ফন্ট সাইজ:
থিম:
এদেখা শেষ না হোক

৩৮তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার সাথী

#এ_দেখা_শেষ_না_হোক #পর্ব - (৩৮) "ক"

#writer #sumaiya_akter_sathi 
--
শিকদার বাড়ির সকল মুরব্বিরা বসে আছেন ড্রয়িং রুমে। রাহার বাবা মা সহ রোহান নাবিলা সবাই এসেছে আজ শিকদার বাড়িতে। মূলত রাহা আর অর্নবের বিয়ের বিষয়ে কথা বলতে শাজাহান শিকদার তাদের ডেকে এনেছেন। যেহেতু তারা আগে থেকেই আত্মীয়, আবারো তারা নতুন করে আত্মীয় হতে যাচ্ছেন।
অর্নব আর রাহার বিয়েতে সবচেয়ে বেশি খুশি ছেলের বাবা আনোয়ার শিকদার। তার কারন রোহান অলরেডি এই বাড়ির মেয়ে জামাই। সেই হিসেবে রাহা আর রোহানের বাবা মা অলরেডি তাদের বেয়াই বেয়াইন হয়ে গিয়েছেন। তার উপরে রাহা আর অর্নবের বিয়ে হলে তাদের সম্পর্ক আরো বেশি মজবুত হবে। 
আনোয়ার শিকদারের কোনো মেয়ে নেই। তিন ছেলে শুধু। তার কোনো মেয়ে না থাকায় যদিও তার একটু আফসোস রয়েছে। কিন্তু ভাইয়ের মেয়ের শশুর বাড়ির সাথে আত্মীয়তা করতে পেরে তিনি এখন বেশ খুশি মনেই আছেন। অর্নব ভালো ছেলে। তার উপরে বাপ চাচাদের সাথে বিজনেস করছে। তাই রাহার বাবা মায়ের কোনো আপত্তি নেই অর্নবের সাথে তাদের মেয়ে কে বিয়ে দিতে। ছেলে হিসেবে অর্নবকে তাদের বেশ পছন্দ হয়েছে।
আয়ান সন্ধ্যার পর মাত্র বাড়ি ফিরেছে। বাড়িতে ঢুকেই আয়ান ড্রয়িং রুমে রোহানের বাবা মাকে দেখে ভ্রু কুঁচকায়। পরপর সে তাকিয়ে দেখে অর্নব আর রাহা পাশাপাশি বসে আছে। শাজাহান শিকদার আয়ানকে দেখে বলে ওঠেন, 
- আরিয়ান এদিকে আসো। রোহানের বাবা মাকে সালাম জানাও। ওনারা আবারো আমাদের নতুন আত্মীয় হতে যাচ্ছেন। অর্নব আর রাহার এনগেজমেন্ট খুব তাড়াতাড়ি হতে চলেছে।
আয়ানের আর কিছু বুঝতে বাকি নেই। আয়ান কোনো কথা ছাড়াই একোরিয়ামের উপরে থাকা একটা ফুলদানি এক আছার মেরে ভেঙে ফেলে। ফুলদানিটি ফ্লোরে পরার সাথে সাথে ভেঙ্গে গুরো গুরো হয়ে পুরো ড্রয়িং রুমের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে। উপস্থিত সবাই হা হয়ে চেয়ে থাকে আয়ানের দিকে। শাজাহান শিকদার উঠে দাঁড়িয়ে রেগে হুংকার দিয়ে ওঠেন, 
- আর ইউ ম্যাড আরিয়ান? কি শুরু করেছো তুমি? মেহমানদের সামনে এসব কি ধরনের আচরণ?
আয়ান চেচিয়ে বলে ওঠে, 
- কতোদিন নিষেধ করেছি একোরিয়ামের উপর কিছু রাখবে না? আমার কথা কারো গায়ে লাগে না? আরেকদিন একোরিয়ামের উপর কিছু রাখতে দেখলে এই বাড়ির প্রতিটা জিনিস ঠিক এইভাবে ভেঙ্গে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলবো। 
অর্নব তাকিয়ে থাকে আয়ানের দিকে। আয়ান কথাগুলো বলেই হনহনিয়ে সিড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়। শাজাহান শিকদার কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন ছেলের দিকে। বিরবির করেন, মন তো চাচ্ছে এই ছেলেকে এক্ষনি কয়েক ঘা লাগিয়ে ম্যানার্স শেখাতে। কোথায় কি করতে হবে আর বলতে হবে এই ছেলে তার কিচ্ছু জানেনা।
আনোয়ার শিকদার এবার পাশ থেকে বলে ওঠেন, ভাইজান বাদ দিন। আমি কাজের মেয়েকে বলে এগুলো সব পরিস্কার করার ব্যবস্থা করছি। শাজাহান শিকদার আর কিছু বললেন না। রোহানের বাবা মায়ের কাছে আয়ানের এই ব্যবহারটা একটু অপমান জনক লাগলো। 
আনোয়ার শিকদার এবার রোহানের বাবা মার দিকে তাকিয়ে বলেন, কিছু মনে করবেন না প্লিজ। আসলে আয়ান একটু এমনই, ওর রাগ উঠলে কোনো দিকে খেয়াল থাকে না। রোহানের বাবা মা আর কিছু বললেন না। তারা নিজেরাও জানেন আয়ান একটু ত্যাড়া প্রকৃতির। এর আগে তাদের বাড়ি থেকে রাতে আয়ান কাউকে কিছু না বলে চলে এসেছে। তাই তারা আর কিছুই মনে করলেন না।  
নাবিলা বসে আছে মুসকানের রুমে। সে আসার পর থেকে মুসকান তার সাথে একটা কথাও বলেনি। মাহিরা বুঝলো না মুসকান কেনো নাবিলার সাথে কথা বলছে না। নাবিলা অসহায় গলায় বলে ওঠে, মুসকান বিশ্বাস কর আমি এসবের কিছুই জানতাম না। আমি তো আজকেই শুনেছি সবটা।
মুসকান কিছুই বললো না। নাবিলা এবার মুসকানের গালে একহাত রেখে বলে, আমার সাথে কথা বল মুসকান। এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিস কেনো বোনের থেকে? মুসকান নাবিলার হাত ছাড়িয়ে দিয়ে বলে, প্লিজ আপু আমার রুম থেকে যাও তুমি। মাহিরার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সব। সে কিছুই বুঝতে পারছে না কথার আগা মাথা। এমন সময় মুসকানের দরজায় নক পরে। মাহিরা দাঁড়িয়ে থাকায় সে গিয়ে মুসকানের রুমের দরজা খুলে দেয়। 
মাহিরা দরজা খুলতেই আয়ান মাহিরার দিকে একটা প্যাকেট বাড়িয়ে দেয়। মাহিরা ফুসকা আর বাদাম দেখে খুশি হয়ে তাড়াতাড়ি আয়ানের থেকে প্যাকেট টা নিয়ে নেয়। আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, থ্যাংক ইউ খাড়ুস লোক। আপনি খুব ভালো। আয়ান মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, ফাস্ট এগুলো শেষ করে আমার রুমে এসো। বলেই আয়ান হনহনিয়ে চলে যায়। মাহিরা হা হয়ে চেয়ে থাকে আয়ানের যাওয়ার পানে। আয়ান তাকে রুমে যেতে বললো কেনো মাহিরা বুঝলো না।
পরপর মাহিরা আর কিছু না ভেবে প্যাকেট টা নিয়ে মুসকানের পাশে এসে বসে। মুসকানকে বলে, দেখো মুসকান তোমার ভাই তোমার জন্য ফুসকা আর বাদাম এনেছে। চলো আমরা সবাই মিলে এগুলো খাই। মুসকান বলে ওঠে, এসব আমি খাবোনা মাহিরা। তুমি প্লিজ এগুলো সব নিয়ে যাও। 
মাহিরা এবার মুসকানের গালে এক হাত রেখে বলে, আমার কথা তুমি শুনবে না মুসকান? আমি তোমার কে হই ভুলে গেলে তুমি? মুসকান তাকায় মাহিরার দিকে। এই মেয়ের আবদার ফেলা যায় না। মাহিরা বলে ওঠে, আসো আমরা ফুসকা খাই। পরপর মাহিরা নাবিলার দিকে তাকিয়ে বলে, নাবিলা আপু তুমিও আসো আমরা একসাথে বসে সবাই মিলে ফুচকা খাই। অনেক গুলো ফুসকা আছে এখানে। তিন জনের অনায়াসে হয়ে যাবে। 
নাবিলা ভেবেছিলো ফুসকা খেতে খেতে মুসকানের সাথে সে কিছু কথা বলে নিবে। তাই নাবিলা এসে মুসকানের পাশে বসলে নিলে মুসকান বলে ওঠে, আপু প্লিজ তুমি আমার রুম থেকে যাও। আমার ভালো লাগছে না কিছু। নাবিলা বসতে চেয়েও আর বসলো না। সে মুসকানের দিকে তাকিয়ে বলল, আমাকে ভুল বুঝিস না মুসকান। আমি সত্যিই এসবের কিছু জানতাম না। বলেই নাবিলা চলে যায়। 
মাহিরা ভ্রু কুঁচকে তাকায় মুসকানের দিকে। বলে, তুমি নাবিলা আপুকে চলে যেতে বললে কেনো মুসকান? মুসকান মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, আপু এখানে থাকলে আমার মেজাজ আরো বেশি খারাপ হতো তাই। মাহিরা আর কিছু না বলে ফুচকার প্যাকেট খুলে দুজনে ফুচকা খেতে শুরু করে।
একঘন্টা হতে চললো আয়ান তার রুমে বসে আছে। মাহিরার আসার কোনো নাম গন্ধ নেই। আয়ানের মেজাজ খারাপ হয়। এই মেয়েকে তাড়াতাড়ি আসতে বললে এই মেয়ে আরো দেরি করে আসে। আয়ান রাগে চোয়াল শক্ত করে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে যায়। দরজা খুলে বেরুতে নিলে সামনে তাকিয়ে দেখে মাহিরা দাঁড়িয়ে আছে। 
মাহিরা সবে মাত্র আয়ানের রুমের দরজা নক করতে যাবে তার আগেই রুমের দরজা খুলে যায়। মাহিরা থতমত খেয়ে যায়। সামনে তাকিয়ে দেখে আয়ান দাঁড়িয়ে আছে। মাহিরা কিছু বলতে যাবে তার আগেই আয়ান কোনো কথা ছাড়াই মাহিরাকে টেনে তার রুমে এনে দরজা লাগিয়ে দরজার সাথে চেপে ধরে। মাহিরা ভ্রু কুঁচকে তাকায় আয়ানের দিকে। 
আয়ান খালি গায়। তা দেখে মাহিরা নাক ছিটকে তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করে বলে, ছি আপনি কতো খারাপ। এভাবে কেউ খালি গায়ে থাকে নাকি? আয়ান মুচকি হেসে মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, চোখ খোলো। মাহিরা বলে ওঠে, আপনি আগে গায়ে কিছু পরে আসুন। আয়ান বলে ওঠে, 
- ইডিয়েট এখন আমি তোর হাসবেন্ড। এখন আমাকে খালি গায়ে দেখতে তোর কি প্রবলেম?
মাহিরা বলে ওঠে, 
- ওমা হাসবেন্ড হয়েছেন বলে কি লজ্জা সরম কিছু থাকবে না নাকি? 
আয়ান ছোট করে বলে, নো। মাহিরা আর কিছু বলল না। আয়ান এবার মাহিরা গালে তার এক হাত রাখে। ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেতেই মাহিরা কিছুটা কেঁপে ওঠে। সে এবার পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায় আয়ানের দিকে। মাহিরা চোখ মেলে তাকাতেই দু'জনের চোখাচোখি হয়। আয়ান মাহিরার চোখের দিকে তাকিয়ে গেয়ে উঠে...
চোখে চোখে কথা বলো 
হৃদয়ে রাখো হৃদয়,
মনে মনে ভাসি চলো
হয়ে যাক না প্রণয়
চার লাইন গেয়ে আয়ান মাহিরার গাল থেকে তার হাত সরিয়ে নেয়। পরপর উল্টো ঘুরে তার বেডের দিকে চলে যেতে নিলে তখনই তার কানে মধুর কন্ঠো স্বর ভেসে আসে...
বুকের ভেতর তোমার জন্য মাতাল হাওয়া বয়
অনুভবে না বলা কথা, বুঝে নিতে হয়
আয়ানের পা থেমে যায়। এই দুই লাইন গান আয়ানের বুকে যেনো ঝড় বইয়ে দিতে থাকে। গানের মাঝে হলেও মাহিরা তাকে তুমি করে ডেকেছে। আয়ান ঝড়ের বেগে তাড়াতাড়ি পেছন ঘুরে তাকায়। মাহিরা তার দিকে তাকিয়ে আছে। আয়ান কোনো কথা ছাড়াই এসে মাহিরাকে চাপ্টে ধরে। মাহিরা হতভম্ব হয়। আয়ান মাহিরাকে জড়িয়ে ধরে উৎফুল্ল কন্ঠে বলে,
- আরেক বার বল সানফ্লাওয়ার?
মাহিরা ভ্রু কুঁচকায়। আয়ান কিসের কথা বলছে সে বুঝলো না। মাহিরা ছোটো করে বলে, কি বলবো? আয়ান বলে ওঠে, মাত্র যেটা বললি সেটা আবার বল? মাহিরা ভেবেছে আয়ান হয়তো গানের কথা বলেছে। তাই সে বলে, আমি পারবো না। আয়ান এবার মাহিরাকে ছেড়ে মাহিরার দু'গালে তাে দু'হাতে রেখে মাহিরার সমস্ত মুখ ছোটো ছোটো চুমু একে দিতে থাকে। মাহিরা তা দেখে বলে ওঠে, কি করছেন? ছাড়ুন আমায়। আয়ান না ছেড়ে মাহিরার চোখ, নাক, কপাল, ঠোঁট সব জায়গায় ছোটো ছোটো চুমু একে দিতে থাকে। মাহিরা তা দেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। এই লোক একটু খুশি হলেই তাকে চুমু দিয়ে ভরিয়ে দেয়। 
মাহিরা বলে ওঠে, হয়েছে হয়েছে। আর চুমু দিতে হবে না। ছাড়ুন এবার। আয়ান মাহিরা মুখে চুমু দিতে দিতে বলে, না হয়নি। এখনো অনেক চুমু বাকি আছে। মাহিরা বুঝলো না এই লোক কেনো হঠাৎ এমন পাগলামি করছে। শুধু বুঝলো এই লোক কোনো কারনে খুশি হয়েছে।
আয়ান মাহিরাকে ছেড়ে এবার নেশালো কন্ঠে বলে, আজ একটু আদর করতে দে মাহি। তোকে খুব আদর করতে মন চাচ্ছে। মাহিরা বলে ওঠে, আমি আগেই বলে দিয়েছি বাড়িতে এসব পাগলামি করবেন না। আয়ান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, বাড়িতে বলে কি আমি আমার বউকে ছুঁতে পারবো না। মাহিরা বলে ওঠে, না পারবেন না। আয়ান একা একা বিরবির করে, 
- একবার ভাগে পেয়ে নেই দারা, আমিও মজাটা বুঝিয়ে দিবো।। 
মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে, কিছু বললেন? আয়ান মাহিরার গালে এক হাত রেখে বলে, আমাকে কষ্ট দিচ্ছিস কেন মাহি? প্লিজ বোঝার চেষ্টা কর। তোকে ছাড়া থাকতে আমার কষ্ট হয়। মাহিরা বলে ওঠে, ওমা আমি কখন কষ্ট দিলাম আপনাকে? আয়ান আর কিছু বললো না। মাহিরার হাত ধরে মাহিরাকে তার বেডের কাছে নিয়ে এসে বলল, 
- মাথা ব্যাথা করছে। মালিশ করে দিয়ে যা। 
আয়ান ড্রয়ার থেকে একটা মলম বের করে মাহিরার হাতে ধরিয়ে দেয়। মাহিরা মলম হাতে নিয়ে বলে ওঠে, 
- আপনার গলা ব্যাথ্যা করে না? 
আয়ান কটমট দৃষ্টিতে তাকায় মাহিরার দিকে। মাহিরা তা দেখে আমতা আমতা করে বলে ওঠে, না মানে। তাহলে আপনার গলাটাও একটু মালিশ করে দিতাম আরকি। আয়ান এবার ধমক দিয়ে বলে ওঠে, 
- ইডিয়েট। ফাজলামো করিস আমার সাথে? এক থাপ্পড় দিয়ে তোর সব দাঁত ফেলে দিবো বেয়াদব। 
আয়ানের ধমক খেয়ে মাহিরার মুখটা কালো হয়ে যায়। মাহিরা কিছু না বলে দরজার দিকে হাঁটা দেয়। আয়ান তা দেখে খপ করে মাহিরার হাত ধরে ফেলে। নরম গলায় ডাকে, বেইবি? কোথায় যাচ্ছিস? মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে রেগে বলে ওঠে, খাড়ুস লোক একটা। আমার হাত ছাড়ুন। আয়ান টেনে মাহিরাকে নিজের কাছে এনে কোলে বসায়। বলে, আই এম সরি বেইবি। রাগ করছিস কেনো? মাহিরা বলে ওঠে, ছাড়ুন আমায়। আমি চলে যাবো। আর জিবনেও আপনার রুমে আসবো না। আয়ান আরো শক্ত করে মাহিরাকে জড়িয়ে রেখে বলে, 
- নো, তোকে ছাড়া যাবে না। তুই আমার রক্তে মিশে গেছিস। 
মাহিরা হা হয়ে চেয়ে থাকে আয়ানের দিকে। আয়ান এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, সত্যিই মাথা টা খুব ব্যাথ্যা করছে। দে না একটু মালিশ করে। মাহিরা আর কিছু না বলে বলল, ঠিক আছে ছাড়ুন আমি মালিশ করে দিচ্ছি। আয়ান মাহিরার কোমড় চাপ্টে ধরে বলে, নো। এভাবে করে দে। মাহিরা আর কথা না বাড়িতে আয়ানের কোলে বসেই আয়ানের কপালে মালিশ করে দিতে থাকে।
অর্নব আর রাহার এনগেজমেন্টের ডেট ফিক্সড করা হয়েছে। এনগেজমেন্টের পরপরই বিয়ে। আপাদত এনগেজমেন্ট টা করা হবে, রাহার পরিক্ষা শেষে দুই পরিবার মিলে রিয়ের ডেট ফিক্সড করবে। খুব তাড়াতাড়ি অর্নব আর রাহার এনগেজমেন্টের ডেট টা দেওয়া হয়েছে। তাই ছেলে আর মেয়েকে একটু আলাদা ভাবে কথা বলার জন্য ছাদে পাঠানো হয়েছে।  
অর্নব দাঁড়িয়ে আছে ছাদে। রাতে হলেও ছাদে পর্যাপ্ত আলো থাকায় চারপাশ বেশ ভালোই দেখা যাচ্ছে। অর্নব তাকিয়ে আছে রাতের দুর আকাশের দিকে। এমন সময় ছাদে রাহা আসে। অর্নবকে দেখে বলে, কেমন আছেন অর্নব? এতোইদিন বেয়াই বলে ডাকলেও রাহা আজ অর্বনকে অর্নব বলে ডাকলো। অর্নব একবার পেছন ঘুরে রাহার দিকে তাকায়। পরপর আবারো আকাশের পানে তাকিয়ে ছোট করে বলে, ভালো। 
রাহা আবারো বলে, শুধুই ভালো? অর্নব আর কিছুই বললো না। রাহা আবারো বলল, আমাদের তো এনগেজমেন্টের ডেট ফিক্সড হয়ে গেলো। অর্নব ছোট করে বলে, শুনলাম তো। রাহা বলে ওঠে, একটা কথা বলা হয়নি আপনাকে। অর্নব ছোট করে বলে, কি কথা? রাহা অর্নবের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, 
- আমি কিন্তু আপনাকে আগে থেকেই পছন্দ করতাম অর্নব। কিন্তু কখনো আপনাকে সেটা বলা হয়নি।
অর্নব হ্যা না কিছুই বলল না। রাহা আবারো বলল, কখনো ভাবিনি আপনার সাথেই আমার বিয়ে ঠিক হবে। অর্নব এবার মুচকি হেসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, আমরা কখনো যেটা ভাবিনা সেটাই আমাদের সাথে হয়। রাহা অর্নবের কথায় কিছুটা ভ্রু কুঁচকায়। বলে, আপনার এই বিয়েতে সম্মতি আছে তো অর্নব? অর্নব এবারেও কিছুই বললো না।
রাহা আবারো বলে ওঠে, আমাকে কি আপনার পছন্দ হয়নি অর্নব? অর্নব রাহার দিকে না তাকিয়েই বলে, বাবা আর চাচ্চুদের পছন্দ হয়েছে আপনাকে। রাহা আবারো এক প্রশ্ন ছুরে দেয়, আর আপনার? অর্নব আবারো কিছুটা হাসলো। বলল, আমার পছন্দের দাম নেই? যেদিন প্রথম আমি বাড়িতে বললাম আমি ডাক্তার হতে চাই? সেদিন আমার বাবা আমাকে একটা কথাই বলেছিলেন। যে ডাক্তার হতে হলে আমাকে এই বাড়ি ত্যাগ করতে হবে। যদি এই বাড়িতে থাকতে চাই? তাহলে আমাকে আমার বাপ চাচাদের বিজনেসের হাল কাঁধে নিতে হবে। সেদিন থেকে আমি আমার সব পছন্দ অপছন্দ বিসর্জন দিয়ে দিয়েছি।
রাহা কিছুটা অবাক হয়। সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মুসকান ডাক ভেসে আসে, রাহা আপু তোমাকে সবাই নিচে ডাকছে। মুসকানের কন্ঠ পেয়ে রাহা আর অর্নব দুজনই পেছন ঘুরে তাকায়। মুসকান দাঁড়িয়ে আছে তাদের থেকে কিছুটা দুরে। রাহা এবার অর্নবের দিকে তাকিয়ে বলে, আসছি অর্নব। ভালো থাকবেন। অর্নব হ্যা না কিছুই বললো না। রাহা আর কিছু না বলে ছাদ থেকে চলে যায়।
অর্নব আর মুসকান দাড়িয়ে থাকে ছাদে। মুসকান এসে অর্নবের মুখোমুখি সামনে এসে দাঁড়ায়। অর্নবের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, তুমি কি রাহা আপুকে পছন্দ করো অর্নব ভাই? অর্নব মুসকানের দিকে তাকিয়ে দেখলো মুসকানের চোখ ফোলা। বুঝলো মুসকান এতোক্ষণ কান্না করেছে। অর্নব বলে ওঠে, 
- তোর বাপ আর আমার বাপ মিলে রাহা কে পছন্দ করেছে। এখানে আমার পছন্দ অপছন্দের কি যায় আসে?
মুসকান বলে ওঠে, তুমি তো একবার তাদের না বলতে পারতে? অর্নব বলে ওঠে, আমি বড়োদের মুখের উপর কথা বলিনা তুই সেটা খুব ভালো ভাবেই জানিস মুসকান। মুসকান বলে ওঠে, তাহলে কি ধরে নিবো তুমি আগে থেকেই রাহা আপুকে পছন্দ করতে? অর্নব বলে ওঠে, মুখ সামলে কথা বলবি মুসকান। বলেই অর্নব ছাদ থেকে চলে যেতে নিলে মুসকান বলে ওঠে, তোমার সাথে আমার কথা শেষ হয়নি অর্নব ভাই। 
অর্নবের পা থেমে যায়। সে পেছন ঘুরে মুসকানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, আমি তোর সাথে কোনো কথা বলতে চাই না। মুসকান আবারো এগিয়ে আসে অর্নবের কাছে। বলে ওঠে, তো কার সাথে কথা বলতে চাও? রাহা আপুর সাথে? অর্নবের মেজাজ খারাপ হয়। অর্নব বলে ওঠে,
- বার বার রাহা রাহা করছিস কেন মুসকান? কি সমস্যা তোর?
মুসকান চেচিয়ে বলে ওঠে, আমার সমস্যা রাহা আপুর সাথে তোমার এনগেজমেন্ট ঠিক হয়ে গিয়েছে। অর্নব মেজাজ খারাপ করে বলে ওঠে, তাতে তোর কি? তুই কেনো এতো প্রশ্ন করছিস আমাকে? মুসকান বলে ওঠে, তুমি জানোনা আমি কেনো এতো প্রশ্ন করছি? অর্নব বলে ওঠে, না জানিনা। আর জানতেও চাইনা। 
বলেই অর্নব আবারো চলে যেতে নিলে মুসকান হুট করে অর্নবকে জড়িয়ে ধরে। অসহায় গলায় বলে ওঠে,
- আমি তোমাকে ভালোবাসি অর্নব ভাই। নিজের থেকেও অনেক বেশি ভালোবাসি। 
অর্নবের বুক ধুক ধুক করছে। মুসকান তাকে এর আগে কখনো ডিরেক্টলি এভাবে ভালোবাসি কথাটা বলেনি। আর না তার এতো কাছে এসেছে কখনো। অর্নবের নিশ্বাস ভারি হয়ে আসে। অর্নব বলে ওঠে, মুসকান ছাড় আমায়। মুসকান আরো শক্ত করে অর্নবকে জড়িয়ে ধরে বলে, তুমি প্লিজ এই বিয়ে টা ভেঙ্গে দাও অর্নব ভাই। আমি তোমাকে অনেক বেশিই ভালোবাসি বিশ্বাস করো। অর্নব নিজের থেকে মুসকানকে ছাড়াতে চেয়ে আবারো বলে, আমাকে ছাড় মুসকান। মুসকান বলে ওঠে, 
- প্লিজ অর্নব ভাই বোঝার চেষ্টা করো। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। প্লিজ তুমি এই বিয়ে টা ভেঙ্গে দাও। 
অর্নব ঝাড়া মেরে মুসকানকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে দিয়ে বলে, পাগলামি করিস না মুসকান। বাড়িতে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। মুসকান অর্নবের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, তুমি শুধু বাড়ির কথাই চিন্তা করছো অর্নব ভাই। আমি যে তোমাকে অনেক বেশি ভালো..। বাকি কথা বলার আগেই অর্নব বলে ওঠে, বারবার এক কথা বলবি না মুসকান।
বলেই অর্নব ছাদের দরজায় দিকে হাটা দেয়। মুসকান অর্নবকে ছাদ থেকে চলে যেতে দেখে আবারো ছুটে এসে অর্নবকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। অর্নবের পা থেমে যায়। মুসকান এবার অর্নবকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে কেদে দেয়। কেঁদে কেঁদে বলতে থাকে, 
- আমি তোমার পায়ে পরছি অর্নব ভাই। আমাকে তোমার ভালোবাসা ভিক্ষা দাও। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না বিশ্বাস করো।
অর্নব কি বলবে খুঁজে পায় না। সে তার পেটে আকড়ে থাকা মুসকানের হাত ছাড়িয়ে দিতে চেয়ে বলে, মুসকান কেউ দেখলে খারাপ ভাববে। ছাড় আমায়। মুসকান আরো শক্ত করে অর্নবের পেট আকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমাকে তোমার কোনোদিন ভালোবাসতে হবে না অর্নব ভাই। কিন্তু তুমি প্লিজ অন্য কারো হয়ো না। তুমি এই বিয়ে ভেঙ্গে দাও। প্লিজ অর্নব ভাই। অর্নব দু'হাতে ঝাড়া মেরে মুসকানের হাত দুটো ফেলে দিয়ে বলে, তোর এসব পাগলামি বাদ দে মুসকান।
মুসকান এবার ভেজা চোখে অর্নবের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, আমাকে কেন ভালোবাসলে না অর্নব ভাই? অর্নব আবারো থমকে যায়। কিছু বলতে চেয়েও সে কিছুই বলতে পারলো না মুসকানকে। মুসকান আবারো বলে ওঠে, রাহা আপু কি আমার চেয়ে বেশি সুন্দর অর্নব ভাই? অর্নবের বলে ওঠে, 
- আরেকবার রাহার নাম তোর মুখে শুনলে? তোর ভাইয়ের মতো আমিও থাপ্পড় দিয়ে তোর মুখের মানচিত্র সব চেঞ্জ করে ফেলবো। 
মুসকান আবারো অর্নবকে জড়িয়ে হু হু করে কেঁদে উঠে। অর্নব দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। মুসকান কেঁদে কেঁদে বলে, আমি বুঝ হওয়ার পর থেকে শুধু তোমাকে ভালোবেসেছি অর্নব ভাই। তোমার জামাকাপড় থেকে শুরু করে ঘর সাজানো সব নিজ হাতে করেছি। কখনো ভাবেনি তোমার ঘরে আমি ব্যতিত অন্য কোনো নারী বউ হয়ে আসবে। আমি তো নিজের ভেবে সবকিছু করেছি বলো? তাহলে আজ সেই ঘরে কিভাবে অন্য কাউকে থাকতে দেখবো আমি?
অর্নব বলে ওঠে, মুসকান ছাড় প্লিজ। কেউ দেখে ফেলবে। মুসকান আরো জোরে জোরে কাঁদতে থাকে। বলতে থাকে, তুমি আমায় ভালোবাসো না আমি সেটা মেনে নিয়েছি অর্নব ভাই। কিন্তু তুমি আমি ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসবে? অন্য কারো সাথে সংসার করবে? সেটা আমি কিভাবে মেনে নিবো অর্নব ভাই? অর্নব কিছুই বলতে পারলো না। মুসকান আবারো বলল, প্লিজ অর্নব ভাই তুমি অন্য কারোও হয়ো না। আমি সইতে পারবো না বিশ্বাস করো। অর্নব এবার জোর করে মুসকানকে ছাড়িয়ে দেয়। মুসকান অনবরত হেঁচকি তুলে কেঁদেই যাচ্ছে। অর্নব বলে ওঠে,
- রুমে যা মুসকান। পাগলামি বন্ধ কর। যা হযেছে সব মেনে নে। 
মুসকান এবার হুট অর্নবের পা জড়িয়ে ধুকরে কেঁদে উঠে। বলে ওঠে, আমি তোমার পায়ে পরি অর্নব ভাই। আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো না প্লিজ। আমি তোমার কাছে ভালোবাসা ভিক্ষা চাচ্ছি। প্লিজ তুমি আমায় ভালোবাসা ভিক্ষা দাও? অর্নব মুসকানের থেকে নিজের পা ছাড়াতে চেয়ে বলে, মুসকান আমার পা ছাড়। কি শুরু করেছিস তুই? মুসকান অর্নবের পা দু হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে, তুমি আমার না হয়ে অন্য কারো হতে পারবে না অর্নব ভাই। অর্নব আবারো বলে ওঠে, আমার পা ছাড় মুসকান। মুসকান এবার বলে ওঠে, 
- খোদার কসম অর্নব ভাই। তুমি আমি ব্যতিত অন্য কারো হলে আমি কিন্তু নিজেকে শেষ করে দিবো। 
অর্নব এবার ঝাড়া মেরে মুসকানের থেকে নিজের পা ছাড়িয়ে মুসকানের গালে কষিয়ে এক থাপ্পড় বসায়।মুসকান টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে গিয়ে কিছুটা দুরে পরে যায়। পরে গিয়ে সেখানে বসেই মুসকান ফুপিয়ে কেঁদে উঠে। অর্নব কিরবির করে বলে ওঠে, আরেকদিন এসব পাগলামি করতে দেখলে তোর ভাইকে বলে উচিত শিক্ষাটা দেওয়াবো আমি। বলেই অর্নব হনহনিয়ে চলে যায় ছাদ থেকে। 
মাহিরা তব্দা খেয়ে চেয়ে আছে ছাদের দরজায় দাড়িয়ে। অর্নব মাহিরাকে পাশ কাটিয়ে ছাদ থেকে চলে যায়। মাহিরা মুসকানকে রুমে খুঁজে না পেয়ে পুরো বাড়ি খুঁজে ছাদে এসেছিলো। এসে দেখে মুসকান অর্নবের পা ধরে আছে। মাহিরা বুঝলো না মুসকান কেনো অর্নবের পা ধরে কাঁদছে। মাহিরার ভাবনার মাঝেই হঠাৎ অর্নব থাস করে মুসকানের গালে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয়।
মুসকান মেজেতে বসে ফুপিয়ে কাঁদছে। অর্নব ছাদ থেকে চলে যেতেই মাহিরা ছুটে আসে মুসকানের কাছে। হাঁটু গেড়ে বসে মুসকানকে ধরে উঠাতে চেয়ে বলে, মুসকান কি হয়েছে তোমার? উঠো এখান থেকে। মুসকান মাহিরার কন্ঠ পেয়ে এবার হুট করে মাহিরাকে জড়িয়ে ধরে আরো জোরে জোরে কেঁদে দেয়। মাহিরা বুঝলো না মুসকানের হঠাৎ এমন কান্না করছে কেনো? মুসকান তো একটু আগেও ভালো ছিলো।
মুসকান কেঁদে কেঁদে মাহিরাকে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে,  
- অর্নব ভাই কেন আমাকে ভালোবাসলো না মাহিরা? আমি তো সত্যিই তাকে ভালোবেসেছিলাম বলো? 
মুসকানের কথায় মাহিরা থমকে যায়। মুসকান আবারো বলে ওঠে, 
- বলো না মাহিরা? আমার ভাগ্য কেনো রাহা আপুর মতো হলো না? আমি কেনো আমার অর্নব ভাইকে পেলাম না? বলো না মাহিরা? বলো?
মাহিরা নিস্তব্ধ। সে কি বলবে নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। মাহিরার আর বুঝতে বাকি নেই মুসকান যাকে ভালোবাসে সেটা আর কেউ না, অর্নব। মাহিরা এতোদিনে কেনো সেটা বুঝতে পারলো না? মুসকান আবারো পাগলের মতো বলতে থাকে , 
- মাহিরা বলো না? আল্লাহ কেনো আমার ভাগ্য অর্নব ভাইকে লিখলেন না? আমার ভালোবাসায় কি কোনো কমতি ছিলো? আমি তো মন থেকে আল্লাহর কাছে প্রতি মোনাজাতে অর্নব ভাইকে চেয়েছি বলো? তারপরও কেনো আমি আমার অর্নব ভাইকে পেলাম না? বলো না মাহিরা? বলো? আমি কিভাবে থাকবো আমার অর্নব ভাইকে ছাড়া? আমি কিভাবে সয্য করবো অর্নব ভাইয়ের পাশে অন্য কাউকে? 
মুসকানের এমন আর্তনার্থে মাহিরার চোখেও পানি চলে আসে। মুসকান আবারো পাগলের মতো বলতে থাকে,
- ও মাহিরা বলোনা? তুমি চুপ করে আছো কেনো? অর্নব ভাই কেনো আমাকে ভালোবাসলো না? বলো না মাহিরা। আমি আমার অর্নব ভাইয়ের সাথে কেনো সংসার করতে পারলাম না? আমার সাজানো ঘরে অন্য কেউ থাকবে? এটা আমি কিভাবে দেখবো? কিভাবে মেনে নিবো? আমার অর্নব ভাই কেনো আমাকে একটু ভালোবাসলো না? 
মাহিরা নিজেও নিঃশব্দে কেঁদে বলে, শান্ত হও মুসকান। প্লিজ পাগলামি করো না। মুসকান এবার পাগলের মতো তার হাত পা ছোটাছুটি করে ছটফট করতে শুধু করে। ছটফট করতে করতে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে,
- আমি শান্ত হতে পারছি না মাহিরা। আমার কলিজা পুরে যাচ্ছে বিশ্বাস করো। আমি কিভাব তোমাদের দেখাবো সেটা? আমি কিভাবে বেঁচে থাকবো আমার অর্নব ভাইকে ছাড়া? 
মাহিরা মুসকানকে শক্ত করে চেপে ধরে বলে, মুসকান প্লিজ একটু শান্ত হও। আমি আছি তোমার পাশে। মুসকান আবারো কেঁদে কেঁদে বলে ওঠে, আমি অর্নব ভাইকে সত্যি ভালোবাসি মাহিরা। বিশ্বাস করো? মাহিরা মুসকানকে জড়িয়ে রেখে বলে, হ্যা আমি বিশ্বাস করেছি। তুমি প্লিজ শান্ত হও এবার। 
মুসকান এবার মাহিরাকে ছেড়ে দেয়। মাহিরার দিকে তাকিয়ে পাগলের মতো বলতে শুরু করে, আচ্ছা মাহিরা? আমার অর্নব ভাই কি সত্যিই অন্য কাউকে ভালোবাসবে? অন্য কেউ আমার গোছানো ঘরে অর্নব ভাইয়ের সাথে থাকবে? পরপর একটু থেমে মুসকান দু'হাতে নিজের চুল খামছে ধরে বলে ওঠে, না না না এটা হতে পার না। আমি কিছুতেই এটা দেখতে পারবো না। বলেই মুসকান খপ করে মাহিরার হাত দুটো ধরে ফেলে বলে ওঠে, 
- মাহিরা তুমি প্লিজ আমার চোখ দুটো উঠিয়ে দিবে?
মাহিরা আশ্চর্য চোখে চেয়ে থাকে মুসকানের দিকে। এতো সুন্দর মেয়েটা আজ এভাবে পাগলের মতো আচরণ করছে? ভালোবাসা কি মানুষ কে সত্যিই পাগল বানিয়ে দেয়? মুসকান মাহিরার থেকে কোনো জবাব না পেয়ে আবারো বলে ওঠে, আমার চোখ দুটো তুমি উঠিয়ে দাও না প্লিজ মাহিরা। অর্নব ভাইকে অন্য কারো সাথে দেখার আগে প্লিজ তুমি আমার চোখ দুটো উঠিয়ে দাও। 
মাহিরা এবার মুসকানকে টেনে শক্ত করে তার বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠে। বলে ওঠে, আল্লাহর দোহাই লাগে মুসকান। প্লিজ একটু থামো, তুমি আর পাগলামি করো না। মুসকান মাহিরার বুকে মাথা রেখে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে থাকে। মাহিরার মনে হচ্ছে মুসকানের কান্নায় তার বুক ফেটে যাচ্ছে। মাহিরা মুসকানের মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, শান্ত হও মুসকান প্লিজ শান্ত হও। সব ঠিক হয়ে যাবে। 
মুসকান গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে, আমাকে কেন অর্নব ভাই ভালোবাসলো না মাহিরা? আমি তো মন প্রাণ উজাড় করে তাকে ভালোবেসেছি বলো? সে কেনো আমায় একটু ভালোবাসলো না? আমার কথা কি তার মনে পরবে না মাহিরা? সে কি সত্যিই আমায় ভুলে যাবে?
মাহিরা মুসকানকে জড়িয়ে নিজেও কাঁদছে। সে বলতে পারলো না কিছুই। মুসকান আবারো বলে, আমার অর্নব ভাই কেনো আমার হলোনা মাহিরা? আমার অর্নব ভাই আমার কলিজা চাইলে আমি আমার কলিজাটাও কেটে তার হাতে উঠিয়ে দিতাম। অর্নব ভাই কেনো আমায় একটা বার চাইলো না মাহিরা?
____________
আয়ান পুরো বাড়ি খুঁজে মাহিরাকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে তার মেজাজ খারাপ হয়। সে একটু ঘুমিয়েছিলো মাথা ব্যাথা করছিলো বলে। মাহিরাকে বার বার বলে ছিলো তার পাশে যেনো বসে থাকে সে যতক্ষণ ঘুমায়। কিন্তু এই মেয়ে ঘুমানোর সুযোগ নিয়ে কখন তার রুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছেরআয়ান জানেনা। এখন আবার এই মেয়ে লাপাত্তা। 
আয়ানের মেজাজ খারাপ হয়। এই মেয়ে কি একটুও তার পাশে শান্তি মতো বসে থাকতে পারে না? আয়ান পুরো বাড়ি খুঁজে মাহিরাকে খুঁজে না পেয়ে ছাদের উদ্দেশ্য হাঁটা দেয়। এই মেয়েকে আজ ছাদে পেলে কষিয়ে গালে দুটো থাপ্পড় বসাবে আগে। এতো রাতে কোন সাহসে এই মেয়ে ছাদে গিয়েছে? থাপ্পড় দিয়ে তার রাতে ছাদে আসার স্বাদ সবার আগে মিটিয়ে দিবে। 
আয়ান সিড়ি বেয়ে ছাদের উদ্দেশ্য উপরে উঠছে। সে আরো কয়টা সিড়ি বেয়ে ছাদের দরজায় দিকে যেতে নিলে সামনে তাকিয়ে দেখে অর্নব দাঁড়িয়ে আছে চোরের মতো। আয়ানকে দেখা মাত্র অর্নব ঝড়ের বেগে তাড়াতাড়ি আয়ানের পাশ কাটিয়ে নিচে নেমে যায়।
আয়ান ভ্রু কুচকায় অর্নববের এমন কান্ডে। অর্নব এমন আচরন করছে যেনো সে চুরি করে ধরা খাওয়ার ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আয়ান বুঝলো না অর্নব কেনো দরজার আড়ালে এভাবে লুকিয়ে ছিলো। অর্নব চলে যেতেই আয়ান সিড়ি বেয়ে ছাদে চলে আসে। 
মুসকান এখনো কেঁদেই যাচ্ছে। মাহিরা নিজেও কেঁদে কেঁদে মুসকানকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। এমন সময় কারো গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে আসে, 
- এখানে কি করছিস? 
আয়ানের গম্ভীর কন্ঠ পেয়ে মুসকান আর মাহিরার দুজনেরই কান্না থামা যায়। মুসকান তার ভাইয়ের গলা পেয়ে মাহিরার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। আয়ান ভ্রু কুঁচকে মেজেতে বসে থাকা দুই ইডিয়েটের দিকে তাকায়। এই দুই ইডিয়েট মেজেতে কি করছে আয়ান বুঝলো না। মাহিরা আর মুসকান দুজনই নিজেদের চোখ মুছে নেয়। 
পরপর মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, কিছু না। আপনি এখান থেকে যান প্লিজ। মাহিরা আর মুসকানকে চোখ মুছতে দেখে আয়ানের আর বুঝতে বাকি নেই এই দুই ইডিয়েট এতোক্ষণ এখানে বসে গাধার মতো কেঁদেছে। আর ওই বড় ইডিয়েট গাধাটা দরজার বাহিরে থেকে সেগুলো সব শুনেছে। 
আয়ানের রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। আয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে, দুই মিনিটের ভেতরে দুইটায় নিচে আসবি। নাহলে এমন থাপ্পড় দিবো? সারাজীবনের জন্য কান্না করার স্বাদ মিটে যাবে। বলেই আয়ান হনহনিয়ে চলে যায় ছাদ থেকে। মাহিরা আর কিছু না বলে মুসকানে উঠিয়ে নিজেও উঠে দাঁড়ায়। পরপর মুসকানকে নিয়ে চলে যায় ছাদ থেকে।
#এ_দেখা_শেষ_না_হোক #পর্ব - (৩৮) "খ"
#writer_sumaiya_akter_sathi 
--
আয়ান তার রুমে বসে রাগে ফুঁসছে। তার মন চাচ্ছে ওই তিন ইডিয়েটকে থাপ্পড় দিয়ে গাল লাল করে দিতে। রাগে আয়ানের গা জ্বলে যাচ্ছে। এমন সময় আয়ানের রুমের দরজায় নক পরে। আয়ান হনহনিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। অর্নব দাঁড়িয়ে আছে আয়ানের রুমের দরজার সামনে। আয়ান ভেবেছিলো মাহিরা এসেছে। কিন্তু অর্নবকে দেখা মাত্র আয়ানের মেজাজ বেড়ে দিগুণ হয়ে যায়।
আয়ান রুমের দরজা আবারো লাগাতে নিলে অর্নব বলে ওঠে, ভাইয়া দাঁড়াও? আয়ান দরজা না লাগিয়ে অর্নবের দিকে তাকিয়ে বলে, এখান থেকে যা অর্নব। অর্নব দাঁড়িয়ে থেকে বলে ওঠে, 
- সরি ভাইয়া। সকালে মাহিরাকে নিয়ে ওসব কথা বলা আমার একদম ঠিক হয়নি। 
অর্নবের কথা শুনে আয়ানের আরো বেশি মেজাজ খারাপ হয়। আয়ান কিরবির করে বলে, তোকে যেনো আমার চোখের সামনে না দেখি। বলেই আয়ান থাস করে অর্নবের মুখের উপর দরজাটা লাগিয়ে দেয়। অর্নব বুঝলো না সরি বলার পরও আয়ান কেনো তার উপর এখনো রেগে আছে।
মাহিরা মুসকানকে নিয়ে মুসকানের রুমে এসেছে। মুসকানকে খাটে বসিয়ে সেও মুসকানের পাশে বসে মুসকানের বলে, 
- আজকে আমি তোমার সাথেই ঘুমাবো মুসকান, ঠিক আছে? 
মুসকান ভেজা চোখে মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, আমার সাথে ঘুমালে ভাইয়া তোমায় কিছু বলবে না মাহিরা? মাহিরা বলে ওঠে, তোমার ভাইকে বুঝিয়ে বলবো আমি। মুসকান আর কিছু বললো না। মাহিরা মুসকানকে ধরে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলে, তুমি শুয়ে পরো মুসকান। আমি তোমার ভাইকে বলে আসছি। মাহিরার কথা মতো মুসকান শুয়ে পরে বিছানায়। মাহিরা মুসকানের গায়ে চাদর টেনে দেয়। 
পরপর দরজার দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে নিলে মুসকান খপ করে মাহিরার হাত টেনে ধরে। মাহিরা ঘুরে তাকায় মুসকানের দিকে। মুসকান মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, তাড়াতাড়ি এসো প্লিজ। মাহিরা মুচকি হেসে বলে, ঠিক আছে। আমি তাড়াতাড়ি চলে আসবো। মুসকান মাহিরার হাত ছেড়ে দিলে মাহিরা দরজার দিকে চলে যায়।
মাহিরা দরজা খুলে সামনে তাকাতেই দেখে আয়ান দাঁড়িয়ে আছে। আয়ান মাত্রই এসেছে মুসকানের রুমের দরজার সামনে। এমন সময় মাহিরা দরজা খুলে দিয়েছে। আয়ান মাহিরাকে দেখে বলে ওঠে, 
- তাড়াতাড়ি রুমে আয় মাহি, আমি ঘুমাবো। 
বলেই আয়ান চলে যেতে নিলে মাহিরা বলে ওঠে, দাড়ান। আয়ানের পা থেমে যায়। সে ভ্রু কুঁচকে পেছন ঘুরে মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, হোয়াট হেপেন্ট?মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, আমি আজ মুসকানের সাথে ঘুমাবো। আপনি গিয়ে ঘুমিয়ে পরুন। বলেই মাহিরা দরজা লাগাতে নিলে আয়ান এক হাত দিয়ে দরজা ধরে ফেলে। মাহিরার দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে বলে ওঠে,
- তুই কোন সাহসে আমাকে ছাড়া অন্য কারো সাথে ঘুমাতে চাচ্ছিস মাহি? তোর কলিজা কি বেশি বড়ো হয়ে গিয়েছে? বল তাহলে? আমিও একটু ছিড়ে দেখি তোর কলিজাটা ঠিক কতোটা বড় হয়েছে?
মাহিরা থতমত খেয়ে যায়। বলে ওঠে, মুসকান তো মেয়ে মানুষ। আপনি এমন করছেন কেনো? আয়ান বলে ওঠে, 
- আই নো। বাট আমি তোকে অন্য কারো সাথে ঘুমানোর পারমিশন দিবো না। তুই শুধু আমার সাথে ঘুমাবি, আর কারো সাথে না। 
মাহিরা বিরক্ত হয় এই লোকর উপর। বলে ওঠে, 
- প্লিজ বোঝার চেষ্টা করুন। মুসকানের মন ভালো নেই। এখন মুসকানের পাশে থাকাটা আমার খুব প্রয়োজন। আপনি না মুসকানের ভাই? ভাই হয়ে বোনের পাশে দাড়াবেন না?
আয়ান ভ্রু কুচকে তাকায় মাহিরার দিকে। বলে ওঠে, 
- বোনকে যেয়ে বল আগে ভাইয়ের পাশে দাড়াতে। ভাইয়ের যে বউ ছাড়া রাতে ঘুম হয় না, বোন সেটা জানে না? 
মাহিরা বলে ওঠে, নির্লজ্জ বেহায়া লোক একটা। যান এখান থেকে। আয়ান আর কিছু বললো না। মাহিরা আবারো বলে ওঠে, এখান থেকে যান আপনি। আয়ান কিছু না বলে সহসা দাঁড়িয়ে থাকে। মাহিরা আবারো বলে ওঠে, আপনি কি এখান থেকে যাবেন? নাকি আমি মামাকে ডেকে বলবো আপনি আমাদের ডিস্টার্ব করছেন? আয়ান চোয়াল শক্ত করে বলে ওঠে, 
- তোর মামাকে কি আমি ভয় পাই? আমি আমার বউয়ের সাথে ঘুমাবো। দেখি তোর মামা কি করে। ডাক তোর মামাকে, ডাক?
মাহিরা বুঝলো এই ত্যাড়া লোকের সাথে এভাবে বলে কোনো লাভ হবে না। তাই মাহিরা এবার অভমানী গলায় বলে ওঠে, আপনি না সেদিন বলেছেন? আপনি আমার সব কথা শুনবেন? আমি যেভাবে বলবো আপনি সেভাবে চলবেন? মাহিরার অভিমানী গলায় আয়ান একটু নরম হলো। মাহিরার গালে এক হাত রেখে বলল,
- ইয়েস বেইবি। তুই যা বলবি তাই করবো।
মাহিরা এবার আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, তাহলে আজকে রাতে একটু কষ্ট করে আমাকে ছাড়া একা ঘুমিয়ে পরুন? আয়ানের রাগ যেনো আবারো ধেই ধেই করে বেড়ে যায়। আয়ান বলে ওঠে, 
- ইডিয়েট তুই জানিস না আমার তোকে ছাড়া ঘুম হয় না? আর একটা কথা বললে থাপ্পড় দিয়ে তোর সব দাঁত ফেলে দিবো মাহি। 
মাহিরা এবার বেশ রেগে যায় আয়ানের উপর। রেগে বলে ওঠে, অসভ্য লোক। বলেছি না আমি আজকে মুসকানে সাথে ঘুমাবো? যান এখান থেকে। আয়ান দাঁত খিঁচে বলে ওঠে, আমার সাথে একদম গলা উঁচিয়ে কথা বলবি না মাহি। মাহিরা চেচিয়ে বলে ওঠে,
- বললে কি করবেন? মারবেন আমায়? গায়ে হাত তুলবেন? নিন মারুন, মারুন আমায়? গায়ে হাত তুলুন আমার?
বলেই মাহিরা আয়ানের দিকে তেড়ে যায়। আয়ান তব্দা খেয়ে চেয়ে থাকে মাহিরার দিকে। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
- আপনারা পুরুষ মানুষ আর পারেন কি? শুধু গায়ে হাত তোলা ছাড়া? নিজেদের শক্তি দেখাতে পারেন শুধু। আর কিছু পারেন না।
আয়ান বলে ওঠে,
- আমি তোর গায়ে কবে হাত তুলেছি মাহি?
মাহিরা বলে ওঠে, হাত তোলেন নি। কিন্তু গলা তো ঠিকই চেপে ধরেছেন। সামনে যে গায়ে হাত তুলবেন না তার কি গ্যারান্টি আছে? বলুন আমায়? আয়ান কিছু না বলে তাকিয়ে থাকে মাহিরার দিকে। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, এখান থেকে যান প্লিজ। আপনাকে দেখলে আমার আরো বেশি মেজাজ খারাপ হচ্ছে। আয়ান এবার হুট করে মাহিরাকে জড়িয়ে ধরে। মাহিরার শরীরে ঘ্রান নাকে শুষে নিয়ে বলে,
- আমার তোকে চাই মাহি। প্লিজ আমার সাথে চল।
মাহিরা আয়ানকে নিজের থেকে ছাড়াতে চেয়ে বলে, আমি আজ মুসকানের সাথে ঘুমাবো। আর এটা আমার ফাইনাল ডিসিশন। আয়ান বলে ওঠে, তুই কিন্তু নিজের শর্ত ভাঙ্গছিস মাহি। আয়ানের কথায় মাহিরার মনে পরে যায় নিজের দেওয়া সেই শর্তের কথা। সে আয়ানকে শর্ত এঁটে দিয়েছিলো, আয়ান যেনো বাড়িতে বসে কোনো রকমের পাগলামি না করে।
তখন আয়ানও তাকে এক শর্ত এঁটে দিয়েছে। প্রতিদিন রাতে মাহিরাকে সে জড়িয়ে ধরে ঘুমাবে। তাহলে সে আর পাগলামি করবে না। মাহিরাও মেনে নিয়েছিলো আয়ানের সেই শর্তের কথা। দুজনই দুজনের শর্ত মেনে নিয়ে এতোদিন শর্তের ভেতরে ছিলো। কিন্ত মাহিরা আজ নিজের শর্ত নিজেই ভাঙ্গছে। আয়ান সেই শর্তের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে মাহিরাকে।
মাহিরা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আয়ানকে নিজের থেকে ছাড়াতে চেয়ে বলে, ভাঙ্গলে ভাঙছি। ছাড়ুন আমায়। আয়ান ছেড়ে দেয় মাহিরাকে। মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, রাতে বের হবি না রুম থেকে। কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে কল করবি ওকে? মাহিরা খুশি হয়ে যায় আয়ানের কথায়। আয়ান রাজি হয়ে গিয়েছে দেখে মাহিরা খুশি হয়ে বলে, ঠিক আছে।
আয়ান আর কিছু না বলে টুস করে মাহিরার ঠোঁটে একটা চুমু খেয়ে বলে ওঠে, আই লাইক ইট। বলেই আয়ান চলে যায়। মাহিরা চেয়ে থাকে আয়ানের যাওয়ার পানে। এই লোক এই ভালো, আবার এই মন্দ। মাহিরা সত্যিই বোঝেনা এই পাগল লোককে।
মাহিরা আর কিছু না ভেবে দরজা আঁটকে দেয়। পরপর গিয়ে শুয়ে পরে মুসকানের পাশে। মাহিরাকে পাশে শুয়ে পরতে দেখে মুসকান তার চোখ মুছে নেয়। মাহিরা মুসকানের দিকে তাকিয়ে বুঝলো এই মেয়ে এতোক্ষণ নিঃশব্দে কেঁদেছে। মাহিরা মুসকানকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মুসকান বলে ওঠে, ভাইয়া তো তোমাকে ছাড়া ঘুমাতে পারে না মাহিরা। তুমি না হয় ভাইয়ার সাথে চলে যেতে? 
মাহিরা বলে ওঠে, 
- তোমার ভাই এক রাত না ঘুমিয়ে থাকুক। এক রাত না ঘুমালে তার কিছু হবেনা। এমনিতেই তোমার ভাই যে তাড়ছিড়া? একটা শিক্ষা পাওয়া দরকার।
মাহিরার কথায় মুসকান কিছুটা হাসলো। মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি কি তোমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পারি মাহিরা? মাহিরা মুচকি হেসে মুসকানের দিকে তার দু'হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, হ্যা অবশ্যই। মুসকান এসে মাহিরাকে জড়িয়ে ধরে আবারো ঝড়ঝড় করে কেঁদে দেয়। মাহিরা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। সে এই জন্যই মুসকানের সাথে আজ রাত থেকে গিয়েছে। সে জানে এই মেয়ে আজ সারা রাত কেঁদে কেটে ভাসাবে। 
মাহিরা থাকলে হয়তো মুসকানের একটু হলেও ভালো লাগবে। তাকে জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত কাঁদতে পারবে। তাই তো সে আজ মুসকানের রুমে থেকে গিয়েছে। মাহিরা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মুসকানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, মুসকান প্লিজ আর কেঁদোনা। অনেক কেঁদেছো তুমি। এতো কাঁদলে তোমার শরীর খারাপ করবে। প্লিজ একটু বোঝার চেষ্টা করো। মুসকান নাক টেনে কেঁদে কেঁদে বলে ওঠে, আমাকে আজ কাঁদতে দাও প্লিজ মাহিরা। কথা দিচ্ছি আমি কাল থেকে আর কাঁদবো না। প্লিজ আজ আমাকে বাঁধা দিয়ো না। মাহিরা আর কিছু না বলে মুসকানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।
অর্নব বসে আছে ছাদে বেঞ্চের উপর। অর্নবের পায়ের কাছে পরে আছে কতো গুলো সিগারেটের অবশিষ্ট অংশ। এখানে পরে থাকা একটা সিগারেটও অর্নব নিজে খায়নি। সবগুলো সিগারেট অর্নব নিজের হাতে জালিয়ে শেষ করছে। 
অর্নব নিজের এক হাতে জলন্ত সিগারেট নিয়ে তার অন্য হাতের তালুতে তা ঠেসে ধরে পোড়াচ্ছে। এভাবেই একটার পর একটা সিগারেট শেষ করছে অর্নব। সে নিজের হাত নিজেই জলন্ত সিগারেট দিয়ে পোড়াতে পোড়াতে গেয়ে উঠে..
"তুমি জানতে পারনি"
"কত গল্প পুড়ে যায়"
"তুমি চিনতে পারনি"
"আমাকে হায়"...
"কি করে বলব তোমায়"
"আসলে মন কি যে চায়"
"কেনো সে পালিয়ে বেড়ায়"
"তোমার থেকে"...
আয়ান ছাদে এসেছে ল্যাপটপ নিয়ে। তার আজ রুমে ঘুম হবে না। তাই সে ল্যাপটপ নিয়ে ছাদে এসেছে কাজ করে সারারাত পার করবে বলে। ছাদে এসে এক পা দিতে না দিতেই আয়ান সামনে তাকিয়ে থমকে যায়। দেখে অর্নব বসে বসে সিগারেট দিয়ে নিজের হাত নিজেই জালাচ্ছে। আয়ান তা দেখে চোয়াল শক্ত করে হনহনিয়ে চলে যায় অর্নবের কাছে। অর্নব আনমনে দুরে কোথাও তাকিয়ে নিজের হাত পোড়াচ্ছিলো। এমন সময় আয়ান এসে থাবা মেরে অর্নবের কাছ থেকে সিগারেট নিয়ে ছুরে ফেলে দেয়।
হাত থেকে সিগারেট পরে যেতাই অর্নবের ঘোর কাটে। অর্নব ঘুরে তাকায় আয়ানের দিকে। আয়ান এবার অর্নবের কলার ধরে কিরবির করে বলে ওঠে, কুত্তার বাচ্চা এটা কি করছিস তুই? অর্নব আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, হাত জ্বালাচ্ছি ভাইয়া। আয়ান ঝাড়া মেরে অর্নবের কলার ছেড়ে দেয়। অর্নব পেছনের বেঞ্চের সাথে গিয়ে বারি খায়। আয়ান কটমট করে বলে ওঠে, 
- শুয়োরের বাচ্চা এভাবে নিজের হাত না জালিয়ে, সোজা গিয়ে আগুনে ঝাপ দে। 
বলেই আয়ান অর্নবের পাশ থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার নিয়ে হনহনিয়ে চলে যায় ছাদ থেকে। অর্নব পেছন থেকে চেচিয়ে বলে ওঠে, আমার বুকে এতো সাহস নেই আগুনে ঝাপ দেওয়ার মতো। তাই আপাদত হাত পোড়াচ্ছি। সিগারেট টা দিয়ে যাও ভাইয়া। আয়ান অর্নবের কথা না শুনে চলে যায় ছাদ থেকে। আয়ান চলে যেতেই অর্নব বিরবির করে ওঠে, 
- যাহ্ শালা। হাত পুড়িয়েও শান্তি নেই।
পাঁচ মিনিট যেতে না যেতেই আয়ান আবারো ছাদে ফিরে আসে। হাতে তার ফার্স্টএইড বক্স। আয়ান এসে অর্নবের পাশে বসে বলে, কুত্তার বাচ্চা হাত দে। অর্নব তাকায় আয়ানের দিকে। অর্নব হাত দেওয়ার আগেই আয়ান অর্নবের হাত টেনে নিয়ে আসে নিজের কাছে। তাকিয়ে দেখে হাতেও তালু সিগারেটে পুরে জায়গায় জায়গায় ছোটো ছোটো কালো দাগ পরে গিয়েছে। হাতের তালুর কিছু কিছু জায়গা একদম জ্বলসে গিয়েছে। 
আয়ানের তা দেখে চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। সে মলম নিয়ে অর্নবের হাতের তালুর পোড়া যায়গায় লাগাতে থাকে। পোড়া যায়গায় মলম লাগতেই অর্নব চোখ মুখ ব্যাথায় খিঁচে নেয়। আয়ানের থেকে হাত ছাড়াতে চেয়ে বলে, ভাইয়া ছেড়ে দাও। তেমন কিছুই হয়নি। আয়ান দাঁত খিঁচে বলে ওঠে, 
- চুপ করে বসে থাক। নাহলে তোর পুরো শরীর আমি সিগারেট দিয়ে জ্বালিয়ে দিবো। 
অর্নব আর কিছু বললো না। আয়ান অর্নবের হাতে মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেয়। অর্নব এবার কোনো কথা ছাড়াই আয়ানের কোলে মাথা রেখে বেঞ্চের ওপর শুয়ে পরে। আয়ান কিছুই বললো না। অর্নব আয়ানের কোলে মাথা রেখে দুর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, 
- ভাইয়া জানো? আমি না ডক্টর হতে চেয়েছিলাম। 
আয়ান এক হাত অর্নবের চুলে গলিয়ে দিয়ে বলে, তো হলি না কেন? অর্নব বলে ওঠে, কিভাবে হবো? ডক্টর হতে চাওয়ায় বাবা আমাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলো। আয়ান সহসা বলে ওঠে, তো বেরিয়ে যেতি? অর্নব বলে ওঠে, আমি ছোট মানুষ। একা বেরিয়ে কোথায় যেতাম? আয়ান বলে ওঠে, তুই একা যেতি কে বললো? অর্নব বলে ওঠে, তাহলে? আয়ান বলে ওঠে, আমিও তোর সঙ্গে যেতাম।
অর্নব চমকে তাকায় আয়ানের দিকে। আয়ান তার দিকে তাকিয়ে আছে। অর্নব এবার আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, সত্যি বলছো? আয়ান বলে ওঠে, তোর কি মনে হয়? অর্নব আয়ানের থেকে চোখ সরিয়ে আবারো আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, আমার সাথে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় যেতে তুমি? আয়ান বলে ওঠে, 
- এই পৃথিবী অনেক বড়ো। তোর আর আমার কোথাও না কোথাও একটু খানি যায়গা ঠিকই হয়ে যেতো।
অর্নব প্রশ্ন করে বসে, আমরা কি তখন বেঁচে থাকতাম ভাইয়া? আয়ান উল্টো প্রশ্ন করে বসে, এখনও কি বেঁচে আছিস? অর্নবের বুকটা ধুক করে উঠলো। সে আবারো তাকায় আয়ানের দিকে। আয়ান এবার বলে ওঠে,
- আমিও তো ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিলাম। পেরেছি কি? 
অর্নব কিছুই বলতে পারলো না। সে আয়ানের থেকে চোখ সরিয়ে আবারো দুরে আকাশের পানে তাকিয়ে ভাবতে থাকলো আয়ানের ইঞ্জিনিয়ার না হওয়ার পেছনের কারন টা।
আয়ান যেদিন প্রথম বাড়িতে জানায় সে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়? সেদিন শাজাহান শিকদার বলেছিলেন, ছেলে তার বিজনেস ম্যান ছাড়া আর কিছুই হতে পারবে না। ছেলে যদি ইঞ্জিনিয়ার হয়? তাহলে তার মরা মুখ দেখবে। আয়ানের মন সেদিনই ভেঙ্গে গিয়েছিলো তার বাবার থেকে। শাজাহান শিকদারের উপর আয়ানের রাগ টা ঠিক সেদিন থেকেই। 
এদিকে শাজাহান শিকদার কখনো মানতে পারেননি এ বাড়ির ছেলেরা কেউ বিজনেস ম্যান ছাড়া অন্য কিছু হবে। বিজনেস তাদের বাপ দাদা পূর্ব পুরুষদের পেশা। তারাও সেটাই করে আসছে। তাই এ বাড়ির ছেলেদেরও বিজনেস ম্যান ছাড়া আর কিছু হওয়া চলবে না। সমাজের মানুষ কি বলবে একজন বিজনেস ম্যানের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হলে?
সমাজের মানুষের কথা চিন্তা করা শাজাহান শিকদার কখনো নিজের ছেলের ইচ্ছে আর সপ্নের কথা ভাবলেন না। আয়ান সেদিনই ভেবে নিয়েছিলো সে বিজনেস ম্যান ঠিকই হবে। কিন্তু তার বাপের বিজনেসে কখনো সে যোগ দিবে না। সে আলাদা বিজনেস করবে তার বাপের থেকে। তার বাবার নাক চোখ সে অবশ্যই কাঁটবে। 
এখন শাজাহান শিকদার কে প্রতিনিয়ত শুনতে হয় তার ছেলে কেনো তার বিজনেসে যোগ দিলো না? শাজাহান শিকদার এর প্রতি উত্তরে কিছুই বলতে পারেন না। আয়ান তার বাবার উপর জেদ নিয়েই একা একা বাপ চাচাদের থেকে আলাদা হয়ে বিজনেস করছে।
আয়ান আবারো বলে ওঠে, 
- আমরা আজ বেঁচে থেকেও বেঁচে নেই। তার থেকে বরং আমরা সেদিন বাড়ি থেকে চলে গেলে একটু হলেও বেঁচে থাকতাম। 
অর্নব ভেবে দেখলো আয়ানের কথাটা। তারা আজ সত্যিই বেঁচে থেকেও বেঁচে নেই। এটা চিরন্তন সত্য কথা বলেছে আয়ান। অর্নব মুচকি হেসে বলে ওঠে, তাহলে কি আমি সেদিন ভুল করে ফেললাম ভাইয়া? আয়ান উল্টো বলে, নিজেই ভেবে দেখ? অর্নব ভাবনায় পরে যায়।
আয়ান এবার বলে ওঠে, রুমে যা। অর্নব জিজ্ঞেস করে, তুমি যাবে না? আয়ান বলে ওঠে, না আমি আজ ছাদে থাকবো। অর্নব সাথে সাথে বলে ওঠে, তাহলে আমিও আজ তোমার সাথে ছাদে থাকবো। আয়ান আর কিছু বললো না। অর্নব এবার ডেকে ওঠে, ভাইয়া? আয়ান ছোট করে বলে, হুম। অর্নব বলে ওঠে, একটা কথা বলার ছিলো তোমাকে। আয়ান ছোট করে বলল, বলে ফেল।
অর্নব কিছু একটা বলতে চেয়েও বলতে পারলো না। কথাটা তার গলায় আঁটকে গিয়েছে। সে নিজের কথা পাল্টে বলে, তুমি কি আমার উপর রেগে আছো ভাইয়া? আয়ান উল্টো প্রশ্ন করে, তুই কি রাগ করার মতো কিছু করছিস? অর্নব বলে ওঠে, সকালে যে মাহিরাকে..। অনবের সম্পুর্ন কথা শেষ হওয়ার আগেই আয়ান বলে ওঠে, না রাগ করেনি। অর্নব আর কিছু বললো না।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে অর্নব আবারো বলল, ভাইয়া আমি কি তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাতে পারি? আয়ান অর্নবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, ঘুমা। অর্নব বলে ওঠে, তুমি ঘুমাবে না? আয়ান বলে ওঠে, বউ ছাড়া ঘুম হয়না আমার। অর্নব মুচকি হেসে আর কিছু না বলে চোখ দুটো বন্ধ করে নেয়। আয়ান বসে বসে অর্নবের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন