#এ_দেখা_শেষ_না_হোক #পর্ব - (০৭)
#writer_sumaiya_akter_sathi
--
মুসকান আর মাহিরা একটা ক্যাফে তে বসে আছে।তাদের থেকে খানিকটা দূরে বসে আছে আয়ান। কানে ব্লুটুথ গুজে ফোনে কিছু একটা করছে সে।মাহিরা কফিতে চুমুক দিয়ে আশে পাশে তাকিয়ে মুসকানকে বলল, ক্যাফে টা কিন্তু বেশ সুন্দর মুসকান। মুসকান হেসে বলে, হ্যা। শপিং করতে আসলে আমরা মাঝেমধ্যেই এখানে বসি।
মাহিরা এবার বলে, নাবিলা আপুরা কখন আসবে মুসকান? আমরা বাসায় যাবো না? মুসকান হেসে বলে, চিন্তা করো না মাহিরা। আপুরা একটু পরই চলে আসবে। মাহিরা আর কিছু বললো না। পাশে তাকিয়ে দেখলো তিনটা মেয়ে আয়ানের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। আয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখে আয়ান তার ফোন নিয়ে ব্যাস্ত। মাহিরা নাক ছিটকায় মেয়েগুলোকে দেখে। মুসকানকে বলে,
- দেখো মুসকান মেয়ে তিনটা কিভাবে তোমার ভাইয়ের দেখছে । ওদের কি কোনো সেল্ফ রিস্পেক্ট নেই?
মুসকান মাহিরার কথা মতো পাশের টেবিলে তাকিয়ে দেখে তিনটা মেয়ে বসে বসে আয়ানকে দেখছে। তিন জনের পরনেই ওয়েস্টার্ন ড্রেস। মুসকান হেসে মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, আমার ভাই তো দেখতে একদম হিরোদের মতো। তাই মেয়েরা তো তার দিকে তাকাবেই। মাহিরা মুসকানের কথা শুনে ভ্রু কুচকায়। বলে, কোন দিক দিয়ে তোমার ভাইকে তোমার হিরো মনে হয়?
মুসকান মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, সব দিক দিয়েই মনে হয়। কেন তোমার মনে হয় না? মাহিরা ঝটপট উত্তর দেয়, না। মুসকান ভ্রু কুচকায়। বলে, কেনো?
মাহিরা এবার চোখ ঘুড়িয়ে আয়ানের দিকে তাকায়। যে এখনো ফোনের ভেতর ডুবে আছে। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, কারণ তোমার ভাই আস্ত একটা ভিলেন। দেখছো না? কেমন ভিলেনদের মতো চুল দাঁড়ি বড় বড় রাখে?
মুসকান এবার তার ভাইয়ের দিকে তাকায়। দেখে তার ভাইয়ের চুল দাঁড়ি একটু বড়ো হয়েছে। এতেও আয়ানকে বেশ অন্যরকম সুন্দর লাগছে। মুসকান মাহিরার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, আরে ভাইয়া তো সবসময় চুল দাঁড়ি বড় রাখে না। মাঝে মধ্যে রাখে আরকি। মাহিরা আর কিছু বললো না।
অর্নব মাত্রই ক্যাফে তে ঢুকেছে। ক্যাফেতে ঢুকেই অর্নবের চোখে পরে তিনটা মেয়েকে। যারা বসে বসে আয়ানকে চোখে গিলে খাচ্ছে । অর্নব আয়ানের পাশে এসে বসল। মেয়েগুলোর উদ্দেশ্য বলল,
- এই যে সোনামনিরা। নিজেদের চোখ হেফাজতে রাখো। বলা তো যায়না কখন আবার তোমাদের চোখ তোমাদের হাতেই উঠে আসবে?
মেয়েগুলো অপমানে চোখ নামিয়ে নেয়। অর্নবের কথায় আয়ান চোখ তুলে তাকায় মেয়েগুলোর দিকে। পরক্ষনে তাকায় মাহিরার দিকে। মাহিরা অর্নবের কথা শুনে তাকিয়ে ছিলো আয়ানদের দিকে। আয়ান তাকাতেই চোখাচোখি হয় দুজনের। মাহিরা চোখ নামিয়ে নেয়। আয়ান মৃদু ঠোঁট বাকায়।
মুসকান এবার অর্নবকে বলে,অর্নব ভাই? নাবিলা আপুরা কোথায়? অর্নব সহসা জবাব দেয়, ওদেরকে পাঁচটা ট্রাক ভাড়া করে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। মুসকান অবাক চোখে তাকায় অর্নবের দিকে। বলে, মানে? অর্নব আবারো বলে,
- কি আর করবো বল। এতো এতো শপিং করেছে ওরা। পাঁচটা ট্রাকেও জায়গা হচ্ছিলো না। কোনোমতে ঠেলেঠুলে ওদের পাঠিয়ে দিয়েছি।
মুসকান বুঝলো অর্নব মজা করছে। অর্নব আবার বল ওঠে, আচ্ছা মেয়েরা এতো শপিং করে কেনো বলতো? যা দেখছি, নাবিলার জামাই তো বিয়ের পর ফকির হয়ে যাবে। মুসকান বলে, তোমরা এসব বুঝবে না। মেয়েরা শপিং করতে অনেক বেশি ভালোবাসে। অর্নব অসহায় গলায় বলে ওঠে, হ্যা। এই ভালোবাসার চক্করে জামাইরা সব ফকির হয়ে যায়।
- বউদের ইচ্ছা পূরন করলে জামাইরা কখনো ফকির হয়ে যায়না ভাইয়া। বরং আল্লাহ তাদের উপার্জন আরো বেশি বরকত দেন।
মাহিরার মুখে এমন কথা শুনে অর্নব হা হয়ে চেয়ে থাকে মাহিরার দিকে। এই মেয়ে এতো কড়া কড়া কথা কোথা থেকে শিখেছে? অর্নব এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, তাই নাকি? তা তুমি কেমন জামাই চাও মাহিরা? বড়োলোক? নাকি..। অর্নব কথা শেষ করার আগেই মাহিরা বলে ওঠে,
- আমি তো আমেরিকান জামাই চাই ভাইয়া।
আয়ান হঠাৎ শব্দ করে কেশে উঠে। মাহিরা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো। কিন্তু আয়ানের কাশির শব্দ শুনে থেমে যায় সে। আয়ানের কানে ব্লুটুথ থাকলেও সেটা কানেক্ট করা ছিলো না। তাই সে মাহিরার প্রথম থেকে বলা সব কথাই শুনেছে। আয়ান মাত্রই কফিতে চুমুক দিয়েছিলো। মাহিরার কথা শুনে তার কফি মস্তিষ্কে উঠে যায়।
অর্নব উঠে আয়ানের পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। বলে, ভাইয়া তুমি ঠিক আছো? আয়ানের কাশি থামলে আয়ান বলে, ঠিক আছি। অর্নব আবারো তার জায়গায় গিয়ে বসে। মুসকান একটা পানির বোতল তার ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, ভাইয়া এটা নাও।
আয়ান পানি খেয়ে মাহিরার দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মনে হচ্ছে সে এক্ষনি মাহিরাকে কাচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। মাহিরা কিছুই বুঝলো না এই লোকের কি হলো হঠাৎ ? অর্নব মাত্রই কফিতে চুমুক দিতে যাচ্ছিলো। এমন সময় আয়ানের গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে আসে,
- এক মিনিটের ভেতরে ওদের নিয়ে বাইরে আয়।
অর্নব কফি থেকে চোখ সরিয়ে আয়ানের দিকে তাকালে দেখে আয়ান বেরিয়ে যাচ্ছে ক্যাফে থেকে। অর্নব দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার আর কফি খাওয়া হলো না। কিভাবে হবে? তার জিবনে যে আয়ানের মতো একজন হিটলার ভাই আছে। এমন ভাই জিবনে থাকলে ঘুম খাওয়া সব বিসর্জন দিতে হয়।
অর্নব উঠে দাঁড়ায়। মুসকানের দিকে তাকিয়ে বলে, চল এবার বাসায় যাওয়া যাক। মুসকান মাহিরা দু'জনে উঠে অর্নবের পিছু পিছু যায়।
আয়ান গম্ভীর মুখে গাড়ি চালাচ্ছে। আয়ানের গম্ভীর মুখ দেখে কেউ কোনো কথা বলছে না। মাহিরা অনেকক্ষন যাবত কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। কিন্তু তার সাহসে কুলাচ্ছে না। কিভাবে বলবে সেটাই ভাবছে সে? নিরবতা ভেঙ্গে মাহিরা বলেই ফেলে,
- আমি ফুচকা খেতে চাই..।
হঠাৎ গাড়ির ব্রেক কষায় সকলে বেলেন্স হারায়।আয়ান আয়নাতে তৃক্ষন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পেছনে বসা মাহিরার দিকে। মাহিরা আর মুসকান নিজেদের সামলে নেয়। অর্নব নিজেকে সামলে নিয়ে মাহিরাকে বলে, আমরা তো বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছি মাহিরা। এখানে তো আশেপাশে কোনো ফুসকার দোকান নেই।
মাহিরার মুখ কালো হয়ে যায়। সে বাংলাদেশ এসেছে আজ দুই দিন হতে চললো। আর এখনো সে ফুসকা খেতে পারেনি? তার দাদাবাড়ী থাকলে এতোক্ষনে নিশ্চয়ই তার বিশ প্লেট ফুসকা খাওয়া হয়ে যেতো। মাহিরা আর কিছু বললো না। মুখ কালো করে গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। আয়ান গাড়ির মিরর থেকে চোখ সরিয়ে গাড়ি স্ট্যার্ট দেয়। আয়ান সামনে গিয়ে গাড়ি ঘুড়িয়ে ইউটার্ন নেয়। অর্নব তা দেখে চেঁচিয়ে বলে,
- আরে কি করছো ভাইয়া? আমরা তো বাসার কাছে চলে এসেছি। এখন আবার কোথায় যাচ্ছো তুমি?
আয়ান হ্যা না কিছুই বলল না। নিঃশব্দে গাড়ি চালালো শুধু। মুসকান আর মাহিরা কিছুই বুঝলো না আয়ান কেনো গাড়ি ঘোড়ালো। আয়ান তাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা সকলের অজানা।
আয়ানের গাড়ি এসে থামে একটা ফুচকা চটপটির দোকানের সামনে। আয়ান গাড়ি থেকে নেমে দাড়ায়। তার দেখাদেখি অর্নবও বের হয় গাড়ি থেকে। অর্নব আয়ানের কাছে এসে বলে, এখানে কেনো আসলে ভাইয়া?
আয়ান গম্ভীর গলায় বলে, ফুচকা খেতে। অর্নব আয়ানকে তৃক্ষন্ন দৃষ্টিতে দেখে বলে, তুমি আবার কবে থেকে ফুচকা খাওয়া শুরু করলে? আয়ান কোনো উত্তর দেয়না। গম্ভীর গলায় মুসকানদের উদ্দেশ্য বলে,গাড়ি থেকে বের হ।
মুসকান মাহিরা দু'জনই গাড়ি থেকে বের হয়। মাহিরা গাড়ি থেকে নেমেই সামনে একটা ফুচকার দোকান দেখে খুশি হয়ে যায়। মুসকানকে বলে, মুসকান চলো আমরা ফুচকা খাই? অর্নব যেনো কিছুই বুঝতে পারছে না। তার ভাই বাড়ির কাছ থেকে এতে দুরে এসেছে শুধুমাত্র ফুচকা খেতে? লাইক সিরিয়াসলি? অর্নব এটা কিছুতেই মানতে পারছে না।
মুসকান আর মাহিরা চার প্লেট ফুসকার অর্ডার দেয়। এরপর দুইজনে এসে চেয়ার টেনে বসে। আয়ান আর অর্নব মাহিরাদের মুখোমুখি সামনে বসেছে। আয়ান ফোনে কিছু একটা করছে। অর্নব আশে পাশে তাকিয়ে দেখছে চারপাশটা। বিকেল হওয়াতে বেশ মানুষজন আছে চারপাশে।
ফুচকা আসলে মাহিরা আয়ান আর অর্নবের দিকে দুই প্লেট ফুসকা বাড়িয়ে দেয়। হাসি মুখে বলে, এটা আপনাদের। আয়ান ফোন থেকে চোখ সরিয়ে মাহিরার দিকে তাকায়। মাহিরার হাসি মুখটা দেখে শান্ত গলায় বলে, আই ডোন্ট লাইক ফুচকা।
মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বললো না। এই খাড়ুস লোক তাকে ফুসকা খেতে এনেছে এটাই অনেক। মাহিরা এবার অর্নবের দিকে তাকিয়ে বলে, ভাইয়া আপনি? অর্নব হেসে বলে, সেইম। মাহিরা আর কিছু না বলে খাওয়া শুরু করে।
অর্নব মুসকানের দিকে তাকিয়ে দেখছে মুসকান একের পর এক ফুচকা মুখে পুরছে। অর্নব এবার ধমক দিয়ে বলে,
- আস্তে খা। মরবি তো ফুসকা গলায় বেজে।
- অর্নব..?
অর্নব থেমে যায় আয়ানের গম্ভীর গলায়। এর সামনে আবার তার বোনকে কিছু বলা যায়না। অর্নব শান্ত গলায় বলে, সরি ভাইয়া।
মাহিরা দুই প্লেট ফুসকা অনায়াসে শেষ করে ফেলেছে । সে আরো দুই প্লেট ফুসকা দিতে বলেছে। এদিকে মুসকান দ্বিতীয় প্লেট ফুসকা খাচ্ছে। তার পক্ষে আর ফুচকা খাওয়া সম্ভব না।
আরো দুই প্লেট ফুসকা আসলে মাহিরা এক প্লেট মুসকানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, এই নাও মুসকান এটা তোমার। মুসকান দ্বিতীয় প্লেট ফুসকা খেতে খেতে বলে, আমার পক্ষে আর সম্ভব না মাহিরা। তুমি খাও। মাহিরা হেসে আবারো ফুচকা খেতে শুরু করে। আয়ান আড়চোখে তাকিয়ে দেখছে মাহিরার ফুচকা খাওয়া। মনে মনে বিরবির করে, ফুচকার আবার কি খায়?
মাহিরা এবার খেতে খেতে বলে, ইতালিতে যে এই ফুসকা কতোটা মিস করি মুসকান। সেটা তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। মুসকান পানি খেয়ে বলে, ফুপ্পি কে বলবে তোমার জন্য বাড়িতে বানাতে। মাহিরা বলে ওঠে, আম্মু তো মাঝেমধ্যেই বানিয়ে দেয়। কিন্তু আম্মুকে আমার কষ্ট দিতে একদমই ভালো লাগে না। মুসকান আর কিছু বললো না। সে বুঝলো মাহিরা তার ফুপ্পিকে অনেক বেশি ভালোবাসে।
মাহিরার খাওয়া শেষ হলে আয়ান বিল মিটিয়ে দেয়। মাহিরার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, আর কিছু খাবে? মাহিরা আয়ানেকে দেখে দু'পাশে না সূচক মাথা নাড়ায়। আয়ান আর কিছু না বলে গাড়ির কাছে চলে যায়। অর্নব,মুসকান,মাহিরা তিনজনই আয়ানের পিছু পিছু যায়।
________
ড্রয়িং রুমে বসে আছেন বাড়ির বড়রা। নাবিলার বিয়ের কার্ড ছাপা হয়েছে আজকে। সেগুলো চেক করছেন সবাই মিলে। এমন সময় মুসকান আর মাহিরা বাড়িতে ঢুকে। দুইজনের হাতেই শপিং ব্যাগ। শাজাহান শিকদার মুসকানকে হাতে শপিং ব্যাগ দেখে জিজ্ঞেস করেন, কই গিয়েছিলে তোমরা? মুসকান কিছু বলার আগেই পিছন থেকে আয়ান বলে ওঠে,শপিংয়ে।
আয়ান আর অর্নবকে দেখে শাজাহান শিকদার আর কিছু বললেন না। নিজেদের কাজে মনোযোগ দিলেন তিনি। মাহিরা আর মুসকানও আর কিছু না বলে উপরে চলে গেলো।
মাহিরা তার রুমে এসে শপিং ব্যাগ গুলো বিছানার উপর রাখে। সে নিজেও জানেনা এই ব্যাগে কি আছে। আয়ান তাকে কি দিয়েছে সেটা বলেনি একবারও। মাহিরা কিছুটা আগ্রহ নিয়ে শপিং ব্যাগ গুলো খুলতে শুরু করে। প্রথম ব্যাগ টা খোলা মাত্রই মাহিরা চমকে ওঠে।
একটা ব্লাক কালারের গরজিয়াছ পাকিস্তানি ড্রেস। ড্রেসটা অসম্ভব সুন্দর। মাহিরার এক দেখাতেই বেশ পছন্দ হলো ড্রেসটা। মাহিরা উল্টে পাল্টে দেখতে থাকে ব্লাক কালারের ড্রেসটা। বিরবির করে, মানুষ টা খাড়ুস হলেও তার পছন্দ টা বেশ সুন্দর।
মাহিরা খুশি হয়ে দ্বিতীয় ব্যাগটা খোলে। সেটাতে সে একটা হোয়াইট কালারের সুন্দর ড্রেস পায়। এই ড্রেসটাও বেশ সুন্দর। মাহিরার দুইটা ড্রেসই খুব বেশি পছন্দ হয়। মাহিরা দুইটা ড্রেস পাশাপাশি রেখে কিছু একটা ভাবে। মাহিরা ভাবছে এই লোক সবকিছুতে কেনো সাদা আর কালো পছন্দ করে?
মাহিরা মনে মনে ভেবে নেয়, তাকে এতো সুন্দর দুইটা ড্রেস কিনে দেওয়ার জন্য সে ওই খাড়ুস লোকটাকে একটা ধন্যবাদ জানাবে।
মাহিরা মুসকানের রুমের সামনে এসে উঁকি ঝুঁকি মারে। কিন্তু মুসকানকে খুঁজে পায় না। সে মুসকানেকে না পেয়ে মুসকানের রুমের সামনে পায়চারি করতে থাকে।
- এখানে কি করছো?
গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে আসতেই মাহিরা পিছন ঘুরে তাকায়। দেখে আয়ান দাঁড়িয়ে আছে। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, মুসকানকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। কোথায় গেলো মুসকান?
আয়ান মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, সবাই ছাদে আছে। মাহিরা বলল, ও আচ্ছা। মাহিয়া যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে নিলে আয়ান বলে ওঠে, কোথায় যাচ্ছো? মাহিরা সহসাই জবাব দেয়, রুমে। আয়ান শান্ত গলায় বলে, ছাদে যাবে না? মাহিরা ভ্রু কুচকায়। বলে,
- এতো রাতে ছাদে যাবো কোন দুঃখে?
আয়ান মাহিরার দিকে কিছুটা এগিয়ে এসে ধমক দিয়ে বলে,
- ইডিয়েট। সবাই ছাদে বার্বিকিউ পার্টি করছে। তুমি যাবে না কেনো?
মাহিরা এবার মিনমিনিয়ে বলে,আমার ভয় লাগে। আমি এতো রাতে ছাদে কিভাবে যাবো? আয়ান মাহিরাকে ভালো করে পরখ করে নেয়। বলে, আমার সাথে এসো। মাহিরা আর কিছু না বলে আয়ানের পিছু নেয়।
মাহিরা আয়ানের পিছু পিছু সিঁড়ি বেড়ে উঠতে উঠতে বলে, একটা কথা বলবো? আয়ান সিঁড়ি বেড়ে উঠতে উঠতে গম্ভীর গলায় বলে, বলো?
মাহিরা এবার আয়ানকে জিজ্ঞেস করে বসে,
- ড্রেস দুইটা কি আপনি পছন্দ করে কিনেছেন?
আয়ান আবারো গম্ভীর গলায় বলে,
- হ্যা। কেনো তোমার পছন্দ হয়নি?
মাহিরা হেসে বলে,
- হয়েছে। আমার খুব পছন্দ হয়েছে। ধন্যবাদ আপনাকে খাড়ুস লোক। আপনি দেখতে খাড়ুস হলেও আপনার পছন্দ কিন্তু অনেক সুন্দর।
আয়ানের পা থেমে যায়। হঠাৎ আয়ান দাঁড়িয়ে যাওয়ায় মাহিরা আয়ানের সাথে ধাক্কা খেয়েও খেলোনা। মাহিরা আয়ানকে থেমে যেতে দেখে বলে, থেমে গেলেন যে? ছাদে যাবেন না? আয়ান এবার মাহিরার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। বলে,
- তোমার সত্যিই ড্রেস দুইটা পছন্দ হয়েছে?
মাহিরা সহসাই জবাব দেয়, হ্যা। কতো সুন্দর ড্রেস দুইটা। পছন্দ হবেনা কেনো? আয়ান আর কিছু না বলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। মাহিরাও আয়ানের পিছু পিছু যায়।
ছাদে খুব সুন্দর করে লাইটিং দিয়ে সাজানো হয়েছে। নাবিলা আর অর্নব মিলে মুরগি বার্বিকিউ করছে। মুসকান আর নুপুর পাশে বেঞ্চে বসে আছে।
অর্নব কয়লার উপর গ্রীলে থাকা মুরগিতে ঘি ব্রাশ করতে করতে নাবিলার উদ্দেশ্য বলে, খাটিয়ে নে যে কয়দিন আছিস। নাবিলা অর্নবের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দেয়। বলে, হ্যা ভাইয়া। তারপর তো শশুর বাড়ি চলে যাবো। তুমি তখন শান্তিমতো থেকো কেমন?
অর্নব বলে ওঠে, নটাংকি থামা। আমার জীবনে কোনো শান্তি নাই। শান্তির মায় মইরা গেছে আমার জিবন থেকে। তুই চলে গেলেও আমাকে অশান্তি দেওয়ার মানুষ আছে এ বাড়িতে। নুপুর এবার পাশ থেকে বলে ওঠে, তা কে তোমার অশান্তির কারন ভাইয়া? অর্নব এবার ঘাড় ঘুরিয়ে নুপুরের দিকে তাকিয়ে বলে,
- তুই চুপ থাক নটাংকির বোন। নাহলে মুরগির পরিবর্তে তোকেই আজ বার্বিকিউ করবো।
অর্নবের কথায় নুপুরের মুখ চুপসে যায়। মুসকান এবার পাশ থেকে বলে ওঠে, তুমি নুপুরকে বকছো কেনো অর্নব ভাই? অর্নব মুখ বাকিয়ে বলে, ইশ আসছে আমার দরদিনি। এতোই যখন দরদ,তো আয় না। তুই এসে বার্বিকিউ কর।
মুসকান রাগে কটমট করে তাকিয়ে আছে অর্নবের দিকে। অর্নবকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মাহিরা সেখানে উপস্থিত হয়। মাহিরা মুসকানের পাশে এসে অভিমানি গলায় বলে, মুসকান তুমি আমাকে রেখেই ছাদে চলে আসলে কেনো?
মুসকান এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, সরি মাহিরা। আমি তো নাবিলা আপুর সাথে কাজ করছিলাম। সবকিছু ছাদে নিয়ে এসেছি। নিচে যেতে চেয়েছিলাম তার আগেই তুমি চলে আসলে।
মাহিরা কিছু বলতে যাবে তার আগে অর্নব বলে ওঠে , চিন্তা করোনা মাহিরা। তুমি সময় মতোই এসেছো। এই দেখো এখনো মুরগি হয়নি। আমরা তোমাকে ছাড়া কিচ্ছু খাইনি বিশ্বাস করো। এই দেখো মাত্রই দিয়েছি। হলেই সবার আগে তোমাকে খেতে দিবো কেমন?
অর্নবের কথা শুনে মাহিরা ফিক করে হেসে দেয়। বলে, ভাইয়া মুরগির প্রথম পিচ টা কিন্তু আমারই চাই'ই চাই । অর্নব হেসে বলে, টেনশন নেই মাহিরা। তুমিই পাবে।
প্রত্যয়,আদি,অভি সবাই ছাদে বল খেলছে। তারা তিন জন সমবয়সি হওয়াতে বেশ ভাব জমেছে তাদের ভেতরে। আয়ান মাহিরাদের মুখোমুখি সামনে বেঞ্চে বসে আছে। এমন সময় হঠাৎ আয়ানের কোলে একটা বল এসে পরে।
আদি,অভি, প্রতয় তিনজন বল খেলছিলো। প্রত্যয় পা দিয়ে জোড়ে বল মারায় বল গিয়ে আয়ানের কোলে পরেছে। তা দেখে আদি, অভি ভয়ে সিটিয়ে যায়। যে যার মতো আড়ালে লুকিয়ে পরে। প্রত্যয় একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে । তার কোনো হেল দোল নেই।
কোলে বল দেখে আয়ান ভ্রু কুচকে তাকায়। বল হাতে নিয়ে আশে পাশে চোখ ঘোড়ায় আয়ান। বোঝার চেষ্টা করে কোথা থেকে বল এসেছে? আয়ান ডান পাশে ঘুড়ে তাকালে দেখে প্রত্যয় দাঁড়িয়ে আছে। আয়ান হাতে ইশারা দিয়ে প্রত্যয়কে তার কাছে ডাকে। প্রত্যয় কিছু না ভেবে আয়ানের দিকে এগিয়ে যায়।
প্রত্যয় কাছে আসলে আয়ান গম্ভীর গলায় বলে, বয়স কতো তোমার? প্রত্যয় হাতের আঙ্গুলে কিছু একটা গুনে বলে, দশ। আয়ান এবার বলে, বল তুমি মেরেছো? প্রত্যয় উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলে, জ্বী ভাইয়া। আয়ান এবার রেগে যায়। ধমক দিয়ে বলে,
- ইডিয়েট। এটা বল খেলার জায়গা?
আয়ানের ধমকে প্রত্যয় কিছুটা কেঁপে উঠে। প্রত্যয় এবার মাথা নিচু করে মিনমিনিয়ে বলে, সরি ভাইয়া। আর হবেনা।
মাহিরা আর মুসকান কিছুটা দূরে থাকায় এতোক্ষন তারা কিছুই শুনতে পায়নি। আয়ানের ধমক কানে আসতেই মাহিরা এগিয়ে আসে। আয়ান আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো তার আগেই মাহিরা হাজির হয়। মাহিরা এসে দেখে প্রত্যয় মাথা নিচু করে আয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে,
- কি হয়েছে? আমার ভাইকে এভাবে বকছেন কেনো?
আয়ান বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসে বলে,
- সেটা তোমার ইডিয়েট ভাইকে জিজ্ঞেস করো।
মাহিরা এবার প্রত্যয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে প্রত্যয়কে। প্রত্যয়ের কাঁদো কাঁদো মুখ। মাহিরা বুঝলো প্রত্যয় কোনো ভুল করেছে। মাহিরা আর প্রত্যয়কে কিছু জিজ্ঞেস করলো না। কিছু জিজ্ঞেস করলেই এই ছেলে এখন কেদেঁ ভাসাবে। মাহিরা এবার আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, প্রত্যয় কোনো ভুল করে থাকলে সরি। বাট ওকে আর এভাবে বকবেন না। বুঝিয়ে বলবেন ও বুঝবে। মাহিরার কথায় আয়ান ভ্রু কুচকায়। কিছু বলতে যাবে তার আগে মাহিরা প্রত্যয়কে নিয়ে চলে যায়। মাহিরা যেতে যেতে প্রত্যয়কে বলে,
- তুই ওই খাড়ুস লোকের সামনে আর যাবিনা। ওই লোকের মাথায় সমস্যা আছে বুঝেছিস?
আয়ান মাহিরার বলা কথাটা শুনে নেয়। আয়ান রেগে বিরবির করে, ভাই বোন দুইটাই ইডিয়েট ।
বার্বিকিউ হয়ে গেলো অর্নব আর নাবিলা সবাইকে খেতে দেয়। মাহিরা খেতে খেতে অর্নবকে বলে, ভাইয়া আপনার হাতের বার্বিকিউ কিন্তু সবার সেরা। অর্নব হেসে বলে, ধন্যবাদ মাহিরা। কিন্তু তুমি আয়ান ভাইয়ের হাতের বার্বকিউ এখনো খাওনি। খেলে বুঝতে পারতে, ভাইয়ার হাতের বার্বিকিউ আরো বেশি সেরা । আমি তো ভাইয়ার কাছ থেকেই শিখেছি।
অর্নবের কথা শুনে মাহিরা আয়ানের দিকে হা হয়ে তাকায়। আয়ান বেঞ্চে বসে পায়ের উপর পা তুলে লাখ সাহেবের মতো বার্বিকিউ খাচ্ছে। মাহিরা বিরবির করে, এই খাড়ুস লোক বার্বিকিউ করতেও পারে?
আয়ান খাওয়ার ফাকে মাহিরার দিকে তাকালে দেখতে পায় মাহিরা তার দিকে তাকিয়ে আছে। আয়ান দূরে বসায় মাহিরাদের কথা কিছুই শোনেনি। আয়ান ভ্রু কুচকায়। বিরবির করে, এর আবার কি হলো হঠাৎ? আয়ান কে তাকাতে দেখে মাহিরা চোখ নামিয়ে নেয়। আবারো খাওয়ায় মনোযোগ দেয়।
রাত এগারোটা। আদি,অভি,প্রত্যয় খাওয়া শেষে নিচে চলে গিয়েছে। বাকিরা ছাদে বসে গল্প করছে।
নাবিলার আবদারে আজ ছাদে বার্বিকিউ পার্টি করা হয়েছিলো। নাবিলা এবার আয়ানকে বলল, ভাইয়া। চলো না আমরা ট্রুথ এন্ড ডেয়ার খেলি। আয়ান ফোনে চোখ রেখে বলে, আমি এসব খেলিনা। তোরা খেল।
মাহিরা এবার নাবিলার হাত ধরে বলে, আপু চলো তো। আমরা সবাই খেলি। এই খাড়ুস লোকের খেলতে হবে না আমাদের সাথে। নাবিলা চোখ বড় করে তাকায় মাহিরার দিকে। আয়ান ভাইকে এই মেয়ে খাড়ুস বলছে ? আয়ান কিছু না বলে ফোনে মনোযোগ দেয়।
ছাদের এক খোলা যায়গায় পাটি বিছানো হয়। মাহিরা, মুসকান, নাবিলা, নুপুর,অর্নব সবাই একসাথে গোল হয়ে বসে। অর্নব একটা বোতল নিয়ে আসে। খেলার আগে সবাইকে খেলার রুলস বলে দেয়। বোতলের মুখ যার দিকে ঘুরবে তাকে ট্রুথ বা ডেয়ার নিতে হবে।
অর্নব প্রথমে বোতল ঘোড়ায়। বোতল গিয়ে ঘোরে নুপুরের কাছে। অর্নব নুপুরকে ট্রুথ অথবা ডেয়ার নিতে বললে নুপুর ট্রুথ নেয়। অর্নব হেসে নুপুরকে বলে, যা বলবি একদম সত্যি বলবি। তুই আজ পর্যন্ত কতবার পরিক্ষায় নকল করেছিস বল?
অর্নবের এমন প্রশ্নে নুপুর গজগজ করছে। সবাই মিটিমিটি হাসছে। নুপুর এবার রেগে বলে, এটা কোনো প্রশ্ন হলো? ভালো প্রশ্ন করো তোমরা। অর্নব বলে, এটাই প্রশ্ন। তাড়াতাড়ি বল। কয়বার নকল করে পাশ করেছিস তুই? নুপুর এবার মিনমিনিয়ে বলে, তিনবার।
উপস্থিত সবাই জোরে হেসে দেয়। অর্নব হেসে বলে, আয়হায় তুই নকল করে এতোদিন পাশ করেছিস? দারা আমি কালই চাচ্চুকে জানাচ্ছি । নুপুর অসহায় গলায় বলে, প্লিজ না ভাইয়া। আব্বুকে কিছু বলো না।
মুসকান এবার বোতল ঘোরালে বোতল মুখ ঘুরে গিয়ে পরে মাহিরার সামনে। মাহিরা ট্রুথ নেয়। মুসকান মাহিরাকে প্রশ্ন করে, তোমার এমন একটা সিক্রেট বলো। যেটা তুমি ছাড়া আর কেউ যানেনা?
মাহিরা একটু ভেবে বলে,
- আমি আমেরিকান ছেলে বিয়ে করে আমেরিকায় সেটেল হতে চাই।
মাহিরার কথায় উপস্থিত সবাই হা হয়ে চেয়ে থাকে মাহিরার দিকে। আয়ান মাহিরার দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চোখ দিয়ে এখন আগুন বের হচ্ছে। যা উপস্থিত কেউই দেখলো না।
অর্নব অবাক হয়ে বলে, এতো দেশের ছেলে থাকতে আমেরিকান ছেলে কেনো মাহিরা? মাহিরা এবার বলল,
- কারণ আমেরিকা আমার সপ্নের দেশ। আমি শুনেছি ওই দেশ অনেক সুন্দর। সবাই যেতে পারে না ওই দেশে। ভাগ্য থাকলে তবেই যাওয়া সম্ভব। তাই আমি চাই কোনো আমেরিকান ছেলে বিয়ে করে খুব সহজেই আমেরিকা চলে যেতে।
অর্নব তাচ্ছিল্যর সাথে বলে, কি বলো? আমেরিকা যাওয়া কোনো ব্যাপার নাকি? আমি চাইলেই তো তোমাকে আমেরিকা পাঠাতে পারি। আমার এক বন্ধুও তো আমেরিকা থাকে।
মাহিরা উৎফুল্ল হয়ে বলে, সত্যি বলছেন ভাইয়া? তাহলে ওনাকে আমার কথা বলবেন প্লিজ? আমি একবার হলেও আমেরিকা যেতে চাই। অর্নব হেসে বলে, ঠিক আছে মাহিরা। আমি কালকেই তোমাকে ওর সাথে কথা বলিয়ে দি..।
- অর্নব..?
অর্নব কথা শেষ করতে পারে না। পিছন ঘুরে তাকালে দেখে আয়ান তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। আয়ানের চোখ অসম্ভব লাল। অর্নব বলে, কিছু বলবে ভাইয়া? আয়ান চোয়াল শক্ত করে বলে, নিচে আয়।
আয়ান আর কিছু না বলে হেঁটে চলে যায়। অর্নব আয়ানের যাওয়ার পানে হা হয়ে চেয়ে থাকে। পরপর ওঠে সেও চলে যায় আয়ানের পিছু। মাহিরা কিছুই বুঝলো না আয়ান অর্নব কে কেনো নিচে নিয়ে গেলো। উপস্থিত সবার একই অবস্থা। সবাই আবারো খেলায় মনোযোগ দেয়।
আয়ান নিচে নেমে সিঁড়ির কাছে এসে দাড়ায়। অর্নব আয়ানের পিছনে এসে বলে, কি হয়েছে ভাই..। কথা শেষ হওয়ার আগেই আয়ান হুট করে অর্নবের কলার চেপে ধরে। অণবকে কলার চেপে দেয়ালের সাথে খানিকটা উঠিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
- খোদার কছম অর্নব। আজ তুই আমার ভাই না হলে? তোকে আমি এক্ষনি তিন হাত মাটির নিচে পুঁতে ফেলতাম।
অর্নব কিছুই বুঝলো না তার অপরাধ কি? সে কি অপরাধ করেছে? নিজেই তো জানেনা কিছু। অর্নব আয়ানের দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বলে, আমি কি করেছি ভাইয়া?
আয়ান ঝাড়ি মেরে অর্নবের তার থেকে দূরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। অর্নব দু কদম পিছিয়ে পরতে নিলে নিজেকে সামলে নেয়। নিজেকে বেলেঞ্চ করে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, তোমার কি হয়েছে ভাইয়া? এমন বিহেভ করছো কেনো? আয়ানের রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। আয়ান দাঁতে দাঁত পিশে বলে,
- তুই ভাবিস না তুই ভাই বলে তোকে আমি ছেড়ে দিবো। তোকে পানিশমেন্ট পেতেই হবে। রেডি থাক পানিশমেন্টের জন্য।
বলেই আয়ান হাটা দেয়। অর্নব অসহায় গলায় বলে,আমার অপরাধটা কি ভাইয়া? আয়ান কিছু না বলে নিচে সিড়ির দিকে চলে যায়। যেতে যেতে গম্ভীর গলায় বলে,
- রাশেদের বাড়ির এড্রেস পাঠা। ফাস্ট।
আয়ান চলে যায়। অর্নব তাকিয়ে থাকে আয়ানের যাওয়ার পানে। অর্নব কিছুই বুঝতে পারছে না। হঠাৎ রাসেদ সাহেবের বাড়ির এড্রেস আয়ান কেনো চাইলো? তাও আবার এতো রাতে? আয়ানের রাশেদ সাহেবের বাড়ির এড্রেস চাওয়ার মানে অর্নব বুঝলো না।
অর্নব যখন রাশেদ সাহেব কে সকালে সব ঘটনা খুলে বলেছিলো। রাশেদ সাহেব ভয় পেয়ে তখন রাজি হয়ে যায়। বলেছিলো সে আয়ানের কাজটা করে দিবে। কিন্তু তার একপ্তাহ সময় লাগবে। অর্নব আয়ানকে এ কথা জানালে আয়ান তখন কিছুই বলে না। কিন্তু এখন আয়ানের রাশেদ সাহেবের বাড়ির এড্রেস চাওয়ার কারণ অর্নব খুঁজে পেলো না।
অর্নব আয়ানকে রাশেদ সাহেবের এড্রেস পাঠিয়ে দেয়। পরপর আয়ানের পিছু নেয় সে। আয়ান ততক্ষণে বাড়ির দরজা পেরিয়ে গাড়ির কাছে চলে এসেছে। আয়ান বাইকে উঠে হেলমেট পরতে নিলে অর্নব বলে ওঠে, এতো রাতে তুমি কোথায় যাচ্ছো ভাইয়া? আয়ান হেলমেট পরে বাইক স্টার্ট দিয়ে বলে, আমি না আশা পর্যন্ত ছাদে যাবিনা।
অর্নব কে আর কিছু বলতে না দিয়ে আয়ানের বাইকটি চলে যায়। অর্নব কিছুই বুঝলো না। আয়ান হঠাৎ তাকে ছাদে যেতে নিষেধ করলো কেনো ? কারনটা অর্নবের জানা নেই। অর্নব আবারো বাড়ির ভেতরে চলে যায়।
মাহিরা বোতল ঘোরায়। বোতোলের মুখ ঘুড়ে গিয়ে মুসকানের সামনে পরে। মুসকান ট্রুথ নেয়। মাহিরা মুসকানকে প্রশ্ন করে, তোমার জীবনের এমন একটা সপ্ন বলো। যেটা পূরন হলে তুমি সবচেয়ে বেশি খুশি হবে। মুসকান এবার হেসে বলে,
- আমার জীবনে একটাই সপ্ন। আমি যাকে ভালোবাসি সেও আমাকে ভালোবাসুক। যেদিন আমার এই সপ্নটা পূরন হবে। সেদিন আমি এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি খুশি হবো।
মাহিরা হা হয়ে চেয়ে থাকে মুসকানের দিকে। এই মেয়ে প্রেমও করে ? তার সাথে তো কতো কথা হয়েছে মুসকানের। কই তাকে তো বলেনি কিছু। মাহিরা এবার জোড়ে বলে ওঠে , কিহ..? তুমি প্রেম করো মুসকান? কই আমাকে তো বলোনি কখনো?
মুসকান ফিক কর হেসে দেয়। বলে, বোকা মাহিরা। প্রেম করলে তো বলতামই। প্রেম তো দূর। সে তো আমাকে পছন্দই করেনা। মাহিরা এবার কিছুটা রেগে হাঁটু গেড়ে বসে বলে, কার এতবড় সাহস? যে আমার এতো সুন্দর মায়াবীনিকে পছন্দ করেনা?
মুসকান হেসে বলে, আরে মাহিরা থামো থামো। রেগে যাচ্ছো কেন? সময় করে তোমাকে সব খুলে বলবো। এখন আসো তো । আমরা সবাই গানের কলি খেলি।
ঘন্টা খানেক পর আয়ান ফিরে আসে। বাড়ির ভেতর ঢুকতেই আয়ানের চোখ পরে ড্রয়িং রুমের দিকে। জিরো লাইট জালিয়ে অর্ণব বসে আছে। আয়ান এগিয়ে আসে অর্ণবের কাছে। বলে, রুমে যাসনি কেনো?
অর্ণব উঠে দাঁড়ায়। আয়ানকে ভালো ভাবে পরখ করে নেয় সে। তখন যেমন রেগে চলে গিয়েছিলো। এখন ফেরার পর একটু শান্ত লাগছে আয়ানকে। অর্ণব আয়ানের শরীর ঘুরেফিরে দেখে কোনো কাটা ফাটা আছে কিনা। তেমন কিছু দেখতে না পেয়ে অর্ণব সন্তির নিশ্বাস ফেলে।
আয়ান ভ্রু কুচকায়। বলে, কি দেখছিস এভাবে? অর্ণব এবার বলে, কোথায় গিয়েছিলে তুমি? আয়ান কিছু না বলেই হেটে সিঁড়ির দিকে চলে যায়। অর্ণব নিজেও আয়ানের পিছু নিয়ে যেতে বলে, রাশেদ সাহেবের বাড়ির এড্রেস কেনো নিয়েছো তুমি?
আয়ান সিঁড়ি বেড়ে উঠতে উঠতে বলে, ওরা ছাদ থেকে নামেনি? অর্ণব বলে, না। তুমি আমার কথার উত্তর দাও। আয়ান শান্ত গলায় বলে, সময় হলে সব জানতে পারবি।
মাহিরা'রা গানের কলি খেলছে। এমন সময় আয়ানের গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে আসে,
- তোরা এখনো ছাদে কি করছিস?
সবাই পিছন ঘুরে তাকায়। আয়ানের গম্ভীর মুখ দেখে সবাই কিছু বলার সাহস পায় না। নাবিলা আমতা আমতা করে বলে, আসলে ভাইয়া আমরা গানের কলি খেলছিলাম। তাই কখন সময় চলে গেছে খেলায় করিনি।
আয়ান এবার গম্ভীর গলায় বলে, রুমে যা সব। মাহিরা এবার আয়ানের কথার ফোড়ন কাটে। বলে, আমরা আরেকটু পরে যাবো। খেলা এখনো শেষ হয়নি আমাদের। আসো তো আপু আমরা আবার গানের কলি খেলি।
সবাই চোখের ইশারায় মাহিরাকে চুপ থাকতে বলে।
আয়ান শান্ত চোখে চেয়ে আছে মাহিরার দিকে। এই চেহারায় কি আছে আয়ান নিজেও জানেনা। আয়ান কোনো কিছু না বলে পাশে থাকা বেঞ্চে বসে পরে। অর্ণব আয়ানের পেছনে দাঁড়িয়ে সবটা খেয়াল করে। অর্ণবের মনে কিছু একটা খটকা লাগছে।
মাহিরা'রা সবাই আবার খেলায় মনোযোগ দেয়। অর্ণব আয়ানের পাশে বেঞ্চে বসে। আয়ানের হাব ভাব বোঝার চেষ্টা করছে সে। নাবিলা মুসকানের কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে, মুসকান। আয়ান ভাইকে বলোনা একটা গান শোনাতে। মুসকান বড় বড় চোখে করে তাকায় নাবিলার দিকে। নাবিলা চোখে ইশারা দিলে মুসকান আয়ানকে বলে, ভাইয়া একটা গান শোনাও না আমাদের। আয়ান মুসকানকের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
- থাপ্পড় খেতে না চাইলে তাড়াতাড়ি শেষ কর।
মুসকান আর কিছু বলার সাহস পায় না। নাবিলা এবার পাশ থেকে বলে ওঠে, প্লিজ ভাইয়া এক লাইন হলেও শোনাও। তোমার গান শুনিনা কতোদিন হলো। আমি তো দুই দিন পর এমনিতেই শশুর বাড়ি চলে যাবো। তখন চাইলেও আর তোমার গান শুনতে পারবো না। প্লিজ ভাইয়া একটা গান শোনাও না। তোমার গান শুনেই নিচে চলে যাবো। অর্ণব এবার পাশ থেকে বলে ওঠে,
- ওরে নটাংকি থাম এবার। আর কতো ব্লাকমেল করবি? শশুর বাড়ি যাবি বলে একটার পর একটা আবদার করেই যাচ্ছিস। শালি নাটক বাজ। তোর জামাইর কপালে নির্ঘাত দুঃখ আছে। তোর জামাই..!
- অর্ণব..?
আয়ানের গম্ভীর গলায় অর্ণব থেমে যায়। নাবিলা মুখ ফোলায়। আয়ান নাবিলার দিকে তাকিয়ে বলে, যা গিটার নিয়ে আয়। নাবিলা খুশি হয়ে এক দৌড় দেয়। মাহিরা হা হয়ে চেয়ে থাকে। এই লোক গানও পারে? সে ভেবে পায়না একটা খাড়ুস লোক আর কি কি পারে।
নাবিল আয়ানকে গিটার এনে দেয়। আয়ান গিটার হাতে নিয়ে ফ্লোরে পাটি বিছানো জায়গায় বসে পরে। অর্ণব অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে আয়ানের দিকে। মুসকান খুশি হয় তার ভাই তাদের সাথে বসায়। অর্ণব নিজেও এবার ওঠে গিয়ে আয়ানের পাশে বসে। সে আয়ানকে সত্যিই চিনতে পারছে না।
আয়ানের মুখোমুখি সামনে মাহিরা বসা। সবাই গোল হয়ে বসেছে। সবার মনে উৎফুল্ল। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকালে দেখে আয়ান তার দিকেই তাকিয়ে আছে। দু'জনেরই চোখাচোখি হয়। কিন্তু আজ আর কেউ চোখ সরায় না। আয়ান মাহিরার দিকে তাকিয়ে গিটারে সুর তুলে..
কত কি বলতে বাকি
কতটা চলতে বাকি..
তোর চোখের চাহনিতে বুক
কতটা গলতে বাকি..
কত কি বলতে বাকি
কতটা চলতে বাকি..
তোর চোখের চাহনিতে বুক
কতটা গলতে বাকি..
তোকে পেতে সব হারাতে
যাবো নীলচে নির্বাসন,
তোকে পেতে সব হারাতে
যাবো নীলচে নির্বাসন,
জানে মন.. তুই জীবন..
জানে মন..তুই জীবন..
গান শেষে সবার হাত তালির শব্দ ভেসে আসে। আয়ান সম্পূর্ণ গান মাহিরার চোখের দিকে তাকিয়ে গেয়েছিলো। মাহিরাও আয়ানের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলো। এই খাড়ুস লোকের গলা যে এতোটা সুন্দর মাহিরার আগে জানা ছিলো না। সে পুরোটা সময় একটা ঘোরের মধ্যে ছিলো। হাত তালির শব্দে মাহিরার ঘোর কাটে।
অর্ণব এতক্ষণ আয়ান আর মাহিরার দিকে চেয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ করছিলো। তার খটকা এখনো কাটেনি। বরং আয়ানের গান শুনে তা আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে।
আয়ানের এইটুকু গান শুনে সবাই মুগ্ধ হয়। মুসকান পাশ থেকে বলে, ভাইয়া অনেক সুন্দর ছিলো গানটা। নাবিলাও বলে ওঠে, ধন্যবাদ ভাইয়া আবদারটা রাখার জন্য। আয়ান কাউকে কিছু বলল না। অর্ণব পাশ থেকে বলে ওঠে, তোর নটাংকি শেষ হলে এবার নিচে যা। নাবিলা মুখ ভেঙচি মারে অর্ণবকে। তারপর সবাইকে নিয়ে নিচে চলে যায়।
চলবে..