ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

৫ম পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

#রক্তমুকুট

#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব - ৫

তলোয়ার এর শান শান শব্দে কেঁপে উঠছে কাটাগিরির প্রবেশ রাস্তা। ডাকাত দলের সদস্য রা নগরে ঢুকে পড়লেও তাদের সর্দার এর সাথে তলোয়ার যুদ্ধে মড়িয়া হয়ে উঠেছে শাখা। একের পর এক আঘাত হানছে সামনে থাকা জোয়ান তাগড়া পুরুষটার ওপর। তার আক্রমন ঠেকানোর ভঙ্গিও নিখুঁত। দু'জনের ধ্বস্তাধস্তির এক পর্যায়ে শাখার তলোয়ার এক ঝটকায় ফেলে দিলো ডাকাত সর্দারের তলোয়ার। পিছন থেকে শোনা গেল হায় রে রে রে রে উচ্চ ধ্বনি। সাহাবাদ সৈন্য দের তাড়া খেয়ে এদিকে ছুটে আসছে বাকি সদস্যরা। শাখার মনোযোগ নড়লো তাদের কলরব এ। সেই সুযোগে ঘোড়ায় চেপে ছুটতে শুরু করলো ডাকাত সর্দার। কিছুদূর গিয়ে আবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় শাখার দিকে। আঙুল তুলে ওপর নিচ নাড়ায়। অর্থাৎ দেখে নেবে।

****

ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। সাহাবাদের সীমান্তঘেঁষা কাটাগিরির জঙ্গলের দিকে দুইটি অশ্ব ছুটে চলেছে দুরন্ত গতিতে। একটিতে যুবরাজ মেহরাব। অন্যটিতে তার চিরচেনা সঙ্গী আলীরাজ। দু'জনেরই পরনে নিকষ কালো শিকারি পোশাক। পিঠে তূণীর, হাতে ধনুক, কোমরে ঝোলানো ধারালো তরবারি। ঘোড়া ছুটাতে ছুটাতেই আলীরাজ মুখ বাঁকাল।

"এই নিয়ে তৃতীয়বার এ জঙ্গলে এলাম। তোর শিকারি নেশা দিন দিন অসুখে পরিণত হচ্ছে মেহু"

মেহরাব বাকা হেসে বলল,

"অসুখ না, অভ্যাস।"

"একদিন এই অভ্যাসই আমাদের বাঘের সকালের নাশতা বানাবে।"

"তুমি আগে থেকেই এত দোয়া করো না।"

"আমি দোয়া করছি? আমি তো নিজের জান বাঁচানোর আবেদন করছি!"

মেহরাব হেসে ফেলল।

"মামা, তুমি না থাকলে জঙ্গলটা খুব নিরস লাগত।"

আলী মুখ কুঁচকে বলল,

"আর তুই না থাকলে আমি এখন নিশ্চিন্তে রাজপ্রাসাদে পায়েস খেতাম। এমনিতেই ওই জঙ্গলে নিশি লুকিয়ে থাকে দিনে দুপুরে। গেলেই আক্রমণ করে বসে। খুঁজে পাওয়া যায় না সেই নিশি কে।”

মেহরাব কিছুটা চটে বলল

“হ্যা আর তাকে তুমি সাহাবাদ এর শাহজাদি বানিয়ে দিয়েছিলে। নজর আর ঠিক হলো না জীবনে শ্যাহহ। ওমন ফুলের মত মেয়েটা এমন কাজ করতে পারে?”

আলীরাজ মুখ কালো করে বলল

“তাহলে বোধহয় ব্যাটা ভুল খবর দিয়েছিলো আমায়। মেয়েটা সত্যিই খুব মিষ্টি রে”

মেহরাব বড় বড় চোখ করে তাকাতেই বলল

“দেখ মেহু, নিজের বিয়ে হচ্ছে না বলে আমারও হতে দিবি না? এ কিন্তু অন্যায়”

কিছুদূর এগিয়ে যেতেই ঘন অরণ্য শুরু হলো।

সূর্যের আলো গাছের মাথা ভেদ করে মাটিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে যেন হারিয়ে যাচ্ছে। বহু বছরের পুরোনো শাল, সেগুন আর গর্জন গাছ আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুনো লতাগুল্ম তাদের শরীর জড়িয়ে ধরেছে। মাঝে মাঝে রঙিন পাখিরা ডানা ঝাপটে উড়ে যাচ্ছে। কোথাও কাঠঠোকরার ঠকঠক শব্দ। আবার কোথাও অদৃশ্য ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক। অরণ্যের বুক চিরে বয়ে চলেছে স্বচ্ছ জলের সরু নদী। তারই একটু ওপরে পাহাড় বেয়ে নেমে এসেছে একটি ঝর্ণা। সাদা ফেনার জল পাথরে আছড়ে পড়ে মুক্তোর মালার মতো চারদিকে ছিটকে যাচ্ছে। শীতল বাতাসে ভিজে মাটির গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। দৃশ্যটা এতটাই নির্মল যে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে না থেকে উপায় নেই। মেহরাব ঘোড়া থেকে নেমে ঝর্ণার ধারে এগিয়ে গেল। দু'হাত ভরে ঠান্ডা পানি তুলে মুখে দিল। তারপর আবার একমুঠো পানি নিয়ে মাথায় ছিটিয়ে দিল। শীতল পানির স্পর্শে চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল সে।

"এই জায়গাটার মতো শান্তি আর কোথাও পাই না।"

আলীরাজও পানি খেল। তারপর হাঁটু সোজা করে উঠে বলল

“আগের বার ডাইনি টা এখান থেকেই আক্রমণ করেছিলো। চল, যত দ্রুত এই স্থান ত্যাগ করা যায় ততই মঙ্গল”

মেহরাব কঠিন স্বরে বলল

“রাজ্য টা না, আমার বাবার অধীন। আমাদের অধীনস্থ রাজ্য থেকে আমাদের আক্রমণ? বাপের বেটি হলে সামনে আসুক। চলো, এবার শিকার দেখা যাক।"

দু'জনে আবার ঘোড়ায় চড়ে আরও ভেতরে ঢুকে পড়ল। খুব বেশি সময় যায়নি। হঠাৎ মেহরাব হাত তুলে আলীকে থামার ইশারা করল। দূরে ঝোপের আড়াল থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো এক রাজসিক হরিণ। তার বিশাল শিং রোদের আলোয় ঝলমল করছে। মেহরাব নিঃশব্দে ঘোড়া থেকে নামল। এক হাঁটু ভাঁজ করে বসে ধনুকে তীর সংযুক্ত করল। চোখ স্থির, নিঃশ্বাস ধীর, তীরের অগ্রভাগ সোজা হরিণের দিকে। আর মাত্র এক মুহূর্ত, ঠিক তখনই ট্যাং করে ডান দিকের কোথাও থেকে বজ্রগতিতে ছুটে এলো আরেকটি তীর। সেটি এসে সজোরে আঘাত করল মেহরাবের ধনুকে। ধনুক কেঁপে উঠল। মেহরাবের ছোড়া তীর লক্ষভ্রষ্ট হয়ে অনেক দূরে গিয়ে পড়ল।

হরিণ মুহূর্তেই লাফিয়ে জঙ্গলের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল। মেহরাব দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখ ক্রোধে ধারালো হয়ে উঠল।

"কে? কোন কাপুরুষ তুই? পিছন থেকে আক্রমণ করিস। বাপ, ময়ের ঠিক থাকলে সামনে আয়। সামনে থেকে আঘাত কর”

কোনো উত্তর নেই। আলী চারদিকে তাকাতে লাগল।

"কোথা থেকে এলো তীরটা?"

মেহরাবও দ্রুত চারপাশ পর্যবেক্ষণ করল। ঘন গাছপালা, লতাপাতা, পাথরের আড়ালে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ঠিক তখনই শুঁউউঁ! করে আরও একটি তীর ছুটে এলো। মেহরাব ঝুঁকে পড়তেই তীরটি তার পেছনের গাছে গিয়ে বিধল। পরপর আরও দুটি তীর।

"আড়ালে! যাও মামা"

চিৎকার করে উঠল মেহরাব। দু'জনে দ্রুত বিশাল এক পাথরের আড়ালে আশ্রয় নিল। মেহরাব আর দেরি করল না। শত্রুর অবস্থান আন্দাজ করে পরপর দুটি তীর ছুড়ে দিল। আলীরাজও ধনুক তুলল। সেও বিপরীত দিকে তীর নিক্ষেপ করতে লাগল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার তাদের তীরের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। বরং অচেনা দিক থেকে আরও তীর ছুটে আসছে। মনে হচ্ছে একাধিক লোক চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। আলীরাজ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল

"মেহু! নিচে থাকলে সুবিধা হবে না।"

"তাহলে?"

"ওই পাহাড়টা দেখছিস? ওপরে উঠতে পারলে চারদিক দেখা যাবে।"

মেহরাব এক ঝলক তাকিয়ে মাথা নাড়ল।

"চলো!"

দু'জনে ঘোড়ার লাগাম শক্ত করে ধরে দ্রুত পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল।

আর তাদের পেছন দিয়ে শিস কেটে ছুটে চলল আরও কয়েকটি রহস্যময় তীর। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অনেকটা ওপরে উঠে এলো দু'জনে।

এখান থেকে নিচের পুরো জঙ্গল যেন হাতের তালুর মতো দেখা যায়। সাহাবাদের সৈন্যরা বহু বছর আগে পাহাড়ের চূড়ায় একটি ছোট্ট কাঠের বিশ্রামঘর নির্মাণ করেছিল। সীমান্ত পাহারা দেওয়ার সময় কিংবা দীর্ঘ অভিযানে ক্লান্ত সৈন্যরা এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিত।

কাঠের উঁচু টংঘরটি এখনো বেশ মজবুত। চারদিকে খোলা জানালা। ছাদে শুকনো খড়ের আবরণ। ভেতরে দুটি কাঠের বেঞ্চ আর একপাশে মাটির বড় কলস রাখা। মেহরাব ও আলীরাজ ভেতরে ঢুকল। দীর্ঘ দৌড়ে দু'জনেরই নিঃশ্বাস কিছুটা ভারী হয়ে উঠেছে। আলী কোমর থেকে পানির মশক খুলে একটানা কয়েক ঢোক পানি খেল। তারপর আরেকটি মশক মেহরাবের দিকে বাড়িয়ে দিল।

"নে, আগে পানি খা।"

মেহরাব মশক হাতে নিলেও চোখ তার বাইরে।

যেন পুরো জঙ্গলটা গিলে ফেলতে চাইছে। আলী বিরক্ত হয়ে বলল,

"এই যে শিকারি মহাশয়, হলো তো? খুব তো বলছিলে তোমার বাপের জঙ্গল। এখন কি হলো? আগন্তুক এর চুমু খেয়ে পাহাড়ে চড়তে হালো। আপা ঠিকই বলে। তোর বংশই ভালো না"

মেহরাব এবার এক চুমুক পানি খেল। কিন্তু চোখের ভাঁজ মিলল না। সে ধীরে ধীরে বলল

"মামা... ব্যাপারটা স্বাভাবিক না।"

"কোনটা?"

“যে তীরগুলো ছুটে এলো, একটাও তীরন্দাজকে আমি দেখতে পেলাম না।"

আলী কাঁধ ঝাঁকাল।

"জঙ্গল এটা। লুকানোর জায়গার অভাব নেই।"

মেহরাব মাথা নাড়ল। তার গলায় বিরল এক স্বীকারোক্তির সুর।

"আমার চোখ এড়িয়ে কেউ এভাবে আড়ালে থাকতে পারেনি আগে।"

সে জানালার ধারে এসে দাঁড়াল। কালো কাপড়ে এখনো তার মুখের নিচের অংশ ঢাকা। শুধু জ্বলন্ত দুটি চোখ চারদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। মনে মনে প্রশ্ন করল সে।

"এত দক্ষ তীরন্দাজ?"

পাহাড়ের এই উচ্চতা থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। নিচে রূপালি সাপের মতো বয়ে চলেছে পাহাড়ি ঝর্ণা। স্বচ্ছ জল পাথরে আঘাত করে সাদা ফেনা তুলছে। চারপাশে সবুজে মোড়া অরণ্য। দৃশ্যটা এতটাই মোহনীয় যে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই মন হারিয়ে যায়। হঠাৎ মেহরাবের তীক্ষ্ণ চোখ স্থির হয়ে গেল।

ঝর্ণার ঠিক সামনেই একটি অবয়ব। কালো পোশাকে আবৃত। দীর্ঘ ওড়না বাতাসে উড়ছে।

সে যেন পৃথিবীর সব চিন্তা ভুলে গেছে। দুই হাত প্রসারিত করে ঝর্ণার জলের ছিটায় গোল গোল ঘুরছে। মুহূর্তটুকু ছিল অদ্ভুত সুন্দর। কিন্তু পরক্ষণেই মেহরাবের ভ্রু কুঁচকে গেল।

কালো ওড়নার ফাঁক গলে বাতাসে ভেসে উঠল দীর্ঘ ঝলমলে সোনালি চুল। যেন গলিত সোনার মতো ঝিকমিক করছে। মেহরাবের চোখ সরু হয়ে এল। তার বুকের ভেতর হঠাৎই আগের ঘটনার স্মৃতি ফিরে এল।

"সোনালি চুল..."

আলী জানালার কাছে এসে তাকাল।

"কী দেখছিস?"

মেহরাব আঙুল তুলে নিচের দিকে দেখাল। আলীও অবয়বটা দেখতে পেল।

"একটা মেয়ে?"

মেহরাবের কণ্ঠ এবার আরও গম্ভীর।

"আমার ধারণা এই মেয়েটাই আগেও আমাদের ওপর আক্রমণ করেছিল।"

বাতাসে উড়ছে সেই সোনালি চুল। ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রহস্যময়ী যুবতী জানতেই পারছে না পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে এক শিকারির চোখ ইতোমধ্যেই তাকে লক্ষ্য করে ফেলেছে। আলী ঠোঁট কামড়ে এক হাতে নিজের চুল খামচে ধরলো

“ওরে শালাহ্। এ তো জব্বর জিনিস। যুবরাজ এর ওপর আক্রমণ করে ঝর্ণার সামনে নিশ্চিন্তে চরকি পাক খাচ্ছে?”

টংঘর থেকে বেরিয়েই দ্রুত পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল মেহরাব। তার পদক্ষেপে এক ধরনের তাড়াহুড়ো। মনে হচ্ছে, আর এক মুহূর্ত দেরি হলেই যেন শিকার হাতছাড়া হয়ে যাবে। আলী পেছন পেছন হাঁপাতে হাঁপাতে নামছে।

"আস্তে নাম! পাহাড়টা তোর বাপের না! লেগে যেতে পারে পাহাড়ের"

মেহরাব কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ নিচের ঝর্ণার দিকেই স্থির। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা ঝর্ণার কাছে পৌঁছে গেল। কিন্তু সেখানে কেউ নেই। কালো পোশাকের সেই মেয়েটি যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে। মেহরাব ঝর্ণার চারপাশে ভালো করে লক্ষ্য করল। পাথরের ওপর ভেজা পায়ের ক্ষীণ কিছু ছাপ। তারপর সেগুলোও মিলিয়ে গেছে। সে নিচু হয়ে মাটি স্পর্শ করল।

"বেশিক্ষণ আগে যায়নি।"

আলী চারদিকে তাকিয়ে বলল,

"তা হলে গেল কোথায়?"

কোনো উত্তর দিল না মেহরাব। ঝোপের আড়াল, পাথরের ফাঁক, সরু পথ সব জায়গায় খুঁজতে শুরু করল। যে মানুষ জঙ্গলে হরিণের পায়ের ছাপ দেখে তার গতিপথ বুঝে ফেলতে পারে, সেই মানুষটিও আজ যেন বিভ্রান্ত। প্রায় সারা টা বেলা ধরে পুরো এলাকা তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোনো সন্ধান মিলল না। মেহরাবের বিরক্তি এবার স্পষ্ট।

"অসম্ভব। এভাবে কেউ উধাও হতে পারে নাকি?”

আলী ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

"হয়তো জিন ছিল।"

মেহরাব এমন সময় ইয়ার্কি করার জন্য চোখ বড় বড় করে তাকালো। আলী গম্ভীর মুখ করে বলল,

"আচ্ছা ঠিক আছে, জিন না। পরি।"

মেহরাব এখনও তাকিয়ে আছে আলীর দিকে।

"না হলে বনপরি। সোনালি চুলও তো ছিল।"

মেহরাব কপালে হাত ঠেকাল।

"তুমি কি একটুখানি স্বাভাবিক হতে পারো না?"

আলী নির্বিকার।

"আমি তো খুবই স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক তুই। সকাল থেকে একটা সোনালি চুলওয়ালা মেয়ের পেছনে জঙ্গল চষে বেড়াচ্ছিস।"

মেহরাব দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

"চরিত্র টা ভালে করো। আমি তার রূপ দেখছি না।"

“তাহলে?"

"দেখছি তার তীরন্দাজি।"

আলী মুচকি হেসে বলল,

"হ্যাঁ হ্যাঁ, তীরন্দাজি। চোখে যা দেখলাম, তাতে তীরের চেয়ে চুলটাই বেশি দেখেছিস।"

মেহরাব এবার সত্যিই বিরক্ত হয়ে গেল।

"আর একটা কথা বললে তোমাকে এখানেই রেখে চলে যাব।"

আলী দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল।

"আচ্ছা, চুপ করলাম।"

চার-পাঁচ পা এগিয়েই আবার বলল,

"তবে বিয়ে করলে সোনালি চুলের বাচ্চা হবে নাকি?"

মেহরাব এবার এমন দৃষ্টি দিল যে আলী নিজের মুখ নিজেই চেপে ধরল।

"ঠিক আছে, আর একটা কথাও বলব না!"

**

বিকেলের রোদ পশ্চিমে হেলে পড়েছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও রহস্যময়ী সেই মেয়েটির কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না। মেহরাব একবার শেষবারের মতো চারদিকে তাকিয়ে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর বলল,

"আজ আর হবে না।"

আলী যেন বেঁচে গেল।

"আলহামদুলিল্লাহ! অবশেষে মানুষের মতো একটা কথা বলেছিস।"

মেহরাব ঘোড়ার লাগাম হাতে নিয়ে বলল,

"এখন আমিরাবাদ ফিরলে রাত অনেক হয়ে যাবে। আজকের রাতটা সাহাবাদ প্রাসাদেই থাকি। কাল সকালেই ফিরে যাব?"

আলী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।

"তাহলে অন্তত আজ গরম খাবার আর নরম বিছানা জুটবে।"

মেহরাব আর কোনো কথা বলল না। তার মনে তখনও ঘুরপাক খাচ্ছে কে সেই সোনালি চুলের মেয়ে? কেন সে আড়াল থেকে তীর ছুড়ল? আর মুহূর্তের মধ্যে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল? নাকি ডাকাত দলের সাথে কোনো যোগসূত্র আছে?”

দুই অশ্ব আবার ধীরে ধীরে জঙ্গলের পথ ধরে সাহাবাদ প্রাসাদের উদ্দেশে ছুটে চলল।

****

যে সোনালি চুলের মেয়েটিকে খুঁজে খুঁজেও পেল না মেহরাব, সে আর কেউ নয়। সাহারা। আজ ভোরেই সুযোগ বুঝে মহলের পেছনের ছোট্ট ফটক দিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল সে। শাখা ব্যস্ত।

জান্নাত হেঁশেলে। সুনেহেরা অন্য কাজে। এই সুযোগ হাতছাড়া করার মেয়ে সাহারা নয়।

তার বহুদিনের ইচ্ছে ছিল কাটাগিরির পাহাড়ি ঝর্ণাটা কাছ থেকে দেখবে। লোকমুখে শুনেছে, বর্ষার শেষে ঝর্ণাটা নাকি স্বর্গের টুকরোর মতো লাগে। সত্যিই তাই। ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে সে সব ভুলে গিয়েছিল। ঠান্ডা পানির ফোঁটা মুখে এসে পড়ায় যেন অমৃতের স্বাদ। দু'হাত মেলে শিশুর মতো ঘুরছিল সে। ঠিক তখনই চোখে পড়ে দুইজন অচেনা শিকারিকে। একজন ধনুক তাক করেছে নিরীহ হরিণটার দিকে। সাহারার মুখ সঙ্গে সঙ্গে গোমড়া হয়ে গেল। সে ছোটবেলা থেকেই প্রাণী হত্যা একদম সহ্য করতে পারে না। বিশেষ করে নিরীহ হরিণ। মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করল,

"এত বড় জঙ্গল পেয়েও বেচারা হরিণটার পেছনে লেগেছে!"

তার মেজাজ মুহূর্তেই বিগড়ে গেল। ধনুক তুলে একটানে তীর জুড়ে দিল। হরিণটাকে আঘাত করা তার উদ্দেশ্য ছিল না। শিকারির ধনুকটাই সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। মুহূর্ত পরেই ছুটে গেল তীর।

ঠিক গিয়ে আঘাত করল ওই শিকারির ধনুকে।

হরিণ প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেল।

সাহারা ঠোঁট কামড়ে মুচকি হাসল।

"হয়েছে! এবার শিকার করো দেখি!"

কিন্তু পরক্ষণেই বুঝল ব্যাপারটা বিগড়ে গেল। ওই শিকারির প্রতিক্রিয়া আর পাচটা সাধারণ শিকারির মতো নয়। সে মুহূর্তেই চারপাশ খুঁজতে শুরু করেছে। সাহারা দ্রুত আরেকটি তীর ছুড়ল।

শুধু তাদের ব্যস্ত রাখার জন্য। তারপর পাহাড়ি সরু গোপন পথ ধরে নিমেষের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। সেই পথের কথা সাহাবাদের মানুষ ছাড়া আর কেউ জানেই না। তাই মেহরাব যতই খুঁজুক, তাকে পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। সাহারা দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে মহলের দিকে ফিরছে। হঠাৎ তার মনে পড়তেই বুক ধক করে উঠল।

"হায় আল্লাহ!"

আজ তো তার বাবা জমিদার বাইজিদ শাহ আসার কথা! তিনি যদি এসে জানতে পারেন তার মেয়ে সারাদিন মহলে ছিল না তাহলে আর রক্ষা নেই।

মুখ কুঁচকে বলল,

"আজ তো আমার খবর আছে!"

প্রধান ফটক দিয়ে ঢোকার প্রশ্নই আসে না সেখানে প্রহরীরা আছে। কেউ না কেউ দেখে ফেলবেই। সাহারা তাই ঘোড়াটাকে মহলের পেছনের পরিচিত বটগাছের কাছে রেখে দিল। এটাকেও নষ্ট করে ফেলেছে। বেশ ইশারা বুঝে। ঠিল চলে যাবে গুটি গুটি করে আস্তাবলে। এক দৌড়ে পুরোনো প্রাচীরের কাছে গেল। চারদিকে একবার তাকাল। কেউ নেই। এক লাফে দেয়ালে উঠে পড়ল। সাবধানে ভারসাম্য রেখে ওপারে উঁকি দিল। আরেক লাফে মহলের ভেতরে নেমে এল। নেমেই হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। কান পেতে শুনল কোথাও কোনো শব্দ হয় কিনা।

না। দাসীরাও এদিকে নেই। সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

"আলহামদুলিল্লাহ..."

তারপর বিড়ালের মতো নিঃশব্দে এক লম্বা বারান্দা থেকে আরেক বারান্দা পেরিয়ে এগোতে লাগল। একবার থামে আবার উঁকি দেয়। আবার দৌড়। যদি সুনেহেরা একবারও দেখে ফেলেন তবে আজ আর রক্ষা নেই। শুধু বকুনি নয়, কয়েক দিনের জন্য কক্ষবন্দিও করে দিতে পারেন। অবশেষে অনেক কৌশলে নিজের কক্ষের দরজার সামনে পৌঁছে গেল। আস্তে করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। দরজা বন্ধ করে পিঠ ঠেকিয়ে বুক ভরে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।

"উফ্! বেঁচে গেলাম!"

মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। যাক শিকারী গুলো যা ভয়ানক ছিল। বেচে গেছে তাদের হাত থেকে।

সাহাবাদ প্রাসাদের প্রধান ফটকের সামনে একের পর এক অশ্বারোহী এসে থামল। প্রহরীরা সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সালাম জানাল। সামনের সাদা অশ্ব থেকে নেমে এলেন এক সুদর্শন, গম্ভীর ব্যক্তিত্বের পুরুষ। গায়ে রাজকীয় পোশাক, কাঁধে পশমের চাদর, সুঠাম দেহ, মুখভর্তি ছাঁটা দাড়ি আর কর্তৃত্বময় দৃষ্টি। তাকে দেখলেই বোঝা যায় তিনি কতটা ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন।

তিনি জমিদার বাইজিদ শাহ্। দীর্ঘ নয় মাস পর তিনি সাহাবাদে ফিরেছেন। এই দীর্ঘ সময় তিনি রাজ্যের বাইরে ছিলেন। কারণ, তাঁর স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে দূর রাজ্যে নিয়ে যেতে হয়েছিল। আজ অবশেষে স্ত্রীকে সুস্থ করে নিজের রাজ্যে ফিরেছেন।

প্রাসাদের ভেতরে খবর পৌঁছাতেই আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। দাস-দাসীরা ব্যাস্ত জমিদার কে স্বাগত জানানোর গোছগাছ করতে।

প্রাসাদের সামনের আঙিনায় এসে থামল আরও দুটি অশ্ব। একটিতে যুবরাজ মেহরাব। অন্যটিতে আলীরাজ। তাদের দেখে বাইজিদ শাহ্ নিজেই দ্রুত এগিয়ে এলেন। মেহরাবও সম্মানের সঙ্গে ঘোড়া থেকে নেমে সালাম জানাল। বাইজিদ দু'হাত বাড়িয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

"স্বাগতম, যুবরাজ।"

মেহরাবও আন্তরিক কণ্ঠে বলল,

"আপনার সঙ্গে আবার দেখা হলো, এটাই সৌভাগ্য।"

বাইজিদ হেসে তার কাঁধে হাত রাখলেন।

"সম্রাট হারুন ওয়াসেমের পুত্র আমার মহলে এসেছেন এ আমার জন্য গৌরবের বিষয়।"

চলমান…..

পাখিরা, কেমন হয়েছে জানিও হুমম 🥹🫶

পরবর্তী পর্ব পেতে পেইজে ফলো দিয়ে রাখো

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন