আলগোছে_ভালোবাসি সিজন 1
#লেখিকা_আজরিনা_জ্যামি
আয়াতের খুব রাগ হচ্ছে আয়াজের ওপর। আয়াজ এরকম একটা কাজ কি করে করতে পারলো। আয়াতের যদি ইশরাতের মতো কোন ফোবিয়া বা সমস্যা থাকতো অন্ধকারে তাহলে কি হতো। ভেবেই ওর খুব রাগ হচ্ছে।আর আজ যদি ঐ ব্যাগটা না পাঠাতো তাহলে কি হতো তাহলে ইশরাত কে কিভাবে সামলাতো ও। কিছুটা সামনে যেতেই রেজওয়ান আহমেদ কে দেখতে পেল আয়াত রেজওয়ান আহমেদ আয়াতকে থামিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বলল,,,
"তুই ঠিক আছিস তো!"
"আমার ব্যাপারে তো তুমি ভালোমতোই জানো তাহলে"
"তবুও আর তুই ওখানে কিভাবে গেলি আর আটকেই বা দিলো কে।"
"অন্ধকারে আমি নিজের সত্তাকে দেখতে পাই। হয়তো অন্ধকার আমার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে তাই। আমাদের সাথে ঘঠিত সকল ঘটনা এই অন্ধকারে হয়েছে তাই আমি অন্ধকার ভয় পাই না। অন্ধকারে আমি আলাদা শক্তি খুঁজে পাই। আর বাকি কথা আমি পরে তোমাকে জানিয়ে দেব । এখন যেতে হবে ঠিক সময় পৌঁছাতে না পারলে হয়তো কারো জীবন চলে যেতে পারে।"
"আচ্ছা ঠিক আছে"
"আল্লাহ হাফেজ"বলেই আয়াত আবার হাটা ধরলো। অনেকেই আয়াত আর প্রিন্সিপালের দিকে তাকিয়ে ছিল। এমন কি খান পরিবারের সকলেই আয়াজরাও বাদ যায়নি। সকলেই বেশ অবাক হলো। ও হেটে মাঠের মাঝখানে আসলো তখন অনিক ও তার বন্ধুরা আয়াতের পথ আটকে ধরলো। আয়াত এখনো ঘেমে আছে মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে রয়েছে। তা দেখে অনিকের বন্ধু বলল,,
"বাহ আজ তো তোমার এই ঘমার্ত মুখে দারুন হট লাগছে।"
"সেদিনের কথা বুজি ভুলে গেছেন।"
"সেদিন তোমার হাতের চড় খেয়ে দারুন ফিল হচ্ছিল।"
তখন অনিক বলল,,
"এই বাজে কথা বন্ধ কর। আর মিস আজকে আয়াজ যে তোমাকে স্টোর রুমে বন্ধ করে রেখেছিল সেটা আমি জানি।"
"তো কি হয়েছে "
"কিছু না এখন তুমি আমাদের সাথে চলো।"
"কোথায়?"
"কোথায় আবার আমার বিছানায় আজকে তোমাকে যা দারুন হট লাগছে না।"
আয়াত এমনিতেই রেগে ছিল। অনিকের কথায় আরো ওর শরীর রাগে রি রি করে উঠলো। ভুল বশত আয়াতের হাত টাই ধরল। এটাই হয়তো ও সব থেকে বড় ভুল করে ফেললো। হাত ধরায় ওর মাথায় রক্ত চেপে গেল।
আয়াজ এতোক্ষণ আয়াতের দিকেই তাকিয়ে ছিল অনিকের হাত ধরায় আয়াজ কোন দিক না তাকিয়ে আয়াতের দিকে দৌড় লাগায়। আয়াত রেগে অনিককে একটা নাক বরাবর ঘুসি মারলো। তা দেখে অনিকের বন্ধুরা ওকে ধরতে আসলো। আয়াত দেরি না করে অনিকসহ ওর তিন বন্ধুকে ইচ্ছে মতো মারতে শুরু করলো । আয়াজের আসার আগেই আয়াত সকলকে মারতে শুরু করে। আয়াজ আয়াতের কাছে এসে দাড়িয়ে পরলো। ও অবাক চোখে আয়াতের মার দেখছে। আরো অবাক হয়েছে আয়াতের মারের স্কিল দেখে । দেখে মনে হচ্ছে খুব প্রফেশনাল । নিচে মারামারি হচ্ছে দেখে সবাই সেখানে আসে। খান বাড়ির সকলে অবাক চোখে আয়াতকে দেখছে একটা মেয়ে হয়ে কিভাবে মারছে। আয়াতের যতো রাগ ছিল সব ওদের কে মেরে শেষ করলো। তারপর অনিকের কাছে গিয়ে বলল,,,
"সেদিন মিস্টার আরাভ কি বলেছিল ভুলে গেলি কি করে। তোদের কে আগেই সাবধান করেছিল। কিন্তু শুনলিনা আমাকে তোর বিছানায় নিতে চাইছিলি না এখন যা তোর জন্য হসপিটালের বিছানা রেডি হয়ে আছে।"
অনিক মার খেয়ে আর কিছু বলতে পারলো না। আয়াত চলে আসতে নিল। তখন কেউ ওর সামনে পানির বোতল ধরলো। ও মুখ তুলে তাকিয়ে দেখলো মাক্স পরিহিত একটা ছেলে। ওর আর বুঝতে বাকি নেই কে এইটা। পানির বোতল টা ধরে আছে ও কিছু না বলে বোতল টা নিয়ে প্রথমে মুখ ধুলো তারপর স্কুটির কাছে গিয়ে স্কুটিতে বসে পানি খেল।সেই মার্কস পরিহিত ও ওর স্কুটির কাছে গেল। আজ মনে হয় কারো অবাকতা শেষ হচ্ছে না একটার পর একটা অবাক হওয়ার কারন পেয়েই যাচ্ছে। প্রিন্সিপাল সকলকে হসপিটালে ভর্তি করার ব্যবস্থা করলো। মাক্স পরিহিতা ছেলেটি আয়াতের কাছে গিয়ে বলল,,,
"সেদিন কতো করে বললাম শালাদের যে মেয়েদের সাথে খারাপ ব্যবহার করিস না। কিন্তু কে শুনে কার কথা। এখন দেখলেন তো কিভাবে মার খেলো। "
ছেলেটির কথা বলার ভঙ্গিতে আয়াত হেসে ফেললো। আর বলল,,
"তা মিস্টার আপনি এখানে কেন।"
"আপনার দেরি হচ্ছিল বলে আসতে হলো। সব কিছু রেডি হয়ে আছে শুধু আপনার অপেক্ষা।"
"তাড়াতাড়ি ই তো যেতে চাইছিলাম কিন্তু একটার পর একটা ঝামেলাই শেষ হচ্ছে না।"
"ওকে সমস্যা নেই আপনি ধিরে সুস্থে আসুন আপনার বদলে আমি অন্য একজনকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছি। তা আপনার কোথাও লাগে নি তো।"
"ধন্যবাদ মিস্টার। আর আমার কোথাও লাগে নি।আপনি টেনশন করবেন না আমি একদম ঠিক আছি।
"ওয়েল কাম মিস।"
"তা আপনি কিভাবে এসেছেন। নাকি আপনাকে ড্রপ করে দিতে হবে।"
"আমি আমার বাইক নিয়ে এসেছি। সেটা দিয়েই চলে যাবো আপনাকে আর আমায় নিয়ে কষ্ট করতে হবে না।তবে আপনাকে একবার আপনার কাজের জায়গায় যেতে হবে।"
"তা তো যাবোই।"
"ওকে আল্লাহ হাফেজ" বলেই ছেলেটা চলে গেল।সবাই ভাবলো হয়তো ছেলেটা ওকে এমনিই পানি দিলো। কিন্তু আয়াজের খুব রাগ হলো ছেলেটার সাথে হাসি মুখ নিয়ে কথা বলতে দেখে। কেন রাগ হলো ও বুঝতে পারল না। কিন্তু ও চিন্তা করতে লাগলো ছেলেটা কি ওর পরিচিত। তখন রেজওয়ান আহমেদ আয়াতের কাছে আসলেন। উনি কিছু বলার আগেই আয়াত বলল,,,
"আমি জানি তুমি কি বলবে তার আগে আমিই বলছি। এটা নিয়ে ঝামেলা হলে আমি সামলে নেব।"
"আমি জানি তুই সামলে নিবি।আমি জিজ্ঞেস করতাম তুই ঠিক আছিস কি না।"
"আমি একদম ঠিক আছি। আমি এখন যাই তুমি ও যাও নাহলে অনেকে সন্দেহ করবে। "
"ওকে সাবধানে যাস।"
"ওকে আল্লাহ হাফেজ।"
"আল্লাহ হাফেজ "
আয়াত ওর স্কুটি নিয়ে চলে গেল। কিন্তু রেখে গেল অনেকগুলো কৌতুহলী চোখ। উনি ওনার রুমের দিকে যেতে লাগলো তখন আয়াজ উনার সামনে গিয়ে বলল,,
"স্যার আয়াত ঠিক আছে তো।"
"হ্যা ও একদম ঠিক আছে।" আর তোমরা এখন ইশরাত কে নিয়ে বাড়ি চলে যাও।"
হুম। তখন আসাদ খান আসলেন প্রিন্সিপালের কাছে। আর বললেন,,,
"মেয়েটা কে আপনি চেনেন নাকি স্যার।"
"হুম চিনি আমার মেয়ের ছোটবেলার বন্ধু নাম আয়াত।" ওকে আপনারা এখন সবাই বাড়ি চলে যান। আর ইশরাত কে নিয়ে যা হলো তার জন্য আমি দুঃখিত। আমি নিজেই জানতাম না ইশরাত আর আয়াত ওখানে আটকে গেল কিভাবে।"
তখন আয়াজ বলল,,
"স্যার আপনি প্লিজ গিল্টি ফিল করবেন না। আসলে এটা একটা এক্সিডেন্ট ছিল।"
"তবুও আমাদের আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল। এটা কি করে হলো অবশ্যই জানতে হবে।"
আসাদ খান বললেন,,
"ওকে কিছু জানতে পারলে আমাদের জানাবেন।"
তখন ইশরাত বলল,,
"আজকের মতো আমরা বাড়ি যাই প্লিজ তারপর জানা যাবে কে কি করেছে আর হয়েছে।"
সবাই ইশরাতের কথায় সায় জানালো। তারপর যে যার মতো বাড়ি চলে গেল। ইশরাত আয়াজের সাথে একটা কথাও বলে নি।
_____________________
খান বাড়িতে চলছে পিনপতন নিরবতা। ইশরাত বাড়ি এসেই সব বলেছে। কি কি করেছে আয়াজ আর আয়াত ওকে শান্ত করার জন্য কি কি করেছে। শুধু আয়াতের কথা মতো ওর ল্যাপটপের ব্যাপারে আর ওর কাজের ব্যাপারে কাউকে কিছু বলে নি। সব শুনে খান বাড়ির সকলে চুপ মেরে আছে। কেউ বিশ্বাস ই করতে পারছে না আয়াজ এমন কোন কিছু করতে পারে। হুট করে আলেয়া খান ওঠে আয়াতের গালে সপাটে চড় মারলেন। আয়াজ অবাক চোখে তার মায়ের দিকে তাকালো।কারন আজ পর্যন্ত ওর মা কখনো ওর গায়ে হাত তুলেনি। বাড়ির সকলে কেউ কিছু বললো না।কারন ও এটার ই যোগ্য। আয়াজ গালে হাত দিয়ে বলল,,,
"মা তুমি,,"
"আর একটা কথাও বলবে না। এই শিক্ষা দিয়েছি তোমাকে। তুমি কি করে পারলে এমন একটা কাজ করতে। আচ্ছা এটা ভাবলে না তোমার বোন যেভাবে অন্ধকার ভয় পায়। তেমনটা তো সেই মেয়েটাও ভয় পেতে পারতো।"
"মা আমি শুধু একটু মজা করতে চেয়েছিলাম।আমি বুঝতে পারি নি ব্যাপারটা এমন হবে।"
"কি মজা তোমার সামান্য মজা, কারো জন্যে সাজা হয়ে যেতে পারতো।" আজ যদি সেই মেয়েটা ইশরাত কে না সামলাতো তাহলে কি হতো তুমি বুঝতে পারছো।"
আয়াজ একবার ইশরাতের দিকে তাকালো। ইশরাত তা দেখে মুখ ফিরিয়ে নিলো। আয়াজ অপরাধ বোধে ভুগছে।আসলে ব্যাপারটা করা ঠিক হয়নি। ও বুঝতে পারছে কাজটা একদম ঠিক হয়নি।কালই ও আয়াতের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবে। ও চুপ করে আছে দেখে আলেয়া খান আবার বললেন,,
"কালই তুমি মেয়েটার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবে।"
আয়াজ শুধু মাথা নাড়ালো কিন্তু কিছু না বলেই সিঁড়ি দিয়ে উঠতে নিলো। কেউ আর কিছু বললো না কারন সবাই ওর চোখে মুখে অনুতাপ দেখতে পেয়েছে। তখন হুট ইশরাত বলল,,
"জানো মা আয়াত আপুর চোখের মনি দুটো না। আহি আপুর চোখের মনির মতো নীল।"
এতো বছর পর নিজের জানপাখির নাম শুনে আয়াজ থেমে গেল। সকলে একবার আয়াজের দিকে তাকালো। সকলের তাকানো দেখে ও নিজের রুমে চলে গেল। তা দেখে সকলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তখন আসাদ খান বললেন,,,
"তুমি দেখলে কিভাবে না মানে মেয়েটা তো চশমা পড়ে ছিল। আর মেয়েটার চোখটা ও ঠিক ভাবে বুঝা যাচ্ছিল না।"
"আজকে দেখেছি আমরা যখন স্টোর রুমে ছিলাম তখন গরমে আয়াত আপু চশমা খুলেছিল তখন দেখেছি ।"
"ওহ আচ্ছা।"
_______________________
আয়াজ রুমে গিয়ে ওর আলমারি খুললো সেখানে থেকে ড্রয়ার খুলে কয়েকটা ছবি বের করলো। সেই ছবিতে ছোট পাঁচ বছরের দুটো বাচ্চা হাসি মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ও ছবিগুলো নিয়ে বেলকনিতে গিয়ে বেলকনিতে রাখা চেয়ারে বসে পরল। মুহূর্তে আয়াজের চোখ ছলছল করে উঠলো। ও চোখ বন্ধ করে ছোটবেলার কথা ভাবতে লাগলো,,,,
"আয়াজ তুমি কোথায় "
"এই তো আহি আমি এখানে।"
"কোথায় তুমি আমি তো তোমাকে খুঁজে পাচ্ছি না।"
"আমি এখানেই আছি তুমি আমাকে খুজো পেয়ে যাবে।"
"কোথায় তুমি আমি পাচ্ছি না তো।"
বলেই আহি চোখ বন্ধ করে কেঁদে উঠলো । আহি আর আয়াজ লুকোচুরি খেলছিল। ওরা সমবয়সী তাই ওরা দুজন চৌধুরী বাড়িতে লুকোচুরি খেলছিল। ওর মনে হচ্ছে আয়াজকে ও হাড়িয়ে ফেলেছে। আহিকে কাঁদতে দেখে আয়াজ আড়াল থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসে আহির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,,,
"এই আহি কাঁদছো কেন এই দেখো আমি তোমার সামনে। চোখ খুলে তাকাও।"
আহি চোখ খুলে তাকালো। আর বলল,,
"আমি ভেবেছিলাম তুমি হাড়িয়ে গেছো।"
"দূর পাগলি আমি হারাবো কেন আমি কখনো তোমার থেকে হারাবো না।"
"সত্যিই"
"তিন সত্যি"
এ কথা শুনেই আহি হেসে ফেললো। আয়াজ চোখ খুলে ছবির দিকে তাকিয়ে বলল,,,
"আহি তুমি কোথায় হারিয়ে গেলে। দেখো আমি আমার কথা রেখেছি। আমি তোমার থেকে হাড়িয়ে যায় নি। কিন্তু তুমি কোথায় হারিয়ে গেলে কেন আহি। আমি যে তোমাকে ছাড়া অনেক অসহায় হয়ে পরেছি। আমার ভুল হয়েছে তোমাকে ছেড়ে এব্রুডে যাওয়া। সেদিন এমন কি হয়েছিল যে তুমি বাড়ি থেকে চলে গেলে। তুমি জানো আমি তোমাকে কতো খুঁজেছি কিন্তু পাইনি। আমি তোমাকে ভালোবাসি আহি খুব ভালোবাসি। তুমি জানো কেন যেনো মনে হয় তুমি আমার খুব কাছে আছো কিন্তু আমি তোমাকে চিনতে পারছি না। প্লিজ আহি ফিরে আসো না আমার কাছে।আমি যে তোমাকে খুব মিস করি। "
বলতে বলতে আয়াজের চোখ দিয়ে পানি পরতে লাগলো। আয়াজ যখন ক্লাস ফাইভে পরে তখন আসাদ খান তার পরিবারের সবাইকে নিয়ে এব্রুডে পারি জমান। আর তার ছয় বছর পর বাংলাদেশ এ আবার ফিরে আসে। আর এসেই জানতে পারে আহি বাড়ি থেকে চলে গেছে দু মাস হলো। সবার সাথে ওও খুঁজে আহিকে কিন্তু পায় নি।
____________________
সাত দিন পর,,
আজ সাত দিন হলো সেদিনের পার। সাত দিন ধরে আয়াত ভার্সিটি আসে না। আয়াজ রোজ নিয়ম করে আয়াতের জন্য অপেক্ষা করে। রোজার কাছে আয়াতের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে কিন্তু কিছুই জানতে পারে না। রোজা সেদিনের ব্যাপারে সব আয়াতের কাছে থেকে জেনেছে। সব জানার পর আয়াজের উপর ও খুব রেগে আছে। ইশরাত সেদিনের পর থেকে আয়াজের সাথে কথা বলে না। হয়তো অভিমানে নয়তো রাগ করে। আজ অনিকের বাবা এসেছে ভার্সিটিতে কে ওনার ছেলেকে আর ওর বন্ধুদের কে মেরেছে সেটা জানতে। উনি এসেই প্রিন্সিপাল রুমে গিয়ে প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলছে। প্রিন্সিপাল উনাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। সাত দিন পর আয়াত ভার্সিটি তে এলো। ও আসতেই আয়াজ আয়াতের দিকে এগিয়ে গেল। আয়াত কে আজ একটু কেমন যেনো লাগছে। আয়াজ আয়াতের সামনে এসে দাড়ালো তা দেখে আয়াত চোখ তুলে আয়াজের দিকে তাকালো আর বলল,,
"কিছু বলবেন?"
"না মানে সেদিন "
"সে দিন কি !"
"সেদিনের জন্য ,,,,
আরো কিছু বলবে তার আগেই রোজা এসে বলল,,,
"আয়াত তোকে বাবা ডাকছে"
"তুই জানিস কি করে।"
"বাবা বলেছে তুই আসলেই তোকে যেনো আমি তাড়াতাড়ি প্রিন্সিপাল রুমে পাঠিয়ে দেই।"
"কেন!"
"অনিকের বাবা এসেছে।"
"ওহ আচ্ছা চল তাহলে। মিস্টার আয়াজ আপনার সাথে পরে কথা বলবো।আসছি,,
বলেই আয়াত ওখানে থেকে চলে গেল আয়াজ কে কিছু না বলতে দিয়ে।"
____________________
"মে আই কামিং স্যার!"
"ইয়েস কামিং"
আয়াত প্রিন্সিপালের অনুমতি পেয়ে ভেতরে ঢুকলো। বুকেই সকলের উদ্দেশ্যে সালাম দিল।
"আসসালামু আলাইকুম সকল কে!"
তখন মন্ত্রী সাহেব মানে অনিকের বাবা কঠিন স্বরে সালাম নিলেন।
"ওয়ালাইকুমুস সালাম। তা তুমি ই কি আমার ছেলে কে আর ওর বন্ধুদের মেরেছো।"
আয়াত মুচকি হেসে বলল,,
"জি আংকেল আমিই মেরেছি ওদের।"
'আমার ছেলেকে মেরেছো আবার বুক ফুলিয়ে বলছো।"
"আমার মতে আমি তো কোন অন্যায় কাজ করিনি"
"তোমার একটুও ভয় লাগছে না।তোমার সামনে একজন মন্ত্রী বসে আছে।"
"আমার ভয় বরাবরই কম। আমি কোন অন্যায় করিনি তাই ভয় পাওয়ার কোন কারন নেই।"
"ইন্টারেস্টিং তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে।এখন তুমি বলো তুমি ওদের কে মেরেছো কেন।"
"কেন আপনাকে উনারা কিছু বলেন নি।"
"না বলেনি।"
অনিক ওর বাবার সাথে ঐ রুমেই ছিল। তাই আয়াত ওকে জিজ্ঞেস করলো।,,
"আপনি উনাকে এখানে নিয়ে এসেছেন কিন্তু কেন মার খেয়েছেন সেটা বলেন নি। কেন বলতে লজ্জা পাচ্ছিলেন নাকি। কৈ আমাকে ঐ কথাটা বলার সময় তো লজ্জা পান নি। তাহলে এখন কেন লজ্জা পাচ্ছেন।"
"ও কি করেছে তোমার সাথে। আর কি বলেছে তোমাকে।"
মন্ত্রীর কথা শুনে আয়াত বললো,,,
"ওকে আমিই বলছি। বলেই আয়াত সব ঘটনা খুলে বললো। সব শুনে মন্ত্রী সাহেব অনিকের গালে থাপ্পর মারলেন। আর বললেন,,,
"তুমি এই মানুষ হয়েছো মেয়েদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেটা জানো না তুমি। বেশ করেছে তোমাকে মেরেছে। আমিও কোনকিছু না জেনে এখানে চলে এসেছি। শেম অন ইউ। আমি তোমাকে আর এখানে রাখবো না। আমি এই সপ্তাহে তোমাকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেব।"
সব শুনে অনিক মাথা নিচু করে ফেলল। আসলে ও বুঝতে পেরেছে আসলেই ব্যাপারটা খারাপ হয়েছে। ও সেদিন ই মার খেয়ে বুজে গিয়েছে তারপর আরাভের কথা গুলো মনে করে ও নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। আসলে ও আয়াতের কাছে ক্ষমা চাইতো। ও মার খেয়েছে বলে ওর বাবা তাকে শায়েস্তা করার জন্যে এখানে এসেছে ওদের কুকৃর্তি না জেনেই।আসলে উনি মন্ত্রী মানুষ তো তাই নিজের ছেলেকে কেউ মেরেছে সেটা মেনে নিতে পারে নি। উনি আয়াতের সামনে গিয়ে বলল,,,
"তুমি যা করেছো সেটা ওর প্রাপ্য। আর ওরা যা করেছে তার জন্য আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি।"
"বাবা তোমার ক্ষমা চাইতে হবে না। আমি ক্ষমা চাচ্ছি।"
অনেকের কথা শুনে ওর বাবা বললেন,,,
"তুমি চুপ করো!"
"বাবা তুমি থামো আমার জন্য তোমার কারো সামনে মাথা নত করতে হবে না।"
"কাজটা কি তুমি ভালো করেছো। তুমি এমন একটা কাজ করেছো তার জন্য মাথা নত করা ছাড়া আর উপায় আছে কি।"
"এর জন্য আপনি কম দায়ী নন কি!"
আয়াতের এ কথা শুনে সকলে আয়াতের দিকে বিষ্ময় নিয়ে ওর দিকে তাকালো। অনিক অনেক অবাক হলো। তখন অনিকের বাবা বলল,,,
"মানে!"
"মানে আজ অনিকের যে অবস্থা তার জন্য আপনিও কম দায়ী নন।"
"তুমি কি বুঝাতে চাইছো।"
"অনিকের ছোটবেলা থেকে একটা মায়ের দরকার ছিল।আপনি কখনো সেদিকে খেয়াল রেখেছেন। সারাজীবন টাকা আর ক্ষমতার পেছনে দৌড়েছেন। যে ছেলেটার তিন বছর থাকতে মা মারা গেছে তাকে কি করে আপনি মায়ের মমতা বোঝাবেন। আপনি তো একটা আয়া রেখে ওকে একা বাড়িতে রেখে গিয়েছেন। কখনো খেয়াল রেখেছেন সেই আয়া ওকে ঠিক মতো মায়ের মমতা দিয়েছে কি না। টাকা আর ক্ষমতার পেছনে ছুটতে ছুটতে ছেলেটা কি করছে না করছে কোনদিন খেয়াল রাখেন নি। ওর বন্ধু কারা ওর পছন্দ অপছন্দ সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন হয়তো জানেন না। আজ আপনি মন্ত্রী বলে আপনার ছেলেকে কেউ মেরেছে সেটা আপনি মেনে নিতে পারেন নি তাই এখানে এসেছেন এমন আই রাইট।"
আয়াতের কথা শুনে অনিক আর ওর বাবা অনেক অবাক হলো এতো কিছু আয়াত জানালো কি করে। তখন মন্ত্রী বলল,,,
"তুমি এতো কিছু কিভাবে জানো।"
"আমি কিভাবে জেনেছি সেটা আপনার না ভাবলেও চলবে। তার আগে আপনি বলুন আমি যা বললাম সেখানে মিথ্যে আছে কিনা।"
"তুমি যা বলেছো সব কথাই সত্যি। আমি কোনদিন আমার ছেলের দিকটা ভেবে দেখিনি।ওর খেয়াল রাখিনি।এমন কি আজো ওর জন্য আমি এখানে আসিনি।"
এ কথা শুনে অনিক ওর বাবার দিকে অবাক চোখে তাকালো । ওর বাবা ওর জন্য এখানে আসেনি। ওর চোখ ছলছল করে উঠলো।ও আয়াতের সামনে গিয়ে বলল,,
" ভুল টা আমারি হয়েছে আমাকে ক্ষমা করে দিও। আসলে আমার মা বোন ছিল না তো তাই কখনো আমাকে মা বোনের সম্মান নিয়ে কখনো কেউ বলে নি। আসলে মা বোন কেমন হয় আমি সেটা জানিই না। তুমি বললে না আমি একটা আয়ার কাছে বড় হয়েছি। উনি কখনো আমাকে আদর করেনি জানো। শুধু ঠিক মতো আমার খাবারটাই দিয়েছে। কখনো মা সম্পর্কে বলে নি। তারপর আমি একটু বড় হলাম তখন আমার দশ বছর বাবা আমাকে ওখান থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে এলো। তুমি জানো। আমার সেখানে দুটো বন্ধু ছিল। তাদের সাথে আমি সবসময় খেলা করতাম । ওদের সাথে ভালোই ছিলাম। কিন্তু বাবা আমাকে ওদের থেকে আলাদা করে দিল। ওদের জন্য আমি খুব কেদেছিলাম কিন্তু বাবা কখনো আমাকে বোঝে নি এমনকি আমাকে বোঝার চেষ্টা ও করে নি। তারপর থেকে আমি উশৃঙ্খল হতে শুরু করলাম এখন যে বন্ধু দেখছো ওরা আমার কলেজের বন্ধু ওদের সাথে থাকতে থাকতে আমিও ওদের মতো এমন হয়ে গেছি। কোনটা ঠিক কোনটা ভুল সেটা আমি জানিনা কারন আমাকে সে ব্যাপারে কেউ কিছু বলেনি। খারাপ কাজ করলেও কেউ আটকায় নি। কারন আমি মন্ত্রীর ছেলে। অনেক খারাপ কাজ করেও বাবার নাম নিয়ে ছাড়া পেয়ে গেছি। তাই তো আমি এখন এমন কেউ যদি আমাকে ভালো খারাপ বোঝাতো তাহলে আমি হয়তো এমন হতাম না। "
অনিকের কথা শুনে অনিকের বাবার চোখ ছলছল করে উঠলো। উনার ছেলে কতোটা কষ্টে ছিল উনি বুঝতেই পারেন নি। এতো বছর পরে উনার নিজেকে ব্যর্থ মনে হচ্ছে।
~চলবে,,