জেহের_এ_ইস্ক ৯
সানজিদা_বিনতে_সফি
রূপকথা যেতে যেতে মুখ বিকৃত করে বলল,
“কি দিন আসলো! আজকাল হিসাব বরাবর করতে আবর্জনায় হাত দিতে হচ্ছে। এখন আবার গিয়ে হারপিক দিয়ে হাত ধুতে হবে। ধুর!”
রূপকথা হাসতে হাসতে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। একেবারে জোকের মুখে নুন পড়েছে। ইসস! দেখলেই গা জ্বলে যায়! শয়তান একটা।
রূপকথার ভাবনার মাঝেই শেহরোজ ঝড়ের গতিতে এসে তাকে টেনে নিয়ে গেল নিজের রুমে। দরজা বন্ধ করেই প্রচন্ড জোরে আছড়ে ফেলল দেয়ালে। আকস্মিক আক্রমণে তাল সামলাতে পারলো না রূপকথা। দেয়ালে বাড়ি খেয়ে হাতে থাকা বালতির উপর আছড়ে পড়ল সে। বালতি ভেঙ্গে হাত কেটে গেল। দেয়ালের সাথে লেগে কপাল ফেটে দরদর করে রক্ত বের হতে শুরু করলো।
শেহরোজ প্রচন্ড রাগে হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে বসেছে। রূপকথা স্থির চোখে তাকালো শেহরোজের দিকে। কপালের রক্ত সারা মুখ ছড়িয়ে গেছে তার। কি বিভৎস ই না লাগছে তাকে।
রূপকথার চোখের সামনের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য ঝাপসা হয়ে এল। মাথার ভেতর তীব্র এক যন্ত্রণার যন্ত্রের মতো বাজতে লাগল। কপালে হাত দিতেই আঙুলগুলো গাঢ় লাল রক্তে ভিজে গেল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে রূপকথার চেহারায় কোনো ভয়ের ছাপ নেই। বরং তার চোখের গভীরে ফুটে উঠেছে একরাশ ঘৃণা।
দেওয়ালে লাথি মেরে শেহরোজ রূপকথার সামনে এসে ঝুঁকে দাঁড়াল। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে তার। দাঁতে দাঁত চেপে সে গর্জে উঠে বলল,
“তোর সাহস কীভাবে হয় আমার সাথে এমন নোংরা বেয়াদবি করার? বার বার ছাড় দিচ্ছি বলে নিজেকে অনেক বড়ো কিছু ভাবতে শুরু করেছিস, তাই না? চিনিস আমাকে? জানিস আমি কি কি করতে পারি? তোর মতো হাজার খানেক রূপকথা দুই আঙ্গুলে পিষে মারতে পারে এই শেহরোজ শেখ। কাকপক্ষী ও টের পাবে না। আরেকবার আমার সামনে বেয়াদবি করলে এই জমিদার বাড়িতেই জ্যান্ত পুতে দেবো তোকে!”
রূপকথা ধীরেসুস্থে মেঝের উপর ভেঙে যাওয়া প্লাস্টিকের বালতিটার দিকে তাকাল, তারপর রক্তমাখা হাতেই দেয়াল ধরে উঠে দাঁড়াল সে। শরীর যন্ত্রণায় ভেঙে আসছে, পিঠের জখম আর কপালের কাটা জায়গা তীব্রভাবে জ্বলছে। কিন্তু তার জেদ একবিন্দু ও কমে নি।
সে শেহরোজের একদম মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। তার রক্তমাখা মুখে ফুটে উঠল বিষাক্ত হাসি। সে আলতো করে নিজের আঙুলের রক্ত শেহরোজের ধবধবে সাদা টিশার্টের ওপর মুছে দিল।
শেহরোজ মুখ কুচকে একপা পিছিয়ে যেতেই রূপকথা ঠান্ডা বলল,
“তোর গায়ে বল বেশি শেহরোজ শেখ। তাই কাপুরুষের মতো মেয়েদের গায়ে হাত তুলিস। কি দুর্ভাগা তুই! যেই মানুষ টা একসময় তোর জন্য উন্মাদ ছিল। আজ সেই তোর মৃত্যু কামনা করে৷ তোর ধ্বংস দেখতে চায়।”
রূপকথা টলতে টলতে শেহরোজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ছলছল চোখে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড৷
“আমার নিজের প্রতি ঘেন্না হয় শেহরোজ। নিজেকে একশো খণ্ডে টুকরো করতে ইচ্ছে করে৷ তোর মতো একটা পশু কে কি না একটা সময় আমি আমার মনে ঠাই দিয়েছিলাম! থু আমার জীবনের উপরে।”
শেহরোজ রক্তাক্ত রূপকথার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ একদম নিস্তব্ধ হয়ে রইল। কি বলছে এই মেয়ে? এসব কথার অর্থ কি? এই মেয়ের চোখে কেন কোন মৃত্যুর ভয় নেই। কোনো কান্নাকাটি নেই। আছে শুধু একরাশ আক্রোশ। এই নীরব হিংস্রতা শেহরোজকে ভেতর থেকে ঝাঁকুনি দিল। শেহরোজ কপাল কুচকে বলল,
“কি সব আবোলতাবোল বলছো তুমি ? তোমার এই কথার মানে কি?”
রূপকথা জবাব দিল না। সে শেহরোজের মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আটকে যাওয়া গলায় বলল,
“তোর চেহারার মতো তুই মানুষ টাও যদি সুন্দর হতি শেহরোজ শেখ! আহারে! আমি তো তোদের কোন ক্ষতি করি নি। নিজের জীবন নিয়ে, পরিবার নিয়ে সুখেই ছিলাম। তবে কেন আমাকে নিঃস্ব করে দিলি? এই জীবনের চেয়ে তো মৃত্যু ভালো ছিল! আমাকে কেন বাঁচিয়ে রাখলি তোরা?”
রূপকথা একদলা থুতু ফেলল। ভয়ংকর ঘৃণা নিয়ে হিংস্র চোখে তাকালো শেহরোজের দিকে। বুজে আসা গলায় হিসহিসিয়ে বলল,
“প্রতি ফোটা রক্তের হিসাব নেয়া হবে, শেহরোজ শেখ। যেই রক্তের নদী তুই বইয়ে দিয়েছিস আমার জীবনে, তার প্রতিটি বিন্দুর হিসেব নেয়ার জন্য আমি এ,,,”
পুরো কথা শেষ করার আগে ই সে ঢলে পড়লো ফ্লোরে। শেহরোজ চোখ মুখ শক্ত করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। রূপকথার বেশিরভাগ কথা-ই ছিল অস্পষ্ট।
শেহরোজ রূপকথার রক্তে ভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল এক দৃষ্টিতে। সে কি কোনভাবে মেয়েটাকে আগে থেকে চেনে? নাহ! কিছু তো মনে পড়ছে না! শেহরোজ ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল। কিন্তু এখন চিন্তা করার সময় নেই। আর কিছুক্ষণ এভাবে পড়ে থাকলে এটা এখানেই মরবে৷ শেহরোজ প্রচন্ড মেজাজ খারাপ নিয়ে মজু বিবি কে ডাকলো। আপাতত এই মেয়ের ট্রিটমেন্ট করা দরকার।
***
শেহরোজ নিজের রুমে আরামকেদারায় চোখ বন্ধ করে বসে আছে। বুঝ হওয়ার পর থেকে পড়াশোনা আর বাবার সাথে ব্যবসায়ীক কাজে ব্যস্ত থেকেছে সে৷ বছর তিনেক আগে বাবা মারা গেল। পুরো পরিবার টা প্রায় ভেঙ্গে পড়েছিল৷ ব্যবসা কোথায় কোথায় ইনভেস্ট করা হয়েছে, তার কিছুই জনতো না তারা। শেহরোজের চতুরতায় সে যাত্রায় ব্যবসায় ইনভেস্ট করা টাকা কোনমতে উদ্ধার করা গিয়েছিল। তবুও অনেক টাকার লস খেয়েছিল তারা৷ শেহরোজ শক্ত হাতে সামলেছে সবটা৷ বাবার জুতোর ব্যবসা আর নিজের এক্সপোর্ট ব্যবসা দুটোই সামলেছে শক্ত হাতে৷ এই আটাশ বছরের জীবনে কোনদিন মেয়ে জনিত কাণ্ডে জড়ায় নি সে। সত্যি বলতে সময় ই পায় নি। আর রূপকথার সাথে সেবার ই তার প্রথম দেখা। এর আগে এই মেয়েটাকে সে দেখেছে বলে মনে পড়ছে না তার।
শেহরোজ বার বার মনে করার চেষ্টা করে। কিন্তু স্মৃতি হাতড়ে তেমন কিছুই খুঁজে পায় না সে। রূপকথা কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কপালে তিন টা আর হাতে একটা সেলাই লেগেছে তার। শেহরোজ আঘাত করতে চায় নি। কিন্তু তখন কি যে হয়ে গেল তার! রাগ টা কিছুতেই সামলে উঠতে পারলো না৷ এই এক সমস্যা তার। খুব সহজে রাগে না৷ আর একবার রাগলে খুন করে ফেলাও তার জন্য দুধভাত৷ এজন্য সব সময় নিজের ভেতরকার আগুনটুকু ধামাচাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করে। ওই মেয়ে টাকে কম তো সুযোগ দেয় নি সে? একের পর এক বেয়াদবি সহ্য করে গেছে৷ বার বার গায়ে হাত তুললেও সেভাবে কিছুই বলে নি সে। নাহয় শেহরোজ শেখের গায়ে হাত তুলে সে আবার হেটে চলে বেড়াবে! এতো সহজ?
শেহরোজ ঘড়ি দেখলো। সকাল দশ টা বাজে। গায়ের রক্তমাখা টিশার্ট টা বদলে বিনে ফেললো সে। লম্বা শাওয়ার নিয়ে তৈরি হয়ে নিচে নামলো। নাশতা সেরে ঢাকার উদ্দেশ্যে বের হবে। ওসব ফালতু মেয়ে মানুষের জন্য অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে তাকে। ওই মেয়ের মুখ আর কোনদিন দেখবে না সে।
শেহরোজ নাশতা সেরে মজু বিবি কে ডেকে বলল,
“রূপকথা কে আপাতত তার বাড়ি পাঠিয়ে দাও। সুস্থ হলে এ বাড়িতে আসবে। সে কোন মহারানী নয় যে এখানে তার সেবা শুশ্রূষা করার জন্য দাসী বাদি আছে।”
মজু বিবি আস্তে করে মাথা নাড়লো। শেহরোজ ফোন আর মানিব্যাগ নিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।
***
দুই দিন আগেই ফুটফুটে এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছে রূপকথা। রুদ্র মেয়ে হওয়ার খুশিতে পুরো হাসপাতাল মাথায় তুলেছে। হাসপাতাল জুড়ে সবাইকে মিষ্টি খাইয়ে রূপকথার কাছে এসে বসলো সে। মেয়ের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে রূপকথা কে খোঁচা দিয়ে বলল,
“কে যেন বলেছিল? আমার রাজকন্যা আসবে না? সে এখন মুখে কুলুপ এঁটে কেন?”
রূপকথা হেসে ফেললো।
“আমার কথা ভুল প্রমাণিত করে আমার কোলে যদি একটা রাজকন্যা আসে, তবে সেই পরাজয়েও যে কত আনন্দ, তা আজ বুঝতে পারছি রুদ্র।”
মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল রূপকথা।
রুদ্র রূপকথার কপালে আলতো করে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিল। রূপকথার কোলজুড়ে ঘুমিয়ে থাকা পুঁচকে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে তার বুকটা এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে উঠছে।
রূপকথা অধোচেতন কল্পনায় দেখে রুদ্র মেয়ে কে কোলে নিয়ে হাসছে৷ কখনো তার চুলে বেনি করে দিচ্ছে। এইতো, এইতো সেদিন ই মেয়েটাকে গোসল করিয়ে দিল নিজ হাতে৷ এরপর? এরপর সব শেষ। এক হায়েনা তার সন্তান, তার স্বামী কে খুবলে খুবলে মারলো তার ই চোখের সামনে৷
রূপকথা চিৎকার করে উঠে। হাপারের মতো বুক উঠানামা করছে তার। নিঃশ্বাস পড়ছে দ্রুত। পুরো শরীর থরথর করে কাপছে। রুহি, তার কলিজার টুকরো, তার রাজকন্যা। মেরে ফেলেছে! ওই জানোয়ার গুলো মেরে ফেলেছে! তার সামনে দেয়ালে আছড়ে আছড়ে মেরেছে তার নিস্পাপ ফুল টাকে। কুপিয়ে যখম করেছে তার স্বামী কে। স্বামী সন্তানের রক্তের স্রোতে ফেলে ধর্ষণ করেছে তাকে।
রূপকথা প্রচন্ড জোরে চিৎকার করে উঠে। নিজের চোখ মুখ খামচে ধরে একের পর এক আঘাত করতে থাকে নিজেকে। তার জন্য, শুধু মাত্র তার জন্য তার স্বামী সন্তান খুন হয়েছে। তিনটা বছর, তিন টা বছর ধরে সে উন্মাদের মতো অপেক্ষা করে আছে। আর কত পরিক্ষা নিবে মালিক!
রুপা বেগম এসে দুই হাতে জাপটে ধরলো রূপকথা কে। অস্থির গলায় কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“মা!ওমা, শান্ত হ মা! একটু শান্ত হ। আমরা আছি তো? তুই এমন পাগলামি করলে আমরা কিভাবে বেঁচে থাকবো?”
নিয়াজ মাস্টার মেয়ের সামনে আসার সাহস করতে পারলো না। সে নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল করিডরে থাকা বেঞ্চে। এই আগুন থেকে বাঁচাতেই তো তড়িঘড়ি করে ছোট মেয়েটার বিয়ে দিয়েছিল সে। স্বামীর সাথে বেশ মানিয়েও নিয়ে ছিল। অথচ সেই আগুন ই তার মেয়ের জীবন টা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দিল!
রূপকথা মায়ের বন্ধন থেকে জোর করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,
“মা, আমি ওই জানোয়ার টা কে টুকরো টুকরো করে ফেলবো৷ গর্ত থেকে একদিন ওই খুনি ঠিক বেরিয়ে আসবে। আমি নিজে টেনে বের করে আনবো ওকে। এরপর নিজ হাতে মারবো।”
রূপকথা নিজের হাত দুটো সামনে এনে দাতে দাত চেপে চিৎকার করে বলল,
“বাবা! পুরো এলাকায় রটিয়ে দাও, তোমার মেয়েকে মেরে আধমরা করে হাসপাতালে পাঠিয়েছে জমিদারের মেজো ছেলে শেহরোজ শেখ।”
রুপা বেগম মেয়ের চোখের পানি মুছে দিয়ে আটকে যাওয়া গলায় বলল,
“তাতে ওদের কোন ক্ষতি ই হবে না রে মা। ওদের ক্ষমতা আছে। কেউ ওদের বিপক্ষে একটা টু শব্দ ও করবে না।”
রূপকথা হাসে।
“করবে মা, করবে। সময় আসতে দাও।”
মা মেয়ের কথার মাঝেই পুলিশ উপস্থিত হলো সেখানে। রূপকথার মুখে অদৃশ্য হাসি। পুলিশ অফিসার রূপকথার বেডের সামনে বসে বলল,
“হসপিটাল থেকে কেউ একজন কল করেছিল৷ তা কি হয়েছিল আপনার সাথে?”
রূপকথা অসহায় গলায় বলল,
“সকালে জমিদার বাড়ি তে গাছের গুড়ি থেকে চেলাকাঠ করতে বলা হয়েছিল৷ কুড়াল দিয়ে কাঠ কাটতে কাটতে অনেকটা দেরি হয়ে যায়। তাই সময় মতো নাশতা বানাতে পারি নি। এজন্য,,,”
রূপকথা ডুকরে কেঁদে উঠলো। মুখে ওড়না চেপে পুনরায় বলল,
“এজন্য সবাই মিলে আমাকে মারধর করেছে।”
পুলিশ অফিসার একজন লেডি অফিসার কে নির্দেশ দিয়ে বলল,
“উনার শরীরের আঘাত গুলোর ছবি তুলে নাও। আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলে আসছি।”
একটু আগে নিজেই নিজেকে করা আঘাতে রূপকথার চোখ মুখে নখের আঁচড় সহ গালে কালশিটে দাগ পড়ে গেছে। লেডি অফিসার ছবি তুলতে তুলতে আফসোস করে বলল,
“আহারে! কিভাবে মেরেছে মেয়েটাকে! এরা কি মানুষ? টাকা আর ক্ষমতার বলে মানুষ কে মানুষ মনে করে না। জঘন্য।”
রূপকথা চুপ করে রইল। অফিসার ডাক্তারের সাথে কথা বলে পুনরায় এসে রূপকথার সামনে বসলো।
“দেখো মা, আমি বুঝতে পারছি তোমার উপর দিয়ে কি গেছে। তুমি চাইলে আমি মামলা লিখে নিতে পারি। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হবে বলে মনে হচ্ছে না। ওরা ক্ষমতাবান লোক৷ ওদের সাথে পেরে উঠবে না। ওরা নিজেদের ক্ষমতা বলে ঠিক মামলা ধামাচাপা দিয়ে দিবে। উল্টো হেনস্থা হতে হবে তোমাদের।”
রূপকথা মনে মনে হাসলো। এই লাইনগুলো সে জীবনে বহুবার শুনেছে। এই দেশে ক্ষুধার জ্বালায় পাউরুটি চুরি করা চোর কে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেললেও কোটি কোটি টাকা মেরে খাওয়া শিক্ষিত ডাকাতদের বিচার হয় না। খুনি, ধর্ষকদের টাকা থাকলেই তাদের সাত খুন মাফ।
অফিসার রূপকথার উত্তরের অপেক্ষায়। রূপকথা শান্ত গলায় বলল,
“আমি কোন অভিযোগ করতে চাই না৷”
অফিসার হাফ ছেড়ে বাঁচলো। হাসিহাসি মুখ করে বলল,
“ঠিক আছে। কোন ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবেন।”
রূপকথা মাথা নেড়ে মনে মনে বিরক্ত হয়ে বলল,
“হ, তোরে জানাইলে তুই ওই জমিদার গো বাল ছিড়া আটি বাধবি গোলামের পুত।”
এইসব দুমুখো সাপ গুলো কে দেখলেই তার গা পিত্তি জ্বলে যায়। রূপকথা লেডি অফিসারের দিকে তাকাতেই সে তাকে চোখের ইশারায় আস্বস্ত করলো। অতঃপর সেও প্রস্থান করলো। রূপকথা চোখ বুজে গা এলিয়ে দিল। তার ক্লান্ত লাগছে। কিন্তু এখনো যে অনেকটা পথ যাওয়া বাকি!
****
রূপকথা সুস্থ হবার পর জমিদার বাড়ি ফিরে এসেছে। আপাতত কারোর সাথেই উচ্চবাচ্য করছে না সে। যেভাবে যেভাবে হুকুম করছে, সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে রূপকথা নিজের ভবিতব্য মেনে নিয়েছে। অনেকে তো আগেপিছে টিপ্পনী কেটে বলছে, শেহরোজ খুব করে শিক্ষা দিয়েছে এই অসভ্য মেয়েটাকে। নইলে চোপার ধারে টেকা মুশকিল হয়ে যেতো।
রূপকথা কারোর কথায় পাত্তা দিচ্ছে না। শেহরোজ নেই। এটাই তার জন্য সুযোগ। গত একমাস ধরে শেহরোজ বাড়ি আসে নি। এদিকে আজকাল শাহ আলম শেখ ও নিষিদ্ধ পল্লিতে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে৷ আজকাল বেশিরভাগ সময় বাড়িতেই ঘুরঘুর করে। রূপকথার আশেপাশে থাকতে চায়। রূপকথা বোঝে। সপ্তাহখানেক আগে তো সবার আড়ালে ঝাপটে ধরেছিল তাকে। রূপকথা কোন রকম ছাড়িয়ে ছুটে পালিয়েছে৷ এই ফাঁদে সে কিছুতেই পা দেবে না৷ যা করার দ্রুত করতে হবে।
রূপকথা রান্না করতে করতে কয়েকজন কাজের মেয়েকে ফিসফিস করতে শুনলো, আজ নাকি শাহ আলম শেখ রাতে চুমকির কাছে যাবে। রূপকথা শান্ত চোখে তাকায়। প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিক ভাবেই রান্না শেষ করে।
দুপুরের পর বাড়ির পেছনের পতিত বাগানটায় যায় রূপকথা। সেখানে আগাছার মতো জন্মে আছে বেশ কিছু ধুতুরা গাছ। সাধারণ মানুষের চোখে এগুলো নিছকই জংলি গাছ। কিন্তু রূপকথা জানে, এই ধুতুরার বীজে লুকিয়ে আছে অ্যাট্রোপিন আর স্কোপোলামিন এর মতো ভয়ংকর বিষ। যা নির্দিষ্ট মাত্রায় শরীরে গেলে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র বিকল করে দেয়, হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ, আর শেষে হার্ট অ্যাটাক!
খুব সাবধানে কয়েকটা ধুতুরা ফল ছিঁড়ে নেয় সে। স্টোর রুমে বসে অত্যন্ত সন্তর্পণে বীজগুলো বেটে তার নির্যাস বের করে। বর্ণহীন, গন্ধহীন এক মরণঘাতী তরল।
সন্ধ্যা নামতেই জমিদার বাড়িতে প্রতিদিনের মতো সাজসাজ রব। শাহ আলম শেখ চুমকির কাছে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তার নিজস্ব গাড়িটা সদর দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। ড্রাইভার রহমত মিয়া গাড়িটা মুছতে ব্যস্ত। কয়েক মুহুর্ত পরে রহমত মিয়া হাক দিয়ে বলল,
“মজু বুবু, বড় সাহেবের পানির বোতল টা দাও। তার আবার ঘন ঘন তৃষ্ণা পায়। পানি নিতে ভুইলা গেলে আমারে গালাগালি করবো।”
রূপকথা নিঃশব্দে হাসলো। মজু বিবি ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতল টা বের করে দিল রহমত মিয়ার হাতে। রূপকথা পাশেই দাঁড়িয়ে সালাদ কাটছে। মিলানী শেখ আজকাল সন্ধ্যায় সালাদ খাওয়া শুরু করেছে। তার জন্য ই স্পেশাল সালাদ প্রস্তুত করছে রূপকথা।
শাহ আলম শেখ যখন গলা ভেজাতে এই পানি খাবে, তখন তার শরীরে আগুন ধরে যাবে। কাজ শেষ করে রূপকথা দ্রুত সরে আসে। মিলানী শেখ কে সালাদ দিয়ে ধীরপায়ে উঠে আসে দোতলায়।
শাহ আলম শেখ হাসিমুখে গাড়িতে উঠছে। এক্ষুনি তার গাড়ি ছুটে যাবে নিষিদ্ধ পল্লির দিকে। রূপকথা ঠান্ডা চোখে দেখে তার চলে যাওয়া। মানুষের জীবন কতটা অনিশ্চিত! এই মানুষ টা জানেই না, কিছুক্ষণ পর সে মৃত্যুর দূতের সাথে সাক্ষাৎ করবে। অথচ যাওয়ার আগে রূপকথা কে হুকুম দিয়ে গেছে, বাড়ি ফিরে সে গরম পানি তে গোসল করবে। রূপকথা যেন জেগে থাকে তাকে পানি গরম করে দেয়ার জন্য।
রূপকথা বিরবির করে বলে,
“যা শাহ আলম শেখ। তোর শেষ গোসলের বরই পাতার গরম পানি আমিই প্রস্তুত করে দেবো।”
রাত তখন আড়াইটা। চারদিক সুনসান নীরব। চুমকির ঘর থেকে বের হলো শাহ আলম শেখ। অতিরিক্ত মদ্যপানে পা টলছে তার। নেশায় বুঁদ হয়ে গাড়িতে উঠল সে। গাড়ি চলতে শুরু করল জমিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে। মেঠো রাস্তার দুপাশে ঘন বাঁশবাগান আর পুরোনো বটগাছের সারি। অমাবস্যার কাছাকাছি রাত, ঘুটঘুটে অন্ধকার।
হঠাৎ গাড়ির ভেতরে শাহ আলম শেখের প্রবল তৃষ্ণা পেল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। তিনি হাত বাড়িয়ে পানির বোতল টা তুলে নিল। ঢকঢক করে কয়েক ঢোক পানি পান করল।
মিনিট পনেরো কাটার পর থেকেই শাহ আলমের শরীরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি শুরু হলো। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে। মনে হচ্ছে হৃদপিণ্ডটা লাফিয়ে গলা দিয়ে বেরিয়ে আসবে। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে, কপালে জমছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। নেশার ঘোরে সে ভাবল, মদের মাত্রাটা আজ হয়তো একটু বেশিই হয়ে গেছে। সে গাড়ির জানালাটা একটু খুলে দিলেন বাতাস আসার জন্য।
গাড়িটা ঠিক শ্মশান ঘাটের ধারের নির্জন বাঁকটায় আসতেই হঠাৎ গাড়ি থেমে গেল। রহমত গাড়ি থেকে বেরিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,
"বড়ো সাব, রাস্তার মাঝখানে মস্ত এক গাছের ডাল পইড়া আছে। আমি ডালটা সরাইয়া দিতাছি।"
বুকের ব্যথায় ছটফট করতে থাকা শাহ আলম শেখ বিরক্তি নিয়ে জানালার বাইরে তাকালেন। আর ঠিক তখনই তার রক্ত হিম হয়ে গেল!
রাস্তার ধারের বটগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছায়ামূর্তি। পরনে সাদা শাড়ি, কোলে কাপড়ে মোড়ানো একটা ছোট্ট পুটলির মতো কিছু একটা। শাহ আলম শেখের চোখের সামনে ভেসে উঠল তিন বছর আগের সেই অভিশপ্ত রাতের দৃশ্য। রুদ্রকে কোপানোর পর এই শাহ আলমই তো ওই মেয়েটার কোল থেকে বাচ্চাটাকে কেড়ে নিয়ে দেয়ালে আছড়ে ফেলেছিল।
নেশার ঘোর, ধুতুরার বিষক্রিয়া আর চরম আতঙ্কে শাহ আলম শেখের মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিল। তার মনে হলো, ওই মরা বাচ্চাটা কোলে নিয়ে কোনো প্রেতাত্মা আজ তার হিসেব নিকেশ করতে এসেছে। তার শরীর থেকে অতিরিক্ত অ্যাড্রেনালিন ক্ষরণ হতে শুরু করল। বিষের প্রভাবে আগে থেকেই মারাত্মক মাত্রায় চলতে থাকা হৃদযন্ত্র এই ভয়ের আকস্মিক ধাক্কাটা আর নিতে পারল না।
একটা অস্ফুট গোঙানি দিয়ে নিজের বুকটা খামচে ধরলেন শাহ আলম শেখ। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উল্টে গেল। সিটের ওপর ঢলে পড়লেন তিনি। শরীরটা কয়েকবার খিঁচুনি দিয়ে একদম নিথর হয়ে গেল।
চাদর মুড়ি দেওয়া রূপকথা রহমত মিয়ার অলক্ষ্যেই আবার অন্ধকারে মিশে গেল।
জমিদার বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেল। বড় ডাক্তার এসে শাহ আলম শেখের মৃতদেহ পরীক্ষা করলেন। কোনো কাটাছেঁড়া নেই, কোনো আঘাত নেই। মুখটা নীল হয়ে আছে। ডাক্তার গম্ভীর মুখে রায় দিলেন,
"ম্যাসিভ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। অতিরিক্ত মদ্যপান আর উত্তেজনার কারণেই গাড়ির ভেতর উনার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।"
রূপকথা শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শাহ আলম শেখের নিথর দেহটার দিকে। জানোয়ার টা কত সহজ মৃত্যু পেলো! সৌভাগ্যবান বটে!
রূপকথা মনে মনে হাসলো। শেহরোজ শেখ! দ্য গেম ইজ বিগান।
চলবে,,