ফন্ট সাইজ:
থিম:
বৃষ্টি ভেজা চিঠি

১ম পর্ব

লেখক: আদিবা আফসারা অহনা

বৃষ্টি ভেজা চিঠি

পর্ব ১ — অচেনা চিঠি

সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা কেমন ভারী হয়ে ছিল।

সূর্যের দেখা নেই। চারপাশে ধূসর মেঘের আস্তরণ। মাঝে মাঝে দূরে কোথাও মেঘ গর্জে উঠছিল, আর জানালার কাঁচে টুপটাপ করে বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছিল।

শহরের ব্যস্ত রাস্তা তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। কিন্তু নীলার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল অনেক আগেই।

জানালার পাশে বসে সে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল।

বৃষ্টি তার বরাবরই ভালো লাগত।

কিন্তু আজকের বৃষ্টিটা কেমন যেন অন্যরকম।

মনে হচ্ছিল, এই বৃষ্টির ভেতর কোনো অদৃশ্য গল্প লুকিয়ে আছে।

নীলা হাত বাড়িয়ে জানালার কাঁচ ছুঁয়ে দিল।

ঠিক তখনই—

টুপ!

একটা পানির ফোঁটা নয়, জানালার গ্রিলের ওপর ছোট্ট একটা সাদা খাম এসে পড়ল।

নীলা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

“এটা আবার কী?”

সে উঠে জানালাটা খুলে খামটা হাতে নিল।

খামটা ভিজে একেবারে নরম হয়ে গেছে। তবুও অদ্ভুতভাবে খামের ওপর লেখা কয়েকটা অক্ষর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

“নীলার জন্য।”

নীলার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

তার নাম!

কিন্তু কে পাঠিয়েছে?

খামের পেছনে কোনো ঠিকানা নেই। কোনো প্রেরকের নামও নেই।

শুধু ছোট করে একটা তারিখ লেখা—

২৮ আগস্ট।

আজকের তারিখ।

নীলা কিছুক্ষণ খামটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে খামটা খুলল।

ভেতরে একটা কাগজ।

কাগজটাও ভেজা।

কালো কালিতে লেখা কয়েকটি লাইন।

নীলা পড়তে শুরু করল—

“প্রিয় নীলা,

তুমি হয়তো আমাকে মনে রাখোনি। কিন্তু আমি তোমাকে ভুলিনি।

যেদিন প্রথম বৃষ্টি নামবে, সেদিন এই চিঠিটা তোমার কাছে পৌঁছাবে।

আর সেদিন থেকেই তোমার জীবনের একটা পুরোনো গল্প আবার শুরু হবে।

তুমি যদি সত্যিটা জানতে চাও, তাহলে আজ বিকেল পাঁচটায় পুরোনো রেলস্টেশনের শেষ বেঞ্চে এসো।

একটা কথা মনে রেখো—

তুমি একা আসবে।

— যে তোমাকে একদিন একটা চিঠি লিখেছিল।”

নীলার হাত কাঁপতে শুরু করল।

“পুরোনো রেলস্টেশন?”

সে আবার চিঠিটা পড়ল।

কিন্তু যতবার পড়ছে, ততই তার মনে হচ্ছে—এই কথাগুলো যেন সে কোথাও আগে পড়েছে।

কোথায়?

কখন?

মনে পড়ছে না।

হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো।

“নীলা?”

মায়ের কণ্ঠ।

নীলা তাড়াতাড়ি চিঠিটা ভাঁজ করে বালিশের নিচে রেখে দিল।

“হ্যাঁ মা!”

দরজা খুলে তার মা ঘরে ঢুকলেন।

“এত সকালে উঠে জানালার পাশে বসে আছিস কেন?”

“বৃষ্টি দেখছিলাম।”

মা জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“আজকে কিন্তু অনেক বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে। বাইরে যাওয়ার দরকার নেই।”

নীলা মৃদু হাসল।

“না মা, কোথাও যাব না।”

কথাটা বলেই সে নিজেই চমকে উঠল।

কারণ তার মাথার ভেতর তখন শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—

বিকেল পাঁচটা। পুরোনো রেলস্টেশন।


সকালটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক কাটল না।

নীলা বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল।

দুপুর হলো।

তারপর একটা।

দুইটা।

সময় যেন আজ ইচ্ছে করেই ধীরে এগোচ্ছে।

চিঠিটা সে কয়েকবার পড়েছে।

প্রতিবারই নতুন একটা প্রশ্ন মাথায় এসেছে।

“যে তোমাকে একদিন একটা চিঠি লিখেছিল”—এর মানে কী?

কেউ কি সত্যিই তাকে আগে চিঠি লিখেছিল?

তার ছোটবেলার কথা মনে পড়ল।

কয়েক বছর আগে, স্কুলে পড়ার সময়, একবার সে একটা অচেনা চিঠি পেয়েছিল।

চিঠিতে লেখা ছিল—

“একদিন তুমি বুঝবে, অপেক্ষা কখনো বৃথা যায় না।”

তখন সে ভেবেছিল, হয়তো কোনো বন্ধুর মজা।

চিঠিটা সে গুরুত্ব দেয়নি।

কিন্তু আজকের চিঠির সঙ্গে সেই কথাগুলোর অদ্ভুত মিল।

নীলা উঠে পুরোনো একটা বাক্স বের করল।

বাক্সটার ভেতরে ছিল তার স্কুলের কিছু পুরোনো খাতা, ছবি, ডায়েরি আর ছোটখাটো স্মৃতি।

অনেক খোঁজার পর একটা ভাঁজ করা কাগজ পেল।

তার হাত থেমে গেল।

সেই চিঠি!

প্রায় পাঁচ বছর আগের।

কাগজটা হলদেটে হয়ে গেছে।

নীলা ধীরে ধীরে চিঠিটা খুলল।

সেখানে মাত্র একটা লাইন—

“যেদিন বৃষ্টি তোমার জানালায় আমার চিঠি এনে দেবে, সেদিন বুঝবে আমি ফিরে এসেছি।”

নীলার নিঃশ্বাস যেন আটকে গেল।

সে চেয়ারে বসে পড়ল।

“এটা কীভাবে সম্ভব?”

পাঁচ বছর আগে লেখা চিঠি।

আর আজকের চিঠি।

দুটোতেই বৃষ্টির কথা।

দুটোতেই চিঠির কথা।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো—

পুরোনো চিঠির নিচে কোনো নাম ছিল না।

শুধু একটা ছোট্ট চিহ্ন।

“R”

নীলা অনেকক্ষণ সেই অক্ষরের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ তার মনে একটা নাম ভেসে উঠল।

রায়ান।

নামটা মনে আসতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।

রায়ান—

তার শৈশবের সবচেয়ে কাছের বন্ধু।

প্রায় পাঁচ বছর আগে হঠাৎ করে যে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

কেউ জানত না সে কোথায় গেছে।

এমনকি নীলাও না।

তারপর ধীরে ধীরে সবাই তাকে ভুলে গিয়েছিল।

কিন্তু নীলা পারেনি।

কারণ চলে যাওয়ার আগে রায়ান তাকে বলেছিল—

“একদিন আমি ফিরে আসব।”

নীলা তখন হেসে বলেছিল,

“কখন?”

রায়ান উত্তর দেয়নি।

শুধু বলেছিল,

“যেদিন তুমি আমার লেখা শেষ চিঠিটা পড়বে।”

সেদিন কথাটার কোনো মানে বুঝতে পারেনি নীলা।

আজ বুঝতে পারছে কি?


বিকেল সাড়ে চারটা।

বৃষ্টি তখন আরও বেড়েছে।

মা রান্নাঘরে ব্যস্ত।

নীলা নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

তার ভেতরে দ্বন্দ্ব।

যাবে?

নাকি যাবে না?

একজন অচেনা মানুষ তাকে ডেকেছে।

তাও একা।

পুরোনো রেলস্টেশনে।

যেকোনো কিছু ঘটতে পারে।

কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, এই রহস্যের উত্তর তাকে জানতেই হবে।

শেষ পর্যন্ত একটা ছাতা হাতে নিল নীলা।

দরজা খুলে বের হওয়ার আগে মাকে বলল,

“মা, আমি একটু বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছি।”

মা রান্নাঘর থেকেই বললেন,

“বৃষ্টির মধ্যে বেশি দূরে যাস না।”

“ঠিক আছে।”

নীলা বেরিয়ে গেল।


পুরোনো রেলস্টেশনটা শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে।

অনেক বছর ধরে সেখানে কোনো ট্রেন থামে না।

স্টেশনটার চারপাশে বড় বড় গাছ। জায়গাটা দিনের বেলাতেও বেশ নির্জন।

নীলা সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে পাঁচটা বেজে দশ মিনিট।

বৃষ্টি তখন ঝমঝম করে পড়ছে।

পুরোনো প্ল্যাটফর্মে পা রাখতেই তার মনে হলো, কেউ যেন তাকে দেখছে।

সে চারপাশে তাকাল।

কেউ নেই।

শুধু বৃষ্টির শব্দ।

দূরে একটা ভাঙা ল্যাম্পপোস্ট বাতাসে দুলছে।

নীলা ধীরে ধীরে শেষ বেঞ্চটার দিকে এগিয়ে গেল।

বেঞ্চটা ঠিক চিঠিতে যেমন বলা হয়েছিল।

কাঠের পুরোনো বেঞ্চ।

তার ওপর বৃষ্টির পানি জমে আছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—

বেঞ্চের এক কোণে একটা কালো ছাতা রাখা।

নীলা থেমে গেল।

ছাতাটা নতুন।

মানে কেউ এখানে এসেছে।

তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

“কে?”

কোনো উত্তর নেই।

“আপনি কি আমাকে চিঠি পাঠিয়েছেন?”

নীরবতা।

হঠাৎ—

ঠক!

পেছন থেকে একটা শব্দ হলো।

নীলা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল।

দূরে প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে।

কালো ছাতা হাতে।

মুখ দেখা যাচ্ছে না।

নীলা স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।

লোকটা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।

এক পা।

দুই পা।

তিন পা।

নীলার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

লোকটা কিছুটা কাছে আসতেই হঠাৎ একটা ট্রেনের হর্নের মতো শব্দ দূর থেকে ভেসে এল।

যদিও এই লাইনে বহু বছর কোনো ট্রেন চলেনি।

নীলা চমকে পিছনে তাকাল।

এক মুহূর্ত।

শুধু এক মুহূর্তের জন্য।

তারপর আবার সামনে তাকিয়ে দেখল—

লোকটা নেই।

নীলা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

“কোথায় গেল?”

সে চারদিকে তাকাল।

কেউ নেই।

শুধু বেঞ্চের ওপর সেই কালো ছাতা।

আর ছাতার নিচে রাখা একটা ছোট্ট কাঠের বাক্স।

নীলা ধীরে ধীরে বাক্সটা হাতে নিল।

বাক্সের ওপর খোদাই করা—

R

তার বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ থেমে গেল।

“রায়ান…”

কাঁপা হাতে বাক্সটা খুলল।

ভেতরে একটা ছবি।

পুরোনো ছবি।

ছবিতে দুজন শিশু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।

একজন নীলা।

আর অন্যজন—

রায়ান।

ছবিটার পেছনে লেখা—

“তুমি আমাকে ভুলে গেলেও, এই ছবিটা কখনো মিথ্যা বলবে না।”

নীলার চোখে পানি চলে এল।

কিন্তু বাক্সের ভেতরে আরও একটা জিনিস ছিল।

একটা চিঠি।

সে চিঠিটা খুলল।

“নীলা,

যদি তুমি এই চিঠিটা পড়ো, তাহলে বুঝব তুমি এসেছ।

আমি জানতাম তুমি আসবে।

কারণ তুমি সবসময় উত্তর খুঁজতে ভালোবাসতে।

কিন্তু এবার যে সত্যিটা জানতে চলেছ, সেটা তোমার ধারণার থেকেও বড়।

আমি তোমাকে ছেড়ে যাইনি।

আমাকে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।

আর যে মানুষটা আমাকে তোমার কাছ থেকে দূরে সরিয়েছিল, সে আজও তোমার খুব কাছেই আছে।

তাকে তুমি চেনো।

তুমি প্রতিদিন তার সঙ্গে কথা বলো।

কিন্তু তুমি জানো না—

সে তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় একটা সত্য লুকিয়ে রেখেছে।

আগামী শুক্রবার রাত আটটায় শহরের পুরোনো লাইব্রেরিতে এসো।

সেখানে তুমি আমার কাছ থেকে শেষ উত্তর পাবে।

— রায়ান”

চিঠিটা পড়ে নীলা স্থির হয়ে গেল।

“সে তোমার খুব কাছেই আছে।”

কে?

মা?

কোনো বন্ধু?

কেউ পরিচিত?

তার মাথায় একের পর এক নাম ঘুরতে লাগল।

ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে মায়ের নাম।

নীলা ফোন ধরল।

“হ্যালো মা?”

ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ কোনো কথা শোনা গেল না।

তারপর মায়ের কাঁপা গলা—

“নীলা… তুই এখন কোথায়?”

“স্টেশনে।”

“কী?”

মায়ের গলায় আতঙ্ক।

“তুই এখনই বাসায় ফিরে আয়।”

“কিন্তু কেন?”

মা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন,

“কারণ… আজ সকালে তোর ঘরে আমি একটা পুরোনো ছবি দেখেছি।”

নীলা অবাক।

“কোন ছবি?”

মায়ের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল।

“তুই আর রায়ানের ছবি।”

নীলার বুক ধক করে উঠল।

“তুমি রায়ানকে চিনতে?”

ওপাশে আবার নীরবতা।

তারপর মা বললেন—

“রায়ান কে, সেটা তুই যেটা ভাবিস… আসলে সে তা নয়।”

“মানে?”

মা উত্তর দিলেন না।

শুধু বললেন,

“বাড়ি ফিরে আয়। সব বলব।”

ফোন কেটে গেল।

নীলা ফোনটা নামিয়ে নিল।

বৃষ্টি তখনও পড়ছে।

কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, বৃষ্টির শব্দের ভেতর কেউ যেন ফিসফিস করে বলছে—

“সত্যিটা জানতে হলে ফিরে এসো…”

নীলা ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে এল।

কিন্তু যাওয়ার আগে একবার পিছনে তাকাল।

শেষ বেঞ্চটার ওপর কালো ছাতাটা এখনও পড়ে আছে।

আর তার পাশে—

একটা মানুষ দাঁড়িয়ে।

কালো পোশাক।

মুখটা অন্ধকারে ঢাকা।

নীলা স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ লোকটা হাত তুলল।

তার হাতে একটা চিঠি।

তারপর দূর থেকেই চিঠিটা মাটিতে ফেলে দিল।

পরের মুহূর্তেই বিদ্যুৎ চমকাল।

এক ঝলক আলোয় নীলা লোকটার মুখ দেখতে পেল।

আর সেই মুখ দেখে তার শরীর যেন অবশ হয়ে গেল।

কারণ মুখটা—

রায়ানের।

কিন্তু রায়ান তো পাঁচ বছর আগে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল!

নীলা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না।

দৌড়ে বেরিয়ে গেল স্টেশন থেকে।

তার পেছনে বৃষ্টি পড়তে থাকল।

আর শেষ বেঞ্চের ওপর পড়ে রইল সেই চিঠি।

চিঠির ওপর মাত্র একটি বাক্য—

“নীলা, তুমি যে মানুষটাকে খুঁজছ, সে তোমার কাছেই আছে।”

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন