হিমশীতল স্পন্দন: একটি অমর প্রেম
লেখক আরিয়ান আহমেদ তাসিন
পর্ব ১: কুয়াশার শহরের অচেনা আগন্তুক
উইলো ক্রিক শহরটাকে দিনের বেলাতেও কখনো পুরোপুরি জেগে থাকতে দেখা যায় না। ধূসর কুয়াশা যেন শহরটার চারপাশে অদৃশ্য কোনো পর্দা টেনে রাখে। রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো গাছগুলোর ডালপালা কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে যায়, আর সন্ধ্যা নামার আগেই নিয়ন বাতিগুলো একে একে জ্বলে ওঠে। আকাশে সূর্যের দেখা খুব কমই মেলে। মেঘলা আকাশ, হালকা বৃষ্টি আর ঠান্ডা বাতাস—এই তিনটিই যেন উইলো ক্রিকের প্রতিদিনের সঙ্গী। শহরের বেশিরভাগ মানুষ সন্ধ্যার পর নিজেদের ঘরে ফিরে যায়। কিন্তু ইভলিনের কাছে সন্ধ্যার নীরবতা বরং স্বস্তির। বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা, জানালার বাইরে বৃষ্টির শব্দ শোনা আর নিরিবিলি কোনো কোণে বসে নিজের মতো সময় কাটানো—এসবই তার ভালো লাগে।সেদিন নভেম্বরের এক ঠান্ডা সন্ধ্যা। পুরোনো লাইব্রেরির ভেতরে হলুদাভ আলো জ্বলছে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে টুপটাপ করে। জানালার কাঁচে জমে থাকা পানির ফোঁটাগুলো নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ছে। ইভলিন একটা টেবিলের পাশে বসে ফ্রেঞ্চ উপন্যাস পড়ছিল। তার সামনে ছড়িয়ে ছিল কয়েকটি বই আর একটা ছোট নোটবুক। মাঝে মাঝে সে বই থেকে চোখ তুলে জানালার বাইরে তাকাচ্ছিল। কুয়াশার কারণে রাস্তার দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। হঠাৎ তার মনে হলো, বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু পরক্ষণেই কুয়াশার ভেতর সেই অবয়ূর্তি মিলিয়ে গেল।ইভলিন চোখ কুঁচকে আবার বইয়ের দিকে তাকাল। “মনে হয় ভুল দেখেছি।”নিজের মনেই কথাটা বলে সে আবার পড়ায় মন দিল।কয়েক মিনিট পর লাইব্রেরির ভেতরের পরিবেশটা অদ্ভুতভাবে বদলে গেল। কোথা থেকে যেন ঠান্ডা বাতাস এসে তার গাল ছুঁয়ে গেল। অথচ জানালাগুলো বন্ধ। ইভলিন হাতের তালু দিয়ে নিজের বাহু ঘষে নিল। ঠিক তখনই তার পাশের তাক থেকে একটা বই মেঝেতে পড়ে গেল।সে চমকে উঠে তাকাল।কয়েক সেকেন্ড বইটার দিকে তাকিয়ে থেকে উঠে দাঁড়াল ইভলিন। ধীরে ধীরে বইটি তুলে নিল। বইটির মলাট কালচে বাদামী। নামটা পুরোনো অক্ষরে লেখা—“অন্ধকারের কিংবদন্তি।”ইভলিন হালকা হেসে বইটা আবার তাকের মধ্যে রাখতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই লাইব্রেরির অন্য প্রান্ত থেকে একটা গভীর কণ্ঠ ভেসে এল।“ওটা পড়তে তোমার আগ্রহ আছে?”ইভলিন থমকে গেল। সে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।ইতিহাস আর মিথলজি বিভাগের সামনে একজন অপরিচিত ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।ছেলেটাকে এর আগে সে কখনো দেখেনি। লম্বা, ছিপছিপে গড়ন। গায়ে কালো ওভারকোট। কালো চুলগুলো সামান্য এলোমেলো। তার মুখের গড়ন অস্বাভাবিকভাবে শান্ত, কিন্তু চোখে এমন এক গভীরতা, যা ইভলিনকে কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির করে দিল। তার চোখ গাঢ় বাদামী। সেই চোখে অদ্ভুত এক শীতলতা আছে। মনে হয়, সে চারপাশের সবকিছু দেখছে, অথচ কোনো কিছুতেই তার আগ্রহ নেই।ইভলিন বইটা হাতে নিয়ে বলল, “না, আসলে এটা নিজে থেকেই পড়ে গেছে।”ছেলেটা তাকের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।“বই কখনো নিজে থেকে পড়ে যায় না।”ইভলিন ভ্রু কুঁচকাল।“তাহলে?”“হয়তো কেউ চেয়েছে তুমি বইটা হাতে নাও।”“কে?”ছেলেটা কোনো উত্তর দিল না। শুধু কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টি ইভলিনের কাছে অস্বস্তিকর হওয়ার কথা, কিন্তু আশ্চর্যভাবে সে চোখ সরাতে পারল না।ছেলেটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল। তার চলার শব্দ প্রায় শোনা যাচ্ছিল না। কাছে আসতেই ইভলিন আবার সেই অদ্ভুত পাইন আর ভেজা মাটির মতো গন্ধ পেল।কয়েক হাত দূরে এসে ছেলেটা থামল।“তোমার নাম কী?”ইভলিন একটু ইতস্তত করে বলল, “ইভলিন।”“শুধু ইভলিন?”“হ্যাঁ। আর তোমার?”ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “অ্যালারিক।”নামটা উচ্চারণ করার সময় তার কণ্ঠে অদ্ভুত ভার ছিল।“অ্যালারিক...” ইভলিন ধীরে ধীরে নামটা পুনরাবৃত্তি করল।“হুম।”“তুমি কি এই শহরের?”অ্যালারিক জানালার দিকে তাকাল। বাইরে তখন কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে।“শহরটা আমাকে চেনে কি না জানি না। তবে আজ থেকে আমিও এই শহরের একজন।”ইভলিন কথাটার অর্থ বুঝতে পারল না।“তুমি নতুন এসেছ?”“হয়তো।”“হয়তো?”অ্যালারিকের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।“তুমি অনেক প্রশ্ন করো।”ইভলিনও হেসে ফেলল।“তুমি অনেক অদ্ভুত উত্তর দাও।”কয়েক মুহূর্তের জন্য দুজনের মধ্যে নীরবতা নেমে এল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।ইভলিন লক্ষ্য করল, অ্যালারিকের চোখ বারবার তার দিকে চলে আসছে। কিন্তু যখনই তাদের চোখাচোখি হচ্ছে, অ্যালারিক সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে তাকিয়ে নিচ্ছে।তার আচরণে ইভলিনের কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।“তুমি এখানে কী খুঁজছ?”অ্যালারিক ইতিহাসের তাকের দিকে তাকাল।“একটা নির্দিষ্ট বই।”“কোন বই?”“যেটার নাম জানি না।”ইভলিন অবাক হয়ে বলল, “নাম না জেনে বই খুঁজছ?”“কিছু জিনিসের নাম জানা থাকে না। শুধু তাদের উপস্থিতি বোঝা যায়।”ইভলিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।“তুমি সবসময় এমন কথা বলো?”“কেমন কথা?”“যেগুলোর অর্থ বুঝতে দুবার ভাবতে হয়।”অ্যালারিক এবার একটু হাসল।“তাহলে তোমাকে আরও বেশি ভাবতে হবে।”ইভলিন বইটা টেবিলে রেখে আবার নিজের চেয়ারে বসল। অ্যালারিকও কিছুটা দূরে গিয়ে একটা তাকের সামনে দাঁড়াল। সে বইগুলো একের পর এক দেখছিল। কিন্তু তার মন যেন বইয়ে ছিল না।ইভলিন বই খুলে পড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু মন বসছিল না। কয়েকবার চোখ একই লাইনে গিয়েও ফিরে এল। অবশেষে সে তাকিয়ে দেখল, অ্যালারিক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তার মুখের ভাব বদলে গেছে। চোখ বন্ধ। কপালে সামান্য ভাঁজ। যেন সে কোনো অদৃশ্য শব্দ শুনছে।ইভলিন আস্তে করে বলল, “সব ঠিক আছে?”অ্যালারিক চোখ খুলল।“হ্যাঁ।”“তোমাকে অস্বাভাবিক লাগছে।”“তোমার কাছেও?”ইভলিন একটু থেমে বলল, “হ্যাঁ।”অ্যালারিক ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।“আমার কাছাকাছি থাকলে তোমার অস্বস্তি হয়?”“না। শুধু... তোমাকে বোঝা কঠিন।”“আমাকে বোঝার চেষ্টা করো না।”“কেন?”“কারণ কিছু মানুষকে যত বেশি বোঝার চেষ্টা করা হয়, তত বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়।”ইভলিন মৃদু হেসে বলল, “তাহলে তুমি রহস্যময় মানুষ?”“আমি রহস্য পছন্দ করি না।”“কিন্তু তোমাকে দেখলে মনে হয় তুমি নিজেই একটা রহস্য।”অ্যালারিক এবার কোনো উত্তর দিল না। তার চোখে হঠাৎ এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দিল।ইভলিন সেটা লক্ষ্য করল।“কী হয়েছে?”“তোমার হাতটা দেখাও।”ইভলিন অবাক হলো।“কেন?”“তোমার আঙুলে কাগজ কেটেছে।”ইভলিন নিজের আঙুলের দিকে তাকাল। সত্যিই সামান্য একটা কাটা দাগ হয়েছে। সে খুব একটা গুরুত্ব দিল না।“এটা কিছু না।”কিন্তু অ্যালারিকের মুখ মুহূর্তের মধ্যে কঠিন হয়ে গেল। সে এক পা পিছিয়ে গেল।“তুমি ঠিক আছ?”ইভলিন জিজ্ঞেস করল।অ্যালারিক চোখ বন্ধ করল এবং গভীর শ্বাস নিল।“আমার একটু বাইরে যেতে হবে।”“কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছে।”“জানি।”“তুমি কি অসুস্থ?”“না।”অ্যালারিক দ্রুত ঘুরে কয়েক পা এগিয়ে গেল।ইভলিনের মনে হলো, তার আচরণের মধ্যে এমন কিছু আছে যা সে বুঝতে পারছে না। সে উঠে দাঁড়াল।“অ্যালারিক।”অ্যালারিক থামল।“হ্যাঁ?”“তুমি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ কেন?”কয়েক মুহূর্ত সে নীরব রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “কারণ তোমার কাছে থাকলে আমার নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা কঠিন হয়ে যায়।”ইভলিনের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।“আমি কি কিছু করেছি?”“না।”“তাহলে?”“সমস্যাটা তোমার নয়, ইভলিন। সমস্যা আমার।”তার কণ্ঠে এমন গম্ভীরতা ছিল যে ইভলিন আর কিছু বলল না।অ্যালারিক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “আজ রাতে একা বাইরে বেশি সময় থেকো না।”“কেন?”“উইলো ক্রিক রাতের পর বদলে যায়।”ইভলিন জানালার বাইরে তাকাল।“শহর কি সত্যিই এত বিপজ্জনক?”অ্যালারিক উত্তর দেওয়ার আগে কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকল।“সব বিপদ চোখে দেখা যায় না।”কথাটা বলে সে লাইব্রেরির অন্য প্রান্তের দিকে চলে গেল।ইভলিন নিজের টেবিলে ফিরে এল। কিন্তু এবার বইয়ের কোনো শব্দই তার মাথায় ঢুকল না। সে শুধু অ্যালারিকের কথাগুলো ভাবছিল।“সব বিপদ চোখে দেখা যায় না।”বাইরে কুয়াশা আরও ঘন হয়ে উঠেছে। রাস্তার বাতিগুলো ঝাপসা দেখাচ্ছে।হঠাৎ জানালার বাইরে একটা কালো অবয়ূর্তি দ্রুত সরে গেল।ইভলিন চমকে উঠে দাঁড়াল।“কে ওখানে?”কোনো উত্তর নেই।সে জানালার কাছে এগিয়ে গেল। কুয়াশার মধ্যে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। ঠিক তখনই অ্যালারিক তার পাশে এসে দাঁড়াল।“ওদিকে তাকিয়ো না।”ইভলিন ঘুরে বলল, “তুমি কিছু দেখেছ?”“হ্যাঁ।”“কী?”অ্যালারিকের চোখ জানালার বাইরে স্থির।“একটা ছায়া।”“মানুষ?”“না।”ইভলিনের গলা শুকিয়ে গেল।“তাহলে কী?”অ্যালারিক কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, “আমি নিশ্চিত নই।”“তুমি কি ভয় পেয়েছ?”প্রশ্নটা শুনে অ্যালারিক ইভলিনের দিকে তাকাল।“আমি ভয় পাই না।”“তাহলে তোমার চোখে এত চিন্তা কেন?”অ্যালারিকের মুখে এবার কোনো হাসি নেই।“কারণ আমি বুঝতে পারছি না কেন সেটা তোমার দিকে তাকিয়ে ছিল।”ইভলিন কিছু বলল না।তারপর অ্যালারিক ধীরে ধীরে বলল, “ইভলিন, আজ রাতে তুমি যতটা সম্ভব মানুষের ভিড়ের মধ্যে থেকো। একা কোথাও যেও না।”“তুমি কি আমাকে অনুসরণ করবে?”অ্যালারিক একটু থেমে বলল, “হয়তো।”ইভলিন অবাক হয়ে তাকাল।“কেন?”“কারণ আমি জানতে চাই, ওই ছায়াটা আসলে কী চায়।”“আর যদি সেটা আমার জন্য আসে?”অ্যালারিকের চোখ আরও গাঢ় হয়ে উঠল।“তাহলে আমি থাকতে চাই।”ইভলিনের হৃদস্পন্দন অজান্তেই দ্রুত হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল না অ্যালারিকের কথায় কেন এত অদ্ভুত নিরাপত্তা অনুভব হচ্ছে।একদিকে ছেলেটাকে ঘিরে অসংখ্য প্রশ্ন। অন্যদিকে তার উপস্থিতিতেই যেন শহরের কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা গল্প নড়েচড়ে উঠেছে।অ্যালারিক জানালার দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, “আজকের রাতটা শান্ত থাকবে না।”ইভলিন তার দিকে তাকিয়ে রইল।“তুমি কি জানো কী ঘটতে যাচ্ছে?”অ্যালারিক ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।“না।”তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে বলল, “কিন্তু আমি অনুভব করতে পারছি... কিছু একটা আমাদের খুব কাছে চলে এসেছে।”বাইরে হঠাৎ বাতাসের ঝাপটা উঠল। কুয়াশা জানালার কাঁচ ঢেকে দিল। আর সেই ঘন সাদা কুয়াশার আড়ালে আবারও দুটি অস্পষ্ট ছায়া নড়ে উঠল।ইভলিন সেদিকে তাকিয়ে রইল।অ্যালারিক তার পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।দুজনেই জানত না সামনে কী অপেক্ষা করছে।কিন্তু সেদিন রাতেই উইলো ক্রিকের নীরবতার মধ্যে তাদের দুজনের জীবন এমন এক রহস্যের দিকে এগিয়ে গেল, যার প্রথম সংকেত তারা ইতিমধ্যেই দেখতে পেয়েছে।
চলবে.....