#মেঘের_ডানায়_রোদ
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্বঃ০৫
সময় এক অদ্ভুত জাদুকর। সে মানুষের ক্ষতগুলোকে সারিয়ে তোলে না, সে শুধু ক্ষতের ওপর একটা শক্ত চামড়ার আস্তরণ তৈরি করে দেয়, যাতে বাইরে থেকে রক্তপাত দেখা না যায়। তিস্তানির সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর পাঁচ-পাঁচটি বছর পেরিয়ে গেছে। বঙ্গোপসাগরের সেই নিম্নচাপটি কেটে গেছে অনেক আগেই, কিন্তু অয়নান্তের মনের ভেতরের নিম্নচাপটি কোনোদিন কাটেনি। সে এখন আর চারুকলার সেই উদাসীন ছাত্রটি নেই। সে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকার একটা নামী বিজ্ঞাপনী সংস্থায় বড় পদে চাকরি করছে। তার পরনে এখন আর মলিন ফতুয়া থাকে না, থাকে ইস্ত্রি করা দামী শার্ট।
ঢাকা শহরের মেঘলা রাত। অয়নান্ত তার ফ্ল্যাট বাড়ির বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে আছে। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নামার তোড়জোড় চলছে। ঠিক তখনই ঘর থেকে এক তরুণী এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা হাতে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। মেয়েটির নাম ‘অনন্যা’। দেখতে বেশ সুন্দরী, শান্তশিষ্ট সংসারী মেয়ে। অয়নান্তের মা-বাবা দেখে-শুনে ধুমধাম করে অনন্যার সাথে তার বিয়ে দিয়েছেন বছরখানেক আগে। অনন্যা চায়ের কাপটা অয়নান্তের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলল, "কী ভাবছ এত মন দিয়ে? আকাশে মেঘ দেখলেই তোমার কেমন যেন একটা ঘোর লেগে যায়।" অয়নান্ত চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে অনন্যার দিকে তাকিয়ে হাসল। সে অনন্যার হাতটা আলতো করে নিজের হাতের মুঠোয় নিল। অনন্যা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। জীবন তো আসলেই থেমে থাকে না। অয়নান্ত এখন অনন্যাকে ভালোবাসে, তার যত্ন নেয়, প্রতি ঈদে তাকে শাড়ি কিনে দেয়। মানুষ তো জীবনে বারবার প্রেমে পড়তেই পারে। অনন্যা তার জীবনে এসেছে নিয়মের পরিপূরক হিসেবে, সংসারের এক পরম শান্তি হিসেবে। কিন্তু অনন্যা যখন ঘরে ফিরে গেল, অয়নান্ত তখন তার পকেট থেকে একটা জিনিস বের করল। একটা ছোট, কাঁচের বোতলের লকেট, যার ভেতরে কিছুটা বালুকণা পোরা রয়েছে। তিস্তানি যেদিন সমুদ্রে হারিয়ে যায়, তার পরদিন অয়নান্ত তার হোটেল রুমের টেবিলের ওপর এই লকেটটা খুঁজে পেয়েছিল। তিস্তানি এটা তার জন্যই রেখে গিয়েছিল হয়তো। অয়নান্ত লকেটটার দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরে তখন ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামল। অয়নান্তের মনে মনে খুব ভালো করেই জানা আছে, সে অনন্যার সাথে সংসার করবে, বুড়ো হবে, তাদের সন্তানও হবে। কারণ জীবন নিয়মে চলে। কিন্তু সেন্টমার্টিনের সেই ধূসর কেয়া বন, প্রবালের কান্না, আর ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ‘তিস্তানি’ নামের মেয়েটির যে মায়াটুকু তার বুকের ভেতর স্থায়ী জলছাপের মতো বসে গেছে তার সেই কমতি, তার সেই শূন্যস্থান পৃথিবীর কোনো কিছু দিয়েই কোনোদিন দূর হবে না।
মানুষ প্রেমে পড়ে বারবার, নিয়মের খাতিরে হাত ধরে অনেকের কিন্তু মায়ায় পড়ে কেবল একবারই। আর অয়নান্তের সেই একমাত্র মায়াটুকু চিরকালের জন্য জমা হয়ে রইল সেন্টমার্টিনের নোনা জলের অতল গহ্বরে, মেঘের ডানায় লেগে থাকা এক চিলতে রোদের মতো।
জগতে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হলো মৃত্যুর পর বেঁচে থাকা। মানুষ যখন তার চোখের সামনে কাউকে চিরতরে হারিয়ে যেতে দেখে, তখন প্রথম কয়েক মুহূর্ত তার মনে হয় সময়টা হয়তো এখানেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। হৃদপিণ্ডের ধকধকানি থেমে গেছে, চারপাশের বাতাস জমে বরফ হয়ে গেছে, আর একটু পরেই আকাশটা ভেঙে চুরমার হয়ে মাথার ওপর পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই হয় না। আকাশ তার নিজের নীল রং নিয়েই স্থির থাকে, চারপাশের মানুষজন যার যার প্রয়োজনে ছুটে বেড়ায়, আর বেঁচে থাকা মানুষটিকেও নিয়ম করে শ্বাস নিতে হয়, তৃষ্ণা পেলে পানি খেতে হয়, খিদের টানে ভাতের থালার সামনে গিয়ে বসতে হয়। প্রকৃতির এই উদাসীনতা বড় নিষ্ঠুর, বড় বেশি নির্মম। সে কারো ব্যক্তিগত শোকের জন্য নিজের চাকা এক সেকেন্ডের জন্যও থামায় না। তিস্তানি সাগরের উত্তাল তরঙ্গে বিলীন হয়ে যাওয়ার পর সেন্টমার্টিন দ্বীপের জেটি ঘাটে যে প্রলয় ঘটেছিল, তার কোনো স্পষ্ট জ্যামিতিক নকশা অয়নান্তের মাথায় ছিল না। তার শুধু আবছা মনে পড়ে, এক জোড়া শক্ত, কালো এবং খসখসে হাত তাকে পেছন থেকে জাপটে ধরে রেখেছিল। সে ছটফট করছিল, চিৎকার করছিল, নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে সেই বাঁধন ছিঁড়ে সমুদ্রের নোনা জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছিল। কিন্তু তার সেই কণ্ঠস্বর সমুদ্রের রাক্ষুসে গর্জনের কাছে ছিল এক নগণ্য মশার গুঞ্জনের মতো। শিশুটি বেঁচে গিয়েছিল। দ্বীপের জেলেরা তাকে জল থেকে টেনে তুলে যখন তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিল, তখন সেই মায়ের আনন্দের চিৎকারে সেন্টমার্টিনের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। আর ঠিক তার কয়েক গজ দূরে, জেটির কাঠের পাটাতনে বসে অন্ধের মতো সাগরের নোনা জলের দিকে তাকিয়ে ছিল অয়নান্ত। সাগর তখনো ফুঁসছে, বড় বড় কালো ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে উপকূলে, কিন্তু সেখানে সাদা শাড়ির কোনো চিহ্ন আর ছিল না। নিম্নচাপের সেই ভয়াবহ দুর্যোগের কারণে টেকনাফগামী শেষ জাহাজটি আর ঘাট ছাড়তে পারেনি। প্রশাসন থেকে সমস্ত জলযান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অয়নান্তকে সেই প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের রাতে দ্বীপে আটকে থাকতে হলো। দ্বীপের একমাত্র ডাকবাংলোর একটা ঘরে যখন সে এসে বসল, তখন তার শরীর থেকে নোনা জল টপটপ করে মেঝেতে ঝরে পড়ছে। পুলিশ এলো, কোস্টগার্ডের লোকজন এলো। একটা অজ্ঞাতপরিচয় মেয়ে উত্তাল সাগরে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ হয়েছে এই খবর দ্বীপে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। অয়নান্তকে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। সে মেয়েটির কী হয়? নাম কী? বাড়ি কোথায়? অয়নান্তের কাছে কোনো উত্তর ছিল না। সে শুধু বলতে পারল, মেয়েটির নাম তিস্তানি। সে ঢাকা থেকে একা এসেছে। এর বাইরে সে আর কিছুই জানে না। তদন্তকারী কর্মকর্তা সন্দেহী চোখে অয়নান্তের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, "একটা মেয়ের সাথে তিন দিন ঘুরলেন, অথচ তার ঠিকানা জানেন না, বংশপরিচয় জানেন না? এটা কেমন কথা, ভাই সাহেব? আজকালকার তরুণ-তরুণীদের জীবনটা কি এতই সস্তা? নাকি আপনারা কোনো ঝামেলা লুকাচ্ছেন?"
অয়নান্ত কোনো উত্তর দেয়নি। সে চারুকলার ছাত্র, সে রঙের গভীরতা বোঝে, মানুষের তৈরি আইনের জটিলতা বোঝে না। সে শুধু বুঝছিল, তার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে এক ধূসর মরুভূমি হয়ে গেছে। পুলিশ তার ব্যাগ তল্লাশি করল, তার চারকোল পেনসিল আর স্কেচবুকগুলো ওলটপালট করে দেখল। সেখানে তিস্তানির অবয়ব ছাড়া আর কোনো অপরাধের প্রমাণ ছিল না। অবশেষে তারা অয়নান্তকে ছেড়ে দিল, তবে দ্বীপে থাকা পর্যন্ত নজরদারিতে রাখল। পরদিন সকালে ঝড় থামল। সেন্টমার্টিনের আকাশ আবার তার চেনা কাঁচের মতো স্বচ্ছ নীল রূপ ধারণ করল। রোদ উঠল প্রবাল পাথরের ওপর, যেন গত রাতে এখানে কোনো মৃত্যুই ঘটেনি। কোস্টগার্ডের স্পিডবোটগুলো সাগরে চক্কর কাটল বেশ কয়েকবার, জেলেরা তাদের জাল ফেলে খুঁজল, কিন্তু তিস্তানির কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। সমুদ্র যাকে একবার নিজের অতলে টেনে নেয়, তাকে সে সহজে ফেরত দেয় না। তিস্তানি যেন সেই প্রবাল দ্বীপের এক টুকরো কুয়াশা ছিল, যা রোদের আলোয় মিলিয়ে গেছে।
দুপুরের দিকে অয়নান্ত তিস্তানির সেই ছোট হোটেল রুমটায় গেল। ম্যানেজার চাবি দিয়ে দরজা খুলে দিতেই এক স্যাঁতস্যাঁতে, লোনা গন্ধ অয়নান্তের নাকে এসে লাগল। ঘরটা একদম গোছানো। বিছানার চাদরে কোনো ভাঁজ নেই। ঘরের কোণায় একটা ছোট কাঠের টেবিল, তার ওপর পড়ে আছে একটা নীল রঙের ডায়েরি আর তিস্তানির সেই গলার লকেটটি, বালিভর্তি ছোট কাঁচের বোতল। তিস্তানি যাওয়ার আগে লকেটটা টেবিলের ওপর রেখে গিয়েছিল। সে হয়তো জানত, সে আর ফিরে আসবে না। সে তার মায়ার শেষ চিহ্নটুকু এই দ্বীপে, অয়নান্তের জন্য রেখে গেছে। অয়নান্ত কাঁপতে থাকা হাতে লকেটটা তুলে নিল। বোতলের ভেতরের সাদা বালির কণাগুলো জানলা দিয়ে আসা সূর্যের আলোয় সামান্য ঝিলমিল করে উঠল। সে ডায়েরিটা খুলল। পাতাগুলো একদম সাদা, কোনো লেখা নেই। শুধু প্রথম পাতায় চারকোল পেনসিল দিয়ে একটা ছোট লাইন লেখা, “মানুষ প্রেমে পড়ে বারবার, কিন্তু মায়ায় পড়ে একবারই।”লেখাটা তিস্তানির নয়, লেখাটা অয়নান্তের নিজের হাতের। গতকাল ছেঁড়া দ্বীপে বসে সে যখন তিস্তানির স্কেচ করছিল, তখন তিস্তানি নিজেই তার পেনসিলটা কেড়ে নিয়ে এই ডায়েরির পাতায় লাইনটা লিখে দিতে বলেছিল। অয়নান্ত ডায়েরিটা আর লকেটটা নিজের ঝোলা ব্যাগে পুরে নিল। তার মনে হলো, সে তিস্তানির শরীরটাকে না পেলেও, তার আত্মার এক প্রকাণ্ড অংশ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। এই বোঝা তাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।
বিকেলের জাহাজে অয়নান্ত যখন টেকনাফের উদ্দেশ্যে রওনা দিল, তখন জাহাজটির ডেকের সেই রেলিংটা একই রকম জং ধরা ছিল। নাফ নদীর জল তখনো ঘোলা ছিল। কিন্তু অয়নান্তের দেখার চোখটা বদলে গিয়েছিল। সে জাহাজের পেছনে তাকিয়ে দেখল, সেন্টমার্টিন দ্বীপটি আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছে। নারকেল গাছের সারিগুলো ধূসর বিন্দুর মতো মিলিয়ে যাচ্ছে। আকাশের এক কোণায় একটা শঙ্খচিল একা ডানা ঝাপটে উড়ে বেড়াচ্ছিল। অয়নান্তের মনে হলো, ওই শঙ্খচিলটা আসলে তিস্তানি। সে তার অতীতের খাঁচা থেকে মুক্ত হয়ে এখন অনন্ত সমুদ্রের আকাশে ডানা মেলেছে। কিন্তু সে অয়নান্তকে এক অদৃশ্য শিকলে বেঁধে দিয়ে গেছে।
ঢাকা ফিরে আসার পর অয়নান্তের জীবনটা এক থমকে যাওয়া জলাশয়ের মতো হয়ে গেল। চারুকলার ফাইনাল ইয়ারের ক্লাস শুরু হলো। বন্ধুরা তাকে ঘিরে ধরল, "কী রে অয়নান্ত? সেন্টমার্টিন থেকে কী নিয়ে এলি? কোনো নতুন ল্যান্ডস্কেপ? কোনো ওয়াটার কালার? তোর চেহারা এমন শুষ্ক দেখাচ্ছে কেন?"
অয়নান্ত মলিন হাসল। সে তার স্কেচবুকগুলো কাউকে দেখাল না। সে চারুকলার স্টুডিওর এক কোণায় ইজেল খাড়া করে দিনরাত শুধু স্কেচ করতে লাগল। কিন্তু তার চারকোল পেনসিল এখন আর কোনো ফুল, পাখি বা মানুষের স্বাভাবিক মুখ আঁকতে পারছিল না। সে যা-ই আঁকতে যেত, কাগজের বুকে ফুটে উঠত একটা উত্তাল সমুদ্রের কালো ঢেউ, কিছু ধারালো প্রবাল পাথর, আর সেই ঢেউয়ের মাঝে তলিয়ে যাওয়া একটা মেয়ের অস্পষ্ট অবয়ব। তার ডিপ্লোমা প্রজেক্টের থিম ছিল,'নোনা জল'। চারুকলার শিক্ষকরা অয়নান্তের সেই কাজগুলো দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। একজন প্রবীণ অধ্যাপক অয়নান্তের পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন, "তোমার এই কাজের মধ্যে এক অদ্ভুত শক্তি আছে, অয়নান্ত। কিন্তু এই শক্তির উৎসটা বড় বেশি বিষাদময়। তুমি এত অল্প বয়সে এত অন্ধকার কোথায় পেলে? তোমার ছবির দিকে তাকালে মনে হয়, ক্যানভাসের পেছন থেকে কেউ একজন যন্ত্রণায় চিৎকার করছে। তুমি কি কোনো ট্রাজেডির মধ্য দিয়ে গেছ?"
অয়নান্ত কোনো উত্তর দেয়নি। সে মনে মনে ভাবল, স্যার, এই অন্ধকার আমার নিজের নয়। এই অন্ধকার বঙ্গোপসাগরের তলদেশ থেকে উঠে আসা এক অন্তহীন মায়ার অন্ধকার। রাত বাড়লে অয়নান্ত তার মেসের ছোট ঘরটায় একা বসে থাকত। ঢাকা শহরের রাতের কোলাহল, মেসের ছেলেদের হইচই, রাস্তায় রিকশার টুংটাং শব্দ তার কান পর্যন্ত পৌঁছাত না। সে কান পাতলে শুধু শুনতে পেত সেন্টমার্টিনের সেই জেনারেটর বন্ধ হওয়ার পর নেমে আসা আদিম অন্ধকার আর সমুদ্রের অবিরাম গর্জন। সে তার ঝোলা ব্যাগ থেকে তিস্তানির সেই বালিভর্তি লকেটটা বের করে হাতের তালুতে রাখত। হুমায়ূন আহমেদের কোনো একটা উপন্যাসে একটা কথা ছিল, “কিছু কিছু মানুষ খুব অল্প সময়ের জন্য আমাদের জীবনে আসে, কিন্তু তারা যখন চলে যায়, তখন আমাদের পুরো জীবনটাই বদলে দিয়ে যায়।” তিস্তানিও তার জীবনে এসেছিল মাত্র তিন দিনের জন্য। তিন দিন একটা মানুষের জীবনের দৈর্ঘ্যর তুলনায় কতটুকুই বা সময়? একটা তুড়ি মারলেই তিন দিন কেটে যায়। অথচ এই তিন দিন অয়নান্তের ভেতরের সমস্ত লজিক, সমস্ত জ্যামিতিক ভারসাম্যকে এক ধাক্কায় ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। সে নিজেকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করত। সে যুক্তির আশ্রয় নিত। সে ভাবত তিস্তানি নামের মেয়েটা আসলে কে ছিল? সে তো তার কোনো আত্মীয় ছিল না, কোনো পুরনো বন্ধু ছিল না, এমনকি তার কোনো অতীতও সে জানত না। তবে কেন তার চলে যাওয়াতে অয়নান্তের বুকের ভেতর এত বড় একটা শূন্যতা তৈরি হলো? মানুষ কি তবে চেনা পরিচয়ের বাইরেও অন্য কোনো আত্মিক বন্ধনে জড়াতে পারে? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর অয়নান্তের জানা ছিল না। সে শুধু বুঝতে পারছিল, সে এক ভয়াবহ মায়ার জালে জড়িয়ে গেছে। তিস্তানি ঠিকই বলেছিল, প্রেম হলো চৈত্র মাসের দুপুরের এক পশলা বৃষ্টি, যা আসে আর চলে যায়। কিন্তু মায়া হলো শীতের সকালের কুয়াশা, যা চারপাশটাকে চেপে ধরে। অয়নান্তের মনটাও এখন সেই কুয়াশায় ঢাকা পড়ে গেছে। সে তার চারপাশের বন্ধুদের দেখত। তারা প্রেমে পড়ছে, ব্রেকআপ হচ্ছে, আবার নতুন কারো হাত ধরে রিকশায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। জীবন কত সহজ, কত চঞ্চল! কিন্তু অয়নান্তের জীবনের সেই চঞ্চলতা চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল। সে বুঝতে পারল, সে আর কোনোদিন কোনো সাধারণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে চট করে প্রেমে পড়তে পারবে না। কারণ তার মনের ক্যানভাসে তিস্তানি নামের সেই মেয়েটি তার মায়ার এক স্থায়ী জলছাপ রেখে গেছে, যা মোছার কোনো ইরেজার এই পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি।
ধীরে ধীরে চারুকলার দিনগুলো শেষ হয়ে এলো। অয়নান্তের সহপাঠীরা যখন গ্যালারিতে নিজেদের চিত্র প্রদর্শনী নিয়ে ব্যস্ত, তখন অয়নান্তের ক্যানভাসগুলো ঘরের কোণায় ধুলো জমাতে লাগল। সে আর ছবি আঁকে না। পেনসিল ধরলেই তার হাত কাঁপে, মনে হয় প্রবাল পাথরের তীক্ষ্ণ কোণাগুলো তার আঙুলে ফুটছে। সে নিজেকে স্বাভাবিক করার জন্য এক বহুজাতিক বিজ্ঞাপনী সংস্থায় 'ভিজ্যুয়ালাইজার' হিসেবে চাকরি নিল। চাকরি পাওয়ার পর তার দৈনন্দিন রুটিন বদলে গেল। এখন আর মটকার ফতুয়া বা জিন্স পরা খেয়ালী অয়নান্তকে দেখা যায় না। তার পরনে থাকে ইস্ত্রি করা দামী ফরমাল শার্ট, পায়ে পালিশ করা জুতো। সে সকাল নয়টায় কাওরানবাজারের অফিসে যায়, ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সাবান, শ্যাম্পু আর রিয়েল এস্টেটের চটকদার বিজ্ঞাপন বানায়। ক্লায়েন্টদের সাথে মিটিং করে, বাজেটের হিসাব মেলায়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, সে এক সফল, বাস্তববাদী তরুণ।
তার বন্ধুরা আড্ডায় বলত, "অয়নান্ত শেষ পর্যন্ত কর্পোরেট দুনিয়ার টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেল। চারুকলার একজন বড় শিল্পী মরে গেল।"
অয়নান্ত তাদের কথা শুনে ডেস্কে বসে কফির মগে চুমুক দিত আর হাসত। সে মনে মনে বলত শিল্পী তো অনেক আগেই মরে গেছে, সেন্টমার্টিনের সেই জেটি ঘাটে, তিন নম্বর সতর্ক সংকেতের ঝড়ের রাতে। এখন যে বেঁচে আছে, সে কেবল একটা সামাজিক রোবট, যে পৃথিবীর নিয়ম মেনে নিখুঁত অভিনয় করে চলেছে।
অয়নান্তের এই নিঃশব্দতা, এই একাকীত্ব তার মা-বাবার চোখ এড়ায়নি। সিলেটে থাকা তার বৃদ্ধ মা প্রায়ই ফোনে কাঁদতেন, "বাবা অয়নান্ত, তুই এত চুপচাপ হয়ে গেলি কেন? তোর ঘরের আলো কেন মাঝরাত পর্যন্ত জ্বলে থাকে? তুই কি কিছু লুকাচ্ছিস আমাদের কাছে?" অয়নান্ত মাকে শান্ত করত, বলত অফিসের কাজের খুব চাপ। কিন্তু মা তো মা-ই হন, তারা সন্তানের ভেতরের খাঁ খাঁ রোদটা ঠিকই টের পান। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, ছেলেকে আর একা রাখা যাবে না। সংসারী হলে মানুষের মনের সব পাগলামি, সব কাল্পনিক ভূত মাথা থেকে নেমে যায়। তারা অয়নান্তের জন্য মেয়ে দেখতে শুরু করলেন। অয়নান্ত কোনো আপত্তি করল না। সে কোনো জেদ ধরল না যে সে বিয়ে করবে না। কারণ সে জানে, এই সমাজে নিজেকে স্বাভাবিক প্রমাণ করার সবচেয়ে বড় উপায় হলো সংসারী হওয়া। সে যদি বিয়ে না করে একা থাকে, তবে সমাজ তাকে নানা প্রশ্নে জর্জরিত করবে, তার মা-বাবা কষ্ট পাবেন। তার চেয়ে মা-বাবার পছন্দের যেকোনো একটা মেয়েকে ঘরে নিয়ে আসা অনেক সহজ। হারিয়ে যাওয়া মানুষ চলে যাওয়ার পরও, তার জায়গায় অন্য কাউকে এসে বসতেই হয়। এটাই পৃথিবীর নিয়ম, এটাই প্রকৃতির বাস্তবসম্মত ব্যাকরণ। সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে অয়নান্তের গাড়িটা যখন শাহবাগের জ্যামে আটকে ছিল, তখন জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সে দেখল ফুটপাতে এক ঝাঁক চড়ুই পাখি উড়ছে। তার হঠাৎ তিস্তানির কথা মনে পড়ল। তিস্তানি বলেছিল, “মানুষ মায়ায় পড়ে একবারই।” অয়নান্ত তার পকেটে হাত দিয়ে লকেটটা স্পর্শ করল। সে বুঝতে পারল, সে এক দীর্ঘ অভিনয়ের মঞ্চে নামতে যাচ্ছে। যেখানে সে একজন ভালো স্বামী হবে, হয়তো ভালো বাবাও হবে। জীবন তার নিজস্ব গতিতে নদীটির মতোই এগিয়ে যাবে। কিন্তু তার ভেতরের সেই সেন্টমার্টিনের নীল জলের শূন্যতা, সেই তিস্তানি নামের মেয়েটির কমতি তা এই জীবনে আর কোনোদিন, কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হবে না। সে নিয়মের হাত ধরবে ঠিকই, কিন্তু তার মনটা আজীবন সেই ছেঁড়া দ্বীপের শেষ সীমানাতেই আটকে থাকবে।