#নীল_ভ্রমর
#কলমে_মোহমায়া
—গাজীপুর শহরের এক ব্যস্ত দিনের মাঝে জ্যামে কালো রঙের প্রাইভেট কার প্রায় দের ঘন্টা যাবত আটকা পরেছে।...
দের ঘন্টায় অপেক্ষা করার পর ব্যস্ত সড়কটা জট ছেড়েছে।
জানাই তো আছে গাজীপুর শহরটার কথা, সময় পাল্টে গেলেও শহরটা নিজের গতি নিয়ে চলে যাচ্ছে।
অনেকটা পাল্টে গেছে পাল্টে গেছে রাস্তা আর বেড়ে গেছে ব্যস্ততা।
এই ব্যস্ততার অভ্যাসটা বলতে গেলে একদম ছেড়ে গেছে কোহিনূকে। গাজীপুরের ব্যস্ত সরকটা পার করে এক গজারি বনের পাকা রাস্তা দিয়ে চলতে থাকা কোহিনূরের গাড়ি। বনের মাঝে চলতে থাকা গাড়িটা মনে হচ্ছে শত শত গাছের ছায়া ভেদ করে সূর্যকে খুঁজে নিচ্ছে। গাছের ফাঁকে পাতার মাঝের আবরণটা ভেদ করে সূর্য রাস্ত আলো দিয়ে যাচ্ছে।
গাজীপুর শুধু তার বাণিজ্যর বা কারখানার জন্য নয় বরঞ্চ তার সৌন্দর্যের জন্যও জানা যায়। এই সৌন্দর্যের জন্য অবশ্যই জমিদারদের প্রশংসা করা প্রাপ্য ।
এখানে নির্মাণ করা হয়েছে অনেক সাজসজ্জা বিশিষ্ট জমিদার বাড়ি। আজও সে জমিদার বংশের কিছু কিছু খোঁজ পাওয়া যায় গাজীপুরের জায়গায় জায়গায়।
দিনের বেলা যেই গজারি বনটা কে সুন্দর্যের মহিমা দেখা যায় ঠিক রাতে তা হয়ে ওঠে মর্মান্তিক ভয়ংকর কালো অভিশাপে । শক্তি পাচার্য আর এক সন্ত্রাসের জগত আছে এই গাজীপুরে। এমনই এক শক্তিধর প্রাচুর্যের অধিকারী বংশ হচ্ছে সরকার বংশ। সরকার বংশের শিরায় শিরায় বইছে জমিদার বংশের র'ক্ত। হয়তো জমিদারিতো হারিয়েছে বহু বছর আগে। কিন্তু আজও সেই নামটা রয়ে গেছে আর রয়ে গেছে তাদের সেই শক্তি ও সম্মান। আসতে আসতে নিজে দের আরো শক্তিশালী করে উঠে তুলেছে সরকার বংশ।
আজ বহু কাল পর এই গাজীপুরের রাস্তায় পা পড়েছে সরকার বংশের ছোট কন্যা কোহিনুরের। আজ বহু বছর পর বাড়ি ফিরছে কোহিনূর সরকার। চলন্ত গাড়ি জানালা দিয়ে নিজের খোলা চুল সহ মাথাটা বের করে দিল কোহি।
জীবন্ত সমুদ্রের নেয় নীল চোখ খানি জল জল করে ওঠেছে সূর্যের শিখায়। তির তির করে সূর্যালোক খানি পড়ছে কোহির নীল চোখ জোড়ায়। ধবধবে সাদা গায়ের বরণ সহ খোলা চুল। র'ক্ত লাল ঠোটখানি আর চোখের তিখনো আঘাতে যে কোন পুরুষ জ্ঞান হারাবে। শুকনো ফর্সা চেহারার দুটো গাল যেন গোলাপের পাপড়ি। এত রূপবতীর চেহারায় কি চিন্তা মানায়।
না মানাচ্ছে না। কোহির মুখেও চিন্তা মানাচ্ছে না। বহুকালের চিন্তা আজ এক সাথে ফুটে ওঠেছে কোহির চেহারায়।চিন্তায় ডুবে থাকাটাই স্বাভাবিক। আজ প্রায় বারোটা বছর পর ফিরে আসা হল গাজীপুরের পথে।চিন্তিত ভাবনায় গাড়ির বাইরের দিকে মাথা দিয়ে চেয়ে রইলো কোহি৷ জেনো সে চোখ না রাখলে হারিয়ে যাবে রাস্তা, হয়তো গুলিয়ে যাবে পথ। গন্তব্য হয়তো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে পৃথিবী থেকে।
ফট ফট ফট ফট করতে করতে প্রাইভেটকার টা থামলো।সরকার জমিদার বাড়ির সামনে। সাথে সাথে যেন কেঁপে উঠল কোহির বুক। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো ফর্সা গায়ের সব লোম শীতল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল । একবার তাকিয়ে দেখলো সামনে থাকা লোহার গেট পেরিয়ে উচ্চ স্তম্ভ বিশিষ্ট জমিদার বাড়ির দোয়ার খানি। চোখের পাতাখানি ভারি হয়ে এলো, হানা দিলে অশ্রু।
গাড়ি থেকে নামতে গিয়েও মনে হলো পূর্ণ শরীর তার শক্তি হারিয়েছে। হাত পা কেপে উঠেছে হ্যান্ডেলটা ধরতে গিয়ে।
এই প্রাচুর্যে নির্মিত সরকার বাড়ি টাকে সামনে থেকে দেখে বুকটা কেঁপে উঠছে। এ বাড়ির মায়া তাকে ছাড়তে হয়েছে ১২ বছর আগে।
আজ বুকটা ভারি হয়ে আসছে বার বার চোখে পানি ছল ছল করে ওঠছে খনে খনে। খুব কষ্টে বুক ফেটে বেরিয়ে আসা কান্না টাকে খামছে ধরে রেখেছে কোহি।
কি দোষ ছিল তার কেন তাকে দুরে ঠেলে দেওয়া হলো। হাজারটা প্রশ্ন আর কৌতুহল বাসা বেঁধেছে কোহির বুকে। কেন তাকে আরাল করা হলো কেন তুলে দেওয়া হলো তাকে মামা আমজাদ আলীর হাতে সে কেন একা বড়ে হলো USA।
কেন মা-বাবাহীন , মেয়েটাকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো আমজাদ আলী এই বাড়ি থেকে। গাড়ি থেকে নেমে ধীর পায়ে হাঁটতে লাগলো জমিদার বাড়ির বড় লোহার গেটের দিকে কোহি।সামনে গিয়ে দরজার দারোয়ান ড্যাব ড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ পর মুচকি হাসি দিয়ে দরজা খুলে দিল কোহির জন্য।
কোহি তার দিকে এক বার তাকিয়ে দরজা দিয়ে সরকার বাড়ির বাগানে পা রাখলো। হঠাৎ আশ্চর্য হয়ে সেখানে কর্মরত লোকেরা কোহির দিকে তাকিয়ে রইল। সম্পূর্ণ বাগানটা গোলাপ ও রকমারি ফুলে সাজানো।
সবাই তার দিকে তাকিয়ে রইয়েছে দেখেও কোহি কোন প্রকার প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সরকার বাড়ির বড় গেটটা পেরিয়ে সরকার বাড়ির বৈঠক ঘরে প্রবেশ করল। ঢুকতেই দেখা মিলে সাজসজ্জা বিশিষ্ট বড় জমিদার বাড়ির বৈঠক ঘরের। চারিপাশে সাজানো আছে ইম্পটিড ফার্নিচার আর আসবাবপত্রে।
চতুর্দিকের দেওয়ালে লাগানো আছে সরকার বাড়ির পারিবারিক দেওয়াল ফটো। একদম সামনে দেওয়ালম টা জুড়ে লাগানো আছে এক বিশাল ফ্রেমের ফ্যামিলি ফটো।
কোহিনূর দেখতে পেলো তার এবং তার জমজ বোনকে কোলে নিয়ে তার বাবা বসে আছে, দু পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার দুই ভাই। তার মা দাঁড়িয়ে আছে তার ছোট চাচীর একদম পাশে।
কি সুন্দর পরিবার তাই না। কার নজর লাগলো তাদের এই সুন্দর জীবনটার। ছোটবেলার কিছুই মনে নেই কোহিনুরের তবুও যেন অশ্রু হানা দিচ্ছে। চোখে অশ্রু খানি জ্বলজ্বল করে বেয়ে পড়ল তার গাল দিয়ে।
এটাই যে তার পরিবার এখানেই তো তার জন্ম। হঠাৎ পেছন থেকে জুমার নামের এক নীল চোখের ছেলে তাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো
" কিরে নূরি তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন। এসব কি পড়েছিস তুই। একদম রাস্তার ফকিরদের মত লাগছে। তোকে কি জামা কাপড় কিনে দেই না। এসব কি পড়েছিস তুই।
কোহির পরনে ছিলো তখন ওভার সাইজ ফাটা জিন্স আর টি-শার্ট।
"যা জলদি কাপোর বদলে নে। একদম অসভ্য দেখা যাচ্ছে। সভ্যতা কি সব গুলে খেয়েছিস, যা জলদি।
তোর মাথায় কাপ কোউ উরে গেলো।
এক পলক তাকাল কোহিনুর সেই ছেলেটির দিকে। তার নীল চোখ এক ফোটা জল পরতেই লাল বর্ণ ধারণ করে। অপলব দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জুমানের দিকে। কোহির চোখ তার দিক থেকে সরছে না। জুমান যে তার আপন মেজ ভাই।
মার মত তাদের ৪ ভাই বোনের ও যে নীল চোখ। মার মতোই তাদের গায়ের বরণ ধরেছে ধবধবে সাদা।
কোহির চোখের দিকে তাকিয়ে জুমান এক পলক তাকিয়ে তার কাছে এসে গালে আলতো করে হাত দিয়ে বলল।
"কি হলো তোর।চোখে পানি কেন আমার নুড়ি কে কেউ কি কিছু বলেছে। কাঁদছিস কেন, ভাই কে বল।
কোহির বুঝতে বাকি রোইলো না জুমান তাকে মাহিনূর ভাবছে৷ তারা যে জমজ। বোঝারি কথা এই বারো বছর পর সে ফিরেছে।
ভাইকে দেখে ধাপ করে তার বুকে জরিয়ে গেলো কোহি।জুমান অবাক হয়ে গেলো।হয়তো এই সময়ের অপেক্ষায় ছিল কোহিনূর। কবে সে তার ভাইদের জরিয়ে ধরবে। বুকের পাহার ভেঙে সাগর বানিয়ে কাদবে।
বৈঠক ঘরের মাঝ থেকে উঠে গেছে দুটো সিঁড়ি দুতলায়। বা পাশের সিরি দিয়ে নামতে লাগলো আদনান আর তার চাচা আতিফুর রহমান। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিতে আদনানের বলিষ্ঠ পুরুষ শরীর রমণীদের পাগল করার জন্য যথেষ্ট। এমন সুপুরুষ কে দেখে যে কেউ হাবুডুবু খাবে।
বাবার মত সুদর্শন দেহ ও মায়ের মত নীল চোখ যে তাকে এক রত্ন বনিয়ে তুলেছে।
চাচা, ভাতিজার চোখ পরলো ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা জুমান আর কোহিনুরের দিকে। কপাল খানিকটা কুঁচকে ফেললো আতিফুর রহমান। বলে উঠলো জুমান কে।
" কি হয়েছে জুমান। নুরি কাঁদছে কেন।
" আর নুরি এসব কি পরে আছো।
কোহি তাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। এক পলক দেখে নিলো তার ভাই আর চাচাকে। হটাত করে চুপ হয়ে গেলেন আতিফুল রহমান। তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে আদনানের দিকে তাকালেন। আদনান ন্ধির পায়ে চলে গেল জুমানের কাছে।
কোহিনুর তাকালো তার ভাইয়ের দিকে। লাল চোখ খানা পরলো তার বড় ভাইয়ের চোখের দিকে। থাবার মতো জড়িয়ে ধরতে গেল নিজের ভাইকে।। কিন্তু আদনানের মাথায় ছিল অন্য কিছু। যেন মনে হচ্ছিলো সে যানে আজ কোহি ফিরবে চোখের ইশারায় জুমান কে বের হয়ে যেতে বললো।জুমান কিছু টা আবাক হলো। কিন্তু কিছু বললো না।
হটাত জুমানের যেতেয় আদনান নিজ বুকে লেগে কাদতে থাকা কোহির, ঘাড়ে সজরে আঘাত করলো আদনান। সাথে সাথে টেলে তার কোলে পরলো কোহি। কিছু টা আবাক হয়ে গেলো ভাইয়ের এমন কান্ডতে। চোখ বুজে তার কলে পরে গেলো। কিন্তু আাদনান এই সব কে কোন গুরুত্ব দিলো না।
আদনান শক্ত কন্ঠে এক ডাক ধোরলো নিজের গালা, সাথে সাথে ডাক সুনে বের হয়ে এলো এক লম্বা যুবক। পরনে তার সাদামাটা লুঙ্গি। আর গায়ে এক সাদা গেঞ্জি। একদম মায়ায় মাখা চেহারাটা ছেলেটার।
নাম তার মুত্তাসিম।
তার ঘারে ছিলো নীল পের বিশিষ্ট লাল গামছা। দেখে বুঝা যাচ্ছি সে গোছলে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল।
আদনানের চোখের ইশারায় কোহিনুর কে নিয়ে নিলো আদনানের কাছ থেকে মুতাসিম।
আদনান তাদের দিকে না তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত আর গম্ভীর কন্ঠে বললো।
"মেয়েটা কে তার জায়গায় পাঠিয়ে দাও তার জায়গা এখানে নয়।
এই বলে আতিফুল রহমান আর আদনান তাদের জিপ গাড়িতে করে কোথায় যেন চলে গেলো।তাদের সাথে আছে আরো দুই গাড়ি বিশিষ্ট তামিল ছবির পালোয়ানের দল বলতে পারো। কি ভয়ংকর তাদের চেহারা, জুমান কিছুই বুঝতে পারল না কি হচ্ছে এখানে সে বাহিরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখল।
পুরো নাম অধীর আরাফ জুমান।
আর আদনানের পুরো নাম। অদ্র আদনান সরকার।
চলবে.........