#জীবন_পেন্ডুলাম
#তাজরীন_ফাতিহা
"এই দিলু এক প্লেট ভাত দে দ্রুত?"
দিলদার টেবিলে টেবিলে কাস্টমারকে খাবার দিচ্ছিলো। এর মধ্যেই প্রতিদিনের কাস্টমার হাফিজ ভাই এসেই উক্ত কথাটা বললেন। দিলদার প্লেটে ভাত বেড়ে হাফিজ ভাইয়ের টেবিলে দিয়ে গেলো। সাথে দিলো আলু ভর্তা আর মুগের ডাল। এই লোক জীবনেও মাছ,গোশত খায় না। খায় না নাকি পকেটে টাকা নেই কে জানে? তবে দিলদার তাঁর কর্মজীবনে এখন পর্যন্ত তাকে এসব খেতে দেখেনি। খুব বেশি হলে ডিম দিয়ে খায়, এর বেশি কিছু খেতে দেখেনি। দিলদার আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আফজাল হোসেন ক্যাশিয়ারে বসে আছেন আর পেপার পড়ছেন। এর মধ্যেই হোটেলে এলাকার বখাটে রুস্তম হাজির তাঁর সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে। দিলদার চরম বিরক্ত হলো। এই লোক ও তাঁর সঙ্গীরা এসেই তাঁর নামের দফারফা করবে। তাঁকে নিয়ে মজা করবে। এর সাথে যে তাঁর কীসের শত্রুতা আল্লাহ্ মাবুদই ভালো জানেন। একে দেখলেই সে দূরে দূরে থাকে কিন্তু ভাগ্য খারাপ বলে এই বাদাইম্মা গুলোর সাথে প্রতিদিন আল্লাহ্ তাঁকে সাক্ষাত করায়। সে হতাশ, চরম হতাশ। রুস্তম এসেই দিলদারকে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলতে শুরু করলো,
"এই কে কোথায় আছিস, তাড়াতাড়ি কইয়া ফেলা কমিডি ম্যান দিলদার কোথায়?"
দিলদার কোনো সাড়া দিলো না। এর কাজ এসেই ঢংয়ের আলাপ করা। মেজাজ গরম হয় তাঁর। বখাটে রুস্তম ও তাঁর সাগরেদরা একটা টেবিলে বসে সেটার উপর বারি দিতে দিতে গেয়ে উঠলো,
"ভাত বেঁচা দিলদার বানাইলো মোরে বৈরাগী, দিলদারের হোটেলে ভাতও খাইলাম, ডাইলও খাইলাম
ভাত আর ডাইল দিয়া বানাইলাম মিক্স খিচুড়ি
ওরে ভাত আর ডাইল দিয়া বানাইলাম মিক্স খিচুড়ি
ভাত বেঁচা দিলদার বানাইলো মোরে বৈরাগী... ই.. ই।"
রুস্তমের সব চেলাপেলা গান শেষে চিৎকার করে উঠলো। তারই দলের সবুজ চিক্কুর দিয়ে বলে উঠলো,
"ভাই আপনে এক্ষান চীজ, কি মিলাইছেন ভাই। আহা"
আরেক চেলা তাল মিলিয়ে বললো,
"হ ভাই আপনে জিনিস, ভাই জিনিস।"
রুস্তম এতক্ষণ এত প্রশংসায় গদগদ হয়ে যাচ্ছিল। নিজের সামনের চুল ( যদিও চুল নাই, হালকা একটু মাথার টাকের সাথে ঝুলে আছে সেটাই ) পিছনের দিকে নেয়ার একটা পোজ দিচ্ছিলো। হঠাৎ জিনিস বলায় ক্ষেপে গেলো। এটা আবার কেমন প্রশংসা। জিনিস মানে কি? সে কেন জিনিস হতে যাবে? সে রাগান্বিত কন্ঠে ওই চেলার দিকে তাকিয়ে বললো,
"জিনিস মানে কি? এক চড়ে দাঁত ফালায়া দিমু তোর? আমি কি বেঁচাবেচির কিছু। ফাউল কোনহানের।"
ওই চেলার নাম বাচ্চু। সে থতমত খেয়ে গেলো। সে তো ওই জিনিসের কথা বলেনি। বলেছে ঐযে বুদ্ধিমান গো কয় ঐটা কিন্তু ভাইয়ে দেখি রাইগ্গা গেছে। তাঁর দিকে সবাই কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে সবুজের দিকে তাকালো অসহায় নয়নে। সবুজ বুঝতে পরলো এই বদ একটা বলতে গিয়ে আরেকটা বলে গড়বড় করে ফেলছে। বদের ঘরের বদ ইংরেজি না জানলে কইতে গেছস ক্যান? তাই সে দ্রুত মফিজ ভাইকে ঠাণ্ডা করতে বললো,
"ভাই আপনে জানেন না এই ছাগলে ইংরেজি জানে না? ওয় মূলত কইতে চাইছিল জিনিয়াস। কইয়া ফেলাইছে জিনিস। কইতে পারেনা তো তাই। আপনে রাগ কইরেন না।"
রুস্তম এবার ঠাণ্ডা হলো। পড়ালেখা তাঁর ক্লাস এইট পর্যন্ত।। সে জানে জিনিয়াস মানে কি, আর কিছু বললো না। পোলায় তো প্রশংসাই করছে, তাই রাগ কমে গেলো তাঁর। হঠাৎ দিলদারের কথা মনে পড়ায় জোরে হাক দিয়া ডাকলো,
"আমার দিল আহে না ক্যা্?"
দিলদার ভেবেছিল এই আপদ আজকে রেগেমেগে বিদায় হবে, সে খুশি হয়েছিল প্রচুর কিন্তু ঐযে তাঁর কপাল। তুই বেডা মানুষ তুই ইভটিজিং করবি মাইয়া মাইনষেরে, তা না কইরা এই আপদ তাঁর পিছনে লাগছে ক্যান? উফফ একটা বিহিত করতেই হবে এই ফাউল লোকের। বিরক্ত হয়ে দিলদার সেখানে গিয়ে বললো,
"ভাই আপনের সমস্যাটা কি একটু খুইল্লা কন তো? আপনি কি ঐযে বেডা বেডা আকর্ষণ থাহে হেই রকমের কিছু?"
রুস্তম না বুঝে বললো,
"কি কইলি?"
"কইলাম আপনে কি বেডা বেডা যে করে, ওই যে আছে না ঐরকম কিছু কিনা?
"বেডা বেডা করে মানে?" রুস্তম হতভম্ব গলায় জানতে চাইলো।
"হেইডা তো আমার থেইকা আপনের ভালো জানার কথা।"
রুস্তমের দলের সব লোক বড় বড় চোখ করে দিলদারের দিকে তাকিয়ে আছে। কামাল ফট করে বলে উঠলো,
"তুই কি গে* গো কতা কইলি?"
"গে* মে কইতে পারুম না কিন্তু যেইডাই হউক, ওইডাই কিনা জিগাইছি।" দিলদার সরল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বললো।
রুস্তম তড়াক করে উঠে দিলদারকে একটা চড় বসিয়ে দিলো। হোটেলের সবাই এতক্ষন ভয়ে ভয়ে ছিল এই বখাটে কোনো গণ্ডগোল করবে কিনা। আজকে রুস্তমের মন মেজাজ ভালো ছিল বলে ভেবেছিল কিছু করবে না কিন্তু দিলদারের এই কথা শুনে সবারই ভয় লাগা শুরু হয়েছিল আজকে তুলকালাম না হয়ে যায়। ঠিক ভেবেছিল তাঁরা। রুস্তম বখাটে বেজায় ক্ষেপেছে। আফজাল হোসেন একটু কাজে বাইরে গিয়েছিলেন। এসেই দিলদারকে গালে হাত দিয়ে দাড়িয়ে থাকতে আর রুস্তমকে রাগে কাপতে দেখে দ্রুত সেখানে গেলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,
"কি হয়েছে এত ভিড় কেন এখানে?"
রুস্তম আফজাল হোসেনকে কিছু না বলে দিলাদারের দিকে তাকিয়ে বললো,
"মজা করি দেইখা আমারে ফাউল মনে অয়। এইসব ফাউল ভাবনা তোর মাথায় আহে কেমনে? তোরে ছোট ভাই ভাইবাই একটু মজা করি আর তুই, ছি।"
দিলদার এমনিতেই ভীতু। আজকে রুস্তম ভাইয়ের এত রাগ দেখে ভীষণ ভয় পেলো। সে এইসব বলতে চায়নি। একবার মাসুদ ভাই বলেছিল, "যখনি রুস্তম তোরে ক্ষেপাইবো তুই সাহস কইরা এই কতা কইয়া দিবি দেখবি আর ক্ষেপাইবো না, শরমে পালাইবো।" প্রতিদিন ক্ষেপানো কার ভালো লাগে, তাইতো আজকে সাহস করে বলেছে। কিন্তু বুঝতে পারেনি কথাটা অনেক খারাপ কিছু মিন করে।
_____
----
সন্ধ্যা নেমেছে একটু আগে। রায়হান রাহমিদকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। বাচ্চাটা ঘুমে ঢুলছিল। ওকে ঘুম পাড়িয়ে রুদের কাছে গেলো চিরুনি নিয়ে। রুদকে বললো,
"রুদ সোনা ভাইয়ুর কাছে আসো, চুলে তেল দিয়ে বেঁধে দেই। চুলে জট পাকিয়ে ফেলেছো তো?"
রুদ ভাইয়ের কথা শুনে ভাইয়ের কাছে গেলো। রায়হান রুদের মাথায় খুব যত্ন সহকারে তেল দিয়ে আঁচড়ে দিলো। রুদ শান্ত বাচ্চার মতো বসে ছিল। বেণী করার সময় রায়হান বললো,
"রুদ ভাইয়ুকে A,B,C গুলো শুনাও তো একদম Z পর্যন্ত।"
রুদ শুনালো। রায়হান মনোযোগ দিয়ে শুনলো আর বললো,
"গুড। আমার রুদ সোনা দেখি পুরোটা পারে। বলোতো রুদ স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণ কয়টি?"
"সরবন্ন এগারোটি, ব্যঞ্জনবন্ন উঁচল্লিশটি।"
"ব্যঞ্জনবর্ণ চল্লিশটি সোনা। ক্ষ- কে বাদ দেয় দেখে ঊনচল্লিশটি ধরা হয়। ক্ষ- ও কিন্তু একটি ব্যঞ্জনবর্ণ। আগে একে ধরা হতো না বর্তমানে ধরা হয়, বুঝেছো সোনা।"
"বুঝিচি।"
"গুড, ভেরি গুড।"
রায়হানের চুল বাঁধা শেষ। রুদকে একটা স্কুলে ভর্তি করে দিতে হবে। রায়হানের দ্রুত একটা কাজের প্রয়োজন। ভাইবোনদের একটা সুন্দর ভবিষ্যত তাঁকে নিশ্চিত করতে হবে। আজকে আফজাল হোসেন বাসায় আসলে তাঁর সাথে কথা বলতে হবে। আগামী দিনের চিন্তায় তাঁর ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে। বাচ্চা দুটোর একটা গতি না করা পর্যন্ত এই চিন্তার শেষ হবে না বোধহয়।
রাত ১০টা। রাহমিদ ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে। উঠেই আশেপাশে কাউকে না দেখে চিৎকার দিয়ে কান্না শুরু করেছে। রায়হান রুদকে নিয়ে টয়লেটে গিয়েছিল। রাহমিদের কান্নার শব্দে দ্রুত রুমে ছুটে এলো। ওকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে শান্ত করতে লাগলো। রাহমিদ ভাইকে দেখে শান্ত হয়ে ভাইয়ের ঘাড়ে মুখ দিয়ে পড়ে রইলো। ক্ষণে ক্ষণে ফোপাচ্ছে বাচ্চাটা। রায়হান ওকে নিয়েই টয়লেটের সামনে দাঁড়ালো। রায়হান রাহমিদের পিঠে হাত বুলিয়ে বলতে লাগলো,
"আমার টোটন সোনা ভয় পেয়েছে। ভয় পায়না বাচ্চা। কি লাগবে আমার লাড্ডুর? ভাইয়ু তো এইখানে।"
রাহমিদ ভাইয়ের কথা শুনে ঘাড় থেকে মাথা উঠিয়ে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো তারপর রায়হানের মুখে হাত দিয়ে খামচি মারলো যেন এটা দ্বারা বুঝালো তাঁকে একলা রেখে যাওয়ার শাস্তি। রায়হান ভাইয়ের কান্ডে ফিক করে হেসে দিলো। তারপর রাহমিদকে উপরে উঠিয়ে পেটে নাক চেপে সুড়সুড়ি দিতে থাকলো। বাচ্চাটা ফিচফিচ করে হেঁসে উঠলো। রায়হানও ওকে ঠেসে ধরে হাসতে লাগলো। এর মধ্যেই রুদ টয়লেট থেকে বের হলো। রুদকে দেখে রায়হান এগিয়ে গেলো। রায়হান রুদকে নিয়ে ঘরে আসলো। এর মধ্যেই রাহমিদ রায়হানের গায়ে প্রসাব করে দিলো। রায়হান হতাশ হয়ে দাড়িয়ে রইলো। ঘুমের মধ্যে রাহমিদ কয়েকবার প্রসাব করায় ওর ভিজা জামাকাপড় পরিবর্তন করে দিয়েছে সে। এখন আবার নোংরা করলো নিজেকে সাথে রায়হানকেও। রায়হান হতাশ হয়ে রাহমিদকে বললো,
"এত শাস্তি! একটু আগে না খামচি মারলে এখন আবার সুসু করে দিয়েছো ভাইয়ুর গায়ে। বজ্জাত একটা। এখন পড়াবো কি? লেংটু থাকো তুমি। কিচ্ছু পড়বো না তোমায়। পড়ালেই আবার নোংরা করবে।"
রাহমিদ ভাইয়ের কথা বুঝতে না পারলেও বুঝলো তাঁকে ধমক দিচ্ছে। তাই সে আবারও কেঁদে উঠলো। রায়হান ওকে আবারও শান্ত করার কাজে লেগে পড়লো। ভাগ্যিস নামাজটা পড়ে ফেলেছিল টোটন উঠার আগে নাহলে তো এই রাতের বেলা আবারও গোসল করা লাগতো। কালকে ফজরের আগে উঠে গোসল করে ফেলতে হবে যেহেতু টয়লেটে ভিড় লেগে যায় একটু বেলা হলেই। এখানে থাকতে হলে অনেক পরিশ্রম করে থাকতে হবে। শুয়ে বসে পায়ের উপর পা তুলে আরাম আয়েশের জীবন ত্যাগ করে এসেছে সে। যদিও এমন পরিবেশের সাথে সে ও তাঁর ভাইবোন অভ্যস্ত না তবুও মানিয়ে তো নিতেই হবে।
_____
----
জয়নব বেগম রাহমিদের জন্য সুজি রান্না করে নিয়ে এসেছে। রায়হানের কাছ থেকে শুনেছে বাচ্চাটা খিচুড়ি তেমন খায়নি। খাওয়া নিয়ে অনেক জ্বালায় বাচ্চাগুলো। রায়হান ছেলেটার জন্য তাঁর ভারী মায়া হয়। আহারে কি নিয়তি! এই বয়সেই কত দায়িত্ব তাঁর মাথার উপর। জয়নব বেগম আল্লাহর কাছে মন খুলে রায়হানের জন্য দোয়া করেন। জয়নব বেগম রায়হানের হাতে সুজির বাটি তুলে দিলো। বললো,
"ওরে একটু সুজি খাওয়াইয়া দেহো। বেশি কইরা দুধ দিয়া বানাইছি। এইডা নিশ্চয় খাইবো।"
রায়হান বাটি হাতে নিয়ে বললো,
"এত কষ্ট না করলেও হতো আন্টি। এরকম বড়লোকি দেখানো উচিত না আমাদের জন্য। খিচুড়ি খায়নি দেখে আপনি সুজি আনলেন তারপর সুজি যখন খাবে না তখন কি আনবেন? ওদের আমি আমার সাধ্যের মধ্যে যা খাওয়াতে পারবো তাই ওদের খেতে হবে। দরকার হলে পান্তা ভাত ডলে ওকে খাওয়াবো। যেটুটুকু খায় খাবে। তাঁদের বুঝতে হবে ভাই তাঁদেরকে এত হাই প্রোফাইলের জীবন দিতে পারবে না।"
কথাগুলো বলতে বলতে রায়হানের গলা ধরে আসলো কিন্তু জয়নব বেগমের সামনে শক্ত থাকলো। জয়নব বেগম কিছু বলার ভাষা পেলেন না। জয়নব বেগম যদি বলে, তিনি খাওয়াবেন তাহলে তিনি নিশ্চিত রায়হান আর একমিনিটও এখানে থাকবে না। এই ছেলের আত্মমর্যাদা অনেক তা দুইদিনে তিনি ভালোই বুঝেছেন। আর তাছাড়াও তাঁদেরও তো তিনজনের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়া সম্ভব না। আবেগ দিয়ে ভাবলেই তো হবে না বিবেক দিয়েও ভাবতে হবে। মৌনতা ভেঙে জয়নব বেগম শুধু বললো,
"রুদরে তো আগেই খাওয়াইয়া দিছো, তোমারে খাওন দিমু? রাহমিদরে খাওয়াইয়া তুমি চাইরটা খাইয়া লও।"
" না আন্টি এখন খাবো না। আংকেল আসলে আংকেলের সাথে খাবো। ওনার সাথে কথা আছে আমার। আপনাদের ঘাড়ের উপর আর কয়দিন? কিছুতো একটা করতে হবে। বসে থাকলে তো আর চলবে না।"
"আইচ্ছা তোমার আংকেল আইলে তোমারে ডাইকা দিমুনি। তয় তাঁর ফিরতে মেলা রাইত হইবো তুমি চাইলে কয়টা খাইয়া লইতে পারো এহন, পরে আংকেলের লগে বইসা দুইটা খাইয়ো।"
"না আন্টি দরকার নেই। আমি অপেক্ষা করবো।"
"আইচ্ছা, তোমার মর্জি।"
জয়নব বেগম চলে গেলেন। রায়হান এতক্ষণ তাঁর সাথে কথা বলছিল আর সুজিটা ঠাণ্ডা করছিল। ঠাণ্ডা হয়ে গেলে রাহমিদকে তাঁর ভাঁজ করা পায়ের উপর শোয়ালো। তারপর বাচ্চাটার বুকের উপর সকালের মতোই তোয়ালে দিলো। রাহমিদ বুঝলো তাঁকে খাওয়ানোর তোড়জোড় চলছে। সে মোচড়ামুচড়ি শুরু করে দিলো রায়হান হাঁটু নাড়িয়ে তাঁকে আদর করতে লাগলো আর চমচ বাড়িয়ে মুখের সামনে ধরলো। বাচ্চাটা সুজি কয়েক চামচ খেলো। সকালের চেয়ে বেশি। তবে খেতে খেতে বহুবার নড়েচড়ে খাবার মুখ দিয়ে ফেলে দিয়েছে। রায়হান কিচ্ছু বললো না। আরও কিছুটা অবশিষ্ট রয়েছে বাটিতে কিন্তু রাহমিদ কিছুতেই খেতে চাইলো না। যাই মুখে দিলো তাই মুখ থেকে ফেলে দিতে লাগলো। রায়হান প্রচণ্ড রেগে ধমক লাগিয়ে বললো,
" একদম মেরে ফেলবো। খাবার নিয়ে খালি ইতরামি। একটু আগে হাসি এখন ছলচাতুরি। ফাজিল কোথাকার। সকালে, দুপুরেও এরকম নখরামি করেছো, এখন আবার করছো। একদম দুইদিন উপোস রেখে দিবো তখন বুঝবে খিদের কি জ্বালা?"
রাহমিদ ভাইয়ের ধমকে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠলো। রায়হান এবার আদর করলো না। আদর করলেই খেতে চাইবে না, নখরামি শুরু করবে আর সারা রাত খিদে পেটে একটু পরপর কাঁদবে। মাকে দেখেছিল রাহমিদ খাওয়া নিয়ে তামাশা শুরু করলেই জোর করে হলেও খাওয়াতো রাতের বেলা। কারণ বাচ্চাটা রাতের বেলা খিদে পেটে একটু পর পর মাকে জ্বালাতো অথচ মা আবার খাওয়াতে চাইলে এই বিচ্ছু খেতে চাইতো না তাই একবারেই জোর করে হলেও খাইয়ে দিতো। কান্নার ফলে মুখ হা হওয়ায় সেই মুখের মধ্যে সুজি ঢুকিয়ে দিলো। বাচ্চাটা কাঁদতেই থাকলো। রায়হান সম্পূর্ণ খাওয়ানো শেষ করে রাহমিদের হাত,পা ছেড়ে দিলো নাহলে এতক্ষণ হাত,পা ছুঁড়ে তাঁকে ক্ষতবিক্ষত করে দিতো। এমনিতেই অনেকগুলো লাথি, খামচি খাওয়া শেষ। বাচ্চাটার মুখ ধুয়ে দিয়ে কোলে নিলো। রাহমিদ কান্না করতেই থাকলো। রায়হান ওকে কোলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক আদর করলো আর গালের সাথে গাল মিলিয়ে বলল,
"ভাইয়ু বকা দিয়েছি টোটন সোনাকে। টোটন সোনা খাবার নিয়ে জ্বালায় দেখেই তো ভাইয়ু বকা দিয়েছি। আমার লাড্ডু খাবার নিয়ে আর দুষ্টুমি করবে? ভাইয়ু নাহলে আবারও বকবো।"
বাচ্চাটা ভাইয়ের কাঁধে ফুপিয়ে যাচ্ছে। রায়হান তাঁকে অনেক্ষন ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করলো কিন্তু বাচ্চাটা ঘুমাচ্ছে না। রায়হান জানে আজকে আর ঘুমাবেও না। সন্ধ্যা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ঘুমিয়েছে। এখন সে না ঘুমিয়ে রায়হানকে জ্বালাবে। রায়হান বিছানায় তাকিয়ে দেখে রুদ ঘুমিয়ে পড়েছে। রুদের গায়ে পাতলা একটা কাঁথা টেনে দিলো। মশায় নাহলে বাচ্চাটাকে খেয়ে ফেলবে। রায়হান রাহমিদকে বুকে নিয়ে রুদের পাশে শুলো। ক্লান্তিতে তাঁর চোখ দুটো মুদে আসতে লাগলো।
_____
----
আফজাল হোসেন অনেক রাত করে দিলদারকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। আজকে দিলদার কোনো কথা তেমন বলেনি। রুস্তম ভাইয়ের হাতে চড় খেয়ে তাঁর প্রেস্টিজে লেগেছে। তাঁর সময় আসুক ওই রুস্তম বখাটে জাউরারে সে দেখে নিবে। আফজাল হোসেন ঘরে এসেই ফ্যানের নিচে বসলেন। জয়নব বেগম তাঁকে পানি এনে দিলো আর বললো,
"এত দেরি কইরা ফিরলেন যে। আইজকা কি কাস্টমার বেশি আছিলো?"
"হ্যাঁ গো। তা আইজকা হঠাৎ এই কথা জিগাইলা যে। আমারে মনে পড়ছিল বুঝি?"
"আপনের ফাউ প্যাঁচাল রাহেন। এমন একটা ভাব করলেন যেন কহোনোই আপনেরে জিগাইনা আইজকাই খালি জিগাইছি।"
"না ঠিক তা না। আইজকা কেমন যেন তাড়াহুড়া লাগলো কতায় কইতরী।" আফজাল হোসেন মুচকি হেঁসে বলে উঠলো।
"আপনের যতসব আজগুবি কতা। যান তাত্তারি হাত মুখ ধুইয়া আহেন। রায়হান পোলাডায় আপনের অপেক্ষায় বইয়া আছে। আমি ভাত বাইরা আনি।"
"কি কও, রায়হান এহনো খায় নাই? ওরে না খাওয়াইয়া রাখছো কেন?" তিনি ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
"আপনের লগে খাইবো কইলো। অনেক জোর করছি খাইবো না। আপনে হাত মুখ ধুইয়া আহেন আমি ওরে ডাইকা লইয়াই।"
আফজাল হোসেন হাত মুখ ধোঁয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলেন। জয়নব বেগম রায়হানদের দরজায় এসে টোকা দিলেন কিন্তু খুললো না। আবারও অনেক্ষণ টোকা দিতে থাকলেন।
_____
----
আফজাল হোসেন আর রায়হান ভাত খাচ্ছে। রায়হানের চোখে ঘুম। রায়হানের কোলে রাহমিদ দুষ্টুমি করছে। জয়নব বেগম বাচ্চাটাকে নিতে চাইলে বাচ্চাটা কান্না করে দিয়েছিল। ভাইয়ের কোল ছাড়া সে কারো কোলে যাবে না। জয়নব বেগমের রায়হানের জন্য খারাপ লাগলো। তখন দরজায় বারি দিয়ে ছেলেটার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছেন। কি আর করার, ছেলেটা না খেয়ে আফজাল হোসেনের জন্য অপেক্ষা করছিল ডাকতে তো হতোই। জয়নব বেগম তাঁদেরকে তরকারি বেড়ে দিলেন। হঠাৎ আফজাল হোসেন জিজ্ঞাসা করলেন,
"তুমি নাকি কিছু বলবে আমাকে, বলে ফেলো?
রায়হান ভাতটুকু গিলে মৃদু গলায় বললো,
"আংকেল আমাকে একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন। খুবই দরকার। ওদেরকে নিয়ে চলতে হলে একটা কাজ করতেই হবে।"
"আমাদের এখানে কি কোনো সমস্যা হয়েছে?" আফজাল হোসেন জানতে চাইলেন।
"না সমস্যা হবে কেন? আপনাদের ঘাড়ে আর কয়দিন। রুদকে ভর্তি করাবো ভাবছি, রাহমিদকে দেখাশোনা, নিজেদের ভরণপোষণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, বাসা ভাড়া এইসবে তো টাকা লাগবে। তাই চাচ্ছি আগেভাগেই একটা কাজ ধরতে তাহলে মাস শেষে একটু দ্রুত টাকা হাতে আসবে। হাতে অল্প কিছু টাকা আছে। মাস চালানো যাবে না। আপনি একটা ব্যবস্থা করে দিন আংকেল? আপনার কাছে চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকবো।"
"আরও কয়দিন যাক। তোমরা এখানে থেকে অভ্যস্ত হয়ে নাও তারপর নাহয় ধীরে সুস্থে কাজের ব্যবস্থা করে দেয়া যাবে।"
"না আংকেল আপনাদের ঘাড়ে এতদিন খেতে পারবো না। এতদিন বসে খেলে আপনাদেরই একসময় বিতৃষ্ণা লেগে যাবে আর আমার নিজেরই লজ্জা লাগবে আপনাদের এখানে এভাবে বসে বসে খেতে। প্লিজ আংকেল আমার অনুরোধটা রাখুন।"
আফজাল হোসেন ও জয়নব বেগম ছেলেটার কথায় মুগ্ধ হলেন। রায়হানের আত্মমর্যাদাবোধ তাঁদেরকে আবারও তাঁর প্রতি মুগ্ধ হতে বাধ্য করলো। আফজাল হোসেন বললেন,
" বাবা, তেমন কোনো কাজ তো আমার খোঁজে বর্তমানে নেই।"
কথাটি শুনে রায়হানের মুখ কালো হয়ে গেলো। বহু আশা নিয়ে এসেছিল। আফজাল হোসেন ইতস্তত সুরে বললেন,
"তবে একটা কাজ আছে কিন্তু..."
"কিন্তু কি আংকেল?"
"তোমাকে কথাটা কিভাবে বলি তুমি লেখাপড়া জানা মানুষ?"
"সমস্যা নেই আংকেল, যেই কাজই হোক আমি করবো তাছাড়া কোনো কাজই ছোট না। পড়ালেখা করে তো এটাই শিখেছি। বেতন অল্প হলেও সমস্যা নেই। কিছু না করার থেকে টুকটাক কাজ করা ভালো।"
"আসলে আমার হোটেলের প্রতিদিনের বাজার করার জন্য একটা লোকের দরকার ছিল। আমি প্রতিদিন বাজারে যেতে পারিনা। হাঁপানি উঠে। দিলদারকে দিয়ে বাজার করিয়েছি এতদিন ও তো এমনিতেই হোটেলে কাজ করে, বাজার করে ছেলেটা হাঁপিয়ে যায় তাই তুমি যদি করতে..."
"সমস্যা নেই আংকেল আমি করবো।"
আফজাল হোসেন খুশি হলেন। রায়হান ছেলেটাকে তাঁর পছন্দ হয়েছে। বাজার করার কাজ তিনি ইচ্ছা করেই দিলেন। ছেলেটা কখনোই কোনো কাজ করেনি হঠাৎই যদি বড় কোনো কাজ করতে বলতেন তাহলে ছেলেটা পারতো না। আস্তে আস্তে কাজ শিখুক উনি এমনিতেই একটা ভালো কাজের ব্যবস্থা রায়হানকে করে দিবেন। ছেলেটার প্রত্যেকটা কথা খুবই গোছানো। খুব সহজেই একটা কাজে ঢুকিয়ে দিতে পারবেন আশা করা যায়।
চলবে...