হাসপাতালের কেবিনে বিকেলের নরম আলো এসে পড়েছে। আফরোজা বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে। কাঁধে ছোট্ট ব্যান্ডেজ, মুখে হালকা ক্লান্তি থাকলেও আগের চেয়ে অনেকটাই স্বাভাবিক লাগছে তাকে। ডাক্তার চেকআপ শেষ করে হাসিমুখে বললেন,
“ভয়ের কিছু নেই। গুলিটা শুধু কাঁধ ছুঁয়ে গেছে। বিশ্রাম নিলেই পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবে। আজকেই বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন।”
কথাটা শুনে শাহরিয়ার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। আফরোজা একপলক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শাহরিয়ারের দিকে তাকালো। গত কয়েক ঘণ্টা ধরে লোকটা একবারের জন্যও তাকে একা ছাড়েনি। ডাক্তার কথা বলে কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই শাহরিয়ার গম্ভীর গলায় বললো,
“চল, তোকে বাসায় পৌঁছে দিই।”
শাহরিয়ারের কথা শুনে আফরোজা কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেলো।
.
.
হাসপাতালের সামনে একটা কালো গাড়ি এসে থামতেই শাহরিয়ার নিজ হাতে দরজা খুলে দিয়ে আফরোজার দিকে তাকাতেই আফরোজা নিঃশব্দে ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠলো। আফরোজা গাড়িতে উঠে বসতেই শাহরিয়ারও আফরোজার সাথে উঠে বসলো। এরপর গাড়ির ভিতরে তারা দুজনের মাঝেই অদ্ভুত নীরবতা ছিলো। সমস্ত নীরবতা ভেঙে কিছুদূর যাওয়ার পর শাহরিয়ার বললো,
“ বান্দি, এত বড় পাগলামি করার কি দরকার ছিলো?”
আফরোজা জানালার বাইরে তাকিয়েই বললো,
“আপনার কিছু হয়ে গেলে... বিষয়টা আমার ভালো লাগতো না।”
শাহরিয়ার কিছুক্ষণ চুপ থেকে স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো,
" প্রাণের বান্দি, চল কিছু করি।”
শাহরিয়ারের কথা শুনে আফরোজা কাঁপা কণ্ঠে শুষ্ক ঢোক গিলে বললো,
কি,,কিছু করি মানে?
মানে, চল প্রেম করি।
শাহরিয়ারের কথা শুনে আফরোজা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে বললো,
আমি প্রেম করতে চাই না আপনার সাথে।
কেনো?
প্রেম করা মহাপাপ আপনি জানেন না?
তওবা, তওবা, আসতাগফিরুল্লাহ, না বান্দি! জানতাম না তো,,,, আজকে জানলাম।
কথাটা বলেই শাহরিয়ার একটু ভাবুক ভঙ্গিতে বললো,
প্রেম করা তো মহাপাপ,, তাহলে কি করা যায়?
............
আফরোজার থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে শাহরিয়ার এবার ভাবুক ভঙ্গিতে বললো,
এই মাঙ্গের নাতি,, চল আমরা পরকিয়া করি।
শাহরিয়ারের কথা শুনে আফরোজা এবার নাক - মুখ কুঁচকে বললো,
মুখের কি ভাষা ছিঃ! আর আমি কোনো মাঙ্গের নাতি নই, আমি আজহার মাহমুদের নাতি। আপনার সাথে আমি প্রেম তো দূর থাক কিছুই করবো না,, বখাটে এমপি সাহেব।
আফরোজার কথা শুনে শাহরিয়ার তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আজহার মাহমুদ নামটা বিরবির করে কয়েকবার উচ্চারণ করলো অতঃপর অট্রহাসিতে ফেঁটে পড়লো। আর আফরোজা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে তার পাশে বসে থাকা বখাটে শ্যাম পুরুষের হাসিমাখা বদন খানি। আফরোজাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে শাহরিয়ার হাসি থামিয়ে আফরোজার একটু কাছে এসে বললো,
এই ধানি লঙ্কা আজকে যেমন করে আমার পাশে বসেছিস, ঠিক এভাবেই কোনো একদিন তুই আমার সাথে সবকিছুই করবি আর সেটা তোর ইচ্ছেতেই,,
শাহরিয়ার কথাগুলো বলতে না বলতেই গাড়ির ড্রাইভার শাহরিয়ারের উদ্দশ্যে বললো,
ছোট সাহেব! এখন কোথায় যাবেন?
শাহরিয়ার আফরোজার দিকে একপলক তাকিয়ে বললো,
সন্ধ্যামালতি বাসার দিকে যাও।
শাহরিয়ারের কথামতো ড্রাইভার সন্ধ্যামালতি বাসার উদ্দশ্যে রওনা হলো।
নিজের বাসার নাম শাহরিয়ারের মুখে শুনে আফরোজা থমকালো চমকালো। সে অবাক কণ্ঠে শাহরিয়ারের উদ্দশ্যে বললো,
আপনি জানেন কিভাবে "সন্ধ্যামালতি" আমাদেরই বাসা।
আফরোজার কথা শুনে শাহরিয়ার অদ্ভুত ভঙ্গিতে হেসে বললো,
বোকা বান্দি! নিজেই তো তখন বললি তুই আজহার মাহমুদের নাতি। সো, একটা মানুষের পরিচয় জানার জন্য তার দাদা বা বাবার নামই যথেষ্ট।
শাহরিয়ারের এমন কথায় আফরোজা আহাম্মক বনে গেলো,,,, এরপর শাহরিয়ারের কথার পৃষ্ঠে সে কিছুই বললো না।
.
.
সন্ধ্যামালতি বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই শাহরিয়ার নেমে এসে আফরোজাকে সাবধানে নামতে সাহায্য করলো। এতে আফরোজা সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশে চোখ বুলিয়ে গাড়ি থেকে নেমে শাহরিয়ারের উদ্দেশ্য বললো,
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, বখাটে এমপি সাহেব।
শালি কিপ্টে মাতারি, তোর মন এতো ছোট জানা ছিলো না।
মানে।
তোর জন্য এতো কিছু করে আমার অনেক এনার্জি লস হয়েছে, সো আমার এখন ভিটামিন প্রয়োজন।
এই মুহুর্তে শাহরিয়ারের এমন কথা ঠিক হজম হচ্ছে না আফরোজার। তারপরেও সে নিজেকেে স্বাভাবিক রেখে বললো,
তো ভিটামিন খান। আপনাকে ধরে রেখেছে কে?
আফরোজার কথা শুনে শাহরিয়ার ঘাড় কাত করে আফরোজার দিকে তাকিয়ে বললো,
বুঝে - শুনে সজ্ঞানে বলছিস তো?
আফরোজা এবার কিছু না বলে শুধু বিরক্ত ভঙ্গিতে হ্যাঁ বোধক মাথা দুলাতেই শাহরিয়ার আফরোজার খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বললো,
ধানি লঙ্কা এটা তোলা রইলো,,, এই সম্পর্কটাকে হালালে রুপ দেওয়ার পরেই আমি তোমার কাছ থেকে ভিটামিন সুদে - আসলে ফেরত নিবো ততোদিন এটা তোমার কাছে আমানত রেখো।
কথাটা বলেই শাহরিয়ার আর একমুহুর্ত সময় ব্যায় না করে গাড়িতে উঠে বসতেই গাড়ি আপন গতীতে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো আর আফরোজা নির্বাক দৃষ্টিতে একপলক সেদিকে তাকিয়ে বাসার ভিতরে এগিয়ে গেলো।
আফরোজা বাসার ভেতরে ঢুকতেই শামসুন্নাহার বেগম ছুটে এসে আফরোজাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“আল্লাহর লাখো শুকরিয়া! তোর বেশি কিছু হয়নি”
ঠিক তখনই রুদ্র আর রৌনক দৌড়ে এলো। দুজনের চোখ-মুখ আতঙ্কে ভরা। রুদ্র কাঁপা গলায় বললো,
“আপু, তুমি ঠিক আছো?”
অন্যদিকে, রৌনক তড়িঘড়ি ফোন হাতে নিয়ে বললো,
“আমরা কিন্তু বড় ভাইয়াকে ফোন করে খবর দিছি!”
আফরোজা অবাক হয়ে বললো,
“কাকে?”
“জাহিদ ভাইয়াকে!”
কথাটা শেষ হতেই বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেলো। পরক্ষণেই দরজা ঠেলে হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকলো জাহিদ। তার চোখেমুখে ভয় আর উৎকণ্ঠা। সে প্রায় দৌড়ে এসে আফরোজার সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
“ তুই ঠিক আছিস?”
আফরোজা মৃদু হেসে বললো,
“আমি ঠিক আছি ভাইয়া।”
জাহিদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ছোট বোনের মাথায় হাত রাখলো। তারপর আফরোজার দিকে তাকিয়ে বললো,
তোকে হসপিটালে কে নিয়ে গেছে?
জাহিদের কথা শুনে আফরোজা শুষ্ক ঢোক গিলে বললো,
আ,, আসলে ভাইয়া আমার যখন গুলি লেগেছে তখন আশোপাশের লোকজন ধরে আমাকে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিলো আর এখন বাসায় পৌছে দিয়ে গেছে।
আফরোজার কথা শুনে জাহিদ আফরোজাকে আর কিছু বললো না। তবে, নাজিয়া বেগমের উদ্দশ্যে বললো,
আম্মু আফরোজার খাবারটা রুমে পাঠিয়ে দেও।
এরপর আফরোজার দিকে তাকিয়ে বললো,
তুই রুমে যা।
জাহিদের কথা শুনে আফরোজা মাথা দুলিয়ে নিজের রুমের উদ্দশ্যে পা বাড়াতেই পিছন থেকে জাহিদ পু্ণরায় বললো,
তোর ফোন কোথায়?
রুমে।
ঠিক আছে। তুই যা আমি আসছি তোর ফোনটা আমার লাগবে।
আফরোজা ভাইয়ের কথা শুনে আর কিছু না বলে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেলো।
.
এখন সময় রাত গভীর।শিকদার মঞ্জিলে ফিরে এসেছে শাহরিয়ার। সারাদিনের রাজনৈতিক ব্যস্ততা, মিছিলের বিশৃঙ্খলা, সব মিলিয়ে তার শরীর-মন দুটোই ক্লান্ত। শাহরিয়ার বাড়িতে ঢুকতেই ড্রয়িংরুমে বসে থাকা ইবনাত ও মেহেরীন শিকদারের সাথে চোখাচোখি হলো তার। মেহেরীন শিকদারের মুখ অস্বাভাবিক কঠিন। তার চোখেমুখে চাপা রাগ। তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
“শাহরিয়ার, তোমার সাথে আমার জরুরি কথা আছে।”
মায়ের কথা শুরে শাহরিয়ার ভ্রু কুঁচকে বললো,
“এখন?”
“হ্যাঁ। এখনই।”
মায়ের কথা শুনে শাহরিয়ার ধীর পায়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। অপরদিকে, মেহেরীন শিকদার গভীর দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আজ যে মেয়েটার জন্য তুমি সবকিছু ফেলে ছুটে গেলে... সে কে?”
তার নাম আফরোজা।
পরিচয় জেনেছো?
আজহার মাহমুদের নাতি।
শাহরিয়ারের কথা শুনে মেহেরীন ভ্রুঁ কুঁচকালো আর ইবনাত বলে উঠলো,
বড় ভাইজানের মেয়ে নাকি?
হ্যাঁ, ছোট মা।
কথাটা শুনা মাত্রই অতি আবেগে ইবনাতের দু চোখ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়লো। এখানে ড্রয়িংরুমে কান্না করা ঠিক হবে না ভেবে ইবনাত নিজের রুমে চলে গেলো। ইবনাত চলে যেতেই মেহেরীন শাহরিয়ারের দিকে তাকিয়ে বললো,
তুমি ঠিক কি করতে চাইছো?
আম্মাজান, আমি মেয়েটিকে ভালোবাসি। পৃথিবীর নিয়ম - কানুন, বাঁধা - বিপত্তি ডিঙিয়ে হলেও আমার মেয়েটিকে চাই। শরীরে রক্তচলাচল না করলে একটা মানুষ যেমন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ঠিক তেমনি আমার মস্তিষ্কের প্রতিটা নিউরন আমাকে সংকেত দেয়, এই মেয়ে ছাড়া আমার অবস্থা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর।
শাহরিয়ারের কথা শুনে মেহেরীন মাথা দুলিয়ে বললো,
তোমাকে আমি ভরসা করি। আশা করি, যা করবে তা বুঝেই করবে।
কথাটা বলেই মেহেরীন ঐ স্থান ত্যাগ করলো। আর শাহরিয়ারও নিজের রুমের উদ্দশ্যে পা বাড়ালো।
❌ অনুমতি ছাড়া কপি করা, কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌
#গল্পঃদহনস্পর্শ
#কলমেঃআনিকা_রহমান
#পর্বঃ০৯
চলবে... ✨
#বিঃদ্রঃ( প্রিয় পাঠকমহল ঠিকঠাক রেসপন্স করো।)