#অবাধ্য_ভালোবাসা
#লেখিকা_নওশিন_আদ্রি তা
#পর্ব_৬
আদ্রি তা ঘুম থেকে উঠে পাশে নীড়কে না দেখতে পেয়ে ঘড়ির দিকে তাকায়। আর তাকাতেই অবাক হয়ে যায় কারণ ঘড়ির কাটায় তখন দশটা বেজে বিশ মিনিট ফজরের নামাজ পড়ে আবার ঘুমিয়ে গিয়েছিল। এত দেরি হয়ে যাওয়া ভাবেনি আদ্রি তা। আড় মোড় ভেঙে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিচে যেতেই মিসেস চৌধুরী মুচকি হাসি দেন।
–সরি মামনি দেরি হয়ে গেলো কীভাবে বুঝিনি।
–আরে ব্যাপার না এইরকম হওয়া আমার সাথেও কত হয়েছে।
–কোনো কাজ থাকলে বল মামনি আমি করে দেব।
–হ্যাঁ আছে তো আমার আর রুপা (নীড়ের ছোট চাচি) সাথে গল্প করো আসো।
মামনির কথায় হালকা হাসলো আদ্রি তা।
"এই বাড়ির প্রতিটা মানুষ এর ব্যবহার অমায়িক। শুধু মাত্র তার খাটাশ মার্কা বেয়াদব স্বামী ব্যতীত। কথায় কথায় ত্যাড়ামি ঘ্যাউড়ামি করতেই হবে তার।"
মনে মনে নীড়কে গাংলি দিয়ে পুনরায় নীলিমাকে জিজ্ঞেস করে,
–আচ্ছা। বাকিরা সবাই কই?
–তোমার বাবা আর চাচু অফিসে। তিন বাঁদরের মধ্যে দুই বাদর গেছে ভার্সিটি আর বড় দুই বাদর মানে নীড় আর রিয়াজ গেছে দলের কোথায় যেন সমস্যা হচ্ছে তাই মিটিং করবে নাকি। এই দুই টাকে নিয়ে সারাদিন ভয়ে থাকা লাগে। যে বিপদের সাথে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছে।
–তুমি মানা করো না কেন।
–মানা তো করেছি কিন্তু নীড় কি আর কথা শোনার ছেলে। বড় ভাইয়ের পিছন পিছন ছোটটাও যুক্ত হয়েছে এখনো কত রাত দেখা যায় বারোটা একটার দিকে বাড়িতে ফিরে আসে। মায়ের মনে যে চিন্তা হয় সেটা তো আর এই ছেলে বুঝেনা। রিয়াজের জন্য চিন্তা হয় না কারণ নীড় কাউকে একটা আঁচ অবধি আসতে দিবে না কিন্তু সে অন্যের প্রতি যতটা যত্নশীল নিজের প্রতি ততটাই উদাসীনা এইজন্যই এতো তাড়া ছিল তোর বাবাই এর ওকে বিয়ে দেওয়ার বউ আসলে যদি বউ এর জন্য বাড়িতে থাকে এইসব ভেবে।
মামনীর কথা শুনে আনমনেই বলে উঠলাম "আমাকে আঙ্কেল বউ করে এই বাড়িতে আনেনি পণ্য হিসেবে কিনে এনেছে তার বংশের উত্তরসূরী আনার জন্য। তোমরা ভুল মানুষ কে নেতা সাহেবের বউ হিসেবে নিয়ে এসেছো আমাকে তো উনি পছন্দ করেন না সেটা বাসর রাতে উনার
বলা কথাতেই টের পেয়েছিলাম। সেখানে আমার টান আসবে কই থেকে। আর সেই টানে কাজ থেকে বাড়ি ফিরা চিন্তা করাও বিলাসিতা ময় ছাড়া কিছুই না"
–তুমি ত উনাকে অনেক ভালোবাসো মামনি তাহলে উনি তোমার সাথে এমন ব্যবহার করে কেন?
আমার কথায় মামনী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চাচিও কেমন জানি চুপসে গেলেন।
"তারজন্য আমিই দায়ী মা। ছেলেটা আমার জন্যেই আজ আমার থেকে দূরে। ছোট বেলাই এমন ছিল না। আমি যখন বিয়ে করে এই বাড়িতে আসি তখন নীড় আর রিয়াজের বয়স মাত্র ছয় বছর। আমাকে পেয়ে দুইজনাই খুব খুশি হয়েছিল আমিও মায়ের ভূমিকা পালন করতে পিছপা হয়নি। নীড় তখন অনার্স কমপ্লিট করেছে হঠাৎ করেই একদিন বাড়িতে এসে ভাংচুর শুরু করে দিলো কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। তোমার বাবা(নিহাল) সেদিন ভাংচুর বন্ধ হওয়ার পরে গিয়েছিল তারপর বাবা ছেলের মাঝে কি কথা হয় জানি না আমি। কিন্তু তারপর থেকেই আমার ছেলে আমার থেকে দূরে সরে যায়"!
মামনির সম্পূর্ণ কথা শেষ হতেই ভাবনাই পড়ে যায় আমি। সব কেমন ঘোলাটে লাগছে ছুট করে কি এমন হয়েছিল যার কারনে মা ছেলের সম্পর্কে ফাটল ধরে গেল?
মিসেস চৌধুরী আদ্রি তাকে ভাবনাই পড়তে দেখে মনে মনে ভেবে নেন তার আর নীড়ের প্রতি চিন্তা হচ্ছে হয়তো। উনি প্রসঙ্গ পালটাতে বলে উঠেন,
–আমার ছেলেকে তোর কেমন লাগে?
মিসেস চৌধুরীর কথায় আদ্রি তা হেসে উঠে।
–জানো মামনি তোমার ছেলে প্রথম দেখায় আমাকে কি বলেছিল।
মিসেস চৌধুরী এবার উৎসুক নয়নে তাকায়।
–ইডিয়েট!!!
কথাটা বলেই আদ্রি তা হেসে উঠে। কিন্তু হাসতে পারলে না মিসেস চৌধুরী।
–তোদের মধ্যে সব ঠিকঠাক আছে তো? দেখ খারাপ ভাবে নিস না এমনি জিজ্ঞেস করলাম।
–তোমার ওই খাদুশ ছেলের থেকে কি আশা করো তুমি মামনি। নিরামিষ নাম্বার ওয়ান তোমার ছেলে। (হেসে উঠে)
মিসেস চৌধুরী পুনরায় আশাহত হন। কিন্তু ফোনের স্ক্রিনের ওপারে থাকা ব্যক্তিটি ভ্রু কুঁচকে তাকায় কথাটা শুনে। হ্যাঁ নীড় সারা বাড়িতে হিডেন সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়েছে। শুধু মাত্র প্রতিটা মানুষ এর বেড রুম ব্যতীত। সাথে মাইক্রোফোন যাতে সব শুনা যায়। মিটিং এ বসে বসে সে ফোনের ক্যামেরায় মা আর বউ এর কথা শুনছিলো কিন্তু বউ এর মুখে নিরামিষ কথাটা ঠিক পছন্দ হলো না তার।
–বুঝলে আসিফ (নীড়ের পি.এ) মাঝেমধ্যে কথায় না কাজে করে দেখাতে হয় নাহয় মানুষ তোমার ক্ষমতার উপরে প্রশ্ন তুলে।
উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে তাকায় থাকে নীড়ে দিকে। এখানে কথা হচ্ছিলো কি নিয়ে আর নীড় বলে কি কিছু মাথায় ঢুকলো না কিন্তু নীড়ের মুখে থাকা শয়তানি হাসি দেখে সবাই বুঝলো নীড় কিছু একটা গন্ডগোল পাকাতে চাচ্ছে।
রিয়াজ ভাইয়ের এই হাসি দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
–কি চলছে তোর মাথায় বিপক্ষ দল কোন হুমকি ধমকি দিয়েছে নাকি।
নীড় আড় মোড় ভাঙে।
–নাহ ভাবছি বউকে নিয়ে হানিমুনে যাবো।
রিয়াজ তো হতবাক হয়ে গেছে নীড়ের মুখে এহেন কথা শুনে।
–ভাই তুই ঠিক আছিস।
–হুম ওইটা তোর ভাবিকে এবার বুঝাবো।
–মানে।
নীড় রিয়াজের প্রশ্নে কোনো উত্তর দেয় না। নীড় কোট জড়ায়ে চলে যেতে নিলেই রক্তাক্ত অবস্থায় কেবিনে প্রবেশ করে নীড়ের বিশ্বস্ত সাকিেব। তাকে এই অবস্থায় দেখে সবাই অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
–সাকিব এই অবস্থা কি করে হলো তোর।
–ভাই ওরা আমাদের উপর হামলা করেছিলো আমাদের দুইজন সাথীকে মেরে দিয়েছে ভাই।
সাথে সাথেই নীড়ের চোখ জোড়ায় রাগ ফুটে উঠে। সবাই সে জায়গায় উপস্থিত হয়। নীড় হকি স্টিক নিয়ে রেগে সবাইকে মারতে শুরু করে দেয়া। হঠাৎ করে পিছন থেকে দুইজনে তার উপরে লোহার রড দিয়ে আঘাত করো হালকা নীচু হয়ে ব্লকতেই আরও দুইটা আঘাত এসে লাগতেই বাকিরা তাদের ধরে নেই।
তাদের মধ্যে একজন বলে উঠে।
–বেশি হাওয়াই উড়িস না। তুই দুই দিনের মন্ত্রী। আমাদের ভাই ই হবে সবার বড়। দেখে নিসা আরাফাত ভাই খুব শীঘ্রই দেশে আসবে সেদিন তোর কি হাল করবে।
নীড় রেগে দুইজনার গলা চেপে ধরে।
–তোর ওই ভাইকে বলে দিশ নীড় চৌধুরী সিংহ। আর সিংহ বনে একটাই হয়। তার এই বনের সিংহ আমি এখানে রাজত্ব শুধু আমার।
দুইজনার জিহ্বা বের হয়ে আসতে নিলেই রিয়াজ নীড় কে সরিয়ে আনে।
–ভাই শান্ত হো এই সময় পাবলিকলি কাউকে মেরে ফেলা মানে রাজনীতি ক্যারিয়ারে লাল দাগ পরে যাওয়া।
নীড় রিয়াজের কথায় ছেড়ে দেয়। ঘড়ির কাটা তখন জানান দিচ্ছে এগারোটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। নীড়ের অপেক্ষায় আদ্রি তা সোফাতেই বসে বসে ঝিমুচ্ছে। এদিকে নীড় ব্যথা শরীর নিয়েই তার কারখানা থেকে ঘুরে এসেছে। সেখানেও সামান্য ঝামেলা বেঁধে ছিল। তার নিজস্ব কাপড়ের ফ্যাক্টরি আছে যেখানে কাপড় সরাসরি বিদেশে রপ্তানি করা হয়। সাথে অন্য নামে দুইটা রেস্টুরেন্টে সপ্তাহ আগে খুলেছো যাতে ভবিষ্যতে তার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে তার পরিবার তার স্ত্রীর কারো উপর ভরসা করতে হবেনা।
বারোটার দিকে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় প্রবেশ করে নীড়। গেট খোলার আওয়াজ পেতেই ঘুম ভেঙে যায় আদ্রি তার। নীড়কে এই অসময়ে আসতে দেখে আদ্রি তা রাগী কণ্ঠে বলে উঠে,
–আপনি নিজেকে ভাবেন কি হ্যাঁ কোথাকার কোন রাজা আপনি আর আমরা আপনার দাসী বান্দি। নিজের ইচ্ছায় আসবেন নিজের ইচ্ছায় যাবেন। কেন? আমাদের কোন মূল্য নাই আমার কথার জবাব দিচ্ছেন না কেন?
নীড় চুপচাপ ওয়াশরুমে চলে যায়। পানি পড়ার আওয়াজে বুঝতে বাকি থাকেনা নীড় সাওয়ার নিচ্ছে। ঠান্ডার আমেজ পড়ছে। সে আমেজে এই রাতের বেলা গোসল করার কোন মানে বুঝলো না আদ্রি তা।
"সারাদিন এসি রুমে থেকেও নাকি গোসল করা লাগে। সব নেতাদের এমন গরম নাকি শুধু এই নেতার এতো গরম"
বুঝলাম না।
সাওয়ার নিয়ে খালি গায়েই বেরিয়ে আসে নীড় পরনে শুধু টাউজার। নীড় বেমালুম ভুলেই গেছে তার পিঠে থাকা দাগের কথা। নীড় আয়নার সামনে দাঁড়াতেই তার চোখ যায় আদ্রি তার বড় হয়ে থাকা চোখের দিকে। সাথে সাথে নীড়ের মনে পড়ে পিঠের কথা। চট জলদি শার্ট পড়তে নিলে বাধা দেয় আদ্রি তা।
নীড়ের হাত ধরে বিছানায় বসে ধীর কণ্ঠে প্রশ্ন করে উঠে।
–মলম কোথায় রাখা?
–কেন এই টুকুর জন্য মলমের দরকার নাই।
–মলম কোথায় ( ধীর কণ্ঠে)
আদ্রি তার ধীর কণ্ঠ যেন পছন্দ হলো না নীড়ের তাও বলে উঠে "কাবার্ডের দ্বিতীয় ড্রয়ারে"।
আদ্রি তা মলম নিয়ে এসে আলতো হাতে মলম লাগায় দিতে শুরু করে। পিঠের যে জায়গায় বাড়ি লেগেছে তা ফুলে নীল হয়ে আছে বুঝায় যাচ্ছে কতটা ব্যথা পেয়েছে।
–বউ হিসেবে মানেন না জানি। আমার সাথে সংসার করতে ইচ্ছুক না বুঝি। কিন্তু যতদিন আছি বউ না মানেন বন্ধু হিসেবেই নিজের ক্ষত গুলোর কথা জানাতে কি খুব বেশি অসুবিধা হবে। নাকি আমি এতোটাই পর। অবশ্য আপন ছিলাম বা কবে।
অভিমানী কণ্ঠে কথা গুলো বলে উঠে যায় আদ্রি তা। নীড়ের খারাপ লাগে সে নিজেই ভুলে গিয়েছিল আর আদ্রি তা চিন্তা করবে স্যামপাথি দেখাবে তাই জানাতেও চায়নি। নীড় শার্ট পড়তে চাইলে আদ্রি তা নিষেধ করে।
–মাত্র ঔষধ লাগিয়েছি এখন পড়িয়েন না।
–ঔষধ এর বাহানা আমার বডির দিকে বাজে নজর দিতে চাও প্রচুর ধান্দাবাজ মেয়ে তো তুমি। আমি জানি আমার বডি সুন্দর আড়চোখে দেখে তা বুঝাতে হবেনা।
নীড়ের কথায় সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নেয় আদ্রি তা। তা দেখে নীড় হো হো করে হেসে উঠে। আদ্রি তা বিড়বিড় করে বলে উঠে,
"অসভ্য নেতাসাহেব"