#"পাতার বাঁশরি"
#" শ্যামোলতা"
"(১)"
মেঘডুবি—নামটা শুনলেই মনে হয়, কোনো এক শান্ত বিকেলে আকাশের মেঘ নেমে এসে এই গ্রামটাকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে।
গ্রামটা শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে। আঁকাবাঁকা মেঠোপথ ধরে এগিয়ে গেলে একসময় চোখে পড়ে সারি সারি কদম, বকুল আর শিউলি গাছ। বর্ষার দিনে সেই পথের দুপাশে জমে থাকা পানিতে আকাশের মেঘের ছায়া পড়ে থাকে। দূর থেকে মনে হয়, পথের মাঝেই যেন আকাশ ডুবে আছে—সেখান থেকেই গ্রামের নাম মেঘডুবি।
গ্রামের এক পাশে বিশাল একটি দিঘি। ভোরবেলা তার জলে কুয়াশা ভেসে থাকে, আর বিকেলের শেষ আলোয় পানিটা রুপালি হয়ে ওঠে। দিঘির পাড়ে পুরোনো একটি বটগাছ, যার নিচে গ্রামের মানুষজন বসে গল্প করে। বটগাছটার ডালে ডালে সারাদিন পাখিদের আনাগোনা।
মেঘডুবির বাড়িগুলো খুব বড় নয়। মাটির দেয়াল, টিনের চাল আর উঠোনজুড়ে তুলসী, জবা, গাঁদা আর বেলিফুলের গাছ। কোনো কোনো বাড়ির উঠোন থেকে ভেসে আসে রান্নার ধোঁয়া, কোথাও শোনা যায় শিশুদের হাসি, আবার কোথাও সন্ধ্যার আজানের সুর মিশে যায় পাখিদের ডাকে।
সন্ধ্যা নামলে মেঘডুবি যেন আরও বদলে যায়। মেঠোপথের ওপর নরম অন্ধকার নেমে আসে। গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে জোনাকি জ্বলে ওঠে। দূরের বাঁশবাগান থেকে বাতাস এসে শুকনো পাতাগুলোকে নড়িয়ে দেয়।
আর গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে আছে একটি পুরোনো, পরিত্যক্ত বাড়ি। দিনের আলোতেও বাড়িটাকে কেমন যেন অচেনা লাগে। গ্রামের মানুষজন খুব একটা সেদিকে যায় না। কেন যায় না—সে কথা কেউ স্পষ্ট করে বলে না।
তবু মেঘডুবি ভয় পাওয়ার মতো কোনো গ্রাম নয়।
বরং এর নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বহু মানুষের হাসি-কান্না, পুরোনো স্মৃতি আর এমন কিছু গল্প—যেগুলো হয়তো বছরের পর বছর ধরে কেউ কাউকে বলেনি।
মেঘডুবি যেন ঠিক তেমনই একটি গ্রাম—
যেখানে মেঘ শুধু আকাশে ভাসে না,
কখনো কখনো মানুষের জীবনের গল্পের মধ্যেও ডুবে যায়। আর এই গ্ৰামের এক ফুল চাষি যার ৮ বছর বিবাহিত জীবনেও তাদের ঘরে কোনো সন্তান ছিলো না। মানুষের কত কুটো কথা শুনতে হয়েছে সবুজ মিঞা আর তার স্ত্রী গুলবাহার কে। দীর্ঘ ৮ বছর পর সে গর্ববতী। এক অমর্বষার রাতে তার পোসক যন্ত্রনা উঠলো। এই অন্ধকার রাতে কেউ নেই তার পাশে। সবুজ মিঞা একটা হারিকেন নিয়ে বেরিয়ে পরলো এই গ্ৰামের দাইমার বাড়ির পথে। অনেক ডেকে তার ঘুম ভাঙিয়ে নিয়ে আসে সবুজ মিঞা। অদ্ভুত বিষয় হলো যেখানে পোসক যন্ত্রনায় সবাই চিৎকার করে সেখানে গুলবারের তেমন কোনো আর্তনাদ ও শোনা যাচ্ছে না। সব কেমন অদ্ভুত লাগলো দাইমার। কারণ আর বৃদ্ধ কালেও এমন কাওকে চুপ থাকতে দেখেনি তিনি।ফজরের আজানের পর গুলবাহার জম্মদিলো এক ফুটফুটে কন্যা।
নবজাতকের কান্নার আওয়াজ কানে আসতে খুশিতে কান্না করে দিলো সবুজ মিঞা। তার বাগানে ফুটে উঠলো শত শত ফুল। ঘরের চাল থেকে শুরু করে বাড়ির চারপাশে যত গাছ ছিলো তাতে বিভিন্ন জাতে পাখি এসে বসে মনের সুখে গান করতে শুরু করেছে। প্রকৃতি তে বইছে স্নিগ্ধ আর মিষ্টি বাতাস। বাগানের ফুলে ফুলে এসে বসতে শুরু করেছে হাজারো প্রজাপতি। সব কিছুর এই নতুন রূপ জানান দিচ্ছে আজ তাদের খুশির দিন। দাইমা নবজাতকে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে খুশি মনে হাসি মুখে
" এই দেখ সবুজ! তোর ঘরে পরির লেখাহ সুন্দার মাইয়া জম্মাইছে। আমাগো কইলাম সবাইরে মিষ্টি খাওয়ান লাগবো তোর!"
সবুজ মিঞা নিজের চোখের পানি মুছে অল্প হাসলো। মেয়ে কে কোলে নিলো দুহাত বারিয়ে। দাইমার দিকে তাকিয়ে
" আমার আজকে সব থেইকা খুশির দিন। আমি আব্বা হয়লাম। আমারেও কেও আব্বা ডাকবো। "
তারপর মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো
" আমার গুলবাহার কেমন আছে? "
দাইমা মৃদু হেসে জানায় সে ঠিক আছে। পরপর বাড়ির চারপাশে নজর বুলিয়ে
" আমি এসব কী দেখতাছি সবুজ? গ্ৰামে যত পাখি ছিলো সবই তো তোর মাইয়া ওহনের খুশিতে তোর বাড়ি চইলা আইছে!"
দাইমার কথা শুনে সবুজ তাকায় চারপাশে। তার বাগানে আজ রঙবে রঙের ফুল ফুটেছে। আর বাড়িতে এসেছে বিভিন্ন জাতের পাখি। যা আগে কখনো হয় নাই। চারপাশ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বলে
" দাইমা! আমি কী আমার গুলবাহারের কাছে যামু? "
দাইমা মুচকি হেসে যাওয়ার অনুমতি দেয়। সবুজ তার মেয়েকে কোলে নিয়ে গুলবাহারের কাছে গেলো। তার মাথার পাশে বসে কপালে চুমু দিয়ে বলো।
" আমি খুব খুশি আজ গুলবাহারর। আমাদের মেয়ে নাকী পরির মত হয়েছে। আজ থেকে ওর নাম "পরি"। জানো আমাদের পরি কে দেখতে প্রকৃতি আজ আমাগো বাড়িতে এসেছে। "
সেইদিন সবুজ মিয়া পুরো গ্ৰামের লোক কে মিষ্টি মুখ করান।
চলবে.........