ফন্ট সাইজ:
থিম:
জীবন পেন্ডুলাম

১২তম পর্ব

লেখক: তাজরীন ফাতিহা

#জীবন_পেন্ডুলাম

#তাজরীন_ফাতিহা
সন্ধ্যে নামলে পাখিরা নীড়ে ফেরে। কর্মজীবী মানুষ ক্লান্ত পথিকের ন্যায় বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকে। কেউ কেউ আরও আগে বা পরে বাড়ির পথে বেরিয়ে পড়ে। রায়হান মাগরিবের নামাজ পড়ে রাস্তায় একাকী হাঁটছে। তার ভালো লাগছে না কিছুই। সন্ধ্যা পার হয়ে রাতের আধারে ধরণী আচ্ছাদিত হচ্ছে। কিন্তু রায়হানের ভাবমূর্তির কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। সে এক মনে রাস্তায় হেঁটে চলছে। কোথায় যাচ্ছে জানে না সে। বাড়িতে যে ছোট দুইজন ভাইবোন আছে যারা তার অপেক্ষায় অপেক্ষারত সেটাও সে ভুলে গেছে খানিকক্ষণের জন্য। পৃথিবীর এই নিষ্ঠুরতায় সে ক্লান্ত, জর্জরিত, আতঙ্কিত। মাথায় পরীক্ষার ফি এর চিন্তা। কিভাবে জোগাড় করবে টাকাগুলো? পরীক্ষায় বসতে পারবে কি? নাকি এই বর্ষেই থাকতে হবে আবার? তার পক্ষে একই বর্ষে দুইবার থাকা সম্ভব না। কি করবে ভেবেই কোনো কুলকিনারা পাচ্ছে না সে। শেষমেষ কোনো উপায় না পেয়ে জগতের সৃষ্টিকর্তা, নিজের সৃষ্টিকর্তা মহান রবের কাছে তার না বলা আর্জি গুলো পেশ করলো আসমানের দিকে তাকিয়ে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মালিক কি তার আর্জি শুনলো? শুনেছে তো অবশ্যই কারণ রবের নিকট সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর বিষয়ও অগোচর হয় না।
____
 
রাত সাড়ে নয়টায় রায়হান বাসায় ফিরলো। সচরাচর রায়হান এতো দেরি কখনোই করে না। আজকেই এতটা দেরি করে বাসায় এসেছে। রায়হান নিজেদের বরাদ্দকৃত রুমে ঢুকতে গিয়ে দেখলো রাহমিদ নিজ হাতে ভাত খাচ্ছে দুই পা ছড়িয়ে। রুদ ভাত মাখিয়ে দিয়েছে আর বাচ্চাটা কোনরকম ভাত খাচ্ছে। যদিও ভাত বেশিরভাগ পড়ে যাচ্ছে তবুও বাচ্চাটা হাল না ছেড়ে নতুন উদ্যমে ভাত খাচ্ছে। রায়হান অনেক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখলো। রাহমিদটা বড় হয়ে যাচ্ছে। আগে রায়হান কে না দেখলে কত কান্না করতো এখন আর কাঁদে না। আচ্ছা, তার যদি কিছু হয় বা সে যদি না থাকে এই বাচ্চা দুটো কি এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারবে? ইদানীং এসব বিদঘুটে ভাবনা এতো পরিমাণে আসে মনে হয় শীঘ্রই কিছু একটা ঘটতে চলেছে। আল্লাহ্ খারাপ কিছু না ঘটাক। এই পৃথিবীতে ভাইবোনদের নিয়ে একটু ভালো থাকতে চাওয়া ছাড়া তার আর কিছু চাওয়ার নেই। এসব ভাবতে ভাবতেই দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করলো সে। রায়হান কে দেখে রুদ দৌঁড় দিয়ে আসলো। উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞাসা করলো,
"ভাইয়া সারাদিন কোথায় ছিলে?"
"এইতো কাজে। কেন?"
"ভাইয়া তুমি বাইরে থাকলে আমার চিন্তা হয় অনেক। কোথায় থাকো, কই যাও বলতেও তো পারবো না। বিপদ অপদের তো কোনো ঠিক ঠিকানা নাই। তুমি একটা ছোট্ট কমদামী বাটন ফোন কিনিও।"
"বাটন ফোনের কথা তোমায় কে বলেছে?"
"পাশের ঘরের আপুটা বলছিল আজকে। তুমি না আসায় রাহমিদ তোমাকে অনেক খুঁজেছে, কেঁদেছে। তখন উনি ফোনের কথা বলেন। আমি বলেছি আমাদের কোনো ফোন নাই। ফোনের অনেক দাম। আপুটা বলেছে বাটন কমদামী সেট পাওয়া যায় নাকি। আচ্ছা ভাইয়া সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন কি?"
"অন্যের ইউজ করা ফোন কম দামে বিক্রি করলে সেটাকে সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন বলে। কেন বলো তো?"
রায়হানের যদিও কথা বলতে ইচ্ছা করছে না তবুও রুদকে কষ্ট দিতে চাচ্ছে না। সারাদিন সে বাসায় থাকে না। ভাইবোন গুলোরও তো তার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে। রুদ ভাইয়ের কথা শুনে কিছু ভাবলো। তারপর বললো,
"বাটন ফোনের দাম বেশি নাকি সেকেন্ড হ্যান্ড ফোনের দাম বেশি?"
"সেটা মডেল অনুযায়ী ভেরিফাই করে।"
রুদ অতি উৎসাহী হয়ে বললো,
"ভাইয়া একটা সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন কিনবে? ফোনটা নাকি টাচ।"
"কোথায় পাবো? তোমাকে এসব কে বলেছে?"
"ওই আপুই বলেছেন। ওনাদের ফোন নাকি বিক্রি করবে। আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো আমরা বাটন ফোন কিনবো নাকি সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন কিনবো? আমি কিছু বলি নাই।"
"ও আচ্ছা ভেবে দেখি। ভাত খেয়েছো?"
"না খাইনি। রাহমিদও সারাদিন খায়নি। ওকে জোর করে ভাত খাইয়ে দিতে চেয়েছি ও নাকি খাবে না। কেমন লাগে বলো?"
এর মধ্যে রাহমিদ প্লেট রেখে কখন হেঁটে এসেছে ওরা কেউই খেয়াল করেনি। ভাইয়ের গা বেয়ে উঠে গলা জড়িয়ে ধরে ছলছল নয়নে বললো,
"মালচে। বেশি করি মাইর দিছে পাচায়।"
রাহমিদ পাছা দেখিয়ে দিলো। রায়হান ভাইয়ের ছলছল নয়নে তাকিয়ে কি যেন খুঁজে পেলো। আজকে জড়িয়ে ধরার শক্তি পেলো না। কেমন হাঁসফাঁস লাগছে তার। মাথাটা কেমন ব্যথা করছে। বিষাক্ত লাগছে সব কিছু। আজকে কিছুই ভালো লাগছে না। রাহমিদ কে নামিয়ে মুখ হাত ধুয়ে শুয়ে পড়লো। ভাতও খেলো না। কারণ যতক্ষণ জেগে থাকবে চিন্তায় চিন্তায় সে আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে। এর থেকে একটু ঘুমিয়ে নেয়া যাক। জাগতিক সকল চিন্তা, কষ্ট, ক্লেশ থেকে সাময়িকভাবে তো মুক্তি পাওয়া যাবে এই ঢের। রায়হান সারাদিনের ক্লান্তিতে খুব তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়লো। রাহমিদ ভাইয়ের বুকের উপরে উঠে শুয়ে থাকলো। বোনের কাছে আজকে যাবে না।
 রুদ দুই ভাইয়ের কাণ্ড দেখলো। বড় ভাই না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে এতে তার খুব খারাপ লাগছে। ভাইয়ার কি বেশি খারাপ লাগছে আজকে। কিছুই যে বললো না আজকে। অন্যান্য দিন তো এসে তাদের ভাইবোনের সাথে কত গল্প করে কিন্তু আজকে এতো নির্জীব কেন ভাই। কোনো সমস্যা হয়েছে কি? এসব ভাবতে ভাবতে সব কিছু গুছিয়ে রাখলো। সে আর কিছু খেলো না। ভাইয়া কিছু খায়নি। সে কিভাবে ভাইকে ছাড়া খাবে। বাসনকোসন এক পাশে রেখে ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ভাইয়ের গলা জড়িয়ে সেও ঘুমিয়ে পড়লো। 
______
-----
রায়হান ভার্সিটির ক্যান্টিনে বসে আছে। আজকে আসতে চায়নি কিন্তু কি মনে করে যেন আসলো। স্যারের সাথে আজকে শেষ কথা বলবে। রায়হান জানে ইমরান স্যার কখনোই মানবে না তবুও শেষ একটা চেষ্টা করে দেখবে সে। যথারীতি ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। আজকে ইমরান স্যারের বদলে বাদল স্যার এসেছে। রায়হানের বুক ধড়ফড় করে উঠলো। স্যার না আসলে কিভাবে তার সমস্যার কথাটা বলবে। আজকেই তো শেষ তারিখ ছিল পরীক্ষার ফি দেয়ার। টেনশনে রায়হান ঘেমে উঠতে লাগলো। বাদল স্যার ক্লাসের মধ্যেই বললো,
"তোমাদের ইমরান স্যার কয়েকদিন আসবে না। তোমাদের পরীক্ষার ফি যাদের বাকি আছে তারা কালকে বা পরশু আমাকে জমা দিবে। আজকে কিছু সমস্যার জন্য নিতে পারছিনা। পরীক্ষার আর বেশিদিন বাকি নেই। প্রিপারেশন কেমন নিচ্ছো সবাই?"
সকলে সমস্বরে বলে উঠলো,
"ভালো স্যার।"
শুধুমাত্র রায়হান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। চোখ দুটো পানিতে ছলছল করছে। তার মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বের হয়ে গেলো, 
"আলহামদুলিল্লাহ।"
মহান রব ঠিকই তার আর্জি কবুল করেছেন। হয়তোবা টাকা পাঠিয়ে দেননি কিন্তু একটা সমাধান ঠিকই পাঠিয়েছেন। আল্লাহর কাছে তার বান্দা কিছু চাইলে মহান রব তা ফিরিয়ে দেননা। একটা না একটা ব্যবস্থা ঠিকই করে দেন। আবারও সে আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলো। দুই দিনের মধ্যে একটা না একটা টিউশনির টাকা ঠিকই পেয়ে যাবে সে। আল্লাহর উপর ভরসা আছে। মালিক যেহেতু সময় দিয়েছে এর পিছনে নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্য আছে।
_____
----
বেশ কিছুদিন পর। রায়হানের দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা শেষ। ভালোভাবেই পরীক্ষা শেষ করেছে সে। এখন ফলাফল ভালো হলেই চিন্তামুক্ত। কালকে থেকে রোযা শুরু। যদিও রমাদানে তার মতো মানুষের এক্সট্রা কোনো বাজারের চিন্তা থাকে না তবুও একটা পবিত্র মাসের আগমণ তাকে চিন্তিত করে ঠিকই। কিভাবে এই পবিত্র মাসটা কাটাবে, কিভাবে ইবাদত করলে এই পবিত্র মাসে পরিপূর্ণ সওয়াব পাওয়া যাবে এসবই তার ভাবনায় কিলবিল করতে থাকে। তাছাড়া রাহমিদ রুদ দুইজনই ভাজা পোড়া খেতে পছন্দ করে। গতবার রাহমিদ এটার জন্য কেমন করলো ভাবলেই তার খারাপ লাগে। এবার চেষ্টা করবে কিছু ভাজা পোড়া রাখতে। যদিও সে জানে না কতটুকু পারবে। 
 চারপাশে মাইকে সেহেরির জন্য ডাকা হচ্ছে। রায়হানের ঘুম ভেঙে গেলো। ভাত তো রান্না করা হয়নি। সে দ্রুত উঠে ভাত আর ঢেঁড়স ভাজি করলো। সেহেরির অল্প সময় বাকি। ইতোমধ্যে রুদও উঠে গেছে। রুদ সবকটা রোযা রাখতে না পারলেও চেষ্টা করে ভাইয়ের সাথে রাখতে। গতবার রেখেছিল দশটা। এবার দেখা যাক কয়টা রাখতে পারে। 
রায়হান এক প্লেটেই তার আর রুদের খাবার বেড়ে নিলো। রুদকে খাইয়ে দিয়ে নিজেও এক লোকমা মুখে পুড়লো। হঠাৎ করে রাহমিদের কান্নার আওয়াজে মুখে খাবার নিয়েই ওকে কোলে নিলো। বাচ্চাটা ঘুমের ঘোরে কাউকে পাশে না পেয়ে কেঁদে উঠেছে। রায়হান ওকে কোলে নিয়েই দ্রুত ভাত খেতে লাগলো। রাহমিদ ভাইবোনকে খেতে দেখে নিজেও হা করলো। সেটা দেখে রায়হান মুচকি হেঁসে বললো,
"তুমিও সেহেরি করবে?"
 
রাহমিদ ঘনঘন মাথা নাড়াতে লাগলো অর্থাৎ সেও করবে। রায়হান হেঁসে ওকেও এক লোকমা খাইয়ে দিলো। বাচ্চাটা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে খেতে লাগলো। রায়হান এটা দেখে বুঝলো রাহমিদের অনেক খুদা লেগেছে। সে আরেক লোকমা বাড়িয়ে দিলো। বাচ্চাটা এবারও খুব আয়েশ করে ভাত মুখে নিয়ে চিবুতে লাগলো। এর মধ্যেই মসজিদের মাইকে বলে উঠলো,
"সম্মানিত এলাকাবাসী সেহেরির আর মাত্র বিশ মিনিট বাকি। এখনো যারা সেহেরি করেননি তারা অতি দ্রুত সেহেরি করে নিন। সেহেরি খাওয়ার আর মাত্র বিশ মিনিট বাকি আছে।"
সেহেরির সময় শুনে রায়হান দ্রুত রুদ আর রাহমিদকে খাইয়ে নিজে কোনরকম খেয়ে পানি খেলো। এর মধ্যেই সেহেরির সময় শেষ হয়ে গেছে। ফজরের আজান শুনে মসজিদে যাওয়ার জন্য ওযু করে পাঞ্জাবি গায়ে দিলো। রাহমিদও পাঞ্জাবি নিয়ে দৌঁড়িয়ে বোনের কাছে গেলো। রুদ বাসনকোসন গুছিয়ে রাখছে। ভাইয়া ধুয়ে দিয়েছে তার কাজ শুধু গুছিয়ে রাখা। রাহমিদ এসেই বোনের জামা টানতে টানতে বললো,
"পলিয়ে দাও। মুসজিদে জাবু। তালাতালি পলাও ভাইয়ু চলি যাচ্চে।"
রুদ অবাক হয়ে তাকালো। রাহমিদ যে পাঞ্জাবি নিয়ে এসেছে এতেই আশ্চর্য হয়েছে। ভাবনা থেকে বেরিয়ে রাহমিদকে পাঞ্জাবি পরিয়ে দিলো। পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে দেয়ার সময়ও বোনকে দিলো না। রাহমিদ পাঞ্জাবি পড়েই ভাইয়ের কাছে দৌঁড়ে গেলো। রায়হান রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল পথিমধ্যে রাহমিদকে পাঞ্জাবি পড়ে তার দিকে ছুটে আসতে দেখে দাঁড়িয়ে গেলো। রাহমিদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ফোকলা হেঁসে বললো,
"মুসজিদে জাবু।"
রায়হান হাঁটুমুড়ে বসে রাহমিদের পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে দিলো। পাজামা টাখনুর উপরে গোটালো। রাহমিদ পাজামা গোটাতে চায়না। সে আবার নিচু হয়ে পাজামা নামিয়ে দিতে চাইলো। রায়হান তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
"টাখনুর নিচে ছেলেদের জন্য প্যান্ট পড়া হারাম সোনা। এভাবেই সুন্দর লাগছে। মাশাআল্লাহ।"
"হালাম কি?"
"হারাম মানে নিষদ্ধ। যেটা করা উচিত নয়।"
"নিচিদ্দ কেনু?"
"কারণ আমাদের ইসালমে এটা নিষেধ। আমাদের নবীজী (সাঃ) এটাকে নিষেধ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
"তোমাদের পুরুষদের কেউ যদি টাখনুর নিচে কাপড় লটকিয়ে রাখে সে জাহান্নামী। অর্থাৎ পোশাকের যে অংশটুকু টাখনুর নিচে থাকবে সে অংশটুকু দোযখের আগুনে জ্বলবে।" (সহীহ বুখারী)
অপর হাদীসে এসেছে,
"যে লোক টাখনুর নিচে কাপড় রাখাকে গর্ববোধ করে বা ঔদ্ধত্য দেখিয়ে কাপড় পড়া থেকে বিরত থাকে না সে জাহান্নামী।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
"সুতরাং এই দুইটা হাদিস থেকে বুঝলাম কোনো অবস্থাতেই টাখনুর নিচে কাপড় পড়া যাবে না। বুঝেছো কলিজা।"
"বুঝেচি।" বলে হেঁসে দিলো।
অতঃপর দুই ভাই মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। রাতের আধারে বড় ভাইয়ের আঙ্গুল ধরে ছোট ভাইয়ের মসজিদে যাওয়ার দৃশ্যটি রুদের কাছে দারুন লাগলো।
দেখতে দেখতে পঁচিশটা রোযা সম্পূর্ণ হবে আজকে। দুপুর তিনটে। কাঠফাঁটা রোদে চারপাশ যেন ঝলসে যাচ্ছে। রায়হান ফুটপাতে হাঁটছে। হাতে এক পোয়া বেসন আর দুইটা মাঝারি আকারের বেগুন ঝুলছে পলিথিনে। রোদের তেজে রায়হান ঘেমে নেয়ে একাকার। আজকে টিউশনির প্রেশারটা বেশি ছিল। রোযার কয়েকদিন একটু বেশিই পরিশ্রম করতে হচ্ছে তাকে। যেহেতু মুসলিমদের বছরে দুইটা আনন্দের দিন আসে সেহেতু দুটো ঈদে রায়হান যথাসম্ভব ভাইবোন দুটোকে নিজের সাধ্যের মধ্যে জামাকাপড় দেয়ার চেষ্টা করে। নিজের জন্য কিছু না কিনলেও ভাইবোন দুটোর জন্য সে কিনবেই। টিউশনির টাকায় সারা মাস চালাতে তার হিমশিম খেতে হয়। তাই এই মাসে চেষ্টা করে স্টুডেন্টদের সময় বেশি দিতে। এতে অভিভাবকরা খুশি হয়ে বোনাস দেয়। মানে টিউশনির টাকার সাথে কয়টা টাকা বেশি বোনাস দেয়। যেহেতু তার ভার্সিটি বন্ধ থাকে তাই কোনো সমস্যা হয়না। 
রায়হান পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই মসজিদে পড়ে। মসজিদে ফজরের সালাত আদায় করে বাসায় এসে কুরআন তেলাওয়াত করে বেরিয়ে পড়ে টিউশনের উদ্দেশ্যে। সকাল সাতটায় বের হয়। বাসায় আসে কোনোদিন তিনটায় আবার কোনোদিন চারটায়। টানা কয়েক ঘণ্টা অমানুষিক পরিশ্রম করে বাসায় এসে আবার ভাইবোনদের জন্য কিছু ভাজা পোড়া করে। সাধ্যের মধ্যে শরবত আর কিছু ফলমূল রাখার চেস্টা করে। সব সময় অবশ্য ফল থাকে না। ফলের যে দাম। আগুন একেবারে! 
দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতিতে রায়হানদের মতো মানুষদের চলতে হয় হিসেব করে। অন্যান্য মাসে দাম যেমন তেমন কিন্তু রোযার মাসে দাম হয়ে যায় আরও দ্বিগুণ। যা নিম্নবিত্ত, রায়হানের মতো খেটেখাওয়া মানুষদের জন্য খুবই কষ্টকর ও কষ্টসাধ্য। রমাদানে যদিও রায়হানের ঘরে ভুঁড়ি ভুঁড়ি বাজার করা হয়না তবুও ওই একটু ছোলা বুট, মুড়ি এগুলোতেই চলে যায় বেশ কিছু খরচা। প্রতিদিন অবশ্য তাদের ভাজা পোড়া বা বুট মুড়ি থাকে না। কোনো কোনো দিন ভাত, পানি দিয়েও ইফতার সারে তারা তিন ভাইবোন। সেদিন রাহমিদ টা প্রচুর জ্বালায়। পাশের ঘরে ভালোমন্দ খাবার দেখে এসে তারও ছোট্ট মনে খেতে ইচ্ছা করে এসব খাবার। 
অবশ্য পাশের ঘরের আপুটা দুই দিন ইফতারি দিয়ে গিয়েছেন। রায়হান কিছু দিতে পারেনি এখনো। তাদের ইফতারি বেশিরভাগই থাকে ভাত নাহলে ছোলা মুড়ি। মাঝে মধ্যে একটু পিঁয়াজু। শুধু ছোলা মুড়ি আর একটু পিঁয়াজু কি কারো বাসায় ইফতারি হিসেবে পাঠানো যায়। তাই আজকে বেসন আর বেগুন কিনেছে। মসুর ডাল ভিজিয়ে রেখে এসেছে। ভাজা পোড়া কয়েকটা বানিয়ে আজকে ওনাদের দিবে। রাহমিদ টাও খুব খুশি হবে আজকে। এসব ভেবে রায়হানের ক্লান্ত দেহে একটুকরো প্রশান্তি বয়ে গেলো। ভাইবোন গুলো খুশি হলেই সে খুশি। 
_____
---
 
রায়হান ঘরে ঢুকে প্রথমে গোসল করলো। আজকে বেজায় গরম পড়েছে। গোসল করে বের হয়ে দেখলো রাহমিদ বিছানায় বসে পা ছড়িয়ে তার আনা বেসন আর বেগুন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। যেন খুব গভীরভাবে কোন কিছু পর্যবেক্ষণ করছে সে। রুদ রুমে নেই। ও বিছানায় রাহমিদের পাশে বসে বললো,
"পন্ডিত মশাই কি করছে?"
"দেখচি।"
"কি দেখছো?"
রাহমিদ উৎফুল্ল হয়ে বললো,
"আজ মুজা মুজা লান্না হোবে?" 
রায়হান মজা করে বললো,
"না তো। আপনাকে কে বলেছে এই কথা প্রিন্স রাহমিদ ওরফে পন্ডিত সাহেব?"
রাহমিদ মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে ফিচ ফিচ করে হেঁসে বললো,
"আমি যানি।"
রায়হান হেঁসে উঠে রাহমিদের পেটে নাক দাবিয়ে আদর করতে লাগলো। রাহমিদ খিলখিল করে হেসে উঠলো। রুদ একটা বাসনে পানি আর বটি নিয়ে এসেছে। দুই ভাইকে হাসতে দেখে নিজেও হেঁসে ফেললো। ওগুলো রেখে বড় ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরলো। রায়হান পিছনে ফিরে রুদের কপালে গালে আদর করলো। রুদও হেঁসে ভাইয়ের গালে, কপালে, মাথায় চুমু দিলো। এটা দেখে রাহমিদ রুদের দিকে মাথা আর গাল এগিয়ে দিলো। রুদ হেঁসে ওকে বললো,
"না তুমি দুষ্টু। তোমাকে আদর দিবো না। আমার একটাই ভাই। তোমাকে কুড়িয়ে পেয়েছি আমরা। তাই না ভাইয়ু?"
রায়হানও সায় জানিয়ে গম্ভীর মুখে বললো,
"হ্যাঁ আসলেই। এরকম বিচ্ছু আমাদের ভাই হতেই পারে না। খামচি দেয়া যার জন্মগত স্বভাব। আমরা কেউই খামচি দিতে পারিনা। ইনি খামচির উপর পিএইচডি করা মানুষ। খামচির রাজা প্রিন্স রাহমিদ।"
রাহমিদ প্রথমে বোনের কথা পাত্তা না দিলেও ভাইয়ের গম্ভীর মুখে বলা কথা বিশ্বাস করে ফেললো। মুহূর্তেই তার চেহারার রঙ পাল্টে কান্না কান্না ভাব জুড়ে গেলো। সে ভাইয়ের কোল থেকে নামার জন্য মোচড়ামুচড়ি করতে লাগলো। চিৎকার করে কান্না জুড়ে দিলো। রায়হান ও রুদ থতমত খেলো। ছোট ভাইকে কি বেশি কষ্ট দিয়ে ফেললো দুইজন। রুদ ফিক করে হেসে বললো,
"ভাইয়ু মজা করেছে রাহমিদ। আমিও মজা করেছি। তুমি তো আমার ছোট্ট আদুরে ভাইটুস।"
রায়হান রাহমিদকে আদর করে চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো,
"পৃথিবী এক দিকে আর আমার ভাইবোন একদিকে। ওই একদিকের দুই ভাগ আপনারা দুইজন। আল্লাহ ও রাসূলের পর সব চেয়ে বেশি ভালোবেসেছিলাম আমার মা, বাবাকে কিন্তু তারা আমার ভালোবাসাকে দূরে ঠেলে হারিয়ে গেছে দূর অজানায়। এখন তো এই পৃথিবীতে আমার ভালোবাসার আছেই মাত্র দুইজন মানুষ। আমার কলিজা। আমার জীবনে ভালোবাসার মানুষের সংখ্যা খুবই সীমিত। নেই বললেই চলে। আপনারা আমার কাছে সাত রাজার ধনের থেকেও অনেক বেশি মূল্যবান। বুঝেছেন কলিজা?"
রাহমিদ ভাইয়ের এত ভারী ভারী কথা বুঝতে পারেনি তবে ভালোবাসা ঠিকই বুঝেছে। সে আদুরে বিড়াল ছানার মতো ভাইয়ের কোলে লেপ্টে রইলো। রায়হান রুদ আর ওকে ঝাপটে জড়িয়ে রাখলো। তিন ভাইবোন ভালোবাসার প্রতীক হয়ে একে অপরের সাথে মিশে রইলো। দৃশ্যটা চমৎকার!
____
----
আজকে ইফতারিতে রায়হান আয়োজন করেছে ট্যাংয়ের শরবত, ছোলা, মুড়ি, পিঁয়াজু, বেগুনি আর আলুর চপ। সবই অল্প অল্প করে বানিয়েছে। এতো আয়োজন রায়হান করেনা। আজকে করেছে পাশের ঘরে ইফতারি দিবে বলে। একটা প্লেটে সব সাজিয়ে রুদকে দিলো পাশের ঘরে দিয়ে আসতে। এর মধ্যে রাহমিদ বায়না করলো সে প্লেট নিবে। প্লেট নেয়ার জন্য রীতিমত পা ঝাপটাতে লাগলো। রুদ উপায় না পেয়ে ওকে দিলো। রাহমিদ ছোট দুইটা হাতে প্লেট ধরে হাঁটতে লাগলো। রুদ ভাইয়ের পিছে পিছে যেতে লাগলো। পরে টোরে যায় নাকি এই ভয়ে।
 দুই ভাইবোন ইফতারি দিয়ে এসে নিজেরাও বসলো। আজকে রাহমিদের চোখ চকচক করছে। পিঁয়াজু, বেগুনি খাবে। ইতিমধ্যেই দুটো খেয়ে ফেলেছে সে। রাহমিদ প্রতিদিন হাফ হাফ করে রোযা রাখে। এরকম করে ওর চারটা রোযা হয়েছে। এভাবে রোযা রাখতে পেরে সে খুবই খুশি। রুদ মাথায় হিজাব পড়েছে। এই হিজাবটা রায়হান তাকে আরবি পড়তে কিনে দিয়েছিল। বাসায় বেশিরভাগ সময়ই ও এই হিজাবটা পড়ে থাকার চেষ্টা করে। 
মাগরিবের আজান দিচ্ছে। রায়হান "বিসমিল্লাহ" বলে খেজুর মুখে দিলো। রুদ আর রাহমিদও ভাইয়ের দেখাদেখি বিসমিল্লাহ বলে খেজুর খেলো। ফলের মধ্যে শুধু খেজুরটাই তাদের ইফতারিতে থাকে। রুদ আর রাহমিদের জন্য আলাদা দুইটা পিঁয়াজু, বেগুনি আর আলুর চপ রেখে একটা করে পিঁয়াজু, বেগুনি ও আলুর চপ মেখে বুট মুড়ি বানালো। এগুলো খেয়ে একেবারে সেহেরিতে ভাত খাবে সে। মাঝখানে আর ক্ষুধা লাগবে না। 
রায়হান ইফতারি শেষে "আলহামদুলিল্লাহ" বলে নামাজে চলে গেলো। রাহমিদও ভাইয়ের সাথে নামাজে যেতে চেয়েছিল কিন্তু আজকে বেশি খাওয়ায় পেট ফুলে ঢোল হয়ে আছে। রাহমিদ বিছানায় ফোলা পেট নিয়ে হাত, পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। 
রুদ নামাজ শেষে ছোট ভাইয়ের এই অবস্থা দেখে হেঁসে ফেললো। উঠে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। বাচ্চাটা একটু ভালোমন্দ দেখলেই খাওয়ার জন্য কেমন পাগলামি করে। আজকে এক হাতে পিঁয়াজু আরেক হাতে বেগুনি নিয়ে কিভাবে খাচ্ছিলো। ভাবলেই হাসি পায় আবার দুঃখও লাগে। ছোট্ট ভাইটা ভালোমন্দ কত পছন্দ করে অথচ সামর্থ্য নেই তাদের। কষ্ট পেয়ে আর কি হবে। আল্লাহ্ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। ভাইয়া বলেছে ,
"বিপদে ধৈর্য ধরে যারা তারাই সফল।"
ভাইয়া প্রায়ই কুরআনের একটা আয়াত তিলওয়াত করে বাংলায় অনুবাদ করে বলে,
"নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে সস্তি রয়েছে।" 
                     ~(সূরা ইনশিরাহ, আয়াত ৫-৬)
মহান রবের প্রতি ভাইয়ের অগাধ বিশ্বাস। তাকে এবং রাহমিদকেও এভাবেই গড়ে তুলছে তাদের বড় ভাই। কোনোভাবেই রবের প্রতি বিশ্বাস, ভরসা হারানো যাবে না। রুদ এসব ভাবতে ভাবতেই বড় ভাইকে ঘরে ঢুকতে দেখলো। রায়হান রাহমিদকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে বলল, 
"কি হয়েছে ওর?"
রুদ বললো,
"ভাইয়ু রাহমিদ আজকে বেশি খেয়ে ফেলেছে। এখন লড়তে চড়তে পারছে না।"
রায়হান উদ্বিগ্ন গলায় বললো,
"বলেছি এসব ভাজা পোড়া কম খেতে কিন্তু এই বিচ্ছু একটা কথাও শোনে না।"
 রায়হান গ্যাস্ট্রিকের সিরাপ কিনে এনে বাচ্চাটাকে খাইয়ে দিলো। রাহমিদ খেতে না চাইলে জোর করে ধমকিয়ে খাইয়েছে। পরে পেটে গ্যাস হলে অনেক সমস্যা হবে। যা রায়হান মোটেও চায়না। ভাইবোনদের অসুখে সব চেয়ে ব্যথিত সেই হয়। রাহমিদটার এমনিতেই অসুখ বিসুক লেগেই থাকে। কোথা থেকে কি হয় বলা তো যায় না। সে কোনো রিস্ক নিতে রাজি নয়।
চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন