ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রতিশোধ এর নেশা

১ম পর্ব

লেখক: রুহা মনি

ছোট একটা গ্রাম। নাম শান্তিপুর। চারপাশে সবুজ ধানক্ষেত আর পুকুর। শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলো দূরে। এখানে সকাল হয় মোরগের ডাকে, আর রাত নামে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে।

সেই গ্রামেরই মেয়ে নিলা। বয়স ১১। গায়ের রং শ্যামলা, চুল দুই বিনুনি। ক্লাস সিক্সে পড়ে। নিলা খুব শান্ত। সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকে। তার স্বপ্ন একদিন সে বড় ডাক্তার হবে। গ্রামের মানুষদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করবে।
নিলাদের পরিবার মধ্যবিত্ত। বাবা কৃষক। মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে। তারা দুই বোন। বড় বোন মেঘলা । বয়স ১৬। ক্লাস টেনে পড়ে। মেঘলা  দেখতে খুব সুন্দরী। লম্বা চুল, মায়াবী চোখ। কিন্তু গরিব বলে সবসময় পুরনো জামা পরে স্কুলে যায়।
*শীতের সকাল*  
কুয়াশায় ঢাকা চারপাশ। দুই বোন চাদর মুড়ি দিয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হলো। হাতে পুরনো ব্যাগ। পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল।
মেঘলা বললো, "নিলা তাড়াতাড়ি হাঁট। নাহলে স্যার বকবে।"  
নিলা হাসলো, "আপু তুমি এত সুন্দর কেন বলো তো? সবাই তোমার দিকে তাকিয়ে থাকে।"
মেঘলা লজ্জা পেয়ে বললো, "চুপ কর। মানুষের নজর ভালো না।"
স্কুলে যাওয়ার রাস্তাটা ছিলো একটা বাঁশ বাগানের পাশ দিয়ে। ওইখানেই প্রতিদিন ৪-৫টা বখাটে ছেলে দাঁড়িয়ে থাকতো। তাদের লিডার ছিলো রনি। এলাকার মেম্বারের ভাতিজা।
আজও তারা দাঁড়িয়ে ছিলো।  
রনি সিগারেট টানতে টানতে বললো, "বাহ মেয়েটা তো দেখতে সেই রে... আকাশের পরী নেমে আসছে।"  
পাশের ছেলে বললো, "নজর দিস না। এটা আমার।  আমার গার্লফ্রেন্ড হবে।"  
আরেকজন অশ্লীল ভাবে হাসলো।
নিলা আর মেঘলা কিছু বললো না। মাথা নিচু করে দ্রুত হেঁটে চলে গেলো।  
নিলা ফিসফিস করে বললো, "আপু চলো অন্য রাস্তা দিয়ে যাই।"  
মেঘলা বললো, "অন্য রাস্তা ১ ঘন্টার। আমাদের অত সময় নাই রে বোন।"
এভাবে প্রায়ই তারা অপমানিত হতো। কিন্তু মুখ বুঝে সহ্য করতো। কারণ রনিদের সাথে ঝামেলা করলে বাবার চাকরি থাকবে না।
*২ দিন পর*  
নিলার খুব জ্বর। গা পুড়ে যাচ্ছে।  
নিলা কাঁপা গলায় বললো, "আপু... আমি আজ স্কুলে যাবো না। তুমি একা চলে যাও।"  
মেঘলা কপালে হাত দিয়ে বললো, "ইশ জ্বর আসছে। আচ্ছা তুই ঘুমা। আমি তাড়াতাড়ি আসবো।"  
মা বললো, "মেঘলা মা সাবধানে যাস। আজকাল রাস্তা ভালো না।"  
মেঘলা বললো, "চিন্তা করো না মা। আল্লাহ ভরসা।"
মেঘলা একা বের হলো। আজ রাস্তা ফাঁকা। কুয়াশার জন্য কিছুই দেখা যাচ্ছে না।  
মেঘলা মনে ভাবলো, "যাক বাবা আজ বখাটে গুলা নাই। একটু শান্তিতে যেতে পারবো।"
হঠাৎ পেছন থেকে একটা কালো মাইক্রো এসে "ক্যাঁচ" করে ব্রেক করলো।  
মেঘলা বুঝে ওঠার আগেই ২টা ছেলে নেমে এসে তার মুখ চেপে ধরলো।  
মেঘলা ছটফট করতে লাগলো। "ম...মা... বাঁচাও"  
কিন্তু কুয়াশার কারণে কেউ শুনলো না।
চোখ-মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে তাকে গাড়িতে তোলা হলো। মেঘলা শুধু আল্লাহকে ডাকছিলো। "আল্লাহ আমাকে বাঁচাও।"
১৫ মিনিট পর গাড়ি থামলো। নদীর পাড়ের একটা পুরনো পরিত্যক্ত বাড়ি। এখানে কেউ আসে না। দিনের বেলাও অন্ধকার। এটা রনিদের নেশার আড্ডা খানা।
বাঁধন খুলতেই মেঘলা দেখলো, ঘরের এক কোণে ইয়াবা, গাঁজা, মদের বোতল ছড়ানো।  
সামনে দাঁড়িয়ে রনি আর তার ৩ সাঙ্গপাঙ্গ। সবাই নেশা করা চোখে মেঘলার দিকে তাকিয়ে আছে।
মেঘলা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো।  
"ভাইয়া প্লিজ আমাকে ছেড়ে দেন। আমি গরিব মানুষ। আমার বাবা-মা আছে। আমার কি ক্ষতি করেছি আমি?"  
কাঁদতে কাঁদতে রনির পা জড়িয়ে ধরলো।
রনি মেঘলার চুল ধরে টান দিয়ে বললো, "অনেক ভাব দেখাইছিস তাই না? আজ তোর ভাব ছুটাবো।"  
বলে লাথি মেরে মেঘলাকে দূরে ফেলে দিলো।  
তারপর ৪ জনই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।
মেঘলার চোখ দিয়ে শুধু পানি পড়ছিলো। আর মনে বলছিলো, "মেঘলা... কেউ... আমাকে বাঁচাও..."
চারদিকে নিস্তব্ধ আশে পাশে কোথয় কারোর সারা নেই। নিলার আর কিছুই করার ছিলো না। সকাল গড়িয়ে বিকেল হয়ে আসলো
ঐদিকে বাড়িতে মা-বাবা আর মেঘলা চিন্তায় পড়ে গেলো।কেনো এখনো নিলা আসলো না?? স্কুল তো আরো আগে ছুটি হয়ে যায়। মেঘলার মা মেঘলার বাবাকে বললো:" কি গো তুমি একটু দেখো না কি হলো?? 
নিলা তো কখনে এতো দেরি করে না।কোনো বিপদ হলো না তো আবার??
নিলার বাবা বের হয়ে গেলো মেয়ের খোজে সন্ধ্যা  ঘনিয়ে আসছে কিন্তু কোথাও মেঘলার খোঁজ নেই। এইদিক ওদিক পাগলের মতো লোক জন কে জিগ্গাস করছিলো বাবা:"" কেউ কি আমার মেঘলা কে দেখেছো??? কিন্তু কোথাও খোঁজ মিললো না। অবশেষে রাত ১০টায় এক বুক কষ্ট আর হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরলো নিলার বাবা। নিলা আর তার মা বার বার জিগ্গাস করলো  মেঘলা কোথায়? তার কি কোনো খোঁজ পাওনি? নিলার বাবা ছলছল চোখে বললো:' আসলে এয়ে আমি সারা গ্রাম খোজলাম, সবাইকে জিগ্যেস করলাম আমার মেঘলাকে কেউ দেখেছো?  কেউ দেখে নাই মেয়েটা কে আল্লাহ কোথায় চলে গেলো মেয়ে টা??
অন্যদিকে বখাটে রনি ও তার দলবল মিলে আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠে।তাদের উদেশ্য মেঘলার বুঝতে বাকি রয়লো না।যেকোনো ভাবে পালানোর রাস্তা খোঁজছিল মেঘলা কিন্তু সফল হতে পারলো না।
যখন রাত ১২ টা বাজলো চারদিকে অন্ধকার কোনো জন মানব নেই কোথাও। তখন বখাটে গুলো এক এক করে হিংস্র পশুদের মতো মেঘলাকে ভোগ করলো তারপর তাকে ফেলে আসলো গ্রামের একটা প্রাইমারি স্কুলের মাঠে।
একদম দূর্বল শরীল নিয়ে মেঘলা উঠে দাড়তে পারছিলো না।তারপরও অনেক কষ্টে নিজের বাড়ির সামনে এসে মা মা বলে ডাকতে  লাগলো।।
মেয়ের ডাক শুনে মায়ের কলিজা কেঁপে উঠল তারাতারি করে নিলা ও তার মা-বাবা বাইরে এসে যা দেখলো তা আর বলার মতো নয়।।
মেঘলার অবস্থা ছিলো ভয়াবহ। বাবা-মা লজ্জায় বিষয়টা কাউকে জানালো না। চুপচাপ মেঘলাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো। দিনের পর দিন চিকিৎসা চললো।
বাড়ি ফেরার পর মেঘলা একদম পাল্টে গেলো। আগের সেই হাসিখুশি মেয়েটা আর নেই। সারাদিন চুপচাপ জানালার পাশে বসে থাকে। কারো সাথে কথা বলে না। ঠিকমতো খাওয়াও না।
দুই দিন পর নিলা স্কুলের ড্রেস পরে তৈরি হচ্ছিলো। তখনই মা এসে কঠিন গলায় বললো,  
"তোরা আর কেউ স্কুলে যাবি না। তোদের আর পড়তে হবে না।"
কথাটা শুনে নিলার হাত থেকে বই পরে গেলো। কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,  
"কেনো মা? আমরা কি করেছি?"
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,  
"তোরা কিছু করিসনি মা। দোষ তোদের কপালের। গরীব ঘরে জন্ম নিয়েছিস, তাও আবার মেয়ে হয়ে।"
সেদিন আর কারো স্কুলে যাওয়া হলো না।
মেঘলা যেহেতু একদম চুপ, তাই নিলা ওর পিছু ছাড়তো না। সারাদিন বোনকে হাসানোর চেষ্টা করতো। গল্প শোনাতো, খেলা করতো। কিন্তু মেঘলার ঠোঁটে একটুও হাসি ফুটতো না। মুখ দিয়েও কোনো কথা বের হতো না।
মেঘলা কিছু না বলায় বাবা-মাও বুঝতে পারছিলো না আসলে কার সাথে কি হয়েছে। একদিন বাবা মেঘলার মাথায় হাত রেখে বললো,  
"মা, তুই আমাদের বল। কে তোর এই অবস্থা করেছে? আমরা চেষ্টা করবো। লাগলে মামলা করবো। আদালতে যাবো।"
মেঘলা তবুও চুপ। তখন নিলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। হাউমাউ করে কেঁদে বললো,  
"কেনো আপু কথা বলে না? আমার সাথে গল্প করে না? হাসে না?"
বোনের কান্না দেখে মেঘলার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সে নিলাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বললো,  
"এই পাগলি, কাঁদিস না। আমার কিছু হয়নি। দেখ আমি একদম ঠিক আছি। এই তো আমি কথা বলছি।"
মেঘলার কথা শুনে বাবা-মা একটু শান্তি পেলো।
তারপর মেঘলা আস্তে করে বললো,  
"বাবা-মা, আমি তোমাদের কিছু বলতে চাইনি। কারণ আমি জানি, বললেও তোমরা ওদের সাথে পেরে উঠবা না।"
বাবা রেগে গিয়ে বললো,  
"তুই নাম বল মা। কে বা কারা আমার মেয়ের এত বড় ক্ষতি করলো?"
মেঘলা নিলার সামনে বলতে চাচ্ছিলো না। কারণ নিলা ছোট হলেও খুব জেদি। এসব শুনলে উল্টা ঝামেলা করবে। তাই সে নিলাকে একটা কাজের অজুহাত দিয়ে অন্য ঘরে পাঠিয়ে দিলো।
নিলা চলে যেতেই মেঘলা কাঁপা গলায় বললো,  
"বাবা... রনি আর ওর বন্ধুরা... ওরাই আমার এই অবস্থা করেছে।"
নামটা শুনেই বাবার চোখ লাল হয়ে গেলো। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো,  
"আজকেই আমি রনির চাচার কাছে যাবো। এলাকার মেম্বার সে। ওর বিচার ও-ই করবে।"
এটা বলেই বাবা রনিদের বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলো।
ওদিকে দরজার আড়াল থেকে নিলা সব শুনছিলো। রাগে ওর সারা শরীর কাঁপছিলো। মনে মনে ভাবলো, মেম্বার চাচা নিশ্চয়ই রনিকে কঠিন শাস্তি দেবে।
---
বাবা রনির চাচা মানে মেম্বার সাহেবকে সব খুলে বললেন। মেম্বার প্রথমে নরম গলায় বললো,  
"ইশ, আমাদের ছেলে এমন কাজ করলো? এখন বলেন, কি শাস্তি চান? ছেলেকে তো আর মেরে ফেলা যাবে না।"
নিলার বাবা অসহায় ভাবে বললো,  
"মেম্বার সাহেব, রনিকে মারলে আমার মেয়ের সম্মান ফিরে আসবে না। এই মেয়েকে এখন আর কেউ বিয়ে করবে না। নিজের চোখের সামনে মেয়ের জীবন শেষ হতে দেখতে পারবো না।  
আপনি আপনার ভাতিজা রনিকে বলেন, আমার মেয়ে মেঘলাকে বিয়ে করতে। এটাই ওর উপযুক্ত শাস্তি।"
এই কথা শুনে মেম্বার সাথে রনির বাবাকে খবর দিলো। 
রনির বাবা এলাকার নামকরা টেরোরিস্ট লিডার। টাকা-পয়সার অভাব নেই। একমাত্র ছেলে রনি। বাবার আদর আর টাকার গরমে যা ইচ্ছা তাই করে বেড়ায়।
সব শুনে রনির বাবা ফোনে ধমক দিয়ে বললো,  
"এই ছোট একটা বিষয় তুমি সামলাতে পারছো না? এই জন্য টাকা দিয়ে তোমাকে মেম্বার বানাইছি?"
মেম্বার কাঁপা গলায় বললো,  
"ভাই, ব্যাপারটা একটু গুরুতর। তাই আপনাকে জানানো।"
রনির বাবা গর্জে উঠে বললো,  
"আচ্ছা। আমি আসছি কয়েকদিনের মধ্যে। তারপর দেখি ব্যাপারটা কত ঝামেলাজনক হয়।"
ফোন কেটে যেতেই ঘরের মধ্যে নেমে এলো ভয়ংকর নীরবতা। সামনে যে ঝড় আসছে, কেউ জানে না।
---চলছে---
লেখিকা : রুহা মনি 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন