ফন্ট সাইজ:
থিম:
এদেখা শেষ না হোক

১৩তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার সাথী

#এ_দেখা_শেষ_না_হোক #পর্ব - (১৩)

#writer_sumaiya_akter_sathi 
--
মাহিরা দৌড়ে সিঁড়ি বেড়ে নিচে নামছে। লাস্ট সিড়িতে নামতে না নামতেই মাহিরা কেয়ার সাথে ধাক্কা খায়। কেয়া সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে যাচ্ছিলো। মাহিরা কেয়াকে খেয়াল করেনি। কেয়ার সাথে ধাক্কা খেয়ে দুজনই সিঁড়িতে মুখ থুবরে পরে যায়। 
আয়ান মাহিরার পিছনে আসছিলো। মাহিরাকে পরে যেতে দেখে আয়ান ঝড়ের বেগে ছুটে এসেছে মাহিরার কাছে। মাহিরা ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠে। আয়ান ছুটে এসে মাহিরাকে ধরে আস্তে ধীরে দার করায়। অসহায় গলায় ব্যথাতুর কন্ঠে মাহিরাকে জিজ্ঞেস করে, আর ইউ ওকে মাহি? মাহিরা ব্যাথায় চোখ মুখ খিচে নেয়। ব্যাথায় সে মুখ দিয়ে কিছুই বলতে পারছে না। 
এদিকে কেয়াকে পরে যেতে দেখে মুসকান ড্রয়িং রুম থেকে ছুটে আসে। মুসকান কেয়াকে ধরে উঠিয়ে দেয়। বলে, একি কেয়া? তুমি কিভাবে পরে গেলে? কেয়া ওঠে দাঁড়ায়। বিরক্ত কন্ঠে বলে, এই অসভ্য মেয়েরাটার জন্যই তো পরে গেলাম। এই অসভ্য মেয়েটা আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। উফ আমার হাত টা শেষ করে দিলো। কতো জোরে ধাক্কা দিলো আমায়। 
মাহিরা তাকায় কেয়ার দিকে। কেয়াকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আয়ান হুংকার দিয়ে ওঠে,
- কুত্তার বাচ্চা তোর চোখ কোথায় থাকে। দেখে চলতে পারিস না? ধাক্কা দিয়ে আবার অসভ্য বলছিস কাকে? কলিজা বেশি বড় হয়ে গেছে না? এক টানে তোর কলিজা ছিঁড়ে ফেলবো আমি।
আয়ানকে এভারে রেগে যেতে দেখে মাহিরা কি করবে বুঝতে পারছে না। সে নিজেই তো কেয়াকে খেয়াল করেনি। আয়ানের হুংকার শুনে মালিহা বেগম রান্নাঘর থেকে ছুটে আসেন। মুসকানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, কি হয়েছে এখানে? মুসকান কিছু বলার আগে আয়ান আবারো হুংকার দিয়ে বলে, 
- তোমার ভাইজি কে আমার চোখের সামনে থেকে নিয়ে যাও মা। নাহলে ওকে আজ এখানেই পুঁতে ফেলবো আমি। 
মালিহা বেগম আয়ানের মুখে এমন কথা শুনে বলেন, এসব কি কথা আয়ান? ও তোমার মামাতো বোন হয়। মালিহা বেগম এবার কেয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, তুই কি করেছিস কেয়া? কেয়া ছলছল চোখে তাকায় মালিহা বেগমের দিকে। 
এদিকে মাহিরা কি বলবে বুঝতে পারছে না। তার জন্যই কেয়াকে গালি খেতে হলো । মাহিরার খুব খারাপ লাগছে কেয়ার জন্য। মাহিরা এবার বলে ওঠে, কেয়ার কোনো দোষ নেই মামুনি। আসলে আমি কেয়াকে খেয়াল করেনি। দৌড়ে নিচে নামছিলাম তখন কেয়ার সাথে ধাক্কা খেয়ে দুজনেই পরে গিয়েছি। মাহিরার কথা শুনে আয়ানের রাগ বেড়ে দ্বিগুণ হয়। আয়ান রেগে দাঁত চেপে বলে, 
- ওর চোখ কই ছিলো? ও কি অন্ধ? ও কেনো সরে দাড়ালো না সিঁড়ি থেকে? 
বলেই আয়ান এক সেকেন্ডেও নষ্ট না করে মাহিরার হাত ধরে সিঁড়ি বেড়ে হনহনিয়ে উপরে চলে যায়। মালিহা বেগম তব্দা খেয়ে চেয়ে থাকেন ছেলের এমন আচরণে। মুসকানও কিছুটা অবাক হয় তার ভাইয়ের এমন কান্ডে। ড্রয়িং রুমে কেউ না থাকায় মালিহা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুসকানকে দিকে তাকিয়ে বলেন, কেয়াকে রুমে নিয়ে যা। দেখ কোথাও ব্যাথা পেয়েছে কিনা। মুসকান কেয়াকে নিয়ে চলে যায়। 
আয়ান মাহিরার হাত ধরে তার রুমে নিয়ে আসে। মাহিরা ছাড়াতে চাইছে নিজের হাত কিন্তু পারছে না। আয়ান মাহিরাকে এনে তার বিছানায় বসিয়ে দেয়। মাহিরার দিকে তাকিয়ে রাগে কটমট করে বলে, এখান থেকে একটুও নড়বি না মাহি। মাহিরা আয়ানের রাগ দেখে আর কিছু বলার সাহস পেলো না। চুপচাপ বসে রইল শুধু।
আয়ান তার ড্রয়ার থেকে একটা বক্স নিয়ে আসে। মাহিরার পাশে বসে বক্স টা খুলতে থাকে। মাহিরা চুপচাপ দেখছে আয়ানের কর্মকান্ড। আয়ান বক্স থেকে খুঁজে একটা মলম বের করে নেয়। মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, হাত দে। মাহিরা নির্বাক ভঙ্গিতে তার এক হাত বাড়িয়ে দেয়। আয়ান মাহিরার হাত দেখে আবারো রেগে বলে ওঠে, 
- ইডিয়েট ডান হাত দে।
মাহিরা তাড়াতাড়ি তার ডান হাতটা বাড়িয়ে দেয়। আয়ান মাহিরার হাত ধরে উল্টাতেই দেখতে পায় কুনুইয়ের দিকে বেশ অনেকটা যায়গা ছিলে গিয়েছে। আয়ানের রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। মন চাচ্ছে কেয়াকে এক্ষনি দাফন করে আসতে।
মাহিরার ছিলে যাওয়া অংশে আয়ান আলতো হাতে মলম লাগিয়ে দেয়। মাহিরা কিছুটা আর্তনাদ করে উঠে। আয়ান ব্যথাতুর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, বেশি লেগেছে? মাহিরা চোখ মুখ খিঁচে দু পাশে মাথা নাড়ায়। 
আয়ান আর কিছু না বলে সযত্নে মাহিরার হাতে মলম লাগিয়ে দেয়। মাহিরা আয়ানে দিকে তাকিয়ে বলে, আপনি কেয়াকে ওইভাবে বকলেন কেনো। আয়ান কেয়ার কথা শুনে আবারো রেগে যায়।বলে, 
- ওই কুত্তার বাচ্চাকে আজ দাফন করিনি এটা ওর সাত জনমের ভাগ্য। 
মাহিরা আয়ানকে আবারো রেগে যেতে দেখে আর কিছু বলল না। কিছুক্ষণ পর আবারো বলে, আপনি মামুনির সামনে আমার হাত ধরলেন কেনো? আয়ান মাহিরার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে, সো হোয়াট? মাহিরা আবারো বলে, মামুনি যদি কিছু মনে করে? না মানে আপনি আমার হাত ধরেছেন সেটা দেখে যদি কিছু মনে করে? আয়ান এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে, 
- আই ডোন্ট কেয়ার মাহি। কে কি ভাবলো আর কে কি মনে করলো।
মাহিরা আর কিছু বলল না। সে জানে এই লোক কেমন ত্যাড়া প্রকৃতির। আয়ার এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে, আর কোথাও ব্যাথা পেয়েছো? মাহিরা কি বলবে বুঝতে পারছে না। সে তো হাঁটুতেও খানিকটা ব্যাথা পেয়েছে। মাহিরা আমতা আমতা করে বলে, না ৷ 
আয়ান মাহিরার হাতে মলম ধরিয়ে দিয়ে বলে, রুমে গিয়ে এক্ষনি এটা লাগিয়ে নিবে। গো ফাস্ট। মাহিরা আর কিছু না বলে ওঠে চলে যায়। মাহিরা যেতে যেতে ভাবে, সে তো মাত্রই আয়ানকে মিথ্যা বলেছে। আর আয়ান সেটা ধরেও ফেলেছে। তারপরও আয়ান তাকে কিছু বলল না কেনো? মাহিরা বুঝলো না এই লোকের মতিগতি। 
মাহিরা চলে গেলে আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই মেয়ের প্রতি সে দুর্বল। সেটা সে আগেও টের পেরেছে। এই মেয়েকে দেখা মাত্রই তার ভেতরে কি জেনো হয়। এই মেয়ের ব্যাথা সে একদমই সয্য করতে পারেনা। মন চায় সব কিছু ধ্বংস করে ফেলতে। এই মেয়ের কিছু হলে তার কলিজায় পানি থাকে না। সেটা আয়ান এই দুইবার টের পেয়েছে।
প্রথমবার যেদিন মাহিরাকে ঘুরতে নিয়ে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছিলো। আর আজ মাহিরার ব্যাথাতুর মুখ দেখে। এই মেয়ের কিছু হয়ে গেলে আয়ান কি করবে সে নিজেও জানেনা। এমন সময় আয়ানের ফোন বেজে ওঠে। আয়ান ওঠে ফোন রিসিভ করে।
মুসকান কেয়াকে রুমে নিয়ে আসে। কেয়া হাতে ব্যাথা পেয়েছে। ব্যাথার যায়গায় মুসকান মলম দিয়ে দেয়। কেয়া রাগে ফুসছে। ওই অসভ্য মেয়েটার জন্য আয়ানের কাছে তার গালি খেতে হয়েছে। কেয়া মুসকানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, ওই মেয়াটা কে মুসকান? মুসকান বুঝলো না কেয়া কার কথা বলছে। মুসকান বলে, কোন মেয়েটা? কেয়া রেগে আবারো বলে, ওই অসভ্য মেয়েটা। যার জন্য আমি পরে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছি। মুসকান আর কেয়া প্রায় সমবয়সি। মুসকান এবার কেয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,
- এভাবে বলো না কেয়া। ও আমাদের ফুপ্পির মেয়ে মাহিরা। মাহিরা অনেক ভালো একটা মেয়ে। তুমি ওর সাথে মিশলে বুঝতে পারবে।
কেয়া বিরক্ত হলো মুসকানের মুখে মাহিরার প্রসংশা শুনে। কেয়া বলে ওঠে, তোমার ফুপ্পিরা কবে যাবে এ বাড়ি থেকে? মুসকান ভ্রু কুচকায়। খানিকটা বিরক্ত হয় কেয়ার মুখে এমন কথা শুনে। মুসকান কেয়াকে বলে, ফুপ্পির নিজের বাড়ি এটা। ফুপ্পি পঁচিশ বছর পর এ বাড়িতে এসেছে। ফুপ্পির যখন মন চাইবে ফুপ্পি তখন যাবে। এইসব নিয়ে তোমাকে এতো ভাবতে হবে না কেয়া। এগুলো আমাদের পারিবারিক বিষয়। তুমি মাথা না ঘামালেও চলবে। আসছি আমি, তুমি রেস্ট নেও। বলেই মুসকান চলে যায় কেয়ার রুম থেকে। কেয়া এখোনো রাগে ফুসছে। সে ওই অসভ্য মেয়েকে দেখে ছাড়বে।
_________
আয়ান রেস্টুরেন্টে বসে কানে ব্লুটুথ গুজে ফোনে কিছু করছে। এমন সময় রাফসান আসে। আয়ানকে দেখে রাফসান ভুত দেখার মতো চমকে উঠে বলে, কিরে দোস্ত। তুই কখন এলি? আয়ান কিছুই বললো না। রাফসান চেয়ারে বসে আবারো বলে, আজ সূর্য কোন দিক দিয়ে উঠলো? টাইমের আগেই পৌঁছে গেলি? হাউ ইট পসিবল?
আয়ান রাফসানের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বলে, বাজে বকা বন্ধ কর। রাফসান হেসে বলে, ঠিক আছে বন্ধ করলাম। বল কেনো ডেকেছিস আমাকে। কোনো সিরিয়াস কিছু? আয়ান এবার গম্ভীর গলায় বলে ওঠে,
- দ্যা মোস্ট সিরিয়াস ম্যাটার অফ মাই লাইফ। 
রাফসান কিছুটা অবাক হয় আয়ানের মুখে এমন কঠিন কথা শুনে। হঠাৎ আয়ানের কি হয়েছে রাফসান বুঝলো না। যে ছেলেকে চিরুনি তাল্লাস করেও খুঁজে পাওয়া যেতো না। সেই ছেলে আজ রাফসানকে বারবার কল করে ডেকে এনেছে। রাফসান হেসে শরবতে চুমুক দিয়ে বলে, ওকে বল কেনো ডেকেছিস?
- আই ওয়ান্ট টু গেট ম্যারিড।
শরবত মুখ থেকে পরে যায়। রাফসান কেঁশে উঠে। শরবত রাফসানের নাকে মাথায় উঠে গিয়েছে। আয়ানের মুখে এমন কথা শুনবে রাফসান সেটা কল্পনাও করেনি। সে মাত্র শরবতটা চুমুক দিয়েছে। আয়ানের কথা শুনে তার আর শরবত খাওয়া হলোনা। সে আয়ানের দিকে তাকিয়ে কিছুটা ঝুকে বলে, তুই কি মাত্র বিয়ের কথা বললি? আয়ান বিরক্ত চোখে তাকায় রাফসানের দিকে। বলে, তুই কি কানে কম শুনিস?
রাফসান হেসে বলে ওঠে, না..না। কম শুনবো কেনো? বাট ঠিক শুনেছি কিনা সেটা শিওর হচ্ছি। যে ছেলের কোনো মেয়েকে দেখলেই গাঁ ঘিন ঘিন করে ওঠে। সে ছেলে নাকি বিয়ে করবে? হটাৎ তোর মুখে বিয়ের কথা শুনে আমি কনফিউজড। কানে ঠিক শুনলাম নাকি সেটাই শিওর হচ্ছি।
আয়ান গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, সো হোয়াট? মেয়েকে তুলে এনে যাষ্ট বিয়ে করবো। রাফসান চকমে ওঠে। বলে, কিহ বলছিস? তুই কি পাগল হয়ে গেলি? মেয়েকে তুলে আনবি কেনো? আয়ান এবার ফোনে চোখ রেখে বলে, মাই উইশ। রাফসান বলে ওঠে, তোর মাথা কি ঠিক আছে আয়ান? কি বলছিস ভেবে চিন্তে বলছিস তো? আয়ান কিছু না বলে ফোনে মনোযোগ দেয়। রাফসান কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে, উঠিয়ে এনে বিয়ে করলে আমাকে বলছিস কেনো? নিজে গিয়ে বিয়ে কর, যাহ্। আয়ান এবার ফোন থেকে চোখ সরিয়ে রাফসানের দিকে তাকায়। গম্ভীর গলায় বলে, 
- বিকজ আই ট্রাস্ট ইউ। এন্ড আমার বিয়েতে সাক্ষী হবি তুই। এটা তোর পানিশমেন্ট।
রাফসান ভ্রু কুঁচকে তাকায় আয়ানের দিকে। বলে, আমি আবার কি করলাম? কিসের পানিশমেন্ট আবার? আয়ান বিরক্ত হয়ে বলে, আমি এতো কৈফিয়ত দেই না। যেটা বলেছি সেটা কর।
মাহিরা মুসকানকে নিয়ে বাড়ির পেছনের বাগানে এসেছে। মাহিরা ছাদ থেকে অনেকবার দেখেছিলো এই বাড়ির বাগানটা। কিন্তু তার কখনো আশা হয়নি এখানে। তাই মাহিরা আজ মুসকানকে নিয়ে বাগান দেখতে এসেছে। মুসকান নিষেধ করেছিলো এই দুপুর বেলা না আসতে। কিন্তু মাহিরা মুসকানের কোনো কথাই শোনেনি। মুসকানকে টেনে নিয়ে এসেছে বাগানে।
মাহিরা ঘুরে ফিরে দেখছে কতো বড়ো বড়ো গাছ বাগানে। মাহিরা খেয়াল করে দেখলো এই বাগানে বেশির ভাগই ফলের গাছ। মাহিরা অবাক হয়ে মুসকানকে জিজ্ঞেস করে, তোমাদের বাগানে এতো ফলের গাছ কে লাগিয়েছে মুসকান? মুসকান হেসে বলে, এই বাগানের সব গাছ দাদীর হাতে লাগানো। 
ওয়েটার খাবার দিয়ে গিয়েছে। আয়ান কিছু না বলে খেতে শুরু করে। আয়ানকে খেতে দেখে রাফসানও খাওয়া শুরু করে দেয়। খেতে খেতে রাফসান আয়ানকে বলে, শুনলাম তুই নাকি ওইদিন আমার পুরো রেস্টুরেন্ট বুক করেছিলি? আয়ান খেতে খেতে বলে, শুনলে আবার জিজ্ঞেস করছিস কেন? 
রাফসান আর কিছু না বলে বলল, দোস্ত আজকের কাচ্চিটা অনেক বেশি মজা হয়েছে তাই না? কিছুদিন আগেই নতুন শেফ এনেছি রেস্টুরেন্টে। খাবার অনেক ভালো বানায়? আয়ান খেতে খেতে বলে ওঠে, হ্যা তোর মতোই জগণ্য।
রাফসানের মুখ কালো হয়ে যায়। বলে, এভাবে বলছিস কেন? কতো কষ্ট করে মেনেজ করেছি এই শেফটাকে জানিস? অনেক পুরোনো শেফ। সবাই তো এখন রেস্টুরেন্টে এসে খাবারের প্রশংসা করছে। বেঁচা কেনাও ভালো যাচ্ছে এখন। আমি ভাবছি এই শেফটাকে সারাজীবনের জন্য আমার রেস্টুরেন্টে রেখে দিবো। কি বলিস? ভালো হবে না? আয়ান খেতে খেতে আবারো বলে, খুবই খারাপ হবে। বরং আমার খুব আফসোস হবে ওই শেফের জন্য যে তোর রেস্টুরেন্টে সারাজীবনের জন্য জব করবে।
রাফসান আর কিছু বলল না। তাকিয়ে দেখলো আয়ান খুব মনোযোগ দিয়ে মজা করে খাচ্ছে। খাবার মজা না হলে আয়ান এই খাবার মুখেও তুলতো না। আর এখন কি সুন্দর মজা করে খাচ্ছে। তার মানে খাবার মজার ছিলো। রাফসান মনে মনে হাসে।
মাহিরা বাগানে ঘুরে ফিরে হঠাৎ একটা কামরাঙ্গা গাছ দেখে সেখানে দাড়িয়ে পরে। কামরাঙ্গা দেখে মাহিরার মুখে পানি চলে আসে। সে উৎফুল্ল হয়ে মুসকানের দিকে তাকিয়ে বলে, মুসকান আমাকে একটা কামরাঙ্গা পেরে দাও তো। মুসকান মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, আমি তো গাছে উঠতে পারিনা মাহিরা। কিভাবে পেরে দিবো? মাহিরা মন খারাপ করে বলে, তাহলে কি আমি কামরাঙ্গা খেতে পারবো না মুসকান? মুসকান মাহিরার মন খারাপ দেখে হেসে বলে, পারবে না কেনো? অবশ্যই পারবে। তুমি এখানে দাড়াও আমি রহমত চাচা কে ডেকে আনছি। মুসকান চলে যায় । মাহিরা একা দাঁড়িয়ে থাকে বাগানে।
খাওয়া শেষ। আয়ান আর রাফসান দুজনই বসে আছে মুখোমুখি চেয়ারে। আয়ান এবার রাফসানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, তোর গালফ্রেন্ট আছে? রাফসান কিছুটা ভ্রু কুঁচকায়। আয়ান কখনে তাকে এমন প্রশ্ন করেনি। রাফসান বলে, হ্যা আছে। কেনো? আয়ান সাথে সাথে বলে, কিভাবে পটালি? রাফসান বলতে থাকে, আমাদের তো পাঁচ বছরের রিলেশন। পাঁচ বছর আগে ওকে প্রপোজ করেছিলাম ও রাজি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তুই হঠাৎ এসব কথা জিঙ্গেস করছিস কেনো?
আয়ান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলে, কারন আমি যাকে বিয়ে করতে চাই সে আমাকে বিয়ে করতে চায় না। রাফসান হতভম্ব হয়ে তাকায় আয়ানের দিকে। বলে, কি বলিস? মেয়ে তোকে বিয়ে করতে চায় না? আয়ান সহসাই জবাব দেয়, না। রাফসান এবার কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে, আমি তো আরো ভাবলাম মেয়ে রাজি কিন্তু তার ফ্যামেলি মানছে না। কিন্তু এখন তো দেখছি মেয়ে শুদ্ধই রাজি না। তুই কি করতে চাচ্ছিস আয়ান? আমাকে একটু খুলে বলবি?
আয়ান কিছু না বলে ফোনে মনোযোগ দেয়। রাফসান আবারো বলে, তুই কি মেয়ের অমতে মেয়েকে তুলে এনে বিয়ে করতে চাইছিস?
আয়ান বলে ওঠে, ইয়েজ। রাফসান চকমে ওঠে সাথেসাথে বলে, তুই কি পাগল আয়ান? আয়ান কিছুই বলল না। রাফসান আবারো বলল, তুই তো কোনো মেয়েকে দেখতেই পারতি না। বিয়ে তো অনেক দূরের কথা। আর এখন শুনছি তুই বিয়ে করবি। কিন্তু যেই মেয়েকে বিয়ে করবি সেই মেয়ে তোকে বিয়ে করতে চায় না। বাই দ্যা ওয়ে, এটা কোন মেয়ে? যে আমার এতো সুন্দর হ্যান্ডসাম বন্ধুটাকে বিয়ে করতে চায় না? ওই মেয়ে কি জানে না? আমার বন্ধু কতো শতো মেয়ের ক্রাশ? আমার বন্ধুর পেছনে হাজারো মেয়ে লাইন দিয়ে পরে থাকে। আর সেই মেয়ে নাকি আমার বন্ধুকে পাত্তা দিচ্ছে না? ওই মেয়ে তো..
- রাফসান?
রাফসান থেমে যায়। আয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখে আয়ান কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। রাফসান আমতা আমতা করে বলে, সরি দোস্ত। আয়ান এবার রেগে বলে ওঠে,
- ওর নামে আর একটা বাজে কথা বললে তোকে আমি এখানেই পুঁতে ফেলবো।
বলেই আয়ান হনহনিয়ে চলে যায়। রাফসান আর কিছু বললো না। তাকিয়ে দেখলো আয়ান গটগট পায়ে বিল কাউন্টারের দিকে চলে যাচ্ছে। রাফসান বুঝলো আয়ান মেয়াটাকে নিয়ে খুব সিরিয়াস। আয়ান বিল কাউন্টারে এসে বিল মিটিয়ে দেয়। রাফসান আয়ানের পিছু পিছু এসে বলে, আমার বিলটাও দিয়ে যা। আয়ান রাফসানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে, নিজের টা নিজে দে। বলেই আয়ান চলে যায় রেস্টুরেন্টে থেকে। রাফসান দাঁড়িয়ে থেকে আনমনে হাসে।
আয়ান বরাবরই এমন। রাফসান যখন নতুন রেস্টুরেন্টে ওপেন করেছিলো। তখন রাফসান অনেক জোর করে আয়ানকে তার রেস্টুরেন্টে এনেছিলো। কিন্তু এখানেও আয়ানের একটা শর্ত ছিলো। আয়ান রেস্টুরেন্টে আসলে তার কাছ থেকেও বাকি সবার মতো বিল নিতে হবে। এটা ছিলো আয়ানের শর্ত। রাফসান তখন কোনো ভাবেই মানতে পারেনি একথা। তার একমাত্র কাছের বন্ধু আয়ান। তার কাছ থেকে রাফসান কিভাবে বিল নিবে? কিন্তু আয়ান এক কথার মানুষ। আয়ান সাফসাফ জানিয়ে দেয়। বিল নিলে তবেই সে রেস্টুরেন্টে যাবে। নাহলে সে কখনোই রাফসানের রেস্টুরেন্টে পা রাখবে না। রাফসান না পারতে আয়ানের শর্তে রাজি হয়। তখন থেকে আয়ান রেস্টুরেন্টে আসলে সম্পূর্ণ বিল পরিষদ করে তবেই যায়। 
মাহিরা বাগানে একা দাঁড়িয়ে আছে । এমন সময় মাহিরা অনুভব করে তার পিছনে কেউ একজন আছে। মাহিরা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়। কেয়া দাড়িয়ে আছে। মাহিরা কেয়াকে দেখে ভ্রু কুঁচকায়। সকালের কথা মনে পরতেই মাহিরা কেয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, সকালের জন্য সরি কেয়া। কিছু মনে করো না। কেয়া মাহিরার দিকে তাকিয়ে রাগে ফুসছে। 
কেয়াকে কিছু বলতে না দেখে মাহিরা আবারো বলে, কিছু বলবে কেয়া? কেয়া এবার বলে ওঠে, তোমার সাথে আয়ান ভাইয়ের কি চলে? মাহিরা কেয়ার কথার কোনো আগা মাথা বুঝলো না। মাহিরা বলল, আমার সাথে ওনার কি চলবে? কেয়া রেগে আবারো বলে, কিছু না চললে আয়ান ভাই তোমার হাত ধরলো কেনো? মাহিরা বিরক্ত হয়। আয়ান তার হাত ধরাতে এই মেয়ে উল্টা পাল্টা কিছু ভাবছে। মাহিরা এবার বলে ওঠে, সেটা তুমি তোমার আয়ান ভাইকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো। আমি তো আর ওনাকে বলেনি আমার হাত ধরতে।
কেয়া মাহিরার কথা শুনে আরো বেশি রেগে যায়। বলে, 
- শোনো মেয়ে। তুমি বিদেশ থেকে এসেছো যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব আবার বিদেশে চলে যাও। আমার আয়ান ভাইয়ের দিকে ভুলেও চোখ তুলে তাকানোরও চেষ্টা করবে না। আরেকদিন যদি দেখেছি তোমাকে আয়ান ভাইয়ের আশেপাশে? তাহলে এর ফল কিন্তু খুব বেশি খারাপ হবে বলে দিলাম। 
কথাগুলো বলেই কেয়া চলে যায় বাগান থেকে। মাহিরা বুঝলো না কেয়া কেনো তাকে এসব কথা বলেছে। এমন সময় মুসকান আসে। কেয়াকে চলে যেতে দেখে মুসকান মাহিরার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কেয়া চলেও যাচ্ছে কেনো? মাহিরা মুসকানের দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বলে, কেয়া হয়তো সকালের ঘটনার জন্য আমার উপর এখনো রেগে আছে। মুসকান হেসে মাহিরাকে বলে, বাদ দাও মাহিরা। ও একটু এমনই। রাগ কমে গেলে দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। মাহিরা আর কিছু বলল না। 
মুসকান রহমত চাচাকে সাথে করে নিয়ে এসেছে। মাহিরা রহমত চাচাকে দেখে মুসকানকে জিজ্ঞেস করে, উনি কে মুসকান? মুসকান হেসে বলে, উনার নাম রহমত আলী। আমরা সবাই উনাকে রহমত চাচা বলে ডাকি। উনি আমাদের বাড়ির সব গাছপালা দেখে শুনা করেন। মাহিরা হেসে বলে, রহমত চাচা কি গাছে উঠতে পারে?
রহমত চাচা এবার পাশ থেকে বলে ওঠেন, হ আমি গাছে উঠতে পারি? আমাগো গ্রামে থাকতে কতো গাছ বাইছি..। তুমি খালি কও কোন গাছে উঠতে হইবো? মাহিরা খুশি হয় রহমত চাচার কথা শুনে। মাহিরা হাত দিয়ে কামরাঙ্গা গাছ দেখিয়ে বলে, রহমত চাচা আপনি কি এই গাছটায় উঠতে পারবেন? রহমত চাচা কামরাঙ্গা গাছ দেখে বলেন, হ পারমু না কেন? মাহিরা খুশি হয়ে বলে, তাহলে আমাকে এই গাছ থেকে কিছু কামরাঙ্গা পেরে দিন। রহমত চাচা হেসে বলেন, তুমি খারাও। আমি এহনি গাছে উইঠা তোমারে কামরাঙ্গা পাইরা দিতাছি।
মাহিরা আর মুসকান গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। রহমত চাচা গাছে ওঠে পরলেন। মাহিরা রহমত চাচাকে তাড়াহুড়া দিয়ে বলে , চাচা একটু তাড়াতাড়ি পারেন। কামরাঙ্গা দেখে আমার জিহ্বায় পানি চলে আসলো। আর লোভ সামলাতে পারছি না। মুসকান মাহিরার কথা শুনে ফিক করে হেসে দেয়। বলে, একটু অপেক্ষা করো মাহিরা। চাচা তোমাকে এক্ষনি কামরাঙ্গা পেরে দিবে।
রহমত চাচা অনেক গুলো কামরাঙ্গা পেরে নিচে ফেললেন। মাহিরা মুসকান সেই কামরাঙ্গা গুলো কুড়িয়ে একজায়গায় করলো। মাহিরা একটা কামরাঙ্গা হাতে নিয়ে তাতে কামড় বসায়। কামরাঙ্গা টা একটু পাঁকা হওয়ায় টক-মিষ্টি আর রসালো লাগলো খেতে। মাহিরার কাছে বেশ ভালো লাগলো কামরাঙ্গাটা। মাহিরা এবার মুসকানের দিকে তাকিয়ে বলে, মুসকান এই কামরাঙ্গা গুলো লবন মরিচ দিয়ে মাখিয়ে খেতে আরো বেশি ভালো লাগবে।
মুসকান সম্মতি জানায় মাহিরার কথার। বলে, হ্যা ঠিক বলেছো মাহিরা। তুমি এখানে বসো আমি লবন আর মরিচ নিয়ে আসছি। মাহিরা খুশি হয়ে বলে, আচ্ছা তাড়াতাড়ি আসবে। মুসকান সম্মতি জানিয়ে চলে যায়। মাহিরা কামরাঙ্গা গুলো পাশের মাচার উপরে রাখে। বাগানে বাঁশ দিয়ে মাচা পেতে শুয়ে বসে থাকেন রহমত চাচা। মাহিরা কামরাঙ্গা গুলো মাচায় রেখে উপরে গাছে থাকা রহমত চাচার দিকে তাকায়। চেঁচিয়ে বলে, রহমত চাচা আমিও আপনার মতো গাছে উঠে কামরাঙ্গা পারতে চাই।
রহমান চাচা উপর থেকে চেঁচিয়ে বলেন, তুমি গাছ বাইতে পারতা না। আমি পাইরা দেই তুমি টোহাও।
মাহিরা অভিমানী গলায় বলে, না চাচা। আমিও গাছে ওঠে কামরাঙ্গা পারতে চাই। রহমত চাচা বলেন, তুমি কেমনে গাছে উঠবা কও? মাহিরা কিছু একটা ভেবে বলে, রহমত চাচা তোমাদের বাগানে কি মই নেই? তাহলে আমি মই বেয়ে গাছে উঠতে পারতাম। রহমত চাচা বলেন, পাশে আম গাছের লগে মই আছে। কিন্তু ঐইডা তো ছোডো মই। মই তো পুরা গাছ পাইবো না। তুমি পুরা গাছ উঠতে পারতা না।
মাহিরা খুশি হয়ে তাড়াতাড়ি গিয়ে আমগাছ থেকে মইটা নিয়ে আসে। মইটা তেমন একটা বড় না হওয়ায় মাহিরার আনতে কষ্ট হলো না। মাহিরা মই এনে কামরাঙ্গা গাছের সাথে দাড়া করায়। তারপর পা ফেলে মই বেয়ে উঠতে উঠতে বলে, রহমত চাচা আমি আসছি। আমিও আপনার সাথে গাছ থেকে কামরাঙ্গা পারবো।
রহমত চাচা গাছ থেকে মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলেন, সামধানে আও। তুমি এইহান থেইকা পইরা গেলে কিন্তু তোমার কোমর হাত পা সব ভাইঙ্গা যাইবো। মাহিরা হেসে বলে, আমার কিচ্ছু হবে না চাচা। 
মাহিরা মই বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। কিন্তু মই ছোটো থাকায় মাহিরা সম্পুর্ণ গাছে উঠতে পারলো না। অর্ধেক গাছ পর্যন্ত উঠে মাহিরা দেখলো মই শেষ। মাহিরা রহমত চাচাকে ডেকে বলে, চাচা মই তো শেষ হয়ে গেলো। রহমত চাচা বলেন, আমি তো তোমারে আগেই কইছিলাম তুমি উঠতে পারতা না মই ছোডো। নাইমা যাও তুমি।
মাহিরা জিদ ধরে বসে থাকে। বলে, না চাচা। আমি গাছে উঠবো। আমি আপনার মতো গাছ বেয়ে উপরে উঠছি। আপনি উপর থেকে আমার হাত ধরিয়েন তাহলেই হবে। রহমত চাচা তার হাত বাড়িয়ে দেয় মাহিরার দিকে। বলে, আইচ্ছা তুমি হাত দেও। মাহিরা রহমত চাচার দিকে এক হাত বাড়িয়ে যেইনা গাছের উপর পা রেখে উঠতে যাবে, ওমনি মাহিরা পা পিছলে নিচে পরে যায়। মাহিরা চিৎকার দিয়ে ওঠে, 
- আল্লাহ গো...বাঁচাও।
ধপাশ করে পরে যায় মাহিরা। ভয়ে মাহিরার চোখ আগে থেকেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মাহিরা চোখ বন্ধ রেখে জোরে জোরে চিৎকার করে নাকে কাঁদতে থাকে,
- ওমা গো..কে কোথায় আছো গো। আমাকে বাঁচাও গো। আমি মরে গেলাম গো। আমার কোমড়টা শেষ হয়ে গেলো গো। আমার সব শেষ হয়ে গেলো গো। আমি এখন কিভাবে আমেরিকা যাবো গো? এই ভাঙ্গা কোমর নিয়ে কে আমাকে বিয়ে কর..।
- সেট আপ।
কারো রাগী গম্ভীর গলা পেয়ে মাহিরা থেমে যায়। তাড়াতাড়ি চোখ মেলে তাকায় মাহিরা। মাহিরা চোখ মেলে তার সামনে আয়ানকে দেখতে পায়। মাহিরা ভ্রু কুঁচকায়। আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, খাড়ুস লোক। আপনি এখানে কেনো? আয়ান রাগী চোখে তাকিয়ে আছে মাহিরার দিকে। মাহিরা অনুভব করতে পারছে না তার শরীরে সব ব্যাথা গুলো। মাহিরা এবার নাকে কেঁদে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে,
- খাড়ুস লোক। দেখুন না গাছ থেকে পরে আমার কোমরটা একদম ভেঙ্গে গেলো। আমি তো কোনো ব্যাথাই অনুভব করতে পারছি না। মনে হয় শরীরটা অবশ হয়ে গিয়েছে। আপনি একটু আমাকে ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবেন প্লিজ? 
আয়ানে রেগে চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। আয়ান দাঁতে দাত চেপে বলে, 
- আর একটা ফালতু কথা বললে এক্ষনি তোকে এক আছার মারবো।
মাহিরা মন খারাপ হলো আয়ানের এমন কথা শুনে। তার কোমর ভেঙ্গে গিয়েছে আর এই লোক তার সাথে রাগ দেখাচ্ছ? মাহিরা আয়ানকে মুখ ভেঙ্গচায়। বলে, ঠিক আছে। আপনাকে লাগবেনা আমি একাই ডক্টরের কাছে যেতে পারবো। সরুন তো সামনে থেকে। খাড়ুস লোক একটা। আয়ান কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মাহিরার দিকে। মন চাচ্ছে এই মেয়েকে কাঁচা চিবিয়ে খেতে। 
মাহিরা এবার বসা থেকে উঠতে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না। মাহিরা বারবার চেষ্টা করেও উঠতে না পেরে বিরক্ত হয়। মাহিরা বিরক্ত হয়ে এবার ভালো ভাবে নিজের দিকে তাকায়। নিজেকে দেখে মাহিরার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যায়। মাহিরা শূন্যে ভাসছে। আরে সে তো নিচেই পরেনি। 
মাহিরা চোখ ঘুড়িয়ে এবার আয়ানের দিকে তাকায়। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখে আয়ান তাকে পাজা কোলে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। পরক্ষণে মাহিরা মুখ খুশিতে ভরে উঠে। তার কোমর ভাঙ্গেনি। এই খাড়ুস লোক তাকে বাঁচিয়ে নিয়েছে। মাহিরা মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে। পরপর আয়ানের দিকে তাকিয়ে খুশি হয়ে বলে, খাড়ুস লোক আমি নিচে পরিনি? মাহিরার কথায় আয়ানের রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। মন চাচ্ছে এই মেয়েকে এক্ষনি এক আছার মারতে। 
আয়ান মাত্রই বাড়িতে এসেছিলো। আয়ান বাড়ির ভেতরে ঢুকতে যাবে এমন সময় মুসকানের সাথে তার দেখা হয়। আয়ান দেখলো মুসকান হাতে লবন মরিচ নিয়ে কোথাও যাচ্ছে। আয়ান জিজ্ঞেস করলে মুসকান বলে, বাগানে যাচ্ছে মাহিরার সাথে কামরাঙ্গা খেতে। মাহিরা বাগানে শুনে আয়ান বিরক্ত হয়। সে আর বাড়ির ভেতরে না ঢুকে সোজা চলে আসে বাগানে। 
আয়ান বাগানে আসতে আসতে দুর থেকে দেখতে পায় মাহিরা মই বেড়ে উপরে উঠছে। তখনই আয়ানের মাথায় রাগ উঠে যায়। সে তাড়াতাড়ি পা ফেলে এগিয়ে আসতে থাকে মাহিরার কাছে। কিন্তু তার আগেই মাহিরা পা পিছলে পরে যায় গাছ থেকে। আয়ান ঝড়ের বেগে ছুটে এসে মাহিরাকে পাঁজা কোলে করে নেয়।
মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে খুশি হয়ে আবারো বলে, খাড়ুস লোক আমার কোমর তো ভাঙ্গেনি। আয়ান মাহিরার দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মন চাচ্ছে এই মেয়েকে এক আছার মেরে সারাজীবনের জন্য এই মেয়ের গাছে উঠার স্বাদ মিটিয়ে দিতে। এই মেয়ে সকালে সিড়ি থেকে পরে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছে। এখন আবার গাছ থেকে পরে যেতে নিচ্ছিলো। আয়ান আর এক সেকেন্ডে দেরি করে আসলে এই মেয়ে নির্ঘাত আজ হাত পা কোমড় সব ভেঙ্গে ঘরে বসে থাকতো। আয়ানের রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। সে মাহিরাকে তার কোল থেকে নামিয়ে দেয়। পরপর মাহিরার দিকে তাকিয়ে হুংকার দিয়ে ওঠে, 
- ইডিয়েট। কোন সাহসে তুই গাছে উঠেছিস? এক্ষনি গাছ থেকে পরে গেলে কি হতো তোর? আর কখনো যদি দেখেছি তোকে গাছে উঠতে? তাহলে আমি নিজ হাতে তোর হাত পা কোমড় সব ভেঙ্গে তোকে পঙ্গু বানিয়ে ঘরে বসিয়ে রাখবো।
মাহিরা কি বলবে বুঝতে পারছে না। এই লোকের মাথায় যে রাগ উঠে গেছে মাহিরা বুঝতে পারলো। এই লোকের সামনে তার বেশিক্ষণ থাকা চলবে না। কখন আবার রেগে ধুপধাপ মেরে দিবে বলা যায়না। মাহিরা কিছু না বলে পিছন ঘুরে হাঁটা দেয়। আয়ান তাড়াতাড়ি এসে পিছন থেকে মাহিরার হাত টেনে ধরে ডেকে ওঠে, মাহি..?
মাহিরার পা থেমে যায়। এই লোক তাকে এতো সুন্দর করে মাহি বলে ডেকেছে যে মাহিরা না থেমে পারলো না। মাহিরা পেছন ঘুরে তাকায় আয়ানের দিকে। খেয়াল করে দেখে একটু আগের রাগী মুখটা এখন আর নেই। মাহিরা চেয়ে থাকে আয়ানের মুখ পানে। এই লোককে সে সত্যিই বুঝে না। কখন কি করে সেটা এই লোক আর এই লোকের আল্লাহই ভালো জানে।
আয়ান মাহিরার সামনে এসে দাড়ায়। শান্ত গলায় বলে, তুমি গাছে উঠেছিলে কেনো। আয়ানের শান্ত গলা পেয়ে মাহিরা জবাব দেয়, কামরাঙ্গা পারতে। আয়ান এবার মাহিরার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, তোমার স্টারফ্রুট পছন্দ? মাহিরা উপর নিচ মাথা নাড়ায়। সম্মতি জানায় তার পছন্দ। আয়ান এবার মাহিরাকে হাত ধরে মাচায় বসিয়ে দেয়। বলে, ওয়েট করো। এই বাগানের সব স্টারফ্রুট তোমার জন্য পেরে আনছি। 
মাহিরা চোখ বড়ো বড়ো হয়ে যায়। সে চমকে তাকায় আয়ানের দিকে। এই লোক কি বলল? এই লোকের কি মাথায় সমস্যা? আয়ান মাহিরাকে রেখে চলে যায়। মাহিরা পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলে ওঠে, আরে আপনি কি পাগল হয়ে গেলেন নাকি? আমি এতো কামরাঙ্গা দিয়ে কি করবো? আয়ান যেতে যেতে গম্ভীর গলায় বলে,
- দিস ইজ ইয়োর পানিশমেন্ট মাহি। 
আয়ানের গম্ভীর গলায় পানিশমেন্ট কথাটা শুনে মাহিরার চোখ আরো বেশি বড়ো হয়ে যায়। এই লোক কি করতে যাচ্ছে? মাহিরা ভেবে পায় না। মাহিরা চুপচাপ বসে থাকে মাচার উপর। রহমত চাচা অনেক আগেই গাছ থেকে নেমে গিয়েছে। আয়ানকে দেখে সে আর মাহিরা কাছে আসার সাহস পায়নি। আয়ান চলে গেলে রহমত চাচা মাহিরার কাছে এসে দাড়ায়। বলে, 
- আমি তোমারে আগেই কইছিলাম গাছে উইঠো না। দেখলা তো স্যার কেমনে রাইগা গেলো? এহন তো স্যার তোমারে কঠিন শাস্তি দিবো। স্যার কিন্তু কাউরে ছাড়েনা। ভুল করলে সবাইরে শাস্তি দেয়। আমার তো ডর লাগতাছে তোমার লাইগা। তোমারে স্যার কি ভয়ংকর শাস্তি দিবো আল্লাহই ভালো জানে। 
মাহিরা শুকনো ঢোক গিলে। সে রহমত চাচার কথা শুনে আয়ানকে আরো বেশি ভয় পাচ্ছে। আয়ানের পানিশমেন্ট কি হতে পারে সেটাই ভাবছে মাহিরা। রহমত চাচা আবারো বলেন, 
- আমি যাই। স্যার আইয়া তোমার লগে কতা কইতে দেখলে আমারেও শাস্তি দিবো। সাবধানে থাইকো তুমি। 
বলেই রহমত চাচা চলে গেলেন। মাহিরা বসে রইল বাগানে। সে এখন কি করবে সেটাই ভাবছে। 
এক ঘন্টার ভেতরে আয়ান ছয় হাজার কামরাঙ্গা হাজির করে মাহিরার পায়ের কাছে । পুরো বাগান জুরে এখন শুধু কামরাঙ্গা আর কামরাঙ্গা। ঝুঁড়ি ভর্তি হাজার হাজার কামরাঙ্গা মাহিরার সামনে। মাহিরা জীবনেও একসাথে এতো কামরাঙ্গা দেখেনি। তার মনে হয় সে কোনো কামরাঙ্গার রাজ্যে চলে এসেছে। মাহিরা তার সামনে হাজার হাজার কামরাঙ্গা দেখে বিস্ময়ের চোখে তাকায় আয়ানের দিকে। এই লোক কি আসলেই পাগল? একটা সুস্থ সবল মানুষ কিভাবে ছয় হাজার কামরাঙ্গা খেতে পারে? 
আয়ান মাহিরার পাশে মাচায় বসে ফোনে কিছু করছে। আয়ান ফোনে চোখ রেখে মাহিরাকে বলে, খাওয়া শুরু করো মাহি। সবগুলো স্টারফ্রুট তাড়াতাড়ি ফিনিশ করবে। ফাস্ট। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, এতো কামরাঙ্গা দেখে আমার পেট ভরে গিয়েছে। আয়ান বাঁকা হেসে মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, 
- না খেয়েই পেট ভরে গেলো মেডাম? 
মাহিরা এবার আয়ানের দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বলে ওঠে, আমি এতো কামরাঙ্গা কিভাবে খাবো? আয়ান এবার রেগে দাঁত চিবিয়ে বলে, যেভাবে গাছে উঠেছো সেভাবে খাবে। মাহিরা ছলছল চোখে তাকায় আয়ানের দিকে। মিনমিনিয়ে বলে, 
- সরি। আর কখনো গাছে উঠবো না। এই বারের মতো আমাকে মাফ করে দিন প্লিজ..? 
আয়ান কিছু না বলে মাহিরার চোখের দিকে তাকায়। এই চোখ তাকে শেষ করে দিচ্ছে। মাহিরার হরিনি চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে আয়ানের ক্ষমতা হলোনা মাহিরাকে ফিরিয়ে দেওয়ার। আয়ান শান্ত চোখে মাহিরার চোখে তাকিয়ে আনমনে বলে ওঠে, ওকে। 
পরক্ষণে মাহিরার চোখ মুখে খুশির ঝিলিক দেখা যায়। মাহিরা খুশি হয়ে আয়ানের এক হাত ধরে বলে, থ্যাংক ইউ খাড়ুস লোক। আপনি অনেক ভালো। আয়ান শান্ত চোখে তার হাতের দিকে তাকায়। মাহিরা তার হাত ধরে রেখেছে। আয়ান মুচকি হেসে আবারো তাকায় মাহিরার দিকে।
চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন