর কেউ নেই আমাদের মা। তোমাকে ছাড়া আমরা কেউ বাঁচতে পারবো না। তুমি যা বলবে তাই হবে মা। আমি পরীকে মেনে নিয়েছি মা। প্লিজ মা তুমি কোথাও যেয়েনা । আমাদের ছেড়ে যেয়োনা মা। প্লিজ।
আছিয়া বেগম ছেলেকে হাটু গেড়ে এভাবে বসে থাকতে দেখে বলল, উঠো শাজাহান। শাজাহান শিকদার উঠলো না। সে একই ভাবে বসে থেকে বললো, আগে বলো তুমি মাফ করে দিয়েছো আমাকে। তুমি আমাদের ছেড়ে কোথাও যাবেনা। বলো মা? ছেলের এমন আকুতি দেখে আছিয়া বেগমের বুক ফেটে যাচ্ছে। সে নিজেও এবার বসে পরলো ছেলের সামনে। শাজাহান শিকদারের দু হাত ধরে বলল, সন্তানরা হাজারটা ভুল করলেও মায়েরা তা মনে রাখে না। সন্তান মাফ চাওয়ার আগেই মায়েরা তাদের মাফ করে দেন। শাজাহান শিকদার নিৰ্বাক চোখে তাকিয়ে রইল আছিয়া বেগমের দিকে।
শাজাহান শিকদার দু হাতে ধরে আছিয়া বেগম কে দার করিয়ে দিলেন। নিজেও উঠে দাড়ালেন। পাশে দাড়িয়ে থাকা পরীর দিকে তাকিয়ে বলেন, তোর বড় ভাইকে মাফ করে দিস পরী। ভাই তোকে না চাইতেও অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলছি। প্লিজ বোন, ভাইয়ের ওপর রাগ করে থাকিস না। তোর ভাই মানুষের কথা সয্য করতে পারেনা জানিসই তো। তুই যখন পচিঁশ বছর আগে এ বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেলি। তখন মানুষজন অনেক কথা শুনিয়েছে আমাদের। সেগুলো মানতে না পেরে তোর প্ৰতি শুধু ক্ষোভ জন্মেছে । আর আজ যখন তোকে দেখলাম তখন সেই ক্ষোভ থেকে তোকে অনেক কিছু বলে ফেলেছি। প্লিজ বোন ভাইকে মাফ করে দিস?
পরী চোখ তুলে তাকায় শাজাহান শিকদারের দিকে। তার বড় ভাই তার কাছে মাফ চাচ্ছে? এটা পরীর কাছে ভালো লাগলো না। পরী বলে ওঠলো, এগুলো তুমি কি বলছো ভাইজান? আমি তোমাদের উপর কখনো রাগ করিনি। আমি যেটা করেছি সেটার জন্য আমার এর থেকে বেশি শাস্তি প্ৰাপ্ত ছিলো। আমি ভুল করেছি ভাইজান। আমার জন্য তোমাদের সম্মানহানী হয়েছে। তাই তোমরা সবাই আমাকে ক্ষমা করে দেও ভাইজান। পরী দু হাত জুড়ে মাফ চাচ্ছে।
শাজাহান শিকদার পরীর কথা শুনে বলে, তোকে আমি মাফ করে দিয়েছি পরী। আয় ভাইয়ের বুকে আয়। বলে দু হাত বাড়িয়ে দিলো পরীর দিকে। পরী ছলছল চোখে তাকিয়ে ভাইকে জড়িয়ে ধরে। হাউমাউ করে কেঁদে দেয় পরী। শাজাহান শিকদারের চোখেও পানি আসলো। পচিঁশ বছরের চাপা কষ্ট যেনো এক নিমিশে শেষ হয়ে গেলো। ভাইবোনের এমন ভালোবাসা দেখে উপস্থিত সকলের চোখে পানি দেখা গেলো এক এক করে আনোয়ার শিকদার জয়নাল শিকদার আরমান শিকদার সহ প্রত্যেকে এগিয়ে আসলেন।
চলবে...