পর্ব_১
জেহের_এ_ইস্ক_১
#সানজিদা_বিনতে_সফি
“তুমি কি বুকের দুধ দিয়ে চা বানাও?”
কথা টা শোনা মাত্র সুমনা চোখ বড় বড় করে তাকালো রূপকথার দিকে। রূপকথা নির্বিকার। বাড়ি ভর্তি লোকের সামনে এমন একটা কুৎসিত কথা বলেও তার মধ্যে কোন অনুশোচনা নেই। ব্যস, কি আর হবার? এই কথা ধরে সুমনার মাদবর স্বামী সারা গ্রাম মাথায় তুলেছে। জমিদার বাড়ি গিয়ে বিচার ডাকার তদবির করে এসেছে।
ঢাকা থেকে গ্রামের জমিজমার বিষয় নিয়ে কিছু কাজের জন্য গ্রামে এসেছিল জমিদার বাড়ির মেজো ছেলে শেহরোজ শেখ। তার কানে কথা টা যাওয়া মাত্র মেজাজ খারাপ হলো তার। এলাকার সবাই জানে, শেহরোজ অসভ্যতা আর বেয়াদবি একদম সহ্য করতে পারে না৷ এই মেয়ের নামে আরো অনেক অভিযোগ এসেছে তার কানে। গ্রামের অর্ধেকটা অস্থির করে রেখেছে একা এই মেয়ে নিজেই। কেমন বেয়াদব হলে মুরব্বিদের সাথে এমন অসভ্য মশকরা করতে পারে তার বুঝে আসে না।
মাদবর জমিদার বাড়ির সামনেই ঢ্যাট হয়ে বসে ছিল। একটা ফয়সালা না করে কিছুতেই যাবে না সে৷ শেহরোজ অনেকক্ষণ এসব নিয়ে কোন কথা বলে নি। মেয়েটা বেয়াদব সে জানে। কিন্তু মেয়েটা তো অবিবাহিত। তার উপর মাস্টারের মেয়ে। এখন তাকে নিয়ে বিচার শালিস হলে তো পরে বিয়ে শাদি হবে না! শেহরোজ ভাবলো ব্যাপার টা নিয়ে পঞ্চায়েত না ডেকে ওই মেয়ের পরিবার কে ডেকে একটা বিহিত করে দিবে। সাবধান করে দিবে যাতে এমন কথা আর কখনো না বলে।
শেহরোজ দুই পরিবার কে সন্ধ্যায় জমিদার বাড়ি উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়ে নিজের কাজে বেরিয়ে গেল। আজ সারাদিন ভুমি অফিসেই কাটাতে হবে তার।
এদিকে রূপকথার বাড়িতে এ নিয়ে হুলুস্থুল পড়ে গেছে। রূপকথার বাবা কষে চড় বসিয়েছে মেয়ের গালে। রূপকথার মা মাটিতে গড়াগড়ি করে কান্নাকাটি করছে। বিচার হলে কি হবে এই ভেবে তার কান্নার বেগ বাড়ছে পাল্লা দিয়ে৷ অথচ রূপকথা এমন ভয়ংকর চড় খেয়েও নির্বিকার। সে বাবার হাতে শক্ত চড় খাওয়ার পর পর ই গিয়ে ভাত নিয়ে বসেছে। আজ বহুদিন বাদে বাড়িতে গরুর মাংস রান্না হয়েছে। মাসে দুই দিন তাদের বাড়ি মাংস আনা হয়। মধ্যবিত্ত সংসারে স্কুল শিক্ষক বাবার এর চেয়ে বেশি সামর্থ্যে কুলোয় না। তাই এই অমৃত কিছুতেই মিস দেয়া যাবে না। আবার কবে না কবে কপালে জোটে!
খাওয়া দাওয়া শেষ করে রূপকথা বাড়ির সামনের পুকুর পাড়ে গিয়ে বসলো। উড়ু উড়ু শুনেছে, আজ নাকি জমিদারের মেজো ছেলে এসেছে। তার বিচার সে ই করবে। রূপকথা শব্দ করে হাসে। ওই চামার করবে তার বিচার! বড়ো আশ্চর্য কারবার তো!
“কি রে রূপ? তোরে কত বার বারন করলাম এইসব করিস না। তবুও কেন এই কাম করলি, বইন?”
রহিমার কথা শুনে রূপকথা শীতল দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে। রহিমা আঁচলে চোখ মোছে।
“আমার লাইগা এই বিপদ কান্দে না তুললেও পারতি। আমি বিধবা মানুষ। পোলাডারে লইয়া একলা থাকি। তোর হইয়া তো দুইডা কথাও কইতে পারুম না রে!”
“বলতে হবে না। তুমি চুপ ই থাকো। আমি তো আর বিধবা না? আমার পোলা ও নাই। আমি ই নাহয় বলি। যাও, দোকানে যাও।”
রহিমা বলার মতো কিছু খুঁজে পেল না। সে ধীরপায়ে চলে গেল দোকানের দিকে৷
রূপকথা দুই হাতে পিছনে নিয়ে মাটিতে ভর দিয়ে পা দোলায়। ওসব বিচার টিচার নিয়ে তার কোন মাথা ব্যথা নেই। দুই মাস পরে সে ঢাকা চলে যাবে৷ ওখানেই হোস্টেলে থাকবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে সে৷ এই গ্রামে পঁচে মরার মেয়ে সে না৷ আর ওই জমিদারের পোলা? হারামজাদা রে কুত্তায় খাক। ওই খবিশের চেহারা দেখলেই তো এক বস্থা লবণ খেয়ে মরে যেতে ইচ্ছে করে। বদমায়েশ টা দেখতেই আস্তা শয়তানের মতো। থুউউউ!
রূপকথা মাটিতে একদলা থুতু ফেলল। ওই কুত্তার মুখের উপর বমি করতে পারলে মনের জ্বালা জুড়াতো। শালা জালিমের বংশধর একটা।
এক অজানা কারণে রূপকথা শেহরোজ কে ভীষণ অপছন্দ করে। একবার তো রাতের আধারে জমিদার বাড়ি গিয়ে শেহরোজের ঘরে বিষাক্ত সাপ ছেড়ে এসেছিল। মখমলের মতো ভাগ্য নিয়া জন্মাইছে হারামজাদা। সাপের কামড় খেয়েও দিব্যি বেঁচে আছে! এদিকে ওই আবু জাহেলের বংশধরের পোষা লাঠিয়াল বাহিনীর খপ্পরে পরে তার জান যেতে বসেছিল। একটুর জন্য পালিয়ে বেঁচেছে সে। সে তো সুযোগেই আছে। একবার বদমায়েশের মুখোমুখি হতে পারলেই হবে শুধু। ওর বাপ দাদার জমিদারির ঠাটবাট সোজা পশ্চাতে দিয়ে দিবে সে।
রূপকথা কিটকিটিয়ে হাসে।
“জমিদারের পোলা, আজ তোমাকে খেলে দেয়া হবে। জাস্ট ওয়েইট এন্ড ওয়াচ!”
****
জমিদার শাহ আকবর শেখের নির্মিত বাড়ি “জমিদার শাহ ভবন”। আকবর শেখ শেহরোজের দাদার বাবা। বেশ বনেদি পরিবার শেহরোজের। বড় ভাই শাহ আলম শেখ এখানেই থেকে বাপ দাদার জমিদারি সামলায়। শেহরোজ ঢাকায় ব্যবসা করে। ঢাকায় বেশ কয়েকটা জুতোর কারখানা আছে তার। এছাড়া গাড়ির বিজনেস সহ বিভিন্ন ম্যাকানিকাল পার্টের বিজনেস করে সে। ঢাকায় তার নিজের দুটো বাড়ি আছে। ওগুলো ভাড়ায় দেয়া। ওখানে সে থাকে না। নিজে থাকার জন্য একটা বিলাশ বহুল ফ্ল্যাট কিনেছে সে। সেখানেও সে থাকে না! ওটা খালি ই পড়ে আছে। সে সারাক্ষণ অফিসে পড়ে থাকে৷ অফিসের কেবিনে একটা ছোট খাট রাখা আছে। কাজ শেষে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে। বেশিরভাগ দিন একই কাহিনী। বলা চলে, আদ্যোপান্ত একজন কাজ পাগল মানুষ সে৷
শেহরোজের ছোট ভাই সাদমান পড়াশোনার জন্য দেশের বাইরে থাকে।
***
সন্ধ্যা হতেই একে একে দুই পরিবার হাজির হলো জমিদার বাড়ির বৈঠকখানায়। শেহরোজ এখনো বাড়ি ফিরে নি৷ রূপকথা মাথায় ঘোমটা টেনে লম্বা হাই তুললো৷ আসার আগে তার মা নিজ হাতে ভাত মেখে খাইয়ে দিয়েছে। কে জানে বিচারে কি হয়! তাই অশান্তি হওয়ার আগেই মেয়েকে খাইয়ে দাইয়ে তাজা করে পাঠিয়েছে সে।
রূপকথার বাবা নিয়াজ মাস্টার একজন আদ্যোপান্ত ভদ্রলোক। এমন ভালো মানুষের ঘরে যে এমন হাড় বজ্জাত মেয়ে কিভাবে হলো, তা ই তো কারোর মাথায় আসে না।
সুমনা একপাশে মুখ গোমড়া করে বসে আছে। তার স্বামী মাদবর মোখলেস আলী দাঁড়িয়ে আছে তার পাশেই । তার মুখে কুটিল হাসি। আজ ওই অজাত কে বাগে পাওয়া গেছে। ওই ইবলিশটার জন্য রহিমা রে হাত করতে পারতাছে না সে! নইলে কবেই বিছানায় নিয়ে ভোগ করা হয়ে যেত! এই মহল্লার বিধবা ডিভোর্সিদের একমাত্র ভরসা তো সে, এই মোখলেস আলী। সে ছাড়া আর কেউ আছে নাকি দেখার? বিধবা মানুষ! স্বামীর সোহাগ পায় না কত বছর? সে যদি সেই অভাব টা পূরণ করে, তাতে ওই মেয়ের এতো জ্বালা কিসের? তার কাছে তো আর যায় নি? অবশ্য সেই স্পর্ধা তার কোনদিন ও হবে না। রূপকথা তার রূপের মতোই বিধ্বংসী। জ্বালিয়ে খাক করে ছাড়বে।
শেহরোজ এলো আধঘন্টা পরে। রূপকথার মেজাজ ততক্ষণে তেতে জ্বালামুখী হয়ে আছে৷ শেহরোজ কে দেখে সে হনহন করে তার মুখোমুখি সোফায় গিয়ে বসলো। দাঁড়িয়ে থেকে থেকে পা টনটন করছে।
রূপকথার এহেন স্পর্ধা দেখে সবার মাঝে গুঞ্জন শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই। শেহরোজও বিরক্তিতে কপাল কুচকে ফেলেছে। নাহ! মেয়েটা তো আস্তো বেয়াদব! ভদ্রতা এর ধাতে নেই বুঝতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না তার।
শেহরোজ শান্ত ভাবে গিয়ে বসলো। অতঃপর শীতল গলায় বলল,
“উঠে দাঁড়াও।”
রূপকথা শুনলো না৷ সে পায়ের উপর পা তুলে দাম্ভিক ভঙ্গিতে বসে বলল,
“জমিদার বাড়িতে কি ভদ্রতার চল নেই? বাড়ি আসা অতিথির সাথে এভাবেই আচরণ করা হয় বুঝি?”
“তুমি অপরাধী। অতিথি নও।”
রূপকথা হেসে ফেললো।
“তা আমাকে অপরাধী সাব্যস্ত করলো টা কে? আপনি? কোন অধিকারে?”
শেহরোজের চোয়াল শক্ত হচ্ছে ধীরেধীরে। রূপকথার বাবা মেয়ে কে ধমকে উঠলেন। মোখলেস আলী হায় হায় করে বলল,
“দেখছেন জমিদার সাব? দেখছেন? এই মাইয়া একটা আগাগোড়া বেয়াদব, অসভ্য। গেরামের অন্য মাইয়া গুলাও ওরে দেইখা খারাপ হইয়া যাইবো। আইজ এর একটা বিহিত আপনের করাই লাগবো।”
“তুমি কি আমাকে হুকুম দিচ্ছো, মোখলেস?”
শেহরোজের গলার ধার শুনে চুপসে গেল মোখলেস আলী। সে এভাবে বলতে চায় নি।
“ভুল বুঝবেন না জমিদার সাব। আমি আপনের কাছে এইডা অনুরোধ হিসেবে রাখছি।”
শেহরোজের বিরক্তি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। সে নিয়াজ মাস্টার কে চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে বলল,
“আপনি বসুন মাস্টার সাহেব।”
রূপকথা নির্বিকার ভাবে হাই তুলছে। নিয়াজ সাহেব বসতেই শেহরোজ গম্ভীর গলায় বলল,
“রূপকথা, তোমার নামে অভিযোগ আছে। তুমি মোখলেসের বউ কে অসভ্য ভাষায় অপমান করেছো। তোমার এই কার্যকলাপ আজকের নয়। তুমি রাস্তাঘাটে সবার সাথেই এহেন অপমান সূচক আচরণ করো। এটা তো মেনে নেয়া যায় না। এই ব্যাপারে তোমার কি মত?”
রূপকথা নিস্পাপ গলায় বলল,
“আমি তো ঠাট্টা করেছিলাম মাত্র। সবাই করে, আমি করলেই দোষ!?”
শেহরোজ শান্ত গলায় বলল,
“তুমি শিক্ষত মেয়ে। তোমার কাছ থেকে এমন আচরণ আশা করা যায় না। তোমার বাবা একজন শিক্ষক। তার মেয়ে হয়ে তুমি এমন অসভ্যের মতো আচরণ করলে তার মান সম্মান কোথায় থাকে? তা কি ভেবেছো একবার?”
রূপকথা এবার সোজা হয়ে বসলো। শেহরোজের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখুন, আমার অতো সময় নেই যে আমি যেচে পড়ে গিয়ে মানুষের মেয়ে বউদের সাথে মশকরা করবো। আমি তো জাস্ট কৌতূহল থেকে জানতে চেয়েছিলাম৷ এই যে, সুমনা ভাবির স্বামী মোখলেস। এই হারামজাদা প্রতিদিন রহিমা বুর চায়ের দোকানে গিয়ে দুধ চা চায়। রহিমা বু গরীব বিধবা। সে জানে, রহিমা বু শুধু রং চা বিক্রি করে। তবুও সে গিয়ে চায় দুধ চা। রহিমা বুর পাঁচ বছরের ছেলেটা যদি বলে দুধ নাই। তখন এই ইতর টা দাত বের করে বিশ্রী ভাবে হাসতে হাসতে বলে, তোর মায়ের আছে তো দুইটা৷ ওইখান থাইকা নিয়া আয়!”
রূপকথার সহজ স্বীকারোক্তি। মোখলেস সহ সবার মুখের রঙ উড়ে গেছে। রূপকথা পুনরায় বলল,
“আমি তো ওইখানেই ওর মেশিন বরাবর লাথি দিতে চেয়েছিলাম। পরে আবার ভাবলাম, হতে পারে হারামজাদা বাড়িতে এমনেই চা খায়! তাই জানতে চাইছি আর কি। এইখানে আমার দোষ কই?”
শেহরোজ কঠোর চোখে তাকিয়ে আছে মোখলেসের দিকে। মোখলেস আর্তনাদ করে বলল,
“সব মিছা কথা! এই মাইয়া এহন আমারে ফাসানের লাইগা এই কথা কইতাছে। এই গ্রামে আমার জন্ম হইছে। কেউ কোনদিন কইতে পারবো আমি কাউরে একটা খারাপ কথা কইছি? এই যে রহিমা এইখানেই আছে। আপনে ওরেই জিগান?”
রহিমা কাপতে কাপতে তাকালো মোখলেসের দিকে। মোখলেস চোখ দিয়েই শাসাচ্ছে তাকে। রহিমার পাঁচ বছরের ছেলেটা কিছু বলতে নিতেই রহিমা তার মুখ চেপে ধরলো। কাপা কাপা গলায় বলল,
“আমি কিছু জানি না। আমি কিছু জানি না।”
“রহিমা, তুমি বাড়ি যাও। বাকি সবাই ও যে যার কাজে যাও।”
রূপকথা তাচ্ছিল্যের চোখে তাকালো শেহরোজের দিকে। মোখলেস যে এই জমিদার বাড়ির ই পোষ্য, তা সে খুব ভালো করেই জানে।
রূপকথা উঠে দাড়ালো। একরাশ ঘৃণা নিয়ে তাকালো শেহরোজের দিকে। তার এবার সত্যি সত্যিই বমি পাচ্ছে। এই ঘৃণিত মানুষ টা কে দেখে ঘৃণায় গা গুলিয়ে উঠছে তার।
“চলো বাবা। এখানে আর দাঁড়িয়ে থেকে কাজ নেই৷ দিনশেষে মালিক তার পোষা কুকুর কে আগলে রাখবে, এটাই তো স্বাভাবিক।”
“দাঁড়াও। মাস্টার সাহেব, রূপকথার সাথে আমার কিছু কথা আছে। একান্তে। আপনার অনুমতি চাই।”
নিয়াজ মাস্টার কে বিভ্রান্ত দেখালো৷ রূপকথা বাবার দিকে তাকিয়ে ইশারায় আস্বস্ত করলো তাকে। অতঃপর পুরো বৈঠকখানা খালি করে একে একে বেরিয়ে গেল সবাই।
“খুব দেমাগ তোমার? তাই না?”
রূপকথা হাসে।
“এটা কে দেমাগ নয়, সাহস আর আত্মসম্মান বলে জমিদার।”
শেহরোজ এবার অধর বাকিয়ে হাসলো। পায়ের উপর পা তুলে বসে দাম্ভিক গলায় বলল,
“তোমার এই ঔদ্ধত্যের জন্য কি পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে, কোন ধারণা আছে তোমার?”
“কুকুর কামড়াবে জেনেও কুকুর কে লাথি মারা টা আমার সখের মধ্যে পরে। আপনি ও ভিন্ন কিছু নন।”
“যোগ্যতা বুঝে কথা বলো মেয়ে!”
শেহরোজের চিৎকারে দেয়ালগুলো ও যেন কেপে উঠেছে। কিন্তু রূপকথা অবিচল৷ তার নাকের পাটা ফুলে উঠেছে। এমনিতেই তার মুখের লাগাম নেই বললেই চলে। তার উপর এই কুকুর আবার ঘেউ ঘেউ করছে। এখন যদি সে বিশ্রী ভাষায় গালি দেয়? তখন তো এই অজাতের বংশধর তাকেই দোষ দিবে!
শেহরোজ ফুসতে ফুসতে বলল,
“এই বাড়ির দাসী হওয়ার যোগ্যতা আছে তোমার? সেই তুমি আমার সাথে, এই শেহরোজ শেখের চোখে চোখ রেখে বেয়াদবি করে যাচ্ছো! আর একটা নালিশ তোমার নামে এলে ঘাড় ধরে এলাকা থেকে বের করে দেবো।”
ব্যস, রূপকথার বেঁচে থাকা ধৈর্য টুকুও কর্পূরের মতো উঁড়ে গেল। সে শেহরোজের চেয়ে দ্বিগুণ জোরে চেচিয়ে বলল,
“গরু চোরের বাচ্চা। আরেকবার আমার উপর চিৎকার করলে তোর মুখে কচু গুজে দিবো। তুই আমারে এলাকা থেকে বের করার কে রে? তোর বাপের জায়গায় থাকি? সরকার কে ট্যাক্স দিয়ে এই দেশে থাকি। তোর চৌদ্দপুরুষ এই এলাকার মানুষ কে শোষণ করে আসছে। এখন তোরা ভাইয়েরা ভাইয়েরাও একই কাজ করতেছোস। তোর দাদা ছিল বিখ্যাত চোরাকারবারি। তোদের ইতিহাস কিছু জানি না ভাবছোস? বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোদের প্রত্যেকের কাপড় খুলে পুরো এলাকায় সার্কাস দেখায় দিব। বদমায়েশের জাত, আমার সাথে চোটপাট! জিভ টেনে ছিড়ে ফেলবো তোর। তোর বাপের টা খাই রে হারামজাদা? তুই আমারে শাসন করার কে? আমার বাপ নাই? আমার বাপ থাকতে তুই আমার বিচার করার কে রে চোরাকারবারির নাতি?”
শেহরোজ যেন কথা বলতেও ভুলে গিয়েছে। নিয়াজ মাস্টার মেয়েকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, আর বার বার ক্ষমা চাইছে শেহরোজের কাছে। কিন্তু রূপকথার মুখ বন্ধ হলে তো? সে একের পর এক গালি দিয়েই যাচ্ছে শেহরোজ কে। তার গালি থেকে বাদ যাচ্ছে না কবরে শুয়ে থাকা জমিদারেরাও। শেহরোজ চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস টানলো। নাহ! এই মেয়েকে শিক্ষা না দিয়ে সে এই গ্রাম ছাড়বে না। এর শেষ সে দেখে ছাড়ব