ফন্ট সাইজ:
থিম:
অপরিপক্ক

১৬তম পর্ব

লেখক: যাজিবা_ জাবিন

#অপরিপক্ক 

#পর্ব_১৬ 
#যাজিবা_জাবিন 
#গ্রামীন_প্লটে_লেখা_সামাজিক_রোমান্টিক_গল্প 
 
(⛔ কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ⛔ চাইলে শেয়ার দিয়ে পাশে থাকতে পারেন)
___________________________
বৈশাখ এলে গ্রামের হাওয়াতেই যেন এক অন্যরকম আনন্দ মিশে যায়। নতুন বছরের প্রথম দিনে দোকানের পুরনো হিসাবের খাতা বন্ধ করে নতুন করে শুরু হয় “হালখাতা”—একটা নতুন আশার অধ্যায়।
গ্রামের হালখাতার রূপটা ছিল অনেক বেশি সহজ-সরল, কিন্তু আন্তরিকতায় ভরা। তখন এত সাজসজ্জা বা আধুনিক আয়োজন ছিল না, তবু উৎসবের আনন্দে কোনো কমতি ছিল না।
দোকানের মাটির মেঝে ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করা হতো, সামনে একটু আলপনা বা সাদামাটা সাজ। কাঠের তাকভরা পণ্য, আর কোণায় বসে দোকানদার নতুন লাল খাতা খুলে বসতেন। খাতার প্রথম পাতায় লেখা থাকত “শুভ হালখাতা” বা “নববর্ষের শুভেচ্ছা”—একদম নিজের হাতের লেখায়।
গ্রাহকেরা নতুন কাপড় পরে, পরিবার নিয়ে দোকানে আসতেন। কেউ পুরনো দেনা শোধ করতেন, কেউ আবার নতুন করে বাকিতে কেনাকাটা শুরু করতেন। আপ্যায়ন বলতে থাকত মুড়ি, বাতাসা, নাড়ু বা গুড়ের মিষ্টি—সবই ঘরোয়া আর আন্তরিক।
মাইক, ব্যানার বা বড় আয়োজন না থাকলেও, মানুষের মধ্যে ছিল এক ধরনের সহজ বিশ্বাস আর সম্পর্কের টান। হালখাতা তখন শুধু হিসাবের খাতা বদলানো নয়, ছিল মানুষের মধ্যে আস্থা আর ভালোবাসা নতুন করে গড়ে তোলার এক বিশেষ উপলক্ষ,নতুন বছরের শুভ সূচনা আর পারস্পরিক বিশ্বাসের এক সুন্দর ঐতিহ্য।
প্রতিবছর হালখাতায় মিলন ব্যস্ত থাকতো দোকানের সাজসজ্জা ও নানান ধরনের আয়োজন নিয়ে,তবে এ বছর তার তেমন আগ্রহ নেই এসবে।
মাস্টার বুঝে ছেলের মনের অবস্থা তাই এবার সে নিজেই যতোটা পারলো দোকানের কর্মচারী ও ছোট ছেলে মাসুদকে সঙ্গে নিয়ে আয়োজন করলো।
মাসুদ বরিশালে "কর্ণকাঠী" (কর্ণকাঠী ইজ্জতুল আলিম মাদ্রাসায় হাফেজী লাইনে পড়াশুনা করছে)
সেখান থেকে ময়মনসিংহ আসাযাওয়ার ঝামেলা অনেক। বছরে দুবার সে বাড়ি আসে, রমজান মাসে আর বৈশাখ মাসে।
বৈশাখ মাসে বাড়িতে আসার পেছনের কারণ একটাই।
মিলনের দোকানের হালখাতা উপলক্ষে মোটামুটি বড় পরিসরে, দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এবং তার নেতৃত্ব দেয় মাসুদ। গ্রামভিত্তিক মসজিদের সংখ্যা খুবই কম এবং মাওলানা হুজুরদের সংখ্যাও কম।
মাস্টার বাদল খুব গর্ব বোধ করে তার ছোট ছেলেকে নিয়ে,বড় ছেলে মিলন লেখাপড়া বন্ধ করে যে আ ঘা ত দিয়েছে তাকে,সেই আ ঘা তে অনেক টাই মলম লাগানোর কাজ করেন মাসুদ।
_______________
রেবেকার অসুস্থতা মিলনকে মানসিক ভাবে ভেঙে দিচ্ছে। চারদিন হয়ে গেলো এখনো তার র ক্ত পা ত কমেনি, উল্টো মেয়েটার শরীর রক্তশূন্য ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
রেবেকা বিছানায় যখন পেটের ব্যাথায় ছটফট করে, মিলন তখন অস্থির হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে চায়, কিন্তু রেবেকা তাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়, কান্নাকাটি করে নিজের বাড়িতে যাওয়ার বায়না ধরে,যা মিলন মানতেই পারছে না। মিলন তাকে যেতে দিতে চায় না, শেষের বার নাটকীয় একটা পরিস্থিতি থেকে তাকে নিয়ে এসেছে, এখন এই অবস্থায় সেনপুর গেলে জালাল মিয়া কি তার বিবিকে তার কাছে আসতে দেবে? যদি না দেয়? যদি বলে তার মেয়ে এই বাড়িতে সুখে নেই, আর দেবেনা এখানে
তখন মিলন কি করবে? সে তার বিবিকে ছাড়া থাকতে পারবেনা।
_______________
আমেনা বেগম তো ধরেই নিয়েছে রেবেকা কে পিশাচ ধরেছে , সে ঢাকঢোল পিটিয়ে ফেলেছে এ বিষয় নিয়ে কয়েক দফায়, মিলন কেও ভয় পাচ্ছে না উল্টো নানান ধরনের কথা শোনাচ্ছে, বিবির পিরায় ব্যথিত জর্জরিত মিলন কোনো দিকেই মনোযোগী হতে পারছে না, আমেনা বেগম মিলনের নিরবতায় আরো আস্কারা পেয়ে বসেছে,উনি রেবেকা কে সাহস দেওয়া ভরসা দেওয়া তো দূরের কথা উল্টো কলিকে ভুলেও রেবেকার আসেপাশে ঘেঁষতে দিচ্ছে না, খালেদাকেও নিষেধ করেছেন রেবেকার কাছে যেতে। কিন্তু তার কথা উপেক্ষা করে খালেদা খাতুন পুত্রবধূর কাছে যায়।
__________________
রেবেকা বিছানায় শুয়ে শুয়ে দেখছে মিলন দোকানে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে,আজ মিলন সাদা লুঙ্গির সাথে সাদা ফতুয়া পরেছে, মিলনের সোজা নাক, দৃঢ় চোয়াল, আর হালকা দাড়ি যা তাকে পরিণত ও পুরুষালী করে তোলে, মাটির দেয়াল সংযুক্ত আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে মাথায় চিরুনি চালালো মিলন, রেবেকা ততক্ষণে উঠে বসেছে 
রেবেকা::::: আন্নে এতো সাইজ্জা ক‌ই যাইতাছুইন?
মিলন::::: সাজলাম কই চুলে কাফোই
(চিরুনি )লাগান কি সাজা নাহি‌!
রেবেকা:::: বেডা মাইনষের এডিই‌ সাজ,ক‌ই যাইতাছুইন?
মিলন::::বাজারে যাই কেন কিছু লাগতো তোমার?
রেবেকা::::: বাজারে বৈশাখী মেলা হ‌ইতাছে, ইস্ আমি যাইবার পারলাম না, গেছে বার বাড়িত আছিলাম আব্বার লগে গেছি
মিলন বুঝতে পারলো রেবেকার মনের অবস্থা, হাতের চিরুনি রেখে এগিয়ে গিয়ে বসলো রেবেকা সামনে, দুহাতে আকড়ে ধরলো রেবেকার গাল,নরম আদুরী গলায় বললো:
মিলন::::সোনা সামনে মাসে নজরুলের জন্ম জয়ন্তী ১১ জ্যৈষ্ঠ, অনেক বড় মেলা হ‌ইবো হেইনো তোমারে ল‌ইয়া যামু 
রেবেকা:::: লাগতো না আন্নে আমারে আমার বাড়িত দিয়া আহুইন।
মিলন::::তোমারে তো ক‌ইছি এইডা তোমার বাড়ি,ঐ বাড়ি এহন আর তোমার না
রেবেকা::::: না আমি বাড়িত যামু,এই বাইত থাকতে ভালা লাগেনা 
(কথাটি বলেই কান্না করে দিল রেবেকা)
চারদিন ধরে মিলন কাছে আসলেই রেবেকার এই এক কথা, মিলন বিরক্ত হচ্ছে এবার, নিজেকে স্বাভাবিক শান্ত রাখার চেষ্টা করলেও তবে পারল ন। রেবেকা গাল দুটো শক্ত করে চেপে ধরে কিছুটা চেঁচিয়ে বলল::
মিলন:::: চুপ আর একবার এই কতা ক‌ইবা না, চারদিন ধ‌ইরা থাকতাম না, যাইবাম গা,ভালালাগে না করতাছো কেন তুমি, কান্দন থামাও বিবি, তুমি ম র লে ও আমার বাঁচলেও আমার আর আমার কাছেই থাহুন লাগবো বুঝছো 
রেবেকা ভয় কান্না থামিয়ে জড়োসড়ো হয়ে গিয়ে,নরম হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরলো মিলনের তার গালে চেপে ধরা পুরুষালী শক্ত হাত দুটো। রেবেকা কোমল হাতের স্পর্শে মিলন দ্রুত গাল ছেড়ে দিলো
চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে স্বাভাবিক করে, মিলন আর পারছে না এই অস্বাভাবিক বিবাহিত জীবন পার করতে, তার এখন অল্পতেই রাগ উঠে যায়, রেবেকা বোঝে না তাকে,বুঝলে হয়তো এইসব বলতো না,সে যে কতোটা তার বিবির প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে সেটা তার বিবি বোঝেনা,তাই তো চলে যাওয়ার কথা বলতে পারে সহজেই, কিন্তু সে একা থাকতে পারবে না,থাকতে চায় না রেবেকাকে ছাড়া।
মিলন বললো:
মিলন::::: দুক্কু পাইছো বিবি, আমি ইচ্ছা ক‌ইরা দেই নাই।
রেবেকা চুপ কথা বলে না, মিলন চায় না রেবেকা তাকে ভয় পাক ,তাই দ্রুত মিলন আলতো করে রেবেকার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে কাছে টানলো, বুকের সাথে বুক চেপে ধরে নরম কন্ঠে বলল::
মিলন::::: আমার সোনা বিবি, আমার চান্দের টুকরা বিবির লাইগা, মেলার থাইকা কি কি আনতাম, নতুন সাজন-পাতি আনতাম,না খাওনের জিনিস আনতাম, নতুন কাপুড় লাগবো নাকি অন্যকিছু 
রেবেকার নাজুক মন মূহুর্তেই একটু আগের সব ভুলে বসলো, অতি উৎসাহ নিয়ে বললো
রেবেকা:::: হ সব লাগবো,সব আনবাইন আর মাঢির পাইলা বাসুন (মাটির হাড়ি পাতিল) ও লাগবো।
মিলন::::: আচ্ছা আর কিছু 
রেবেকা::: মাঢির ব‌উ জামাই ও আনবাইন
মিলন ভ্রু কুঁচকে বলল 
মিলন ::::: তা দিয়া কি করবা তুমি ?
রেবেকা::::জামাই ব‌উ খেলতাম 
মিলন:::: হেডি খেলতে মাডির ব‌উ জামাই লাগবো কেন, তুমি আমি খেলি আমরা তো জামাই-বৌ
রেবেকা:::: আন্নে বড় বেডা মানু (মানুষ) আন্নের লগে খেলুন যাইতো নাকি।
মিলন রেবেকার নাকে নাক ঘষে বলে
মিলন::::তাইলে বড় বেডার মাইনষের গলে যা খেলন যায় তা খেলবা?
রেবেকা:::: কি খেলতাম 
মিলন:::: বড় বড় খেলা, সময় হক বুঝামু , এহন আমারে চুমা দেও দেহি বিবি
রেবেকা"বিসমিল্লাহ" বলে মিলনের গালে ঠোঁট দাবালো মিলন চোখ বন্ধ করে অনুভব করে রেবেকার আদর। মিলন রেবেকার পুরো মুখে ঠোঁট ছোঁয়ায় সময় নিয়ে। তার বিবি ছোট মানুষ ,তাকে এটা ওটা দিলেই খুশি, নিজের কাছে রাখতে মিলন এমন সব এনে দিয়ে ও রাজি, কিন্তু বাপের বাড়ি পাঠাবে না, অন্তত যতোদিন তার সংসারের একটা শক্ত খুঁটি না হচ্ছে।
 _____________________
খালেদা খাতুন যাবে বাপের বাড়ি, তাই দ্রুত একা হাতে সংসারের সব কাজ শেষ করল, এতদিন হাতে হাতে সব কাজে তাকে সাহায্য করেছে রেবেকা, কিন্তু এখন রেবেকা একপ্রকার ঘর বন্ধি, তাই অবশ্যই রেবেকার জন্য না, আমেনা বেগম তাকে ঘরের বাহিরে আসতে নিষেধ করেছে তাই,কলির বাচ্চা হবে তাই সে কোন কাজ করে না আর আমেনা বেগমের তো হাত ধোয় ভাত খায়,সে তো কোনো কাজ করেই না।
মিলন দোকানে যাওয়ার সময় বলে গেছে ফিরতে দুপুর হবে, খালেদা খাবার নিয়ে রেবেকার ঘরে ছুটে,তাকে খাইয়ে রেখেই রওনা দেবে সে, এই বাড়িতে সে ছাড়া রেবেকা কে খাবার দেওয়া আপাতত কেউ নেই।
আমেনা বেগম বারান্দায় বসে দেখছিল, খালেদা মিলনের ঘর থেকে বের হতেই আমেনা বেগম বলে::
আমেনা:::: ধুর মুখপুড়ি ম র তুই ম র, বারবার ক‌ইতাছি ঐ পিচাশ ধরা ছেড়ির কাছে যাইছ না,তাও যাছ।
খালেদা:::: মায়া আন্নে হুদাই এডি ক‌রতাছুইন, মিলন ভেজালে আছে তাই কিছু ক‌ইতাছে না কিন্তু,ক‌ইলজায় একটু ডর রাহুইন পুত কিন্তু আমার রাগী বহুৎ 
আমেনা:::: আমি হাচা কতা ক‌ই দেইহা আমার নাতি কিছু কয় না,এডি তোমার মতো বলদ বুঝবো কেমনে, মাথায় তো গোবরের গাট্টা ছাড়া কিছুই নাই। তোমার নিজের মাইয়া কিন্তু পোয়াতি সাবধান হও, পিশাচ গন্ধ পাইলে ঐ পেঢের ছাউ খাইয়া তুফান তুলবো।
আমেনা::::: মায়া আন্নের মুখটা সামালদেন,যহন যা ইচ্ছা ক‌ওয়া ভালা না,আর বৌয়েরে কুনো পিশাচ টিচাশ ধরে নাই, পিশাচ যারে ধরে তার আশেপাশে যেওন যায় নাহি খাইস্টা গন্ধে।
খালেদা ক‌থাটা বলেই চলে গেলো ,আমেনা বেগম তা দেখে মুখ ঝামটালো,কলি তখন পেছনে এসে তার দাদিকে বললো:
কলি::::: বু হাচাই কি পিশাচ আমার গেন্দা আবু (পিচ্চি বাচ্চা) খাইয়া হালবো?
আমেনা::::‌আমি থাকতে তা হ‌ইবার দেম,তোর মায়েরে কি এমনে এমনেই বাপের বাড়িত যাইবার দিতাছি নাহি,ঐ খবিশের নাতনি আগে যাক,বাড়িঢা খালি হক, পিশাচ দৌড়ানের বেবস্থা করমু।আমারে তো চেনে না ঐ পিশাইচ্চায় ওরে যা টাইট করুম দেহিছ কেমন চিল্লায়, চিল্লাইবো আর ক‌ইবো "ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি" 
__________________
 
মিলন দ্রুত আসবে বলে গেলেও আসতে পারেনা, দোকানের মালিক সে তা ছাড়া আরও একটা নতুন দোকান উদ্বোধন হবে কিছু দিনের মধ্যেই, মাসুদের তদারকিতে যোহরের পর মিলাদ মাহফিল সম্পন্ন হবে, সেই হিসেবে মিলনের বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হবে। সেসব কথা চিন্তা করে মিলন দ্রুত মেলায় যায়, রেবেকার জন্য পছন্দ করে যা যা কিনার ছিল কিনে নিতে, যাতে করে সন্ধ্যায় হালখাতার অনুষ্ঠান শেষ হতে সোজা বাড়িতে চলে যেতে পারে।
অন্যদিকে খালেদা খাতুন খুব দ্রুত যেতে চাইলেও যেতে পারলো না মরিচার চরে,আজকেও নৌকা সংকট, বৈশাখ উদযাপন করতে মানুষজন নানান যায়গায় যায়গায় যাচ্ছে, কেউ আবার মেলায় ঘুরতে যাচ্ছে, ঘন্টাখানেক দাঁড়ানোর পর সে নৌকায় চড়তে পরলো।
খালেদা খাতুনের দুশ্চিন্তার শেষ নেই,আজ বাড়িতে কেউ নেই রেবেকা একা একেবারে, আমেনা বেগমকে বিশ্বাস নেই তার, শাশুড়ি তো তার‌ই ,তার থেকে কে ভালো চেনে তাকে, নিশ্চয়ই তার পেটের মধ্যে কিছু জটলা আছে ,নয়তো একবার বাবার বাড়ি যাওয়ার কথা বলতেই অনুমতি দিয়ে দিলো, যেখানে দিনের পর দিন বায়না করেও বাপের বাড়ি যেতে দেয়নি।
তাই তো খুব অগচরে খালেদা,এক সের চালের বিনিময়,আমেনা বেগমের উপর নজর রাখতে রোজিনা কে রেখে এসেছে, রোজিনা তাদের ভিটার পাশের সবজি ক্ষেতে কাজ করছে জামাই সহ, মাঝে মাঝে তাদের বাড়িতেও কাজ করে ঘর লেপে, কাপড় ধোয়, সেই মহিলাই।
নদী পার হয়ে খুব দ্রুত বালুচর হেঁটে,খালেদা খাতুন নিজের বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালো। আজকে ভোরবেলা মিলনের সাথে গোপন বৈঠক হয়েছে তার, মিলন তখন তার মা খালেদা খাতুন কে বলে সে রেবেকাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে, খালেদা খাতুন তখন ছেলেকে বোঝায় হুট করেই হাসপাতালে নিয়ে গেলে, গ্রামের মানুষ রেবেকার শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে নানান কথা বলবে, অপয়া অলক্ষী বলবে। মিলন তখন ভাবে সত্যি তাদের গ্রামে এসব কথা খুব দ্রুত রটে। খালেদা খাতুন তখন ছেলের মলির মুখ দেখে বলে, মরিচার চড়ে বড় মসজিদের হুজুর খুব ভালো এসব বিষয়ে, তার কাছে শরীর বন্ধের তাবিজও নিয়ে থাকে মানুষেরা সাথে পানি পড়াও দেয়। মিলন তখন নিষেধ করে দেয় ,তার বিবিকে এই সমস্ত উল্টাপাল্টা ঔষধ খাওয়াবে না। তারপরও খালেদা খাতুন খুব জোর করে মিলনকে ,শুধু একটু পানি পড়াই তো আর তাবিজ গলায় ঝুলিয়ে রাখা যায়। এতে যদি রেবেকা সুস্থ হয়ে যায় তাহলে কষ্ট করে হাসপাতালে নিয়ে গ্রাম হাসানোর দরকার কি। মায়ের কথা মানে মিলন তবে এটাই শেষ। এবার কিছু না হলে সে রেবেকা কে হাসপাতালে নিয়েই যাবে, তাতে মানুষ যা ইচ্ছা বলুক তার কিছুই যায় আসে না।
খালেদাকে দেখেই খবিরুন নেসা, ঘসেটি বেগম অবাক হয়ে গেলো,হাসমত সওদাগর তখন পুকুরে মাছ ধরছিলো, মেয়েকে দেখেই খুশিতে আত্মহারা। 
ঘসেটি বেগম নাতনিকে দেখে খুশি তবে বিজ্ঞ বৃদ্ধা বুঝতে পারলো তার নাতনি এমনি এমনি আসেনি সে খালেদা কে জিজ্ঞেস করলো 
ঘসেটি::::: কিতা হ‌ইছে ব‌ইন ঐ খবিশের ঘরের খবিশ কি কিছু করছে নি 
খালেদা::::: হেয় তো অনেক কিছুই করে বু আমার লগে ,তয় এহন আমার পুতের বৌডার পেছনে লাগছে
ঘসেটি::::: এই খবিশ মরলেও ঠিক হ‌ইবার না
খালেদা খাতুন সব খুলে বললো‌ দাদীর কাছে
ঘাসেটি:::: হায় হায় ঐ ছুডো মাইয়াডা ঐ শ‌ইলে এডি সহ্য করতাছে কেমনে ,ওর বাপের বাড়িত যানে এডি
খালেদা::::: না না উপায় আছে এডি যানলে হেরা মাইয়া ল‌ইয়া যাইবো , মিলন তা চায় না তাই এহনো যানাইনাই কিছু, নিজেগোর মতো কইরা একটু চেষ্টা করি আগে।
ঘসেটি:::::: হ হ তাই ভালা , জামাই বাড়িত এই ঘটনা ঘটছে এহন বাহের বাড়িত মানলে দোষ ধরবার পারে হেরা।
__________________________
স্বার্থপরতা মানুষের এমন এক প্রবণতা, যেখানে নিজের চাওয়া-পাওয়াই হয়ে ওঠে একমাত্র অগ্রাধিকার। এই মানসিকতা ধীরে ধীরে হৃদয়ের উদারতাকে সংকুচিত করে এবং সম্পর্কের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করে। যে মানুষ শুধু নিজের লাভের কথা চিন্তা করে, সে হয়তো সাময়িকভাবে কিছু অর্জন করতে পারে, কিন্তু প্রকৃত সুখ ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিতই থাকে।আমেনা বেগম তার বাস্তব উদাহরণ।
বাড়ি ফাঁকা পেয়ে আমেনা বেগম, জমিলা বুড়ির পরামর্শে, সাহায্যে পিশাচ তাড়াতে শিয়ালের শুকনা মল সংগ্রহ করেছে,জমিলা বলে দিয়েছে, শিয়ালের মল (গু)পানিতে গুলিয়ে রেবেকা কে খাওয়ালে ও মল আগুনে পুড়ে ধোয়া দিলে, তার দুর্গন্ধে রেবেকার শরীর থেকে পিশাচ দূর হবে।
রোজিনা আড়াল থেকে সবটা শুনলো,সে এখন কি করবে তা বুঝতে পারছে না, আমেনা বেগম তার ঘরের বারান্দায় বসে,দুই হাতে পলেটিন পেঁচিয়ে শিয়ালের মল গুঁড়া করে ভাঙ্গা মাটির ছোট কলসে তে গুলিয়ে নিচ্ছে, পাশেই মাটির ভাঙ্গা মালসার ভেতর চুলা থেকে গরম কয়লা নিয়ে নিয়েছে, শিয়ালের মল এই কয়লার মধ্যে দিলে ধোয়া তৈরি করবে এবং রেবেকা কে মলের শরবত খাইয়ে, এই মালসা রেবেকার ঘরে রেখে বাহির দিক দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেবে সেই ছক এঁকেছে সে। দুই- তিন ঘন্টা কেউ বাড়িতে আসবে না এরই মধ্যে পিচাশ তাড়ানো শেষ।
কলি::::: দাদি কামডা কি ঠিক হ‌ইবো,যদি আরো খারাপ কিছু হয়
আমেনা::::: চুপ কর তুই,তোর গেন্দার কতা ভাব, অন্য কিছু ভাবন লাগতো না,আর খবরদার এডি কেউ যেন না যানে।
কলি দাদির ভয়ে আর কিছু বলে না।
আমেনা বেগম নাকে কাপুড় বেঁধে নিয়েছে সবকিছু তৈরি রেবেকা কাছে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই, রোজিনা এক গামলা কাদামাটি সঙ্গে শুকনো কাপড়ের নেড়ারা নিয়ে উঠানে এসে দাঁড়ায়। আমেনা তাকে দেখেই চমকায়।
দ্রুত হাতে শিয়ালের মল দিয়ে তৈরি জিনিসগুলো পেছনে রেখে বলে 
আমেনা:::::: তোমার এহন এইনো কি,ব‌উ বাইত না,এহন যাও পরে আইও
রোজিনা ভয়ে আছে খুব , তবুও সাহস করে মিথ্যা ঘটনা বানিয়ে বলে দিলো
রোজিনা::::: জে জেঢিআম্মা মিলন তহন বাজারে যাইবার কালে ক‌ইলো, ওর ঘরখান সুন্দর কইরা লিইপা দিতে,আইজ বৈশাখ মাসের পরথম দিন তাই।
আমেনা বেগম খুব বিরক্ত হ‌ইলো , রাগে দাঁতে দাঁত পিষে বলল
আমেনা::::: তয় এহন কেন আরো আগে কি ম র বা র গেছিলা
রোজিনা::::: জেঢিআম্মা যানুইন তো কাম করি ভাত খাই, এতক্ষণ হান্নানগোর সবজি বাগানে কাম করতাছিলাম তাই দেরি হ‌ইলো, মিলন ক‌ইছে না করি কেমনে।
আমেনা::::: আচ্ছা আচ্ছা তাড়াতাড়ি করো, বেশি সময় যেন না লাগে।
 রোজিনা দ্রুত মিলিয়ে ঘরে ঢুকে, বিছানায় তাকিয়ে দেখে রেবেকা গুটিসুটি মেরে ঘুমাচ্ছে, মেয়েটাকে দেখেই বড্ড মায়া হচ্ছে তার, কি নাদুসনুদু সুন্দর মেয়েটা শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। যার বাড়িতে এমন দাদি শাশুড়ি আছে তার কপালে এর থেকে ভালো আর কি হবে।
রোজিনা কাদামাটি দিয়ে খুব আস্তে আস্তে ঘর লেপতে শুরু করলো, যাতে ঘর লেপা শেষ হওয়ার আগে খালেদা খাতুন বাড়ি ফিরে আসে। তাছাড়াও উনি খুব চালাকি করে তার স্বামীকে বাজারে মিলনের দোকানে পাঠিয়েছে। 
_____________________
খালেদা খাতুন হুজুরের কাছ থেকে পানি পরা আর তাবিজ নিয়েই রওনা হয়েছে বীরপুরের উদ্দেশ্যে, তবে সে একা নয় সাথে তার দাদী ঘসেটি বেগম ও আছেন দুইজন নদী পার হতে নৌকার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে, খালেদা খাতুনকে খুব চিন্তিত-বিচলিত দেখাচ্ছে, ঘেমে নেয় একাকার অবস্থা তার,ঘসেটি বেগম তাকে দেখে বলে
ঘসেটি:::;; এতো ঘামতাছোস কেন, কিছু হ‌ইবো না,ঐ বুড়ি শ য় তা ন তয় মা র বো তো না 
খালেদা::::: বু হেয় হাত না মা র লেও দাঁতে মা রে,আন্নে তো থাহুইন না তাই যানুইন না।
অন্যদিকে আসরের নামাজ শেষে, মাত্র দোয়া মাহফিল শুরু করেছে,মিলন দোয়া ধরেই বাড়িতে চলে যাবে মনটা তার রেবেকার কাছেই পড়ে আছে।
রোজিনার জামাই এখনো‌ রাস্তায়,এতোটা পথ হেঁটে যেতে সময় লাগবে তার, ভ্যানে চড়ে যাওয়ার পয়সা নেই তার কাছে।লোকটার আবার এক পায়ে সমস্যা আছে, একটা পা বড় একটা ছোট।
অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে, ঘড়ির কাঁটা অনুযায়ী এক ঘন্টার মতো, আমেনা বেগম খুব বিরক্ত এখনো ঘর লেপা হচ্ছে না তাই। সে রাগি কন্ঠে গলা চিৎকার করে বলে
আমেনা::::: কি লো বান্দির বেডি এতক্ষণ লাগেনি ঘর লেপতে,বাইর হ জলদি।
_____________________
রোজিনা কি আর করবে সে অনেক সময় নষ্ট করেছে ইচ্ছা করেই,এখন তো বের হতেই হবে,তার দ্বারা আর কি করা সম্ভব।
তবে আমেনা বেগম যাতে ঘরে না ঢুকতে পারে তাই , বেশি বেশি কাদা মাটি দিয়ে ঘর লেপেছে।
বাহিরে বের হয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে রোজিনা আমেনা বেগম কে বলে।
রোজিনা::::: জেঢিআম্মা লেপন শেষ তয় ঘর হুগাইতে(শুকাতে) সময় লাগবো,দেহুইন যে বিলাই যেন না ডুহে।
আমেনা তা শুনে আরো রেগে গেলো,রাগে কটমট করে তাকালো রোজিনার দিকে। রোজিনা ভয়ে সেখান থেকে চলে গেলো।
আমেনা বেগম দেখলো ঘরের দুয়ারে একে বারে কাঁচা কাদামাটি, সত্যিই শুকাতে সময় লাগবে, অপেক্ষা করলে সময় চলে যাবে, তখন তার এই শিয়ালের মলে হাত দেওয়াই বৃথা হয়ে যাবে, তাছাড়া পিচাশ তাড়ানোর এমন সুযোগ সে আর পাবে না। 
তাই আমেনা বেগম বুদ্ধি করলো,আগে মালসার জ্বলন্ত কয়লায় শিয়ালের মল দিয়ে ঘরের ভেতর ধোয়া দেবে, তখন এই ধোয়ার বিশ্রী গন্ধ রেবেকার শরীর পিশাচ সহ্য করতে না পেরেই অর্ধেক কাহিল হয়ে যাবে ততক্ষণে ঘরটাও শুকিয়ে যাবে, তখন সে ঘরে ঢুকে মলের শরবত খাইয়ে দিলেই সব সমস্যা শেষ।
যেমন ভাবা তেমন কাজ, আমেনা নাকেমুখে আঁচল গুঁজে, ধোয়া ওঠা মালসা নিয়ে রেবেকার ঘরের ভেতরে রেখে, বাহির থেকে দরজাটি বন্ধ করে দিল।
পাঁচ মিনিটের মাথায় ঘরের ভেতর থেকে রেবেকা কাশির শব্দ শুনা গেলো, আমেনা বেগম তার বারান্দায় বসেই শুনছে আর বলছে
আমেনা::::: সহ্য কর নতবৌ,তোর শ‌ইলতে পিশাচ আইজ আমি খেদাইয়াই (তারায়ে)ছাড়মু
ততক্ষণে রেবেকা উচ্চস্বরে কাঁশতে কাঁশতে কান্না করে ডাকছে 
রেবেকা::::: আমমমমম্মা আমমমমম্মা দোর খুলুইন, আমার দম বন্ধ হ‌ইয়া গেলো,কেও নাই দোরডা খুলুইন আমি ম‌ ই রা যায়াইম আমমমমম্মা
কলির সহ্য হচ্ছে না রেবেকার চিৎকার,কিন্তু সে পিশাচ ভয় পায় তাই কিছু করতে পারছে না। আমেনা বেগম‌ও বিচলিত হচ্ছে রেবেকার চিৎকার শুনে তবে রেবেকার জন্য না।
বাড়ির বাহিরে শব্দ পেলে অন্য মানুষ শুনে ফেলবে,এসে দেখে নিবে সে কি কাণ্ড ঘটিয়েছে সেটা ভেবে। 
________________________
খালেদা খাতুন নৌকা থেকে নেমে বাড়ির পথে দ্রুত হাঁটছে,ঘসেটি বেগম তার সাথে পা মেলাতে পারছে না, দাদিকে পেছনে ফেলেই খালেদা ছুটছে তার মনে হচ্ছে কিছু খারাপ ঘটছে।
অন্যদিকে রোজিনার জামাই মাত্র‌ই মিলনের দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে,ভেতরে বাতাসা জিলাপি বিতরণ করা হচ্ছে,তাকে দেখে মাস্টার এগিয়ে গেলো জিলাপি নিয়ে পেছনে মিলন দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িতেই যাবে সে হাতে রেবেকার জন্য মেলা থেকে কিনে আনা জিনিস গুলো।
রোজিনার জামাই হাঁপাতে হাঁপাতে বললো
:::::::আন্নেগোর বাইত যেন কি হ‌ইছে রোজি আমারে পাডাইলো ক‌ইলো মিলনরে যেন এহনি বাইত যাইবার ক‌ই।
কথাটা শুনেই মিলনের বুক কাঁপতে লাগলো, মাস্টার ছেলেকে দেখে নিলো কোনা চোখে,বললো:
বাদল::::: কার কি হ‌ইছে
:::::: তা জানিনা রোজিরে ক‌ইবার হুনলাম জেঢিআম্মা নাকি কি সবনাইসা কাম করতাছে,আন্নেরা জলদি যাইতাইন।
মিলন তা শুনেই রাগি চোখে তাকালো বাবার দিকে,বাদল মাস্টার সেই চোখে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না, চোখ দিয়ে সব ভস্ম করে দিতে চাইছে যেন।
মিলন দোকান থেকে বেরিয়ে আসার আগে কর্মচারীকে উদ্দেশ্য করে বলল রোজিনার স্বামীকে বকশিশ দিয়ে দিতে।তার পর এক প্রকার দৌড়ে গিয়ে ভ্যানে চড়ে বসলো
মিলন::::: চাচা যতো জলদি চালাবার পারো চালাও ভাড়া বেশি পাইবা।
ভ্যান চালক তাই শুনলো। 
এখন দেখার বিষয় 
মিলন কিংবা খালেদা খাতুন কে আগে বাড়িতে ফিরে রেবেকা কে উদ্ধার করে আমেনা বেগমের কুসংস্কার কর্ম থেকে।
চলবে.............

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন