ফন্ট সাইজ:
থিম:
যেই তোমার হাওয়া আমাকে ছুঁলো

৩১তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

যেই তোমার হাওয়া আমাকে ছুঁলো

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৩১.

নিজের বড় ছেলে এবং একমাত্র মেয়ের হুট করে হয়ে যাওয়া বিয়েতে মনের অনেক শখ আহ্লাদই পূরণ করতে পারে নি আফজাল সাহেব এবং সাদিকা বেগম। কিন্তু সেইসব শখ ছোট ছেলের বিয়ের উছিলায় পূরণ করে নেওয়ার একটা সুযোগ পেতেই তারা তা লুফে নেন।

আজ শোভন এবং মধুমিতার হলুদ সন্ধ্যার অনুষ্ঠান। শোভনের ইচ্ছে অনুযায়ী দুজনের একসাথেই হলুদ হবে। হলুদের অনুষ্ঠানের জন্য চৌধুরী নিবাসের বাড়ির বাগান এবং ছাদ বেশ আকর্ষণীয় ভাবে সাজানো হয়েছে। ছাদে মূলত বর ও কনেকে হলুদ দেওয়া হবে। আর বাড়ির বাগানে গেস্টদের খাবারের আয়োজন করা হয়েছে।

বাড়ির বড় বউ হিসেবে তরী আজ সারাদিন শাশুড়ির সাথে বিভিন্ন কাজে হাত মেলাচ্ছে। সবশেষে শাশুড়ির কথা মতন মধুমিতা ঠিকঠাক তৈরি হচ্ছে কিনা কিংবা কিছু প্রয়োজন কিনা সেদিকটা দেখতে ব্যস্ত সে।

পার্থও আজ সারাদিন একমাত্র ভাইয়ের হলুদের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়ে বেশ দৌড়াদৌড়ি করছে। এক মুহুর্তের জন্যও তরীর দেখা পায়নি সে। সকল গেস্টরা ইতিমধ্যে এসে পড়েছে। সকলেই পালাক্রমে বাড়ির বড় বউয়ের খোঁজ করছে। পার্থ তাই আর অপেক্ষা না করে নিচে চলে আসে তরী তৈরি হয়েছে কিনা দেখতে।

__________

নিজের বেডরুমের কাঠের দরজাটা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করতেই আয়নার সামনে একটা অপ্সরা দেখতে পায় পার্থ। কমলা এবং গোলাপি রঙের মিশেলে জামদানি শাড়ি পরিহিত তরী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হলুদের বাটির থালাটা ফুল দিয়ে সাজাতে ব্যস্ত। দরজা খোলার শব্দ পেয়েই ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে পার্থকে দেখে বলে উঠে,

“ দেখুন না কেমন হয়েছে? আমি আগে কখনো সাজাই নি। “

তরী মূলত হলুদের স্বচ্ছ কাচের বাটিকে বুঝিয়ে এই কথাটা বলে। কিন্তু পার্থ তা শুনে না। সে এগিয়ে গিয়ে তরীর দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বলে,

“ অপূর্ব লাগছে। “

তরী সরু চোখে পার্থর দিকে মুখ তুলে তাকায়। মুহুর্তেই সে পার্থর দৃষ্টি দেখে তার বুকে মৃদু আঘাত করে রুম থেকে ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে,

“ আপনার এই দৃষ্টি আমি ভালো করে চিনি। একশো হাত দূরে থাকবেন আজকে আমার থেকে। বহু কষ্টে এই মেকাপ করেছি আর চুল খোপা করেছি। “

কথাটুকু বলে বেশিদূর যেতে পারে না তরী তার আগেই হাতে টান লেগে পিছিয়ে আসে সে। ব্যালেন্স বিগড়ে একহাতে থাকা হলুদের বাটিটা পড়ে যেতে নিলেই পার্থ নিজের ডানহাতে তা ধরে ফেলে। তরী সাথে সাথে ফুসে উঠে,

“ পার্থ! আম্মা আমাকে তাড়াতাড়ি উপরে যেতে বলেছে। শোভন আর মধুমিতাও অলরেডি উপরে চলে গিয়েছে। হলুদের অনুষ্ঠানে বর কনে সহ সকলে উপস্থিত কেবল হলুদই নেই। “

পার্থ ভ্রু কুচকে বলে,

“ যেতে মানা করেছে কে আপনাকে? “

“ হাত ছাড়ুন তাহলে। “

“ আমি কখন বললাম ছাড়বো না? “

“ উফ পার্থ! “

তরীর তাড়াকে তোয়াক্কা করে না পার্থ। সে একহাতে স্বচ্ছ কাঁচের বাটি হতে সামান্য হলুদ বাটা তুলে নিয়ে তরীর ঘাড়ের পিছনে লাগিয়ে দেয়। তরী চোখ বড় বড় করে বলে,

“ পাগল হয়ে গিয়েছেন? কার হলুদ কাকে দিচ্ছেন? “

“ আমাদের বিয়ের সময় আমি ব্যতীত সবাই আপনাকে হলুদ লাগিয়েছিলো। সেই হিসাবের খাতাটা তোলা ছিলো। আজ পূরণ করে নিলাম। “

তরীর বিরক্ত মাখা মুখে মুহুর্তেই সলজ্জ হাসি ফুটে উঠে। সেই হাসি দেখে পার্থ কপোকাত হয়। সকল তাড়া নিমিষেই মস্তিষ্ক থেকে মুছে যায়। কাচের বাটিটা একপাশে রেখে হাত বাড়িয়ে তরীর খোপায় গোজা বেলী ফুলের মালাটা একটানে খুলে ফেলে। মুহুর্তেই ঝরঝর করে পিঠময় ছড়িয়ে পড়ে কালো চুলের গোছা। পার্থ আবার খানিকটা হলুদ বাটা হাতে নিয়ে শাড়ির আঁচল ভেদ করে তরীর নির্মেদ পেটের একপাশে তা মেখে দেয়। অত:পর ফিসফিসিয়ে বলে,

“ হিসাব বুঝে নিয়েছি তরী রশীদ। চাইলে যেতে পারেন এখন। বাঁধা দিবো না। “

এইটুকু বাক্য শুনতেই তরী সাথে সাথে একহাতে বাটি এবং অন্য হাতে শাড়ির কুচি সামলে দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নেয়। দরজার কাছাকাছি যেতেই পার্থ পিছন থেকে বলে উঠে,

“ কেউ দেখে ফেলার ভয় মনে রাখবেন না। পার্থ মুন্তাসিরের স্ত্রী বাকি সকলের জন্য নিষিদ্ধ। যে চোখ তুলে তাকানোর সাহস করবে সে নিজের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলবে। “

__________

সকলের দৃষ্টি বর কনের দিকে থাকলেও বর ও কনে ব্যস্ত একে অপরকে দেখতে। কখনো নজর লুকিয়ে তো কখনো প্রকাশ্যে। অবশ্য এটা নিয়ে এই পর্যন্ত তাদের বন্ধুমহল কম লেগ পুল করে নি। তবুও তারা সেটার তোয়াক্কা করলো না। যেই প্রেমিক যুগল প্রেম করার সময়ই কখনো কারো তোয়াক্কা করে নি তারা বিয়ের একদিন আগেই বা কার পরোয়া করবে?

হলুদের একফাঁকে শোভন মধুমিতার দিকে অনিমেষ তাকিয়ে থেকে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,

“ অবশেষে তোমাকে আমার পাওয়া হলো মধু। “

মধুমিতা জবাব দেয় না। তাদের আজকের এই পরিণতির পিছনে সবটাই অবদান শোভনের। নিলখেত রোড হতে শুরু করে টিএসসি রোড পর্যন্ত সম্পূর্ণ সড়ক সাক্ষী শোভনের সেই অবদানের। উড়নচণ্ডী এক রমণীর মনে প্রথমে প্রেমের বীজ বুনন করে। অত:পর রোজ নিয়ম করে সেই ছোট্ট প্রেম চারায় পানি দিয়ে তাকে বৃদ্ধি পেতে সাহায্য করে। সেই ছোট্ট চারা আজ বড় বৃক্ষে রূপ ধারণ করেছে। শাখা-প্রশাখা, ডাল-পালা ছড়িয়ে ছায়া দিতে শিখেছে। সেইজন্য মধুমিতা শোভনের কাছে চির কৃতজ্ঞ।

__________

নিজের ছোট দা'র বিয়ে নিয়ে সবথেকে এক্সাইটেড থাকা পৃথা ছাদের এককোণে বসে আছে নীরব ভঙ্গিতে। বেশ অস্থির লাগছে তার। এতো লাউড মিউজিক ও মানুষের সমাগম আচমকাই তার কাছে বেশ অস্বস্তিকর ঠেকছে। তূর্যটাও উধাও হয়ে গিয়েছে যেনো এই বাসায় আসার পর থেকে। তার আম্মা বিয়ের এতো ব্যস্ততার মাঝেও একমাত্র মেয়ে জামাইর খাতির যত্নে কোনো কমতি রাখছে না। বরং ঢের বেশিই করছেন। তূর্য যদিও অনেকবার বলেছে তাকে নিয়ে এতো ব্যস্ত না হতে কিন্তু সাদিকা বেগম তা শুনলে তো!

পৃথার আর বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু চাইলেও এখান থেকে যেতে পারছে না। তাই দম খিচে বসে বসে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার প্রহর গুনছে। আচমকা তরী তার পাশে এসে বসে প্রশ্ন করে,

“ খারাপ লাগছে পৃথা? “

পৃথা শুকনো গলাটা এক ঢোক গিলে ভিজিয়ে সামান্য হেসে বলে,

“ না বড় ভাবী। এভাবেই বসে আছি। “

তরী শান্ত গলায় বলে,

“ ঠিক থাকলে তুমি এখানে চুপচাপ বসে থাকতে না। শরীর খারাপ লাগছে নাকি মন খারাপ? “

“ আসলে একটু মাথা ধরেছে ভাবী। “

তরী চিন্তিত গলায় বলে,

“ তাহলে এখানে বসে আছো কেন? নিচে রুমে যাও। রেস্ট করো। “

“ না ভাবী। আমি এখন ভাইয়ের বিয়ে রেখে গিয়ে নিচে বসে থাকলে কেমন দেখায় না বিষয়টা? “

“ বোকা মেয়ে। কেউ কিছু বলবে না। তুমি তোমার রুমে গিয়ে রেস্ট করো। আমি ছোটকে খুঁজে পাঠাচ্ছি। বলদটা এই বাসায় আসার পর থেকে বউ কিংবা বোন কাউকেই চিনছে না। “

পৃথা হেসে উঠে নিচে চলে যায়। তরী ব্যস্ত হয়ে সম্পূর্ণ ছাদ ঘুরে তূর্যকে খুঁজে বের করে। তারপর তাকে পৃথার কাছে পাঠিয়ে দেয়।

__________

তূর্য নিচে নেমে পৃথার রুমে প্রবেশ করতেই দেখে পৃথা দুই হাতে মাথা চেপে ধরে বিছানার এককোণে বসে আছে। তূর্য ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে তার সামনে বসে প্রশ্ন করে,

“ বেশি খারাপ লাগছে? মাথা টিপে দিবো? “

পৃথা কথা বলে না। কেবল মাথাটা সামনের দিকে ঝুকিয়ে তূর্যের হাতের বাহুতে ঠেক দেয়। তূর্য অপর হাতে আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। আচমকা পৃথা তার একহাত জাপ্টে ধরে বলে,

“ তূর্য মাথা ঘুরাচ্ছে প্রচুর। “

কথাটা বলতে বলতেই তার শরীর ঢলে পড়ে। তূর্য চিন্তিত ভঙ্গিতে পৃথাকে আগলে ধরে। সাথে সাথে তার মনে পড়ে যায় পৃথার ডায়াবেটিস আছে। আবারও কি ব্লাডে সুগার লেভেল কম হয়ে গিয়েছে নাকি? সে সাথে সাথে তরীকে কল করে। কিন্তু কিছুক্ষণ কল করার পরও তরী ফোন রিসিভ করে না। তূর্য পৃথাকে ডাকতে ডাকতে নিজের পাপার নাম্বার ডায়াল করতে নেয় কিন্তু তখনই তার রুমে সাদিকা বেগম প্রবেশ করে। তূর্য উনাকে দেখে সাথে সাথে বলে,

“ আম্মা আপিকে একটু ডেকে আনেন প্লিজ। পৃথা সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে। “

__________

রুমের মধ্যে পৃথা, তরী এবং সাদিকা বেগম উপস্থিত কেবল। বাকি সকলে দরজার অপরপাশে দাঁড়ানো। হলুদের অনুষ্ঠান ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছে। গেস্টরা সকলেই ফিরে গিয়েছে।

তরী পৃথার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,

“ তোমার সুগার লেভেল তো নরমাল আছে। “

পৃথা ক্লান্ত গলায় বলে,

“ জানিনা ভাবী, প্রচুর মাথা ঘুরাচ্ছে হঠাৎ করে। “

সাদিকা বেগম তরীকে রুমের একপাশে ডেকে নিয়ে নিচু স্বরে কিছু কথা বলে। সাথে সাথে তরীর মস্তিষ্ক সচল হয়। এতক্ষণ সে-ও এই সন্দেহ করে নি। নিশ্চিত হওয়ার জন্য তার একটু বের হতে হবে। তাই সাদিকা বেগমকে বলে,

“ আম্মা আপনি পৃথার সাথে থাকুন। আমি পাঁচ মিনিটেই ফিরছি। “

বলেই সে বেরিয়ে যায়। রুম থেকে বের হতেই সকলে তাকে ঘিরে ধরে। তরী আপাতত কিছু একটা বুঝ দিয়ে পার্থকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ আমার সাথে একটু সামনের ফার্মেসি চলুন। “

পার্থ চিন্তিত গলায় বলে,

“ কি লাগবে আমাকে বলো। আমি গিয়ে নিয়ে আসছি। “

“ না। আমার সাথে যেতে হবে। “

পার্থ আর বাড়াবাড়ি করে না। তরীকে নিয়ে এলাকার ফার্মেসিতে চলে যায়। ভাগ্যিস ফার্মেসি তখনো খোলা ছিলো। তরী একাই ভিতরে প্রবেশ করে কিছু একটা কিনে বেরিয়ে আসে। বাসায় ফিরে সাথে সাথে আবার পৃথার রুমের ভেতর চলে যায় সে। প্রায় পনেরো মিনিট পর সাদিকা বেগম ও তরী দুজনই বেরিয়ে আসে রুম থেকে। তরী শান্ত গলায় তূর্যকে বলে,

“ তুই ভিতরে যা। “

স্ত্রীর কাছে যাওয়ার অনুমতি পেতেই আর এক মুহুর্ত দেরি করে না তূর্য। দরজাটা লক করে রুমের ভেতর প্রবেশ করতেই বিছানার এককোণে বসে থাকা পৃথা তার দিকে মুখ তুলে তাকায়। তূর্য তার সামনে গিয়ে চিন্তিত গলায় বলে,

“ কি হয়েছে পৃথা? “

পৃথা কোনো জবাব না দিয়ে হাতে থাকা প্রেগন্যান্সি কিটটা তূর্যর দিকে তুলে ধরে। কিছুটা ডিজিটাল থার্মোমিটারের ন্যায় দেখতে বস্তুটির দিকে তূর্য ভ্রু কুচকে দুই সেকেন্ড তাকায়। অত:পর সেটাতে নীল রঙের দুটো দাগ দেখতে পেয়েই বিস্মিত নয়নে পৃথার দিকে তাকায়। পৃথা মনে সামান্য ভয় নিয়ে কাঁপা গলায় বলে,

“ আই এম প্রেগন্যান্ট তূর্য। “

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন