ফন্ট সাইজ:
থিম:
অবরুদ্ধ নিশীথ

৬৯তম পর্ব

লেখক: তেজস্মিতা মুর্তজা

#অবরুদ্ধ_নিশীথ

#তেজস্মিতা_মুর্তজা

৬৯. (প্রথমাংশ)

জয় আমির জন্মগ্রহণ করল দেশের এক উত্তাল রাজনৈতিক পরিবেশে। ১৯৮৭ সন। বাংলাদেশে সামরিক শাসন চলছে। উত্তাল দেশের অবস্থা। তখন সকল বিরোধী দল পারস্পারিক সংঘাত একপাশে রেখে স্বৈরাচার পতনের লক্ষ্যে হাতে হাত রেখেছে।

জাভেদ আমির ধীরে ধীরে আবারও রাজনীতিতে ফিরলেন ঠিকই। কিন্তু এবার তার দৃষ্টিকোণ ও মনোভাব বোঝা বড় দায়।

১৯৯০ এর শেষে স্বৈরাচারের পতন হলো।

জয়কে স্কুলে ভর্তি করা হলো চার বছর বয়সে। তার জিদেই। সে দেখেছে সকলে স্কুলে যায়। তারও যাওয়া দরকার। বাড়িতে দুটো মহিলা রাখা আছে জয়ের যত্নের জন্য। তাদেরকে সহ্য করা যাচ্ছে না। একটার বয়স কম। বিশ-বাইশ বছর হবে। খুব নজরে, যত্নে রাখে। অত যত্ন-আত্তি বড়লোকপনায় বিরক্ত সে। তার মাথায় ফুলদানী দিয়ে মেরে জখম করে দিয়েছে সে। তার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। তবু মেয়েটার লজ্জা নেই, আবার আসে জয়ের দেখাশোনা করতে। জয় তাই আরও বিতৃষ্ণ মেয়েটার ওপর।

জাভেদ আমিরের সাথে ঝামেলা তার। সে রোজ স্কুল থেকে বড়বাবা কাছে যায়। বাপের ছোটভাইকে সে ডাকে বড়বাবা। এটার কারণ আছে। বাবা শাসন করে। তার বাবাকে ভালো লাগে না। বাবার চেয়েও বেশি আপন ও বড় তার চাচা। তাই জয়নাল আমির তার বড়বাবা। এত চতুর সে কোত্থেকে হয়েছে তা নিয়ে উদ্বেগ আছে হুমায়িরার।

জয়নাল আমির নিতে আসেন স্কুলের গেইটে। চাকরেরা ভয়ে সরে আসে, বাঁধা দিতে পারে না জয়নাল আমিরকে। জাভেদ একবার জিজ্ঞেস করলেন, “এই বেয়াদব! জয়নালের সাথে গেছিলি?ʼʼ

-“হ্যাঁ।ʼʼ

-“কেন?ʼʼ

দৌড়ে গিয়ে দাদুর কোলে চড়ে বলল, “আমার ভালো লাগে। তুমি আর নিষেধ করবে না। আমি যাবই।ʼʼ

তবু জাভেদ দুটো থাপ্পর মারলেন। খুব জোরে নয় তবে লাগল। কিন্তু জয়ের মুখ দেখে মনে হলো না, তার কিছু হয়েছে। পরেরদিন সে সন্ধ্যার পর ফিরল চাচার কাছ থেকে। আগে বিকেলে ফিরতো।

বাবা থাকলে তার বন্ধুদের আড্ডা মিস যায়। আমির বাড়ির ফটকের সামনে এসে তাকে ডাকার সাহস কারও নেই। তা মনেহয় একমাত্র বাবার জন্যই। দারোয়ানটা চরম খিটখিটে। একবার তাকে অবশ্য কুকুরের দৌড়ানি খাইয়েছিল সে। পুকুরে গোসল করার উপায় নেই। তাছাড়া তার কিছু অবলা শাগরেদ আছে। গোয়ালের গরুগুলো, ফটকের বাইরে বসে ঝিমানো কুকুরেরা, বাড়ির ছাদের চিলেকোঠায় বাচ্চা তোলা বিড়াল, কবুতর। এগুলোর পরিচর্যা করতে পারা যায় না বাবার জন্য। আরও আছে তার বাজিগর। বাজিগরগুলো দিয়েছে বড়বাবা। ছয়টা থেকে নয়টা হয়েছে ওরা। একটার জোড়া নেই। সে নাড়তে চাড়তে গিয়ে ডিম নষ্ট করে ফেলেছিল। সে কি কান্না! তার দোষ নাকি দাদুর। কারণ দাদু মাত্র চারবার ডিম নাড়তে নিষেধ করেছে। এর বেশি বলেনি। বাবার হাত থেকে ওগুলোকে বাঁচিয়ে রাখারও চাপ আছে। বাবা সুযোগ পেলেই বড়বাবার দেওয়া পাখিদের উড়িয়ে দেবে। কম চাপে থাকে না সে। বড় ব্যস্ত মানুষ।

এমন বাবার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখা জয়ের দ্বারা সম্ভব না।

হুমায়িরার কাছে একবার বিচার এলো, ক্লাসের চারটে ছেলেকে মেরে জখম করে দিয়ে এসেছে। কারণ, ওরা তাকে রাজাকারের ভাতিজা বলেছে। সে তখন টু-তে। সে ক্লাসে দল গঠন করেছে। একদল যারা জয়কে রাজাকারের ভাতিজা বলে না, দেশোদ্রোহীর ছেলে বলে না। আরেকদল যারা বলতে চায় কিন্তু এখন ভয়ে বলতে পারে না। তারা হলো জয়ের বিরোধী দল।

দাদুর সাথে খাতির তার ভালোই। কিন্তু রাগ হয় যখন দাদুর কাছে বন্দুক চালানো শিখতে চাইলে শেখায় না। দাদুর লাঠি লুকিয়ে সে সপ্তাখানেক ভুগিয়েছে দাদুকে। তাতে জলিল আমির আরও ক্ষেপেছেন। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, জয়কে আর কোনোভাবেই তিনি ভালোবাসবেন না। কিন্তু জয়ের তো ভালোবাসা লাগে না।

সে এমন সব কাজ করবে যাতে দাদুর পক্ষে তাকে ভালোবাসা সত্যিই কঠিন হয়। সে দাদুর সংবাদপত্র ছিঁড়ে কুটিকুটি করে রাখে। পান খায় দাদু। সে চুনের ভেতর পানি ঢেলে টলটলে বানিয়ে রাখে। নামাজে যাওয়ার সময় টুপি নিয়ে খেলতে চলে যায়। একবার দাদুর জন্য বেড়ে রাখা তরকারীতে মরিচের গুড়ো মিশিয়ে নেড়েচেড়ে রেখে দিয়েছিল। হুমায়িরা তাকে ঝাল খেতে দেন না। কিন্তু সে জানে মরিচের গুড়ো ঝাল। তা খেয়ে দাদুর অবস্থা খারাপ। পানি খেয়ে শান্ত হলে সে আস্তে কোরে গিয়ে দাদুর সামনে গিয়ে হাত পেছমোড়া করে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি মিশিয়েছি তোমার খাবারে ঝাল। বলো, আর কোনোদিন ভালো বাসবে না বলে হুমকি দেবে? চুপচাপ ভালো না বাসবে। বুঝলে?ʼʼ

এরকম বিরোধীতা চলল কিছুদিন। দাদু একদিন এসে খুব চোটপাট করলেন। জয় একটা কথাও অস্বীকার করেনি। সব স্বীকার করেছে। এমনকি যা অপরাধ করেনি তাও।

বড়বাবা বলেন, “লোকের কাছে ভালো হবার চেষ্টা করার দরকার নেই। মানুষ ভালোদের দোষ খুঁজে বের করার চেষ্টায় মত্ত থাকে কেবল। একই কাজ খারাপ হিসেবে পরিচিত লোকেরা করলে ঠিক আছে। কিন্তু ভালো মানুষ হিসেবে তা তুই করেছিস এটা প্রমাণ হলে তারা তোকে আর বাঁচতে দেবে না।

খারাপ হিসেবে পরিচিতদের স্বাধীনতা বেশি। তারা যা খুশি করতে পারে। তুই যা খারাপ করছিস সেটাও তোর, আর নিজের কৃতকর্ম হোক ভালো বা খারাপ তা অস্বীকার করাটা ছোটলোকি। তুই খারাপ এটা তোর স্বীকার করার সাহস না থাকলে তুই কাপুরুষ। কারণ ওটা তোর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। তুই যখন কারও কাছে ভালো সাজতে নাটক করবি বা কারও মনমতো চলবি, ব্যাপারটা অনেকটা এমন হলো না যে তুই তার কাছে দায়বদ্ধ! তোর কোনো নিজস্বতা নেই।

ভালো সাজতে চায় ভন্ডরা, ভীতুরা, খাতির পাওয়ার লোভীরা। আর এটাই দায়বদ্ধতা, দূর্বলতা, একপ্রকার বাধ্যতা। যেন কেউ তোকে খারাপ ভাবলে তোর যায় আসে। কখনও কারও কাছে ভালো হবার জন্য কোনোরকম সামান্য চেষ্টাও করবি না। কেউ তোর নিজস্বতাকে মেনে নিয়ে থাকলে আছে, নয়ত তোর কাউকে দরকার নেই নিজেকে ছাড়া!ʼʼ

জয় মনোযোগ দিয়ে শোনে। কিছু কথা বোঝে, আর যা বোঝে না তাও মনে রাখার চেষ্টা করে। সে টের পায়, চাচার চিন্তা-ধারার সবই তার ছোট্ট মস্তিষ্কের চিন্তাধারার সাথে প্রায়-ই মিলে যায়। বাবা তাকে হাজার মানা করলেও সে চাচার কাছে যাবেই।

দাদু গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এসব কেন করেছিস?ʼʼ

সে মুখ গোমড়া করে বলল, “তুমি তো বললে ভালোবাসবে না। কিন্তু আমি তেমন কিছু করিইনি আগে। এখন করছি। যাতে ভালো না বাসার কারণ থাকে। অকারণে ভালোবাসবে না কেন?ʼʼ

ক্লাস থ্রি-তে তার একটা গৃহশিক্ষক রাখা হলো। মাস্টার আসার আগে সে যায় ঢিল ছুঁড়ে আম পাড়তে। হামজা এসে সেদিন এক ঝুড়ি আম দিয়ে গেছে। কিন্তু চুরি করা আমের স্বাদই আলাদা।

জাভেদ ব্যবসার কাজে প্রায়-ই ঢাকা-চট্রগ্রাম থাকেন। তখন বিচার আসে জলিল আমিরের কাছে। হুমায়িরাকে ধরে মহিলারা বলে জয়ের কুকীর্তির কথা। সেদিন আম পাড়তে গেছে মন্ডলদের বাগানে। মন্ডল বাড়ির ছেলেরা এসে বাঁধা দিচ্ছিল। বড়দের ডেকে আনার হুমকি দিচ্ছিল।

আম না পড়ে যে ডাল-পাতা ভেঙে পড়েছে, তা-ই তুলে বেদম মেরেছে ওদের। ওদের অপরাধ, নিজেরা কোনো একশন না নিয়ে বড়দের ডাকার মতো এমন ছোটলোকি হুমকি ওরা কেন দিলো? যা করবে ওরা করবে। কাপুরুষের মতো বড়দের ডাকতে চেয়ে ওরা জয়ের মারামারির মুডটাই নষ্ট করে দিয়েছে। যুদ্ধে-বিগ্রহ হবে সমান সমানে। তারপর দেখা যাবে কে জেতে।

মাস্টার এসে বসে আছেন আধঘন্টা। জলিল আমির দু'বার খড়ি নিয়ে খুঁজে এসেছেন। পাননি খুঁজে ওকে। পাবার কথা নয়। সে বাগানের ওপারে ভাঙা গোয়ালের কোণায় সভায় ব্যস্ত। ও পাড়ার কয়েকটা পুঁচকে জয়ের নামে নালিশ করেছে। জাভেদ আমির এলে ওদের বাবা-মা আসবে বিচার নিয়ে। এটা হতে দেয়া যায় না। ওদেরকে শাসাতে হবে। যাতে বাবা-মাকে গিয়ে বলে, জয় ভালো না। তবে ওদের কিছু করেনি। বিচার দেওয়া ক্যান্সেল।

শেষমেষ অধৈর্য হয়ে মাস্টার গেলেন খুঁজতে। খুব বিনয়ের সাথে বললেন, “জয়! বাবা। আসো পড়বে। পরে এসে খেলবে। আসো।ʼʼ

জয় বিরক্তিতে চোখে-মুখ খিঁচে তাকাল। উঠল না সভা ছেড়ে। মাস্টারকে বলল, “এখন ব্যস্ত আছি। বসেন ঘরে গিয়ে। পরে আসতেছি।ʼʼ

মাস্টার হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলেন।

-“কী হলো? যান! জরুরী কাজে আছি। আপনে কি এখন দাঁড়িয়ে থেকে বাচ্চাদের আলাপ শুনবেন?ʼʼ

মাস্টার রেগেমেগে একাকার। তবু চুপচাপ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ভেতরবাড়িতে ঢুকে হুমায়িরাকে বললেন, “আপনার ছেলেকে আর পাড়ার ছেলেদের সাথে মিশতে দেবেন না। ওর মুখের ভাষার শুদ্ধতা হারিয়ে যাচ্ছে।ʼʼ

হুমায়িরা রাতে শাসন করলেন। তারপর দিন মাস্টারকে আধঘন্টা বসিয়ে রেখে পরে এসে পড়তে বসল। পড়ার দশ মিনিট না-ই যেতে উঠে পড়ে বলল, “আর পড়ব না আজ। আপনে যান। আমার কাজ আছে।ʼʼ

হনহন করে বেরিয়ে চলে গেল।

সেই রাগটুকু মাস্টার চাপা রাখলেন। পরেরদিন পড়ার সময় মাস্টার পড়াচ্ছেন, সে কাগজ দিয়ে নৌকা, বাঁশি, ব্যাঙ ইত্যাদি বানাচ্ছে। মাস্টারের ধৈর্যচ্যূত হবার পর্যায়ে। তারপর তিন চারবার উঠে গিয়ে পানি খেয়ে এলো। টেবিলের ওপর মাথা রেখে ঝিমোতে লাগল। শেষমেষ মাস্টার স্কেল দিয়ে মারলেন দুটো ঠাস ঠাস করে।

জয় কাঁদতে কাঁদতে হুমায়িরার কাছে ছুটল। মাস্টারে কাছে সে আর পড়বে না। মাস্টার মারে। সে কি কান্না তার! সে সময় হামজা এলো। হুমায়িরা কান মলে ধরলেন, “এবার বল, মাস্টার কেন মেরেছে তোকে? বাদর ছেলে!ʼʼ

-“মাস্টার ভালো না।ʼʼ

জয় কাঁদছে। তার বানোয়াট কান্না দেখে হাসি পাচ্ছে হামজার।

-“তুই কিছু করিসনি?ʼʼ

-“না।ʼʼ

জয় জীবনে কাঁদে। কাঁদলে তা সত্যি, এটা না মানার উপায় পেলেন না হুমায়িরা। জলিল আমির রাজপুত্রের মতোন পালছেন নাতিকে। তবু হুমায়িরা বললেন, “সেদিন মাস্টার নালিশ করেছিল বলে বাদ দেওয়ালি?ʼʼ

কিন্তু সে তো তারপরেও দু'দিন পড়েছে।

কথাটা বিশ্বাসযোগ্য হলো। এবং এটা করার জন্যই সে তারপরেও দু'দিন পড়েছে মাস্টারের কাছে। কিন্তু মাস্টারকে বাদ দেওয়ানোর একটা ছুঁতো দরকার বিধায় দুটো দিন খুব জ্বালাতন করে মার আদায় করেছে মাস্টারের কাছে।

হামজাকে দেখে শান্ত হলেন হুমায়িরা। সবার খোঁজ-খবর নিলেন। শাহানা ভাবী তেলের পিঠা বানিয়ে দিয়েছে হামজার কাছে। হুমায়িরার শরীরটা ভালো না। গর্ভাবস্থার চারমাস চলছে। কাজের মেয়ে দুটো গেছে গ্রামে। জয় সারাদিন বাদরামি করে বেড়ায়, তাকে সামলানো চার মজুরের কাজের সমান।

বিকেল পর্যন্ত রইল হামজা। ফুপু যতক্ষণ রান্না করল, সে দাঁড়িয়ে রইল ফুপুর পাশে। হামজার ছিপছিপে শুকনো শরীর, পরনের লুঙ্গি আর ফতোয়াটা ময়লা। মুখটা শুকনো। নরম চালচলন। মুখে স্মিত হাসি, তবে মলিন। বয়স চৌদ্দ। এই বয়সেই লম্বা হয়ে গেছে দেখার মতো।

জয় হামজাকে পেলে সব ভুলে যায়। জয়ের স্বাস্থচেহারা একদম আমির পরিবারের সবার মতোই অভিজাত হয়েছে। খালি স্বভাবটা দিনদিন বখাটের মতো হচ্ছে সঙ্গদোষে।

হুমায়িরা হামজাকে রেঁধে খাওয়ালেন, ও বাড়ির খবর শুনলেন। আজ ক'দিন হুমায়ুন পাটোয়ারী বাড়িতে নেই। সংসারের দায় তার নয়। হামজা, তুলি, শাহানা ভেসে গেলেও সে দায় তার নয়। সে দেশে-বিদেশে ঘুরছে, মহিলাদের বিয়ের প্রলভন দিয়ে তাদের ভোগের অপরাধে কত এলাকা থেকে মার খেয়েও ফিরেছে।

হামজা ক্লাস এইটে। বাসায় চাল নেই। হামজার স্কুলের বেতন দেয়া হয় না আজ চারমাস। মাস্টার বেতন না নিয়ে স্কুলে যেতে মানা করে দিয়েছে।

হুমায়িরা কিছু কাঁচা তরকারী, চাউল, পোশাক আর কিছু টাকা বের করে হামজার হাতে দিলেন। বাড়িতে লোক নেই। ছুটিতে গেছে কাজের লোকেরা। জয়কে সাথে নিয়ে হামজাকে এগিয়ে দিয়ে এলেন অনেকটা দূর। হামজা পায়ে পড়তে যায়, “ফুপু, তোর পায়ে লাগি। আমি একাই চলে যাব। আমার কিচ্ছু হবে না। তোর পেটে আমার ছোট বোন। এই রাইতে বাইরে বাইর হইলে যদি বোনুর কিছু হয়, তোর খবর আছে। বাইর হস না ফুপু আম্মা।ʼʼ

হুমায়িরা শুনলেন না, “অন্ধকারে একা ছাড়ব? কেউ যদি টাকাটা কেড়ে নেয়?ʼʼ

-“তুই কি বাড়ি পর্যন্ত যাবি? তখনও তো নিতে পারে।

-“তবু আমার সান্ত্বণা থাকবে। চল।ʼʼ

জলিল আমির লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন ফটকের কাছে পুত্রবধুর অপেক্ষায়।

হামজা ফুপুর ডান হাতখানা ছাড়ল না যতক্ষণ হাঁটল। জয় মায়ের হাত ছেড়ে ছুটে এসে হামজার হাত চেপে ধরে তিড়িং-বিড়িং ছুটছে।

দু'দিন পর জাভেদ ফিরলেন। ক্লান্ত চেহারা। হুমায়িরা দেখেই দেখে বুঝে ফেললেন, কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু জাভেদ বড় চাপা মানুষ। রাজধানী থেকে ফিরেছেন, তা কেবল বুঝলেন জলিল আমির।

আমির নিবাসে লোকজন কম। ফটকের দারোয়ান মনসুর মিয়া, বাগানের মালী মন্টু, আর দুজন আছে বাংলো ঘরে বিপদ-আপদের জন্য।

জলিল আমিরের অভ্যাস সদর ঘরে আরাম কেদারায় দুলতে দুলতে ঘুমানো। লাঠিটা কেদারার সাথে হেলান দিয়ে রাখা। বুকের ওপর বই, চোখে চশমা আছেই। নাক ডেকে ঘুমোচ্ছেন।

মনসুর মিয়ার চাকরিটা সুখের। সারারাত সে ঘুমায় ফটকের ধারের চেয়ারটায় বসে। বাড়ির কর্তা জলিল সাহেব জানেন, ঝারিও মারেন, এমনকি কয়েকবার লাঠি নিয়ে তেড়েছেনও, কিন্তু চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দেন না। মনসুর মিয়া নিশ্চিত ছাড়াবেনও না।

মাঝরাত। কয়টা, মনসুর জানে না। কেউ ডাকছে মনসুর মিয়াকে। খুব করুণ সুরে। তার খুব বিপদ। বাড়ির কর্তার কড়া হুকুম, “যত রাত হোক আর যা-ই হোক, কেউ সাহায্য চাইলে ফটক যদি না খুলিস, তোর চাকরি কইলাম শ্যাষ রে, মনসুর।ʼʼ

মনসুর দ্বিধায় ভুগল, তার ভয় করছে। তবু খুলল। কোনো অসহায় লোক না তারা। একজনও না। আট-দশজন। মুখে কালো কাপড় বাঁধা। চোখটা খুব সামান্য দেখা যাচ্ছে। ঘন্টাখানেক আগে আমির বাড়ির দোতলার বাতি নিভেছে।একঘন্টা পর এরা কী করতে এসেছে?

মনসুর মন্টু আর বাংলো ঘরের দুজনকে ডাকল। তারা উঠে এসে দাঁড়িয়ে রইল। মনসুরকে জবাই করা হলো। তারা খুব নরম মনের। তাই মুখ ফিরিয়ে রাখল। দেখল না দৃশ্যটা, বরং ফটকটা ভেতর থেকে ভালোভাবে আঁটকে এলো।

পথ দেখিয়ে দিলো। সদর দরজার নকল চাবিও তাদের কাছেই। দুর্বৃত্তদের হাতে চাবি তুলে দিয়ে তাদের কাজ শেষ। তারা বাইরে অপেক্ষা করতে লাগল।

জলিল আমির সেদিন খুঁড়াতে খুঁড়াতে গিয়ে নিজের বন্দুকটা তুলে নিয়েছিলেন ঠিকই, তবে গুলি চালাতে পারেননি। তাঁর বুকের ওপর চড়ে বসে তাকে যখন জবাই করা হচ্ছিল, কেবল উনার গলা দিয়ে ঘোঁৎ-ঘোঁৎ আওয়াজ আসছিল। তিনি শেষবার কালিমা শাহাদত পড়লেন। শেষ করতে পারলেন না অবশ্য, জবান বন্ধ হয়ে গেল।

জাভেদ আমির আব্বার ডাকে নিচে নেমে আসার আগে যে বন্দুক নিতে গেলেন দোতলার বড় বারান্দার ওপারে, ততক্ষণে কিন্তু দুর্বৃত্তরা শোবার ঘরে ঢুকে পড়েছে।

জাভেদ আমিরের গুলিতে চারজন পড়ে গেল। তখনও নয়জন আমির নিবাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। জীবিত নয়জনের মাঝে কিন্তু জলিল আমিরের পালিত দুজনসহ মন্টুও আছে।

জাভেদ আমির মনোবল হারিয়ে ফেললেন কেমন যেন। তবু বিশ্বাসঘাতকদের বুকে গুলি চালাতে তার হাত কাঁপতে শেখেনি একজনের ঠ্যাঙয়ে শেষ গুলিটা করতে পেরেছিলেন উনি। উনাকে চারজন মিলে ধরে ছেঁচড়ে নিয়ে শোবার ঘরে হুমায়িরা আর জয়ের সামনে উপস্থিত করা হলো।

ছোট্ট জয় আমির ছোট্ট হাতে তার ছোট্ট সঙ্গীদের খুব মারে। সেদিন তার ঠাঁয় হয়েছিল মায়ে পিঠপিছে। সে বাবার পেছনে ছুটে গিয়ে সদর ঘরে দাদুর মাথা ছাড়া দেহটা দেখেছে। মাথাটা দেহর সাথে নেই দাদুর। তার পা নড়ছিল না, তবু সে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসেছে ঠিকই মায়ের কাছে। অবশ্য সিঁড়ি বইতে গিয়ে কয়েকবার পড়ে গিয়ে চামড়া-মাঃস ছিলে গেছে শরীরের কয়েক জায়গার! রক্ত ঝরছে, জ্বলছেও। কিন্তু তার বুক ভেঙে কান্না আসছে। দাদুর মাথাটা কোথায়? দাদু কি তাকে কাল সকালে বাগানের ভেতর লাঠি নিয়ে তাড়বে না? বলবে না, “শোন জয়! যতবড় বিপদই সামনে এসে দাঁড়াক, কেবল আল্লাহকে ডাকবি।ʼʼ

জয়ের প্রশ্ন, “আল্লাহ কে?ʼʼ

-“আমাদেরকে যিনি বানিয়েছেন।ʼʼ

-“সে আমাদের রক্ষা করবে?ʼʼ

-“সব অবস্থায়। ধর, বারবার ডাকছিস তবু তোর বিপদ উদ্ধার হচ্ছে না, তবু বিশ্বাস হারাবি না। তাহলে কাফের হয়ে যাবি!ʼʼ

-“কাফের কী?ʼʼ

-“খারাপ।ʼʼ

-“বড়বাবা বলেছে, খারাপ হওয়াটা খারাপ না।ʼʼ

-“চুপ। ওই কুলাঙ্গারের কথা বলবি না।ʼʼ

হুমায়িরা নামাজ পড়লে সে গিয়ে জ্বালাতন করে। ঘাঁড়ে উঠে বসে, সামনে গিয়ে জায়নামাজের ওপর বাবু মেরে বসে মায়ের দিকে তাকিয়ে মুখ ভেটকিয়ে হাসে। তখন নামাজ শেষে হুমায়িরা বলতেন, “এমন করতে নেই, আব্বা। আল্লাহ নারাজ হয়।ʼʼ

-“আল্লাহ নারাজ হলে কী?ʼʼ

-“ছিঃ। এসব বলতে নেই। আল্লাহ আমাদের রক্ষাকর্তা আব্বা। তাকে সন্তুষ্ট রাখতে হয়।ʼʼ

জয় আজ মায়ের পেছনে লুকিয়ে মনে মনে ডাকছে আল্লাহকে, “আল্লাহ! রক্ষা করেন আল্লাহ।ʼʼ

চলবে...

[সতর্কতা: পর্বটিতে সহিংসতা রয়েছে।]

#অবরুদ্ধ_নিশীথ

#তেজস্মিতা_মুর্তজা

৬৯. (বর্ধিতাংশ)

জাভেদ আমিরকে চেয়ারে বসানো হলো। উনাকে ঘিরে ধরে রইল চারজন। জলিল আমিরের রাখা লোকেদের মাঝে একজনকে মেরে ফেলেছেন জাভেদ, আরেকজন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে, চোখদুটো তার সুযোগসন্ধানী। জাভেদ আমির ঘৃণাভরে একবার দেখলেন। উনার শক্তিশালী দেহটাকে ধরে রাখা দরকার। ছটফট করছেন বড়।

দড়ি দরকার। একটা ভালো ব্যবস্থার কথা মাথায় এলো ওদের। হুমায়িরার বুকের আঁচলটা ভালো কাজে দেবে। শরীর থেকে শাড়ির আচলটা টান মারল। শাড়ি দেহে পেঁচানো থাকে। সেই টাল সামলাতে না পেরে গর্ভবতী হুমায়িরা পড়ে গেলেন মেঝেতে, আর্তনাদ করে উঠলেন। সে অবস্থায় দুটো পুরুষালি লাত্থি মারতে কিন্তু ভুলল না ওরা। কোমড় বরাবর কষে মারল লাত্থিদুটো।

জাভেদ আমির গর্জে উঠলেন, ওদের গায়ে হাত দিলে তোর বংশ নির্বংশ করে ছাড়ব, “শুয়োরের বাচ্চা। ওদেরকে ছুঁবি না।ʼʼ

উনাকে তখন দুজন চেপে ধরে রেখেছে।

শাড়িটা ছিঁড়ে নিয়ে ওরা তা দিয়ে চেয়ারের সাথে বাঁধল জাভেদ আমিরকে।

কেউ উপহাস করল, “ছোঁবো না! ঠিক আছে বস! ছুঁইলাম না। গুলি কইরা খুলিডা উড়াই দেই?ʼʼ

জয় কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ল মায়ের পাশে। তার কান্না খুবই বিরক্তিকর ঠেকল। তাই তাকে একটা বড়সড় লাত্থি মারা হলো। ঠোঁটটা থেতলে গেল। জয় বুঝল কাঁদা যাবে না। তার কান্নার শব্দ ওদেরকে বিরক্ত করছে।

হুমায়িরা অসহ্য যন্ত্রণায় মেঝেতে পড়ে রইলেন। জয় হামাগুড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে মায়ের দিকে এগোয় আবার ওদের দিকে তাকায়, আবার যদি লাত্থি মারে! গুটিসুটি মেরে মায়ের কাছে মেঝেতে আধশোয়া হয়ে ঝুঁকে মায়ের হাতটা চেপে ধরে রাখে। বাবার কাছে যাবার উপায় নেই। তার অবশ্য ইচ্ছে করছিল, আলমারি থেকে একটা শাড়ি এনে মাকে দিতে। মা বোধহয় লজ্জা পাচ্ছে পেটিকোট আর ব্লাউজ পরে। সবসময় যে শাড়ি পরে থাকে। বাইরের কেউ এলে আরও টেনেটুনে ঘোমটা দেয়। সে দেখেছে।

কিন্তু তার কিছু করার নেই। সে মনে মনে রক্ষাকর্তাকে ডাকছে, 'আল্লাহ! রক্ষা করেন। এই শয়তানদেরকে মেরে ফেলেন। এরা খারাপ লোক।ʼ

তার মাথায় এই চিন্তাও এলো, খারাপ হওয়া তো খারাপ না। কিন্তু এই রকম খারাপকে কী বলে? এই খারাপদেরকে জয়ের ভালো লাগছে না। এখন আল্লাহ নামক রক্ষাকর্তার উচিত, এই খারাপদেরকে শাস্তি দেয়া।

ফাঁড়া খড়ি দিয়ে জাভেদকে মারতে লাগল ওরা। আর্তনাদটা আর নেয়া যাচ্ছে না। শাড়ির এক টুকরো জাভেদের মুখেও গুঁজে দেয়া হলো। একেকটা আঘাতে চামড়া ছিঁড়ে মাংস থেতলে উঠছিল জাভেদের শরীরের। কয়েকটা আঘাতে ঝিমিয়ে গেলেন জাভেদ। সাদা ফতোয়াটা রক্তের ছোপ দেখা যাচ্ছে। এবার মুখের কাপড় সরিয়ে নেয়া হলো।

এবার উনার উচিত ওদের কাছে প্রাণভিক্ষা অথবা আক্রমণের কারণ বা তারা কে এসব জানতে চাওয়া। কিন্তো জাভেদ করলেন অন্যকিছু। তিনি স্ত্রীর কাছে মিনতি করে উঠলেন, “চলে যাও হুমু। তোমার পায়ে পড়ি। জয়, চলে যা আব্বা। আমি আসব তোদের সাথে দেখা করতে। হুমায়িরা প্লিজ। দয়া করো। আমার সন্তানদেরকে নিয়ে চলে যাও তুমি। আমি আসব। খুব তাড়াতাড়ি।

এই তোরা ওদের যেতে দে। ওরা তো কিচ্ছু করেনি, তাই না? ওদেরকে বের হয়ে যেতে দে।ʼʼ

হুমায়িরা বুকের ওপর দুটো হাত আড়াআড়িভাবে ধরে ইজ্জত ঢাকার বৃথা চেষ্টাটা করছেন। দেখতে উনাকে তখন বড় বোকা বোকা লাগছে। বোকা নারী কেবল দু'পাশে মাথা নেড়ে বলেন, “এরা কারা গো জয়ের বাপ!ʼʼ শুনতে বড় অদ্ভুত লাগে তা।

রক্তাক্ত গালে হাসলেন জাভেদ, “পুরোনো দুশমনী। চলে যাও হুমু। পরে বলব।ʼʼ

কথাটা জয়ের মনে রইল। বড়বাবা বলে, তাদের পুরোনো দুশমন হলো সৈয়দ পরিবার।

হুমায়িরা ভাবেন, পরে বলবে? এই লোক মিছে সান্ত্বণা দিতে বড় তৎপর!

তাদের পারিবারিক নাটক বেশিক্ষণ সহ্য করল না ওরা। একেকটা আঘাতের সাথে সাথে জাভেদ আমিরের দেহের মাংস খড়ির সাথে ছিঁড়ে ছিঁড়ে আসছিল। পরনের ফতোয়া ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে উঠেছে।

জয় মুখ গুঁজে আছে মায়ের বুকের ভেতরে। সে মায়ের বুক খোঁড়ার চেষ্টা করছে বোধহয়। ঢুকে যেতে পারলে ভালো হবে।

ওদের লুটপাট শেষ হয়েছে। ভাগাভাগি পরে হবে। আলমারী খালি। আমির নিবাসের ঐতিহ্যবাহী কাসার তৈজসপত্রও ছাড়েনি। যুদ্ধের ডাকাতরা যত পেয়েছিল, এরা কিন্তু তত পেল না। এক প্রকার লোকসান হলো আগেরজনেদের তুলনায়। তবু কিছুই ছাড়া যাবে না। যা পাবে হাতে, তাই যাবে সাথে।

হুমায়িরার কানে মোটা স্বর্ণের ঝুমকা। তা খুলে নেবার মতো অত সময় বা ধৈর্য আছে তাদের? হেঁচকা টানে হুমায়িরার কানের ফুঁটো ছিঁড়ে দু'ভাগ গেল, তা যাক, ঝুমকো জোড়াও বেরিয়ে এলো। গলার হাড়, বালা সব নিলো।

মজার ব্যাপার হলো, লুটপাটে দুর্বৃত্তদের আগ্রহ নেই বিশেষ। বারো আনা আগ্রহই জলিল আমিরের রাখা লোকদুটোর মাঝে বেঁচে থাকা সেই একজনের। সে ওদের ডেকে বলল, কুড়াল দিয়ে আলমারির তালাটা ভেঙে দিতে। সে নিজে হাতে হুমায়িরার অর্ধনগ্ন দেহ থেকে অলংকার খুলল। এই বাড়িতে থাকার সময় এসব চোখে চোখে দেখে যে লোভ সংবরণ করা কত কঠিন ছিল, তা তারা দুজন ছাড়া কেউ জানে না। ভালো হয়েছে একজন মরেছে। ভাগ কমেছে।

তারা অসন্তুষ্ট। জাভেদকে আরও কষ্ট দিয়ে মারার ছিল। কিন্তু তা হচ্ছে না।

জাভেদকে মেরেই তাদের কাজ শেষ না। তাদেরকে জয়নালের আবাসে যেতে হবে। জয়নাল দিনাজপুরে এখন।

জয় দেখল, বাবা আর কথা বলছেন না। মাথা ঝুঁলে পড়েছে। উনার কোলের ওপর কয়েক সেকেন্ড পর পর আঠালো রক্ত ও থুতুর মিশ্রণ টুপটুপ করে পড়ছে। ট্যাপের পানি পড়ার কথা মনে পড়ল জয়ের। এভাবেই ট্যাপ বন্ধ করার পরেও টুপটুপ করে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ে।

সে মনে মনে তখনও আল্লাহকে ডাকছে। রক্ষা পেতেই হবে আজ। সে আল্লাহকে ডেকে এ-ও বলেছে, বড়বাবাকে এখন পাঠিয়ে দিতে। হুমায়িরা বলতেন, আল্লাহ চাইলে সব পারেন। বড়বাবাকে পাঠিয়ে দিতেও পারেন নিশ্চয়ই!

এলো বড়বাবা। ওরা যখন জাভেদকে শেষবার শ্বাস নিতে বাধ্য করছে, তেমনই চরম মুহুর্তে পেছনে প্রাচীর টপকে বাগানের ভেতর দিয়ে কার্ণিশ বেয়ে উঠে এলেন জয়নাল আমির। তিনি একা। হাতে শুধু একটা রামদা, পরনে কাছা মারা লুঙ্গি। জাভেদ আমির অর্ধচেতনায় ছোট ভাইকে দেখলেন কিনা বোঝা গেল না। তাঁর সারা শরীর ফাঁড়া মেহগনির খড়ির আঘাতে কাচা-কাচা।

দুর্বৃত্তরা একচোট একে অপরের দিকে তাকিয়ে মহানন্দের হাসি হাসল। জয়নাল আমির এখানেই চলে এসেছে অবশেষে।

জয়নাল আমির কিন্তু ভাইকে বাঁচাতে গেলেন না। একদমই না। তিনি ভাবীকে ধরে উঠালেন। হুমায়িরা অসহ্য পেটের ব্যথায় কুঁকড়ে গেছেন। ছুটে যেতে চাইলেন স্বামীর কাছে। জয়নাল আমিরের কঠিন মুষ্ঠি থেকে মুক্ত হতে পারলেন না কেবল। কোমড়ের গামছাটা খুলে বড়ভাবীর শরীরে জড়িয়ে অপর হাতে জয়ের হাতটা চেপে ধরলেন। রামদা তখন দুই হাঁটু দিয়ে চেপে ধরা।

ওরা একটু ধীর-স্থির হয়েছে। জয়নাল আমির নামটাতে এক আতঙ্ক আছে, তা দিনাজপুর জানে।

জয়নাল ভাবী ও ভাতিজাকে ধরে নিয়ে কক্ষের বারান্দায় বসালেন হেলান দিয়ে। জয় বড়বাবার হাত ছাড়ছে না। আস্তে কোরে জিজ্ঞেস করে, “বাবার কী হয়েছে, বড়বাবা?ʼʼ

বড়বাবা জবাব দিলেন না। বরং ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলেন জয়কে পেছনের দিকে মায়ের কাছে। জয়ের অভিমান হলো।

জয়নাল আমির ডাকলেন ওদের, “আয়। কার কার মায়ের বুকের দুধের জোর পরীক্ষা করবি, আগায়ে আয়। আজ দেখব তোদের মায়ের বুকে দুধের জোর বেশি নাকি আমার হাতের ধাতুর।ʼʼ

একজনের অবশ্য হাত কাটা পড়েছিল। হাতটা তিনি কাটলেন বামহাত দিয়ে। তবু নিখুঁত আঘাত। জয় তখন বড়বাবার ডান কোলে। সেদিন প্রথমবার জয় আমির রক্তের সংস্পর্শ পেলো। ছলাৎ কোরে এসে এক খাবলা গরম তরল ছোট্ট জয়ের শরীরে লেগে গেল। গা'টা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেছিল। ঘিনঘিনও করেছিল। বড়বাবার আধখোলা শার্টের প্রান্ত মুঠো করে ধরেছিল সে। বড়বাবার মুখ পাথরের মতো শক্ত তখন। বড়বাবার মুখেও রক্তের ছিটা।

হাত কাটার থমকাথমকির মাঝে কক্ষের দরজা দিয়ে ভাবী ও ভাতিজাকে বের করে দোতলার লম্বা বারান্দায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন জয়নাল। কিন্তু সেখানেও দুজন, পেছনের গুলোও এগিয়ে এসেছে। একহাতে ভাবীকে ধরে জয়কে বুকের সাথে মিশিয়ে রামদাটা চেপে ধরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন।

উনার হাতের রামদা চরকীর মতো ঘুরছে। কমপক্ষে দু'ফুটের মাঝে কেউ এসে দাঁড়ালে মাথা নেমে যাবে ঘাঁড় থেকে।

কিন্তু তার ভাবী জাভেদকে ছেড়ে যাবেন না। বারবার পিছু ফিরে চায়। জয় অস্ফূট স্বরে 'বাবা বাবাʼ বলে ডাকছে। নারীর আবেগে ঘেন্না এলো জয়নালের। তিনি ভাইকে বাঁচাতে যাননি কেন, তা বুঝেও তো অবলা নারী চুপচাপ সাথে হাঁটতে পারে। ভাই তার বাঁচবে না। বড়জোর মিনিট কয়েক জান আসা-যাওয়া করবে আর! কিন্তু বাঁচাতে হবে জয় আমিরকে! আমির বংশের শেষ প্রদীপ। আর জয়ের লালন-পালনের জন্য জয়ের মাকে।

জয়নাল আমির নরকের দেবতার মতোন নিষ্ঠুর ভঙ্গিতে পিতার মাথাকাটা লাশও পেরিয়ে এগিয়ে গেলেন নির্বিকার চিত্তে। তখন কিন্তু জয় ডুকরে কেঁদে উঠেছিল। বাবার জন্য নাকি দাদুর জন্য, জানা নেই।

বড়বাবার বাম বাহুতে রক্তের ছড়াছড়ি। মাংস অবধি ঠেলে বেরিয়ে এসেছে, এমন গভীর ক্ষত। অথচ বড়বাবার চোখদুটো জ্বলছে, দাউদাউ করে জ্বলছে। র-ক্তের মতো লাল, ছলছলে। বড়বাবা সেদিন জয়কে এক কঠিন ধমক দিয়েছিলেন, “কাদলে তুলে আঁছাড় মারব একটা। আমির বংশের রক্ত তুই। কাঁদবি তো জীবিত গেঁড়ে রাখব। কাঁদছিস কেন? হাসবি। হাস। হাস এখন।ʼʼ

জয় আশ্চর্যজনকভাবে দেখল, লোকগুলো দোতলায় থেমে গেছে। আর ওদেরকে ধরতে এগিয়ে আসছে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। বাবা তো পড়েই রইল শোবার ঘরে চেয়ারে। বাবা যাবে না ওদের সাথে?

জয়নালকে বাগানের মালি মন্টু খবর দিয়েছে। নিজের সাথে নিজের দাবা খেলার অভ্যাস আছে জয়নাল আমিরের। সেই দাবার গুটি ফেলে চলে এসেছেন মন্টুর ডাকে। মন্টু বলেনি কী হয়েছে, শুধু বলেছে, “ছোট ভাইজান একবার এক্ষুনি চলেন বাড়িত্।ʼʼ

শার্টের বোতাম তিনটা লাগিয়ে বেরিয়ে এসেছেন জয়নাল। দুটো এখনও খোলা।

আমির বাড়ির পেছনে ঝোপঝাড়। বিস্তর ভূমি পড়ে আছে। জঙলি এলাকা প্রায়। সেদিক দিয়ে হুমায়িরা আর জয়কে বের করে দিতে পেছনের ফটকের কাছে গেলেন জয়নাল। ওরা কিন্তু তখন সবে সদর বাড়ির সামনের প্রাঙ্গনে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তাদেরকে তাড়া করার কোনো তাগিদ নেই ওদের মাঝে।

মন্টু কোত্থেকে যেন এসে দ্রুত চাবি দিলো, “ছোট ভাইজান, এই লন ছুড়ান (চাবি)। পিছনের দরজার ছুড়ান।ʼʼ

একবার পেছনে তাকালেন জয়নাল, তারপর মন্টুর দিকে। জয়কে কোলে ধরা হাত দিয়ে ভাবীকে দাড় করিয়ে রাখার চেষ্টা করে শ্লথ হাতে জং ধরা তালাটা খুলতে খুলতে আবারও একবার পেছন মুখোশধারী ও মন্টুর দিকে একবার তাকালেন।

তালা খোলা হলো। ফটক খুলে গেল বিকট শব্দ কোরে। জয়নাল আমির অল্প হাসলেন এবার। ছয়জন মুখোশধারী একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে তাদের অপেক্ষা করছে। দূরত্ব চার-পাঁচ হাত। সেই দূরত্বের মাঝ দিয়ে সাপের মতো শরীর বেঁকিয়ে বেরিয়ে এসে ভাবীর হাত ছেড়ে জয়কে নামিয়ে তাড়া করলেন, “যান। চলে যান। আর পেছনে তাকাবেন না। সময় বেশি পাবেন না, ভাবী। খুব অল্প সময় পাবেন। যান যান যান।ʼʼ

জয় বড়বাবার হাত চেপে ধরে। খুতখুত কোরে কেঁদে কিছু বলতে যাবার আগে বড়বাবা এক বিশ্রী ধমক মারলেন, “এক কোপে গলা কেটে ফেলব। চুপচাপ তোর মায়ের সাথে চলে যা। দৌঁড়া!ʼʼ

জয় অবিশ্বাসে বড়বাবার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। বড়বাবা কেন যাবে না তাদের সাথে? অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না বড়বাবার কঠিন মুখখানা। বড়বাবা হুংকার ছাড়লেন, “যা, শুয়োরের বাচ্চা। যাহ! চলে যা, জয়..ʼʼ

সেই অন্ধকারের মাঝেই ওদের দিকে তাড়া করল দুজন। জাভেদের স্ত্রী-সন্তানকে ছাড়া যাবে না। কিন্তু একটা বাগড়া বাঁধল। জয়নাল আমির প্রাচীরের মতো মাঝে দাঁড়িয়ে পড়লেন। পেছন ফিরে অন্ধকারেই কঠোর স্বরে হুমকি দিলেন, “জোরে হাঁটেন ভাবী। জয়কে চেপে ধরে জোরে হেঁটে জঙ্গল পেরিয়ে যান।ʼʼ

ওদেরকে ঠেকাতে গিয়ে হাঁটুতে কোপ লাগল উনার। হাতের দুটো আঙুল ঝুলে রইল চামড়ার সঙ্গে। কে জানে ততক্ষণে মা-ছেলে কতদূর পৌঁছাল!

হুমায়িরা ওই অবস্থায় বেশিদূর যেতে পারবেন না অন্ধকারে জঙলি পথ পেরিয়ে। জয়নাল আমির ওদেরকে ঠেকাতে গিয়ে গোটা শরীরে কতকগুলো গভীর জখম পেলেন। রক্তক্ষরণ ততক্ষণে শরীরটাকে দূর্বল করে ফেলেছে উনার। কিন্তু তা বলে তিনি জয়ের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন না! জয় আমিরকে বাঁচতে হবে।

অবশেষে লাভ হলো না বটে। তিনি বন্দি হবার আগে কেবল একটা মহাকর্মই করতে পেরেছিলেন। ওদের পথ ছেড়ে দিয়ে আস্তে আস্তে বাড়ির দিকে এগিয়ে এলেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ওরা তখন ক্ষুধার্ত কুকুরের মতোন ছড়িয়ে পড়েছে জঙলি এলাকার ভেতরে মা-ছেলের খোঁজে।

জয়নাল আমিরের ঠ্যাংয়ে মাংস ছিঁড়ে গিয়ে গর্ত হয়ে গেছে। কলকল করে রক্ত ঝরছে সেখান থেকে। কিন্তু উনাকে হত্যার চেষ্টা করা হচ্ছে না কোনোভাবেই। করা হবেও না, তা তিনি জানেন। কোনোরকম এগিয়ে গেলেন। মন্টু তখনও ফটকের সাথে দাঁড়িয়ে। জয়নাল আমির কেবল একবার হাস্যজ্জ্বল মুখে ডাকলেন, “মন্টু মিয়াহ্!ʼʼ

মন্টু বড় বিনয়ের সাথে জবাব দেয়, “জি, ছোটভাইজান।ʼʼ

মন্টুর কথা ফুরোয় না। জয়নালের হাতের রামদা মন্টুর গর্দান স্পর্শ করে, এবং মুহুর্তের মাঝে তা নেমে ছিটকে পড়ে দেহ থেকে আলাদা হয়ে কোথাও।

বেইমানরা দুনিয়ায় থাকলে দুনিয়ার এত চমকপ্রদ সৌন্দর্যে দাগ দেখা দেয়। জয়নাল আমির সৌন্দর্যের ওপর দাগ পছন্দ করেন না তেমন একটা।

দুর্বৃত্তদের চূড়ান্ত এক লাভ হয়েছিল। যে লাভটা মূলত তারা নিজেদের অজান্তেই চাইছিল। তা জয়নাল আমির আরেকটু সহজ করে দিলেন।

জয়নাল আমির গ্রেফতার হয়েছিলেন। নিজের ভাই, বাপ ও মন্টু মিয়াসহ আরও কয়েকজনকে আহত ও নিহত করার অপরাধে। নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড।

যখন ভোরের আলো ফুটছে। সে সময় জাভেদ আমিরকে হিঁচড়ে নামিয়ে আনা হলো বাগানের প্রাঙ্গনে। শুকনো পাতারা পড়ে আছে। হাঁটলে মরমর শব্দ হয়। জয়নাল আমিরকে ধরে রেখে তার সম্মুখে জাভেদ আমিরের কণ্ঠনালি বরাবর চারবার ছুরিকাঘাত করা হলো। ছোট্ট ধারালো, বাঁকা হান্ট নাইফ। প্রথমভাগে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এসে তারপর ধীরে ধীরে চুইয়ে পড়তে থাকল।

জয়নাল আমির আস্তে কোরে চোখদুটো বুজে ফেললেন। শরীরটা ঝিমিয়ে আসছে। ওরা মুখের মুখোশ খুলে ফেলছে আস্তে আস্তে। ভদ্রলোক হয়ে উঠছে। পুলিশ আসবে এবার। ওরা সাক্ষী দেবে কীভাবে জয়নাল আমির সঙ্গীদের সাথে নিয়ে নিজের বাড়িতে হামলা করেছে এবং বাপ-ভাই সহ আরও কয়েকজনকে হত্যা করেছে। আর যে লোকগুলো গুলি খেয়ে মরেছে, তারা মূলত জয়নালেরই লোক। আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে জাভেদ আমির গুলি চালিয়েছেন তাদের ওপর।

—

আমির নিবাস দিনাজপুরের ঘোড়াহাট উপজেলায়। প্রসিদ্ধ এক অঞ্চল। মোঘল, নবাব, পর্যায়ক্রমে রাজা দ্বারা শাসিত করতোয়ার তীর ঘেঁষে অবস্থিত অভিজাত, পুরোনো অঞ্চল দিনাজপুরের ঘোড়াহাট। সেই অঞ্চলের অভিজাত পরিবারের বড়বধূ হুমায়িরা সে রাতে নেহাত এক অসুস্থ গর্ভবতী কাঙালিনী।

ঘোড়াহাটে আজ সেসব রাজা-সামন্ত নেই তেমন, তবু আছে। ঘোড়াহাট দুর্গ থেকে খুব বেশি দূর নয় আমির নিবাস। দিনাজপুরের প্রশাসনিক অঞ্চল। করতোয়ার কলতান যেন কলকল রবে কানে ধরা দিচ্ছিল হুমায়িরার।

তিনি ভাবলেন, কোনোভাবে বাপের বাড়ি যাওয়া যায় কি? বাঁশেরহাট ঘোড়াহাট থেকে পায়ে হাঁটা পথে কমপক্ষে এক-আধদিন। কখনও বাঁশেরহাটে একা যাননি হুমায়িরা। জলিল আমির সঙ্গে কোরে নিয়ে গিয়ে আবার সঙ্গে নিয়ে আসতেন। বাড়ির বউদের একা চলতে নেই, বাপের বাড়িতেও রাত বাসী করতে নেই।

আর চলার ক্ষমতা নেই হুমায়িরার। জয়কে বুকের সাথে চেপে ধরে ঝোপের ওপর লুটিয়ে পড়লেন। উনার মনে হচ্ছে, রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তলপেটের চিনচিনে ব্যথা ভালো আশঙ্কা জাগাচ্ছে না। জয় বারবার জিজ্ঞেস করে, “তোমার কী হইছে?ʼʼ

হুমায়িরা জয়ের কপালে একটা চুমু খেয়ে জড়িয়ে ধরে বললেন, “কিছু হয় নাই আব্বা। আল্লাহরে ডাক।ʼʼ

জয় আল্লাহকে ডাকছে সেই তো তখন থেকেই। একবার ডেকে বড়বাবা এসেছিল। সুতরাং আল্লাহকে ডাকাটায় একটু ভরসার ব্যাপার আছে বটে। সে ডাকল। ডেকে বলল, মায়ের ব্যথা কমিয়ে দিতে। তাদের পেছনে যারা তাদের ধরতে আসছে, তাদের শাস্তি দিতে।

জঙলি এলাকাটা খুব বড় নয়। ওদের হাতে মশাল বা টর্চ ধরণের কিছু ছিল না। হতে পারে নেই।

রাতের কত বাজল জানা নেই। কিন্তু পাতার খচমচ, ঝোড়ঝোপ পেরিয়ে এগিয়ে আসার আওয়াজ এলো। তিক্ত যন্ত্রণাকে চেপে হুমায়িরা টানটান হয়ে শুয়ে পড়লেন জয়কে নিয়ে। নিঃশ্বাসের আওয়াজ খুব জোরে লাগছিল কানে। জয়ের মুখটাও চেপে ধরে ছিলেন।

সে রাতে ধরা পড়লেন না। সকালের আলো ফুটলে বেরিয়ে পড়েছিলেন জঙলি এলাকা ছেড়ে। হুমায়িরা জানেন না, তিনি কোন পথে এগোচ্ছেন। মানুষ বসবাসের এলাকা দিয়ে যাবার উপায় নেই দিনে। কেউ দেখবে গর্ভবতী হুমায়িরার খুঁড়িয়ে পথচলা, রক্তে জর্জরিত পেটিকোটের ওপর একটা লাল গামছা জড়ানো শরীর, ছিঁড়ে যাওয়া ব্লাউজ।

দুটো রাত কাটলো নির্জন ঝোপে ঝাড়ে। রাত শেষ হবার আগেই হেঁটে যদি কোনো ঝোপ পাচ্ছিলেন, সেখানেই থেমে যাচ্ছিলেন। দিনের আলো ফুটতে ফুটতে যদি লোকালয় অবধি পৌঁছান, এই ভয়।

এই দু'দিনে ছোট্ট জয়কে দুবার গন্ধ, নোংরা পুকুরের পানি খাওয়ানো হয়েছে। জয় খিদেয় কাঁদতে চায়, কিন্তু মায়ের দিকে চেয়ে আর কাঁদে না, তার জেদ ওঠে, হাঁটতে চায় না।

রাতে ঝোপ পেরিয়ে পথচলা, অনাহারী অবস্থা এবং নির্ঘুম হেঁটে চলার পরিশ্রম হুমায়িরার গর্ভাবস্থার অভিশাপকে বাড়িয়ে রক্তক্ষরণের মাত্রা বাড়াল। হামাগুড়ি দিয়ে পথচলারও উপায় আর নেই।

বড় আশ্চর্যের বিষয়, ওরকম অবস্থায় এত প্রতিকূলতার মাঝে অনাহারী গর্ভবতী হুমায়িরা কীসের জোরে যে পরের দুটো রাতও পথ চলেছেন একটু একটু কোরে! তিনি জানেন না কোনদিকে এগোচ্ছেন।

তিনদিনের রাত। হুমায়িরার মনে হলো, প্রাণরস ফুরিয়ে এসেছে অবশেষে, জীবনের দায় মেটানোর সময় এসেছে। গর্ভের সন্তানের কাছে মা হিসেবে ধিক্কার মেনে নিয়ে তখন তিনি পথ চলা বন্ধ করে দিলেন। জয় হাঁটতে চায় না, কিন্তু হুমায়িরার সাধ্যের বাইরে জয়কে কোলে তুলে নেয়া। নিষ্ঠুরের মতো হুমায়িরা জয়ের মুখের দিকে তাকান না। তাকালে উনার মা হয়ে বেঁচে থাকার স্বাদ ফুরোবে, এই ভয়।

ঘোড়াহাট পেরিয়ে হুমায়িরা তখন হাকিমপুরে, হিলি সীমান্তের অঞ্চলের এক নির্জন ঝোপে পড়ে আছেন। তিনি জানেন না, তিনি কোথায়! পাখির ডাকাডাকি জানান দিলো রাত তিনটা পেরিয়ে গেছে। সকাল হতে খুব দেরি নেই।

জয় মায়ের কাছে খাবার চাইল। জেদে কয়েকটা খামছিও মারল। মারা উচিতও। এক সময় হুমায়িরা খাবার নিয়ে সারা বাড়ি ছুটে বেড়াতেন জয়ের পেছনে। আজ সে খাবার চাইছে, কিন্তু হুমায়িরা দিচ্ছে না। জেদ হবে না কেন?

হুমায়িরা জয়কে বুকের ওপর নিয়ে গালে-মুখে হাত বুলিয়ে বললেন, “আল্লাহকে ডাক জয়। এই দুনিয়ায় এখন তোর আমার কেউ নেই। আমাদেরকে রক্ষা করার কেউ নেই তিনি ছাড়া।ʼʼ

জয় বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝেই তবু মনে মনে ডাকছিল আল্লাহকে। কিন্তু তিনদিনের না খাওয়া, প্রাণের ঝুঁকি, মায়ের অবস্থা এবং সব মিলিয়ে ভেতরের জেদে শক্ত হয়ে বসে রইল। চোখের পাতা লেগে আসছে। হাঁটুতে ব্যথা। সেই অনাহারী অবস্থায় পেট পিঠের সাথে লেগে গেছে। ক্লান্তি ও ক্ষুধায় মাটির ওপর মায়ের বাহুতে আস্তে কোরে মাথাটা রেখে শুয়ে পড়ার পর কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল!

বিকট হাসির আওয়াজ ও হুমায়িরার বাহু নড়েচড়ে ওঠায় ঘুম ভাঙল। চারজন লোক তাদের খুঁজে পেয়ে খুব খুশি। সকাল হয়ে গেছে! ওরা খুঁজে পেয়ে গেছে ওদেরকে, এবার?

হুমায়িরার বাহু চেপে ধরে ঝারা মেরে টেনে তোলা হলো। করুণ আর্তনাদ করে উঠলেন হুমায়িরা। জয়ের অভুক্ত ছোট্ট শরীরটা টেনে তুলে দাড় করানো দায়। কিন্তু সে গিয়ে এলোপাথারি কয়েকটা আঘাত করার চেষ্টা করল লোকটিকে। মুখভর্তি দাড়ি তার। আরেকজন এসে জয়কে ধরে ওর দুহাত পিছমোড়া করে ধরে চাপ দিলো। মনে হলো, কচি হাতের বাহুগুলো মটমট করে উঠল।

সীমান্তের পার্শ্ববর্তী কোয়ার্টার এলাকা। সেসব কোয়ার্টার আজ পরিত্যক্ত ও নির্জন লাশকাটা ঘরের মতো দেখতে। বাইরের লোহার জানালা-দরজা মাদকাসক্ত ও চোরেরা খুলে বিক্রি করে খেয়েছে। দেয়ালে শেওলা, প্লাস্টার খসে খসে পড়ছে।

চারপাশে ঘন জঙ্গল গজিয়ে গেছে। বন্দর সংলগ্ন এসব কোয়ার্টার মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনী হিলি সীমান্ত দখলের সময় পুড়িয়ে দিয়েছিল।

পোড়া বিল্ডিংগুলো এখন মদের আসর ও জুয়ার আড্ডাখানা হিসেবে খুব ভালো। এসব জায়গায় লোক দিনেও পা রাখে না। তাদের জানের ভয় আছে।

ভেতরের বিল্ডিংয়ের এক দোতলায় জয়কে বাইরে রেখে হুমায়িরাকে নগ্ন করার কাজে লেগে পড়ল ওরা। ভাঙা জানালার গ্রিল ধরে জয় চেঁচাচ্ছে। তার গলার আওয়াজ আঁটকে আসছে। সে দেখল, বড়বাবার জড়িয়ে দেয়া গামছাটা মায়ের শরীর থেকে খুলে মুখে ঢুকিয়ে দেয়া হলো। মা আর চিৎকার করতে পারছে না। চোখের পানি ভেসে ভেসে এসে গালে গোঁজা গামছায় ঠেকলে শুষে নিচ্ছে গামছা। মায়ের শরীরে একটুও জোর নেই।

জয় বন্ধ দরজায় এলোপাথারি ধাক্কাধাক্কি করে বড় ক্লান্ত হয়ে গেল। তিনদিনের না খাওয়া ছোট্ট দেহটা আর চলতে চায় না। সে আবারও জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মায়ের দিকে তাকাতে খুব ভয় হচ্ছে তার। খুব ভয়াবহ দৃশ্য। বুকের ভেতরটা এত নিষ্ঠুরভাবে ঢিপঢিপ করছে। শ্বাসরোধ হয়ে আসছে।

ওরা মাকে পুরো নগ্ন করে ফেলেছে। মায়ের পেটটা উঁচু হয়েছে একটু। পেটের ভেতরে তার বোন আছে। বোন কি কষ্ট পাবে না! ওরা খুব জোরাজুরি করছে মায়ের সাথে। একটা ব্যাপার খেয়াল করল জয়, মায়ের দুই উরুর মাঝ দিয়ে রক্ত শুকিয়ে আছে। আগে ঝরা রক্ত। পুরোনো সেই শুকনো রক্তের ওপর দিয়ে নতুন রক্তের প্রবাহ আসছে।

ওরা মায়ের শরীরের ওপর চেপে শুয়ে পড়ছে। মা হাত-পা ছটফট করলে ওরা খামছে চেপে ধরে রাখছে দুজন। ওরা যখন উলঙ্গ হলো লুঙ্গি খুলে, দৃশ্যটা খুবই খারাপ লাগল জয়ের কাছে। সে চোখের ওপর ছোট্ট দুই হাতের তালু চেপে ধরল।

জয়ের তখনই হুট করে আল্লাহর কথা মনে পড়ল। রাতেও হুমায়িরা পিঠে হাত চাপড়াতে চাপড়াতে ক্ষীণ গলায় বলেছিলেন, “তোর আর আমার সাথে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই। আল্লাহকে ডাকবি যেকোনো বিপদে। ক্ষুধা পেলে, কষ্ট পেলে, আঘাত পেলে...সবসময়।ʼʼ

সে সেদিন চিৎকার করে করে আল্লাহকে ডেকেছিল, “আল্লাহ আপনে আসেন। কোথায় আপনে, আল্লাহ? আমার আম্মুকে ওরা মেরে ফেলবে আল্লাহ! ও আল্লাহ.....আপনে শুনছেন? রক্ষা করেন আমার আম্মুকে।ʼʼ

মনে হয় আস্তে ডাকা হচ্ছে। জয় আরও জোরে জোরে ডাকল আল্লাহকে। আল্লাহ যদি রক্ষা করতে দেরি করে ফেলে, তাহলে মায়ের খুব কষ্ট হয়ে যাবে। সে বারান্দার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েও ডাকল। আকাশ থেকে কখন আসবে আল্লাহ! ঘরের ভেতরে খুব খারাপ কিছু হচ্ছে। কিন্তু কান্নার তোড়ে জয়ের গলা আঁটকে আসছে। ডাকতে ডাকতে হেঁচকি উঠে গেল, কাশতে কাশতে গলায় জ্বলুনি শুরু হলো। বুকটা লাফাচ্ছে।

তার এত চিৎকার বোধহয় খুব বিরক্তিকর ছিল। দরজার খুলে একজন লোক লুঙ্গির গিট্টু বাঁধতে বাঁধতে এগিয়ে এলো। জয় দৌড়ে যাবার চেষ্টা করেছিল ঘরের ভেতরে।

কিন্তু লোকটা জয়কে ধরে ফেলল। মেঝেতে শুইয়ে ফেলে বুকের ওপর চড়ে বসল লোকটা। জয়ের দম বন্ধ হয়ে এলো। তাতে জয়ের আবার একবার আল্লাহর কথা মনে পড়েছিল অবশ্য। লোকটা তাকে জবাই করবে। আরেকটু সময় সে পেতে পারতো। কিন্তু এত চিৎকারের ফলে সময় এগিয়ে এলো।

সে লোকটার হাতে চাপাতির মতো দেখতে মৃত্যুকে দেখেছিল। তখন তার বয়স সাত। তার আল্লাহর কথা মনে পড়লেও সে ডাকল না। একটুও ডাকতে ইচ্ছে করল না। খুব আগ্রহী নজরে নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে রইল চাপাতির চকচকে ধারালো প্রান্তের দিকে।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন