ফন্ট সাইজ:
থিম:
জেহের ই ইস্ক

৭ম পর্ব

লেখক: সানজিদা বিনতে সাফি

জেহের_এ_ইস্ক ৭

সানজিদা_বিনতে_সফি
রূপকথা সুস্থ হলো। এর কয়েকদিন পরেই তাকে নিয়ে বিচার বসলো জমিদার বাড়ি তে৷ রূপকথার কারণে শেহরোজ শেখের অনেক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তাছাড়া রূপকথা শেহরোজ কে ফাসাতে চেয়েছে, এটাও তো দিনের আলোর মতো পরিস্কার? তাই সবাই মিলে ঠিক করেছে, এর বিচার জমিদারপুত্র ই করবে। 
শেহরোজ ঢাকায় ছিল। বিচার উপলক্ষে গ্রামে ফিরেছে সে। রূপকথার অপমানিত লাঞ্ছিত মুখটা দেখার জন্য ই তো এতদিন অধীর হয়ে অপেক্ষা করেছে সে! আজ তবে সেই কাঙ্খিত দিন টি এলো!
বাবার হাত ধরে রূপকথা যখন জমিদারি বাড়ির সীমানায় পা রাখল, ঠিক পরমুহূর্ত থেকেই যেন বদলে গেল সবকিছু। সেই অবাধ্য, উদ্যাম রূপকথা হঠাৎ অবিশ্বাস্য রকম শান্ত। আগের সেই তীব্র চিৎকার, বুক চিরে বেরিয়ে আসা ক্ষোভ, কিংবা চোখের কোণে জ্বলে থাকা প্রতিহিংসার দাহ্য আগুন, কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।
​তাকে এখন দূর থেকে দেখলে মনে হয় এক স্থির, নতজানু নদী। যে নদীর নিজস্ব কোনো জিদ নেই, কোনো বিদ্রোহ নেই। কূলের বাঁধন তাকে যেদিকেই পথ দেখাক না কেন, সে নিঃশব্দে কেবল বয়ে চলাই নিজের ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছে।
জমিদার বাড়ির উঁচু পাথুরে তোরণ পার হওয়ার সময় তার পায়ের শব্দটুকুও যেন নিঃশব্দে মিলিয়ে গেল। যে রূপকথার একটি হুঙ্কারে একসময় চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠত, আজ সে নীরবতার এক জীবন্ত মূর্তি।
​নিয়াজ মাস্টার যখন তাকে সবার সামনে নিয়ে দাঁড় করালেন, সে একবারের জন্যও চোখ তুলে তাকাল না। তার নিষ্পলক দৃষ্টি আটকে রইল ঠান্ডা মার্বেলের মেঝের ওপর। সালিসে বসা মুরব্বিদের গম্ভীর কণ্ঠের প্রশ্নগুলো যেন তার কানে পৌঁছাচ্ছিল না৷ প্রতিটি প্রশ্নের জবাবে কেবল মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানাল সে। এ এক অদ্ভুত, নির্জীব বাধ্যতা।
​গ্রামের লোকেরা দূর থেকে ফিসফিস করে বলতে লাগল, এ তো সেই রূপকথা নয়। একটা দুর্ঘটনা তার ভেতরের ঝড়টাকে নিমেষে থামিয়ে দিয়েছে? নদীর স্রোত যেমন নিজের গন্তব্য না জেনেও কেবল বয়ে চলে, রূপকথাও যেন ঠিক তেমনি নিজের ভবিষ্যৎকে এই জমিদার বাড়ির অন্ধকারের হাতে সঁপে দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
শেহরোজ পুরোটা সময় এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রূপকথার নিস্তেজ মুখের দিকে৷ হুট করেই তার ভীষণ রকম হাসফাস লাগছে৷ মেয়ে টা চিৎকার চেচামেচি করছে না কেন! কেন ই বা সব কিছু মেনে নিচ্ছে চুপচাপ? সে তো আশা করেছিল, রূপকথা হিংস্র বাঘিনীর মতো তাকে চোখের আগুনে পুড়িয়ে মারবে। তার বানানো সমস্ত নিয়ম নীতি কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সবার সামনে চ্যালেঞ্জ করবে তাকে৷ তবে? তবে কি হলো? এতো সহজেই হার মেনে নিলো সে! উঁহু, বিশ্বাস হচ্ছে না! 
 শেহরোজের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর হচ্ছে। মেয়েটার মনে কিছু তো একটা চলছে! যে মেয়ে এক মুহুর্তে তার পুরো একটা বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে রণমুর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে কি না এখন চাবি দেয়া পুতুলের মতো সব কিছু মেনে নিচ্ছে! আশ্চর্য! 
বিচার শেষে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল, রূপকথা শেহরোজের পা ধরে ক্ষমা চাইবে। যেহেতু সে মেয়ে মানুষ, তার শারীরিক ভাবে আঘাত করা মওকুফ করে পায়ে ধরার বিষয় টাতে একমত হলো সবাই৷ তাছাড়া শেহরোজের ভীষণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রূপকথার বাবা নিয়াজ মাস্টার কে সেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে৷ দুই মাসের মধ্যে শেহরোজ কে ত্রিশ লক্ষ টাকা বুঝিয়ে দিতে হবে নিয়াজ মাস্টার কে। 
শেহরোজের ঠোঁটে অদৃশ্য হাসি। রূপকথা মাথা তুলে তাকালো। শেহরোজের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, 
“ওই নরকের কীটের পায়ে ধরবো আমি? প্রশ্নই আসে না৷ আমাকে ফাঁসি তে ঝুলিয়ে দিলেও আমি ওর পায়ে ধরে ক্ষমা চাইবো না৷ ও একটা লম্পট, চরিত্রহীন। আমার সাথে কি হয়েছে, তার একমাত্র সাক্ষী আমি নিজে৷ ওই অমানুষ টা আমাকে ধর্ষণ করেছে৷”
রূপকথা গলার কাছ থেকে ওড়না টা একটানে ফেলে বলল, 
“এই যে ক্ষত গুলো দেখছেন, এগুলো এই জানোয়ারের দেয়া। ও,,,”
শেহরোজ চিলের মতো ছুটে এসে ক্ষিপ্র হাতে রূপকথার গায়ে ওড়নাটা পুনরায় জড়িয়ে দিল ৷ তার চোখ মুখ শক্ত। প্রচন্ড রাগে কপালের রগ ফুলে উঠেছে তার৷ 
শেহরোজের এহেন কান্ডে সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে। শাহ আলম শেখ ভ্রু উঁচু করে হাসলো। তাহলে এই ব্যাপার! ছোট ভাইয়ের মন এসে গেছে এই মাস্টারের মেয়ের উপর! বাহ! এ যে সোনায় সোহাগা।
শেহরোজ সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে শক্ত গলায় বলল, 
“রূপকথা আমার অপরাধী। তাই শাস্তিটাও আমি নির্ধারণ করবো।”
রূপকথা আগের মতোই চুপচাপ দাঁড়িয়ে৷ শেহরোজ একবার রূপকথা কে দেখে নিয়ে গম্ভীর গলায় ঘোষণা দিয়ে বলল,
“আজ থেকে আগামী ছয়মাস রূপকথা জমিদার বাড়ির কাজের লোক হিসেবে থাকবে। আমার দাসী হয়ে। ব্যস, আর কোন জরিমানা বা পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন নেই। এটা আমার সিদ্ধান্ত। আর রূপকথা কে আমার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে।”
রূপকথা হালকা হেসে বলল,
“আর যদি না মানি?”
“পরিণতি তুমি জানো।”
“দেশে কি আইন কানুন নেই?”
শেহরোজ রূপকথার দিকে আরেক কদম এগিয়ে গেল। চোয়াল শক্ত করে দাতে দাত চেপে বলল, 
“এই শহরে আমিই আইন, আমিই কানুন। চেষ্টা করে দেখো, আইন তোমাকে কতটুকু সাহায্য করে? দেখবে নাকি? ডাকবো পুলিশ? বৃদ্ধ বাবা মা কেও জেলের ভাত খাওয়াতে চাও?”
রূপকথার কথা হারিয়ে গেল। সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো তার বাবার দিকে। এই মানুষ টার জন্য ই তো এতকিছু! সেই মানুষ টা কে কিভাবে সে জেলের ঘানি টানাবে? রূপকথা নত হয়। তার বাবার সাধ্য নেই এতগুলো টাকা জরিমানা দেয়ার। শয়তান টা তার খেলায় ই তাকে মাত দিয়ে দিয়েছে৷ রাগ আর ক্ষোভে গলা বুজে আসতে চাইছে তার। 
রূপকথা চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস টানলো। অতঃপর শান্ত স্বরে বলল, 
“ঠিক আছে। আমি রাজি আপনার প্রস্তাবে। তবে, জমিদার বাড়ির কেউ আমার উপর হুকুম চালাতে পারবে না। অন্যায় যেহেতু আপনার সাথে হয়েছে, সেহেতু আপনার হুকুমজারি মেনে নিলেও অন্য কারোর ঘেউঘেউ সহ্য করবো না আমি।”
শেহরোজ ভ্রু উঁচু করে বলল, 
“ওকে, ডিল। তবে আজ এই মুহুর্ত থেকে তোমার এই বাড়িতে থাকার সময়কাল শুরু হলো।”
শেহরোজ উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, আপনারা এবার আসতে পারেন।”
মাদবরদের মধ্যে বেশিরভাগ ই অসন্তুষ্ট। এই একটা সুযোগ ছিল এই মেয়েকে বাগে আনার। কায়দা করে একঘরে করে দিতে পারলে আয়েশ করে হেনস্থা করা যেত। কিন্তু তা আর হলো কই? এই মেয়ের উপর জমিদার পুত্রের এতো মেহেরবানি কিসের সেটাই বুঝতে পারছে না তারা। 
সবাই চলে যেতেই শেহরোজ আর শাহ আলম শেখ ও ভেতরে চলে গেল। কিন্তু সেখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিয়াজ মাস্টার৷ ভঙ্গুর এই মানুষ টার দিকে তাকিয়ে রূপকথার ঠোঁট ভেঙ্গে কান্না এলো। বাবার গলা জড়িয়ে ধরে সে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
“কষ্ট পেয়ো না, বাবা। আমি ভালো থাকবো৷ তুমি নিজেকে সামলাও। বাড়ি ফিরে মা কেও তো তোমাকেই সামলাতে হবে? আর আমাকে দোয়া করে দাও, আমার উদ্দেশ্য যেন সফল হয়৷ ওদের ধুলোয় মিশিয়ে তবেই থামবো আমি। হয় এসপার, নয় উসপার।তুমি তো জানো বাবা, তোমার মেয়ের হারানোর আর কিছু বাকি নেই৷”
নিয়াজ মাস্টার বোবা দৃষ্টিতে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রূপকথা বাবা কে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“তৈরি হও বাবা। আমাদের বিজয় সন্নিকটে।”
নিয়াজ মাস্টার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“তুমি কেন এসবে জড়ালে মা! কেন সব ভুলে গেলে না? আমরা তো দিব্যি ভুলে গেছি, দেখো! নিজের জীবন টা তো জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়েই গেছে৷ আবার কেন আগুন জ্বালাচ্ছো?”
রূপকথা উদাস হয়ে তাকিয়ে রইল শূন্যে। নিয়াজ মাস্টার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে মেয়ের হাত ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,
“চলো, আজ রাতেই আমরা এখান থেকে চলে যাই মা! ওদের বিচার আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও। আল্লাহ কারোর উপর অবিচার করেন না। ওদের পাপের শাস্তি ওরা ঠিক পাবে৷ তুমি আর নিজেকে এভাবে শেষ করো না৷”
রূপকথা বাবার হাত থেকে নিজের হাত টা ছাড়িয়ে নিল৷ বাবার দিকে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল, 
“আমার ঘুম আসে না বাবা! আমি ঘুমাতে পারি না। বার বার মনে হয়, আমাদের পুরো পরিবার টা কে ধ্বংস করে কত শান্তিতে ই না আছে তারা! তাদের বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ নেই, অনুশোচনা নেই৷ অথচ আমদের জীবন টা তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেছে। আমরা মৃত লাশ হয়ে বেঁচে আছি৷ আমি মেনে নিতে পারি না বাবা! আমার দম আটকে আসে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়৷ বারবার মনে হয় ওই জানোয়ার টা আমার গলা চেপে ধরে আছে৷ আমি মরে যাচ্ছি বাবা, আমি মরে যাচ্ছি বাবা। 
কথাগুলো বলতে বলতে রূপকথার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল। গলার স্বরে বছরের পর বছর জমে থাকা ক্ষোভ আর যন্ত্রণা যেন কান্নার বদলে বিষাক্ত এক আগ্নেয়গিরি হয়ে বেরিয়ে আসছে। নিয়াজ মাস্টার থমকে দাঁড়ালেন। তিনি বুঝলেন, মেয়েকে আর কোনো বাঁধনে আটকে রাখা সম্ভব নয়। যে নদী একবার কূল ভেঙেছে, সে এখন সবকিছু ভাসিয়ে নিয়েই শান্ত হবে।
 নিয়াজ মাস্টার মেয়ের মাথায় একবুক হাহাকার নিয়ে শেষবারের মতো হাত রাখলেন, তারপর একপা দুইপা করে ভারী পদক্ষেপে জমিদার বাড়ির তোরণ পার হয়ে গেলেন।
​বাবা চলে যেতেই রূপকথা গায়ের ওড়নাটা শক্ত করে জড়িয়ে নিজের ভেতরটাকে পাথর করে নিল। কাঁদলে চলবে না। এখনো যে বহুপথ যাওয়া বাকি। 
​পায়ের জুতো মন্থর গতিতে মার্বেলের মেঝেশোভা পেরিয়ে বিশাল ড্রয়িংরুমের দিকে এগোতেই ওপরের তলার বারান্দা থেকে শেহরোজের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
​“নিচে দাঁড়িয়ে আকাশকুসুম ভাবলে চলবে, রূপ। দাসীর কাজ চিন্তা করা নয়, হুকুম তামিল করা।”
​রূপকথা চোখ তুলে ওপরে তাকাল। শেহরোজ একহাতে কফির মগ নিয়ে রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে একাধারে ঔদ্ধত্য আর গভীর কোনো অনুসন্ধান। রূপকথা এক চুলও বিচলিত না হয়ে ঠোঁটের কোণে বিষাক্ত এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
​“আমার কাজের তালিকাটা তবে বলেই দিন, শেহরোজ শেখ? কোথায় আগুন লাগাতে হবে বলুন? এই বাড়িতে? নাকি আপনার অই চুল্লির মতো মুখে?”
​শেহরোজের হাতের কফির কাপটা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। চোখ দুটো ছোট ছোট করে সে নেমে এলো সিঁড়ি দিয়ে। রূপকথার একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে তার চোখে চোখ রেখে থমথমে গলায় বলল,
​“ভয় হচ্ছে না? বাঘের গুহায় ঢুকে তার সামনেই লম্ফঝম্প! জানো, তোমার পরিণতি কি হতে পারে?” 
রূপকথা নিজের মুখ টা বিকৃত করে ফেলল। তাচ্ছিল্য করে বলল, 
“নিজের ঘরে দাঁড়িয়ে সব কুকুর ই নিজেকে বাঘ মনে করে।”
অতঃপর কৌতুক করে বলল, 
“বিশ্বাস করুন মনিব, আপনার চেহারায় একটা শুয়োর শুয়োর ভাব আছে। দেখলেই গা গুলোয়। নোংরা আর নাপাক মনে হয়৷ কিভাবে আপনাকে বাঘ ভাবি, বলুন তো! আপনি বরং মুখে একটা বাঘের মুখোশ পরে থাকুন৷ আজকাল বিভিন্ন খেলনার দোকানে পাওয়া যায়। এনে দিব নাকি একটা?”
শেহরোজ চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে। সে ভেবে রেখেছিল, রূপকথা কে তেমন কোন কাজ করতে দিবে না৷ কিন্তু দেখো, এই মেয়ের মুখ না, যেন রাইস মিল। মুখ দিয়েই তার ইজ্জত গুড়ো গুড়ো করে দিচ্ছে। সে রূপকথার চোয়াল শক্ত করে ধরে বলল,
​“আমাকে জ্বালাতে চাও? চেষ্টা করে দেখতে পারো, রূপ। কিন্তু মনে রেখো, আগুনে হাত দিলে হাতটাই আগে পোড়ে।”
​রূপকথা চোখ না সরিয়ে শক্ত স্বরে বলল, “যে আগেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, তার আর নতুন করে পোড়ার ভয় থাকে না।”
​শেহরোজ এক ঝটকায় তার মুখটা ছেড়ে দিল। রক্তে এক অচেনা উত্তাপ টের পাচ্ছে সে। যে মেয়েকে সে অপমানের শেষ সীমায় নামাতে চেয়েছিল, সেই মেয়ে প্রতিটি পদে তাকেই চ্যালেঞ্জ করছে! 
শেহরোজ তীক্ষ্ণ চোখে রূপকথা কে আপাদমস্তক দেখে চিৎকার করে মিলানী কে ডাকলো। মিলানী নিজের ঘরে ছিল। শেহরোজের ডাক শুনে ছুটে এলো সে৷ 
শেহরোজ রূপকথা কে দেখিয়ে দিয়ে বলল,
“আজ থেকে এই বাড়ির সমস্ত কাজ এই মেয়ে করবে। সকাল থেকে সন্ধ্যা, সব কাজ ওর থেকে পাই পাই আদায় করে নেবেন। এর অন্যথা যেন না হয়।”
মিলানী ক্রুর হেসে বলল,
“ঠিক আছে।”
রূপকথার মুখে কোন বিকার নেই৷ শেহরোজ হন হন করে নিজের রুমে চলে গেল। এই বাড়ির দ্বিতীয় তলা টা পুরো শেহরোজের দখলে। সেখানে কারোর যাওয়ার অনুমতি নেই। মিলানী শেখ রূপকথা কে আগাগোড়া দেখে কিটকিটিয়ে হাসলো। অতঃপর রুক্ষ গলায় ধমক দিয়ে বলল,
“খাঁড়ায় রইলি কেন? রান্নাঘরে গিয়ে বাসন গুলা ধুইয়া ফেল। আর শোন, রাইতে সবাই রুটি খাইবো৷ চাকর বাকর মিলাইয়া শ'খানেক রুটি বানাইতে হয় এই বাড়িতে। গরুর মাংস, আর রুটি৷ মেজো শেখ আবার মাংস খাইবো না৷ হের লাইগা দেশি মুরগী ভুনা করবি। যা, রান্না শেষ কইরা পুরো বাড়ি ঝাড়া মোছা করতে হইবো আবার। অনেক কাম।”
শেহরোজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে সব টা দেখলো। শুনতে হাস্যকর হলেও সত্যি, এই আপাদমস্তক বেয়াদব মেয়েটার জন্য তার মনের সুপ্ত এক স্থানে মায়া হচ্ছে৷ শেহরোজ চেয়েও সেই মায়া উপেক্ষা করতে পারছে না। 
“নাহ! এখানে থাকলে এই মেয়ে কে শায়েস্তা করা যাবে না। কাল ই সে ঢাকা চলে যাবে। মিলনী শেখ ভীষণ বজ্জাত মানুষ। এই মেয়েকে ঠিক সোজা করে ছাড়বে৷ 
রাতে খাবার টেবিলে বসে শেহরোজ প্রথম গ্রাস মুখে তুলতেই তার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। মুরগির মাংস না, এ যেন আস্তো আগুনের গোলা! শেহরোজের নাক মুখ সব লাল হয়ে গেছে ঝালে৷ শেহরোজ একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রূপকথার দিকে তাকিয়ে দেখলো রূপকথা তার দিকেই তাকিয়ে আছে। শেহরোজের সাথে চোখ মিলতেই সে ঠোঁট উঁচু করে চুমু খাওয়ার ভঙ্গি করলো। অতঃপর ওড়না ঘোরাতে ঘোরাতে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে। মনে মনে বিরবির করে বলল, 
“খা, ভালো করে খা এবার। আজ মুখ জ্বালিয়েছি। কাল অন্তর জ্বালিয়ে খাবো৷ বদমায়েশের দল।”
চলবে??

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন