#মায়ার শেষ প্রহর
# লেখিকা : জান্নাতুল মাওয়া
#কপি করা নিষিদ্ধ
অতীত থেকে বের হয়ে আসা এত সহজ নয়। মানুষ ভাবে সময় সবকিছু ভুলিয়ে দেয়, অথচ কিছু স্মৃতি সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না—শুধু চুপচাপ বয়ে বেড়াতে হয়। প্রতিদিন নিজেকে বোঝাতে হয়, ‘ওটা শেষ হয়ে গেছে’, তবুও মনের কোনো এক কোণে সেই পুরোনো দিনগুলো নীরবে কষ্ট দিয়ে যায়।
পেছন থেকে কেউ মেহেরিমার কাধে হাত রাখলো, হকচকিয়ে উঠলো রমনী, আয়নার দিকে তাকাতেই সস্তীর নিশ্বাস নিলো,
আপু তুই ভয় পেয়ে গেছিলাম,,
তোকে খুব সুন্দর লাগছে,
মুচকি হাসলো মেহেরিমা,
কি ভাবছিলি??
কই না-তো ! কি ভাববো?
অতীত??
করুন চোখে বোনের দিকে তাকালো মেহেরিমা,
এই একটা মানুষ যার কাছে সব বলা যায়। যে কখনো ওর বড়ো বোন,কখনো বন্ধু, কখনো ঝগরা করার সঙ্গী, ছোট বেলার সেই যে ২০১৯ এ ঘটে গেলো ওর জীবনের সব থেকে বীভৎস ঘটনা, তার পর থেকে এই উড়নচণ্ডী মেয়েটাকে কেউ উরতে দেখেনি , কেউ দেখেনি ছোট মেয়েটার আর্তনাদ, এই একটা মানুষ ছাড়া, যে ওকে সব বেলায় আগলে নিয়েছে,
ভাবনার ভিতেরেই টুপ করে এক ফোটা জল গরিয়ে পরলো মেহেরিমার চোখ থেকে,
ফাহিমা মুচকি হাসলো, সে বোঝে, সে জানে এই মেয়েটার মনের কথা,,
অতঃপর মেহেরিমার কপালে আলতো করে চুমু একে দিয়ে বললো,,
“অতীতটা সুন্দর ছিল না, তাই বলে ভবিষ্যৎটাও অন্ধকার হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। কিছু স্মৃতি মানুষকে ভাঙে, আবার সেই ভাঙা জায়গাগুলো থেকেই একদিন নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলা যায়। বুঝলি??
মুচকি হাসলো মেহেরিমা,
ছাবিহা দৌড়ে এসে জানালে জামাই বাড়ীর মানুষ চলে এসেছে,
ফাহিমা আপু আসো গেট ধরবো!
ধুর আমি হলাম বউ এর বড়ো বোন আমি কীভাবে যাবো? তুই যা,
ঠোঁট উল্টে ছাবিহা বললো, ওকে ফাইন, বাট টাকার ভাগ চাইবা না বলে দিলাম,,
ওকে ওকে যা,,
বিয়ে পরানো শুরু করবো??
মেহেরিমার বাবা বললেন, হুম করেন,
অতঃপর শুরু হলো বিয়ের কার্যক্রম, মেহেরিমার বুক কাপঁছে, চোখ জাপসা লাগছে! কিন্তু কেনো?
এর মধ্যেই সেই সুর সেই কথা,,
রাজি থাকলে বলো মা কবুল?
ছল ছল চোখে রমনী তাকালো বোনের দিকে এই বাড়ীতে যে এই মেয়ে ছাড়া আর কেউ নেই ওর,,
বড়ে বোন চোখে ইশারা দিয়ে ছোট বোনকে আস্বস্ত করলো,,
ক,,কবুল,
আলহামদুলিল্লাহ,,
জোরালো শব্দের ধ্বনি তোলে সবাই বললো,,
আজ থেকে সে অন্য করো,
বর পক্ষ কে বসানো হয়েছে খাবার খাওয়ার জন্য, খাবার শেষ এ সবাই রওনা দিবে বউ কে নিয়ে,
একজন ভদ্রলোক বললো, রোস্টটা মজা হয় নাই ঠিক না ভাইজান ? উহহু এমন খারাপ হইছে কেন কন - তো?
এমন কয়জন মানুষ না থাকলে হয়তো সমাজ বলেও কিছু থাকতো না, এদেরকেই তো সমাজ বলে মুর্খ সমাজ,
ভদ্রলোক জানতো না তার পাশেই দারিয়ে সব তদারকির দায়িত্বে ছিলো, মেহেরিমার ফুফা, খুব রগচটা মানুষ, তবে আজ রাগটা অতো না দেখিয়ে ঠান্ডা এবং ভয়ংকর রকমের কন্ঠে বললো, আসলে ভাই একটা কথা কি জানেন, কুকুর এর পেটে ঘি হজম হয় না, দামী জীনিস নাহ?
ওনার এমন ভয়ংকর রকমের কন্ঠে লোকটা কিছুটা ভয় পেলো হয়তো তাই একদম চুপ হয়ে গেলো!
যাওয়ার পালা,,
বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় মেয়েদের কষ্টটা শুধু বিদায়ের কান্না নয়—এটা যেন নিজের চেনা পৃথিবীটা পেছনে ফেলে অচেনা এক জীবনের দিকে হাঁটা।
যে ঘরটায় এতদিন নিজের মতো করে ছিল, যে মানুষগুলোকে ঘিরে প্রতিদিনের জীবন—সবকিছু এক মুহূর্তে পিছনে পড়ে যায়। মুখে হাসি রাখার চেষ্টা করে, অথচ বুকের ভেতরটা তখন শুধু একটা কথাই বলে—“আমি কি সত্যিই এই বাড়িটা ছেড়ে চলে যাচ্ছি?”
মেয়েরা সেদিন শুধু একটা বাড়ি ছেড়ে যায় না, সঙ্গে নিয়ে যায় শৈশবের স্মৃতি, মায়ের আঁচল, বাবার আদর, ভাই-বোনের সঙ্গে কাটানো হাজারটা মুহূর্ত। আর সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার—যে বাড়িটাকে এতদিন নিজের বাড়ি বলেছে, বিদায়ের পর সেটাকেই বলতে হয় “বাপের বাড়ি।”
মেহেরিমার চোখ জলছে, ঝাপসা হয়ে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে ,, ততক্ষণে তার চোখ পড়লো একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তার বাবার দিকে ,,
মেয়েকে বাপের বাড়ি থেকে বিদায় দেওয়ার সময় মায়ের কান্না সবাই দেখে, কিন্তু বাবার নীরব কষ্টটা খুব কম মানুষই বোঝে।
যে বাবা সারাজীবন মেয়ের আবদার পূরণ করতে গিয়ে কখনো ক্লান্তি দেখাননি, সেই বাবাই বিদায়ের মুহূর্তে মুখটা শক্ত করে রাখেন—শুধু মেয়েটা যেন বুঝতে না পারে, তার চলে যাওয়ায় বুকের ভেতরটা কতটা খালি হয়ে যাচ্ছে।
মেয়েটা শ্বশুরবাড়ির পথে চলে যায়, আর বাবা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকেন… চোখের পানি লুকিয়ে। মনে মনে হয়তো শুধু একটাই কথা বলেন—
“মা, তুই সুখে থাকিস… তোর বাবার বাড়িটা সবসময় তোর জন্যই থাকবে।”
মেহেরিমা আর আটকাতে পারলো না চোখের জল, ডুকরে কেঁদে উঠে রমনী,, শরীরের ভার যেনো বেড়ে গেছে কয়েক গুন,, জ্ঞান হারিয়ে পরেই যাচ্ছিলো, এক জোরা দক্ষ হাত ওকে ধরে ফেললো, তবে কে ধরলো তা ঠাহর করার আগেই, রমনী জ্ঞান হারিয়ে পরেই রইলো সেি মানুষটার বুকে,
টিপ টিপ করে চোখ খোলার পর, কিছুক্ষণ রমণী ঠাহর করতে পারলো না সে আদৌ কোথায় আছে, তখনই তার মাথায় আসলো সে তো তার শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলো, তাহলে কি এটাই তার শ্বশুরবাড়ি ?
বেলি ফুলের গন্ধে ম-ম করছে চারিপাশ, কেনোনা তাদের বাসর ঘরটা বেলি ফুলের সাহায্যেই সাজানো হ'য়েছে,, দুনিয়ার বুকে হাজার ফুল আছে তবে মেহেরিমার এই বেলি ফুলটা অসম্ভব পছন্দের,, কেনো? তা রমনী নিজেও জানে না,,
হুট করেই রমনীর শরীরে ঝঙ্কার দিলো, আ-আজ বাসর রাত? সে বাসর ঘরেই বসে আছে? ডুকরে কেঁদে উঠে রমনী, প্রায় আধা ঘণ্টা যাবত কাঁদছে মেয়েটা কেউ জানে না, কেউ দেখেও নি,
এমন সময় দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো এক পুরুষ অবয়ব, অন্ধকার রুম, বাইরে যে সাজানো হয়েছে সেই লাইটিং থেকেই বোধহয় আলো আসছে, যা দ্বারা পুরুষ টির মুখের অর্ধেক অংশ দেখলো রমনী,
আবারও ডুকরে কেঁদে উঠে মেয়েটা, ফুপিয়ে কেঁদে চলছ সে,,
ঘরে প্রবেশ করার সময় জারিফ কিছুটা কান্নার শব্দ শুনেছিলো, জানতো মেহেরিমাই কাঁদছে,
আস্তে আস্তে হেঁটে খাটের কাছে এসে বসলো খাটের এক কোনায়,
তখুনি ঘটে গেলো এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা,,