🚫ডার্ক রোমান্স🚫
#আমার_শুধু_তোকেই_লাগবে
লেখা: #রুদ্র_রায়_রূপায়ন
পর্ব সংখ্যা - ২৫
.
⚠️গল্প কপি করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ⚠️
মাঝরাতে এক বিভৎস স্বপ্ন দেখে চিৎকার করে উঠে বসে চিত্রা । ভয়ে তার শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে । গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় । আঁখি যুগল দিয়ে গাল গড়িয়ে গড়-গড় করে উষ্ণ অশ্রু কণারা গরিয়ে পরতে থাকে । অস্থিরতায় আর ভয়ে হাসফাস করতে-করতে হাঁপাতে থাকে চিত্রা । তার শ্বাস নিতে বড্ড কষ্ট হয় । বুকের মধ্যে কিছু অজানা ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠে তার ছোট্ট শরীরটা ৷
চিত্রা কোন রকমে হাত বাড়িয়ে বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দেয় । বেড টেবিলের উপরে রাখা পানির গ্লাসটা হাতে তুলে নিয়ে ঢকঢক করে পুরো পানিটা শেষ করে ।
বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে । কিন্তু পারে নাহ । তার চোখ থেকে পড়া অশ্রুরা কোনো বাঁধা মানে নাহ । মনের মধ্যে জেঁকে ধরে থাকা ভয়েরা তাকে ছাড়ে নাহ ।
শাওনকে নিয়ে এমন একটা ভয়ংকর স্বপ্ন দেখাতে ভয়ে সে একেবারে জড়সড় হয়ে যায় । প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয়ে হু-হু করে উঠে তার বুক । অস্থিরতা, ভয় আর কিছু চাপা যন্ত্রণা জেঁকে ধরে তার ছোট্ট নারী সুলভ কোমল শরীরটাকে ।
চিত্রা একহাতের তালু দিয়ে চোখ জোড়া মুছে আরেক হাত দিয়ে বিছানা হাতরিয়ে ফোনটা হাতে তুলে নেয় । ঘড়িতে তখন ১-টা বেজে ৫৭-মিনিট ।
চিত্রা কাঁপা-কাঁপা হাতে শাওনের নাম্বারে ডায়াল করে ।
প্রথমবার, দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার রিং হওয়ার পর শাওন কল তুলে । এতোরাতে চিত্রার কল দেখে সে কিছুটা অবাক হয় । তার চোখ মুখ কুচকে আসে । কপালে সুক্ষ চিন্তার ভাজ পরে ।
শাওন কলটা রিসিভ করে ঘুম জড়ানো গলায় ডেকে উঠে,
-ক’লিজা ! ”
ফোনের অপর পাশ থেকে শাওনের গলার আওয়াজ চিত্রার কানে ভেসে আসলে হু-হু করে কেঁদে উঠে চিত্রা । শাওনের গলার আওয়াজ শুনে সে আর নিজেকে কিছুতেই কন্ট্রোল করতে পারে নাহ । এতোক্ষণ নিরবে বাঁধ ভাঙ্গা অশ্রু কণারা এবার শব্দের সাথে গাল বেয়ে গড়িয়ে পরতে শুরু করে । আর্তনাদ করে কেঁদে উঠে চিত্রা ।
এতো রাতে চিত্রার এমন করুন স্বরে পাগলের মতো আর্তনাদ করা কান্নার আওয়াজ শুনে শাওন ভীষণ অবাক হয় । ভয়ে তার অন্তর আত্মা কেঁপে উঠে । চোখে মুখে লেগে থাকা ঘুমের রেশ কেটে গিয়ে বিস্ময় খেলে যায় পুরো মুখ জুড়ে । কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের কণা জড় হওয়া শুরু করে ৷
শাওন শুয়া থেকে উঠে বসে ।
অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করে,
-ক'লিজা কি হয়েছে তোর ? এতো রাতে কান্না করতেছিস কেন তুই ? ”
চিত্রার কান্না থামার পরিবর্তে দ্বিগুণ হয় । সে পাগলের মতো কেঁদেই যাচ্ছে । শাওনের কাছে বড্ড অসহায় শুনায় সেই কান্নার আওয়াজ ।
ফোনের অপর পাশ থেকে শাওন ব্যস্ত গলায় বলে উঠে,
-বল না ক’লিজা কি হয়েছে তোর ? শরীর খারাপ করেছে ? কোনো কারনে ভয় পেয়েছিস ? কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস ? প্লিজ বল কি হয়েছে ? ”
চিত্রা কান্নার মাঝে একটা ঢোক গিলে । ফুপিয়ে উঠে । কাঁপা-কাঁপা গলায় বলার চেষ্টা করে,
-আ..প.নি… ”
চিত্রা তার কথা শেষ করতে পারে নাহ । আবারও কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে । শাওন অস্থির গলায় বলে,
-ক’লিজা কান্না করিস নাহ প্লিজ ! আমাকে বল কি হয়েছে ? ”
চিত্রা কান্না জড়ানো আঁতকে উঠা গলাতেই কোনো মতে বলে উঠে,
-আ..প.নি আমাকে ছেড়ে যাবেন না প্লিজ । আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারবো না । আপনাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো নাহ । আপনার কিছু হলে আমি শেষ হয়ে যাবো । আপনি প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাবেন নাহ ! ”
চিত্রা শব্দ করে কেঁদে উঠে । শাওন আন্দাজ করতে পারে চিত্রা নিশ্চয়ই কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখেছে, যার কারণে এসব কথা বলতেছে ।
শাওন নিজেকে ধাতস্থ করে । আদুরে গলায় নরম স্বরে বলে,
-আমি কোথাও যাবো না সোনা । তোকে ছাড়া আমি কোথাও যাবো নাহ । তুই কান্না থামা একটু । চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা কর, দেখবি শাওন তোর কাছেই আছে । ”
চিত্রা কান্না করতে করতেই মৃদু চিৎকারের সাথে বলে উঠে,
-নাহহ ! আমি চোখ বন্ধ করবো নাহ । আমি একদম চোখ বন্ধ করবো নাহ । আমি চোখ বন্ধ করলেই আপনি হারিয়ে যাবেন । আমাকে একা রেখে অনেক দূরে চলে যাবেন । তখন আপনাকে আর আমার পাওয়া হবে না । আমি চোখ বন্ধ করবো না । আমি আপনাকে হারাতে চাই নাহ । একদম হারাতে চাই নাহ । ”
শাওন স্থির চোখে ফোনের দিকে তাকায় । ফোনের ওপাশ থেকে ভীষণ আদুরে গলায় বলে,
-তুই কান্না থামা ক’লিজা । আমি কোথাও হারাবো না । তোকে ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না সোনা । আমি সবসময় তোর সাথে থাকবো । তুই শুধু প্লিজ কান্না থামা । ”
চিত্রার কান্না থামার কোনো নাম নেই । সে পাগলের মতো নিজের মধ্যে কিছু বিরবির করে কান্না করেই চলেছে । আর অপর পাশ থেকে শাওন অসহায়ের মতো বারবার কিছু ব্যাথাতুর দীর্ঘশ্বাস ছাড়তেছে ।
চিত্রার কান্না আর তার একদম সহ্য হয় নাহ । বুকের মধ্যে খুব যন্ত্রণা হয় । অসহায় বোধ করে ।
শাওন অসহায় গলায় বলে উঠে,
-ক'লিজা ভিডিও কলে আয় । দেখ আমি তোর একেবারে সামনেই আছি । খুব কাছে । ”
শাওন কল কেটে রুমের লাইট জ্বালিয়ে চিত্রাকে ভিডিও কল করে । চিত্রা কল রিসিভ করলে- শাওনের ফোনের ডিসপ্লেটে চিত্রার কান্নায় লাল হয়ে যাওয়া ফোলা-ফোলা চোখ আর পাংশুটে মুখের ছবি ভেসে উঠে । যা দেখে শাওনের বুক ধুক করে উঠে । যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠে হৃদয় । মনে হচ্ছে কেউ হয়তো কোনো ধারালো অ’স্ত্র দিয়ে তার ভিতরে একের পর এক আঘাত চালাচ্ছে । যার যন্ত্রণা তাকে মৃ’ত্যুসম পীড়া দিচ্ছে।
অসহায় শাওন নির্বোধের মতো তাকিয়ে থাকে চিত্রার দিকে । তার মস্তিষ্কে এসে বাড়ি খায় কিছু অদৃশ্য ইচ্ছা । মনে হয়- এখনই যদি সে ছুটে গিয়ে তার প্রিয়সীকে বুকের মধ্যে শক্ত করে জরিয়ে ধরতে পারতো, তবে হয়তো একটু শান্তি মিলতো । স্বস্তি পেতো । বুকের মধ্যে হওয়া যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতো । কিন্তু সে নিরূপায় ।
অপরদিকে- চিত্রা নিজের ফোনের ডিসপ্লেটে শাওনকে দেখে চিৎকার করে কেঁদে উঠে । আগের থেকে তার কান্নার বেগ দ্বিগুণ হারে বেড়ে যায় । আর্তনাদ করে বলে উঠে,
-আপনি আসুন চৌধুরী সাহেব । আপনি আমার কাছে আসুন । আমি আপনাকে একটু ছুঁয়ে দেখতে চাই । আপনার বুকে মাথা রাখতে চাই । আপনি প্লিজ আসুন । ”
অসহায় শাওন এক আকাশসম অপারগতা আর যন্ত্রণা বুকের মধ্যে চেপে রেখে, প্রিয়তমাকে শান্তনার স্বরে বলে,
-যাবো তো ক'লিজা । সকাল হলেই আমি বেরিয়ে পড়বো । তুই শুধু আর একটু অপেক্ষা কর । কান্না থামিয়ে একটু ঘুমনোর চেষ্টা কর । আমি ততক্ষণ ফোনের মধ্যেই তোর দিকে তাকিয়ে থাকবো । তোর কাছে থাকবো ৷ আর সকালে তোর ঘুম ভাঙ্গলে চোখ খুলে তাকিয়ে দেখবি আমি চলে এসেছি তোর কাছে । তুই শুধু এখন কান্না থামিয়ে একটু ঘুমা জান । ”
শাওনের কোনো কথাই চিত্রা কানে তুলে নাহ । সে নিজের মতো আর্তনাদ করেই বলে চলে,
-আপনি এখনি আসুন । আপনাকে ছাড়া আর কিচ্ছু ভালো লাগতেছে নাহ । আমার ভীষণ ভয় লাগতেছে । কষ্ট হচ্ছে । দমবন্ধ হয়ে আসতেছে । মনে হচ্ছে এই বুঝি শ্বাস আঁটকে মা’রা যাবো । আর বুঝি কখনো আপনাকে সামনে থেকে দেখতে পাবো নাহ ! আপনাকে ছুঁতে পারবো নাহ ! আপনার বুকে মাথা রাখতে পারবো নাহ ! আপনাকে একটু শক্ত করে জরিয়ে ধরতে পারবো নাহ । আপনি আসুন । আপনি এখুনি আমার কাছে আসুন । প্লিজ আ..প…… ”
চিত্রা আর কিছু বলতে পারে নাহ । তার হাত থেকে ফোনটা পরে যায় । সে কান্না করতে করতে অজ্ঞান হয়ে বিছানার উপরে ঢলে পড়ে ।
অপর পাশে শাওনের ফোনের ডিসপ্লেটে চিত্রার মুখের ছবির বদলে, রুমের ফকফকা সাদা ছাঁদটা দৃশ্যমান হয় । হঠাৎ করে চিত্রার সারা শব্দ একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়াতে, শাওনের বুক কেঁপে উঠে । শরীরে ঘাম ছুটে যায় ।
ফোনের অপরপাশ থেকে শাওন চিৎকার করে ডেকে উঠে,
-চিত্রা…. ”
একবার, দুইবার, বারবার চিত্রাকে ডাকার পরেও চিত্রার কোনোরকম আওয়াজ না পাওয়াতে শাওনের শরীর কাঁপতে শুরু করে । তার গলা জরিয়ে আসে ৷ মুখ দিয়ে আর কোনো কথারা বের হয় না । তবুও সে বহুত কষ্টে উচ্চারণ করে,
-আমি আসছি ক'লিজা । আমি এখনি আসছি । তুই শুধু একটু অপেক্ষা কর সোনা । আমি এখুনি তোর কাছে চলে আসছি । ”
শাওন তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে উঠে দাড়ায় । আর শাহনাজ চৌধুরীর ফোনে কল দেয় । কয়েকবার রিং হওয়ার পর শাহনাজ চৌধুরী ফোন হাতে নেয় । এতো রাতে শাওনের নাম্বার থেকে কল এসেছে দেখে কিছুটা অবাক হয় । মনের মধ্যে নানানটা প্রশ্নের জন্ম নেয় ।
শাহনাজ চৌধুরী কল রিসিভ করতে গেলে ফোনটা কেটে যায় । সাথে সাথেই আবারও শব্দ করে বেজে উঠে । এবার তিনি সাথে সাথেই রিসিভ করেন । শাহনাজ চৌধুরী কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ব্যস্ত গলায় বলে উঠে শাওন,
-আম্মু তুমি এখনি চিত্রার কাছে যাও । চিত্রার অবস্থা খুব খারাপ আম্মু । তুমি প্লিজ এখনি তার কাছে যাও । ”
কথাগুলো বলতে বলতে শাওনের গলা ধরে আসে । শাহনাজ চৌধুরীর ঘুম কেটে যায় । তিনি বিছানা থেকে উঠে রুম থেকে বেরোতে বেরোতে অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করেন,
-কি হয়েছে চিত্রার ? আর তোর গলা এমন কেন শুনাচ্ছে আব্বু ? কি হয়েছে বল আমাকে? ”
শাওন জড়িয়ে আসা গলায় করুন স্বরে বলে,
-আম্মু চিত্রা মনে হয় কোন খারাপ স্বপ্ন দেখেছে । ও অনেক ভয় পেয়েছে আম্মু । অনেক কান্না করতেছে । আমার সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে ও একেবারে চুপ হয়ে গেছে । ওর আর কোনো আওয়াজ পাচ্ছিলাম না আমি আম্মু । আমার খুব টেনশন হচ্ছে । বুকের মধ্যে খুব বেশি যন্ত্রণা হচ্ছে আম্মু । তুমি প্লিজ তারাতাড়ি ওর কাছে যাও । আমি এখনি বাসায় আসতেছি আম্মু । খুব তারাতাড়ি বাসায় আসতেছি । ততক্ষণে তুমি একটু ওকে দেখে রেখো আম্মু । ”
শাহনাজ চৌধুরীকে আর কিছু বলতে না দিয়েই কল কেটে দেয় শাওন ।
শাহনাজ চৌধুরী এতো রাতে ছেলের এমন উন্মাদনা দেখে বেশ চিন্তিত হয়ে পরেন । সাথে কিছুটা ভয়ও পান । তিনি দ্রুতপায়ে এক প্রকার দৌড়াতে-দৌড়াতে চিত্রার রুমে যান । আর গিয়ে দেখেন মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে পরে আছে । যা দেখে শাহনাজ চৌধুরীর কলিজা কেঁপে উঠে । তিনি ভীষণ ভয় পেয়ে যান । দ্রুত পায়ে চিত্রার কাছে এগিয়ে গিয়ে চিত্রাকে ঠিকমতো বিছানায় উপর শুইয়ে দিয়ে চিত্রার চোখে মুখে পানির ছিটা দেন । চোখ তুলে ঠিকমতো চিত্রার মুখের দিকে তাকালে শাহনাজ চৌধুরীর চোখ জোড়া থেকে টুপ করে গড়িয়ে পরে দুফোঁটা তপ্ত অশ্রু । তিনি চিত্রার পাশে বসেন আর পরম যত্নে চিত্রাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জরিয়ে ধরেন ।
.
চার্টার ফ্লাইটের সাথে যোগাযোগ করে ইমিডিয়েটলি একটা প্রাইভেট জেট বুকিং করে শাওন । আর হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে যায় রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্য ।
শাওন যখন চৌধুরী ম্যানশনে পৌঁছায় তখন বাজে সাড়ে ৪-টা । রাজশাহী থেকে বাসায় পর্যন্ত আসতে তার প্রায় দুই ঘন্টার মতো সময় লাগে ।
শাওন চৌধুরী ম্যানশনের চৌকাঠ পেরিয়ে দ্রুত পায়ে নিজের রুমের দিকে অগ্রসর হয় । আর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পা জোড়া থমকে যায় শাওনের ।
শাহনাজ চৌধুরী চিত্রার পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে । শাওনকে রুমে আসতে দেখে তার দিকে তাকায় । ছেলেটা কেমন উন্মাদের মতো হয়ে আছে । এলোমেলো চুল, উসকো খুসকো দাঁড়ি, চোখ মুখ একেবারে পাংশুটে, গায়ের কাপড়ও ঠিক নেই ! মনে হয় যা পড়েছিল, যেভাবে ছিল, সেভাবেই চলে এসেছে । সবমিলিয়ে বলতে গেলে একেবারে একাকার অবস্থা ।
শাওন অসহায় চোখে শাহনাজ চৌধুরীর দিকে তাকায় । জিজ্ঞেস করে,
-ও এখন কেমন আছে আম্মু ? ”
শাহনাজ চৌধুরী ছেলের দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়,
-ভালো আছে আব্বু । কিছুক্ষণ হলো ঘুমিয়েছে মাত্র ! ”
শাওন একটা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে ।
শাহনাজ চৌধুরী ছেলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠে,
-তাড়াহুড়ো করে এতো রাতে কেন আসতে গেলি? সকালেই তো আসতে পারতি । ”
শাওন তার মায়ের দিকে শীতল চাহনিতে তাকায় । ধীর পায়ে চিত্রার একপাশে গিয়ে বসে । আর আলতো স্বরে শাহনাজ চৌধুরীর উদ্দেশ্য বলে,
-তুমি এখন রুমে গিয়ে রেস্ট নাও আম্মু । আমি আছি এখানে । ”
শাহনাজ চৌধুরী ছেলের মুখের দিকে তাকায় । তিনি হয়তো শাওনের ভেতরের অবস্থা কিছুটা আন্দাজ করতে পারেন । তাই তিনি আর কোনো রকম প্রশ্ন করেন না শাওনকে ।
শাহনাজ চৌধুরী একবার শাওনের মুখের দিকে তো একবার চিত্রার মুখের দিকে তাকিয়ে নীরবে রুম থেকে চলে যায় ।
শাওন অপলক দৃষ্টিতে চিত্রার দিকে তাকিয়ে থাকে । আলতো হাতে চিত্রার একহাত নিজের হাতের ভাঁজে নিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ায় । বিছানার মধ্যে হেলান দিয়ে বসে চিত্রাকে নিজের বুকের উপর তুলে নেয় । এতোক্ষণে তার যন্ত্রণায় হাহাকার করা বুকটার স্বস্তি মেলে । কপালে পড়া চিন্তার ভাজ গুলো স্বাভাবিক হয় । মন স্থির হয় । যন্ত্রণারা নরম হয় । বুক ভরে একটা শান্তির শ্বাস নেয় ।
শাওন গভীর ভাবে চিত্রার কপালে আর গালে চু'মু খায় । চিত্রা নড়েচড়ে উঠে । তার ঘুম আলগা হয়ে যায় । শাওন চিত্রার গালে একহাত রেখে আলতো স্বরে ডেকে উঠে,
-ক'লিজা দেখ আমি এসে গেছি । ”
চিত্রা চোখ পিটপিট করে খুলে তাকায় । আর চোখের সামনে শাওনকে দেখে, তাকে জরিয়ে ধরে আবারও কেঁদে উঠে ।
শাওন চিত্রাকে শক্ত করে জরিয়ে ধরে । মৃদু স্বরে বলে,
-আর একদম কান্না নয় ক'লিজা । এখন আমি এসে গেছি নাহ । তোকে একা রেখে আর কোথাও যাবো না । ”
চিত্রা শাওনের বুকে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে । শাওন চিত্রার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
-প্লিজ কান্না থামা সোনা । তোর কান্না আর একদম সহ্য হচ্ছে নাহ আমার ।
জানিস ফোনে যখন তোর কান্নার আওয়াজ শুনলাম, তখন আমার ঠিক কেমন লেগেছিল । নিজেকে কতটা অসহায় মনে হয়েছিল ৷ কতটা ভয় পেয়ে গেছিলাম আমি ! বুকটা ফেটে যাচ্ছিলো আমার । মনে হচ্ছিলো পারি তো তখনি তোর কাছে ছুটে আসে তোকে শক্ত করে জরিয়ে ধরি । বুকের ভেতর ভরিয়ে রাখি । ”
একটু থেমে শাওন অসহায় গলায় আবারও বলে,
-তোর কান্না আমার সহ্য হয় না ক’লিজা । তোর চোখে জল দেখলে আমার নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হয় । খুব বেশি যন্ত্রণা হয় । ভয় হয় । ”
চিত্রা শাওনের বুক থেকে মাথা তুলে চোখ ভর্তি জল নিয়ে শাওনের মুখের দিকে তাকায় । কিছুক্ষণ শাওনের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ক্ষীণ স্বরে বলে,
-চৌধুরী সাহেব, আপনি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেন নাহ তো ? ”
শাওন চিত্রার দুইগালে হাত রেখে চোখে মুখে প্রগাড় মায়া মিশিয়ে আশ্বাসের স্বরে বলে ,
-আমি তোকে ছেড়ে কোথাও যাবো না ক’লিজা । কখনো যাবো নাহ । এখন বল তো কি হয়েছে তোর? কেন ওভাবে কান্না করতেছিলি ? ”
চিত্রা শাওনের দিকে অসহায় আর ভয়ার্তক চোখ-মুখ নিয়ে তাকায় ৷ লম্বা একটা শ্বাস টেনে শাওনকে নিয়ে তার দেখা ভয়ানক স্বপ্নটার কথা জানায় ।
শাওন একটা মুচকি হাঁসি দেয় । চিত্রাকে নিজের সাথে জরিয়ে নিয়ে আলতো স্বরে বলে ,
-আমার বোকা বেগম ! ওটা তো একটা স্বপ্ন ছিল মাত্র । স্বপ্ন দেখে বুঝি কেউ এতোটা কান্না করে ? আর কখনো যদি সত্যি সত্যি তোর চোখের সামনে আমার এমন কিছু হয়, তখন তাহলে কি করবি তুই ? ”
চিত্রা শাওনকে শক্ত করে জরিয়ে ধরে মৃদু চিৎকার করে ক্রোধ নিয়ে বলে উঠে,
-নাহহহ ! আপনার কিচ্ছু হবে নাহ । আমি আপনার কিচ্ছু হতে দেবো না । আপনাকে আমি আর কোথাও যেতে দিব নাহ । কোথাও নাহ । ”
শাওন আলতো হেঁসে চিত্রার মাথায় হাত রাখে । নরম স্বরে বলে,
-আমি আর কোথাও যাবো না ক’লিজা । তোকে রেখে আর কোথাও যাব নাহ আমি ।”
একটু থেমে,
-আর তোকে রেখে যাবোই বা কোথায় বল? তুই তো আমার ক'লিজা ৷ আমার অস্তিত্ব । আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন । তোকে ছেড়ে কি আমি কোথাও যেতে পারি ?
ভালোবাসি যে । নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি তোকে আমি । এক পৃথিবী সমান ভালোবাসি তোকে ৷ তোকে ছাড়া আমার একমুহূর্তও চলে নাহ ক'লিজা । এই পাঁচ পাঁচটা দিন যে আমি কিভাবে পার করলাম তা একমাত্র আমিই জানি । ”
চিত্রা মাথা তুলে সরল চোখে শাওনের মুখের দিকে তাকায় । শাওন কপালে কপাল ঠেকিয়ে চিত্রার নাকের সাথে নিজের নাক ঘষে । মুচকি হেঁসে বলে,
-ভালোবাসি প্রিয় বেগম । খুব বেশি ভালোবাসি । ”
চিত্রা কোনো কিছু বলে না । তার কান্নারা থেমে গেছে । সে এখন চুপটি করে শাওনের বুকে গুটিশুটি হয়ে পরে আছে । মনে হচ্ছে এতোক্ষণ ধরে তার একমাত্র এটারই প্রয়োজন ছিল । এটারই অপেক্ষায় ছিল সে ।
চিত্রার মনে জেঁকে ধরা ভয়েরা আস্তে আস্তে কেটে যায় । সে বুক ভরে শ্বাস নেয় । আর পরম শান্তিতে শাওনের বুকে পরে থাকে । এটাই যেন তার একমাত্র শান্তির জায়গা ।
শাওন চিত্রার কপালে গভীর ভাবে চুম্বন একে দেয় । আর নিজের সাথে শক্ত করে জরিয়ে ধরে । কিছুক্ষণের মধ্যে চিত্রার চোখ বুঝে আসে । সে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় । শাওন চিত্রার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাঁসি দেয় । চিত্রার মুখে আসা চুল গুলো সরিয়ে দেয় ।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে চিত্রার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে । একটা সময় পর শাওনেরও চোখ জোড়া বুঝে আসে । আর সে চিত্রাকে নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে জরিয়ে রেখেই গভীর ঘুমে তলিয়ে পরে ।
.
চলবে…
⚠️গল্প কপি করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ⚠️
🚫🚫 গল্পটা শুধু প্রাপ্তবয়স্ক আর মুক্তমানদের জন্য উন্মুক্ত । গল্পে ধীরে ধীরে রোমান্টিকতার বিষয়টা একটু বেশি আর গভীর হবে । তাই যাদের এসব পচ্ছন্দ নয়, তারা দয়াকরে এড়িয়ে চলবেন। 🚫🚫
“রি-চেইক দেওয়া হয়নি ! ভুল গুলো ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন । ”