মায়াবন্ধন
দশম পর্ব — অদ্ভুত কাছাকাছি
সকালের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই ইরায়ার ঘুম ভেঙে গেল। সাধারণত সকালের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। অ্যালার্ম বাজলে সে প্রথমে সেটাকে বন্ধ করে, তারপর পাঁচ মিনিট ঘুমানোর প্রতিজ্ঞা করে এবং সেই পাঁচ মিনিট কখন যে এক ঘণ্টায় পরিণত হয়, তা নিয়ে তার নিজেরও কোনো ধারণা নেই। কিন্তু আজ অদ্ভুতভাবে ঘুম ভাঙার পর আর চোখ বন্ধ করতে পারল না। বিছানায় চুপচাপ শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মাথায় গত কয়েকদিনের ঘটনাগুলো একের পর এক ঘুরে বেড়াতে লাগল। আরিশের সঙ্গে প্রথম দেখা, রাস্তার মাঝখানে ঝগড়া, তারপর আবার সেই অনুষ্ঠানে দেখা, একের পর এক অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে মুখোমুখি হওয়া—সবকিছু যেন খুব দ্রুত ঘটছে। সবচেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার হলো, ইরায়া যতই নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে আরিশ ইশতিয়াক তার জীবনের এক বিরক্তিকর অধ্যায় মাত্র, ততই লোকটা কোনো না কোনোভাবে তার চিন্তার মধ্যে ঢুকে পড়ছে। বালিশটা মুখের ওপর চেপে ধরে ইরায়া বিড়বিড় করে বলল, “একটা মানুষ এত বিরক্তিকর হয় কীভাবে? দেখলেই মনে হয় পৃথিবীর সব সুখ কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে।” কয়েক সেকেন্ড পর আবার নিজেই চোখ বন্ধ করে বলল, “তবে হাসলে খারাপ লাগে না।” কথাটা মুখ থেকে বের হতেই সে হঠাৎ বালিশ সরিয়ে বসে পড়ল। “ইরায়া নওশীন! তুই কি পাগল হয়ে যাচ্ছিস?” নিজের সঙ্গেই কথা বলতে বলতে সে বিছানা থেকে নেমে গেল। নিচে নাস্তার টেবিলে বসেও তার মনটা অস্বাভাবিকভাবে অন্যমনস্ক ছিল। মা দুবার জিজ্ঞেস করার পর সে বুঝতে পারল যে তাকে কিছু বলা হচ্ছে। “কী হয়েছে? এত চুপচাপ কেন?” ইরায়া দ্রুত মাথা নাড়ল। “কিছু হয়নি।” “শরীর খারাপ?” “না।” “তাহলে?” “আমি কি সবসময় কথা বলি?” মা মৃদু হেসে বললেন, “তুই চুপ থাকলে বরং চিন্তা হয়।” ইরায়া মুখ বাঁকিয়ে নাস্তা খেতে লাগল। ঠিক তখনই তার ফোনে মিহির মেসেজ এল। মেসেজে মাত্র কয়েকটি শব্দ—‘আজ বের হবি। জরুরি।’ ইরায়া সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল—‘জরুরি না খাবারের ব্যবস্থা?’ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উত্তর এল—‘দুটোই।’ ইরায়ার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে দ্রুত লিখল—‘কোথায়?’ মিহি উত্তর দিল—‘এক ঘণ্টার মধ্যে তৈরি থাক।’ ইরায়া ফোন নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মিহির সঙ্গে বন্ধুত্ব করার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মিহি কখনো কোনো পরিকল্পনা আগে থেকে পরিষ্কার করে বলে না। তার কাছে সবকিছুই সারপ্রাইজ। আর ইরায়ার কাছে সারপ্রাইজ মানেই সম্ভাব্য বিপদ। তবুও খাবারের কথা শুনে সে আর না করতে পারল না।
অন্যদিকে শহরের অন্য প্রান্তে আরিশ ইশতিয়াক নিজের অফিসের কাঁচঘেরা কেবিনে বসে ছিল। সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল খোলা, টেবিলের ওপর ল্যাপটপ, পাশে কফির কাপ—সবকিছু যথাস্থানে থাকলেও তার মন কাজের মধ্যে ছিল না। রাফি বেশ কিছুক্ষণ ধরে দূর থেকে বিষয়টা লক্ষ্য করছিল। গত কয়েকদিনে সে একটি অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ করেছে। আরিশ আগের মতোই কঠোর, আগের মতোই কম কথা বলে, সামান্য ভুলেও বিরক্ত হয়; কিন্তু মাঝে মাঝে কোনো কারণ ছাড়াই কয়েক সেকেন্ড চুপ হয়ে যায়। যেন তার মাথায় এমন কোনো চিন্তা আসে, যেটা সে নিজেও স্বীকার করতে চায় না। রাফি অবশেষে সাহস করে বলল, “স্যার, একটা কথা বলব?” আরিশ চোখ না তুলেই বলল, “তুমি কি আজকাল কাজের চেয়ে কথা বেশি বলো?” রাফি গলা পরিষ্কার করল। “না স্যার, আমি শুধু একটা পর্যবেক্ষণ করেছি।” এবার আরিশ চোখ তুলে তাকাল। “তোমার পর্যবেক্ষণগুলো সাধারণত আমার পছন্দ হয় না।” “এইবারও হয়তো হবে না।” “তাহলে বলো না।” রাফি ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল। “আপনি কি কাউকে নিয়ে ভাবছেন?” আরিশের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। “কাকে নিয়ে?” “সেটা তো আমি জানি না স্যার। তবে নামের প্রথম অক্ষর সম্ভবত ই।” কয়েক মুহূর্ত কেবিনের বাতাস ভারী হয়ে গেল। রাফি মনে মনে নিজের শেষ ইচ্ছার কথা ভাবতে শুরু করল। আরিশ ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিল। “তোমার কাজ শেষ?” “প্রায়।” “তাহলে বাকি কাজটা শেষ করো।” “জি স্যার।” রাফি ঘুরে চলে যেতে উদ্যত হয়েও থেমে গেল। “তবে একটা কথা স্যার।” “আবার?” “আপনি যখন রাগ করেন, তখন ভয় লাগে। কিন্তু যখন চুপচাপ থাকেন, তখন আরও বেশি সন্দেহ হয়।” আরিশ এবার টেবিলের ওপর রাখা কলমটা হাতে নিল। রাফি আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে আরিশ একা হয়ে গেল। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে নিজের অজান্তেই মৃদুস্বরে বলল, “মিস বকবকানি।” তারপর যেন নিজেই নিজের কথা শুনে বিরক্ত হয়ে গেল। সে কলমটা টেবিলে রেখে দিল। “অসহ্য একটা মেয়ে।”
দুপুরের দিকে ইরায়া আর মিহি শহরের একটি পরিচিত ক্যাফেতে পৌঁছাল। ইরায়া ভেবেছিল এখানে এসে অন্তত শান্তিতে খাওয়া যাবে, কিন্তু মিহির মুখের রহস্যময় হাসি দেখে তার সন্দেহ আরও বেড়ে গেল। বসার সঙ্গে সঙ্গেই ইরায়া বলল, “এখন বল, আমাকে এখানে কেন এনেছিস?” মিহি পানির গ্লাস হাতে নিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “এমনিই।” “মিথ্যা।” “সত্যি।” “তুই যখন ‘এমনিই’ বলিস, তখন বুঝি বড় কিছু আছে।” মিহি একটু হাসল। “আজকে কিছু মানুষ আসবে।” ইরায়া সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহের চোখে তাকাল। “কী মানুষ?” “মানুষই।” “মিহি!” “আচ্ছা আচ্ছা, আমার এক পরিচিতের সঙ্গে দেখা করতে হবে।” “তোর পরিচিতের সঙ্গে দেখা করতে আমাকে কেন?” “আমি একা গেলে বিরক্ত হব।” ইরায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমার জীবনটা কেন এমন?” মিহি হাসতে হাসতে বলল, “কারণ তুই নাটক করতে ভালোবাসিস।” “আমি নাটক করি না।” “তুই সকালে ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গে তর্ক করিস।” ইরায়া চোখ বড় বড় করল। “তুই জানলি কীভাবে?” মিহি উত্তর দেওয়ার আগেই ইরায়ার ফোনে একটি কল এল। অপরিচিত নম্বর। সে কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে কল রিসিভ করল। ওপাশ থেকে কোনো কথা শোনা গেল না। “হ্যালো?” ইরায়া বলল। নীরবতা। “কে?” আবার নীরবতা। এবার তার বিরক্তি বাড়ল। “কেউ যদি কথা না বলেন, তাহলে ফোন দেওয়ার মানে কী?” ঠিক তখন ওপাশ থেকে খুব নিচু স্বরে একটি পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল, “সামনে তাকাও।” ইরায়ার হাত থেমে গেল। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে সামনের দিকে তাকাল।
ক্যাফের কাঁচের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরিশ।
তার মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব, চোখে অদ্ভুত স্থিরতা। কয়েক মুহূর্ত ইরায়া শুধু তাকিয়ে রইল। তারপর তার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল বিরক্তি। দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া অবিশ্বাস। আর তৃতীয় প্রতিক্রিয়া—নিজের অজান্তে বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ধাক্কা। সে দ্রুত ফোনটা কেটে দিয়ে বলল, “আপনি এখানে?” আরিশ ধীরে ধীরে তাদের টেবিলের দিকে এগিয়ে এল। “এই প্রশ্নটা আমারও।” ইরায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “আমি তো আগে এসেছি।” “তাতে কী?” “তাহলে আপনিই আমার পেছনে এসেছেন।” আরিশের চোখে সামান্য বিস্ময় ফুটে উঠল। “তোমাকে অনুসরণ করার মতো এত সময় আমার নেই, মিস বকবকানি।” ইরায়ার চোখ কুঁচকে গেল। “কি বললেন?” “যা শুনেছ।” “আমাকে মিস বকবকানি বললেন?” আরিশ শান্তভাবে বলল, “ভুল বলেছি?” “অবশ্যই ভুল বলেছেন।” “তুমি কি কম কথা বলো?” ইরায়া কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। মিহি পাশে বসে এতক্ষণ মুখ চেপে হাসছিল। ইরায়া এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই হাসছিস কেন?” মিহি নির্দোষ মুখে বলল, “আমি কিছু বলিনি।” আরিশ তখনই মিহির দিকে তাকাল। মিহি হঠাৎ কাশতে শুরু করল, যেন তার হাসিটা গলায় আটকে গেছে। ইরায়া আবার আরিশের দিকে ফিরে বলল, “আর আপনি আমাকে যে নামে ডাকবেন, তার আগে অনুমতি নেবেন।” আরিশ চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল, “তাহলে তুমি আমাকে কী নামে ডাকবে?” “আমি?” ইরায়া ঠোঁট বাঁকাল। “অনেক নাম আছে।” “যেমন?” ইরায়া কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করার ভান করল। তারপর একদম গম্ভীর মুখে বলল, “বিস্ট।” মিহির হাসি এবার সত্যিই বেরিয়ে গেল। আরিশ স্থির হয়ে ইরায়ার দিকে তাকাল। “বিস্ট?” “হ্যাঁ।” “কেন?” “আপনার চেহারা দেখে।” আরিশের মুখ আরও কঠিন হয়ে গেল। “আমার চেহারার কী সমস্যা?” “সমস্যা নেই। একটু বেশি ভয়ংকর।” “তাহলে তোমার জন্য ভালো। তুমি তো সাহসী।” “আমি সাহসী না।” “রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গাড়ির চালককে রকেটচালক বলা মানুষ অবশ্যই সাহসী।” ইরায়া মুখ ঘুরিয়ে ফেলল। “ওটা অন্য ব্যাপার।” আরিশ ঠান্ডা গলায় বলল, “তাহলে বিস্ট?” “ওটা আপনার চরিত্রের সঙ্গে মানায়।” “তুমি আমার চরিত্র কতটুকু জানো?” প্রশ্নটা শুনে ইরায়া কয়েক সেকেন্ড চুপ হয়ে গেল। সত্যিই তো, সে আরিশকে কতটুকু চেনে? কয়েকবার দেখা হয়েছে, কয়েকবার ঝগড়া হয়েছে। অথচ মনে হয় মানুষটাকে নিয়ে তার অনেক মতামত তৈরি হয়ে গেছে। আরিশ তার নীরবতা লক্ষ্য করলেও কিছু বলল না।
ঠিক তখনই মিহি হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। “আমি একটু আসছি।” ইরায়া সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরে ফেলল। “কোথায়?” “ওই যে পরিচিত মানুষটা এসেছে।” “আমাকে রেখে?” “তুই তো একা না।” কথাটা বলেই মিহি এমনভাবে হাসল যে ইরায়ার সন্দেহ নিশ্চিত হয়ে গেল। “মিহি, দাঁড়া!” কিন্তু ততক্ষণে সে চলে গেছে। ইরায়া ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে আরিশের দিকে তাকাল। আরিশও তার দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনের মাঝখানে কয়েক সেকেন্ডের অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। ইরায়া প্রথমে মুখ খুলল। “আপনি কি সত্যিই আমার পেছনে আসেননি?” আরিশ ভ্রু তুলল। “তুমি কি সত্যিই ভাবছ আমি তোমার পেছনে ঘুরি?” “আমি ভাবছি না।” “তাহলে জিজ্ঞেস করছ কেন?” “এমনিই।” “মিথ্যা।” ইরায়া বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনি সবসময় আমাকে বিরক্ত করেন কেন?” “কারণ তুমি বিরক্ত হও।” “খুব মজা?” “কিছুটা।” ইরায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। “আপনি মজা করতে পারেন?” “আমি মানুষ।” “দেখে বোঝা যায় না।” “ধন্যবাদ।” “এটা প্রশংসা ছিল না।” “জানি।”
কথার মাঝেই ওয়েটার খাবার নিয়ে এল। ইরায়া খাবারের দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত সবকিছু ভুলে গেল। আরিশ সেটা লক্ষ্য করল। তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই সামান্য হাসি ফুটে উঠল। “তোমার একটা সমস্যা আছে।” ইরায়া খাবারের দিকে তাকিয়েই বলল, “কী?” “খাবার দেখলে তোমার পৃথিবী বদলে যায়।” ইরায়া এবার চোখ তুলে তাকাল। “আমার পৃথিবী বদলায় না।” “এইমাত্র বদলেছে।” “আপনি লক্ষ্য করলেন কেন?” প্রশ্নটা বেরিয়ে আসতেই দুজনেই এক মুহূর্ত চুপ হয়ে গেল। আরিশের চোখ স্থির হয়ে গেল তার মুখে। ইরায়া দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। “মানে, আপনি এত খেয়াল করেন কেন?” আরিশ শান্ত গলায় বলল, “কারণ তুমি নিজেই খেয়াল করার মতো ঝামেলা।” ইরায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “তাহলে আপনাকে আমি মিস্টার ঝামেলা বলব।” “বিস্ট থেকে ঝামেলা?” “আজকে ভালো মুডে আছেন বলে পদোন্নতি দিলাম।” “ধন্যবাদ, মিস বকবকানি।” “আমাকে ওই নামে ডাকবেন না।” “তাহলে মিস ঝামেলা?” “আরও খারাপ।” “ছোট ফ্লাওয়ার?” ইরায়া চোখ বড় বড় করল। “কি?” আরিশ নিজেও যেন বুঝতে পারল না কেন নামটা বলল। কয়েক সেকেন্ড তার মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না, কিন্তু ইরায়া স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। “আপনি আমাকে ফ্লাওয়ার বললেন?” আরিশ গলা পরিষ্কার করল। “ভুলে বলেছি।” “ভুলেও মানুষ এমন নাম বলে?” “তুমি কি সবকিছুর ব্যাখ্যা চাও?” ইরায়া মৃদু হেসে বলল, “হ্যাঁ।” আরিশ তার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই হাসিটা খুব ছোট ছিল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার কঠিন মুখটাকে মুহূর্তের জন্য নরম করে দিয়েছিল।
ক্যাফের বাইরে তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। চারপাশে মানুষ নিজেদের মতো ব্যস্ত, কেউ জানে না একই টেবিলে বসে থাকা এই দুই মানুষ কিছুদিন আগেও একে অপরকে দেখলে রাস্তার দিক পরিবর্তন করার কথা ভাবত। অথচ আজ তারা একসঙ্গে বসে আছে, ঝগড়া করছে, নাম নিয়ে তর্ক করছে এবং অদ্ভুতভাবে সময়টা কেটে যাচ্ছে। ইরায়া নিজেকে বারবার বোঝাচ্ছিল যে এটা শুধুই কাকতালীয়। আরিশও নিজের মনে একই কথা বলছিল। কিন্তু কাকতালীয় ঘটনা কতবার ঘটলে তাকে আর কাকতালীয় বলা যায়?
হঠাৎ আরিশের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে আগের সেই হালকা পরিবেশটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। ইরায়া বিষয়টা লক্ষ্য করল। আরিশ কল রিসিভ করে খুব সংক্ষিপ্তভাবে কিছু কথা বলল, তারপর ফোন রেখে উঠে দাঁড়াল। ইরায়া অবাক হয়ে বলল, “এখনই যাচ্ছেন?” আরিশ তার দিকে তাকাল। “কাজ আছে।” “ওহ।” ইরায়া দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল, যেন তার যাওয়া নিয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই। আরিশ কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে বলল, “একটা কথা।” “কী?” “রাস্তা পার হওয়ার সময় সামনে তাকাবে।” ইরায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আর আপনি গাড়ি আস্তে চালাবেন।” “আমি চেষ্টা করব।” “সত্যি?” “না।” ইরায়া বিরক্ত হয়ে তাকাল। আরিশের চোখে এবার স্পষ্ট হাসি। “বিদায়, মিস বকবকানি।” ইরায়া দাঁত চেপে বলল, “বিদায়, বিস্ট।” আরিশ চলে যাওয়ার সময় পেছনে ফিরে তাকাল না। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছে এক মুহূর্ত থেমেছিল। যেন কিছু বলতে চেয়েও বলেনি।
মিহি ফিরে এসে ইরায়ার সামনে বসতেই তার মুখে এমন হাসি ফুটে উঠল যে ইরায়ার সন্দেহ আরও বেড়ে গেল। “তুই সব প্ল্যান করে করেছিস?” ইরায়া প্রশ্ন করল। মিহি চোখ বড় বড় করে বলল, “আমি? কী প্ল্যান?” “আমাকে এখানে আনা, তারপর আমাকে একা রেখে চলে যাওয়া!” “আমি তো সত্যিই একজনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম।” “তুই জানতিস আরিশ এখানে আসবে?” মিহির চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত কিছু ঝলকে উঠলেও সে দ্রুত বলল, “আমি কীভাবে জানব?” ইরায়া সন্দেহের চোখে তাকিয়ে রইল। “তুই মিথ্যা বলছিস।” “প্রমাণ?” ইরায়া চুপ করে গেল। কোনো প্রমাণ নেই। শুধু তার মনে হচ্ছে আজকের ঘটনাটা সাধারণ নয়। কিন্তু সে সেই চিন্তাকে গুরুত্ব দিল না। কারণ সে এখনো বিশ্বাস করে, আরিশ ইশতিয়াকের সঙ্গে তার দেখা হওয়া শুধুই কাকতালীয়।
তবে শহরের অন্য প্রান্তে গাড়িতে বসে থাকা আরিশের হাতে তখনও ফোনটি শক্ত করে ধরা। ফোনের ওপাশ থেকে পাওয়া খবরটি তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। কিছুদিন ধরে এমন কিছু বিষয় ঘটছে, যেগুলোকে সে সাধারণ ঘটনা বলে উড়িয়ে দিতে পারছে না। কিন্তু আজকের সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার সেই ফোনকল নয়। বরং ক্যাফেতে বসে থাকা এক চঞ্চল মেয়ের মুখ বারবার তার মনে পড়ছে। সে বিরক্ত হয়ে জানালার বাইরে তাকাল। “ছোট ফ্লাওয়ার!” শব্দটা আবার মাথায় আসতেই তার নিজের ওপরই রাগ হলো। সে কখন থেকে মানুষকে এমন নামে ডাকতে শুরু করেছে? রাফি পাশে বসে চুপচাপ ছিল। কিছুক্ষণ পর সে খুব সাবধানে বলল, “স্যার?” “কী?” “আজকে আপনার মেজাজ ভালো মনে হচ্ছে।” আরিশ চোখ বন্ধ করল। “তোমার ভুল ধারণা।” রাফি হালকা হাসল। “জি, স্যার।” আরিশ চোখ খুলে তার দিকে তাকাল। “কিছু বলবে?” “না।” “তাহলে হাসছ কেন?” “এমনিই।” “রাফি।” “জি?” “চুপ।” “জি স্যার।”
সেদিন সন্ধ্যায় নিজের ঘরে ফিরে ইরায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করতে করতে হঠাৎ থেমে গেল। তার মনে পড়ল আরিশের বলা শেষ কথাটা—ছোট ফ্লাওয়ার। অকারণে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে নিজেকে ধমক দিল। “একদম হাসবি না। ওই লোকটা বিস্ট। ব্যাধক পুরুষ। অশুভ লোক। ভয়ংকর মানুষ।” কয়েকটি নাম একসঙ্গে বলেও নিজের মনকে বোঝাতে পারল না কেন জানি। কারণ যতবার সে আরিশকে বিরক্তিকর প্রমাণ করতে চেয়েছে, ততবারই লোকটার কোনো নতুন দিক তার সামনে এসেছে। আর এই অদ্ভুত মানুষটাকে বুঝতে না পারার বিরক্তিটাই হয়তো ধীরে ধীরে কৌতূহলে বদলে যাচ্ছে।
তবে তাদের গল্প এখনো ভালোবাসার গল্প হয়ে ওঠেনি। এখনো তারা একে অপরের জীবনে ঝামেলা, বিরক্তি আর অপ্রত্যাশিত উপস্থিতির নাম। সামনে আরও অনেক দেখা আছে, আরও অনেক ভুল বোঝাবুঝি আছে, আছে হাসি, রাগ, অভিমান আর এমন কিছু মুহূর্ত, যেখানে দুজনেই হয়তো নিজেদের অজান্তে একে অপরের কাছে একটু একটু করে দুর্বল হয়ে পড়বে। রহস্য এখনো দূরে আছে, অন্ধকার এখনো পুরোপুরি নামেনি। আপাতত গল্পের পথে হাঁটছে দুই বিপরীত স্বভাবের মানুষ—একজন চঞ্চল, বাচাল, দুষ্টু ছোট্ট ঝড়; আরেকজন নীরব, কঠিন, রহস্যময় বিস্ট। কেউই এখনো জানে না, এই সাধারণ ঝগড়াগুলো একদিন কত গভীর মায়াবন্ধনে জড়িয়ে দেবে তাদের।
চলবে…
#লেখিকা : নূরাইয়া মেঘলা শাহারীন মায়াবন্ধন
একাদশ পর্ব — অদৃশ্য টান
ক্যাফে থেকে বের হওয়ার পরও ইরায়ার মাথা থেকে আরিশের কথাগুলো সরছিল না। নিজের অজান্তেই সে বারবার সেই মুহূর্তটার কথা মনে করছিল, যখন আরিশ তাকে ছোট ফ্লাওয়ার বলে ডেকেছিল। কথাটা শুনতে যতটা সাধারণ, তার কাছে কেন যেন ততটা সাধারণ লাগছিল না। সে জানত না কেন একটা মানুষকে নিয়ে এত ভাবছে। আরিশের সঙ্গে তার পরিচয়ই বা কতদিনের? অথচ লোকটা তার সামনে এলেই কেন যেন আশপাশের সবকিছু একটু অন্যরকম হয়ে যায়। কখনো রাগ হয়, কখনো বিরক্তি, আবার কখনো এমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয় যেটার নাম ইরায়া নিজেই জানে না। সে গাড়ির জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল। পাশে বসে মিহি অনেকক্ষণ ধরে তার মুখের দিকে তাকিয়ে অবশেষে হেসে বলল, “কী ভাবছিস?” ইরায়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে বলল, “কিছু না।” মিহি মুচকি হেসে বলল, “তুই যখন ‘কিছু না’ বলিস, তখন বুঝি তোর মাথায় অনেক কিছু চলছে।” ইরায়া বিরক্ত হয়ে বলল, “তুই কি আমার মাথার ভেতর ক্যামেরা লাগিয়েছিস?” মিহি হেসে বলল, “ক্যামেরা লাগানোর দরকার নেই। তোর মুখটাই সব বলে দেয়।” ইরায়া মুখ ঘুরিয়ে আবার জানালার দিকে তাকাল। মিহি কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বলল, “আরিশকে কেমন লাগল?” প্রশ্নটা শুনে ইরায়া সঙ্গে সঙ্গে তাকাল। “কাকে?” “যাকে তুই এতক্ষণ ধরে মনে মনে গাল দিচ্ছিস।” ইরায়া ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমি ওকে গালি দিচ্ছি না।” “তাহলে?” “ভাবছি।” “কী ভাবছিস?” ইরায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “লোকটা অদ্ভুত।” মিহি হাসল। “শুধু অদ্ভুত?” “খুব অদ্ভুত।” “আর?” “খুব রাগী।” “আর?” ইরায়া এবার বিরক্ত হয়ে বলল, “আর তুই বেশি প্রশ্ন করিস।” মিহি হেসে মাথা নাড়ল। “ঠিক আছে, মিস বকবকানির বান্ধবী আর কিছু বলবে না।” ইরায়া তার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই নামটা আবার কোথা থেকে শিখলি?” মিহি চোখ টিপে বলল, “যে মানুষ তোকে ওই নামে ডাকে, তার কাছ থেকেই শিখেছি।” ইরায়া আর কোনো উত্তর দিল না। শুধু মনে মনে ভাবল, মানুষটা সত্যিই অসহ্য।
সেদিকে আরিশও ক্যাফে থেকে বের হয়ে নিজের গাড়িতে বসেছিল। গাড়ি চলতে শুরু করার পর অনেকক্ষণ সে কোনো কথা বলল না। রাফি সামনে বসে ছিল, কিন্তু আজ তার পাশে আরেকজনও ছিল—আরিশের পুরোনো বন্ধু আরণদব। আরণদব কিছুক্ষণ আরিশের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে বলল, “তুই আজকাল একটা মেয়ের নাম শুনলেই এমন চুপ হয়ে যাচ্ছিস কেন?” আরিশ চোখ তুলে তাকাল। “কোন মেয়ের কথা বলছিস?” আরণদব ভান করে চিন্তা করার ভঙ্গি করল। “নামটা মনে পড়ছে না। ছোট্ট একটা ফুলের মতো নাম।” রাফি মুখ নিচু করে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল। আরিশ তাকে একবার তাকাতেই সে সঙ্গে সঙ্গে জানালার বাইরে তাকিয়ে গেল। আরণদব এবার হেসে বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে। ইরায়া।” আরিশের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। “ওর নাম নিয়ে এত কথা বলিস না।” “কেন?” “ভালো লাগে না।” “কাকে? তোকে, নাকি ওকে?” আরিশ উত্তর দিল না। আরণদব একটু ঝুঁকে বলল, “বন্ধু হিসেবে একটা কথা বলি, তুই কিন্তু বদলে যাচ্ছিস।” আরিশ ঠান্ডা গলায় বলল, “আমি বদলাইনি।” “তাহলে আগে কোনো মেয়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তোর মুখে হাসি দেখা যেত?” “আমি হাসিনি।” “হেসেছিলি।” “না।” “রাফি?” রাফি বিপদ বুঝে বলল, “আমি কিছু দেখিনি।” আরণদব হেসে উঠল। “দেখলি? সবাই তোকে ভয় পায়।” আরিশ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “তুইও ভয় পেতে পারিস।” “আমি তোকে ছোটবেলা থেকে চিনি। তোর ভয় দেখানোতে আমার কিছু হয় না।” কথাটা শুনে আরিশের মুখে সামান্য হাসি ফুটে উঠল। তাদের বন্ধুত্বটা এমনই। আরণদব এমন একজন, যার সামনে আরিশ নিজের কঠিন মুখোশটা কিছুটা সরিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু আজ আরণদবও বুঝতে পারছিল, বন্ধুর জীবনে নতুন কিছু ঢুকেছে। সেটা শুধু ইরায়া নয়, তার চেয়েও বড় কোনো পরিবর্তনের শুরু।
সন্ধ্যার দিকে আরিশ বাড়িতে ফিরতেই পরিবেশটা আবার অস্বাভাবিক মনে হলো। বিশাল বাড়ির ড্রয়িংরুমে তার মা নাদিয়া বসে ছিলেন। চোখেমুখে ক্লান্তি। কিছুটা দূরে তার বাবা ইশতিয়াক সাহেব ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন। আরিশ সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাদের লক্ষ্য করল। বাবার কণ্ঠ খুব নিচু, কিন্তু তার মুখের অভিব্যক্তি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। কথোপকথন শেষ করে ইশতিয়াক সাহেব ফোনটা নামিয়ে রাখতেই আরিশ বলল, “কী হয়েছে?” বাবা তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিছু না।” আরিশ শান্ত গলায় বলল, “আপনি যখন কিছু না বলেন, তখনই বুঝি কিছু হয়েছে।” নাদিয়া দ্রুত বললেন, “আরিশ, এখন এসব নিয়ে কথা না বলাই ভালো।” আরিশ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “মা, তোমরাও কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছ?” নাদিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। ইশতিয়াক সাহেব এবার কঠিন গলায় বললেন, “তুমি নিজের জীবন নিয়ে থাকো। ব্যবসার ব্যাপারে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না।” আরিশের চোখ সরু হয়ে গেল। “আমি আপনার ছেলে। পরিবারে কী হচ্ছে সেটা জানার অধিকার আমার আছে।” “অধিকার আর প্রয়োজন এক জিনিস নয়।” কথাটা বলে ইশতিয়াক সাহেব উঠে চলে গেলেন। নাদিয়া ছেলের কাছে এসে আস্তে বললেন, “তোমার বাবার সঙ্গে এখন তর্ক করো না।” আরিশ মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কিছু জানেন?” নাদিয়া চোখ নামিয়ে বললেন, “কিছু পুরোনো বিষয় আছে। সবকিছু জানার সময় এখনো আসেনি।” “কোন পুরোনো বিষয়?” নাদিয়া আর কিছু বললেন না। শুধু ছেলের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “বিশ্বাস করো, তোমার ভালোর জন্যই কিছু কথা বলা হচ্ছে না।” আরিশ মায়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, বাড়ির দেয়ালের ভেতর এমন কোনো গল্প লুকিয়ে আছে, যার সঙ্গে তার নিজের জীবনও জড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই গল্পের দরজা এখনো বন্ধ।
পরদিন দুপুরে ইরায়া মিহির সঙ্গে বাইরে বেরিয়েছিল। তাদের সঙ্গে আজ নীলয়ও ছিল। নীলয় খুব স্বাভাবিকভাবেই ইরায়ার সঙ্গে কথা বলছিল। সে মাঝে মাঝে এমন কিছু কথা বলছিল, যেগুলো শুনে ইরায়া হেসে ফেলছিল। মিহি দুজনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে কিছু একটা বুঝলেও কিছু বলছিল না। নীলয় হঠাৎ ইরায়ার হাতে থাকা ব্যাগটা নিয়ে বলল, “এটা দাও, আমি রাখছি।” ইরায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল, “না, আমি নিজেই পারব।” নীলয় হেসে বলল, “জানি। তবুও সাহায্য করতে চাইলাম।” ইরায়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে ব্যাগটা দিয়ে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার ওপাশে একটি কালো গাড়ি এসে থামল। গাড়ির কাঁচ কালো হওয়ায় ভেতরে কে আছে বোঝা গেল না। কয়েক সেকেন্ড পর গাড়িটা আবার চলে গেল। ইরায়া বিষয়টা খেয়ালই করল না, কিন্তু মিহি একবার গাড়িটার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন থমকে গেল। নীলয় সেটা লক্ষ্য করলেও কিছু জিজ্ঞেস করল না।
অন্যদিকে গাড়ির ভেতরে বসে থাকা আরিশের মুখ কঠিন হয়ে ছিল। সে ইরায়াকে নীলয়ের সঙ্গে দেখেছিল। কেন যেন দৃশ্যটা তার ভালো লাগেনি। তার নিজের কাছেই বিষয়টা অস্বাভাবিক মনে হলো। ইরায়া তো তার কেউ নয়। সে কার সঙ্গে কথা বলবে, কার সঙ্গে হাসবে, কার সঙ্গে থাকবে—এসব নিয়ে তার ভাবার কথা নয়। তবুও বুকের ভেতর অকারণ বিরক্তি জমে উঠল। আরণদব পাশে বসে তার মুখ দেখে মুচকি হেসে বলল, “কী হলো?” আরিশ কোনো উত্তর দিল না। “ওই যে নীলয় ছেলেটা?” আরিশ এবার তাকাল। “তুই ওকে চাস?” “চিনি না। কিন্তু তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে চিনে ফেলতে হবে।” আরিশ ঠান্ডা গলায় বলল, “ওর ব্যাপারে কিছু জানার দরকার নেই।” আরণদব হেসে বলল, “তুই বলছিস দরকার নেই, অথচ পাঁচ মিনিট ধরে ওর দিকে তাকিয়ে আছিস।” আরিশ এবার বিরক্ত হয়ে বলল, “চুপ কর।” আরণদব হেসে মাথা নাড়ল। “বুঝেছি। ব্যাপারটা গুরুতর।”
সন্ধ্যায় ইরায়া বাড়ি ফেরার পর দেখল তার বাবা আবার ফোনে কথা বলছেন। এবার বাবার মুখে আগের চেয়েও বেশি উদ্বেগ। সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ শুনল। কথার মাঝে বাবার মুখ থেকে একটি নাম ভেসে এল, কিন্তু ইরায়া নামটা ঠিকমতো শুনতে পেল না। শুধু শেষ কথাটা পরিষ্কার শুনল—“ওদের আবার ফিরে আসার কথা ছিল না।” ইরায়ার বুকের ভেতর কেমন একটা ধাক্কা লাগল। বাবা তাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে ফোন কেটে দিলেন। “তুই কখন এলি?” ইরায়া স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল, “এই তো।” বাবা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন, “আজ কোথায় গিয়েছিলি?” “মিহির সঙ্গে।” “আর কেউ ছিল?” প্রশ্নটা শুনে ইরায়া একটু অবাক হলো। “নীলয় ছিল।” বাবা হঠাৎ কিছুক্ষণ চুপ করে গেলেন। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, “ওকে আমি চিনি না।” ইরায়া বলল, “মিহির পরিচিত।” বাবা আর কিছু বললেন না। কিন্তু তার মুখের পরিবর্তন ইরায়ার চোখ এড়াল না।
সেই রাতে ইরায়া বিছানায় শুয়ে ছিল, কিন্তু ঘুম আসছিল না। একদিকে বাবার আচরণ, অন্যদিকে আরিশের কথা—সব মিলিয়ে মাথার ভেতর যেন অনেকগুলো প্রশ্ন। হঠাৎ ফোনে একটি মেসেজ এল। নম্বরটি অপরিচিত। সে মেসেজ খুলে দেখল মাত্র একটি বাক্য লেখা—“সবাইকে বিশ্বাস করো না।” ইরায়ার বুক কেঁপে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে মিহিকে ফোন করল। মিহি ফোন ধরল না। আবার করল। এবারও না। ইরায়া কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর অকারণেই তার মনে হলো, এই মুহূর্তে যদি কাউকে ফোন করতে হয়, তাহলে সে আরিশকেই করবে। নিজের এই চিন্তায় সে নিজেই অবাক হয়ে গেল। “আমি পাগল হয়ে গেছি নাকি?” বিড়বিড় করে ফোনটা পাশে রেখে দিল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবার ফোনটা হাতে নিল। আরিশের নম্বর তার কাছে নেই। অথচ মিহির ফোনে আরিশের নম্বর আছে—এই কথাটা তার মনে পড়তেই সে মিহিকে আবার কল করল।
অন্যদিকে আরিশ তখন নিজের ঘরে বসে সেই একই ধরনের একটি অচেনা মেসেজ দেখছিল। তার মেসেজে লেখা ছিল, “তোমার কাছের মানুষদের মধ্যে একজন এমন কিছু জানে, যা তুমি জানো না।” আরিশ অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ফোনটা বন্ধ করে জানালার বাইরে তাকাল। বাইরে রাত গভীর হয়ে এসেছে। শহরের আলো জ্বলছে, কিন্তু সেই আলো তার মনে কোনো শান্তি আনতে পারল না। তার মনে শুধু একটি মুখ ভেসে উঠছে—ইরায়া। সে জানে না কেন, কিন্তু হঠাৎ তার মনে হলো মেয়েটাকে নিরাপদ রাখা দরকার। এই অনুভূতিটা যুক্তিহীন, অস্বস্তিকর, কিন্তু অস্বীকার করার মতো নয়। সে আরণদবকে ফোন করল। আরণদব ঘুমজড়ানো গলায় ফোন ধরতেই আরিশ বলল, “ইরায়া নওশীন সম্পর্কে কিছু জানতে হবে।” ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর আরণদবের গলা বদলে গেল। “কেন?” আরিশ ধীরে বলল, “কারণ কেউ তাকে নিয়ে আমাকে সতর্ক করছে।” আরণদব আর কোনো মজা করল না। “তুই কি মনে করিস ও বিপদে আছে?” আরিশ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “জানি না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, ওর চারপাশে এমন কিছু ঘটছে, যার ব্যাপারে ও নিজেও কিছু জানে না।” আরণদব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমি খোঁজ নিচ্ছি। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস—কোনো মেয়ের জন্য নিজের মাথা হারিয়ে ফেলিস না।” আরিশ মৃদু গলায় বলল, “আমি মাথা হারাইনি।” আরণদব হেসে বলল, “এখনো না।”
সেই রাতেই শহরের অন্য একটি নির্জন জায়গায় একজন অচেনা মানুষ ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছিল। তার কণ্ঠ নিচু, মুখ অন্ধকারে ঢাকা। সে শুধু বলল, “ওরা দুজন কাছাকাছি আসছে।” ওপাশ থেকে উত্তর এল, “তাহলে নজর আরও বাড়াও।” লোকটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “কিন্তু এখনই কিছু করা যাবে না।” ফোনের ওপাশ থেকে ঠান্ডা গলা ভেসে এল, “আমি জানি। সময় আসেনি।” কল কেটে গেল। অন্ধকারে লোকটির মুখে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল।
আরিশ জানত না সেই রাতের কথাগুলো তার জীবনের সঙ্গে কতটা জড়িয়ে আছে। ইরায়াও জানত না, তার পরিবার যে বিষয়টা গোপন করছে, তার ছায়া ধীরে ধীরে তার চারপাশে ঘন হয়ে আসছে। আর তাদের মাঝখানে তৈরি হওয়া অদ্ভুত টানটাও এখন আর শুধু ঝগড়া কিংবা মজা করার মধ্যে আটকে নেই। আরিশ যতই নিজেকে বোঝায় যে ইরায়া তার জীবনের কেউ নয়, ততই কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে মেয়েটার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আর ইরায়া যতই তাকে বিস্ট, ব্যাধক পুরুষ কিংবা অশুভ লোক বলে নিজের মনকে বোঝায়, ততই তার মনে লোকটার জন্য অদ্ভুত এক জায়গা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই সম্পর্কের শুরু এখনো অনেক দূরে। সামনে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে আরও হাসি, আরও ঝগড়া, আরও ভুল বোঝাবুঝি, আরও কাছাকাছি আসা—আর সেই অদৃশ্য রহস্য, যার দরজা এখনো পুরোপুরি খোলেনি।
চলবে…
# লেখিকা: নূরাইয়া মেঘলা শাহারীন