যেই তোমার হাওয়া আমাকে ছুঁলো
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৪৪.
সন্ধ্যা নেমেছে অনেকক্ষণ হলো। ফেইরি লাইটের সোনালী টিমটিমে আলোয় রুমটা আচ্ছাদিত হয়ে আছে। এককালে সর্বদা সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে থাকা তূর্যের রুমটা তার অনুপস্থিতিতেও এখন বেশ গোছানো থাকে। সেই গুছিয়ে রাখার পিছনে অবদানকারী রমণী পরিপাটি বিছানার এককোণে শুয়ে আছে ফোন কানে গুজে। বাংলাদেশ সময় এখন সন্ধ্যা সাতটা হলেও নিউজিল্যান্ডে এখন রাত দুটো বাজে। ফোনের এপাশ হতে রমণী একরাশ অভিমান নিয়ে বলে উঠে,
“ আমাদের প্রথম রমজানের মাস ছিলো তূর্য। প্রথম চাঁদ রাত, প্রথম ঈদ। আপনার অনুপস্থিতি আমার আর সহ্য হচ্ছে না। “
“ পনেরো দিন চলে গিয়েছে। আর পনেরোটা দিন অপেক্ষা করো। ফিরে আসবো তো শীঘ্রই। “
তূর্যর ফিরতে আরো পনেরো দিন বাকি ভাবতেও পৃথার দমবন্ধকর অনুভূতি হয়। সে বেশ নরম গলায় বলে উঠে,
“ আমি খুব অধৈর্য্য কিশোরীর ন্যায় আচরণ করছি। তাই না? বিয়ে হয়েছে, এক বাচ্চার মা হতে চলেছি তবুও নিজের এইরকম স্বভাব দূর করতে না পেরে আমি নিজের প্রতিই খুব বিরক্ত। “
ফোনের অপর পাশ হতে তূর্য স্লান হেসে বলে,
“ আমি তো তোমার প্রতি বিরক্ত অনুভব করি না পৃথা। “
শরতের সময় এখন। বর্ষার শুরুর দিকে পৃথা একটা বেলি ফুলের চারা কিনে বারান্দায় লাগিয়েছে। কিছুদিন হয়ে তাতে ফুল এসেছে। বারান্দার থাই দরজা খোলা থাকায় শিরশিরে বাতাসের সাথে সেই সুবাস ভেসে আসছে। সেটার সুবাসে মৌ মৌ করছে সম্পূর্ণ রুম।
ফোনের অপরপাশ হতে তূর্য ক্ষানিকক্ষণ চুপ থেকে প্রশ্ন করে,
“ বেবি কি করে? “
পৃথা মন খারাপ নিয়ে জবাব দেয়,
“ জানি না। আমি মা হয়েও ওর ব্যাপারে কিছু বুঝতে পারি না। আপনি ওর প্রয়োজন অপ্রয়োজন আমার থেকেও ভালো বুঝেন। “
তূর্য শান্ত গলায় বলে,
“ আমি তোমাকেও বুঝি পৃথা। “
পৃথা আর কিছু বলে না। আচমকা সে ফোন কেটে দেয়। তার টানা টানা অভিমানী চোখ জোড়া থেকে টপটপ করে পানি পড়তে শুরু হয়। তূর্যকে ছাড়া তার খুব শূন্য লাগছে। এই শূন্যতা কেবল তূর্যই মেটাতে পারবে। কবে আসবে তূর্য?
__________
সন্ধ্যায় ইফতারি সেড়ে এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে বেরিয়েছিল শোভন। এতোদিন পর বিদেশ ফেরত বন্ধুর সাথে দেখা হওয়ায় গল্প আড্ডায় কখন যে রাত নেমে আসে সেদিকে তার খেয়াল ছিলো না। বাড়ি ফিরতে ফিরতে দশটার উপর বেজে যায়। দশটার দিকেই তাদের বাড়ির সবাই যে যার রুমে ঘুমাতে চলে যায়। তাই শোভনও বাহির থেকে ফিরে সোজা নিজের রুমে চলে আসে।
নিজের রুমে প্রবেশ করতেই দেখে মধুমিতা বেশ আয়োজন করে গোলাপি রঙের একটা তাঁতের শাড়ি পড়ে বিছানায় শুয়ে বই পড়ছে। শোভন গায়ের ঘর্মাক্ত শার্টটা খুলতে খুলতে বলে উঠে,
“ এতো আয়োজন কিসের? “
মধুমিতা বইয়ে মুখ গুজে রেখে জবাব দেয়,
“ নিজের জন্য সকল আয়োজন। “
শোভন আর কোনো পাল্টা কথা বলে না। চুপচাপ গিয়ে বিছানার এককোণে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গাটায় সোজা হয়ে শুয়ে পড়ে। একহাত কপালের উপর আড়াআড়ি ভাবে রেখে চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টায় মগ্ন হয়। শোভনের এই কাজে মধুমিতা বেশ রাগ হয়। এই ডিউটিওয়ালা কি এই মাত্র তার মতো সুন্দরী বউকে ইগনোর করে ঘুম বেছে নিলো? এর শোধ মধুমিতা তুলেই ছাড়বে। দেখে নিবে এই ডিউটিওয়ালা শান্তিতে ঘুমায় কিভাবে।
মধুমিতা চুপচাপ বিছানা ছেড়ে নেমে রুমের যত লাইট আছে সব জ্বেলে দেয়। বিছানার কাছে এসে ল্যাম্পের লাইটও শব্দ তুলে জ্বেলে দেয়। অত:পর বড় বড় পা ফেলে বিছানায় গিয়ে একপাশ ফিরে চোখ বুজে শুয়ে রয়। লাইট অন থাকলে যে শোভনের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে তা তার অজানা নয়। তাই ইচ্ছে করেই এই কাজটা করেছে সে।
বেশ কিছুক্ষণ সময় পেরোয়। মধুমিতা হঠাৎ টের পায় শোভন বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। সাথে সাথে মধুমিতা শক্ত করে নিজের চোখ বুজে ঘুমানোর অভিনয় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শোভন সব লাইট বন্ধ করে ফের বিছানায় এসে শুতেই মধুমিতা পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়। মনে মনে ঠিক করে সে আবার নেমে সব লাইট অন করে দিবে। ঠিক সেই মুহুর্তেই পিছন থেকে ঠান্ডা একজোড়া হাত তাকে নিজের কাছে টেনে পিছন থেকে আঁকড়ে ধরে। তার কাধে নিজের নাক ঘষে বলে উঠে,
“ একজনের জন্য করা আয়োজনকে নিজের নামে বলে চালিয়ে দেওয়া একটা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই অপরাধে আপনার জরিমানা দায়ের করা হলো। “
মধুমিতা ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
“ কি জরিমানা? “
“ সুন্দরী বলে জরিমানার পরিমাণ কমিয়ে দিলাম। কেবল একশো মধুময় চুমুতেই চলবে। “
__________
সন্ধ্যায় ডাইনিং টেবিলে পার্থ আর শোভন মুখোমুখি বসে আছে। টেবিলে বসে আছে আফজাল সাহেব এবং সাদিকা বেগমও। মাগরিবের আজান হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ। আফজাল সাহেব বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ইফতারি খেলেও সাদিকা বেগম মুখ টিপে হাসছে। এমনকি জমিলা খালাও বাদ যাচ্ছে না। শোভন এবং পার্থ একে অপরের দিকে আড়চোখে বারবার তাকাচ্ছে। তাদের স্বীয় স্ত্রী দ্বয় আজ রান্নাঘর ছেড়ে বের হচ্ছে না। কেবল খেজুর খেয়ে রোজা খুলেই কাজের অযুহাত দেখিয়ে রান্নাঘরে চলে গিয়েছে। এর কারণও তারা বেশ ভালো করে বুঝতে পারছে। অপরাধ করে তাদের ফাঁসিয়ে দিয়ে অপরাধীরা ঠিকই এখন নিজেরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
পার্থ এবং শোভন দুজনেই খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের শার্টের কলার টেনে গলার একপাশে রক্ত জমে যাওয়া কালচে দাগটা ঢাকতে ব্যস্ত। আজ সারাদিন সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘরের বাইরে থাকলেও এই মুহুর্তে আর তাদের পালানোর কোনো জায়গা নেই। আফজাল সাহেব যত দ্রুত সম্ভব খাবার সেড়ে সেখান থেকে কেটে পড়লেন। নিজের রুমে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি গলা ছেড়ে স্ত্রীকে তলব করেন। স্বামীর ডাক শুনতেই সাদিকা বেগম হাসতে হাসতে নিজের রুমের দিকে চলে যায়। ডাইনিং রুমে এখন পার্থ আর শোভন ব্যতীত আর কেউ নেই।
পার্থ তরীর বানানো কাবাবের শেষ অংশটুকু মুখে পুড়ে বেশ বিরক্ত মুখে বলে উঠে,
“ বাসায় হঠাৎ ছাড়পোকা খুব বেড়েছে মনে হচ্ছে। এদের কামড়ের জ্বালায় আর টেকা যাচ্ছে না। এশার নামাজ পড়ে বাসায় ফেরার পথে ছাড়পোকার ওষুধ কিনে আনতে হবে। “
শোভনও খাওয়া শেষ করে পানি খেয়ে উঠে দাঁড়ায়। কিছু বুঝে না এমন একটা ভাব করে ভাইয়ের সাথে তাল মিলিয়ে বিরক্ত মিশ্রিত সুরে বলে উঠে,
“ তেলাপোকার পরিমাণও খুব বেড়েছে। আমিও বাসায় ফেরার সময় তেলাপোকা মারার ওষুধ কিনে আনবো। “
তাদের কথার মাঝেই রান্নাঘরের দরজা হতে হাসির শব্দ ভেসে আসে। পার্থ আর শোভন হতভম্ব ভঙ্গিতে সেদিকে তাকাতেই দেখে তরী এবং মধুমিতা খাবারের বাটি হাতে লজ্জায় মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সামনে দাঁড়ানো জমিলা খালাই শব্দ করে হাসছে। পার্থ আর শোভন মনে মনে ভাবে জমিলা খালা কি তাদের বলা কথা শুনে ফেললো নাকি? দুজনেই আরেকদফা লজ্জায় পড়ে যায়। পার্থ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে উঠে,
“ তরী, আমি বাহিরে যাচ্ছি। বাসায় ফিরতে রাত হবে। কেউ জেগে আমার অপেক্ষা করো না। “
শোভনও তাড়া দেখিয়ে বলে উঠে,
“ মধু, এসে দরজা লাগাও। আমিও বাহিরে যাচ্ছি। “
কথা শেষ করতেই দুই ভাই তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে দুই দিকে হাঁটা ধরে। আজকে আর কারো মুখোমুখি পড়তে চায় না তারা। মাঝরাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তবেই বাড়ি ফিরবে বলে ঠিক করে তারা।
___________
দেখতে দেখতে সাতাশটা রোজা চলে গেলো। ঘড়িতে ক'টা বাজে জানা নেই পৃথার। অন্ধকার রুমটা জ্যোৎস্নার মেলায় মৃদু আলোকিত। বারান্দার খোলা থাই দরজা হয়ে ঝিরঝিরে বাতাসের সঙ্গে মৃদু ঠান্ডাভাব বয়ে আসছে। আম্মা থাকলে নিশ্চিত এখন পৃথাকে বড় করে একটা ধমক দিতো এই রাতের দিকে দরজা খোলা রাখার অপরাধে। আম্মার ভাষ্যমতে গর্ভাবস্থায় নাকি সহজেই মেয়েদের খারাপ বাতাস লেগে যায়। এ নিয়ে পৃথাকে বেশ নিষেধাজ্ঞার তালিকাও তিনি ধরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পৃথা সেসবের প্রতি খুবই উদাসীন। এসব ধরাবাঁধা নিয়ম মেনে চলার অভ্যাস তার নেই কখনো।
বিছানার হেডসাইডে পিঠ হেলান দিয়ে বসে আছে সে। শাড়ির আঁচলটা বিছানা গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে আছে অবহেলায়। উদাসী দৃষ্টি বয়ে অভিমানের অশ্রু ঝড়ছে। চরম অভিমান নিয়ে সেদিন ফোন কেটে দেওয়ার পর থেকে সে আর তূর্যর কোনো ফোনকল রিসিভ করে নি। সিন করেনি কোনো ম্যাসেজও। তূর্য নামক মানুষটার উপর তার জমে রয়েছে চরম অভিমান। এই লোকটা পৃথার মিষ্টতাও চুরি করে সাথে নিয়ে দূর দেশে চলে গিয়েছে। পৃথার সব কিছুই এখন তিক্ত মনে হয়।
তার পাশাপাশি তার বাচ্চাটাও হয়তো নিজের বাবার অনুপস্থিতি হারে হারে টের পাচ্ছে। সেজন্যই হয়তো খাবার দাবারের প্রতি জারি করেছে নীরব বিদ্রোহ। গত ক'দিন ধরে পৃথা যাই মুখে দিচ্ছে তা-ই গলা দিয়ে আর নামছে না। বমি হয়ে শরীর ছেড়ে দিচ্ছে বারবার। হুমায়ুন রশীদ আর আম্মার ঠিক করা আয়না খালা এ নিয়ে বেশ চিন্তিত।
আচমকা কলিংবেলের শব্দটা সম্পূর্ণ বাড়ির নিস্তব্ধতা ভেঙে তীক্ষ্ণ স্বরে বেজে উঠে। এই সময়ে আবার কে এলো? প্রশ্নটা মনে উঁকি দিলেও পৃথা উঠে গিয়ে দেখার শক্তি খুঁজে পায় না। পাপা আর আয়না খালা নিচে আছে। উনারাই নাহয় দেখে নিবে ভেবে পৃথা নিজের ক্লান্ত চোখ জোড়া বুজে নেয়।
পনেরো থেকে বিশ মিনিটের মাথায় রুমের দরজার নব ঘুরানোর শব্দ কানে পৌঁছাতেই পৃথা চোখ মেলে পাশ ফিরে তাকায়। মুহুর্তেই তার বিস্মিত, স্তম্ভিত চোখ জোড়া বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু ফোটা জল। তড়িৎ গতিতে বিছানা ছেড়ে নামতে নিলেই শাড়ির আঁচলের সাথে পা পেঁচিয়ে পড়তে নেয়। কিন্তু ভাগ্যক্রমে একটা বলিষ্ঠ বুকে তার জায়গা হয়। স্তম্ভিত পৃথা সেখান থেকে সড়ে যাওয়ার আর সাহস পেলো না। যদি এটা স্বপ্ন হয়? এই ভয়ে তার শরীর কাঁপিয়ে কান্না পাচ্ছে। কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণ করে একটা শীতল স্বর বলে উঠে,
“ তোমাকে রেখে কোথাও গিয়ে শান্তি পাবো না আমি। “
চলবে…