ফন্ট সাইজ:
থিম:
এদেখা শেষ না হোক

৪০তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার সাথী

#এ_দেখা_শেষ_না_হোক #পর্ব - (৪০)

#writer #sumaiya_akter_sathi 
--
সকাল আটটা, আয়ানের রুমের দরজায় কেউ অনবরত নক দিয়ে যাচ্ছে। মাহিরা ধরফরিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে বসে দরজার শব্দে। আয়ানের রুমের দরজা কেউ ধাক্কা ধাক্কি শুরু করে দিয়েছে। মাহিরা শুকনো ঢোক গিলে পাশে তাকায়। আয়ান এখনো গভীর ঘুমে। মাহিরা তাকিয়ে দেখলো আয়ান ঘুমের মাঝে তার এক হাত মাহিরার কোমড় ধরে রেখেছে। মাহিরা আলতো হাতে তার কোমড়ে থাকা আয়ানের হাতটা সরিয়ে বিছানা থেকে নেমে যায়। 
আয়ানের হাতের বাঁধন নরম থাকায় মাহিরা সমস্যা হলো না আয়ানের হাত সরাতে। মাহিরা আর কিছু না ভেবে দরজার দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। মাহিরার বুক ধুপপুক করছে। দরজার বাহিরে কে আছে মাহিরার অজানা। সে আল্লাহর নাম নিতে নিতে মনে মনে আয়ানকে কয়েকটা গালিও দিয়ে ফেললো। 
ওই বজ্জাত লোকের তেড়ামির কারনে তাকে এই রুমে ঘুমাতে হয়েছে। এখন যদি বাড়ির কোনো মানুষ মাহিরাকে তার রুমে দেখতে না পেয়ে মাহিরার খোঁজে আয়ানের রুমে আসে? তখন কি হবে সেটাই ভাবতে থাকে মাহিরা। মাহিরা মনে একরাশ ভয় নিয়ে দরজার কাছে গিয়ে কান পাতে। শোনার চেষ্টা করে দরজার ওপাশে থাকা ব্যক্তিটা কথা।
এদিকে কেয়া হাতে কফি নিয়ে অনবরত আয়ানের রুমের দরজা ধাক্কা ধাক্কি করছে। সে প্রায় দু'মাস পর এ বাড়িতে এসেছে। সে এসেই মালিহা বেগমের কাছ থেকে কফি নিয়ে ছুঁটে এসেছে আয়ানের রুমে। কফি তো বাহানা মাত্র, সে তো শুধু আয়ানকে দেখতে এসেছে। কতোদিন হয়ে গেলো সে তার আয়ান ভাইকে দেখে না। 
কেয়া এক নাগাড়ে দরজা ধাক্কা দিয়ে আয়ানকে ডেকে যাচ্ছে, আয়ান ভাই? দরজা খোলো? তোমার জন্য কফি নিয়ে এসেছি আমি। মাহিরার কেয়ার কন্ঠস্বর পেয়ে ভ্রু কুঁচকায়। কেয়া কখন আসলো এ বাড়িতে মাহিরার জানা নেই। মাহিরা কিছু না ভেবে ফটাফট দরজা খুলে দেয়। 
কেয়া এতো সকালে আয়ানের রুমে মাহিরাকে দেখে ভুত দেখার মতো চমকে উঠে। এদিকে কেয়ার হাতে কফির মগ দেখে মাহিরার মেজাজ খারাপ হয়। কেয়া এতোদিন যা করেছে মাহিরা মেনে নিয়েছে। কারন তখন আয়ান তার স্বামী ছিলো না। কিন্তু এখন আয়ান তার স্বামী। তার স্বামীর জন্য অন্য কেনো মেয়ে কফি নিয়ে আসবে? এটা মাহিরা সয্য করবে না কখনো।
কেয়া তব্দা খেয়ে চেয়ে থাকে মাহিরার দিকে। রেগে জোরে বলে ওঠে, এই মেয়ে? তুমি আয়ান ভাইয়ের রুমে কি করছো? মাহিরা কেয়ার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, আস্তে কথা বলো কেয়া। উনি ঘুমাচ্ছেন। কেয়া মাহিরার মুখে উনি ডাক শুনে আরো বেশি রেগে যায়। বলে ওঠে, এই অসভ্য মেয়ে? তুমি আমার আয়ান ভাইয়ের রুমে কি করছো? 
মাহিরার আবারো মেজাজ খারাপ হয় কেয়া আমার আয়ান ভাই বলায়। মাহিরা বলে ওঠে, হাসবেন্ডের রুমে ওয়াইফ কি করে জানো না? কেয়া আরেক দফায় চমকায় মাহিরার মুখে হাসবেন্ড কথা শুনে। বলে ওঠে, হোয়াট? কে তোমার হাসবেন্ড? মাহিরা এবার কেয়ার মতো করে বলে ওঠে, তোমার আয়ান ভাই। 
বলেই মাহিরা আয়ানের রুম থেকে বেরিয়ে আয়ানের রুমের দরজা চাপিয়ে আবারো কেয়ার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, উনি এখন ঘুমাচ্ছেন। উনাকে ডিস্টার্ব করবে না কেয়া। আর উনি তোমার এই কফি কোনোদিন খাবে না। উল্টো তোমাকে কফি হাতে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে রাগারাগি করবেন। তাই তুমি এখান থেকে চলে যাও। 
কথাগুলো বলেই মাহিরা নিজের রুমের দিকে হাঁটা দেয়। কেয়া যেনো এখনো কোনো ঘোরের মধ্যে আছে। সে কারেন্টর মতো শক খেয়েছে মাহিরার মুখে হাসবেন্ড শুনে। মাহিরা নিজের রুমের দিকে চলে গেলে কেয়া তব্দা খেয়ে চেয়ে থাকে মাহিরার যাওয়ার পানে। সে এবার সাপের মতো ফুঁসতে ফুঁসতে মাহিরার পিছু পিছু যায়।
মাহিরা নিজের রুমে এসে দাড়াতে না দাড়াতেই কেয়া পেছন থেকে বলে ওঠে, হাসবেন্ড মানে কি? আয়ান ভাই কি তোমাকে বিয়ে করেছে নাকি? তুমি কোন সাহসে আয়ান ভাইকে হাসবেন্ড বলছো? মাহিরা কেয়ার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, 
- সাহস আছে বলেই বলছি। তোমার আয়ান ভাই আমাকে আরো একমাস আগে বিয়ে করে ফেলেছে। 
কেয়ার বুকে ধুক করে উঠে। সে কি শুনছে এটা নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। তার আয়ান ভাই বিয়ে করে ফেলেছে? তাও এই মেয়েকে? কিন্তু সে তো তার আয়ান ভাইকে মন প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসে। তার আয়ান ভাই কেনো তাকে বিয়ে করলো না? কেয়া এবার কোনো কথা ছাড়াই তার হাতে থাকা কফির মগটা মাহিরার দিকে ছুড়ে মারে। গরম কফি মাহিরার গলায় লেগে কফির মগটা নিচে পরে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।
মাহিরার গলা জ্বলে যাচ্ছে। সে চোখ মুখ খিঁচে কেয়ার দিকে তাকিয়ে হুংকার দিয়ে ওঠে, 
- আর ইউ ম্যাড? হাউ ডেয়ার ইউ কেয়া? 
কেয়া এবার কোনো কথা ছাড়াই মাহিরার দিকে এগিয়ে পেছন থেকে মাহিরার দু'হাতে মোচড় দিয়ে ধরে চিবিয়ে বলে ওঠে, 
- তোর সাহস কি করে হয় আমার আয়ান ভাইকে বিয়ে করার? 
মাহিরা ব্যথা সয্য করতে পারছে না কিছু। একে তো গরম কফি গলায় লাগায় গলা জ্বলছে। অন্য দিকে কেয়া দু'হাত পেছন থেকে মোচড় দিয়ে ধরে রাখায় মাহিরা তীব্র ব্যথায় চোখ মুখ খিঁচে বলে ওঠে, কেয়া ছাড়ো আমার হাত। লাগছে আমার। 
কেয়া মাহিরার কথায় আরো শক্ত করে মাহিরার হাত দুটো চেপে ধরে কিরবির করে বলে,
- শোন নষ্টা মেয়ে। তোকে সাফসাফ একটা কথা জানিয়ে দিচ্ছি। তুই যদি সত্যিই আমার আয়ান ভাইকে বিয়ে করে থাকিস? তাহলে তুই আজকের ভেতরে আমার আয়ান ভাইকে ডিভোর্স দিবি। তোর মতো নষ্টা মেয়ে আমার আয়ান ভাইয়ের নো
নখের যোগ্যও না। 
বলেই কেয়া মাহিরাকে সযোরে এক ধাক্কা দিয়ে দুরে সরিয়ে দেয়। মাহিরা ছিটকে গিয়ে ডেসিং টেবিলের সাথে কপালে বাড়ি খায়। এতে মাহিরার কপালের এক সাইড থেকে কিছুটা কেঁটে রক্ত বেরোয়। মাহিরা কোনো রকম নিজেকে সামলে কেয়ার দিকে ঘুরে সজোড়ে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয় কেয়ার গালে। কিরবির করে বলে ওঠে, 
- আমি কোনো নষ্টা মেয়ে না। আর না আমি তোমার মতো তোমার আয়ান ভাইয়ের কাছে ঘেঁষে ঘেঁষে গিয়েছি। তোমার আয়ান ভাই উল্টো আমার কাছে এসেছে। তাই যা বলার মুখ সামলে কথা বলবে কেয়া। আমাকে বাধ্য করবে না নিজের স্বামীর অধিকার ফলাতে।
মাহিরার হাতে থাপ্পড় খেয়ে কেয়ার রাগ যেনো বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়। আয়ানকে স্বামী বলায় কেয়া কোনো কথা ছাড়াই তেড়ে এসে মাহিরার গলা সজোরে চেঁপে ধরে। কেয়া মাহিরাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে কটমট করে বলে ওঠে, আমার আয়ান ভাইকে তুই কালো জাদু করেছিস। নাহলে আমার আয়ান ভাই কখনো তোর মতো মেয়ের কাছে যাবে না। তোর থেকে হাজারো সুন্দরী মেয়ে আছে এই বাংলাদেশে। তাদের গায়ের চামড়া তোর থেকে হাজার গুন সাদা। আমার আয়ান ভাই তাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। তুই কালো জাদু করে আমার আয়ান ভাইকে বিয়ে করেছিস।
মাহিরা দু'হাতে কেয়ার হাত চেপে ধরে কেয়াকে নিজের থেকে ছাড়াতে চায়। কিন্তু কেয়া এতোটা শক্ত করে তার গলা চেপে ধরে রেখেছে যে মাহিরা দু'হাতে কেয়ার হাত তার গলা থেকে ছাড়াতে পারছে না। কেয়া আবারো চিবিয়ে বলে ওঠে, তুই কোন সাহসে আমায় আয়ান ভাইকে আমার কাছ থেকে কেঁড়ে নিয়েছিস? এখন আবার নাটক করছিস? তোদের মতো মেয়েকে আমার ভালো করে চেনা আছে। নষ্টা মেয়ে কোথাকার। মাহিরার দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে অনেক চেষ্টা করেও কেয়ার হাত নিজের গলা থেকে ছাড়াতে পারছে না।
আয়ান মাত্র ঘুম থেকে উঠে তার পাশে তাকিয়ে মাহিরাকে দেখতে না পেয়ে মেজাজ খারাপ হয়। এই মেয়েকে সে একদিন বলে দিয়েছে মর্নিং কিস না নিয়ে বিছানা থেকে না নামতে। এই মেয়ে তার একটা কথাও শোনেনা। আয়ান এবার নিজের রুম থেকে বেরিয়ে মাহিরার রুমের দিকে হাঁটা দেয়।
আয়ান এসে মাহিরার রুমে একপা দিতেই সামনের দৃশ্য দেখে আয়ানের চোখ লাল হয়ে যায়। গরম ধোঁয়া ওঠা আগুনের হলকা বের হচ্ছে আয়ানের চোখ দিয়ে। এদিকে কেয়া এখনো মাহিরার গলা চেপে ধরে রেখেছে দেয়ালের সাথে। আয়ান ঝড়ের বেগে এসে কেয়ার কোমড় বড়াবড় এক লাথি মেরে কেয়েকে মাহিরার থেকে দুরে সরিয়ে দেয়।
মাহিরা ছাড়া পেড়ে অনবরত কাশতে কাশতে দেয়ালের সাথে ঘেষে নিচে বসে পরে। এদিকে কেয়া হটাৎ আক্রমণে ছিটকে গিয়ে ফ্লোরে ভাঙ্গা কাঁচের মগের উপর পরে যায়। তার হাতে কিছু কাঁচের টুকরো ঢুকে যেতেই সে ব্যাথায় চোখ মুখ খিঁচে উঠে দাড়াতে নেয়। কেয়া উঠে দাঁড়াতে না দাঁড়াতে আয়ান আবারো ঝড়ের বেগে এসে কেয়ার চুলের মুঠি ধরে সযোরে এক বাড়ি মারে পাশের দেয়ালের সাথে। 
কেয়ার কপাল ফেটে সঙ্গে সঙ্গে রক্ত বের হয়। আয়ানের এমন কান্ডে মাহিরার নিজের কাশি থেমে যায়। সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায়। আয়ান কেয়াকে দেয়ালের সাথে বাড়ি মেরে শান্ত না হয়ে কেয়ার গলা এক হাতে চেপে ধরে উপরে তুলে ফেলে। কিরবির করে বলে,
- কুত্তার বাচ্চা, তোর সাহস কি করে হয় ওর গায়ে হাত দেওয়ার? আজ তোকে আমি শেষ করে ফেলবো। তোর জানাজা উঠবে আজ। 
বলেই আয়ান নিজের হাত আরো শক্ত করে কেয়াকে উপরে উঠিয়ে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে রাখে। কেয়ার পা দুটো ফ্লোরে নেই। আয়ান তাকে উঁচু করে দেয়ালের সাথে চেপে ধরায় কেয়ার পা দুটো বাচার জন্য ছটফট করতে থাকে। মাহিরা ছুটে এসে আয়ানের বাহু ধরে বলে ওঠে, পাগল হয়ে গিয়েছেন? কি করছেন এটা? ছেড়ে দিন কেয়াকে? আয়ান মাহিরার কথা না শুনে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে কেয়ার গলা চেপে ধরে রেখে বলে, 
- ও কোন সাহসে তোর গলা চেপে ধরেছে? ওকে আজ আমি প্রাণে শেষ করে দিবো। 
মাহিরা আবারো টেনে ধরে আয়ানের বাহু। আয়ানকে ছাড়াতে চেয়ে বলে, কেয়াকে ছেড়ে দিন প্লিজ। কেয়া দুর্বল হয়ে পরছে, ও মরে যাবে। মাহিরা আয়ানের শক্তির সাথে পেরে উঠে না। কেয়ার চোখ উল্টে আসে। পায়ের ছটফটানি আস্তে আস্তে থেমে যেতে থাকে। মাহিরা তা দেখে আয়ানকে দুহাতে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়।
আয়ান সরতেই কেয়া থাস করে ফ্লোরে পরে যায়। কেয়ার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মাহিরা তাড়াতাড়ি এক গ্লাস পানি এনে কেয়ার মাথা তার কোলে নিয়ে কেয়াকে পানি খাইয়ে দেয়। এটা দেখে আয়ানের চোখ আরো বেশি লাল হয়ে যায়। সে কোনো কথা ছাড়াই সজোরে এক লাথি বসায় কেয়ার পেটে।
কেয়া মুখের পানি সহ সাথে সাথে রক্ত বমি করে দেয়। মাহিরা তব্দা খেয়ে চেয়ে থাকে আয়ানের দিকে। আয়ান আরো একটা লাথি দিতে নিলে মাহিরা ঝড়ের বেগে এসে আয়ানের পা আকড়ে ধরে বলে ওঠে, আল্লাহর দোহাই লাগে। প্লিজ ওকে প্রাণ ভিক্ষা দিন। আয়ান চোয়াল শক্ত করে হুংকার দিয়ে ওঠে, 
- জানোয়ারের বাচ্চা, আমার পা ছাড়। ওকে আজ আমি প্রানে না মেরে শান্ত হবো না।
এমন সময় দরজা থেকে কিছু ঝনঝন শব্দ ভেসে আসে। মাহিরা আর আয়ান দুজনেই তাকায় দরজার দিকে। মালিহা বেগম দাঁড়িয়ে আছেন মাহিরার রুমের দরজায়। মাহিরার রুমের এই দৃশ্য দেখে তার হাতে থাকা খাবারের ট্রে টা নিচে পরে গিয়েছে। নিচে পরা সেই কাচ ভাঙ্গার শব্দই ভেসে এসেছে দরজা থেকে।
মালিহা বেগম মুসকানের রুমে খাবার হাতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। মেয়েটা তার ক'দিন ধরে কিছুই খাচ্ছে না। তিনি মাহিরার রুমের সামনে দিয়ে যেতে নিলে মাহিরার রুমে চেঁচামেচির শব্দ শুনে তিনি মাহিরার রুমের দিকে এগিয়ে আসেন। মাহিরার রুমের দজায় দাড়াতেই তিনি আয়ানকে লাথি মারতে দেখেন। কেয়ার রক্ত বমি দেখে তখনই তার হাতে থাকা খাবারের ট্রে নিচে পরে গিয়েছে।
মালিহা বেগম এবার ছুটে আসেন ফ্লোরে পরে থাকা কেয়ার কাছে। কেয়ার মাথাটা নিজের কোলের উপর রেখে আহাজারি করে ডাকতে থাকেন, 
- কেয়া? এই কেয়া? চোখ খোল মা আমার? আমার দিকে তাকা। তোর ফুফু কে দেখ? 
কেয়ার চোখ ধীরে ধীরে বুঝে আসে। তার শরীর আস্তে আস্তে নিস্তেজ হতে শুরু করে। মালিহা বেগম এবার আহাজারি করে চেঁচামেচি করে বাড়ির লোক জনদের ডাকতে শুরু করেন। মালিহা বেগমের আহাজারি শুনে অর্নব ছুটে আসে মাহিরার রুমে। এসে কেয়ার এই অবস্থা দেখে সাথে আয়ানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অর্নব বুঝলো এখানে কোনো ঝামেলা হয়েছে।
অর্নব কে দেখে মালিহা বেগম কেঁদে বলে ওঠেন, অর্নব বাবা দেখো তো কেয়া চোখ খুলছে না কেনো। বলেই তিনি আবারো কেয়ার দিকে তাকিয়ে ডেকে ওঠেন, এই কেয়া? মা আমার চোখ খোল একবার? তোর ফুফু কে দেখ একবার? অর্নব এসে কেয়ার পালস চেক করে। কেয়ার পালস চলছে। অর্নব এবার মালিহা বেগম কে বলে, মামুনি পালস চলছে। ওকে তাড়াতাড়ি হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। 
মালিহা বেগম অর্নবের দিকে তাকিয়ে কেঁদে কেঁদে বলেন, ওকে তাড়াতাড়ি হসপিটালে নেওয়ার ব্যবস্থা করো বাবা। ওর কিছু হলে আমি আমার ভাইকে মুখ দেখাতে পারবো না। অর্নব আর সময় নষ্ট না করে কেয়াকে তুলে নিয়ে হসপিটালে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। মালিহা বেগম এবার ওঠে এসে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠেন, কেয়ার যদি আজ কিছু হয় এর সম্পুর্ন দায়ভার তোমাকে দিতে হবে আয়ান। আমার ভাইজি কে এভাবে না মারলেও পারতে। আয়ান এবার তার মায়ের দিকে তাকিয়ে রেগে বলে ওঠে,
- খোদার কসম মা, ও যদি আজ বেঁচে যায়? আর ভবিষ্যতে কোনোদিন আমার চোখের সামনে পরে? আমি নিজ হাতে ওর গলা কেটে টুকরো টুকরো করে ওকে তোমার সামনে রেখে দিবো। তাই নিজের ভাইজির প্রাণ বাঁচাতে চাইলে? তাকে আমার চোখের সামনে থেকে দুরে রাখো। ও আজ যে দুঃসাহস দেখিয়েছে? এর পর থেকে ওর আর বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।
মালিহা বেগম আর কিছু না বলে কাঁদতে কাঁদতে মাহিরার রুম থেকে চলে যান। মাহিরা স্তব্ধ হয়ে বসে আছে ফ্লোরে। সে নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছে আয়ানের এমন কান্ডে। আজ কেয়ার কিছু হয়ে গেলে সে নিজেকে কিভাবে ক্ষমা করবে? আয়ান কোনো কথা ছাড়াই মাহিরার হাত ধরে মাহিরাকে দার করিয়ে দেয়। পরপর কোনো কথা ছাড়াই মাহিরার হাত ধরে নিজের রুমের দিকে হাঁটা দেয়। মাহিরা নিস্তব্ধ হয়ে আনমনে আয়ানের সাথে হাঁটতে থাকে। কয়েক মুহূর্তের ভেতরে কি থেকে কি হয়ে গেলো মাহিরা যেনো কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
আয়ান মাহিরাকে তার রুমে এনে বেডে বসিয়ে দেয়। পরপর ড্রয়ার থেকে একটা বক্স বের করে বক্স থেকে একটা মলম আর বেন্ডেজ বের করে সে মাহিরার সামনে এসে দাড়ায়। মাহিরা এখনো নিস্তব্ধ। আয়ান কিছু না বলে মাহিরার কপালের কাটা অংশের রক্ত মুছে মাহিরার কপালে ছোট একটা বেন্ডেজ করে দেয়। পরপর মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, দেখি গলাটা? 
বলেই আয়ান মাহিরার মাথা উচু করে গলা দেখতে নিলে মাহিরা ঝাড়া মেরে আয়ানের হাত ফেলে দিয়ে বলে, এটা আপনি কি করলেন? আয়ান গম্ভীর গলায় বলে, গলা দেখতে দে মাহি। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, মানুষকে আঘাত করতে আপনার কলিজা কাঁপে না? আয়ান চোয়াল শক্ত করে বলে ওঠে, 
- না কাঁপে না। আমার কলিজা শুধু তোর জন্য কাপে। আর কারো জন্য না। 
মাহিরা বলে ওঠে, আপনি আসলেই মানুষ তো? নাকি..! মাহিরা কথা শেষ করার আগেই আয়ান বলে ওঠে, 
- আমি জানোয়ার। তোর দিকে কেউ হাত বাড়ালে আমি এর থেকে বেশি জানোয়ার হবো। এর থেকে বেশি হিংস্র হবো। এর থেকে বেশি রক্ত ঝড়াবো। 
মাহিরা কি বলবে এই লোককে খুঁজে পেলো না। সে এবার কোনো কথা ছাড়াই হুট করে আয়ানকে জড়িয়ে ধরে ঝড় ঝড় করে কেঁদে দেয়। আয়ান চোয়াল শক্ত করে বলে ওঠে, কান্না থামা মাহি। মাহিরার কেঁদে কেঁদে বলতে থাকে,
- আপনি এমন কেনো হলেন খাড়ুস লোক? আপনি কি একটু ভালো হতে পারতেন না? আজ কেয়ার কিছু হলে আমি কিভাবে নিজেকে ক্ষমা করবো? 
আয়ান কিছুই বললো না। মাহিরা আবারো কেঁদে কেঁদে বলল, আপনি কেন নিজের সাথে আমাকে জড়ালেন? আমি তো চাইনি আপনার মতো মানুষকে বিয়ে করতে। আপনি কেন আমাকে বিয়ে করলেন? আপনি কেন ভালো হলেন না? আপনি কেন খাড়ুস হলেন? আয়ান এবারো হ্যা না কিছুই বললো না। মাহিরা নাক টেনে আবারো বলে ওঠে, আমার প্রশ্নের উত্তর দিন খাড়ুস লোক। আপনি কেন খাড়ুস হলেন বলুন আমাকে? আয়ান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মাহিরার মাথায় এক হাত রেখে বলে ওঠে, 
- তোর কিছু হলে আমি ঠিক থাকি না মাহি। আমার ভেতর থেকে কোনো হিংস্র জানোয়ার বেরিয়ে আসে। আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনা। এটা কি আমার দোষ? 
মাহিরা আয়ানকে ছেরে দিয়ে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, 
- আপনাকে আমি ভালো একটা কবিরাজের কাছে নিয়ে যাবো, ঠিক আছে? 
আয়ান শান্ত চোখে মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলল, তারপর? মাহিরা আবারো বলে ওঠে, 
- তারপর কবিরাজের কাছ থেকে একটা তাবিজ এনে আপনার শরীরে বেঁধে দিবো। তাহলে দেখবেন আপনি একদম সুস্থ হয়ে গেছেন। আপনি আর এমন পাগলামি করছেন না।
মাহিরার কথায় আয়ান আবারো দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। এই মেয়ে কি জানেনা তাবিজ কবজ ইসলামে নিষিদ্ধ? আয়ান আর কিছু না বলে মাহিরাকে বলল, মাথা উঁচু করো গলায় মলম লাগিয়ে দিচ্ছি। মাহিরা আর কিছু না বলে তার মাথা খানিকটা উচু করে। আয়ান আলতো হাতে মাহিরার গলায় মলম লাগিয়ে দেয়। গরম কফি গায়ে পরায় পুড়ে না গেলেও লাল হয়ে গিয়েছে যায়গা গুলো। আয়ান মাহিরার গলায় মলম লাগিয়ে গলার নিচে নামতে নিলে মাহিরা বলে ওঠে, আমাকে দিন আমি লাগিয়ে নিচ্ছি। 
আয়ান মাহিরার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, আমি লাগিয়ে দিলে কি সমস্যা? মাহিরা আমতা আমতা করে বলে, আমি লাগিয়ে নিতে পারবো দিন আমাকে। বলেই সে আয়ানের থেকে মলম নিতে গেলে আয়ান বলে ওঠে, 
- তোর শরীরর এমন কিছু নেই যেটা আমার অদেখা তাই চুপচাপ এখানে বসে থাক। 
মাহিরা আর কিছু বলতে পারলো না। আয়ান মাহিরার কফি পরা গলায় মলম লাগিয়ে দিলো।
কেয়া হসপিটালের ভর্তি। মালিহা বেগমের মুখ নেই তার ভাইকে কিছু বলার। কেয়ার বাবা এই ঘটনার পর জানিয়ে দিয়েছেন তার মেয়েকে তিনি আর কখনো তার বোনের বাড়িতে পা রাখতে দিবেন না। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি যে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কখনো দ্বিতীয় বিয়ে করেননি? শুধুমাত্র সত্ত মা কেয়াকে কষ্ট দিবে বলে। আর সেই মেয়েকে যখন কেউ এভাবে শেষ করে দিতে চায়? সেই বাড়ির আশেপাশেও তিনি তার মেয়েকে ঘেঁষতে দিবেন না। 
শাজাহান শিকদার এই ঘটনার পর আয়ানকে ডেকে এনে আচ্ছা মতো বকেছেন। জিজ্ঞেস করেছেন কেয়ার সাথে এমনটা করার কারন কি। আয়ান হ্যা না কোনো কিছুই বলেনি শাজাহান শিকদার। আর না কিছু বলার প্রয়োজন মনে করেছে। সে শুধু দাঁড়িয়ে থেকে শাজাহান শিকদারের কথা গুলো শুনেছে। 
আয়ানের চুপ থাকা যেনো শাজাহান শিকদারের রাগ আরো বেশি বাড়িয়ে দেয়। এই ঘাড় ত্যাড়া ছেলের সাথে তিনি পেরে উঠেন না। এদিকে মাহিরার বেশ খারাপ লাগছে কেয়ার জন্য। তার কারনে কেয়ার আজ এই অবস্থা হলো। কে জানে কেয়া এখন কেমন আছে। সে চেয়েছিলো কেয়াকে একবার হসপিটালে দেখতে যাবে। কিন্তু আয়ানের ভয়ে সে আর বাড়ির বাইরে পা রাখার সাহস করেনি।
_____________
সেদিনের পর কেঁটে গিয়েছে আরো দু'দিন। মুসকান দাঁড়িয়ে আছে তার ড্রেসিং টেবিলের সামানে। নিজেকে আয়ানায় দেখে নিজের সাথে কথা বলছে মুসকান। সেদিনে রাতের পর থেকে সে আর কাঁদেনি। কার জন্য কাঁদবে সে? যে তাকে কখনো ভালো বাসেনি তার জন্য? নাকি যে তার গায়ে হাত তুলেছে তার জন্য?
মুসকান এতোদিনে বুঝে গিয়েছে অর্নব তাকে কখনোই ভালোবাসবে না। ভালোবাসার হলে সেই শুরু থেকেই অর্নব তাকে ভালোবাসতো। তাকে এভাবে কখনো দুরে দুরে সরিয়ে রাখতো না। আর না অন্য কাউকে বিয়ে করতে চাইতো। তাই মুসকান ভেবে নিয়েছে সে আর ওই মানুষের জন্য কাঁদবে না। 
কেঁদে কি হবে? কাঁদলে কি সেই মানুষটা ফিরে আসবে?নাকি তার কান্না দেখে তাকে ভালোবাসতে শুরু করবে? তার এতো আহাজারির পরও যেই মানুষটা তাকে ভালোবাসেনি? নিজের করে নেয়নি? সে যে আর কিছুতেই তাকে ভালোবাসবে না মুসকান সেটা বুঝে গিয়েছে। যার ভালোবাসার সে এমনিই ভালোবাসবে। আর যে ভালোবাসে না? তার হাত পা ধরেও কোনো লাভ হবে না। এই কঠিন বাস্তব সত্যি কথা গুলো মুসকান নিজের মনের ভেতরে গেথে নিয়েছে। সে আর কিছু না ভেবে আয়নার সামনে থেকে সরে রেডি হতে চলে যায়।
আয়ান তার রুমে সোফায় বসে আছে। মাহিরা আয়ানর কোলে বসে আয়ানের ফোন দিয়ে গেইম খেলছে। তার ফোনে গেইম দেখলে পরী বেগম রাগারাগি করেন। এসব গেইম টেইম রেখে পড়াশোনা করতে বলেন। তাই মাহিরা বুদ্ধি খাটিয়ে আয়ানের ফোনে অনেক গুলো গেইম নামিয়ে রেখেছে। সে যখনই সুযোগ পায়, তখনই আয়ানের ফোন দিয়ে গেইম খেলে।
তারা দু'জনেই ফিটফাট হয়ে রেডি হয়ে বসে আছে মুসকানের জন্য। মুসকান রেডি হয়ে আসলেই তারা তিনজন মিলে বিয়ে খেতে যাবে। আয়ানের এক ফেন্ডের বিয়ে আজ। আয়ান যদিও এসব বিয়ে শাদিতে যায় না কখনো। কিন্তু মাহিরা বিয়ের অনুষ্ঠানের কথা শুনে লাফিয়ে সেখানে যাওয়ার জন্য বায়না ধরে। 
আয়ান যদিও প্রথমে রাজি ছিলো না বিয়েতে যেতে। সে সাফসাফ মাহিরাকে জানিয়ে দিয়েছিলো তারা বিয়ে বাড়ি যাবেনা। কিন্তু মাহিরা আয়ানের কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করে আয়ানকে ঠিকই রাজি করে ফেলেছে। যদিও ফ্যামিলির সবাইকে দাওয়াত করা হয়েছে বিয়েতে। কিন্তু আয়ান শুধু মাহিরাকে নিয়ে যেতে চেয়েছে।
এদিকে মাহিরা আবার তাদের সাথে মুসকানকে নিয়ে নিয়েছে। সে চলে গেলে মুসকান বাড়িতে একা থাকবে যেটা মাহিরার মোটেও ভালো লাগবে না। মুসকান যদিও প্রথমে যেতে রাজি হয়নি। মাহিরার জোড়াজুড়িতে সে আর না করতে পারলো না।
আয়ান সোফায় বসে বসে মাহিরার গেইম খেলা দেখছে। এই মেয়ে তার ফোন গেইম দিয়ে ভরে রেখেছে। আয়ানের ফোনে এখন শুধু দরকারী কিছু অ্যাপস ছাড়া বাকি সব গেইম দিয়ে ভর্তি। আয়ান বসে বসে মাহিরাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। মাহিরা বিয়ে বাড়িতে যাবে বলে সুন্দর করে সেজেগুজে বসে আছে। 
আয়ান মাহিরাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে তার চোখ আঁটকে যায় মাহিরার মাথায় থাকা একটা সুন্দর ক্লিপের উপর। আয়ান এর আগে মেয়ের জিনিস পত্র এতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেনি।সে এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, তোর মাথায় এটা কি?
মাহিরা গেইম খেলতে খেলতে আয়ানকে বলে, কোনটা? আয়ান এবার মাহিরা মাথায় থাকা ক্লিপটা ধরে বলে, এটা? মাহিরা গেইম খেলায় মনোযোগ দিয়ে ছোট করে বলে, বউ। আয়ান বুঝলো না মাহিরার কথা। বলে ওঠল, 
- হ্যা তুই তো আমার বউ। কিন্তু তোর মাথায় ওটা কি? 
মাহিরার গেইম খেলায় ডিস্টার্ব হচ্ছে বলে সে বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে, উফফ এটার নামই বউ। এটাকে বউ ক্লিপ বলে।
ক্লিপের আসল নাম bow, কিন্তু মাহিরা ভুল ইংরেজি উচ্চারন করে বউ বলেছে। আয়ানও জানেনা এটার আসল নাম কি। তাই সে মাহিরার মাথায় থাকা বউ ক্লিপের দিয়ে তাকিয়ে বলে ওঠে, 
- ওহ নাইস, আমার বউয়ের মাথায় বউ? 
মাহিরা কিছুই বললো না। সে নিজের গেইম খেলায় ব্যাস্ত। আয়ান এবার মাহিরার মাথায় হাত দিয়ে বউ ক্লিপ টা খুলতে চেয়ে বলে, দেখি তো এই বউ ক্লিপ টা। আমাকে দে। বলেই আয়ান মাহিরার মাথা থেকে ক্লিপটা নিতে গেলে মাহিরা তার মাথা আয়ানের থেকে দুরে সরিয়ে নেয়। আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, 
- অসভ্য লোক। একদম আমার চুল নষ্ট করবেন না বলে দিচ্ছি। অনেক কষ্ট করে চুল সেট করেছি।
আয়ান এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, 
- আমাকে তোর পুরো সাজ নষ্ট করতে বাধ্য করিস না।
মাহিরা থতমত খেয়ে তাকায় আয়ানের দিকে। আয়ান আবারো বলে, দে আমাকে ওটা। মাহিরা বেশ বিরক্ত হয়ে তার মাথা থেকে বউ ক্লিপটা খুলে আয়ানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, এই নিন আপনার ক্লিপ। শান্তি হয়েছে এবার? এখন এটা মাথায় দিয়ে বসে থাকুন। আয়ান মাহিরার থেকে বউ ক্লিপটা নিয়ে ধমক দিয়ে বলে ওঠে, 
- ইডিয়েট আমি কি মেয়ে? যে এটা মাথায় দিবো। 
মাহিরা আর কিছু বললো না। সে আবারো নিজের গেইম খেলায় মনোযোগ দিলো। আয়ান এবার তার হাতে থাকা বউ ক্লিপটা ঘুড়িয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে মাহিরাকে বলে,
- সো কিউট, আমার বউকে এরকম অনেক গুলো বউ কিনে দিবো, ওকে? 
মাহিরা হ্যা না কিছুই বললো না। সে নিজের গেইম খেলায় ব্যাস্ত। মাহিরা আয়ানের কথা শুনছে না দেখে আয়ান এবার মাহিরার কাছ থেকে ফোন কেড়ে নেয়। মাহিরা চেচিয়ে ওঠে, আরে আরে কি করছেন? গেইম খেলছি তো। আয়ান ফোনটা পাশে ফিক্কা মেরে ফেলে দু'হাতে মাহিরার কোমড় শক্ত করে আকড়ে ধরে বলে,
- গেইম পরে খেলবে। আগে নিজের স্বামীকে সময় দাও। 
মাহিরা বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে, আপনি কিন্তু অনেক জ্বালান আমাকে। আয়ান মাহিরার চুলে নাক ঘষে বলে, ভবিষ্যতেও জ্বালাবো। কি করবে? মাহিরা ঘুড়ে তাকায় আয়ানের দিকে। বলে ওঠে, আপনার কি খেয়ে দেয়ে আর কোনো কাজ নেই? আমাকে জ্বালানে ছাড়া? আয়ান এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, 
- পৃথিবীর প্রতিটা স্বামীর একটাই কাজ বউদের জালানো। 
মাহিরা আয়ানকে আর কিছু বললো না। বিরবির করলো, বেহায়া নির্লজ্জ লোক একটা। আয়ান আবারো মাহিরার চুলে নাক ঘষে ডেকে ওঠে, সানফ্লাওয়ার? মাহিরা ছোট করে বলে, বলুন? আয়ান বলে ওঠে, 
- আমার একটা মেয়ে চাই, দেখতে ঠিক তোর মতো। 
মাহিরা হা হয়ে চেয়ে থাকে আয়ানের কথা শুনে। আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, 
- মেয়ে কি হাতের মোয়া? যে চাইলেই পেয়ে যাবেন? 
আয়ান মাহিরার কথায় মুচকি হেসে বলে ওঠে, তোকে যেদিন রাতে প্রথম দেখেছি? সেদিনই আমি তোর আর আমার মেয়ের নাম ঠিক করে রেখেছি। মাহিরা চমকে উঠে আয়ানের কথায়। বলে ওঠে, আপনি কি সেই প্রথম দিন থেকে আমাকে পছন্দ করতেন? আয়ান বলে ওঠে, 
- ওসব পছন্দ টছন্দ বুঝি না আমি। আমার শুধু তোকে চাই মাহি।
মাহিরা চেয়ে থাকে আয়ানের দিকে। আয়ান মাহিরার চোখের দিকে তাকিয়ে আবারো বলে ওঠে, তোর চোখের দিকে যেদিন প্রখম তাকিয়েছি? সেদিনই আমায় পুরো পৃথিবী থেমে গিয়েছে। বুকে এক ঝড় বয়ে গিয়েছে তোর চোখের চাহনিতে। পুরো বুকে তোলপাড় শুরু হয়ে গিয়েছিলে শুধু তোর চোখে দেখে। আমি কয়েক মুহুর্তের জন্য এই পৃথিবীর সবকিছু ভুলে যেতে বসেছিলাম সেদিন।
মাহিরা হা হয়ে চেয়ে আছে আয়ানের দিকে। আয়ানের মুখে এমন কথা সে আর কখনো শোনেনি। আয়ান এবার মাহিরার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
- জানিস মাহি? তোর চোখ দুটো আমাকে সেদিনই মেরে ফেলেছে। আমি জীবিত হয়েও মৃত হয়ে গেলাম তোর চোখের দিকে তাকিয়ে। 
মাহিরা হেবলার মতো চেয়ে থাকে আয়ানের দিকে। আয়ান কখনো এখাবে নিজের আবেগ, অনুভূতি গুলো প্রকাশ করেনি এর আগে। মাহিরা এবার বলে ওঠে,
- আপনি কি পাগল? শুধু চোখ দেখে মানুষ কিভাবে মরে যায়? 
আয়ান মুচকি হেসে মাহিরার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, 
- সবার কথা জানিনা আমি। কিন্তু তোর এই চোখে আমি নিজের মরন জেনেও ঝাঁপিয়ে পরেছি। তোর চোখের মায়ায় ডুবেছি। তোকে নিজের করে আরো গভীর ভাবে তোর চোখ দুটো দেখার সুযোগ করে নিয়েছি। আমি নিজের মরন যেনেও তোর চোখের মায়ায় পরেছি।
মাহিরা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে আয়ানের দিকে। এই লোক কি বলছে সব তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।মাহিরা বলে ওঠে, আপনি তো এর আগে কখনো এসব কথা বলেননি আমাকে। আয়ান বলে ওঠে, বলতে হবে কেনো? তুই কি বুঝে নিতে পারিসনা আমার না বলা কথা গুলো? মাহিরা এবার আয়ানের থেকে চোখ সরিয়ে মিনমিন করে বলে, আমি আপনাকে বুঝিনা খাড়ুস লোক। আপনি কেমন যানি। এই ভালো আবার এই মন্দ। আয়ান মাহিরার কথায় মুচকি হেসে বলে ওঠে, 
- তুই ভালো তো আমি ভালো। তুই খারাপ তো আমি খারাপ। 
মাহিরা আবারো বুঝলো না আয়ানের কথা। বলল, একবার ভালোবাসি বলুন না আমায়? আয়ান সাথে সাথে বলে ওঠে, 
- ভালোবাসি বলতে হবে কেনো? তুই কি আমার ভালোবাসা ফিল করতে পারিস না মাহি? 
মাহিরা এই লোকের মুখ থেকে ভালোবাসি শোনার জন্য দু'পাশে মাথা নাড়িয়ে না জানায়। আয়ান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে ওঠে, চল দেরি হয়ে যাচ্ছে। বলেই আয়ান উঠতে নিলে মাহিরা দু'হাতে আয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে, প্লিজ একবার ভালোবাসি বলুন। আমার অনেক দিনের ইচ্ছা আপনার মুখ থেকে ভালোবাসি শোনার। 
আয়ান বলে ওঠে,
- ভালোবাসা ফিল করতে না পারলে ভালোবাসি বলে মজা নেই মাহি। 
মাহিরা মুখ ফুলায়। বলে, এমন করছেন কেনো? একবার বলুন না প্লিজ? আয়ান আবারো বলে ওঠে, আমি তোর কানের কাছে সারাদিন ভালোবাসি ওয়ার্ড টা বললেও কোনো লাভ হবে না যদি তুই আমার ভালোবাসা ফিল করতে না পারিস। তাই যেদিন তুই আমার ভালোবাসা ফিল করতে পারবি? আমি ঠিক সেদিনই তোকে ভালোবাসি বলবো।
বলেই আয়ান মাহিরাকে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, প্লিজ একবারই তো। আয়ান গম্ভীর গলায় ছোট করে বলে, নো। পরপর সে মাহিরার হাত ধরে হাঁটা দেয়। মাহিরার খুব রাগ লাগছে আয়ানের উপর। সে যেতে যেতে একা একা বিরবির করে, 
- এমন ভাব করছে মনে হচ্ছে উনার ভাগের সম্পত্তি চাইছি আমি। আমাকে একবার ভালোবাসি বললে কি উনার ভাগের সম্পত্তি কমে যাবে? খাড়ুস একটা। 
বলেই মাহিরা আয়ানকে একটা মুখ ভেঙ্গচি দেয়। আয়ান মাহিরার মুখ ভেঙ্গচি না দেখলেও মাহিরার কথা গুলো শুনে সে মনে মনে হাসে। 
মুসকান রেডি হয়ে গাড়ির কাছে এসেছে। আয়ান আর মাহিরা আগে থেকেই গাড়িতে বসে আছে মুসকানের জন্য। মুসকান এসে গাড়ির পেছনে উঠে বসে। আয়ান আর মাহিরা গাড়ির সামনে বসা। মুসকান গাড়িতে উঠে বসতেই আয়ান গাড়ি স্ট্যার্ট দেয়। এমন সময় হঠাৎ কারো চিৎকার ভেসে আসে,
- দাঁড়ায়া'আআও..!
হঠাৎ চিৎকারে আয়ান সাথে সাথে গাড়ির ব্রেক কষে। এতে সবাই টাল সামলাতে না পেরে সামনের দিকে ঝুঁকে পরে। এদিকে অর্নব ছুটে এসে কোনো কথা ছাড়াই তাড়াতাড়ি গাড়ির দরজা খুলে পেছন সিটে মুসকানের পাশে বসে পড়ে। সবাই নিজেদের সামলে ভ্রু কুঁচকে অর্নবের দিকে তাকায়। 
অর্নব সিটে গা এলিয়ে অনবরত হাঁপাতে থাকে। আরেকটু হলেই আয়ানের গাড়ি মিস করে ফেলতো সে। মাহিরা অর্নবকে এভাবে হাঁপাতে দেখে বলে ওঠে, ভাইয়া আপনি এভাবে হাঁপাচ্ছেন কেনো। কি হয়েছে আপনার? অর্নব জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে বলে মাহিরাকে বলে ওঠে, 
- আর বলোনা মাহিরা। তোমার শশুর আস্ত একটা জল্লাদ। কোনো কারন ছাড়া একদমই ছুটি দিতে চায় না। ছুটি চাইলেই বারবার কৈফিয়ত চায়। অনেক কষ্টে তোমার শশুর কে ভুং ভাং বুঝিয়ে ছুটি নিয়ে এসেছি। আরেকটু দেরি হলেই তোমাদের সাথে বিয়ে বাড়ি যাওয়াটা মিস করে ফেলতাম।
অর্নবের কথা শুনে সবাই হা হয়ে চেয়ে থাকে অর্নবের দিকে। আয়ান এবার গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, আমার গাড়িতে উঠেছিস কেনো? নাম আমার গাড়ি থেকে। অর্নব আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, আমিও তোমাদের সাথে বিয়ে বাড়িতে যাবো ভাইয়া। অনেকদিন হয়ে গেলো বিয়ে শাদি কিছু খাই না। সেই কবে নিরানব্বই সালে একবার শুধু নাবিলার বিয়েটা খেয়েছিলাম। 
মাহিরা বলে ওঠে, নিরানব্বই সাল কই ভাইয়া? নাবিলা আপুর বিয়ে হয়েছে কয়েক মাস হলো। অর্নব বলে ওঠে, ওই একি তো হলো। আয়ানের মেজাজ খারাপ হয়। আয়ান বলে ওঠে, আমি তোকে আমাদের সাথে নিবো না। নাম গাড়ি থেকে। অর্নব এবার কাঁদো কাঁদো মুখ করে মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, দেখেছো মাহিরা? ভাইয়া আমাকে তার গাড়ি থেকে নেমে যেতে বলছে। তুমি প্লিজ ভাইয়াকে কিছু বলো? 
মাহিরা থতমত খেয়ে যায়। সে অর্নবের হয়ে আয়ানকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আয়ান বলে ওঠে, থাপ্পড় খেতে না চাইলে আমার গাড়ি থেকে নাম অর্নব। অর্নব আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, এমন করছো কেনো ভাইয়া? আমি তোমাদের সাথে গেলে কি তোমাদের খাবার কম পরে যাবে নাকি? আয়ান চোয়াল শক্ত করে বলে ওঠে, হ্যা কম পরে যাবে। নাম আমার গাড়ি থেকে। 
অর্নব সাথে সাথে বলে ওঠে, সমস্যা নেই ভাইয়া। কম পরবে না। আমি সবার থেকে একটু একটু করে খেয়ে নিবো। আর তাছাড়া বিয়ে বাড়িতে অনেক খাবার থাকে। কম পরার কোনো চান্স নেই। আয়ানের রাগে যা জ্বলে যাচ্ছে। আয়ান কিরবির করে বলে ওঠে, তুই নামবি? নাকি আমি ওঠে আসবো কোনটা? অর্নবের মুখটা এবার মলিন হয়ে যায়। অর্নব আবারো মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, 
- দেখো মাহিরা ভাইয়া আমাকে কিভাবে বকছে? আমি না তোমাদের বিয়ের সাক্ষী ছিলাম বলো? তোমার বর তো নিজের বিয়ের দাওয়াত টাও আমাদের খাওয়ালো না। এখন আবার অন্য কারো বিয়ে খেতে চাচ্ছি সেটাও খেতে দিতে চাইছে না। 
বলেই অর্নব সিটে গা এলিয়ে তার এক হাত বুকে রেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে, আহা কি কষ্ট আমার। কেউ আমার কষ্টটা বুঝলো না। কতো দিন হয়ে গেলো আমি বিয়ে খাই না। বিয়ে কি সেটাই ভুলে গেছি বিয়ে না খেতে খেতে। ভাই একটা বিয়ে করে ফেললো তাও দাওয়াত খেতে পারলাম না। আজকেও যদি বিয়ে খেতে না পারি? তাহলে আমার রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে বিয়ে খাওয়া ছাড়া আর কোনো গতি থাকবে না।
মাহিরা অর্নকে কি বলবে ভেবে পেলো না। এদিকে আয়ান আর নিতে পারলো না। সে রেগে কিরবির করে বলে ওঠে, তোকে আমি দাওয়াত খাওয়াচ্ছি দারা। বলেই আয়ান গাড়ি থেকে নামতে নিলে মাহিরা আয়ানকে বাঁধা দিয়ে বলে, আরে আরে কি করছেন? থামুন, থামুন। মাহিরার কথায় আয়ান থেমে যায়। মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, হোয়াট হেপেন্ট? 
মাহিরা বলে ওঠে, অর্নব ভাইয়াকে আমাদের সাথে নিয়ে চলুন। আয়ান জোরে বলে ওঠে, হোয়াট? এই গাধা টাকে আমাদের সাথে করে নিয়ে যাবো? মাহিরা বলে ওঠে, অর্নব ভাইয়া গাধা না। আয়ান চোয়াল শক্ত করে বলে ওঠে, ওকে গাড়ি থেকে নামতে বল মাহি। আমি ওকে আমার গাড়িতে দেখতে চাই না। মাহিরা বলে ওঠে, প্লিজ এমন করবেন না। ভাইয়াকে নিয়ে চলুন আমাদের সাথে? ভাইয়া আমাদের কতো হেল্প করেছে বলুন? আমাদের বিয়েতে সাক্ষী দিয়েছে। তারপর আবার সেদিন রাতে..! রাতের কথা বলতেই আয়ান চোয়াল শক্ত করে জোরে ধমক দিয়ে ওঠে,
- মাহি..? 
মাহিরা তাকায় আয়ানের দিকে। আয়ান রাগী চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বললো না। আয়ান বারবার তাকে নিষেধ করে দিয়েছে সেদিনের সেই রাতের কথা মনে না করতে। কিন্তু মাহিরা ভুলে বলতে গিয়েছিলো। তার আগেই আয়ান তাকে সাবধান করে দিযেছে। মাহিরা আর কিছু না বলে চুপ মেরে বসে থাকলো। আয়ান চোয়াল শক্ত করে গাড়ি স্টার্ট দেয়। তার মন চাচ্ছে এই দুই গাঁধাকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে চলে যেতে। 
আয়ান গাড়ি স্টার্ট দিতেই অর্নব পিছনে বসে মুচকি মুচকি হাসে। তার কথা গুলো ঠিক যায়গায় কাজে লেগেছে। অর্নব এবার ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের সিটে তাকায়।মুসকান কাচ ভেদ করে বাহিরে তাকিয়ে আছে। মুসকান এতোক্ষণে একটা টু শব্দও করেনি। না একবার তার দিকে ফিরে তাকিয়েছে। শুধু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দুরে কোথাও। অর্নব আর কিছু না বলে সিটে গা এলিয়ে দিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। 
চলবে..
                               

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন