#দ্বিতীয়_বার_ভালোবাসা
#আরিয়া_আলম
#সূচনা_পর্ব
বাসর ঘরে বউ সেজে বসে আছি আমি। আমার নাম তাসনুভা মেহেরিন। আর আমার বিয়েটা কোনো সাধারণ বিয়ে ছিল না। ছিল একেবারে সিনেমার ক্লাইম্যাক্স টাইপের দুর্ঘটনা—যাকে বলে কট ম্যারেজ!
ঢাকা শহরেই আমার বাড়ি। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে রাতে গ্রামের চেয়ারম্যানের বাড়ির বাগান থেকে আম চুরি করতে গিয়েছিলাম। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন—আম চুরি!
আম চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়লাম শহরের নামকরা বিজনেসম্যান মাহতাব খানের হাতে। তারপর কীভাবে কীভাবে যেন সেই ধরা পড়া থেকে কথাকাটাকাটি, কথাকাটাকাটি থেকে ঝগড়া, ঝগড়া থেকে কটাকটি—আর শেষমেশ কট ম্যারেজ!
মানে, মানুষ যেখানে প্রেম করে বিয়ে করে, সেখানে আমি আম চুরি করতে গিয়ে বর চুরি করে ফেললাম!
তবে আমার বিয়ের আসল চমক এখানেই শেষ নয়।
আমার সদ্য বিয়ে করা বরের চার বছরের একটা ছেলে আছে। নাম মাহিন।
শুনেছি, মাহিন যখন মাত্র পাঁচ মাসের, তখন তার মা নাকি মাহতাব খানের এক বন্ধুর সঙ্গে পালিয়ে গেছে।
এসব শুনে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।
কে পালিয়েছে, কার সঙ্গে পালিয়েছে, কেন পালিয়েছে—এসব নিয়ে গবেষণা করার মতো সময় আমার নেই। কারণ আমি বিয়ে করে ভীষণ খুশি!
এর পেছনে অবশ্য দুটো মহৎ কারণ আছে।
প্রথম কারণ—আর পড়াশোনা করতে হবে না।
দ্বিতীয় কারণ—আমার সৎ মায়ের অত্যাচার আর সহ্য করতে হবে না।
ব্যস! জীবন সফল!
আমি মনে মনে ভেবেছিলাম, বিয়ের পর জীবন হবে একেবারে সিনেমার মতো। সুন্দর শাড়ি পরব, স্বামী আমার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হবে, তারপর একটু রোমান্টিক কথা হবে...
কিন্তু আমার কপালটাই পোড়া!
বিয়ের পর শান্তি তো পেলামই না, উল্টো আমার সদ্য বিয়ে করা বর আমাকে পড়াতে বসিয়েছে!
হ্যাঁ, বাসর রাতে!
মানুষ বাসর ঘরে বউয়ের হাত ধরে, আর আমার বর আমার হাতে কলম ধরিয়ে দিয়েছে।
আমি খাতার দিকে তাকিয়ে আছি।
খাতা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
কলম আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আর আমি মনে মনে আমার ভাগ্যকে গালি দিচ্ছি।
আচ্ছা আপনারাই বলুন তো, আমি বিয়ে করেছি কী পড়ালেখা করার জন্য?
বিয়ে করেছি স্বামী-সন্তান পালার জন্য!
তার ওপর আজ আমাদের বাসর রাত!
কই, শালার জামাই একটু রোমান্টিক হবে! দুটো প্রেমের কথা বলবে! বউয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসবে!
তা না!
আমাকে আইসিটির অঙ্ক করতে বসিয়েছে!
আমার এখন সত্যিই মনে হচ্ছে, এই লোকটার সিস্টেমে বড় ধরনের সমস্যা হয়েছে।
মনে হয় এক ছেলে পয়দা করতে গিয়ে সিস্টেমে এত জং ধরেছে যে রোমান্স নামের সফটওয়্যারটাই আনইনস্টল হয়ে গেছে!
আমি বিরক্ত হয়ে খাতা খুলে বসেছি।
মাহতাব খান আমার সামনে বসে বেশ গম্ভীর মুখে বললেন,
—এই যে, প্রশ্নটা ভালো করে পড়ো। তারপর উত্তর দাও।
আমি গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লাম।
—জি।
মাহতাব খান আবার বললেন,
—আর হ্যাঁ, নিজের মতো কিছু লিখবে না। যা প্রশ্নে চেয়েছে, সেটাই লিখবে।
আমি আবারও মাথা নাড়লাম।
—জি।
মাহতাব খান নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের ফোনটা হাতে নিলেন।
আর আমি?
আমি খাতার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
তারপর মাথায় একটা অসাধারণ বুদ্ধি এলো।
যেহেতু পড়াশোনা আমার দ্বারা হবে না, তার চেয়ে বরকে নিয়ে একটু প্রশংসা করাই ভালো।
কলম হাতে নিয়ে আমি লেখা শুরু করলাম।
বর্তমান———
মাহতাব ফোন থেকে চোখ তুলে বললো,
—হয়ে গেছে?
মেহেরিন গর্বিত মুখে খাতা এগিয়ে দিলো।
—জি। খুব সুন্দর হয়েছে।
মাহতাব খাতা হাতে নিয়ে প্রথমে স্বাভাবিকভাবেই তাকাল।
তারপর তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
তারপর কপালে ভাঁজ পড়ল।
তারপর চোখ দুটো বড় হয়ে গেল।
তারপর—
মাহতাবের মুখ দেখে মনে হলো, লোকটা জীবনে প্রথমবার এমন কোনো জিনিস দেখেছে যার কোনো ব্যাখ্যা বিজ্ঞানও দিতে পারবে না।
কারণ আইসিটির অঙ্কের খাতায় মেহেরিন যা লিখেছে, সেটা কোনো অঙ্ক তো নয়ই—বরং তার সদ্য বিয়ে করা স্বামীর গুণকীর্তনের মহাকাব্য!
মাহতাব একবার খাতার দিকে তাকাল।
একবার মেহেরিনের দিকে তাকাল।
আবার খাতার দিকে তাকাল।
তারপর গভীর শ্বাস নিল।
—মেহেরিন...
মেহেরিন মিষ্টি করে হাসলো।
—জি, জামাই সাহেব?
মাহতাব চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। মনে হলো, নিজের ধৈর্যের শেষ সীমাটা খুঁজে দেখছে।
তারপর খাতা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মেহেরিনের দিকে তাকাল।
মেহেরিন তখন এমন নিরীহ মুখ করে বসে আছে, যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতেও জানে না।
মাহতাব ধমকে উঠলো,
—এই মেয়ে! এসব কী লিখেছো?
মেহেরিন চোখ পিটপিট করে বললো,
—কী লিখেছি?
—তোমাকে না বলেছিলাম আইসিটি লিখতে?
—জি।
—তাহলে এখানে এসব কী?
মেহেরিন খাতার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বললো,
—আপনার প্রশংসা।
মাহতাব থমকে গেল।
—আমার... প্রশংসা?
—জি।
—আইসিটির খাতায়?
—জি।
—কেন?
মেহেরিন একদম নির্লজ্জের মতো হেসে বললো,
—কারণ আইসিটির অঙ্ক পারি না। কিন্তু আপনাকে নিয়ে লিখতে পারি।
মাহতাব কয়েক সেকেন্ড মেহেরিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর কপালে হাত দিয়ে বসে পড়ল।
—হে আল্লাহ! আমি কোন মেয়েকে বিয়ে করলাম!
মেহেরিন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলো,
—এই যে! আমাকে বিয়ে করার আগে কিন্তু কেউ আপনাকে জোর করেনি।
মাহতাব দাঁত চেপে বললো,
—তোমাকে আম চুরি করতে দেখেছিলাম। তখনই বুঝেছিলাম তুমি বিপদ। কিন্তু এত বড় বিপদ—তা বুঝিনি!
মেহেরিন ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,
—আমি কি জানতাম নাকি আমার বর বাসর রাতে আমাকে আইসিটি পড়াবে?
মাহতাব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
—তোমার পড়াশোনা শেষ করতে হবে।
মেহেরিন আঁতকে উঠে বললো,
—কী?!
—হ্যাঁ। পড়াশোনা করবে।
—কিন্তু আমি তো বিয়ে করে ফেলেছি!
—বিয়ে করেছো, কলেজ থেকে অবসর নাওনি।
—কিন্তু আমি তো ভেবেছিলাম বিয়ের পর পড়াশোনা বন্ধ!
—ভুল ভেবেছো।
মেহেরিন হতাশ হয়ে খাতার ওপর মাথা রেখে ফিসফিস করে বললো,
—আমার জীবনটা শেষ...
মাহতাব ভ্রু তুলে বললো,
—কেন?
মেহেরিন মুখ না তুলেই বললো,
—বিয়ের আগে মা পড়াতেন। বিয়ের পর বর পড়াচ্ছে। আমার মনে হয় আমি স্বামী না, কলেজের স্যার বিয়ে করেছি।
মাহতাব আর কিছু বললো না।
শুধু খাতাটা আবার মেহেরিনের সামনে রেখে বললো,
—চলো। এবার সত্যি সত্যি আইসিটি করো।
মেহেরিন মুখ তুলে অসহায় চোখে তার দিকে তাকালো।
—একটা কথা বলি?
—বলো।
—আপনি চাইলে আজকে আমাকে অঙ্ক না করিয়ে একটু রোমান্টিক হতে পারেন।
মাহতাব শুকনো গলায় বললো,
—তুমি আগে আইসিটির অঙ্কটা শেষ করো। তারপর রোমান্স নিয়ে আলোচনা হবে।
মেহেরিন মনে মনে বললো,
‘এই লোকটার সত্যিই চিকিৎসা দরকার।’
তারপর খাতার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
বাসর রাতের প্রথম শিক্ষা—
স্বামী যদি মাহতাব খান হয়, তাহলে বিয়ের পরেও আইসিটি থেকে রেহাই নেই!