ফন্ট সাইজ:
থিম:
জীবন পেন্ডুলাম

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: তাজরীন ফাতিহা

#জীবন_পেন্ডুলাম

#তাজরীন_ফাতিহা
আফজাল হোসেন হোটেলে বসে আছেন। হিসেবের খাতা খুলে হিসেব মিলাচ্ছেন। দিলদার কাস্টমারকে খাবার দিচ্ছে। দিলদার ফ্রী হয়ে আফজাল হোসেনের কাছে এসে বললো,
"একটা কতা আছিলো চাচা।"
"বল"
"চাচা, রায়হান কিন্তু বাজার করা এহনো পারে না। কি করবেন কন তো? আইজকা কি করছে হুনবেন?"
আফজাল হোসেন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
"কি করেছে আজকে?"
দিলদার আজকের সকালের ঘটনা অদ্যপন্ত বর্ণনা করলো। আফজাল হোসেন মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। দিলদার জিজ্ঞাসা করলো,
"কি করবেন এহন?"
"ভেবে দেখছি। কাজে যা।"
দিলদার "আইচ্ছা" বলে প্রস্থান করলো। নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো সে। এর মধ্যেই রুস্তম বখাটে ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের আগমন। দিলদার এদেরকে দেখে অবাক হয়েছে। সেদিনের ঘটনার পর রুস্তম ভাইকে এই হোটেলে দেখা যেতো না। দিলদার ভেবেছে আপদ বিদায় হয়েছে। এখন তো দেখছে সে ভুল ছিল আপদ আবার এসে জুটেছে। বিরক্তিকর একটা নিশ্বাস ফেললো সে। রুস্তমের চেলা বাচ্চু দিলদারকে ডেকে আনলো। দিলদার বিরক্তি চেপে রেখে রুস্তমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রুস্তম কোনো কথা না বলে আয়েশি ভঙ্গিতে পায়ের উপর পা তুলে দিলদারকে দেখছে। দিলদার আর থাকতে না পেরে বললো,
"কিছু বলবেন ভাই?"
এতক্ষণ পর রুস্তম মুখ খুললো,
"তুই নাকি বিরাট মস্তান হয়েছিস?"
দিলদার আকাশ থেকে পড়লো মনে হয়। মস্তান আর সে। কোথায় আকাশ আর কোথায় পাতাল। দিলদার বিরক্ত হয়ে বললো,
"এইসব কি বলতাছেন ভাই? আমি মস্তান হুমু কেন?"
"সেটা আমি কেমনে জানমু। কয়দিন আহি নাই দেইখ্যা নিজেরে পাতি গুণ্ডা মস্তান ভাবা শুরু করছিস নাকি?"
"এইসব ফাউ কতা আপনেরে কেডা কইছে? আমি কোনো গুন্ডামি করি নাই? কারতে হুনছেন এই আজগুবি কতা?"
এবার রুস্তমের চেলা আব্বাস কথা বলে উঠলো। বললো,
"ভাই এই সেয়ানার কতা হুনবেন না। আমি নিজের চোক্ষে দেখছি একটা পোলারে ধমকাইয়া ধমকাইয়া কতা কইতে আছিলো। মগা, বলদাও কইছে। পোলাডার কোলে একটা বাইচ্চাও আছিল। পোলাডা এক্কেরে মন খারাপ কইরা খাড়ায় আছিলো ভাই। নিজেরে সিনেমার হিরো ভাবে।"
দিলদার হা হয়ে এতক্ষণ আব্বাসের কথা শুনলো। রুস্তম বললো,
"বহুত বাড়ছিস বুঝলাম। হেদিনের কতায় হেব্বি মেজাজ খারাপ হইছে তোর উপ্রে তাই কয়দিন আহি নাই অমনি উড়া শুরু করছিস। রাস্তায় যারে তারে কতা হুনাস। যাউকগা মাইনষেরে মগা কস তুই কি তাইলে? উম তুই হইলি মগার বড় ডা বগা।"
রুস্তমের সকল চেলা হেঁসে উঠে সহমত জানালো। দিলদার অপমানিত বোধ করলো। সে তো রায়হানকে একটু বকা দিয়েছে আর এরা তাকে না জেনে যা তা বলছে। রায়হানকে ওভাবে বলায় নিজেরও খারাপ লাগছিল। এতিম ছেলেটার সাথে এভাবে কথা বলা উচিত হয়নি। আচ্ছা, এতিম ছেলেটার সাথে ওভাবে কথা বলায় আল্লাহ্ নারাজ হয়েছেন? রুস্তমকে আল্লাহ্ তায়ালা তার শাস্তি দিতে পাঠান নি তো আবার? 
_____
-----
রায়হান রুদের জামা খুলে সারা শরীর মুছিয়ে দিচ্ছে। রুদ জ্বরের ঘোরে থরথর করে কাঁপছে। ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে আর রায়হান শরীর মুছিয়ে দিয়ে মুখ ধুইয়ে দিলো। বালতিতে রুদকে কুলিকুচি করালো। পাশে রাহমিদ হামাগুড়ি দিয়ে বসার চেষ্টা করছে। রাহমিদ এখন বসতে পারে। তবে নিজে নিজে অনেকক্ষণ বসে থাকতে পারেনা। কারো সাহায্যে বসতে হয়। সে এখন বসে খেলনা দিয়ে খেলছে তবে ব্যালেন্স করতে না পেরে পিছনের দিকে হেলে পড়ে গেলো। বালিশের উপর পড়েছে। শুয়ে শুয়ে এখন হাত, পা ছড়িয়ে খেলছে। পা উপরে তুলে মুখে আঙ্গুল ভরে নানা ধরনের অস্পষ্ট আওয়াজ করতে লাগলো। মাঝে মাঝে কি জানি বলে চিল্লিয়ে উঠে আর হাসে। রায়হান সেটা দেখে মৃদু হাসলো। রুদকে জামা কাপড় পরিয়ে শুইয়ে দিলো। গায়ে কাঁথা টেনে দিলো। বাচ্চাটা জ্বরের তালে কিছুই ঠিক মতো খেতে পরছে না। সেজন্য আজকে সকালে বার্লি কিনে এনেছে সে। দেখা যাক বার্লি খাওয়াতে পারে কিনা। রায়হান রাহমিদকে আদর করে বালিশ দিয়ে চারপাশে বর্ডার করে দিলো। খেলনা দিলো যাতে সে চলে গেলে না চিল্লায়। রুদের কপালে চুমু দিয়ে রাহমিদকে দেখে রাখতে বলে সে রান্না ঘরের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরলো। রান্না ঘরে এসে দেখে জয়নব বেগম কি যেন রান্না করছে। রায়হানকে দেখে সে দ্রুত বললো,
"কি লাগবো বাবা?"
"কিছু না আন্টি। একটু বার্লি রাঁধবো। রুদ কিছু খেতে পারছে না তাই।"
"দাও আমারে, আমি অক্ষণই রাইন্দা দিতাছি?"
"না না আন্টি দরকার নেই। আমি রাঁধতে পারবো। আপনি শুধু চুলা খালি হলে আমাকে ডেকে দিয়েন।"
"চুলা তো খালিই। আমার রান্না শেষ। তুমি রাঁনতে পারো? আমারে দাও। আমি সুন্দর কইরা পাকাইয়া দেই।"
"সমস্যা নেই। আমি পারবো।"
জয়নব বেগম বুঝলেন রায়হানকে মানানো সহজ না তাই তিনি চুলা খালি করে দিয়ে তরকারি নিয়ে ঘরে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে আরেকবার রায়হানকে জিজ্ঞাসা করলো সে পারবে কিনা? উত্তরে রায়হান সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো। রায়হান চুলায় পাতিল বসিয়ে পানি ঢাললো। পানিতে বার্লি ঢেলে নাড়াচাড়া করতে লাগলো। বার্লি ফুটে আসলে নামাতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেললো। তার মুখ থেকে আর্তনাদ বের হলো। হাতের চামড়া পুড়ে গেছে। সে দ্রুত পানিতে হাত ভিজিয়ে দিলো। এখন একটু জ্বলুনি কম লাগছে। কিছুক্ষন ভিজিয়ে রেখে হাতটা উঠালো। চুলা থেকে পাতিল টা নামিয়ে একটা বাটিতে বার্লি ঢেলে নিলো। 
বাটি নিয়ে ঘরে এসে দেখলো রাহমিদ বসে বসে বোনের চুল নিয়ে খেলছে। রুদ এক হাত দিয়ে রাহমিদকে জড়িয়ে রেখেছে। রায়হানের হাত টা জ্বলছে আবারও। পানিতে কিছুক্ষণ রাখায় ভালো লাগছিল এখন আবার জ্বলছে। রায়হান রুদকে উঠিয়ে একটু একটু বার্লি খাইয়ে দিতে লাগলো। বাচ্চাটার মুখ শুকিয়ে গেছে। দুই দিনের জ্বরে বাচ্চাটা কাবু হয়ে গেছে। রুদকে খাইয়ে দেখে রাহমিদ তাকিয়ে আছে খাবারের দিকে। রায়হান হেঁসে বলে, "খাবে?" বাচ্চাটা কি বুঝলি কে জানে ফিচ করে হেঁসে গড়াগড়ি খেলো। রায়হান আবার রুদকে খাইয়ে দিতে লাগলো। রাহমিদ আবার মুখে আঙ্গুল ভরে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। রায়হান এবার কোনো কথা না বলে রাহমিদের মুখে এক চামচ ঢুকিয়ে দিলো। রাহমিদ মুখে নিয়ে মুখ নাড়ালো তারপর হঠাৎ করে মুখ বিকৃত করে খাবার ফেলে দিলো। সম্পূর্ণ জামা ভরিয়ে ফেললো। রায়হান হতাশ হয়ে তাকিয়ে থাকলো ওদিকে হাতের জ্বলুনিও বাড়ছে।
_____
-----
আজকে আফজাল হোসেন একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরেছেন। রায়হানের সাথে তার জরুরি আলাপ আছে। জয়নব বেগম রায়হানকে ডেকে আনলো। আফজাল হোসেন আর রায়হান ভাত খেলো। খাওয়া শেষে আফজাল হোসেন রায়হানকে বললো,
"তুমি কি পড়াশোনা করবে না? সেদিনও জিজ্ঞাসা করেছিলাম।"
"কিভাবে পড়াশোনা করবো আংকেল। ওরা ছোট আর ভার্সিটি তে এডমিশনের জন্য অনেক পরিশ্রম করতে হবে। যা এখন ওদের নিয়ে করা সম্ভব না। টাকারও একটা ব্যাপার আছে।"
"শোনো একটা কথা বলি। পড়াশোনা ছেড়ো না। পড়াশোনা জানা থাকলে একটা না একটা জায়গায় চাকরি অনায়াসে হয়ে যাবে। চাকরি না হলেও মানুষকে পড়িয়ে দু, চার টাকা ইনকাম করতে পারবা কিন্তু পড়াশোনা না করলে কোথাও কাজ পাবে না। অনেক কষ্টের কাজ করে টিকে থাকতে হবে তোমাকে। যা তোমার দ্বারা সম্ভব না। তুমি ছোটবেলা থেকেই রাজকীয়ভাবে বড় হয়েছো এখন কোনো কঠিন কাজ দিলেই তুমি খেই হারিয়ে ফেলবে। তাল রাখতে পারবে না। পদে পদে বিপদে পড়বে তাই বলছিলাম একটু ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নাও পড়াশোনা ছাড়বে নাকি ধরে রাখবে।"
রায়হান কি বলবে ভেবে পেলো না। এত ছোট ভাইবোনকে রেখে কিভাবে প্রিপারেশন নিবে আর কিভাবেই বা টিকবে। একটা পাবলিক ভার্সিটিতে টিকা তো মুখের কথা না। যদিও রায়হান যথেষ্ট মেধাবী তবুও একটা গাইডলাইন তো থাকতে হবে। আফজাল হোসেন আবারও বলে উঠলেন,
"তোমার ভাই বোনের চিন্তা করো না। ভার্সিটিতে একবার ভর্তি হয়ে গেলে প্রতিদিন নাহয় না গেলে। শুধু পরীক্ষার সময় উপস্থিত থেকে পরীক্ষা দিলে শিক্ষকদের বলে। তারা নিশ্চয় বুঝবে তোমাকে।"
"আসলে আংকেল ঠিক তা না। এখন কিভাবে প্রিপারেশন নিবো। অল্প কয়েকদিন বাকি বোধহয় এডমিশনের। আমার কাছে তো বইও নেই কোনো। তার উপর ওদেরকেও দেখতে হবে। সব মিলিয়ে সাহস হচ্ছে না পড়ার। "
"তোমার ইন্টারমিডিয়েটের রেজাল্ট কি?"
রায়হান মুখ নামিয়ে মিন মিন করে বললো,
"জিপিএ ফাইভ।"
আফজাল হোসেন অবাক হয়ে গেলেন। এত ভালো একজন ছাত্রের এভাবে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে এটা তিনি মানতে পারছেন না কিছুতেই। আফজাল হোসেন বললেন,
"এত ভালো রেজাল্ট নিয়ে তুমি পড়াশোনা ছেড়ে দিবে? আচ্ছা জানতে পারি, তোমার কী হওয়ার ইচ্ছা ছিল?"
রায়হানের মুখ অন্ধকার হয়ে গেলো। কিছু স্মৃতি বোধহয় তার মানসপটে তীব্রভাবে উঁকি দিয়ে তার যন্ত্রণা বাড়িয়ে দিলো। রায়হান মুখ নামিয়ে বললো,
"বাবা, মায়ের শখ ছিল দেশের নামকরা ডাক্তার বানাবেন। কারণ বাবার মা মানে আমার দাদি চিকিৎসার অভাবে মারা যান যা আমার বাবাকে খুব ব্যথিত করেছিল। আর আমারও ইচ্ছা ছিল কিন্তু এখন আর নেই।"
 রায়হানের ভাঙা গলা। আফজাল হোসেন আর জয়নব বেগম পাথরের মতো বসে আছেন। ছেলেটার এত দুঃখ তাদের সহ্য হচ্ছে না। আফজাল হোসেন বললেন,
"এখন তো আর মেডিকেলে পরীক্ষা দিতে পারবে না মনে হয়। তুমি ভার্সিটিতে চেষ্টা করো। আমি বই খাতা এনে দিবো। তুমি পড়বে?"
"না না আংকেল। আপনি আর আন্টি এমনিতেই আমাদের জন্য অনেক করছেন। আমি চাই না আমাদের জন্য আর কোনো টাকা খরচ করেন। আমি চাচ্ছি না আপনাদের ঘাড়ে বসে খেতে। প্লিজ আংকেল, জোর করবেন না। পড়াশোনা আমার জন্য না। আমি আমার ভাই বোনকে পড়াবো যেভাবেই হোক। আমার না পড়লেও চলবে।"
"রায়হান জানো, তুমি সব সময় আমার দেয়া কিছুকে দয়া ভাবো। আমার কাছ থেকে ধার হিসেবে নাও এখন পরে নাহয় টাকা হলে পরিশোধ করে দিলে। তোমাকে দেখলে আমার যৌবন কালের কথা মনে পড়ে ভীষণ। আমিও এতিম ছিলাম। তাই বোধহয় তোমার প্রতি টানও একটু বেশি। এতিম খানায় বড় হয়েছি বুঝলে। কোনরকম মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে কাজে লেগে যাই নিজের ভবিষ্যতের জন্য। তখন থেকে খেটে খেয়ে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এই পর্যন্ত এসেছি। মাঝে মাঝে মনে হয় পড়াশোনা টা যদি করতে পারতাম তাহলে ভালো একটি পর্যায়ে আজকে থাকতাম। মা, বাবা থাকলে নিশ্চয় পড়াশোনা করাতো। তাই আফসোস লাগে নিজের ভাগ্যের উপর প্রায়ই। যদিও আল্লাহ্ আমাকে যথেষ্ট ভালো রেখেছেন আলহামদুলিল্লাহ। আমি চাই এই আফসোসটা যেন তোমার কখনো না হয়। তারপরও যদি তুমি পড়াশোনা না করতে চাও আমার কিছু বলার নেই। এটা একান্তই তোমার সিদ্ধান্ত। আমি তো তোমার কেউ নই। তোমার উপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার অধিকারও আমার নেই।" 
আজকের আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন। চারপাশে কেমন ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। এমন পরিবেশে আত্মা জুড়িয়ে যায়। রায়হানের এই রকম আবহাওয়া বরাবরই প্রিয় কিন্তু আজকে রায়হানের এই সুন্দর চারিপাশ বিষাক্ত ঠেকছে। রাহমিদটার জ্বর, ঠাণ্ডা। নাজেহাল অবস্থা প্রায়। বাচ্চাটা থেকে থেকে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠছে, কাশি দিচ্ছে। যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছেনা বাচ্চাটা। রায়হান ওকে কোলে নিয়ে গায়ের সাথে মিশিয়ে রেখেছে। বাচ্চাটার কান্না থামছে না। রায়হানের অস্থির লাগছে। কয়েকদিন পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে গিয়ে বাচ্চাগুলোর প্রতি যত্ন নিতে পারেনি সেভাবে। রায়হান এডমিশনের জন্য জান প্রাণ লাগিয়ে পড়ছে। সেদিনের পর বিশ দিন কেটে গেছে। আর কিছুদিন পরই এডমিশন পরীক্ষা। আফজাল হোসেনের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে নীলক্ষেত থেকে সস্তা মূল্যে এডমিশনের বই কিনে এনেছে সে। দিলদার ভাই অবশ্য এই নীলক্ষেতের ঠিকানা দিয়েছিল। এখানে নাকি সস্তায় বই পাওয়া যায়। এটা শুনে রায়হান দিলদারকে নিয়ে বই কিনে এনেছে। দিন রাত এক করে পড়ছে সে। তাকে একটা ভালো পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স পেতেই হবে। কিন্তু পড়ালেখায় সময় দিতে গিয়ে বাচ্চাগুলোকে সময় দিতে পারছে না সে। এটা তাকে খুবই পীড়া দিচ্ছে। মনে হচ্ছে পড়ালেখা করার দরকার নেই আবার পরক্ষনেই মনে হচ্ছে পড়ালেখা না করলে এই ভাইবোনদের সে কিভাবে মানুষ করবে। দুনিয়াটা যে সোজা না এটা সে গত কয়েকদিনে বুঝে গিয়েছে। রাহমিদ রায়হানের কোলের মধ্যে ঘাপটি মেরে আছে। বাচ্চাটার শরীর গরম অনেক। কিভাবে যে জ্বর আসলো জানা নেই রায়হানের। আর এমনিতেও বাচ্চাদের রোগ শোক লেগেই থাকে। রায়হান জলপট্টি দিলো। রাহমিদ টা জ্বরের ঘোরে খালি কান্না করছে। রায়হান রাহমিদকে কোলের মধ্যে নিয়ে ঝাপটে ধরে জলপট্টি দেয় আর বলে,
"আমার টোটনের কি হয়েছে। আল্লাহ্ আমার টোটনকে ভালো করে দাও। ও রাহমিদ, রাহমিদরে, আমার কলিজা ভাইয়ু তোমায় সময় দেয়নি দেখে জ্বর বাধিয়েছো। ভাইয়ু পঁচা তাই নারে।"
রাহমিদের কান্না কোনোভাবেই থামার নয়। জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। রায়হানের অস্থির লাগছে ভীষণ। কি করবে ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছে না। কিভাবে জ্বর কমাবে? ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে? কিছু টাকা আছে এতেই হয়ে যাবে বোধহয়। নাহ্ আর বসে থাকা যায় না। এসব ভেবেই দাঁড়িয়ে পড়লো রায়হান। আবহাওয়া যদিও ভালো না তবুও ঘরে বসে থাকলে সমাধান হবে না। রায়হান রাহমিদকে নিয়ে বের হলো। রুদকে জয়নব বেগমের কাছে দিয়ে যাবে ভাবলো। জয়নব বেগম কলপাড়ে হাঁড়ি পাতিল মাজছিলেন। রায়হান সেখানে গিয়ে বলে উঠলো,
"আন্টি?"
জয়নব বেগম ফিরে চাইলেন। বললেন,
"কি হইছে বাবা? কিছু লাগবো?"
"রাহমিদের অনেক জ্বর। জলপট্টি দিয়েছি কাজ হয়নি ওকে একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। বাচ্চাটা মারাত্মক কান্না করছে? রুদকে যদি একটু দেখতেন।"
জয়নব বেগম বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন। রাহমিদের গালে কপালে হাত দিয়ে দেখলেন জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
"হায় হায় এত জ্বর? কহন থেইক্কা এমন?"
"সকাল থেকে। এমনিতেও কয়েকদিন ধরে খাবার দাবারে প্রচুর অরুচি ওর। প্রথম এত পাত্তা দেইনি আবার টাকারও ব্যাপার ছিল। চাইলেও ওষুধ কিনে খাওয়াতে পারিনি কিন্তু আজকে সকাল থেকে এত জ্বর যে কিছুতেই কমে না। তাই ভাবলাম একটু ডাক্তার দেখিয়ে আনি।"
"ঠিক আছে যাও। তয় টেকা আছে তোমার তে?"
"কিছু আছে আন্টি।"
"ওই টেকায় হইবো? খাড়াও এহানে।"
"আন্টি হয়ে যাবে। আর লাগবে না। শুধু শুধু আপনার টাকা দেয়ার প্রয়োজন নেই।"
"তাও লইয়া যাও। যদি লাগে। পড়ে দিয়া দিও তোমার টেকা হইলে।"
কথাটা বলেই জয়নব বেগম দ্রুত ঘরে গেলেন। ঘরে গিয়ে কিছু টাকা নিয়ে এসে রায়হানের হাতে দিলেন। রায়হান নিতে চায়নি কিন্তু তিনি জোর করে দিয়ে দিয়েছেন। রাহমিদ কেঁদে যাচ্ছে একনাগাড়ে। রায়হান আর দেরি না করে দ্রুত ফার্মেসিতে রওনা দিলো।
____
---- 
"হাওয়া মে উড়তা রাহে, 
মেরা লাল দুপাট্টা মাল মাল  
মেরা লাল দুপাট্টা মাল মাল।
ওহো ওহো"
চায়ের দোকানে বসে রুস্তম ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা গান গাচ্ছে। ভুলভাল গান। তাও আবার বাকের ভাইয়ের বিখ্যাত গান। রুস্তম আবার বাকের ভাইয়ের বিরাট ভক্ত। কাজ কাম সব বাকের ভাইকে কপি করে করে সে। হাতে, গলায় চেইন দিয়ে মুড়ানো। হাতে চায়ের কাপ। তার দুই চেলা বাচ্চু আর আব্বাস ঘাড় টিপে দিচ্ছে। দিলদার মোবাইলে টাকা ভরে হোটেলে যাচ্ছিলো। এর মধ্যেই এই আজাইরাদের দেখা। ফোনে টাকা শেষ হওয়ার আর সময় পায়নি। দিলদারের মনে হলো এই রাস্তা দিয়ে না গিয়ে অন্য রাস্তা দিয়ে যাবে যদিও পথ বড় হবে তাতে কি এদের থেকে তো মুক্তি পাবে। পুরাই বিরক্তিকর একটা গ্যাং। দিলদার উল্টো পথ ধরতেই দেখলো রুস্তমের আরেক চেলা এইখানেই আসছে। এসেই দিলদারকে বললো,
"কিরে হোটেল তো সামনে তুই এই পথ দিয়ে কই যাস?"
কথায় আছে না "যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়" কথাটা একেবারে দিলদারের সাথে খাটে। দিলদার কাচুমাচু করে বললো,
"সবুজ ভাই সামনে একটু কাম আছে তাই যাইতাছি আরকি।"
"কিন্তু তোরে দেখলে তো তা মনে হয়না। কেমন চোরের মতো লাগতেছে।"
শুরু হয়ে গেছে অপমান করা। এসব সহ্য করা যায় না। শেষ পর্যন্ত চোর। দিলদার বললো,
"না ভাই সত্যই কাম আছে।"
"আইচ্ছা যাবি নে। আগে ভাইয়ের লগে দেহা কইরা যা।"
গোদের উপর বিষফোঁড়া। যে ভয়টা দিলদার পাচ্ছিলো সেটাই হলো। সবুজ ওকে টানতে টানতে রুস্তমের সামনে আনলো। রুস্তম চায়ে চুমুক দিয়ে ওর দিকে তাকালো। দিলদার চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে বাচ্চু ওকে বললো,
"কিরে চেগাইয়া খাড়ায় আছোস কেন? সালাম দে ভাইরে।"
দিলদার সালাম দিলো। রুস্তম চা খেয়ে বললো,
"কিরে বগা, এহানে কি তোর?"
দিলদারের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। আবারও অপমান। সে বললো,
"একটা কাম আছিলো ভাই তাই।"
"কি কাম আবার। যাউকগা হুন। দেখতো আমারে কেমন লাগতেছে।" 
রুস্তম পোজ দেয়ার চেষ্টা করলো। দিলদারের বলতে ইচ্ছা করলো, "ভাই বান্দর দেখছেন, বান্দরের থেকেও বিশ্রী।" কিন্তু মুখে কিছুই বললো না। আব্বাস বলে উঠলো,
"কিরে কস না কেন? ভাইরে হেব্বি লাগতেছে না।"
দিলদার হাসার চেষ্টা করলো কিন্তু হাসাটা ঠিক ফুটে উঠতে চাইলো না মুখে। বললো,
"হ ভাই হেব্বি।"
এর মধ্যেই কে যেন ডেকে উঠলো,
"দিলদার ভাই?"
দিলদার ও রুস্তমের সব সাঙ্গপাঙ্গ রা ঘুরে তাকিয়ে দেখে একটা ছেলে কোলে একটা বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দিলদার দ্রুত সেখানে গিয়ে বললো,
"রায়হান তুমি এইহানে কি করো?"
"ভাই রাহমিদের অনেক জ্বর। ওরে নিয়ে ফার্মেসিতে গিয়েছিলাম। উনি বলছে হাসপাতালে ভর্তি করতে। অবস্থা নাকি ভালো না। আমি তো হাসপাতাল চিনি না এখানকার তাই আপনাকে দেখে ডাক দিছি।"
কথাগুলো বলতে বলতে রায়হান কেঁদে দিলো। ভাইয়ের চিন্তায় অস্থির হয়ে গেছে সে। বাচ্চাটা কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ হয়ে গেছে। রায়হান কি করবে দিশা না পেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। তখন দিলদারের কথা শুনে তাকে ডাক দিয়েছে। রুস্তম এতক্ষন রায়হানের কথা শুনছিল। আব্বাস বলে উঠলো,
"ভাই এই পোলারেই হেদিন দিলু কতা হুনাইতেছিল।"
বাচ্চু বলে উঠলো,
"এ মনে ওয় দিলুর পরিচিত। আহারে পোলাডার চোক্ষে কি মায়া। বাচ্চাটা কানতাছে।"
রুস্তম ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা সেখানে গিয়ে কাহিনী জানলো। তারপর এখনকার একটা সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে দিলো। 
_____
----
রায়হান হাসপাতালের বেডে রাহমিদকে নিয়ে বসে আছে। বাচ্চাটার হাতে স্যালাইন লাগানো। সরকারি হাসপাতাল গুলোর এই এক সমস্যা। অনেক ভিড়। অনেক গুলো বেড এক রুমের মধ্যে। ডাক্তার রাহমিদকে দেখে বলেছেন, বাচ্চাটার নিউমোনিয়া হয়ে যেতে পারতো আর একটু দেরি করে ভর্তি করালে। খাবারে অনিয়ম বাচ্চাটার শরীর ভেঙে আরও অসুস্থ করে ফেলেছে। ঘন ঘন গোসল, ভিজা জামাকাপড়ে থাকলে নাকি নিউমোনিয়া অনেক মারাত্মক আকার ধারণ করে। রায়হান মনে করে দেখলো গত কয়েকদিনে রাহমিদকে ঠিক মতো দেখাশোনা করতে পারেনি। হয়তো ভেজা জামাকাপড়ে থেকেই এতটা জ্বর হয়ে গেছে। আল্লাহ্ বাঁচিয়েছে নিউমোনিয়া হয়নি। এর আগেই রায়হান হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। ডাক্তার কিছু ওষুধ লিখে দিলো। এটা নিয়ম করে খাওয়াতে বললো। রুস্তম, দিলদার ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা বাইরে অপেক্ষা করছে। ভিতরে বেশি মানুষ থাকা উচিত না দেখে তারা বাইরে অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বের হয়ে গেলো। রায়হান বের হলো তার অল্প কিছুক্ষণ পর। রায়হানকে দেখেই দিলদার বললো,
"গুরুতর কিছু?"
"না ভাই তবে হতে পারতো। কিছু ওষুধ লিখে দিয়েছে। ওকে নিয়মিত খাওয়াতে বলেছে।"
"ছাইড়া দিছে নাকি থাকন লাগবো এইহানে?"
"স্যালাইন দিয়েছে তো তাই কালকে সকালে চলে যেতে বলেছে। আমার রুদের জন্য টেনশন হচ্ছে। ও তো আমাকে ছাড়া কখনো থাকেনি ভাই। ও যদি কান্না করে।"
"টেনশন কইরো না। চাচি দেইখা রাখবো। তুমি রাহমিদ রে দেহো।"
"ভালো লাগছে না কিছুই। আমার ভাই, বোনদের রোগ শোক পিছু ছাড়ে না কেন ভাই?"
রায়হানের কান্না গলা। রুস্তম ও তার চ্যালা প্যালা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে তারা যেয়ে কি করবে। যতই বখাটে গিরি করুক দিন শেষে মানুষের বিপদে বখাটেপনা সাজে না। এটা তারা খুব করে মানে। রায়হান দিলদারের সামনে থেকে গিয়ে রুস্তমদেরকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানালো। তারাই তো এই হাসপাতালের ঠিকানা দিয়েছে নাহলে অতো টাকা দিয়ে কিভাবে সে রাহমিদকে ভর্তি করাতো। 
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন