#অবরুদ্ধ_নিশীথ
#তেজস্মিতা_মুর্তজা
২.
পরদিন অন্তূর ডাক পড়ল প্রফেসর ইউসুফ সিরাজীর কক্ষে। কক্ষে প্রবেশের পথে পিয়ন থামালো, “দাড়ান আপনে। স্যার বিজি আছে। মিটিং চলতেছে ভিতরে।ʼʼ
কিন্তু প্রফেসর নিজেই ডেকে নিলেন অন্তূকে, “ভেতরে আসতে দাও ওকে।ʼʼ
ভেতরে প্রবেশ করে সে সালাম জানাল। ইউসুফ সিরাজী মাথা নাড়লেন, “এসো!ʼʼ
কক্ষের পরিবেশ শীতল, নিঃশব্দ। কয়েকজন শিক্ষক ও কিছু দূরে দু'জন সিনিয়র চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, মূর্তির মতো। বসে যে কেউ নেই, তা নয়। বসে যে লোকটি, সিরাজী সাহেবের টেবিলের সঙ্গে লাগোয়া একটি চেয়ারে—অন্তূর পদার্পন তাকে সামান্য উদ্দীপিত করেনি। দৃষ্টি অবধি কাঁপেনি। সে মনোযোগ সহকারে একটি কাজ করছে। বাঁ হাতের অনামিকা আঙুলির রূপোর আংটিখানা আঙুলের মাঝে ঘোরাচ্ছে। কিন্তু দৃষ্টি সেদিকে নেই। ঠান্ডা দৃষ্টি মেঝের ওপর। বলবান, লম্বা দেহে সাদা ধবধবে পাঞ্জাবী, যেটার অধিকাংশ ঢাকা পড়েছে গায়ে জড়ানো শালে। লোকটাকে অন্তূ চেনে। ছাত্র পরিষদের একতলা বিল্ডিংয়ের সামনে একগাদা ব্যানার লাগানো, সেসবে এই লোকটার ছবি রোজ ছাপা হয় তো! নাম হামজা পাটোয়ারী। অন্তূর কেমন অস্বস্তি হয়েছিল এ পর্যায়ে।
ইউসুফ সিরাজী জিজ্ঞেস করলেন, “গতকাল কী হয়েছিল?ʼʼ
অন্তূ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমাকে র্যাগ দেয়া হয়েছিল, স্যার!ʼʼ
প্রফেসর বিরক্ত হলেন, “সে তো আর নতুন কিছু নয়। তুমি কী করেছ?ʼʼ
-“আমাকে সিগারেটে টান...ʼʼ
-“আহ!ʼʼ ব্যাপারটা শুনতে মোটেই আগ্রহী নন প্রফেসর, এটা কোনো ঘটা করে শোনার মতো ঘটনা নয়। বিরক্ত হলেন তিনি, “তুমি কী করেছ সেটা বলো!ʼʼ
অন্তূ স্যারের সম্মানে বিনয়ের সঙ্গে তবে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “আমাকে ধূমপান করতে বলা হয়েছিল, স্যার। আর তাতে অভ্যস্ত নই আমি। তাই সিগারেটটা নিয়ে ফেলে পা দিয়ে নষ্ট করে দিয়েছি।ʼʼ
সিনিয়র দুজন কেশে উঠল। শিক্ষকদের দৃষ্টি সরু হলো। সিরাজী সাহেব মাড়ি শক্ত করে চশমা ঠিক করতে করতে আড়চোখে একবার হামজাকে দেখে নিলেন। উহু! হামজার হেলদোল নেই। হামজা খুব মনোযোগে তার হাতের আংটির সঙ্গে খেলছে।
ইউসুফ সিরাজী ধমকে উঠলেন, “এই শিখেছ? কার সঙ্গে এই আচরণ করেছ কোনো জ্ঞান আছে সে বিষয়ে? অভদ্র, আনকালচারড মেয়ে! সিনিয়রদের সঙ্গে এই আচরণ শিখেছ এতদিনে? ভার্সিটিতে আসো বেয়াদবী শিখতে? আদবের বালাই নেই ভেতরে! তুমি জানো, এতে তোমার এডমিশন ক্যানসেল হতে পারে? জানো?ʼʼ
অন্তূ বোকার মতো অবাক হলো। সে নেহাত অনভিজ্ঞ বলেই অবাক হলো। নয়ত এমন স্বাভাবিক ঘটনায় অবাক হবার কিছু নেই।
-“নাম কী?ʼʼ
-“মাহেজাবিণ আরমিণ অন্তূ।ʼʼ
-“বাবার নাম?ʼʼ
একটু ভয় হলো অন্তূর, এসব আব্বুর কানে গেলে! আব্বুর যদি প্রেশার বাড়ে? সম্মানে আঁচ লাগবে আব্বুর! এখানে অন্তূর দৃঢ়তার শেষ এবং অসীম দূর্বলতার শুরু। তার দৃষ্টি সচেতন হলে সে দেখতে পেতো এ পর্যায়ে হামজার নজর সামান্য উচু হয়ে তার ওপর পড়েছে। গভীর চোখদুটো হাসতে চাইছে। অন্তূর পা থেকে মাথা অবধি খু সযত্নে মেপে নিয়ে চোখদুটো আবার মেঝেতে আটকেছে।
অন্তূ আব্বুর নাম বলল, “আমজাদ আলী প্রামাণিক।ʼʼ
-“স্কুল মাস্টার আমজাদ নাকি?ʼʼ
-“জি!ʼʼ
-“এখনও মাস্টারি করে?ʼʼ
-“জি না। রিটায়ার করেছে বছরখানেকের মতো।ʼʼ
ইউসুফ সিরাজী লম্বা শ্বাস ফেলে আস্তে কোরে হামজাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হামজা! তুমি কিছু বলবে?ʼʼ
হামজার মনোযোগে বিঘ্ন ঘটালো না প্রফেসরের ডাক। কিছু মুহুর্ত পর পর খুব অলসতার সঙ্গে আংটি থেকে ডানহাতখানা তুলে তর্জনী ও মধ্যমা আঙুলি নেড়ে সামান্য ইশারা করল– অন্তূকে বের হয়ে যেতে অনুমতি দিলো নাকি খুব অগ্রাহ্যতার সাথে আদেশ করল বলা মুশকিল। তা বলে চোখ তুলে দেখল না একটাবারও!
কক্ষ থেকে বেরোবার পরেও অন্তূর হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হতে সময় নিলো কিছু। হৃদস্পন্দন বাড়ার মতো উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি। অনুল্লেখ্য ব্যাপারটুকু হৃৎপিণ্ডের অস্থিরতায় মিশে থাকাই ভালো। এর আগে কখনও এমন নিকট দুরত্বে হামজার সঙ্গে দেখা হয়নি। সামনাসামনি আজ প্রথম সাক্ষাৎ।
ফ্যাকাল্টি অফ এগরিকালচার বিল্ডিং পেরিয়ে শহীদ মিনার চত্বর। সেখানে এক সিনিয়র মেয়ে ডাকল অন্তূকে। মেয়েটির নাম তানিয়া।
তানিয়া জিজ্ঞেস করল, “গতকাল আবার কী হয়েছিল তোমার সঙ্গে?ʼʼ
অন্তূ বসল সিড়ির ওপর। শরীরে কিছু দূর্বলতা অনুভূত হচ্ছিল। সে বলল, “গতদিন আবার? কেন, এর আগেও কি কিছু ঘটেছে নাকি ভার্সিটিতে?ʼʼ
তানিয়া জিজ্ঞেস করল, “কোন ইয়ার যেন তুমি?ʼʼ
-“সেকেন্ড ইয়ার।ʼʼ
-“ও আচ্ছা! ছুটিতে ছিলে তোমরা! ভার্সিটিতে হওয়ার কি আর কোনো কমতি আছে? একের পর এক হয়-ই। তোমার কী হয়েছে গতদিন, জয় আমিরের সঙ্গে?ʼʼ
অন্তূ চিনল না, “জয় আমির?ʼʼ
প্রশ্নটা খুব অপছন্দ হলো তানিয়ার, বিরক্ত হলো সে, “দুই বছর ভার্সিটিতে পড়ছো, এবার কি বলবে জয় আমিরকে চেনো না? ভার্সিটির ছাত্রলীগের সম্পাদককে চেনো না? আচ্ছা, কাউন্সিলরের ছেলে, ছাত্র সংসদের সভাপতি হামজা পাটোয়ারীকে চেনো?ʼʼ
-“জি, চিনি।ʼʼ
-“তো জয় আমির কে? হামজার ফুফাতো ভাই, জয় আমির।ʼʼ
তানিয়া অন্তূর আনমনা ভাবটা পছন্দ করল না। তার মনে হলো সে চেনাতে পারেনি জয় আমিরকে। আরেকটু বিশদভাবে বর্ণনা দরকার। সে বলল, “দুই বছর আগে এখান থেকে অনার্স শেষ করেছে। শ্যামলা বর্ণের লম্বা করে, থুতনির কাছে একটা তিল আছে। গলায় চেইন, তাতে J লেটার আছে। ডানহাতে ঘড়ি পরে আর বামহাতে ব্রেসলেট...কাল তো দেখা হয়েছিল, মনে আছে?ʼʼ
অন্তূর মনে আছে। লোকটা ঝুঁকে উঠে এসেছিল অন্তূর ওপর। বুকের ওপর পড়ে থাকা চেইনের লকেটটা অন্তূর শরীর স্পর্শ করেছিল।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আস্তে কোরে বলল, “চিনেছি।ʼʼ
-“কী করেছে ওরা তোমার সঙ্গে?ʼʼ
তানিয়ার সুরে গোপনীয়তা রক্ষার তাগিদ। খুবই সচেতন সে।ভয়াবহ রহস্যের ব্যাপার খোঁজ চালাচ্ছে সে।
অন্তূ বলল, “বিশেষ কিছু নয়, র্যাগ দিয়েছিল।ʼʼ
এবার তানিয়া আরও সতর্ক হয়ে উঠল, “আরে! লজ্জা পাচ্ছ কেন? আমি কাউকে কিচ্ছু বলব না, এসব হতেই থাকে। বলো কী করেছে ওরা তোমার সঙ্গে?ʼʼ
অন্তূ অবাক হলো, “আশ্চর্য! লজ্জা পাওয়ার প্রশ্ন কেন উঠছে? বললাম তো, সাধারণ র্যাগ দিয়েছে। আর কীসব হয়ে থাকে?ʼʼ
তানিয়ার হাসি পাচ্ছে খুব। বিদ্রুপের হাসি। রাগও হচ্ছে অন্তূর নাদানিতে।
-“কেন? তুমি জানো না র্যাগিংয়ে মেয়েদের সাথে কী কী করা হতে পারে?ʼʼ
-“আন্দাজ আছে। তবে আমার সঙ্গে তেমন কিছু হয়নি।ʼʼ
তানিয়া বোকা নয়। জয় আমিরের হাতে পড়েছিল অথচ তেমন কিছু হয়নি–এটা বিশ্বাস করার মতো বোকা অন্তত সে নয়।
সে বলল, “তাই নাকি? যাক, তা যদি সত্যি হয়, তো ভালো। কিন্তু তুমি কী করেছ? তোমাদের নিয়ে কানাঘুষা চলছে ভার্সিটিতে। তোমার সাহস বেশি হয়েছে নাকি?ʼʼ
-“কানাঘুষা? কানাঘুষার মতো কিছু তো হয়নি! এছাড়া সাহসের কিছু নেই এতে। যা আমার পছন্দ নয়, তাতে আমি সাফ মানা করে দিয়েছি।ʼʼ
-“তোমার তো মাথায় দোষ আছে মনে হচ্ছে! তুমি সিনিয়রের সাথে বেয়াদবি করে এসে বলছো কানাঘুষার কিছু হয়নি! হয় তুমি পাগল, নয়ত বোকা অথবা দুঃসাহসী বলা যায়। কিন্তু এখানে দুঃসাহস টেকার না। তুমি সিনিয়রদের সাথে এরকম অবাধ্যতা করলে কোন সাহসে! জয় আমিরকে তুমি আসলেই চেনো না? হামজা পাটোয়ারীকে চেনো না?ʼʼ
অন্তূর মনে মনে বলল, ঘাস কাটতে আসি না, এবং এসব পঙ্গপালদের খবর রাখতে তো অবশ্যই না। আসি পড়ালেখার জন্য, তা শেষে ফিরে যাই।
তানিয়া অন্তূকে সতর্ক করল, শোনো! তুমি এখনও খুব নাদান বুঝলে? তোমার ভালো হবে এসব সাহসিকতা নিজের কাছে রাখলে। ওসব এখানে চলবে না। তুমি পর্দা করো, ভদ্র মেয়ে। কাল কী হয়েছে, কী হবে জানি না। কিন্তু তুমি সাবধান হও। এর আগে বহু মেয়ে ভার্সিটি ছেড়েছে জয়ের কারণে। তোমরা তখনও এডমিশন নাওনি, জয় সেকেন্ড ইয়ারে ছিল বোধহয়। একটা মেয়ে হলের ছাদ থেকে পড়ে আত্মহত্যা করল। ওরা কী করেছিল মেয়েটার সঙ্গে জানি না। কিন্তু বাঁচতে দেয়নি। জয়-হামজা ওই দুটো অভিশাপ! আবার ভালোও!ʼʼ
-ʼʼভালোও কেন?ʼʼ
-“রাজনীতির চাল বোঝো না? সমাজসেবার কাজবাজ করে দুই ভাই আর তাদের দলবল মিলে। পুরো ছাত্র সংগঠনের বেশ ভালোই যোগান দেয় দুজন। ত্রাণ, চিকিৎসা, স্বাস্থ, দুর্যোগ—এসবে বহুত অবদান আছে ওদের। অঞ্চলে নামডাক ভালো হামজার। কিন্তু জয় আমির সেরকম না।ʼʼ
অন্তূর চোখের সামনে হামজার শীতল চোখে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকা দৃশ্যটা ভেসে উঠল। সে তানিয়াকে জিজ্ঞেস করল, “কিছু হয়েছে আবার ভার্সিটিতে? শুধু রাজনৈতিক ছাড়াও অন্যকিছু? আমরা তো ছুটিতে ছিলাম।ʼʼ
-“বঙ্গমাতা হলের আয়া সালমা খালাকে চেনো?ʼʼ
-“দেখেছি।ʼʼ
-“হামজা ভাইয়ের নিজস্ব যে ক্লাবটা আছে, ওটা চেহেলগাজী মাজারের ওদিকে। সেই ক্লাবের পাশেই থাকে সালমা খালা। কয়েকবছর আগে উনার ছোট ছেলের এক্সিডেন্ট হয়ে সেই ক্ষত থেকে ক্যান্সার হলো। তার চিকিৎসায় খালা নাকি ওই বাড়ির জায়গা বিক্রি করে দেয়। বিক্রিটা আবার কেমন শোনো–পাওয়ার দলিল করা। মানে হলো ওই জমির বিনিময়ে যে টাকাটা সে নিয়েছিল, একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই টাকা লাভ-সুদসহ পরিশোধ করতে পারলে ওই জমি সে ফেরত পাবে। কিন্তু পারেনি পরিশোধ করতে। আর জমিটা বিক্রি করেছিল রাজন আজগরের কাছে। ওরা কেমন লোক, কারা ওরা তা না জানলে আর কিছু বলার নেই তোমাকে। তো রাজন আজগরের ভাতিজা পলাশ আজগর তাগাদা দিচ্ছিল বাড়ি খালি করার। কিন্তু খালার যাওয়ার জায়গা নেই।
তো উনি আরও কিছুটা সময় চান। সেই সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ করে বাড়ি ফেরত নেবেন আর নয়ত চলে যাবেন। সেজন্য হামজা পাটোয়ারীকে ধরেছেন। হামজা ভাইয়ের আব্বা তো কাউন্সিলরও। তো হামজা ভাই, কাউন্সিলর সব মিলে একটা শালিস-বিচার হয়েছিল। কিছু সময় দেয়া হয়েছিল। তার মধ্যেও সালমা খালা টাকা দিতে পারেননি। জায়গাও খালি করেননি।
এখন কয়দিন হলো খালার মেয়ে আঁখিকে পাওয়া যাচ্ছে না।ʼʼ
অন্তূর গলা শুকিয়ে এলো।
-“পাওয়া যাচ্ছে না মানে? আর এসব কি সবাই জানে? তাহলে পলাশ আজগর বা হামজা পাটোয়ারীকে ধরছে না কেন কেউ?ʼʼ
-“চুপ। চুপ করো। আস্তে কথা বলো। পাগল নাকি তুমি? মরবে? কে কাকে কী বলবে? লোক এত খবর কীভাবে জানবে? আমার হলের খালা, তাই আমি একটু ভেতরের খবর জানি। তোমাকে শুধু সতর্ক করার জন্য বললাম। তুমি যে দুঃসাহস দেখিয়েছ, এখনও সময় আছে সাবধান হও। তাছাড়া এখনও কেউ জানে না আঁখি কোথায় বা কে কী করেছে।ʼʼ
অন্তূ উদ্ভ্রান্তের মতো উঠে এলো। মাথাটা ভার হয়ে এলো। তানিয়া খুব শাসিয়ে দিলো এসব যেন কাউকে না বলে, খবরদার না।
অন্তূর চোখের সামনে কল্পিত এক অপরিচিতা কিশোরীর চেহারা ভাসতে লাগল। তার মনে হলো তার খুব কাছের কেউ অপহৃত হয়েছে। কী হয়েছে সেই অপরিচিতার সঙ্গে? কোথায় আছে সে?
—
এরপর আর দু'দিন ভার্সিটিতে গেল না অন্তূ। আব্বু জেলায় নেই। এই পরিস্থিতিতে তার সাধ্যি হলো না একা ভার্সিটিতে পা রাখার। দুটো দিন প্রত্যেক ওয়াক্ত নামাজে সে এক কিশোরীর জন্য প্রার্থনা করল। রাতে ঘুম এলো না। পড়ায় মনোযোগ এলো না।
পরদিন কুষ্টিয়া থেকে ফিরল মার্জিয়া। তখন খাড়া দুপুর। অন্তূ গোসল সেরে এসে সবে তোয়ালে থেকে চুল ছেড়েছে। রাবেয়া যোহরের নামাজে বসেছেন। মার্জিয়া সঙ্গে এনেছে এক ভারী ব্যাগ। তাতে কিছু টাটকা শাক-সবজি দেখা যাচ্ছে– পুঁইশাক, কয়েক আঁটি লালশাক, গাছের লাউ, এক ফালি মিষ্টিকুমড়ো, নতুন বানানো কলাই ডালের বড়ি, ধনেপাতা।
ব্যাগটা মার্জিয়া ধুপ করে মেঝেতে রাখল। অন্তূ ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “অন্তিক আনতে যায়নি? একা এলেন?ʼʼ
মার্জিয়া জবাব দিলো না। অন্তূ আবার বলল, “আপনি বোরকা খুলে গোসল করে আসুন। আমি নামাজটা পড়ে আসি। এরপর একসাথে খাব।ʼʼ
মার্জিয়া খ্যাকখ্যাক করে উঠল, “অ্যাই, নাটক করবা না তো, অন্তূ! সহ্য হচ্ছে না গায়ে।ʼʼ
অন্তূ স্বাভাবিকভাবে বলল, “ঠিক আছে। গায়ে একটু ঠান্ডা পানি ঢেলে আসুন। ভালো লাগবে।ʼʼ
ছ্যাঁত করে উঠল মার্জিয়া, “তোমার মতো ডাইনির মুখে এর চেয়ে ভালো পরামর্শ শোনার আশা রাখিই বা কই আমি? কথাই বলো গা জ্বালানো সব।ʼʼ
-“কী হয়েছে? ক্ষেপে আছেন কেন? কার রাগ আমার ওপর দেখাচ্ছেন?ʼʼ
-“তোমার মতো মা তা রী ননদ থাকতে রাগ আর কার ওপর হবে?ʼʼ
অন্তূ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার কণ্ঠস্বর কড়া হয়ে উঠল, “মুখ সংযত করুন আপনার। আপনি জানেন বেশিক্ষণ আমি আপনার অহেতুক কথাবার্তা নিতে পারব না।ʼʼ
-“কী করবা তুমি? আমার বোনের সংসার যেভাবে খাইতে লাগছো তোমরা, আমারেও তাড়াবা নাকি এইখান থেকে? তুমি জানো অন্তূ, আমার মেজাজে সবসময় আগুন জ্বলে। তুমি সামনে আসলে মনেহয় কেরোসিন ঢেলে পড়ল। আমি কবে জানি পাগল হয়ে যাব।ʼʼ
অন্তূ যথাসম্ভব শান্ত স্বরে বলল, “অকারণে এমন কর্কশ ব্যবহার করলে মনে শান্তি থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। এই যে বললেন আমাকে দেখলে আপনার রাগের আগুনে কেরোসিন ঢেলে পড়ে, এর কোনো কারণ আছে আপনার কাছে?ʼʼ
-“চুপ। তোমার এত মিঠি মিঠি জ্ঞান তো আমি চাইনি অন্তূ। আমার জীবনটা জাহান্নাম বানাতে তোমাদের সবার যত আয়োজন ওই যথেষ্ট। তার ওপর আর ভালোমানুষি দেখাতে আইসো না।ʼʼ
রাবেয়া যোহরের নামাজে বসেছিলেন, দ্রুত সালাম ফিরিয়ে উঠে এলেন, “কী হইছে, মার্জিয়া। কীসব কথা এইসব? এমন করতেছ ক্যান?ʼʼ
মুখ ঝামটি মারল মার্জিয়া, “শখ আমার খুব যে, তাই।ʼʼ
অন্তূ বলল, “ভনিতা না করুন বলুন, আমি কী করেছি? আপনার শখ পরেও মেটাতে পারবেন। আপনি কী একটা নোংরা ভাষা ব্যবহার করলেন। তার উপযুক্ত কারণ দেখান।ʼʼ
-“অর্ডার নাকি তোমার?ʼʼ
-“অনেকটা তাই। ফাসেকের মতো মুখ ফসকে ফট করে এমন কিছু বলে ফেলবেন যা আমার আত্মমর্যাদা ও চরিত্রকে আঘাত করবে, সেটা তো এমনি এমনি ছেড়ে দেয়া যায় না, ভাবী। উপযুক্ত ভিত্তিসহ ব্যাখ্যা করুন আপনার ভাষাটাকে। মাতারী কী? এবং সেটা আমি কীভাবে?ʼʼ
মুখ বিকৃত করল মার্জিয়া, “উকালতি ভালো শিখছো হ্যাঁ? কথাবার্তা এমন বলো যেন গোটা দুনিয়াটাই তোমার আদালত। তুমি মাতারী কেমনে, জানো না তুমি, না? আমার বোনের সংসার তোমাদের জন্যে যদি ভেঙেই যায়, তখন দেখবা আমি তোমারেও এই বাড়িতে শান্তিতে থাকতে না দিয়ে কেমন হিরহির করে টেনে বের করে দিয়ে আসি।
রাবেয়া গর্জে উঠলেন এবার মৃদু স্বরে, “আমার মেয়েকে বের করার বা রাখার তুমি কে? আমার মেয়ের বাপ-মা মরে যায় নাই এখনও যে তুমি আমার মেয়েকে বাড়ি থেকে বের করবা! এখনও বেঁচে আছে আমার মেয়ের বাপ। কী হইছে, তা বলবা না? না তা তো জানাই নাই তোমার। এত রহস্য করা ক্যান, হ্যাঁ?ʼʼ
মার্জিয়া চিটমিট করে উঠল। যেন সে অনেককিছু বলতে চায়, অনেককিছু আছে যা তার বলার আছে কিন্তু বলার নয়। সে বরং তার বদলে আরও কর্কশ সুরে বলে, “বলতে পারলে তো হতোই। বলতে পারিনা তো আম্মা। আর না সইতে পারি। তবে এখন যা বলতেছি, আমার বোনের ঘর ভাঙলে আপনার মেয়েকে দেখি এই বাড়িতে রাখে কে?ʼʼ
তখন অন্তিক বাড়িতে ঢুকল। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত, রক্তশূণ্য, প্রাণহীন চেহারা। দেখলে মনে হয় গথিক হরর সিনেমায় দেখানো কোনো ভ্যাম্পায়ার বাস্তবে এসে অন্তিককে আক্রমণ করেছে। এবং নিজের সমস্ত পিপাসা মিটিয়ে নিচ্ছে অন্তিকের প্রাণরস শুষে।
সে আস্তে কোরে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার! কীসের চেঁচামেচি চলতেছে?ʼʼ
রাবেয়া গর্জে উঠলেন এবার মৃদু স্বরে, ʼʼমার্জিয়া কী কয়, কিছুই বুঝি না। এমন অশান্তি কয়দিন দেখা যায় ক তো, বাপ! কী হয়, কীসের কথা কয়, কিছুর কথাই বুঝি না। তোর বাপের কানে গেলে ভালো হইতো বিষয়টা? মানুষটা এমনিই চিন্তায় চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। আজ তিনদিন বাড়ি নাই।ʼʼ
অন্তিক যেমন নীরব, নিথর চরিত্র হিসেবে দৃশ্যপটে ঢুকেছিল সেই ভাব বজায় রেখে ওভাবেই সে চুপচাপ নিজের কক্ষে চলে যায়। যেন তার কিছুই বলার নেই, কিছুই করার নেই। বিশেষত সে শুনতে চায় না স্ত্রীর অভিযোগ, শুনতে চায় না আব্বুর পরিস্থিতি।
অন্তূর মনের বিরূপতা বাড়ে। সে ঘৃণাভরে দেখে হঠাৎ-ই একদিন নিঃশব্দ কারণে মৃতপ্রায়- কাপুরুষ বনে যাওয়া একমাত্র বড়ভাইকে। তরতরে যুবক অন্তিকের এক অ-পুরুষ হয়ে ওঠার গল্পটা অস্পষ্ট তার কাছে। এভাবেই কতগুলো বছর কাটছে এ বাড়িতে। অন্তিক শুধু একটা দেহমাত্র, যে গোটাটাই মানসিক অস্তিত্ব ও বিবেকবোধমুক্ত। সে বহুদিন ভাইয়ের সাথে প্রয়োজনীয় ছাড়া অপ্রয়োজনীয় কথা বলে না, হাসে না, একসাথে খায় না। এক অপরিকল্পিত অনীহা এবং বিতৃষ্ণা জেগেছে সবকিছু বুঝে নির্বিকার থাকা অন্তিকের ওপর। মার্জিয়া অকারণেই চিৎকার চেঁচামেচি করে, কেন করে, কীসব বলে, কিছুই বোধগম্য হয় না। আর অন্তিক কিছু বলেই না।
অন্তিক–আমজাদ মাস্টারের সুযোগ্য ছেলে। যার পড়ালেখা, সামাজিক সক্রিয়তা, মেধা, কথাবার্তা, হাসি—একসময় সমাজে আলোচিত বিষয় ছিল। আমজাদ মাস্টারের যোগ্য ছেলে থেকে অযোগ্য বিবেকহীন মূর্খ কাপুরুষের জন্মটা কবে যেন!
সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি, একটু আগে যে অল্প খিদেটা পেয়েছিল, তা এখন আর অনুভব হচ্ছে না অন্তূর
আস্তে করে নিজের ঘরে চলে এলো। পেছনে রাবেয়া বেগমের ফুঁপানোর আওয়াজ পেল, ফিরে তাকাল না। অবলা মা তার, আব্বু বাসায় নেই। কুড়িগ্রাম গেছে। আজ ফেরার কথা ছিল, হয়ত ফিরবে না। অন্তূ পড়ার টেবিলে বসল, এখন আব্বু এসে বিছানায় বসলে তবে কিছু হতো। বই বন্ধ করে টেবিলে মাথা এলিয়ে দিলো। অস্থির লাগছে ভেতরটায়। ভার হচ্ছে মাথাটা।
চলবে...