ফন্ট সাইজ:
থিম:
মায়ার শেষ প্রহর

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: জান্নাতুল মাওয়া
#মায়ার শেষ প্রহর 
#লেখিকা:জান্নাতুল মাওয়া
#কপি করা নিষিদ্ধ 

মেহেরিমা নিজের কথাতেই হঠাৎ থেমে গেলো।

“আপনাকে চিনতে আমারও কি সময় লাগবে, জারিফ?”
কথাটা বলেই বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হলো।
কেন সে এমন কথা বলল?
নিজেকে সামলে ছবিটা আবার ব্যাগের ভেতর রেখে দিল সে।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
“মেহেরিমা?”
ফাহিমার কণ্ঠ।
মেহেরিমা দ্রুত দরজা কাছে গেলো ।
ফাহিমা হাতে একটা ছোট ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখেই মেহেরিমার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
“তুই এখানে?”
“হ্যাঁ। আম্মু পাঠিয়েছে কিছু জিনিস দিতে। আর আমি নিজেও দেখতে চাইলাম, আমার বোন নতুন বাড়িতে কেমন আছে।”
ফাহিমা ঘরে ঢুকেই চারপাশে তাকাল।
তারপর সোফার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“ওহ্! এই সেই সোফা?”
মেহেরিমা বুঝতে না পেরে বলল,
“কোন সোফা?”
“যেখানে তোর মহামান্য স্বামী গতরাতে ঘুমিয়েছে।”
মেহেরিমা সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় মুখ নামিয়ে ফেলল।
হু ”
ফাহিমা হেসে উঠল।
“আচ্ছা আচ্ছা, আর জ্বালাব না। তবে একটা কথা বল।”
“কী?”
“মানুষটা কেমন?”
মেহেরিমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল—রাতের সেই শান্ত মুখটা, চায়ের কাপটা, আর বারবার বলা কথাগুলো।
‘আমি আপনাকে কোনো কিছুর জন্য জোর করব না।’
মেহেরিমা ধীরে ধীরে বলল,
“ভালোই মনে হয়।”
ফাহিমা ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“মনে হয়?”
“আমি তো এখনো ঠিকমতো চিনিই না।”
ফাহিমা মৃদু হেসে তার মাথায় হাত রাখল।
“তাহলে সময় নিয়ে চিনিস।”
মেহেরিমা জানালার বাইরে তাকাল।
অদ্ভুতভাবে আজ কথাটা শুনে তার ভয় লাগল না।
বরং মনে হলো—
হয়তো সত্যিই সময় দেওয়া যায়।
হয়তো এই অচেনা সম্পর্কটারও একটা গল্প আছে।
যে গল্পের শুরুটা সে নিজের ইচ্ছেতে লেখেনি…
কিন্তু পরের পাতাগুলো?
সেগুলো হয়তো তার নিজের হাতেই লেখা হবে।ফাহিমা চলে যাওয়ার পর মেহেরিমা আবার জানালার পাশে এসে দাঁড়াল।
বিকেলের নরম রোদটা ধীরে ধীরে ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ তার মনটা কেমন অস্থির।
সকাল থেকে বারবার একটা কথাই মনে পড়ছে—
“কিছু মানুষকে চিনতে সময় লাগে।”
জারিফকে কি সত্যিই সময় নিয়ে চেনা উচিত?
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।
মেহেরিমা ঘুরে তাকাল।
জারিফ দাঁড়িয়ে আছে।
“নিচে যাবেন?”
“কেন?”
“আম্মু সবাইকে নিয়ে বিকেলের নাশতা করতে বসেছেন।”
মেহেরিমা একটু ইতস্তত করে বলল,
“আমি গেলে… সমস্যা হবে না তো?”
জারিফ অবাক হয়ে তাকাল।
“সমস্যা কেন হবে?”
“সবাই তো নতুন…”
“আপনিও তো এই বাড়িরই একজন এখন।”
কথাটা খুব স্বাভাবিকভাবেই বলল জারিফ।
কিন্তু মেহেরিমার বুকের ভেতর কেমন যেন নরম একটা অনুভূতি ছড়িয়ে গেল।
জারিফ দরজার পাশে সরে দাঁড়াল।
“চলুন।”
মেহেরিমা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
কিছুদূর যাওয়ার পর মেহেরিমা হঠাৎ বলল,
“জারিফ?”
“হুম?”
“আপনি কি সবার সঙ্গেই এমন?”
জারিফ তাকাল।
“কেমন?”
“মানে… এত ভদ্র।”
জারিফ হেসে ফেলল।
“আপনি কি আমাকে পরীক্ষা করছেন?”
মেহেরিমার মুখে হালকা হাসি ফুটল।
“না। জানতে চাচ্ছি।”
“তাহলে উত্তরটা পরে দেব।”
“কেন?”
জারিফ সামনে তাকিয়ে বলল,
“আপনি তো বলেছিলেন, আমাকে চিনতে আপনার সময় লাগবে।”
মেহেরিমা থমকে গেল।
লোকটা তাহলে কথাটা মনে রেখেছে!
জারিফ হেঁটে চলে গেল।
মেহেরিমা কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে তার পেছনে হাঁটতে লাগল।
অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
হয়তো—
এই মানুষটাকে চিনতে সত্যিই একটু সময় দেওয়া যায়।বিকেলের নাশতার টেবিলে বসতেই মেহেরিমা বুঝল, সবাই বেশ স্বাভাবিকভাবে তার সঙ্গে কথা বলছে।
কেউ তার পছন্দের খাবার জানতে চাইছে, কেউ আবার গল্প করছে।
মেহেরিমা ছোট ছোট উত্তর দিচ্ছিল।
হঠাৎ তার সামনে একটা প্লেট এগিয়ে এলো।
“এটা নিন।”
মেহেরিমা তাকিয়ে দেখল—জারিফ।
প্লেটে তার পছন্দের সিঙ্গারা আর পাশে এক কাপ চা।
মেহেরিমা অবাক হয়ে বলল,
“এগুলো কেন?”
জারিফ খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
“সকালে ঠিকমতো খাননি।”
“আপনি খেয়াল করেছেন?”
“হুম।”
মেহেরিমা আর কিছু বলল না।
পাশ থেকে জারিফের ছোট বোন হেসে বলল,
“ভাইয়া, তুমি তো দেখি বিয়ের পর থেকেই খুব দায়িত্বশীল হয়ে গেছো!”
টেবিলে কয়েকজন হেসে উঠল।
মেহেরিমা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
জারিফ অবশ্য নির্বিকার।
“মানুষটার যত্ন নেওয়া দায়িত্বশীলতা হলে, হ্যাঁ।”
কথাটা শুনে সবাই আবার হাসল।
কিন্তু মেহেরিমা চুপ হয়ে গেল।
তার হাতটা কাপের ওপর থেমে রইল।
কেন জানি কথাটা তার ভেতরে গিয়ে লাগল।
এতদিন সে ভেবেছিল—
এই বিয়েতে সে একাই।
কিন্তু অচেনা এই বাড়িতে এসে বারবার একজন মানুষ তাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে—
সে একা নয়।
নাশতা শেষে সবাই উঠে গেলে মেহেরিমাও উঠতে যাচ্ছিল।
হঠাৎ জারিফ বলল,
“এক মিনিট।”
মেহেরিমা থেমে তাকাল।
“জি?”
জারিফ টেবিল থেকে তার ফোনটা তুলে দিল।
“আপনি এটা এখানে রেখে গিয়েছিলেন।”
মেহেরিমা ফোনটা হাতে নিয়ে বলল,
“ধন্যবাদ।”
জারিফ মাথা নাড়ল।
তারপর একটু থেমে বলল,
“আর হ্যাঁ…”
“হুম?”
“আজ রাতে যদি ভয় লাগে, আমাকে ডাকবেন।”
মেহেরিমা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন… আমি যেন ভয় না পাই।”
জারিফ মৃদু হাসল।
“ভয় পাওয়া আপনার দোষ না।”
একটু থেমে সে বলল,
“তবে ভয় পেলে একা থাকাটাও জরুরি না।”
মেহেরিমা কোনো উত্তর দিল না।
শুধু ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে চলে গেল।
আর জারিফ তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার দিকে।
হয়তো তাদের সম্পর্কের নাম এখনও শুধু—
স্বামী আর স্ত্রী।
কিন্তু কোথাও খুব অল্প অল্প করে,
একটা বিশ্বাস জন্ম নিতে শুরু করেছে।
বিয়ের এক সপ্তাহ কেটে গেল।
সাতটা দিন।
অথচ মেহেরিমার কাছে মনে হলো, এই বাড়িটাকে যেন সে ধীরে ধীরে চিনে ফেলছে।
প্রথম দিনের সেই অস্বস্তিটা আর নেই। শাশুড়ির সঙ্গে এখন বেশ স্বাভাবিকভাবেই কথা বলে, ছোট ননদের সঙ্গে গল্প করে, এমনকি রান্নাঘরে গিয়েও মাঝে মাঝে শাশুড়িকে কাজে সাহায্য করে।
শুধু একজন মানুষই এখনও তার কাছে পুরোপুরি অচেনা।
জারিফ।
অবশ্য জারিফের সঙ্গে এখন আগের মতো অস্বস্তিও হয় না।
কথা হয়।
তবে খুব বেশি নয়।
সকালবেলা—
“চা খাবেন?”
দুপুরে—
“খেয়েছেন?”
রাতে—
“ঘুমাবেন না?”
এই ছোট ছোট কথার মধ্যেই যেন তাদের এক সপ্তাহ কেটে গেছে।
সেদিন বিকেলে মেহেরিমা বারান্দায় বসে বই পড়ছিল।
হঠাৎ জারিফ এসে তার সামনে দাঁড়াল।
“আপনি কি সবসময় বই পড়েন?”
মেহেরিমা বই থেকে চোখ না তুলেই বলল,
“হুম।”
“আমাকে দেখেও?”
মেহেরিমা এবার তাকাল।
“আপনাকে দেখে কী করব?”
জারিফ হেসে ফেলল।
“জানি না। সাধারণত মানুষ নতুন বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে কথা বলে।”
মেহেরিমা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আপনি তো নিজেই কথা বলেন না।”
“আমি তো ভাবি আপনি অস্বস্তি পাবেন।”
মেহেরিমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বইটা বন্ধ করল।
“এখন আর পাই না।”
জারিফের মুখের হাসিটা একটু থেমে গেল।
“সত্যি?”
“হুম।”
“তাহলে একটা প্রশ্ন করি?”
“করুন।”
জারিফ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“আপনি কি এখনও আমাকে ভয় পান?”
মেহেরিমা উত্তর দিল না।
কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
“না।”
জারিফের চোখে খুব অল্প একটা স্বস্তি ফুটে উঠল।
“ভালো।”
“কিন্তু…”
মেহেরিমা আবার বলল,
“আপনাকে এখনও পুরোপুরি চিনি না।”
জারিফ মৃদু হেসে বলল,
“চেনার জন্য তো পুরো জীবন পড়ে আছে।”
কথাটা শুনে মেহেরিমা চুপ করে গেল।
এক সপ্তাহ আগে এই মানুষটার সঙ্গে একই ঘরে থাকাটাই তার কাছে ভয়ংকর ছিল।
আর আজ?
আজ তার মনে হচ্ছে—
এই মানুষটাকে নিয়ে আরও কিছু জানতে ইচ্ছে করছে।
জারিফ উঠে দাঁড়াল।
“চলুন।”
“কোথায়?”
“বাইরে।”
“কেন?”
“আপনাকে একটা জায়গা দেখাব।”
মেহেরিমা অবাক হয়ে তাকাল।
“কোথায়?”
জারিফ রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল,
“সেটা গেলে দেখবেন।”
মেহেরিমা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বইটা হাতে নিল।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
সে জানত না—
জারিফ তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে এবার তার মনে কোনো ভয় হলো না।
বরং মনে হলো—
এই প্রথম, নিজের ইচ্ছেতে জারিফের সঙ্গে কোথাও যেতে তার ভালোই লাগছে।গাড়িটা থামতেই মেহেরিমা জানালার বাইরে তাকিয়ে থমকে গেল।
চেনা জায়গা।
চেনা সেই ছোট্ট বইয়ের দোকানটা।
মেহেরিমার চোখ বড় হয়ে গেল।
“আপনি… এখানে কেন এনেছেন?”
জারিফ গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে বলল,
“আপনি বই ভালোবাসেন না?”
“বাসি। কিন্তু…”
“তাহলে নেমে আসুন।”
মেহেরিমা ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল।
দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তার মনে হলো, কতদিন পর সে নিজের পছন্দের জায়গায় এসেছে।
জারিফ পাশে এসে দাঁড়াল।
“ফাহিমার কাছ থেকে শুনেছি, আপনি এখানে প্রায়ই আসতেন।”
মেহেরিমা অবাক হয়ে তাকাল।
“আপনি আমার ব্যাপারে এত কিছু জেনে ফেলেছেন?”
জারিফ মুচকি হেসে বলল,
“সব না। একটু একটু করে জানছি। 
মেহেরিমার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
দুজন পাশাপাশি দোকানের ভেতরে ঢুকে গেল।
মেহেরিমা একটার পর একটা বই দেখতে লাগল।
জারিফ একটু দূরে দাঁড়িয়ে চুপচাপ তাকে দেখছিল।
হঠাৎ মেহেরিমা একটা বই হাতে নিয়ে ঘুরে বলল,
“এটা নেব।”
“ঠিক আছে।”
“আর এটা।”
“হুম।”
“আর ওইটা…”
জারিফ হেসে বলল,
“আপনি বই কিনতে এসেছেন, নাকি দোকানটাই কিনবেন?”
মেহেরিমা মুখ ফুলিয়ে বলল,
“আপনিই তো বললেন যা ভালো লাগে নিতে।”
জারিফ মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে। যত খুশি নিন।”
মেহেরিমা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
“ধন্যবাদ।”
“কিসের জন্য?”
“আমাকে আমার মতো থাকতে দেওয়ার জন্য।”
জারিফের হাসিটা এবার একটু নরম হলো।
“আপনাকে বদলাতে তো বিয়ে করিনি।”
মেহেরিমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
সে দ্রুত চোখ নামিয়ে বইয়ের পাতায় তাকাল।
জারিফ অবশ্য কিছুই বলল না।
শুধু পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
আর মেহেরিমা প্রথমবার বুঝল—
কখনো কখনো ভালোবাসার শুরুটা বড় কোনো মুহূর্ত দিয়ে হয় না।
হয়তো শুরু হয় এমনই ছোট্ট একটা জায়গা থেকে—
যেখানে কেউ আপনার পছন্দগুলো মনে রাখে।বইয়ের দোকান থেকে বের হতেই মেহেরিমা থেমে গেল।
আকাশটা কখন যে মেঘে ঢেকে গেছে, খেয়ালই করেনি সে।
দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি এসে পড়ল কপালে।
“বৃষ্টি!”
মেহেরিমা আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
জারিফ গাড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
“দাঁড়ান।”
কয়েক মুহূর্ত পর সে একটা ছাতা নিয়ে ফিরে এলো।
ছাতাটা মেহেরিমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“নিন।”
মেহেরিমা ছাতাটা নিতে গিয়ে থেমে গেল।
“আর আপনি?”
“আমি আছি।”
“কীভাবে?”
জারিফ হেসে বলল,
“বৃষ্টিতে ভিজে।”
মেহেরিমা ছাতাটা নিল না।
বরং একটু সরে গিয়ে বলল,
“আপনিও আসুন।”
জারিফ কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নীরবে ছাতাটা মেলে দুজনের মাথার ওপর ধরল।
পাশাপাশি হাঁটতে লাগল তারা।
কিছুদূর যাওয়ার পর মেহেরিমা হঠাৎ বলল,
“জারিফ?”
“হুম?”
“আপনি কি সবসময় মানুষের পছন্দ মনে রাখেন?”
“না।”
“তাহলে আমারটা রাখলেন কেন?”
জারিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর শান্ত গলায় বলল,
“কারণ আপনি যা পছন্দ করেন, সেগুলো নিয়ে কথা বলার সময় আপনার চোখে ভয় থাকে না।”
মেহেরিমা থেমে গেল।
জারিফও থামল।
“তাই ভাবলাম,” সে মৃদু হেসে বলল, “ওই জিনিসগুলো আপনার কাছ থেকে হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত না।”
মেহেরিমা কিছু বলতে পারল না।
বৃষ্টির শব্দের মাঝে শুধু দুজনের নীরবতা।
কিছুক্ষণ পর মেহেরিমা খুব আস্তে বলল,
“আপনি জানেন?”
“কী?”
“আপনাকে নিয়ে আমার ধারণাটা একটু একটু করে বদলাচ্ছে।”
জারিফ তার দিকে তাকাল।
“খারাপ থেকে ভালো?”
মেহেরিমার ঠোঁটে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
“সেটা এখনো বলব না।”
জারিফ হেসে ফেলল।
“ঠিক আছে। সময় নিয়ে বলবেন।”
আবার হাঁটতে শুরু করল তারা।
এই প্রথম—
মেহেরিমার মনে হলো, জারিফের পাশে হাঁটাটা অস্বস্তিকর নয়।
বরং বেশ শান্ত।
আর সেই শান্তিটাই হয়তো একদিন তাদের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় হয়ে উঠবে।
প্রায় দুই সপ্তাহ পরের কথা।
সেদিন দুপুরে মেহেরিমা নিজের ঘরে বসে বই পড়ছিল। হঠাৎ নিচ থেকে তার শাশুড়ির কণ্ঠ ভেসে এলো—
“মেহেরিমা মা, তোমার ফোন!”
মেহেরিমা তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এলো।
ফোনটা হাতে নিতেই ওপাশ থেকে ফাহিমার কাঁপা কণ্ঠ ভেসে এলো।
“মেহেরিমা…”
“হুম আপু?”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ফাহিমা খুব আস্তে বলল,
“দাদাই খুব অসুস্থ।”
মেহেরিমার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
“কী হয়েছে দাদাইয়ের?”
“হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ডাক্তার দেখানো হয়েছে… কিন্তু অবস্থা ভালো না।”
মেহেরিমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
চোখের সামনে ভেসে উঠল দাদাইয়ের মুখটা।
ছোটবেলায় তার হাত ধরে হাঁটা, লুকিয়ে টাকা দেওয়া, তার পছন্দের মিষ্টি এনে রাখা—সবকিছু একসঙ্গে মনে পড়ে গেল।
“আমি… আমি এখনই আসব।”
কথাটা বলেই ফোনটা কেটে দিল সে।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারল না।
“আমি দাদাইয়ের কাছে যাব…”
কথাটা বলতে বলতে সে কাঁদতে শুরু করল।
মেহেরিমার চোখে পানি দেখে জারিফ কিছু বলার আগেই তার মা এগিয়ে এলেন।
“কী হয়েছে মা?”
মেহেরিমা কাঁপা গলায় বলল,
“আমার দাদাই খুব অসুস্থ… আমি ওনার কাছে যেতে চাই।”
কথাটা শুনে মহিলার মুখটাও মলিন হয়ে গেল।
“এ আবার বলার কী আছে? অবশ্যই যাবে।”
মেহেরিমা অবাক হয়ে তাকাল।
“কিন্তু মা… আমি তো—”
“কোনো কিন্তু না।”
তিনি মেহেরিমার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“বিয়ের পর মেয়েরা নিজের বাড়ির মানুষদের ভুলে যায় না মা। আপনজন অসুস্থ হলে সেখানে ছুটে যাওয়া তোমার অধিকার।”
মেহেরিমার চোখ দিয়ে টুপটুপ করে পানি পড়তে লাগল।
 জারিফের মা বললেন,
“জারিফ, গাড়ি বের করো। মেয়েটাকে এখনই নিয়ে যাও।”
জারিফ মাথা নাড়ল।
হুম যাচ্ছি মম, আপনি আসুন ”
তার মা আবার মেহেরিমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আর শোনো, কতদিন থাকতে হবে সেটা নিয়ে চিন্তা করো না। দাদাই সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত থেকো।”
মেহেরিমা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
“মা…”
মহিলাটি তাকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন,
“কাঁদো না মা। আল্লাহর কাছে দোয়া করো। ইনশাআল্লাহ, তোমার দাদাই ভালো হয়ে যাবেন।”
মেহেরিমা চোখ মুছতে মুছতে মাথা নাড়ল।
কিছুক্ষণ পর জারিফ এসে দাঁড়াল তার সামনে।
“চলুন?”
মেহেরিমা ধীরে মাথা নাড়ল।
দরজার কাছে এসে আবার পেছনে তাকাল।
তার শাশুড়ি তখনও দাঁড়িয়ে আছেন।
মেহেরিমা বুঝতে পারল—
এই বাড়িটা হয়তো তার নিজের বাড়ি নয়।
কিন্তু এখানে অন্তত তার কষ্টটা বোঝার মতো মানুষ আছে।
আর সবচেয়ে বেশি—
তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা।
জারিফ।
গাড়ি ছুটে চলেছে শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে।
মেহেরিমা জানালার পাশে বসে একদৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো বারবার ভিজে উঠছে।
জারিফ কয়েকবার তার দিকে তাকিয়েও কিছু বলল না।
হঠাৎ মেহেরিমা নিজেই ফিসফিস করে বলল,
“দাদাই ঠিক থাকবে তো?”
জারিফ স্টিয়ারিংয়ে চোখ রেখেই বলল,
“ইনশাআল্লাহ।”
“যদি কিছু হয়ে যায়?”
কথাটা বলতে গিয়েই মেহেরিমার গলা কেঁপে উঠল।
জারিফ এবার তার দিকে তাকাল।
“এখন খারাপ কিছু ভাববেন না।”
মেহেরিমা চুপ করে রইল।
কিছুক্ষণ পর জারিফ বলল,
“আপনি চাইলে আপুকে আবার ফোন দিতে পারেন।”
মেহেরিমা ফোনটা হাতে নিল।
কিন্তু কল করার আগেই ওপাশ থেকে ফাহিমার কল চলে এলো।
“হ্যালো?”
ফাহিমার গলা শুনেই মেহেরিমা জিজ্ঞেস করল,
“দাদাই কেমন আছে?”
“ডাক্তার আবার দেখতে এসেছে। তুই আর কতদূর?”
“আর বেশি না।”
“তাড়াতাড়ি আয়।”
কলটা কেটে গেল।
মেহেরিমা ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরল।
জারিফ ধীরে বলল,
“আর একটু পরেই পৌঁছে যাব।”
কিছুক্ষণ পর গাড়ি তাদের বাড়ির সামনে এসে থামল।
গাড়ি থামার আগেই মেহেরিমা দরজা খুলে নেমে গেল।
সামনের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল ফাহিমা।
মেহেরিমাকে দেখেই ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
“চল, দাদাই তোকে ডাকছিল।”
মেহেরিমার বুকটা ধক করে উঠল।
“আমাকে?”
“হুম।”
ফাহিমার হাত ধরে সে দ্রুত ভেতরে ঢুকে গেল।
জারিফও কিছুটা দূরত্ব রেখে পেছনে পেছনে এলো।
ঘরের ভেতর ঢুকতেই মেহেরিমার চোখ পড়ল বিছানায় শুয়ে থাকা দাদাইয়ের দিকে।
মুখটা আগের চেয়ে অনেক দুর্বল।
মেহেরিমার চোখ মুহূর্তেই ভিজে গেল।
“দাদাই…”
বৃদ্ধ মানুষটি ধীরে চোখ মেলে তাকালেন।
মেহেরিমাকে দেখেই তার মুখে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল।
“আমার মাইয়াডা আইছে?”
মেহেরিমা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
দাদাইয়ের পাশে বসে তার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,
“হ্যাঁ দাদাই… আমি আসছি।”
দাদাই দুর্বল হাতে তার মাথায় হাত রাখলেন।
“কাঁদিস না মা।”
মেহেরিমা মাথা নেড়ে চোখের পানি মুছল।
কিন্তু হাতটা ছাড়ল না।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জারিফ চুপচাপ সেই দৃশ্যটা দেখছিল।
এই প্রথম সে বুঝল—
মেহেরিমার হাসির পেছনে কতটা গভীর টান লুকিয়ে আছে এই মানুষগুলোর জন্য।
আর সেই মুহূর্তে তার মনে হলো,
মেহেরিমাকে শুধু ভালো রাখা নয়—তার আপন মানুষগুলোকেও ভালো রাখার দায়িত্বটা হয়তো কোনো একদিন নিজের অজান্তেই নিয়ে ফেলবে সে।
দাদাই কিছুক্ষণ পর চোখ মেলে মেহেরিমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জারিফের দিকে তাকালেন।
“ওই যে… জারিফ?”
জারিফ এগিয়ে এসে বলল,
“জি, দাদাই।”
দাদাই মৃদু হেসে বললেন,
“বসো বাবা।”
জারিফ পাশে থাকা চেয়ারে বসে পড়ল।
দাদাই কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
“কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনি এখন কেমন বোধ করছেন?”
“আগের চেয়ে একটু ভালো।”
মেহেরিমা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“তুমি কথা কম বলো দাদাই, ডাক্তার বেশি কথা বলতে নিষেধ করেছে।”
দাদাই হেসে বললেন,
“তুই তো বিয়ের পর দেখি আমাকে শাসন করাও শিখে গেছিস!”
ঘরে থাকা সবাই হেসে উঠল।
মেহেরিমা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“শাসন না করলে কে করবে?”
দাদাই মৃদু হেসে তার হাতটা চাপড়ে দিলেন।
জারিফ চুপচাপ তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই প্রথম মেহেরিমাকে এতটা স্বাভাবিক, হাসিখুশি দেখল সে।
কিছুক্ষণ পর দাদাই চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিতে লাগলেন।
মেহেরিমা আস্তে করে উঠে দাঁড়াল।
জারিফও উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আপনি থাকুন। আমি বাইরে যাচ্ছি।”
মেহেরিমা তাকিয়ে বলল,
“কোথায়?”
“আপনার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি। সকাল থেকে ঠিকমতো কিছু খাননি।”
মেহেরিমা একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
“আচ্ছা।”
জারিফ চলে গেল।
মেহেরিমা দরজার দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত।
ফাহিমা পাশ থেকে মুচকি হেসে বলল,
“কী রে?”
“কিছু না।”
“মুখ দেখে তো কিছু একটা মনে হচ্ছে।”
মেহেরিমা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“চুপ কর তো!”
ফাহিমা হেসে ফেলল।
আর মেহেরিমা নিজের অজান্তেই দরজার দিকে আরেকবার তাকাল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন