ফন্ট সাইজ:
থিম:
জেহের ই ইস্ক

৫ম পর্ব

লেখক: সানজিদা বিনতে সাফি

#জেহের_এ_ইস্ক ৫

#সানজিদা_বিনতে_সফি
শেহরোজ গাড়িতে বসে একমনে নিজের ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে। আজগর একটা ছবি পাঠিয়েছে। যেখানে পুরো খামারবাড়ি জ্বলছে৷ আর সেই আগুনের সামনে দা হাতে দাঁড়িয়ে আছে রূপকথা নামক বিধ্বংসী রমণী।  
রূপকথার এই রূপ দেখে শেহরোজের বুক কি কাপে নি একবারও? কয়েক মুহুর্তের জন্যও কি থমকায় নি দৃষ্টি? শেহরোজ পুরো টা পথ ছবিটার দিকে তাকিয়েই এসেছে৷ ওদিকে প্রায় কোটি টাকার সম্পদ তার পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সেই চিন্তা এখন আর ভাবনায় জায়গা করতে পারছে না তার। তার ভাবনা ঘিরে শুধু একটা অস্পষ্ট মুখ। রূপকথা!
শেহরোজ যখন গ্রামে পৌছালো, তখন প্রায় ভোর হয়ে এসেছে। খামারবাড়ির আগুন নিভেছে সবার প্রচেষ্টায়। তবে ততক্ষণে শেহরোজের পুরো পরিকল্পনা উলটে গেছে। গ্রামের সবার সামনে এখন রূপকথা ভিক্টিম। তার গায়ে স্পষ্ট ক্ষত। শরীরের বিভিন্ন স্থান পুড়ে লাল হয়ে গেছে। চোখ মুখের অবস্থা ভয়ংকর। অবশ্য এ হবার ই কথা। গত দুই দিন দানা পানি কিচ্ছু পেটে পড়েনি তার। তবুও এই মেয়ে তার প্রশিক্ষিত হিংস্র লাঠিয়াল বাহিনী কে নাস্তানাবুদ করে পুরো বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে বসে আছে৷ এটা কি সত্যিই মেয়ে মানুষ! শেহরোজ হিসেব মেলাতে পারে না। পুরো খামারবাড়ি তে লোকজন গিজগিজ করছে। কিছু হাস মুরগী পুড়ে মারা গেলেও গরু গুলো সব অক্ষত আছে। রূপকথা প্রচন্ড রাগে আগুন লাগিয়ে দিলেও পরে আর স্থির থাকতে পারেনি। বোবা প্রাণীগুলোর তো কোন দোষ নেই। ওই জালিমদের শাস্তি তারা কেন ভোগ করবে? তাই দা নিয়ে ছুটে গিয়ে দড়ি কেটে দিয়েছে তাদের। এতে সে নিজেও পুড়ে গেছে অনেকটা। তবুও শান্তি!
শেহরোজ খামার বাড়ি পা রাখতেই বুঝতে পারলো গ্রামের লোক ক্ষেপে আছে। সামনেই নির্বাচন। এইবার নির্বাচনে সে এমপি পদপ্রার্থী হতে যাচ্ছে৷ তাই কিছুতেই কোন মেয়ে জনিত কেলেংকারী তে জড়ানো যাবে না। হিসেব করে পা ফেলতে হবে। 
“শেখ সাব, এই মাইয়া এইখানে কেমনে আইলো?”
রফিক উদ্দিন, গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ একজন লোক। সবাই তাকে ভীষণ সম্মান করে৷ শেহরোজ তার প্রশ্ন শুনে অবাক হওয়ার ভান করে বলল, 
“আমি নিজেও তো কিছু বুঝতে পারছি না চাচা। আমি তো ঢাকা ছিলাম। আগুন লাগার কথা শুনেই না ছুটে এসেছি।”
নিয়াজ মাস্টার রূপকথা কে আগলে ধরে বসে আছে। রুপা বেগম মেয়ের মাথায় পানি ঢালছে আর কাদছে। 
রফিক উদ্দিন মাথা দোলালো। শেহরোজ ঢাকা ছিল একথা মিথ্যে নয়। তবে রূপকথার এখানে থাকাটাও তো স্বাভাবিক বিষয় নয়। কেউ না কেউ তো তাকে এখানে নিয়ে এসেছে? কিন্তু কে সে?
রূপকথা আধো অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। শাহ আলম শেখ সেখানেই উপস্থিত। তবে শেহরোজের হয়ে সে কোন কথা বলল না। কোন ভাবে শেহরোজ এই ঝামেলায় ফেঁসে গেলে নমিনেশনে তার নামের সীলমোহর পাকাপোক্ত হয়ে যাবে। তাই যতটা সম্ভব গা বাঁচিয়ে চলতে হবে।  
শেহরোজ পরিস্থিতির উষ্ণতা আঁচ করতে পারলো। মেয়েটা তাকে ফাসানোর জন্য ছক করেই রেখেছে। তবে সেও কোন কাচা খেলোয়াড় নয়। মনে মনে হাসে শেহরোজ। অথচ মুখে অসহায়ত্ব ফুটিয়ে নরম স্বরে বলে, 
“আজগর কোথায়? আজগর!”
শেহরোজের হাকডাক শুনে আজগর সামনে এসে দাঁড়ালো। শেহরোজ ছদ্ম রাগ দেখিয়ে বলল, 
“কোথায় ছিলি তুই? আর এই মেয়ে এখানে এলো কি করে?”
আজগর চোখ নামিয়ে শেহরোজের শেখানো বুলি পটপট করে বলল,
“ভাই, আমি তো কিছুই বুঝতাছি না। আমরা তো সবাই ঘুমাই ছিলাম। পোড়া গন্ধে ঘুম ভাঙ্গতেই দেখি বাইরে আগুন। দরজা খুলতে গিয়া দেখি দরজা বাইরে থেইক্কা লাগাই দিছে কেউ। আপনে রফিক চাচা রে জিগান? হেয় নিজে আমাগো দরজা খুইলা দিছে!”
রফিক উদ্দিন মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে বলল,
“হ, আজগর ঠিক কইছে। আমিই দরজা খুইলা দিছি। তাহাজ্জুদ পড়তে উইঠা দেখি বিলের মাঝখানে বিশাল আগুন! আমি মনে করছি আমাগো ধানের জমিতে আগুন লাগছে। লোকজন লইয়া আইয়া দেখি এই অবস্থা!”
শেহরোজ মনে মনে হাসলো। তার দৃষ্টি অধোচেতন রূপকথার দিকে স্থির। মেয়েটার সাহস তাকে বিস্মিত আর মুগ্ধ দু'টো ই করছে৷ এই মেয়ে খেলতে চাইছে৷ বিশেষ করে তার সাথে। শেহরোজ এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছে, এই মেয়ের কোন উদ্দেশ্য আছে। কোন একটা কিন্তু আছে তার ভেতরে। শেহরোজ দেখতে চায়। পুরোটা খেলায় সমান তালে খেলতে চায়৷ এবং প্রতিটি খেলায় মাত দিয়ে আরো চটিয়ে দিতে চায় এই রূপকথা নামক ধ্বংসযজ্ঞ কে। 
গ্রামবাসীর মাঝে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। তবে কি জমিদারদের কোন শত্রু এই কাজ করেছে? রূপকথা কে ব্যবহার করে ফাসাতে চাইছে জমিদারদের? কেউ কেউ বলছে রূপকথা নিজেই এসব করেছে জমিদারদের থেকে নিজের অপমানের বদলা নিতে।  
শেহরোজ আস্তেধীরে হেটে রূপকথার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। রূপকথার সামনে পায়ের উপর ভর দিয়ে বসে ঘাড় কাত করে দেখলো রূপকথার মুখের দিকে। অতঃপর চিন্তিত গলায় বলল, 
“মেয়ে টাকে তো সুস্থ মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে ওর সাথে খারাপ কিছু ঘটেছে। আপনারা ওকে দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। ব্যাপার টা রেইপ কেইস হতে পারে।”
উপস্থিত সবাই শিউরে উঠল। এরমানে রূপকথা কে কেউ,,,,! সবার মাঝে গুঞ্জন শুরু হলো জোরেসোরে। কারোর তোয়াক্কা না করে শেহরোজ নিজেই কোলে তুলে নিলো রূপকথা কে। নিয়াজ মাস্টার কে তাগাদা দিয়ে বলল,
“মাস্টার সাহেব, আমার সাথে আসুন। আমি ওকে হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি। ব্যাপার টা পুলিশ কেস। তাই প্রমাণ মুছে যাওয়ার আগেই মেডিকেল এক্সামিনেশান করা প্রয়োজন।”
নিয়াজ মাস্টার কথা বলার সুযোগ পেল না। তার আগেই শেহরোজ রূপকথা কে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠে বসেছে। 
****
পুরো এলাকায় রূপকথার ধর্ষণের ব্যাপার টা রটে গিয়েছে। সবার মুখে একই কথা।
শেহরোজের গাড়ি ধুলো উড়িয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ছুটছে। গাড়ির পেছনের সিটে আধো অচেতন রূপকথা। তার মাথা নিয়াজ মাস্টারের কোলে। পাশে রুপা বেগম ডুকরে কাঁদছেন। রূপকথার পোড়া খত আর ক্লান্ত, শীর্ণ অবয়ব দেখে নিয়াজ মাস্টারের বুক ফেটে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। 
শেহরোজ স্টেয়ারিং এ হাত রেখে এই সমস্ত দৃশ্য গাড়ির লুকিং গ্লাসে দেখতে দেখতে শেহরোজের ঠোঁটের কোণে এক কুটিল ও রহস্যময় হাঁসি ফুটে উঠলো।
​শেহরোজ খুব ভালো করেই জানে, সে যে চালটি চেলে এসেছে, তা মাস্টারস্ট্রোক। রূপকথাকে বাঁচানোর নাম করে সে তাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। যদি হাসপাতাল পর্যন্ত বিষয়টি গড়ায়, তবে ডাক্তারি পরীক্ষাতেই সত্য বেরিয়ে আসবে। আর তাতে গ্রামের লোক রূপকথাকেই মিথ্যাবাদী, চরিত্রহীন প্রমাণের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে, ধর্ষণের গুজব ছড়িয়ে দেওয়ায় আপাতত এখানেই থাকতে হবে রূপকথা কে। তার আশ্রয় ই হবে রূপকথার শেষ ভরসা। 
​গাড়ি থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছাতেই শেহরোজের অনুগত আজগর দৌড়ে গিয়ে স্ট্র্যাচার নিয়ে এলো। শেহরোজ নিজেই রূপকথাকে পাঁজাকোলা করে জরুরি বিভাগে নিয়ে গেল। ডাক্তার আর নার্সরা তড়িঘড়ি করে রূপকথাকে ভর্তি করে নিল সাথে সাথেই। 
​জরুরি বিভাগের বাইরে করিডোরে দাঁড়িয়ে নিয়াজ মাস্টার কাঁপা গলায় বললেন, 
“শেখ সাব, আমার মা যদি কোনো ভুল কইরাও থাকে, তাও তার ওপর এই অন্যায় কে করল?”
​শেহরোজ অত্যন্ত সহানুভূতির অভিনয় করে নিয়াজ মাস্টারের কাঁধে হাত রাখল,
 “মাস্টার সাহেব, আপনি ভেঙে পড়বেন না। গ্রামে আপনাদের অনেক শত্রু আছে। রূপকথা মেয়েটা জেদি, হয়তো কারো সাথে তর্ক করেছিল। পুলিশ আসছে, আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব মেডিকেল রিপোর্ট ক্লিয়ার করাব। অপরাধী রক্ষা পাবে না। তাছাড়া এখনবের সাথে আমার খামারবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি ও জড়িয়ে আছে৷ আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”
নিয়াজ মাস্টার ধপ করে বসে পরে। তার মেয়ের এ-ই হাল! সে কি করে নিশ্চিন্ত থাকবে? 
​ভিতরে রূপকথার স্যালাইন চলছে। স্যালাইনের ওষুধের প্রভাবে তার অচেতনতা কিছুটা হালকা হতে শুরু করে। চোখের পাতা দুটো যেন হাজার মনের বোঝা হয়ে আছে, তবুও রূপকথা অলসভাবে চোখ মেলল। ধোঁয়াটে ভাব কেটে চোখের সামনে ভেসে উঠল হাসপাতালের সাদা সিলিং। 
​শেহরোজ ডাক্তারের ঘর থেকে বের হয়ে একাকী ওয়ার্ডে ঢুকল। রূপকথার বেডের পাশে এসে ঝুঁকলো। তার কণ্ঠস্বর এখন আর সেই লোক দেখানো নরম বা সহানুভূতিশীল নেই। সেখানে বিরাজ করছে তীব্র অহংকার আর চ্যালেঞ্জ।
​“কী ভেবেছিলে? খামারবাড়িতে আগুন দিয়ে, গায়ের চামড়া পুড়িয়ে আমাকে ফাঁদে ফেলবে?” 
শেহরোজ হাসলো। রূপকথার একদম কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
 “তোমার এই বিধ্বংসী রূপ দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি রূপ। কিন্তু খেলার শেষ দানে এসে তুমি মাত খেয়ে গিয়েছো। পুরো গ্রাম জানে, তুমি এক নির্যাতিতা ভিক্টিম। তোমার সততা, তোমার অহংকার, তোমার লড়াই সব এক নিমেষে একটা গুজবের নিচে পিষে গিয়েছে। এখন কি হবে তোমার! কে বিয়ে করবে তোমাকে? সবাই তো তোমাকে নোংরা ভেবে নাক সিটকাবে রূপ! কি করে কাটাবে বাকি জীবন টা?”
শেহরোজের ব্যাঙ্গাত্মক রসিকতায় রূপকথার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। শেহরোজ রূপকথার গালে লেপ্টে থাকা এলোমেলো চুল গুলো সরিয়ে দিয়ে হিসহিসিয়ে বলল, 
“চিন্তা করো না রূপ। আমি আছি তো? আমি তোমাকে রেখে দিবো না হয়! জমিদার বাড়ি দাসী পোষা পুরনো ঐতিহ্য। তুমি নাহয় এক কোণে পড়ে থাকবে। তোমার ভাত কাপড়ের দায়িত্ব আমার। আর যদি অন্য কোন চাহিদা থাকে তো, ফিল ফ্রী টু বি মাই মিসট্রেস।”
​রূপকথা দুর্বল শরীর নিয়েও শেহরোজের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরলো। তার শুকনো, ফেটে যাওয়া ঠোঁট দুটো অপমান আর ক্ষোভে কেঁপে কেঁপে উঠছে। চোখ দুটোতে জ্বলছে আগ্নেয়গিরির লাল আগুন।
​খাদ্য ও পানির অভাবে তার গলার স্বর ফুটছিল না, তবুও সে তীব্র ঘেন্নায় চিবিয়ে চিবিয়ে ফিসফিস করে বলল,
 “শেহরোজ শেখ, তোর মতো কুত্তা কে এই রূপকথা থু ও দেয় না। তোর বাপ ধর্ষক, তোর ভাই ধর্ষক, তোর চোদ্দগুষ্টির সব পুরুষ বেশ্যাবাড়ির রেগুলার কাস্টমার ছিল। তুই ই বা ভিন্ন হবি কিভাবে? তোর তো রক্তেই ভেজাল৷ তবে আমাকে কলংকিত করে এতো সহজে পাড় পাবি না তুই। আজ আগুন তোর খামারে লেগেছে। খুব শীঘ্রই তোর রক্তে আর তোর অহংকারেও লাগবে। তোকে রাস্তার নেড়িকুত্তা বানিয়ে ছাড়বো আমি। ধর্ষণ করেছিস না? ঠিক আছে। এইবার হজম পরিণতি হজম করার জন্য তৈরি হ।”
​শেহরোজ রূপকথার হাতের বাঁধন আলতো করে ছাড়িয়ে নিয়ে হেসে উঠল। রূপকথার এই অপরাজিত হিংস্র চোখের চাহনিই শেহরোজকে এক অদ্ভুত মানসিক উত্তেজনা দিচ্ছে। এই মেয়েকে ভাঙা অত সহজ নয়, আর শেহরোজও সেটাই চায়। সহজ শিকারের তার কোনো আগ্রহ নেই।
“তবে যাই বলো, তুমি আগুন সুন্দরী! আরো কয়েকবার কাছে পেলে মন্দ হতো না৷”
রূপকথা নিজের দুর্বল হাতেই জোরেশোরে চড় বসালো শেহরোজের গালে। শেহরোজ এক মুহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। পরপর ই শক্ত হাতে গলা চেপে ধরলো রূপকথার। 
শেহরোজের হাতের চাপ রূপকথার গলায় শক্ত হতে থাকে। রূপকথার শ্বাসনালী চেপে আসলেও তার দৃষ্টি থেকে ভয় বা অনুশোচনার কোনো ছাপ ফুটে উঠলো না। বরং তার চোখ দুটোতে তখন শুধুই শেহরোজের জন্য চরম ঘৃণা আর এক পৈশাচিক জয়ের উদযাপনের ঝলক।
​শেহরোজ নিজের চোখ দুটো ছোট ছোট করে ফিসফিস করে বলল,
“তোর এত বড় সাহস? শেহরোজ শেখের গায়ে হাত তুলিস তুই? তুই জানিস না, এই হাতের একটা ইশারায় তোকে আর তোর পুরো পরিবারকে শ্মশানে পরিণত করতে পারি আমি?”
​রূপকথা কষ্ট করে একটু হাসল। অবরুদ্ধ গলা দিয়েই অস্পষ্ট স্বরে বলল, “তাহলে মার!গলা টিপে মেরে ফেল আমাকে। কিন্তু শেহরোজ শেখ, তুই তো একটা কাপুরুষ! একটা মেয়েকে বেহুশ করে তার ইজ্জত লুটে নেয়া নপুংসক তুই।”
প্রচন্ড রাগে শেহরোজের হাত আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরলো রূপকথার গলা। রূপকথা আটকে যাওয়া গলায় বলল, 
“আজ তুই বাইরে বের হয়ে দেখবি তোর খেলাটা কীভাবে উল্টে গিয়েছে।”
​কথাটা শুনে শেহরোজের আঙুলগুলো এক মুহূর্তের জন্য শিথিল হয়ে এলো। সে রূপকথার মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা তো সাধারণ কোনো গ্রামের সরল মেয়ে নয়। এই মেয়ে প্রচন্ড ধূর্ত৷ সে যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়েই তাকে চ্যালেন্জ ছুড়ে দিয়েছে তা বুঝতে অসুবিধা হলো না শেহরোজের। 
​ঠিক তখনই ওয়ার্ডের দরজায় পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। আজগর হাঁপাতে হাঁপাতে ভেতরে ঢুকে দ্রুত বলল, “ভাই! পুলিশ আইসা পড়ছে। লগে রফিক চাচা আর গ্রামের আরো কয়েকজন মুরুব্বিও আইছে। ডাক্তার সাব রূপকথার রিপোর্ট করনের লাইগা পারমিশন চাইতাছে।”
​শেহরোজ চট করে রূপকথার গলা থেকে হাত সরিয়ে নিল। নিজের পোশাকটা হালকা গুছিয়ে নিয়ে এক পা পিছিয়ে দাঁড়াল। তার মুখের হিংস্রতা মিলিয়ে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে সেখানে ফুটে উঠল এক সুচতুর ঠাণ্ডা ও শান্ত অভিব্যক্তি।
​সে রূপকথার দিকে ঝুঁকে শেষবারের মতো নিচু গলায় বলল, “খেলবি যখন, শেষ পর্যন্ত খেল। কিন্তু মনে রাখিস, জমিদার বাড়ির খাঁচায় বন্দী পাখিকে ডানা কেটেই রাখা হয়। এই হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর তোর একমাত্র গন্তব্য হবে আমার ওই বিশাল শেখ বাড়ি। তোর রূপের অহংকার আমি নিজের হাতে গুঁড়িয়ে দেব।”
​রূপকথা চোখ বন্ধ করে রইল, কোনো উত্তর দিল না। তবে মনে মনে সে প্রস্তুত। আগুন যখন জ্বলতে শুরু করেছে, তখন সেই আগুনে শুধু খামারবাড়ি নয়, শেহরোজ শেখের সমস্ত রাজত্ব আর অহংকার ছাই হওয়া পর্যন্ত সে থামবে না।
পুলিশ এসে রূপকথার বেডের পাশে দাঁড়ালো। নিয়াজ মাস্টার, রুপা বেগম সহ গ্রামের মান্যগণ্য মুরুব্বিরাও উপস্থিত৷ 
পুলিশ কেবিনা থাকা টুল টায় বসে নরম গলায় বলল, 
“তোমার সাথে কি হয়েছিল মা? আমাদের সব কিছু খুলে বলো। কে তোমার এই হাল করেছে?”
রূপকথা ডুকরে কেঁদে উঠলো। আড়চোখে একবার তাকালো শেহরোজের দিকে। শেহরোজ শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে। যেন নাটকের পরের দৃশ্য দেখার অপেক্ষায় সে। 
রূপকথা নিজের কান্নার দমক কমিয়ে আটকে যাওয়া গলায় শেহরোজের দিকে আঙ্গুল তুলে বলল, 
“শেহরোজ শেখ। শেহরোজ শেখ আমাকে পরশু রাতে তার সাঙ্গপাঙ্গ দিয়ে তুলে নিয়ে গিয়েছিল খামারবাড়ি তে। সেদিন রাতেই সেখানে সে আমাকে ধর্ষণ করে।”
শেহরোজ আগের মতোই শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে। তার ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট বাকা হাসি। 
পুলিশ অফিসার শেহরোজের দিকে তাকাতেই শেহরোজ আশ্চর্য হবার ভান করে বলল, 
“এসব তুমি কি বলছো মেয়ে! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি যদি তোমার সাথে ওরকম জঘন্য কাজ করেই থাকি, তাহলে আমি কেন তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসবো? কেন ই বা পুলিশে খবর দেবো!”
সবাই শেহরোজের সাথে একমত হলো। তবে রূপকথার কথাও কেউ ফেলে দিতে পারছে না। রূপকথা কাদতে কাদতে বলল, 
“আমার কাছে প্রমাণ আছে।”
এবার শেহরোজের কপালে চিন্তার ছাপ পড়লো। রূপকথা নিজের জামার সামনের বোতাম টা ছিড়ে শেহরোজের সামনে ধরে বলল, 
“এটা হিডেন ক্যামেরা। এখানে সব কিছু রেকর্ড হয়েছে৷ আপনারা চাইলে সবাই দেখতে পারেন।”
শেহরোজ চোখ বন্ধ করে ফেললো। এই মেয়েকে মাপতে সে ভুল করে ফেলেছে। এতটা হটকারি হওয়া ঠিক হয় নি তার। মেয়েটা ঠিক তাকে ফাসিয়ে দিয়েছে! 
চলবে,,, 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন