মায়াবন্ধন
পঞ্চম পর্ব — অদ্ভুত কাছাকাছি
সকালের আলো ধীরে ধীরে ঢাকার ব্যস্ত শহরটাকে জাগিয়ে তুললেও ইরায়া নওশীনের ঘুম ভাঙার কোনো ইচ্ছা ছিল না। তার কাছে সকাল মানেই পৃথিবীর সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় একটি সময়। বিশেষ করে যখন আগের রাতটা সে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি। অবশ্য ঘুম না হওয়ার কারণ নিয়ে সে নিজেও খুব একটা ভাবতে চাইছিল না। বিছানায় শুয়ে বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল একটি বিরক্তিকর মুখ, কঠিন দুটি চোখ আর ঠান্ডা গলায় বলা কিছু কথা। আরিশ ইশতিয়াক। লোকটার নামটা মনে পড়তেই ইরায়া বিরক্ত হয়ে বালিশটা মাথার ওপর চেপে ধরল। পৃথিবীতে এত মানুষ থাকতে কেন বারবার এই অশুভ লোকটার সঙ্গেই তার দেখা হচ্ছে? প্রথম দিন রাস্তার মাঝে, তারপর অনুষ্ঠানে, তারপর আবার এমন কিছু পরিস্থিতি যেখানে সে চাইলেও মানুষটাকে উপেক্ষা করতে পারেনি। ইরায়া নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করল যে এসব নিছক কাকতালীয় ঘটনা। ঢাকা শহর ছোট নয়, মানুষও কম নয়। একই মানুষের সঙ্গে দু-একবার দেখা হয়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু তার ভেতরের অন্য একটি কণ্ঠস্বর যেন বলছিল, ব্যাপারটা এতটা সাধারণ নয়।
অবশেষে মায়ের কয়েকবার ডাকার পর ইরায়া বিছানা ছেড়ে উঠল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করতে করতে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে সে নিচু গলায় বলল, “আজকে কোনো ঝামেলা চাই না। কোনো রকেটচালক চাই না। কোনো বিস্ট চাই না। শান্তিতে একটা দিন কাটাতে চাই।” নিজের কথায় নিজেই মাথা নাড়ল সে। কিন্তু ভাগ্য যেন তার এই সিদ্ধান্ত শুনে কোথাও বসে হাসছিল।
নাশতার টেবিলে বসে ইরায়া অস্বাভাবিক চুপচাপ ছিল। তার মা কয়েকবার তাকিয়ে অবশেষে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে? আজ এত শান্ত কেন?”
ইরায়া মুখ তুলে তাকাল। “আমি কি সবসময় খুব বেশি কথা বলি?”
তার মা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন, “সত্যিটা শুনতে চাস?”
ইরায়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। “না, দরকার নেই।”
পাশ থেকে পরিবারের অন্য একজন হেসে উঠতেই ইরায়া বিরক্ত মুখে খাবারের দিকে তাকাল। ঠিক তখনই তার মোবাইল বেজে উঠল। স্ক্রিনে মিহির নাম দেখে সে ফোনটা হাতে নিল। ওপাশ থেকে স্বাভাবিক কোনো শুভেচ্ছা নয়, বরং শুরুতেই তাড়াহুড়োর গলা ভেসে এল। মিহি কোথাও যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে বলছিল। ইরায়া প্রথমে রাজি হয়নি। তার বাইরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু মিহির অনুরোধ, জোরাজুরি এবং শেষ পর্যন্ত খাবারের প্রলোভনে সে আবারও রাজি হয়ে গেল। খাবারের ব্যাপারে ইরায়ার দুর্বলতা নিয়ে মিহির কোনো সন্দেহ ছিল না।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর দুজন শহরের একটি পরিচিত ক্যাফের সামনে এসে পৌঁছাল। পরিবেশটা শান্ত, চারপাশে কাচের দেয়াল আর নরম আলো। ইরায়া বসতে না বসতেই মেনু হাতে নিয়ে এমন মনোযোগ দিয়ে খাবার দেখতে শুরু করল যেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে এসেছে। মিহি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “তোর জীবনে কোনোদিন প্রেমিক এলে মনে হয় খাবারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে।”
ইরায়া নির্বিকার গলায় বলল, “যে খাবারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জিততে পারবে, তাকেই বিবেচনা করা হবে।”
মিহি মাথা নাড়ল। “তোর বিয়ে হবে না।”
“আমার বিয়ে নিয়ে তোর এত চিন্তা কেন?”
“কারণ তুই কোনো মানুষকে সহ্য করতে পারবি না।”
ইরায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “মানুষ সহ্য করা যায়। কিছু কিছু প্রাণী যায় না।”
মিহি সন্দেহের চোখে তাকালেও আর কিছু বলল না। কারণ সে জানত ইরায়া কাকে ইঙ্গিত করছে। গত কয়েকদিনে আরিশ ইশতিয়াক নামের মানুষটির কথা না বলার চেষ্টা করেও ইরায়া কমপক্ষে পনেরোবার তার প্রসঙ্গ তুলেছে। মিহির কাছে বিষয়টা যথেষ্ট মজার ছিল। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল, ইরায়া নিজেও এখনো জানে না কেন একজন সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ এত সহজে তার চিন্তার মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছে।
ক্যাফের দরজা খুলে কয়েকজন মানুষ ভেতরে ঢুকতেই ইরায়ার দৃষ্টি সেদিকে গেল। প্রথমে সে খুব একটা গুরুত্ব দিল না। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার হাতের চামচটা থেমে গেল। মুখের ভাব এমন হয়ে গেল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অপছন্দের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তার সামনে এসে পড়েছে।
কালো শার্ট পরে ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকছে আরিশ।
তার সঙ্গে রাফি ছিল এবং আরও দুজন অপরিচিত ব্যক্তি। আরিশ কারও সঙ্গে কথা বলতে বলতে ভেতরে এগিয়ে আসছিল। স্বাভাবিকভাবেই তার উপস্থিতি আশপাশের মানুষের নজর কেড়ে নিচ্ছিল। লোকটার মধ্যে এমন একটা অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস ছিল, যা চাইলেও উপেক্ষা করা যায় না। সে খুব বেশি কথা না বললেও তার চারপাশের পরিবেশে এক ধরনের চাপা প্রভাব তৈরি হতো।
ইরায়া ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে ফেলল।
মিহি অবাক হয়ে বলল, “কী হলো?”
ইরায়া ফিসফিস করে বলল, “চুপ।”
“কেন?”
“একটা বিপদ এসেছে।”
মিহি ঘুরে তাকাতেই সব বুঝতে পারল। তার ঠোঁটের কোণে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল। “ওহ!”
ইরায়া চোখ পাকাল। “ওহ বলবি না।”
“তোর রকেটচালক।”
“চুপ কর!”
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইরায়ার শেষ কথাটা খুব নিচু স্বরে বলা হয়নি। কয়েক টেবিল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরিশের কানেও শব্দটা পৌঁছে গেল।
তার পা থেমে গেল।
ধীরে ধীরে সে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
ইরায়া তখন সম্পূর্ণ নির্দোষ মুখে মেনুর দিকে তাকিয়ে আছে, যেন পৃথিবীতে রকেট নামের কোনো বস্তুই নেই।
আরিশ কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে এমন এক হাসি ফুটে উঠল, যেটা দেখে রাফিও বিস্মিত হয়ে গেল। আরিশ খুব কম হাসে—এটা তার আশপাশের সবাই জানে। কিন্তু আজকাল অদ্ভুতভাবে এই হাসির কারণ একটাই মেয়ে।
আরিশ সরাসরি ইরায়াদের টেবিলের দিকে এগিয়ে এলো।
ইরায়া তার ছায়া নিজের সামনে পড়তে দেখেও মাথা তুলল না। সে মনে মনে প্রার্থনা করছিল, লোকটা যেন চলে যায়। কিন্তু জীবনে কোনো প্রার্থনা এত দ্রুত ব্যর্থ হয়নি।
“এখানে লুকিয়ে আছ কেন, মিস বকবকানি?”
ইরায়া ধীরে ধীরে মাথা তুলল। চোখে অবিশ্বাস, বিরক্তি এবং সামান্য বিস্ময়। “আমি লুকিয়ে আছি?”
আরিশ চেয়ারের দিকে তাকাল। “দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।”
“আপনার দেখার সমস্যা আছে।”
“আমার?”
“হ্যাঁ। সবকিছু ভুল দেখেন।”
আরিশ শান্তভাবে তার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। “তুমি আমাকে আবার কী বললে?”
ইরায়া চোখ বড় করে বলল, “আমি?”
“হ্যাঁ, তুমি।”
“আমি কিছু বলিনি।”
আরিশ সামান্য ঝুঁকে এল। “রকেটচালক?”
ইরায়ার মুখের ভাব এক মুহূর্তের জন্য বদলে গেল। পাশ থেকে মিহি মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছিল।
ইরায়া গলা পরিষ্কার করল। “ওটা পুরোনো কথা।”
“আমার মনে আছে।”
“আপনার এত কিছু মনে থাকে?”
“কিছু কিছু জিনিস ভুলে যাওয়া যায় না।”
কথাটা সাধারণভাবে বলা হলেও মুহূর্তের জন্য ইরায়া চুপ হয়ে গেল। কেন জানি তার মনে হলো আরিশের চোখে অন্যরকম কিছু আছে। সেই দৃষ্টি বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারল না সে। দ্রুত অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার টেবিল কি ওদিকে না?”
আরিশ চোখ সরাল না। “আমার যেখানে ইচ্ছা।”
“বাহ! রাস্তা, ক্যাফে সবই আপনার?”
“তুমি যেখানে থাকো, সেখানটা আপাতত আমার বিরক্তির জায়গা।”
ইরায়া মুখ খুলে কিছু বলার আগেই মিহি হেসে ফেলল। ইরায়া এবার তার দিকে এমনভাবে তাকাল যে মিহি দ্রুত গম্ভীর হয়ে গেল।
আরিশ এবার ইরায়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি সবসময় এত ঝামেলা করো?”
“আমি?”
“হ্যাঁ, মিস ঝামেলা।”
ইরায়ার চোখ গোল হয়ে গেল। “আপনি আমাকে কী বললেন?”
“মিস ঝামেলা।”
“আমি ঝামেলা?”
“অবশ্যই।”
“আপনি নিজে একটা চলন্ত দুর্যোগ।”
“তা হলেও তুমি আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকেই দুর্ঘটনা ঘটছে।”
“কী দুর্ঘটনা?”
“প্রথম দিন প্রায় আমার গাড়ির সামনে এসে পড়েছিলে।”
ইরায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আবার শুরু করলেন!”
“তারপর?”
“তারপর কিছু না।”
“অনুষ্ঠানে আমাকে দেখে এমনভাবে তাকিয়েছিলে যেন ভূত দেখেছ।”
“আপনাকে দেখলে অনেকেই তাই ভাবতে পারে।”
আরিশের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। “আমি এত ভয়ংকর?”
ইরায়া তার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “আপনি জানতে চান?”
“না।”
“ভালো করেছেন।”
মিহি এবার আর হাসি আটকাতে পারল না। আশপাশের কয়েকজন মানুষও কৌতূহলী হয়ে তাদের দিকে তাকাচ্ছিল। আরিশ অবশ্য এসবের কোনো পরোয়া করল না। তার চোখে তখনও সেই অদ্ভুত স্থিরতা।
হঠাৎ সে ইরায়ার সামনে থাকা খালি চেয়ারটায় বসে পড়ল।
ইরায়া বিস্ময়ে তাকাল। “আপনি বসছেন কেন?”
“দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছে না।”
“আপনার নিজের টেবিল আছে।”
“জানি।”
“তাহলে?”
“এখানে বসতে ইচ্ছা করছে।”
ইরায়া বিরক্ত হয়ে নিঃশ্বাস ফেলল। “বিস্ট।”
আরিশ এবার ধীরে মাথা কাত করল। “নতুন নাম?”
“আপনার জন্য উপযুক্ত।”
“বিস্ট?”
“হ্যাঁ। কারণ আপনি মানুষের মতো আচরণ করেন না।”
আরিশের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত ঝিলিক দেখা গেল। সে নিচু গলায় বলল, “সাবধানে নাম দিও, ছোট্ট ফ্লাওয়ার।”
ইরায়া মুহূর্তেই চুপ হয়ে গেল।
“কী বললেন?”
আরিশ স্বাভাবিক গলায় বলল, “কিছু না।”
“না, আপনি আমাকে কী বললেন?”
“শুনতে পাওনি?”
“পেয়েছি।”
“তাহলে আবার জিজ্ঞেস করছ কেন?”
ইরায়া কিছু বলার আগেই রাফি দূর থেকে আরিশকে ডাকল। তার সঙ্গে জরুরি আলোচনা ছিল। আরিশ উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে কয়েক মুহূর্ত ইরায়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
“খাবারটা শেষ করো, মিস বকবকানি।”
ইরায়া মুখ বাঁকিয়ে বলল, “আপনি আমার খাবারের দায়িত্ব নেন না।”
আরিশ ধীরে হেসে বলল, “সেটা দেখাই যাবে।”
এই কথাটা বলে সে চলে গেল।
ইরায়া কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মিহির দিকে তাকাল।
মিহির মুখে এমন হাসি ছিল, যা দেখে ইরায়া বুঝতে পারল এখনই তাকে কিছু শুনতে হবে।
“বলবি না।”
মিহি হাসল। “আমি কিছুই বলিনি।”
“তোর মুখ বলছে।”
“আমার মনে হচ্ছে লোকটা তোকে পছন্দ করে।”
ইরায়ার হাতে থাকা চামচটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। “কি!”
“আমি ভুল বললাম?”
“অবশ্যই ভুল বলেছিস।”
“তাহলে সে তোর টেবিলে এসে বসল কেন?”
“কারণ সে নির্লজ্জ।”
“আর তোকে ছোট্ট ফ্লাওয়ার বলল কেন?”
ইরায়ার মুখ সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল। “ওটা একটা অপমান।”
“কোথায় অপমান?”
“জানি না। কিন্তু অপমান।”
মিহি আবার হাসল।
ইরায়া বিরক্ত হয়ে খাবারের দিকে মন দিলেও তার মন আর সেখানে ছিল না। ‘ছোট্ট ফ্লাওয়ার।’ নামটা বারবার মাথায় ঘুরছিল। সে নিজের ওপরই বিরক্ত হলো। একটা নাম নিয়ে এত ভাবার কী আছে? একজন মানুষ তাকে একটা ডাকনাম দিয়েছে, এতে পৃথিবী বদলে যায়নি।
কিন্তু পৃথিবী না বদলালেও অদ্ভুতভাবে তার মনের ভেতর কিছু একটা বদলাতে শুরু করছিল।
অন্যদিকে ক্যাফের অন্য প্রান্তে বসে আরিশ রাফির কথা শুনছিল ঠিকই, কিন্তু মনোযোগ দিতে পারছিল না। রাফি কিছুক্ষণ কথা বলার পর বুঝতে পারল তার বসের মন আজ অন্য কোথাও।
“স্যার?”
আরিশ চোখ তুলল। “কী?”
“আপনি শুনছেন?”
“শুনছি।”
“আমি শেষ পাঁচ মিনিটে কী বলেছি?”
আরিশ চুপ করে রইল।
রাফি ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। “আমি বুঝতে পারছি।”
“কী বুঝতে পারছ?”
“কিছু না, স্যার।”
“রাফি।”
“জি?”
“তোমার চাকরি—”
“খুব প্রিয়, স্যার। জানি।”
আরিশ ঠান্ডা চোখে তাকালেও রাফি এবার সামান্য হাসল। সে বহুদিন ধরে আরিশকে চেনে। এই মানুষটাকে কেউ সহজে বুঝতে পারে না। তার জীবন নিয়ম, পরিকল্পনা এবং নিয়ন্ত্রণে বাঁধা। হঠাৎ কোনো অপরিচিত মানুষের জন্য সে নিজের পরিকল্পনা পরিবর্তন করবে—এটা আগে কখনো ঘটেনি।
কিন্তু ইরায়া নওশীনের ব্যাপারটা আলাদা।
সমস্যা হলো, আরিশ নিজেও এখনো সেটা স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়।
ক্যাফে থেকে বের হওয়ার সময় ইরায়া আবার একবার পেছনে তাকিয়েছিল। সে জানত না কেন তাকিয়েছে। হয়তো নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে লোকটা সত্যিই আর তার পেছনে আসছে না।
কিন্তু তাকিয়ে সে দেখল, আরিশ আগেই তার দিকে তাকিয়ে আছে।
দুজনের চোখ এক হলো।
ইরায়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে নিল।
আরিশের ঠোঁটের কোণে আবার সেই রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
মেয়েটা তাকে বিরক্ত করে।
অস্বাভাবিকভাবে বিরক্ত করে।
তার কথা বলার ধরন বিরক্তিকর। রাগ দেখানো বিরক্তিকর। চোখ পাকানো বিরক্তিকর। তাকে দেখলেই নতুন নতুন নাম দেওয়ার অভ্যাসও বিরক্তিকর।
তবুও কেন জানি এই বিরক্তিটুকুই এখন আরিশের কাছে অদ্ভুতভাবে ভালো লাগতে শুরু করেছে।
আর ইরায়া?
গাড়িতে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে সে নিজেকে শতবার বোঝানোর চেষ্টা করছিল যে আরিশ ইশতিয়াক তার জীবনে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় একজন মানুষ।
একজন অশুভ পুরুষ।
একটা বিস্ট।
একজন রকেটচালক।
একটা চলন্ত ঝামেলা।
কিন্তু সমস্যা একটাই—
যতবার সে লোকটার জন্য নতুন কোনো অপমানজনক নাম ঠিক করছিল, ততবারই অজান্তে তার ঠোঁটের কোণে হাসি চলে আসছিল।
ঢাকার ব্যস্ত শহর তখনও আগের মতোই ছুটে চলেছে। হাজার মানুষের ভিড়ে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বভাবের মানুষ নিজেদের অজান্তেই বারবার একই পথে এসে দাঁড়াচ্ছে। একজন ভাবছে অন্যজনকে এড়িয়ে চলবে। আরেকজনও ঠিক একই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
কিন্তু ভাগ্যের পরিকল্পনা তাদের দুজনের পরিকল্পনার চেয়েও অনেক বেশি জটিল।
কারণ কিছু মানুষের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় দুর্ঘটনায়।
দ্বিতীয় দেখা হয় কাকতালীয়ভাবে।
আর তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম দেখা হওয়ার পর একসময় মানুষ বুঝতে পারে—
সবকিছু কাকতালীয় ছিল না।
তবে ইরায়া আর আরিশ এখনো সেটা জানত না।
তাদের গল্প তখনও কেবল শুরু হয়েছে।
ভালোবাসা এখনো আসেনি।
রহস্যও এখনো নিজের দরজা খোলেনি।
শুধু শুরু হয়েছে এক অদ্ভুত সম্পর্কের—
ঝগড়া, দুষ্টুমি, বিরক্তি আর অজানা আকর্ষণে গড়ে ওঠা এক মায়াবন্ধন।
চলবে…
#লেখিকা :নূরাইয়া*মেঘলা শাহরীন