ফন্ট সাইজ:
থিম:
এদেখা শেষ না হোক

৩২তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার সাথী

#এ_দেখা_শেষ_না_হোক #পর্ব - (৩২)

#writer_sumaiya_akter_sathi 
--
তুহিন মাহিরার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মেয়েটা কি বোকা নাকি? একটা মানুষ কথা বলেনা দেখে কি সে খুন করতে পারেনা? তুহিন বলে ওঠে, 
- নিরব প্রকৃতির মানুষদের মস্তিষ্ক আরো বেশি প্রখড় হয়। তারা আরো ভালো ভাবে নিরবে সব কাজ সেড়ে ফেলতে পারে।
মাহিরা এতো কঠিন বাংলা বুঝলো না। বলল, ভাইয়া প্লিজ বলুন। আরবিন ভাইয়া কাকে খুন করেছে। তুহিন মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, সব ঘটনা কি তোমার আজকেই জানতে হবে? আজ সব শুনে ফেললে কাল কি শুনবে? কালকের জন্য কিছুটা হলেও বাচিয়ে রাখো মেয়ে। মাহিরা বলে ওঠে, 
- কালকে তো আমি নাও বেঁচে থাকতে পারি ভাইয়া। আপনার বস আমাকে যখন তখন মেরে ফেলতে পারে।
তুহিন মাহিরার কথার ফোড়ন কেটে বলে, না আমি থাকতে তোমার কিছু হবেনা মেয়ে। বস তোমাকে কিছু করবে না। মাহিরা তুহিনের দিকে তাকিয়ে বলে, 
- এই কথাটা আপনার বসের কানে গেলে? সে সবার প্রথম আপনাকে গুলি করে মারবে, তারপর আমাকে গুলি করে মারবে। আমরা দুই ভাইবোন মিলে তখন চান্দে চলে যাবো। ঠিক বলেছি না ভাইয়া? 
তুহিন মাহিরার কথায় হেসে ফেলে। বলে, 
- আমি মরে গেলে আমার কবরটা যেনো আমার বোনের পায়ের কাছে হয় মেয়ে।
মাহিরা বুঝলো না তুহিন পায়ের কাছে কেনো বললো।বলে ওঠলো, পায়ের কাছে কেনো ভাইয়া? তুহিন মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, মরে গিয়ে যদি একটু মাফ পাওয়া যায় সেই চেষ্টায়। মাহিরা তাকিয়ে থাকে তুহিনের দিকে। কি সুন্দর আবদার তুহিনের। মাহিরা আবারো বলে, ভাইয়া আপনি কিন্তু বললেন না ভাই'থ্রি কাকে খুন করেছে। তুহিন মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, অন্যদিন বলবো মেয়ে এখন ঘুমাও। আমার খুব ঘুম পেয়েছে। বলেই তুহিন শুয়ে পরে। মাহিরাও আর কিছু বললো না তুহিনকে। তাকিয়ে দেখলো তুহিন উল্টো ঘুরে শুয়ে আছে। তুহিনের শরীর একটু পরপর কেঁপে উঠতে দেখে মাহিরা বুঝলো তুহিন কাঁদছে। তার থেকে কান্না আড়াল করতেই তুহিন ঘুমের কথা বলেছে। মাহিরা আর কিছু বললো না তুহিনকে। কাঁদলে যদি মানুষটার মনটা একটু হালকা হয়।
রাত দুইটা, আয়ান গোডাউনে ঢুকেছে। রেজওয়ানের সব গোডাউন তল্লাশি করা শেষ। শুধু মাত্র এই একটি গোডাউন বাকি আছে। আয়ান গোডাউনের এক একটি কোনা নিজে তল্লাশি করে দেখছে। রেজওয়ান মাহিরাকে কিডনাপ করার আগে এখানে লুকিয়ে ছিলো। আয়ান প্রতিটা কোনা তল্লাশি করেও কিছু না পেয়ে এক লাত্থি মারে পাশের চেয়ারের উপর। তখনই চেয়ারের সাথে লেগে একটা ময়লার ঝুড়ি উবুড় হয়ে পরে যায়। ঝুড়ি থেকে কিছু ময়লা চারপাশে ছড়িয়ে পরে থাকে। সাথে একটা মোড়ানো কাগজ গড়িয়ে আসে আয়ানের পায়ের কাছে। 
আয়ান কিছু না ভেবে কাগজটা হাতে তুলে নেয়। কাগজ টা মোড়ানো ছিলো দেখে আয়ান কাগজ টা খুলতে শুরু করে। কাগজটি একটি সমুদ্রের ম্যাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আয়ান এবার কাজটি মেলে টেবিলের উপর রাখে। তাকিয়ে দেখে ম্যাপের এক জায়গায় লাল দাগ করে বৃত্ত করা। আয়ানের আর বুঝতে বাকি নেই মাহিরা কোথায় আছে। এসব রেজওয়ানের আগে থেকে প্রি-প্ল্যান করা ছিলো। রেজওয়ান সব কিছু আগে থেকে প্ল্যান করে মাহিরাকে কিডনাপ করেছে।
আয়ান রাগে চোয়াল শক্ত করে কাগজটি মুষ্টি বদ্ধ করে ছুড়ে ফেলে দেয় দুরে কোথাও। পরপর গোডাউন থেকে বেরোতে নিলে অনর্ব সেখানে হাজির হয়। আয়ানকে দেখে বলে ওঠে, ভাইয়া তিন দিন ধরে সমুদ্রর মাঝে একটা জাহাজ আঁটকে আছে। এটা কি সন্দেহ জনক না? আয়ান এবার হুট করে অর্নবের কলার চেপে ধরে বলে, কুত্তার বাচ্চা এটা আগে বলিসনি ক্যান। ইশান অর্নবের পিছু পিছু আসতে আসতে বলে ওঠে, আমরা তো সকাল থেকে সেটাই বলার জন্যই আপনার পেছনে ছুটছি। কিন্তু আপনি তো আমাদের কোনো কথাই শুনলেন না। আয়ান অর্নবের কলার ছেড়ে দেয়। কিরবির করে ইশানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, তোর কবর আমি এসে খুঁড়বো দারা। বলেই আয়ান হনহনিয়ে চলে যায় গোডাউন থেকে। অর্নব আর ইশান দাঁড়িয়ে থাকে। 
তুহিন কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছে সে নিজেও জানেনা। অনবরত পায়ে লাঠি খেতে খেতে তুহিনের ঘুম ভেঙ্গে যায়। তুহিন ঘুম থেকে ধরফরিয়ে উঠে দেখে রেজওয়ান তাকে অনবরত লাথি দিয়ে যাচ্ছে। তুহিন রেজওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, বস আপনি কখন আসলেন? আপনি না বললেন আজ আসবেন না। রেজওয়ান তুহিনের কলার চেপে ধরে তুহিনকে দার করায়। কিরবির করে বলে ওঠে, কুত্তার বাচ্চা এই মেয়ের জন্য আয়ান আমার সর্বস্ব লুট করে ফেলেছে। আর তুই এই মেয়েকে বাঁচানোর জন্য উঠে পরে লেগেছিস? বলেই রেজওয়ান তুহিনের নাক বরাবরই এক ঘুষি মারে। 
তুহিন ছিটকে গিয়ে দুরে পরে যায়। নাক ফেটে রক্ত বের হয় তুহিনের। তুহিন হাত দিয়ে নাক মুছে উঠে দাঁড়ায়। বলে, বস আপনি টেনশন করবেন না। আয়ান শিকদার এই মেয়ের খোঁজ কখনো পাবে না। আমরা সমুদ্রের অনেক গভীরে আছি। আমরা নেটওয়ার্কের একদম বাইরে বস। আয়ান শিকদার চাইলেও কখনো এখানে আসতে পারবে না। দেখছেন না? তিন দিনেও আয়ান শিকদার আমাদের ধরতে পারলো না? 
রেজওয়ান নিজের মাথার চুল নিজে টেনে ধরে কিরবির করে বলে, আমার সব লুটে নিয়েছে ওই শুয়োরের বাচ্চা। শুধু মাত্র এই মেয়ের জন্য? হোয়াই? কিভাবে সম্ভব? আমি ওর জন্য কি না করেছি? ও এই মেয়ের জন্য আমাকে নিঃস্ব করে দিলো? এই মেয়েকে আমি আর বাচিয়ে রাখবো না তুহিন। এই মেয়েকে আমি এক্ষনি জালিয়ে দিবো। আমার কোনো পেট্রোলের প্রয়োজন নেই।বলেই রেজওয়ান তাড়াতাড়ি তার পকেট হাতরিয়ে লাইটার খুজতে শুরু করে। তুহিন তা দেখে চমকে উঠে বলে, 
- বস..বস মাথা ঠান্ডা করুন। প্লিজ এমন কিছু করবেন না। এই মেয়ে নির্দোষ, এই মেয়ে কিছুই করেনি। যা করার আয়ান শিকদার করেছে। আপনি যা করার উনার সাথে করুন।
রেজওয়ান ধাক্কা দিয়ে তুহিনকে দুরে সরিয়ে দেয়। দাঁত কিরবির করে বলে, কুত্তার বাচ্চা ওর জন্য দরদ দেখাতে আসলে তোকে সহ জ্বালিয়ে দিবো। তুহিন আবারো রেজওয়ানের কাছে এসে বলে, বস দরকার হয় আমাকে জ্বালিয়ে দেন। তারপরও এই মেয়েকে ছেড়ে দিন। আমার বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছে নেই। প্লিজ বস, আমাকে জ্বালিয়ে হলেও এই মেয়েকে আপনি বাচিয়ে রাখুন।
রেজওয়ান তার পকেট থেকে লাইটার বের করে বিদ্ঘুটে এক হাসি হাসে। তুহিন রেজওয়ানের হাতে লাইটার দেখে হুট করে এবার রেজওয়ানের পা আকড়ে ধরে বলে, বস আমি আপনার পায়ে পরি। প্লিজ বস এই মেয়েকে ছেড়ে দেন। এই মেয়েকে প্লিজ জ্বালাবেন না। রেজওয়ান তার পা মোচড়া মুচড়ি করে তুহিনের থেকে নিজের পা ছাড়াতে চেয়ে বলে, আমার পা ছাড় তুহিন। তুহিন আরো শক্ত করে রেজওয়ানের পা আকড়ে ধরে। বলে, বস প্লিজ এই মেয়েকে ছেড়ে দিন। এই মেয়ে কিচ্ছু করেনি। এই মেয়ে নির্দোষ।
রেজওয়ান এবার এক লাথি মেরে তার পা ছাড়িয়ে নেয় তুহিনের থেকে। তুহিন ছিটকে আবারো কিছুটা দুরে পরে যায়। পরে গিয়ে তুহিন কপালে আঘাত পায়। রেজওয়ান তুহিনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, এই মেয়ের বাঁচার কোনো অধিকার নেই তুহিন। যতোদিন বেঁচেছে সেটাই অনেক। বলেই রেজওয়ান লাইটার জ্বালিয় মাহির দিকে ছুড়তে যাবে তখনই তুহিন চেঁচিয়ে বলে ওঠে, 
- আপনার বউয়ের কসম বস। এই মেয়েকে আপনি জ্বালাবেন না।
পরক্ষণে রেজওয়ানের হাত থেমে যায়। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে কসম করা হারাম। রেজওয়ান সেটা জানা সর্তেও সে তার হাতে থাকা লাইটার ছুড়ে দুরে ফেলে দিয়ে ঝড়ের বেগে এসে তুহিনকে একের পর এক ঘুষি মারতে মারতে বলে, কুত্তার বাচ্চা তুই এসবের মাঝে আমার বউকে টেনে আনলি কেন? আমার ইমোশন নিয়ে খেলিস তোরা সব না? তোরা সব গুলা বেইমান। সব কয়টায় এক। আমার সব বেইমানদের সাথে দেখা হয়েছে।
রেজওয়ান অনবরত তুহিনকে মেরে হাঁপিয়ে উঠলে তুহিন কে ছেড়ে দিয়ে সে হনহনিয়ে ছাদ থেকে চলে যায়। তুহিনের নাক মুখ ফেটে রক্ত বের হতে থাকে। তুহিন উঠে বসে তাকায় মাহিরার দিকে। মাহিরার মুখে কস্টেপ। সে তাকিয়ে আছে তুহিনের দিকে। অনবরত চোখের পানি পরছে মাহিরার চোখ বেয়ে। সে এতোক্ষণ সব দেখেছে রেজওয়ান কিভাবে তুহিনকে মেরেছে। তুহিন মাহিরার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, এই মেয়ে তুমি কাঁদছো কেনো? একদম চোখের পানি ফেলবে না। 
তুহিনের কথায় মাহিরার কান্না আরো বেশি বাড়ে। তার মুখে কস্টেপ থাকায় সে কিছুই বলতে পারে না মুখ দিয়ে। আরবিন এসে তুহিনকে পানি দিয়ে বলে, ভাই আপনি কেনো বসের অবাধ্য হচ্ছেন। এই মেয়ে তো আপনার রক্তের কেউ হয় না ভাই। তুহিন কুলি করে পানি খায়। আরবিনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
- সব সম্পর্ক রক্তের কেন হতে হবে? 
আরবিন আর কিছু বলতে পারলো না। তুহিন এসে মাহিরার মুখের কস্টেপ খুলে দেয়। মাহিরা এখনো কাঁদছে। তুহিন তা দেখে বলে ওঠে, এই মেয়ে তোমাকে বলেছি না কান্না থামাতে? মাহিরা কেঁদে কেঁদে হেঁচকি তুলে বলে, ভাইয়া আপনি আমার জন্য কেনো এতো মার খেলেন? আমাকে না হয় আজ জালিয়েই দিতো। আমি মরে যেতাম। তুহিন ফটাফট বলে ওঠে,
- আমি আমার এক বোনকে হারিয়েছি, আরেক বোনকে হারাতে পারবো না। 
বলেই তুহিন চলে যায়। মাহিরা তুহিনের যাওয়ার পানে তাকিয়ে আরো জোরে জোরে কাঁদতে থাকে।
ফজরের ওয়াক্ত চলছে। আয়ান দাঁড়িয়ে আছে জাহাজের ছাদে। হাতে তার জলন্ত সিগারেট। যেটাতে সে একটু পরপর টান দিচ্ছে। ফাহিম এসে আয়ানের পাশে দাড়ায়। বলে, স্যার আমরা তো অনেক গভীরে চলে আসলাম। এখনো কেনো রেজওয়ানের জাহাজটা আমরা দেখতে পাচ্ছি না? আয়ান জলন্ত সিগারেটে টান দিয়ে বলে ওঠে,
- তোর মনে হয় চুলকানি হচ্ছে। বেশি চুলকানি হলে বল সাগরের পানিতে চুবিয়ে আনি। 
পরক্ষণে ফাহিমের মুখ কালো হয়ে যায়। ফাহিম আর কিছু বলতে পারে না আয়ানকে। এমন সময় জাহাজের নাবিক এসে জানায় জাহাজটি আর সামনের দিকে যাচ্ছে না। কিছুর সাথে আঁটকে পরেছে জাহাজটি। আয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। আয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলে, বোট রেডি কর ফাহিম। ফাহিম বলে ওঠে, স্যার এতো বড়ো সাগরে বোট চালোনো টা রিক্স হয়ে যাবে। প্রাণের ঝুঁকি আ..। ফাহিমের সম্পুর্ন কথা শেষ হওয়ার আগেই থাস করে এক থাপ্পড় পড়ে ফাহিমের গালে। আয়ান ফাহিমের গালে কষিয়ে এক থাপ্পড় মেরে বলে, 
- কুত্তার বাচ্চা তোকে জ্ঞান দিতে বলেছি? বোটে কি তুই যাবি নাকি আমি যাবো? 
ফাহিম ছোট করে বলে, সরি স্যার। আয়ান আর কিছু না বলে হনহনিয়ে চলে যায়। 
অনবরত এলার্ম বাজার শব্দে রেজওয়ানের ঘুম ভেঙ্গে যায়। এখনো চারপাশ অন্ধকারে ছেয়ে আছে। তা দেখে রেজওয়ানের মাথায় রক্ত উঠে যায়। একটু আগেই ঘুমিয়েছে সে। এখন আবার ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। রেওয়াজ বিছানা থেকে উঠে বসে। এলার্ম কোথায় বাজছে সেটা দেখার জন্য সে ছুটে নিচে চলে যায়। 
পাঁচ মিনিট যেতে না যেতেই রেজওয়ান হাঁপাতে হাঁপাতে আবারো ফিরে আসে। তুহিনকে অনবরত ধাক্কা দিয়ে উঠিয়ে তোলে। তুহিন হুড়োহুড়ি তাড়াতাড়ি চোখ মেলে তাকায়। দেখে রেজওয়ান অনবরত হাঁপাচ্ছে। তা দেখে তুহিন বলে ওঠে, কি হয়েছে বস? আপনি এভাবে হাঁপাচ্ছেন কেনো? রেজওয়ান হাঁপাতে হাঁপাতে অস্পষ্ট স্বরে আওড়ায়, আয়..আয়ান। তুহিন বুঝতে না পেরে বলে, দাড়ান বস আগে আপনার ইনহেলার নিয়ে আসছি। বলেই তুহিন রেজওয়ানের বিছানা থেকে ইনহেলার নিয়ে এসে রেজওয়ানের হাতে দেয়।
রেজওয়ান তাড়াতাড়ি ইনহেলারে নেয়। তুহিন বলে ওঠে, বস কি বলছিলেন এবার বলুন। রেজওয়ান শ্বাস নিয়ে বলে ওঠে, কুত্তার বাচ্চা আয়ান আসছে। তুহিন চমকে উঠে আয়ানের কথা শুনে। বলে ওঠে, অসম্ভব বস। আয়ান শিকদার এখানে কিভাবে আসবে? তার তো এখানের খোঁজ পাওয়া কখনোইও সম্ভব না। রেজওয়ান উঠে দাড়িয়ে কিরবির করে বলে, 
- এর্লাম বেজেছে তুহিন। বিপদ ঘনিয়ে আসছে, আমি শিওর আয়ান আসছে। 
তুহিন বলে ওঠে, বস অন্য কেউও তো হতে পারে। রেজওয়ান এবার তুহিনের কলার চেপে ধরে বলে ওঠে, 
- কুত্তার বাচ্চা, এই সমুদ্রের এতো গভীরে কি তোর বাপ আসবে আমাদের মিষ্টি বিলাতে? 
তুহিন বলে ওঠে, বস আপনি এতো ভয় পাচ্ছেন কেনো? আপনার কাছে তো অস্ত্র আছে। আসলেই এক একটারে শেষ করে দিবেন। রেজওয়ান তুহিনের কলার ছেড়ে দিয়ে বলে, অস্ত্র সবসময় কাজে আসে না তুহিন। এই মেয়েকে তোল তাড়াতাড়ি। আমাদের এখান থেকে যেতে হবে। তুহিন এবার তাকায় মাহিরার দিকে। মাহিরা চেয়ারে এককাধ হয়ে বসে বসে ঘুমাচ্ছে। তুহিন বলে ওঠে, বস মেয়েটাকে ছেড়ে দিলে হয় না?
রেজওয়ান অগ্নি দৃষ্টিতে তুহিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। বলে ওঠে, তোকে প্রানে মারতে আমার হাত কাঁপপে তুহিন। তাই এমন কিছু করিস না যেনো আমার তোকে প্রানে মারতে হয়। তুহিন রেজওয়ানের কথায় বাঁকা হেসে বলে, আপনার হাতে মৃত্যুও সই বস। রেজওয়ান আর কিছু না বলে চলে যায়। তুহিন দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আরবিন কে ডেকে তুলে।
আয়ান দূরবীন হাতে নিয়ে বোটে দাঁড়িয়ে আছে। তার পেছনে আসছে আরো দুটি বোট। যেখানে ফাহিম আর অর্নব আছে। আয়ানকে তারা একা আসতে দেয়নি। তারাও এসেছে আয়ানের পিছু পিছু। আয়ান তার হাতে থাকা দূরবীন যন্ত্র দিয়ে চেক করে দেখলো। দুরে এক বড় জাহাজ দেখতে পেয়ে আয়ান চালককে সেদিকে যেতে বললো। আয়ানের কথা মতো তিনটে বোট জাহাজের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে। 
বোট জাহাজের কাছে আসতেই আয়ান লাফিয়ে জাহাজে উঠে পরে। সে কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা জাহাজের ছাদে চলে যায়। ফাহিম আর অর্নবও তা দেখে বেশ অবাক হয়। পুরো জাহাজ চেক না করে আয়ান কেনো ছাদে যাচ্ছে তারা কেউ বুঝলো না। কিন্তু তারা কেউ কোনো প্রশ্ন করলো না আয়ানকে। আয়ান জাহাজের ছাদে এসে পুরো ছাদে কাউকেই দেখতে পেলো না। 
আয়ান আগে থেকেই জানতো এমন কিছুই হবে। যখন জাহাজ আঁটকে পড়েছে আয়ানের তখনই সন্দেহ হয়েছে। এটা যে রেজওয়ানের চাল আয়ান সেটা আগেই ধরতে পেরেছে। আয়ান তার সামনে কিছুটা দুরে চেয়ার আর দড়ি পরে থাকতে দেখে সেদিকে এগিয়ে যায়। পরপর হাটু গেড়ে বসে দড়িগুলো তার হাতে তুলে নেয়। চোখ বন্ধ করে নাকের কাছে দড়িগুলো নিয়ে ঘ্রান শুষে নেওয়ার চেষ্টা করে বলে, আমাকে ক্ষমা করিস মাহি। 
ফাহিম পুরো ছাদ খুঁজে একজায়গায় অনেকটা রক্ত দেখতে পায়। সে তৎক্ষণাত আয়ানকে ডেকে বলে, স্যার এগিকে আসুন। এখানে অনেক রক্ত পরে আছে। রক্তের কথা শুনে আয়ানের বুক ধুক করে উঠে। আয়ান তাড়াতাড়ি ছুটে যায় সেদিকে। দেখতে পায় অনেকটা রক্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মেঝেতে। আয়ান হাঁটু গেড়ে বসে একফোটা রক্ত তার হাতের আঙ্গুলে ডগায় নেয়।
অর্নব তা দেখে বলে ওঠে, ভাইয়া এটা কি মাহিরার রক্ত? মাহিরা কি কোনো ভাবে..। সম্পুর্ন কথা শেষ করার আগেই আয়ান হুংকার দিয়ে ওঠে, মাহি'র গা থেকে একফোঁটা রক্ত ঝড়লে রেজওয়ানকে আমি নিজ হাতে জবাই করবো। বলেই আয়ান উঠে দাঁড়ায়। ছাদ থেকে হনহনিয়ে যেতে যেতে ফাহিমের উদ্দেশ্য বলে, রক্ত ল্যাবে পাঠা ফাহিম। ফাহিম আর কিছু না বলে কিছুটা রক্তের সেমপল নিয়ে নেয়।
___________
মাহিরাে ঘুম ভাঙ্গে সকাল দশটায়। সে আশে পাশে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করে সে কোথায় আছে। দেখতে পায় তার চারপাশে মুদি দোকানে মতো সাদা সাদা আটার প্যাকেট। মাহিরা চোখ ঘুড়িয়ে দেখে পুরো রুমের শেল্ফে এমন সাদা সাদা প্যাকেট পরে আছে। এমন সময় রেজওয়ান এসে মাহিরার সামনে চেয়ার টেনে বসে। মাহিরা রেজওয়ান কে দেখে বলে ওঠে, 
- ভাই'টু আপনারা কি আটা ময়দার ব্যবসা করেন? এই রুমে এতো আটা ময়দা কেনো? 
রেজওয়ান চোয়াল শক্ত করে বলে মনে, রেডিও'র বাচ্চা এগুলোকে দেখে কি তোর আটা ময়দা মনে হয়? এগুলো সব ড্রাগস। কোটি কোটি টাকার ড্রাগস এগুলো। মাহিরা হা হয়ে চেয়ে থাকে রেজওয়ানের দিকে। বলে ওঠে, এতো ড্রাগস দিয়ে আপনি কি করেন ভাই'টু?রেজওয়ান সহসা বলে ওঠে, ব্যবসা করি। আর আমার সেই ব্যবসায় পানি ঢেলেছিস তুই আর তোর প্রেমিক।
মাহিরা বলে ওঠে, খাড়ুস লোক আমার প্রেমিক না ভাই'টু। রেজওয়ান ভ্রু কুচকে বলে, তো আয়ান তোর কি লাগে? মাহিরা তাকায় রেজওয়ানের দিকে। বলে ওঠে, কিছু না। রেজওয়ান বাঁকা হেসে বলে, কিছু না বলেই আয়ান তোর জন্য এতো কিছু করছে। আর কিছু হলে কি করতো? মাহিরা কিছুই বললো না। তাকিয়ে দেখলো রেজওয়ানের হাতে সাদা বেন্ডেজ। তা দেখে মাহিরা বলে ওঠে, আপনার হাতে কি হয়েছে ভাই'টু? রেজওয়ান তাকায় তার হাতের দিকে। তখন ফল কাঁটতে গিয়ে তার হাত কেঁটে গিয়েছে। এমন ভাবে হাত কেঁটেছে যে অনেকটা রক্তও ঝড়েছে হাত থেকে। তুহিন তখন রেজওয়ানের হাতে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে।
রেজওয়ান নিজের হাতের থেকে চোখ সড়িয়ে মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, কেঁটে গিয়েছে। মাহিরা একা একা বিরবির করে, বেশ হয়েছে। আমাকে কষ্ট দিতে চেয়েছে না? এখন আল্লাহই উনাকে কষ্ট দিয়েছে। রেজওয়ান এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, তোর কপাল ভালো যে তুই এখনো বেঁচে আছিস। নাহলে মন তো চাইছে তোকে এক্ষনি পুড়িয়ে ছাই করে ফেলি।
মাহিরা এবার ছলছল চোখে রেজওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, আপনি এতো পাষাণ কেন ভাই'টু। আপনি আমাকে এতো কষ্ট কেন দিচ্ছেন? আমি আপনার কি ক্ষতি করেছি বলুন তো? আপনি আমাকে ঠিকমতো খেতে পর্যন্ত দেন না। আপনি অনেক খারাপ একটা মানুষ ভাইটু। আমি খাড়ুস লোককে সব বলবো। খাড়ুস লোক তখন আপনাকে পানিশমেন্ট দিবে। রেজওয়ান বিদ্ঘুটে এক হাসি দেয়। বলে, বেঁচে থাকলে তো বলবি? আমি তো তোকে বাঁচিয়েই রাখবো না। প্রাণে মারবো তোকে। 
মাহিরা এবার কেঁদে দেয়। বলে, আপনি কেন আমার সাথে এমনটা করছেন ভাই'টু। আমি তো কিছুই করিনি বলুন। আপনার মনে কি একটুও দয়া মায়া নেই? আমি যদি আজ আপনার বোন হতাম? তাহলে কি আপনি আমার সাথে এমনটা করতে পারতেন? তুহিন ভাইয়াও আমাকে নিজেকে বোন মনে করে। আপনিও তো কোনো না কোনো মায়ের সন্তান। এক মায়ের সন্তান হয়ে কিভাবে পারছেন আরেক মায়ের কোল খালি করে দিতে?
রেজওয়ান বলে ওঠে, আমার বাপ মা বোন সবাকে যেমন আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে? তেমনি আমিও সবার কাছ থেকে সব কেড়ে নিবো। মাহিরা নাক টেনে বলে, আপনার বাপ মা বোন সবাই কোথায় ভাইটু? রেজওয়ান বলে ওঠে, কেউ বেঁচে নেই। এই পৃথিবীতে আমি নিঃস্ব। আমার কেউ নেই। মাহিরা তাকায় রেজওয়ানের দিকে। কাল রাতে তুহিন রেজওয়ানকে তার বউয়ের কসম দিয়েছিলো। কিন্তু মাত্র রেজওয়ান বলল সে নিঃস্ব।
মাহিরা এবার রেজওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, আর আপনার বউ? সে কোথায়? রেজওয়ান তাকায় মাহিরার দিকে। বলে ওঠে, তাকেও কেউ একজন মেরে ফেলেছে। খুব কাছের কেউ। এখন আমিও তার বউকে মারার অপেক্ষায় আছি। মাহিরা আর কিছু না বলে জিজ্ঞেস করে, আপনার মা বাবা বোন কিভাবে মারা গিয়েছে ভাইটু? রেজওয়ান ছোট করে বলে, 
- গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছে বাপ, মা, বোন। আমি বারো বছর বয়সে ছেলে হয়ে নিজের বাপ মায়ের মরা লাশ দেখলাম। চার মাসের ছোট বোনটার ছিন্ন বিন্ন দেহ দেখলাম। বড় হয়ে নিজের স্ত্রীর গলা কাটা মাথা দেখলাম। আর কি কিছু লাগে এই পৃথিবীতে পাষাণ হতে? 
মাহিরার চোখে পানি জমলো। সে রেজওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, তুহিন ভাইয়ার মতো আপনার মনেও অনেক কষ্ট তাই না ভাইটু? রেজওয়ান বলে ওঠে, তুহিন তোকে ওর সব গল্প বলে দিয়েছে? মাহিরা ছোট করে বলে, হ্যা। রেজওয়ান বিরবির করে, শালা আস্ত একটা বেইমান। বলেছি কাউকে যেনো নিজের দুর্বলতা শেয়ার না করে। আর শালা আগলা দরদ দেখিয়ে সব বলে দিলো। শালা বেইমানের দল সব।
মাহিরা এবার বলে ওঠে, বেইমান তো আপনিও ভাই'টু। রেজওয়ান মাহিরার দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বলে, এই মেয়ে এই? তোকে কে বলেছে আমি বেইমান? মাহিরা বলে ওঠে, খাড়ুস লোক বলেছে। রেজওয়ান ভ্রু কুচকে তাকায় মাহিরার দিকে। বলে ওঠে, আয়ান তোকে আমার নামে আর কি কি বলেছে? মাহিরা বলে ওঠে, বলেছে আপনি আর খাড়ুস লোক আগে একসাথে বিজনেস করতেন। তারপর একদিন আপনি খাড়ুস লোকের সাথে বেইমানি করেছেন। তখন থেকে আপনাদের ভেতরে ঝামেলা চলছে। 
রেজওয়ান বিরবির করে, শালা আস্ত একটা মিথ্যুক। আসল ঘটনাটাই বলেনি। নিজের দোষ সব চেপে গিয়েছে।মাহিরা শুনলো না রেজওয়ানের কথা শুনে। রেজওয়ান এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে বসে, কি খাবি বল। মাহিরা অবাক চোখে তাকায় রেজওয়ানের দিকে। বলে ওঠে, আপনি কি ঠিক আছেন ভাইটু? নাকি হাত কাটার সাথে আপনার স্মৃতিশক্তি কেটে গিয়েছে? রেজওয়ান বলে ওঠে, আমি ঠিক আছি। বেশি কথা বলছিস কেন? মাহিরা কিছুটা তাছিল্য হেসে বলে, না মানে আপনি আমার কাছে জানতে চাইছেন আমি কি খাবো? তাই জিজ্ঞেস করলাম আরকি।
রেজওয়ান কিছু না বলে তাকিয়ে থাকে মাহিরার দিকে। মাহিরা আবারো বলে, যে মানুষ আমি বেশি খেয়ে ফেলবো বলে আমাকে একবেলা দেয়? সে মানুষ হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করছে আমি কি খাবো? বিষয়টা একটু অযুক্তিক না ভাই'টু? রেজওয়ান এবার বিদ্ঘুটে হেসে বলে, মরার আগে সবার কাছেই তার ইচ্ছার কথা জানতে চাওয়া হয়। ভেবে নে আমি তোর কাছে সেটাই জানতে এসেছি। মাহিরা চমকে তাকায় রেজওয়ানের দিকে। বলে, 
- আপনি আমাকে যতটা কষ্ট দিলেন পৃথিবীতে আর কেউ আমাকে এতো কষ্ট দেয়নি ভাইটু। আমাকে মারবেন? ঠিক আছে মারেন। কিন্তু আমাকে মারার পর নিজে কতোদিন বেঁচে থাকবেন ভেবেছেন কখনো? আমাকে মারার সাথে সাথে আপনার মৃত্যু টাও যে ঘনিয়ে আসছে ভাইটু। 
কথাটা বলার সাথে সাথে রেজওয়ান থাস করে এম চড় বসায় মাহিরার গালে। মাহিরা চড় খেয়ে একপাশে ঝুঁকে যায়। রেজওয়ান মাহিরার দিকে তাকিয়ে কিরবির করে বলে ওঠে, 
- কুত্তার বাচ্চা আমাকে মরার হুমকি দিচ্ছিস তুই? তোর কি মনে হয়? আমি মরাকে ভয় পাই? কোন খানকির পোলা আমাকে মারবে? কার বুকে এতো বড়ো সাহস আছে? বল আমাকে?
মাহিরা থাপ্পড় খেয়েও হাসলো। বলল, ভয় না পেলে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কেনো ভাই'টু? কিসের এতো ভয় আপনার? রেজওয়ান কটমট দৃষ্টিতে তাকায় মাহিরার দিকে। বলে, তোর মুখে কি বেশি বুলি ফুটেছে? তাইলে বল এক্ষনি উড়িয়ে দিচ্ছি। বলেই রেজওয়ান তার কোমরে গুজে থাকা পিস্তল বের করে। মাহিরা রেজওয়ানের হাতে পিস্তল দেখে চমকে উঠে। সে জীবনে সামনাসামনি এসব দেখেনি। রেজওয়ান তার হাতে থাকা পিস্তল মাহিরার কপালে ঠেকিয়ে বলে, কি যেনো বলছিলি? এখন বল তো? 
মাহিরা আর কিছু না বলে মাথা নিচু করে ফেলে। রেজওয়ান বলে ওঠে, বয়স যতোটুকু ততটুকুই কথা বলবি। বেশি কথা বললে একদম হায়াত কমিয়ে দিবো।রেজওয়ানের কথার মাঝখানেই তুহিন আসে সেখানে। সে রেজওয়ানের হাতে পিস্তল দেখে চমকে উঠে। তাড়াতাড়ি রেজওয়ানের কাছে এসে বলে, বস এসব আপনি ওর সামনে বের করছেন কেনো? ও ভয় পাচ্ছে তো। রেজওয়ান তুহিনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, ওর গলা বেশি বড় হয়ে গেছে তুহিন। তাই বের করে একটু দেখিয়েছি আরকি। বলেই রেজওয়ান চলে যায়। 
তুহিন মাহিরার দিকে তাকিয়ে দেখে মাহিরা মাথা নিচু করে রেখেছে। সে ভালো করে খেয়াল করলে দেখে মাহিরার ফর্সা গাল লাল হয়ে আছে। তা দেখে তুহিন জিজ্ঞেস করে, এই মেয়ে তোমার গালে লাল কেনো? কেউ কি মেরেছে তোমায়? মাহিরা চোখ তুলে তাকায় তুহিনের দিকে। তুহিন দেখতে পায় মাহিরার গালে পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ স্পষ্ট বসে গিয়েছে। তুহিন তা দেখে বলে ওঠে, বস কি তোমাকে মেরেছে মেয়ে? 
মাহিরা চোখে পানি টলমল করছে। সে কিছু না বলে তুহিনের থেকে চোখ নামিয়ে নেয়। তার গায়ে আজ পর্যন্ত কেউ কখনো হাত তোলেনি। সবাই শুধু মুখে বকেছে, গায়ে হাত দেয়নি কেউ। মাহিরা মাথা নিচু করে ফেলতেই তুহিন বুঝতে পারে রেজওয়ান যে মাহিরাকে মেরেছে। তুহিন অসহায় গলায় বলে ওঠে, আমি তোমাকে বারবার বলেছি মেয়ে তুমি বেশি কথা বললে না। মাহিরা অসহায় গলায় বলে ওঠে, ভাইয়া আমাকে একবার খাড়ুস লোকের সাথে কথা বলিয়ে দিবেন? আমি মৃত্যুর আগে তার সাথে একবার কথা বলতে চাই। আপনার বসকে বলুন এটাই আমার শেষ ইচ্ছা। উনি তো মৃত্যুর আগে আমার শেষ ইচ্ছাটা জানতে চেয়েছেন তাই না? তুহিন কি বলবে ভেবে পেলো না। সে নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলে। পরপর মাহিরাকে কিছু না বলেই সে চলে যায়।
ফাহিম হাতে একটা ফাইল নিয়ে আয়ানের দিকে বাড়িয়ে দেয়। বলে, স্যার ল্যাপ থেকে রিপোর্ট এসেছে। আয়ান ফাইল চেক করে দেখতে থাকে। তা দেখে ফাহিম বলে ওঠে, স্যার রক্ত টা ম্যামের না অন্যকারোর। আয়ান ফাইল চেক করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলে, রেজওয়ানের লাস্ট লোকেশন কই দেখা গিয়েছে। ফাহিম বলে, স্যার রাজবাড়ীর আশেপাশে দেখা গিয়েছে। কিন্তু সেখানে আমরা তল্লাশি চালিয়েছি। ওখানে একটা গাড়ি ছাড়া আর কিছুই পাইনি আমরা। 
আয়ান চোয়াল শক্ত করে বলে ওঠে, ওই কুত্তার বাচ্চা আমাদের ঘুড়াচ্ছে ফাহিম। আমাদের পথ ভুল করার জন্য ও ওখানে গাড়ি রেখে দিয়েছে। ফাহিম বলে ওঠে, স্যার রেজওয়ানের সব কিছু তো আমাদের হাতে। এখন রেজওয়ান কোথায় থাকতে পারে? আয়ান চোয়াল শক্ত করে বলে, 
- ও আকাশে থাকুক আর পাতালে থাকুক। ওকে আমি খুঁজে বের করবোই। ওর কলিজাটা কতো বড় সেটাই দেখার আছে আমার।
তুহিন মাহিরার জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। মাহিরা কাল দুপুরে খেয়েছে এখন আবার দুপুর হতে চললো। তুহিন এসে মাহিরার হাত খুলে দেয়। মাহিরা দিকে খাবার প্লেট বাড়িয়ে দিয়ে বলে, এটা খেয়ে নেও মেয়ে। মাহিরা তুহিনের দিকে তাকিয়ে বলে, ভাইয়া আমি খাবোনা এটা নিয়ে যান। তুহিন জোর করে মাহিরার হাতে প্লেট ধরিয়ে দিয়ে বলে, কোনো কথা বলবে না মেয়ে। চুপচাপ খেয়ে নেও। আজ সারাদিনে কিন্তু আর খাবার জুটবে না কপালে। বলেই তুহিন চলে যায়। 
মাহিরা না চাইতেও খাবার খায়। বাঁচতে হলে তাকে খেতে হবে। কিন্তু সে আর কতোদিন বাঁচবে? এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াটা ভালো নয় কি? মাহিরা চোখের পানির সাথে মিশিয়ে ভাত গিললো। কয়েক লোকমা খাবার পেটে যেতেই মাহিরা গড়গড় করে বমি করে দেয়। যতোটুকু পেটে পরেছিলো সেটাও সাথে সাথে পরে যায়। রেজওয়ান তা দেখে দুরে দাড়িয়ে থেকে বিদ্ঘুটে হাসে। 
তুহিন মাহিরার জন্য পানি নিয়ে এসে দেখে রেজওয়ান দরজায় দাড়িয়ে আছে ফোন হাতে নিয়ে। তুহিন তা দেখে বলে, আপনি এখানে কি করছেন বস? রেজওয়ান কিছু না বলে তুহিনকে দেখে ফোন পকেটে ভরে নেয়। তুহিন তাকিয়ে দেখে মাহিরা খাবার প্লেট হাতে নিয়ে বমি করছে। তুহিন তা দেখে বলে ওঠে, বস আপনি ওর খাবারে কি দিয়েছেন? ও বারবার খাবার খেলেই বমি করে কেনো? রেজওয়ান বিদ্ঘুটে হেসে বলে, বাসি পঁচা খাবার খেলে তো বমি করবেই।
তুহিন চমকে উঠে রেজওয়ানের কথায়। বলে ওঠে, বস আপনি ওকে এতোদিন বাসি পঁচা খাবার দিয়েছেন? এসব খেলে তো এই মেয়ে মরে যাবে। রেজওয়ান বলে ওঠে, আমিও এটাই চাই এই মেয়ে মরে যাক। তুহিন বলে ওঠে, বস আপনি এই মেয়েকে এতো কষ্ট কেন দিচ্ছেন? এই মেয়ে কি দোষ করেছে? রেজওয়ান কিরবির করে বলে ওঠে, 
- আমার ওয়াইফ কি দোষ করেছিলো? আমার ওয়াইফ কেন মরলো? আমার ওয়াইফকে কেন মারলো ওর প্রেমিক? 
তুহিন আর কিছু বলতে পারলো না। রেজওয়ান আবারো বলে ওঠে, বেশি দরদ দেখাবি না তুহিন। ভুলে যাসনা আয়ান আমার সাথে কি কি করেছে। বলেই রেজওয়ান চলে যায়। তুহিন আর কিছু না বলে পানি হাতে মাহিরার কাছে চলে আসে। মাহিরার কাছ থেকে প্লেট টা নিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়। মাহিরা হা হয়ে তাকিয়ে থাকে তুহিনের দিকে। বলে ওঠে, খাবারগুলো ফেলে দিলেন কেনো ভাইয়া? 
তুহিন মাহিরার দিকে পানি বাড়িয়ে দিয়ে বলে, পানি খাও। মাহিরা পানি খেয়ে তুহিনকে বলে, উনারা তো আমাকে সারাদিনে আর খাবার দিবেনা ভাইয়া। আপনি খাবারটা ফেলে দিলেন কেনো? তুহিন মাহিরাকে কিছু না বলে আবারো চলে যায়। মাহিরা তাকিয়ে থাকে ফ্লোরে পরে থাকা খাবার গুলোর দিকে। ক'টা ভাতের এতো দাম?
- আরবিন এই আরবিন? শুয়োরের বাচ্চা এদিকে আয়। 
তুহিনের ডাকে আরবিন জবাব দেয়, জ্বি ভাই? তুহিন রেগে এসে আরবিনের গাল বরাবর এক ঘুষি মারে। আরবিন বলে ওঠে, কি হলো ভাই আমাকে মারছেন কেনো? তুহিন রেগে কটমট করে বলে, শুয়োরের বাচ্চা তুই ওই মেয়েকে বাসি পঁচা খাবার দিলি কোন সাহসে? আরবিন আমতা আমতা করে বলে, বস দিতে বলেছে আমি কি করবো ভাই? তুহিন আরো একটা ঘুষি বসায় আরবিনের গাল বরাবর। বলে, শুয়োরের বাচ্চা তুই খেতে পারবি ওই খাবার? তুই যে ওকে দিলি? আরবিন মাথা নিচু করে বলে, সরি ভাই। 
তুহিন কটমট করে বলে, আমার খাবার দে। আরবিন আর কিছু না বলে গরম খাবার বেড়ে তুহিনের হাতে দেয়। তুহিন খাবার নিয়ে যেতে নিলে আরবিন বলে ওঠে, ভাই ওই মেয়েকে এই খাবার দিলে বস আপনাকে আবারো মারবে। তুহিন যেতে যেতে বলে ওঠে, মার কি তুই খাবি নাকি আমি খাবো? বেশি কথা বলিস কেন? আরবিন আর কিছু বললো না।
তুহিন খাবার হাতে মাহিরার কাছে আসে। মাহিরার হাতে খাবার দিয়ে বলে, এটা খেয়ে নাও। মাহিরা কিছু না বলেই তুহিনের থেকে খাবার নিয়ে খাওয়া শুরু করে। আগের খাবার টা নাকের কাছে গন্ধ লাগলেও এটা মাহিরার কাছে গন্ধ লাগলো না। মাহিরা খেতে খেতে তুহিনকে বলে, আপনি নিশ্চয়ই আপনার খাবার আমাকে দিয়েছেন তাই তা ভাইয়া? তুহিন মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, সম্পুর্ন খাবার শেষ করবে। একটা ভাত প্লেটে থাকলে বসের মতো আমিও তোমার অন্য গালে থাপ্পড় দিয়ে লাল কে দিবো। মাহিরা মুচকি হেসে আর কিছু না বলে সব খাবার খেয়ে নেয়। 
মাহিরার খাওয়া প্রায় শেষ। এমন সময় রেজওয়ান সেখানে আসে। মাহিরাকে গরম ভাত খেতে দেখে বলে ওঠে, তোর কপালে গরম ভাত জুটলো কিভাবে? মাহিরা তাকায় রেজওয়ানের দিকে। মাহিরা কিছু বলার আগেই তুহিন এসে বলে, বস আমার খাবার আমি ওকে দিয়েছি। প্লিজ ওকে খেতে দিন। আপনার খাবার কম পরবে না। রেজওয়ান এসে তুহিনের সামনে দাড়ায়। বলে, তোর মতো বেইমান আমি দুটো দেখিনি তুহিন। আমার খেয়ে আমার পরে তুই আমার পিঠেই ছুরি মারছিস?
তুহিন মাথা নিচু করে বলে, সরি বস। রেজওয়ান বলে ওঠে, ইচ্ছে তো করে এই মেয়েকে মারার আগে তোকে মেরে দেই। কিন্তু তোকে মারতে আমার হাত কাঁপে। তোকে আমি আমার ভাই ভেবেছিলাম। আর তুই আমার পিঠ পিছে ছুরি মেরে যাচ্ছিস? আমি এখনো তোকে কেন বাঁচিয়ে রেখেছি নিজেও জানিনা। তুহিন বলে ওঠে, বস আপনি আমাকে যে শাস্তি দিবেন দেন। তারপরও এই মেয়েকে আর কষ্ট দিয়েন না। রেজওয়ান আর কিছু না বলে হনহনিয়ে চলে যায়। 
___________
চারপাশে অন্ধকার। ঝিঝি পোঁকাদের শব্দ ছাড়া আশে পাশে আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। আয়ান আবারো এসেছে সেই পরিত্যক্ত পুলিশ স্টেশনে। রাতের অন্ধকারে সে একাই এসেছে আজ। তার অনেক কিছু জানার আছে এখান থেকে। আয়ানের হাতে টর্চ লাইট ছাড়া আর কিছুই নেই। আয়ান টর্চ হাতে ধুলো জমে থাকা ফাইল গুলো একের পর এক চেক করছে। এই পরিত্যক্ত পুলিশ স্টেশনে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে। আয়ান তা উদ্ঘাটনা করার চেষ্টা করছে। 
আয়ান একের পর এক ফাইল দেখছে। ফাইল গুলোতে আছে রেজওয়ানের পরিচয় সব ব্যাকগ্রাউন্ড। আয়ান রেজওয়ানের সাথে বিজনেস করেছে এটা সত্যি। কিন্তু সে কখনো রেজওয়ানের ব্যাকগ্রাউন্ড জানতো না। আর না কখনো সে রেজওয়ানের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। এই সকল ধুরো জমে থাকা ফাইল গুলোতে আছে রেজওয়ানের বাবা মা বোনের এক্সিডেন্টের তথ্য। আছে রেজওয়ানের বাব মা বোনের পরিচয়। 
এখানের প্রতিটা ফাইল চেক করে আয়ান বুঝতে পারে রেজওয়ান আসলে কে। কি তার আসল পরিচয়। সেদিন আয়ান যদিও রেজওয়ান কে সন্দেহের তালিকায় রেখেছিলো। কিন্তু আজ সে শিওর হয়ে রেজওয়ানের আসল পরিচয় জানার পর তার পায়ের নিচের মাটি সরে যায়। আয়ান ভাবতে পারছে না এতো কিছু কিভাবে এক সুত্রে জুড়ে গেলো। আয়ান আর কিছু না ভেবে ফাইল গুলো রেখে দিয়ে স্টেশন থেকে বেরিয়ে যায়। এমন সময় আয়ানের ফোনে টুং করে এক মেসেজের শব্দ ভেসে আছে। আয়ান তার পকেট থেকে ফোন বের করে একটা মেসেজে ক্লিক দিতেই একটা ভিডিও প্লে হয়। ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে মাহিরা খাবার খেয়ে বমি করছে। ভিডিও টা দেখা মাত্র আয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। এমন সময় আবারো সেই নাম্বার থেকে কল আসে। আয়ান ফোন রিসিভ করে হুংকার দিয়ে ওঠে, 
- কুত্তার বাচ্চা তুই ওকে কষ্ট দিচ্ছেন কেন? সাহস থাকলে আমার সামনে এসে দারা। আমার সাথে লড়। তোর কলিজাটা কতো বড় আমি সেটাই দেখতে চাই।
রেজওয়ান অট্টো হাসি হেসে বলে, তোর সাথে লড়েও এতোটা মজা পেতাম না যতোটা মজা এখন পাচ্ছি। আয়ান কিরবির করে বলে, খোদার কসম রেজওয়ান। ওর গায়ে আর একটা ফুলের টোকা দিলে আমি নিজ হাতে তোর গলা কাটবো। রেজওয়ান বলে ওঠে, কিভাবে গলা কাটবি আয়ান? আমার ওয়াইফের গলা যেভাবে কেটেছিস সেভাবে কাটবি? নাকি আরো দুই ইঞ্চি নিচ দিয়ে কাটবি? তাড়াতাড়ি শিওর হয়ে বল তো আমায়। 
আয়ান দাঁত খিঁচে কিরবির করে বলে, মাহি'র গায়ে আর একটা আঘাত হানলে তোর অবস্থা তোর ওয়াইফের থেকেও হাজার গুন বেশি খারাপ হবে। তুই তো তোর ওয়াইফের লাশ দেখতে পেরেছিস। কিন্তু তোর লাশ দেখার মতো এই পৃথিবীতে কেউ থাকবে না। আমি তোকে এতো টুকরো করে কাটবো যে তোর মাংস দেখে মানুষ বুঝতেই পারবে না এটা কুত্তার মাংস নাকি মানুষের মাংস। কথাগুলো বলেই আয়ান ফোন কেটে দেয়। রেজওয়ান ফোন কান থেকে সড়িয়ে বিরবির করে, শালা আস্ত একটা মিথ্যুক।
তুহিন শুয়ে আছে মাহিরার থেকে কিছুটা দুরে। আরবিন তুহিনের পাশে। মাহিরা তা দেখে বলে, ভাইয়া আপনি তো বললেন না আরবিন ভাইয়া কাকে খুন করেছে। তুহিন মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, যাকে মন চায় তাকে খুন করেছে। তাতে তোমার কি? তোমার এতো জানার কৌতুহল কেনো? বলেছি না তোমাকে চুপ থাকতে? মাহিরা মুখ ফুলিয়ে বলে, আপনি আমাকে এভাবে বলতে পারলেন ভাইয়া? আমি না আপনার বোন হই। মাহিরার কথা শুনে তুহিন উঠে বসে। বিরবির করে,
- বাঙালির এই একটা সমস্যা। মানুষের দুর্বলতা একটু খুঁজে পেলে? সেখানে সবার আগে হাত ঢুকিয়ে দেয়।
মাহিরা মুচকি হেসে বলে, প্লিজ ভাইয়া বলুন না। আমার খুব জানার ইচ্ছা। এই শান্ত শ্রিষ্ট মানুষ টা কাকে খুন করেছে। তুহিন তার পাশে শুয়ে থাকা আরবিনের দিকে তাকায়। ছেলেটার গায়ের রং ফর্সা। নামের মতো দেখতেও কিছুটা দুবাইয়ের আরবি শেখদের মতো। তুহিন আরবিনের থেকে চোখ সরিয়ে নিজের দিকে তাকায়। নিজের ডার্ক চকলেট মার্কা গায়ের রং দেখে তার আরবিনের প্রতি খুব হিংসা হয়। তুহিন এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
- এই মেয়ে বলো তো আরবিন দেখতে বেশি সুন্দর নাকি আমি? 
মাহিরা তুহিনের কথায় থতমত খেয়ে যায়। সে কি প্রশ্ন করল আর তুহিন তাকে কি জবাব দিচ্ছে? মাহিরা আরবিনের দিকে তাকিয়ে দেখে লোকটা ফর্সা কিন্তু তুহিনের মতো চেহারায় কোনো মায়া নেই। মাহিরা তুহিনকে কিছুটা তেল দেওয়ার জন্য বলে, অবশ্যই আপনি সুন্দর ভাইয়া। আরবিন ভাইয়ার শুধু গায়ের রংটাই একটু ফর্সা। কিন্তু উনি আপনার মতো দেখতে এমন সুন্দর না। আপনার মতো মায়াও নেই উনার চেহারায়। মাহিরার কথায় তুহিন খুশি হয়। বলে,
- তুমি তাহলে ধরতে পেরেছো আমার সৌন্দর্যটা। আমি কালো হলেও কতোটা হেন্ডসাম আর সুন্দর বুঝেছো তবে।
মাহিরার খুব হাসি পায় তুহিনের কথায়। একটা মানুষ নিজের প্রশংসা নিজেই করছে। মানুষ আর কি প্রশংসা করবে তার? মাহিরা বলে ওঠে, জ্বি ভাইয়া আপনি অনেক সুন্দর। এবার বলুন উনি কাকে খুন করেছে। তুহিন বলে, আমার ঘুম পেয়েছে মেয়ে তাই সংক্ষেপে ছোট করে বলছি। তুহিন বলতে শুরু করে, আরবিনের যখন আট বছর বয়স? তখন আরবিন তার চোখের সামনে ওর মাকে তার চাচার হাতে ধর্ষন হতে দেখে। আরবিন তখন ছোটো থাকায় তার চাচাকে বাধা দিতে পারেনি। আরবিনের বাবা ছিলো না। তাই ও আর ওর মা ওদের চাচার বাসায় থাকতো। 
একদিন আরবিন খেলতে যায়। সেখান থেকে ফিরে এসে সে তার চোখের সামনে তার মাকে ধর্ষন হতে দেখে। আট বছরের ছেলেটি তখন তার চাচার শক্তির সাথে পেড়ে উঠেনি। ওর চাচা ওর মায়ে ধর্ষণ করে গলা টিপে হত্যা করে। মানুষকে বলে ওর মা নাকি আত্নহত্যা করেছে। 
কিন্তু আরবিন জানতো ওর মা আত্মহত্যা করেনি। ওর চাচা ওর মাকে মেরেছে। আরবিন ছোট বলে কেউ তার কথা বিশ্বাসও করেনি। নিজের মায়ের বিচার না পেয়ে সেদিনের পর থেকে আরবিন চুপ হয়ে গিয়েছে। 
আরবিনের চোখের সামনে ওর মায়ের খুনি ঘুরে বেড়াচ্ছিলো তখন। কিন্তু আরবিন কিছুই করতে পারতো না। যখন আরবিনের পনেরো বছর বয়স? সেদিন সে আবারো তার চাচাকে বাড়ির কাজের মহিলার সাথে একই কাজ করতে দেখে। সেদিন আর আরবিন থেমে থাকেনি। আরবিন সেদিন ছুটে চলে যায় রান্না ঘরে। হাতের কাছে দা বটি পেয়ে সে সেটাই উঠিয়ে নিয়ে আসে।কোনো দিকে না তাকিয়ে আরবিন একের পর এক কোপাতে থাকে ওর চাচাকে। যতক্ষণ ওর চাচার শরীরে প্রাণ ছিলো ততক্ষণ আরবিন ওর চাচাকে কুপিয়েছে। আরবিনের ফর্সা গায়ে সেদিনই প্রথম লেগেছে লাল রক্ত। 
মাহিরা ছলছল চোখে তাকায় আরবিনের দিকে। আরবিন একই ভাবে শুয়ে আছে। এই লোকটা বোমা মারলেও উঠবে কিনা সন্দেহ আছে। মাহিরা বলে ওঠে, ভাইয়া বাংলাদেশে এতো ধর্ষক কেনো বলুন তো? আমরা কি শান্তিতে একটু বাঁচতে পারবো না? তুহিন কিরবির করে বলে ওঠে,
- বাংলাদেশ কুত্তার বাচ্চা বেশি। তাই ধর্ষনও হয় বেশি। এইসব কুত্তার বাচ্চাকে শেষ করার জন্য আমাদের মতো কিছু খুনিদের জন্ম নিতে হবে। 
মাহিরা এবার প্রশ্ন করে বসে, ভাইয়া আপনার বসের ওয়াইফ আর ফ্যামিলি কিভাবে মারা গিয়েছে। তুহিন বলে, আমি বসের সম্পর্কে তেমন কিছু জানিনা মেয়ে। শুধু জানি বস বারো বছর বয়সে তার বাপ মা বোনকে হারিয়েছে। এক এক্সিডেন্টে বসের মা বাবা আর বসের চার মাসের ছোট বোনটা মারা যায়। তখন থেকে বস খুব একা হয়ে পরে। বস এতিম খানায় মানুষ হয়। তারপর বস এখানে কিভাবে আসলো সে ঘটনা আমার জানা নেই। 
মাহিরা প্রশ্ন করে বসে, আপনার বসের ওয়াইফের নাকি কাটা মাথা দেখেছেন উনি? এটা কি সত্যি ভাইয়া? তুহিন বলে ওঠে, হ্যা সত্যি। কিন্তু এসব কথা তোমাকে কে বলেছে? মাহিরা বলে, আপনার বস সকালে বলেছে। তুহিন আর কিছু বললো না। মাহিরা আবারো বলে, উনি বলল উনার ওয়াইফকে নাকি তার কাছের কেউ মেরেছে। কিন্তু উনার তো পরিবারের কেউ নেই। তাহলে উনার ওয়াইফকে কে মেরেছে ভাইয়া? তুহিন বলে ওঠে, আমি সত্যিটা বললে তোমার বিশ্বাস হবে না মেয়ে। মাহিরা বলে ওঠে, বিশ্বাস হবে ভাইয়া প্লিজ বলুন। আমি সব সত্যিটা জানতে চাই। তুহিন বলে ওঠে, বসের ওয়াইফকে তোমার..।
- তুহিন..?
তুহিন সম্পুর্ন কথা বলার আগেই কারো রাগী গম্ভীর কন্ঠ স্বর ভেসে আসে। তুহিন দরজার দিকে তাকায়। রেজওয়ান কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তুহিন উঠে দাড়ায়। রেজওয়ান তুহিনের কাছে এসে থাস করে এক চড় বসায় তুহিনের গালে। তুহিন গাল ঘষে মিনমিনিয়ে বলে, সরি বস আর কখনো মুখ খুলবো না। রেজওয়ান কিছু না বলে কটমট করতে করতে চলে যায়। মাহিরা বুঝলো না রেজওয়ান তুহিনকে কেনো থাপ্পড় মারলো। তুহিন আর কিছু না বলে শুয়ে পরে। মাহিরা তা দেখে বলে ওঠে, ভাইয়া বলুন না উনার ওয়াইফকে কে মেরেছে? তুহিন উল্টো ঘুরে শুয়ে মাহিরাকে বলে, নাম বললে বস আমাকে প্রানে মেরে ফেলবে মেয়ে। তুমি কি সেটাই চাও আমি প্রানে মরে যাই? মাহিরা আর কিছু বলতে পারলো না।
মাঝখানে কেটে গিয়েছে আরো তিনদিন। আয়ান এখনো মাহিরার খোঁজ পায়নি। আজ সাতদিন হতে চললো মাহিরা নিখোঁজ। আয়ানের আর ধৈর্য্য কুলাচ্ছে না। রেজওয়ানের নাম্বার ট্রেস করেও রেজওয়ান কে ধরা যায়নি। বাংলাদেশের প্রতিটা কোনায় লোক লাগিয়েও আয়ান এখনো মাহিরার খুঁজ পায়নি। আয়ানের মতো রেজওয়ানও একজন অতি বুদ্ধি সম্পর্ন মানুষ। রেজওযান কাঁচা কাজ করেনা। রেজওয়ান সব কিছু প্লান করেই নেমেছে সে এবার।
দশট্রাক ভর্তি বড় বড় কন্টেইনার করে পেট্রোল এনেছে আয়ান। ফাহিম জানে না এতো পেট্রোল দিয়ে আয়ান কি করবে। ফাহিম বলে ওঠে, স্যার এতো পেট্রোল দিয়ে কি করবেন আপনি? আয়ানের হাতের জলন্ত সিগারেটে টান দিয়ে বলে, রেজওয়ানের ছাপান্ন টা গোডাউনের আর বারোটা জাহাজের প্রতিটায় পেট্রোল ঢালবি। আর হ্যা, রাজবাড়ীতে পেট্রোল ঢালার ভিডিওটা আমার চাই। 
ফাহিম ছোট করে বলে, ওকে স্যার। আয়ান যেতে যেতে আবারো বলে ওঠে, আমি কল না দেওয়া পর্যন্ত আগুন যেনো না জ্বলে। ফাহিম চমকে তাকিয়ে থাকে আয়ানের দিকে। পেট্রোল ঢালা পর্যন্ত ঠিক ছিলো। কিন্তু আগুন জ্বলবে মানে? ফাহিম তো ভেবেছিলো রেজওয়ান কে ভয় দেখানোর জন্য আয়ান শুধু তাদের পেট্রোল ঢালতে বলেছে। আয়ান কি সত্যি সত্যিই ভয়কে জয় করে তুলবে?
রেজওয়ান ঘুমাচ্ছে। এমন সময় অনবরত তার ফোনে মেসেজের শব্দ ভেসে আসতে থাকে। রেজওয়ান বিরক্ত হয়ে মোবাইল হাতে নেয়। কালকেই সে নতুন সিম কিনেছে। হঠাৎ কে মেসেজ দিচ্ছে রেজওয়ান বুঝলো না। সে তাকিয়ে দেখে এক আননোন নাম্বার থেকে অনেক গুলো মেসেজ আসাছে। রেজওয়ান বুঝলো না তার নতুন নাম্বারে কে মেসেজ পাঠাচ্ছে। রেজওয়ান ফোন হাতে নিয়ে একটা মেসেজে ক্লিক করতেই রেজওয়ানের চোখ কপালে উঠে যায়। রেজওয়ান সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি কল করে সেই নাম্বারে।
আয়ান গাড়ির ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে সিগারেট ফুঁকছে। এমন সময় তার ফোন বেজে ওঠে। আয়ান হয়তো এটার অপেক্ষাতেই ছিলো। আয়ের বাঁকা হেসে ফোন রিসিভ করে। ফোন রিসিভ হতেই রেজওয়ান ওপাশ থেকে হুংকার দিয়ে ওঠে, কুত্তার বাচ্চা আমার প্রতিটা গোডাউনে কতো লক্ষ কোটি টাকার মাল আছে তোর কোনো আইডিয়া আছে? তোর বাপ দাদা চৌদ্দ গুষ্টিকে বেঁচলেও এতো টাকা হবে না যতো টাকার মাল আমার গোডাউনে আছে। আমার একটা গোডাউন জ্বললে আমি কিন্তু এই মেয়েকে টুকরো টুকরো করে নদীতে ভাসিয়ে দিবো। 
আয়ান বাকা হেসে বলে, আরেকটা ভিডিও দিচ্ছি দেখে নে আগে। তৎক্ষণাত রেজওয়ানের ফোনে আরো একটা ভিডিওর মেসেজ আসে। রেজওয়ান ভিডিওতে ক্লিক করতেই দেখে রাজবাড়ীতে পেট্রোল ঢালা হচ্ছে।রেজওয়ানের তা দেখে মাথায় রক্ত উঠে যায়। রেজওয়ান কিরবির করে বলে ওঠে, 
- ওটা আমার ওয়াইফের শেষ স্মৃতি আয়ান। খোদার কসম করে বলছি। আমার রাজবাড়ী পুরলে আমি এই মেয়েকে জিন্দা দাফন করে দিবো।  
আয়ান সিটে গা এলিয়ে দেয়। ফোন কানে ধরে বলে, চব্বিশ ঘণ্টা সময় দিচ্ছি। এর ভেতরে মাহিকে না ছাড়লে তোর রাজবাড়ী থেকে গোডাউন সব একসাথে আগুন জ্বলবে। আই রিপিট? আগুন জ্বলবে। বলেই আয়ান ফোন কেটে দেয়।
রেজওয়ান এক আছার মেরে নিজের ফোন ভেঙ্গে ফেলে। তার গা জ্বলে যাচ্ছে। রেজওয়ান কিরবির করতে করতে চলে যায় মাহিরার কাছে। মাহিরা ঘুমিয়ে ছিলো। এমন সময় রেজওয়ান এসে পিস্তল বের করে মাহিরার পেছনে থাকা লাইটে গুলি করে। হঠাৎ শব্দে মাহিরা ঘুমের মাঝেই কেঁপে ওঠে। মাহিরার ঘুম ভেঙ্গে যায়। রেজওয়ান এবার মাহিরার কপালে পিস্তল ঠেকায়। বলে, এই কুত্তার বাচ্চা। তোর জন্য আমার হাত থেকে আজ সব চলে যাচ্ছে। আমার এতো বছরের পরিশ্রম সব ধুলোয় মিশে যাচ্ছে শুধু মাত্র তোর জন্য। 
তুহিন মাহিরার জন্য খাবার আনতে গিয়েছিলো। এসে দেখলো রেজওয়ান মাহিরার কপালে বন্ধুক ঠেকিয়ে আছে। তুহিন তাড়াতাড়ি খাবার রেখে রেজওয়ানের হাত চেপে ধরে। বলে, বস কি করছেন। ছাড়ুন এটা আমাকে দিন। রেজওয়ান বলে ওঠে, আমার হাত ছাড় তুহিন এই মেয়েকে আজ আমি প্রাণে মেরে ফেলবো। তুহিন রেজওয়ানের থেকে বন্ধুক ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। রেজওয়ানও নিজের হাত টানছে। ধস্তাধস্তির মাঝে হঠাৎ একটা গুলি বের হয়ে উপরে ছাদে লেগে যায়। 
রেজওয়ান তুহিন দুজনেই থেমে যায়। গুলি ছাদে লাগতেই ছাদ ফাটল ধরা শুরু করে। রেজওয়ান তুহিনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, কুত্তার বাচ্চা বের হ এখান থেকে। ছাদ এক্ষনি ভেঙ্গে পরবে। বলেই রেজওয়ান ছুটে চলে যায়। তুহিন আর কিছু না ভেবে তাড়াতাড়ি মাহিরার হাতের বাঁধন খুলতে থাকে। মাহিরা তাকিয়ে দেখে ছাদ থেকে বালু ঝুড়ঝুড় করে গড়িয়ে পরছে। মাহিরা তা দেখে বলে ওঠে, ভাইয়া আপনি চলে যান ছাদ এক্ষেনি ভেঙ্গে পরবে। 
তুহিন মাহিরার হাতের বাঁধন খুলে তাড়াতাড়ি মাহিরার পায়ের শিকল খুলতে থাকে। কিন্তু মাহিরা পায়ের শিকল তালা মারা। তুহিনের কাছে চাবি নেই। চাবি রেজওয়ানের কাছে, তুহিনের হাতে সময় নেই রেজওয়ানের কাছে যাওয়ার। তুহিন কিছু না ভেবে আসে পাশে তাকায়। সে কিছুটা দুরে একটা ভাঙ্গা ইট দেখে সেটা নিয়ে আসে। মাহিরা তাকিয়ে দেখে ছাদ সম্পুর্ন ফাটল ধরে গিয়েছে। মাহিরা তা দেখে বলে ওঠে, ভাইয়া আপনি এখান থেকে চলে যান প্লিজ। তুহিন কিছু না বলে, একের পর এক আঘাত হানতে থাকে তালার ওপর। এমন সময় আরবিন এসে তুহিনের হাত টেনে ধরে বলে, ভাই এখান থেকে চলেন প্লিজ। ছাদ এক্ষনি ভেঙ্গে পরবে। 
তুহিন ধাক্কা মেরে আবরিন কে ফেলে দেয়। করিবির করে বলে, শুয়োরের বাচ্চা যা এখান থেকে। তুহিন ইট দিয়ে চার পাঁচটা আঘাত করতেই তালা ভেঙ্গে যায়। এমন সময় ছাদের কিছুটা অংশ মাহিরার পেছনে ভেঙ্গে পরে। মাহিরা তা দেখে চেচিয়ে বলে ওঠে, আল্লাহর দোহাই লাগে ভাইয়া, প্লিজ আপনি এখান থেকে চলে যান। তুহিন কোনো দিকে না তাকিয়ে ঝড়ের বেগে মাহিরার পা থেকে শিকল খুলতে শুরু করে। শিকল খুলতেই সে আর এক মুহূর্তে না দাঁড়িয়ে ঝড়ের বেগে মাহিরাকে নিয়ে ছুটতে থাকে। তাদের পেছনে থেকে এক এক করে ঘষে পরতে থাকে ছাদের অংশ।
চলবে..
[ এই দুইদিন ধরে গল্প লিখতে পারছি না। মাথায় টেনশন থাকলে গল্প লেখা যায় না। আপনারা হয়তো ভাবেন আমি প্রতিদিন গল্প লিখি। কিন্তু না, আমি প্রতিদিন গল্প লিখতে পারিনা। গল্প লিখতে হয় ঠান্ডা মাথায় নিরিবিলি পরিবেশে। যেটা সবসময় হয়ে উঠে না। আবার মাঝে মাঝে মন চায় সারাদিন বসে বসে গল্প লিখি। তখন আবার লেখার টাইম থাকেনা। যারা ভাবেন গল্প শুধু লিখলেই হয়ে যায়, আসলে বিষযটা তেমন না। 
আমার লেখা এমনও অনেক পর্ব আছে যেটা আমি সম্পুর্নটা লিখে ফেলেছি। কিন্তু পরে দেখি সেটা আমার পছন্দ হয়নি। তারপর সেটা কেটে দিতে হয়েছে। ঠান্ডা মাথায় মন মতো করে আবারো লিখেছি। আমি যা তা লিখতে পারিনা। লেখার পর যদি দেখি আমার মন মতো হচ্ছে না? আমি তখন সম্পুর্ন লেখাটা কেটে দেই। যেটা লেখার পর আমারই নিজেরই পছন্দ হয়না সেটা আপনাদের কিভাবে পছন্দ হবে বলেন? 
আমি গল্প লিখতে লিখতে গল্পের কারেক্টারে ভেতরে ঢুকে যাই। তাই হয়তো আপনাদের পছন্দ হয় আমার লেখা গল্পটা। কিন্তু এই দুই দিন যাবত আমি কিছুই লিখতে পারছি না। আর আমি গল্প লিখতে না পারলে আপনারা কিভাবে গল্প পরবেন? এই টেনশনে আমার মাথা আরো কাজ করে না। আবার যখন দেখি আপনাদের রেসপন্স ভালো না? তখন তো আরো বেশি মন চায় না লিখতে। সরি, অনেক কথা বলে ফেললাম আপনাদের।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন