ফন্ট সাইজ:
থিম:
যেই তোমার হাওয়া আমাকে ছুঁলো

৪৭তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

যেই তোমার হাওয়া আমাকে ছুঁলো

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৪৭.

বছর ঘুরে আবার এসেছে শীতকাল। ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে ঢাকা শহর। ফাইনাল এক্সাম দিয়ে সবেমাত্র ভার্সিটি থেকে বেরিয়েছে মধুমিতা। সাথে সাথে তার চোখে পড়লো একজন হাওয়াই মিঠাই ওয়ালাকে। মধু মনে মনে বেশ খুশি হলো। এতক্ষণ ধরে তার মিষ্টি কিছু খেতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। মনের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে মধুমিতা একটা গোলাপি রঙা হাওয়াই মিঠাই কিনে নিলো। অত:পর টিএসসি চত্ত্বরের একপাশে বসে সে রাস্তার দিকে দৃষ্টিপাত করে হাওয়াই মিঠাই খেতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

এরকমই কোনো এক শীতের বিকেলে তার আর শোভনের প্রথম দেখা হয়েছিলো। ঠিক তার ভার্সিটির সামনেই। কিছুদিন যেতেই মধু লক্ষ্য করে শোভন নামক এই ছেলেটাকে প্রায়শই তার ভার্সিটি এরিয়া তে দেখা যায়। প্রথম প্রথম মধুমিতা দেখেও না দেখার ভান করে হলে ফিরে যেতো। কিন্তু একদিন সে সাহস নিয়ে শোভনের মুখোমুখি হয়। কপট রাগ দেখিয়ে প্রশ্ন করে,

“ কি চাই? “

শোভনের অকপটে জবাব,

“ তোমাকে চাই। নিজের ঘরের বউ হিসেবে। “

লোকটার এমন লাগামহীন কথায় মধু সেদিন বিরক্ত হয়। রাগ নিয়ে বলে,

“ এই ছেলে? কি মনে করো নিজেকে? কোন সিনেমা দেখে এসে এসব ফিল্মি ডায়লগ ছাড়ছো? “

“ আমি বড় হয়েছি কেবল একজনের সিনেমা দেখেই। দেব দা। শিরায় শিরায় রক্ত, আমি দে দা'র ভক্ত। “

শেষের লাইনটা বলে শোভন বিস্তর হাসে। মধুমিতার গা জ্বলে যায় সেই হাসি দেখে। সে শাসিয়ে বলে,

“ আর কখনো যেনো আমার আশেপাশে না দেখি। নাহলে গুন্ডা ভাড়া করে ধরে পেটাবো। আর তবুও দূর না হলে পুলিশে কেস করবো। “

“ এনিটাইম ম্যাডাম। আমি থানায় ডায়েরি খুলে বসে থাকবো আপনার অভিযোগ তুলে নিতে। “

মধুমিতা বিরক্ত হয়। এই লোককে হুমকি ধামকি দিয়ে লাভ নেই বুঝতে পারে। তাই সে নীরবে চলে যেতে উদ্যত হয়। শোভন সেদিন তাকে পিছু ডেকে বলেছিলো,

“ এইযে মিস মধু। আপনাকে কিছু বলার ছিলো। “

মধু ঘাড় ঘুরিয়ে ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করে কি? শোভন হাসতে হাসতে দু লাইন গেয়ে উঠে,

“ ও মধু, ও মধু,

আই লাভ ইউ,

আই লাভ ইউ। “

মধু বিস্ময়ে বাকহারা হয়ে পড়ে। অত:পর ফুসে উঠে বলে,

“ আপনি কি এইমাত্র আমাকে টিজ করলেন? “

“ মোটেও না। আমি শুধু দেব দা'র সিনেমার একটা গানের দুটো চরণ গেলাম। “

পুরনো স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠতেই মধুমিতা আপনমনে হেসে উঠে। তাদের সাদামাটা প্রেমের সাক্ষী এই টিএসসিকে হঠাৎ করেই তার খুব ভালো লাগছে। টিএসসির বাতাসে হাজারো প্রেমের কাহিনীর মাঝে মিশে আছে তাদের সাদামাটা প্রেমের ঘ্রাণও।

__________

হসপিটাল থেকে বেরয়েই ধানমন্ডির একটা শপিং মলের বেবি শপে এসেছে তরী। উদ্দেশ্য নিজের ভাজতির জন্য সুন্দর কিছু জামা এবং খেলনা কেনা। যদিও আম্মা ইতিমধ্যে নিজের নাতনির জন্য অসংখ্য জামা এবং নিমা বানিয়েছেন। তবুও তরীর ইচ্ছা সে নিজেও পছন্দ করে তার ভাজতিকে কিছু জামা এবং খেলনা উপহার দিবে। বেবি শপে ঘুরতে ঘুরতে তরী আচমকা দেয়ালের পাশে থাকা এক আয়নার দিকে তাকায়। সাথে সাথে সে তড়িৎ গতিতে পিছনে ফিরে তাকিয়ে সামান্য গলা উঁচু করে ডাকে,

“ ছোট? “

তরীর গলা শুনে আশেপাশের কিছু মানুষ ক্ষানিকের জন্য তার দিকে তাকায়। অত:পর যে যার কাজে ফের মন দেয়। তূর্যও ফিরে তাকায়। বোনের সাথে অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা হয়ে সে অবাকও হয় এবং খুশিও। তরী এগিয়ে যেতেই প্রশ্ন করে,

“ তুই এখানে কি করিস আপি? “

তরী নিজের ভাইয়ের দু'হাতে থাকা কতগুলো মেয়ে বাচ্চার জামা দেখে বলে,

“ তুই যেই কাজে এসেছিস আমিও সেই কাজেই এসেছি। “

তরীর কথার মানে বুঝতে পেরে তূর্য হাসে। তরী প্রশ্ন করে,

“ একা এসেছিস? “

“ হ্যাঁ। অফিস থেকে বের হয়ে সোজা এখানে আসলাম। পৃথার পায়ে পানি জমার কারণে ওকে আপাতত বাসা থেকে বের হতে দেই না। তাই ও বাসায় বসে অনলাইন শপিং করে আর আমি স্ব শরীরে এসে। “

তরী হেসে বলে,

“ তোরা দুইটাই পাগল। আমাদেরও সুযোগ দে কিছু কেনার। “

তূর্য আর তরী গল্প করতে করতে আরো কিছু শপিং করে বেরিয়ে একটা কফিশপে বসে। কফি অর্ডার দিয়েই তরী বলে,

“ দেখ আমি কিন্তু আগেই বলে দিচ্ছি, বেবি আমাকে ফুপ্পি ডাকবে। যদি পার্থর পাল্লায় পড়ে ওকে মামী ডাক শিখিয়েছিস তাহলে তোকে আর পার্থকে আমি তুলে আছাড় মারবো। “

“ বাপরে! তুই এটা নিয়ে আবার ভাইয়ার সাথে ঝগড়া করেছিস নাকি? “

“ আলবাত করেছি। অসভ্য লোক বলছিলো ও মামা হলে আমি মামী হবো। আমিও বলে দিয়েছি আমি ফুপ্পি হলে উনি ফুফা হবে। ব্যস! এই নিয়ে ওর সাথে আমার খুব সিরিয়াস ঝগড়া হয়েছে। “

তূর্য হেসে বলে,

“ শিট। তারমানে তোদের বেবি আসলে এরকম ঝগড়া আমার আর পৃথারও ফেস করতে হবে। “

তরী চোখ টিপে বলে,

“ চাপ নিস না। আমার বাচ্চা তোকে মামাই ডাকবে। আফটার অল আমার একমাত্র ভাই তুই। “

তূর্য হেসে একটা প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিয়ে বলে,

“ একবছরে আমাদের জীবন কতো বদলে গেলো না আপি? গতবছরও আমার জীবনে প্রায়োরিটি লিস্টে শুধু কাজ আর ফ্যামিলি ছিলো। আর এখন বছর ঘুরতে না ঘুরতে আমার ফ্যামিলিতে এবং প্রায়োরিটি লিস্টে দুজন নতুন মানুষ যোগ হয়ে গেলো। টু বি অনেস্ট আমি ছোট থাকতে জেলাস ফিল করতাম যে পাপা হয়তো তোকে বেশি আদর করে। কিন্তু এখন নিজে ফিল করতে পারছি। মেয়ের বাবা হওয়া ইজ সাচ এ ব্লেসিং। আই এম অলরেডি এটাচড টু হার। তুই দেখিস আমার মেয়েও তার পাপার প্রিন্সেস হবে। “

তরী মুগ্ধ চোখে নিজের ভাইকে দেখতে ব্যস্ত। তূর্যর চোখে মুখে ফুটে আছে খুশির রেখা। তরী টেবিলের উপর থাকা ভাইয়ের একহাতের উপর নিজের হাত রেখে বলে উঠে,

“ ইউ উইল বি এ গুড ফাদার আই নো। আমাদের ছোট্ট মা অলরেডি তার পাপার প্রিন্সেস। “

__________

সেন্ট মার্টিন দ্বীপের বুকে ফের ফিরেছে পার্থ এবং তরী। গতবার শাশুড়ির কথায় বাধ্য হয়ে আসলেও এবার তরী স্ব ইচ্ছায় ঘুরতে এসেছে। আচমকা সমুদ্র তাকে খুব টানছিলো। মনের টানকে নাকি কখনো ফিরিয়ে দিতে নেই। তরী পার্থর কাছে প্রস্তাব রাখে সমুদ্রে ঘুরে আসার প্রসঙ্গে। পার্থ নাকোচ না করলেও বলেছিলো ব্যস্ততা মিটলেই সে তরীকে নিয়ে যাবে সমুদ্রে। পার্থর সেই ব্যস্ততা মিটতে লেগে গেলো একটা মাস। এক মাস পর হলেও দ্বীপে এসে তরী খুশিতে উৎফুল্ল হয়। বহু কষ্টে সে তিনদিনের ছুটি ম্যানেজ করেছে হসপিটাল থেকে। কর্ম জীবনের ব্যস্ততা থেকে মাঝেমধ্যে ছোট খাটো ব্রেক মস্তিষ্ক এবং বদনে সজীবতা এনে দেয়।

সেই একই বাংলোতে এসে তরী মনটা দূর্দান্ত রকমের ভালো হয়ে যায়। সে মনে মনে এই বাংলোটাতেই আসতে চাইছিলো। কিন্তু মুখ ফুটে আর পার্থকে বলা হয়নি। ভাগ্যিস পার্থ অন্য কোথাও তাকে নিয়ে যায় নি।

বাংলোতে প্রথম দিন তাদের পৌঁছাতে পৌঁছাতেই সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। একে তো জার্নির ক্লান্তি ভাব তার উপর রাতের বেলা তাই তারা আর বেরোয় নি। খেয়েদেয়ে সোজা ঘুমিয়ে শরীর সতেজ করে। পরের দিন দুপুরে সি ফুড দিয়ে লাঞ্চ করে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়েই দু'জন বেরিয়ে পড়ে দ্বীপ ঘুরে দেখতে। বাসায় সবসময় তরী থ্রি পিস পড়ে থাকলেও এখানে আসার সময় লাগেজে করে শুধু শাড়িই নিয়ে এসেছে। আজকে সে হালকা ধূসর এবং লাল রঙের মিশ্রিত একটা শাড়ি পড়েছে। আয়োজন করে বেশ সেজেছেও।

কিন্তু যার জন্য এতো আয়োজন তার কোনো পাত্তাই নেই। পার্থ আপনমনে সমুদ্রের তীরে পা ভিজিয়ে হেঁটে চলেছে। তার দৃষ্টি স্থির এই অপার্থিব সুন্দর প্রকৃতির দিকে। দূরে বালির উপর হেঁটে চলা তরীর মন খারাপ হয়। সে হাঁটা ছেড়ে বালির উপর নিজের জুতো জোড়া খুলে তার পাশে পা ভেঙে বসে পড়ে। অত:পর দূর হতে পার্থকে দেখতে থাকে। হালকা গোলাপি রঙের শার্ট এবং সাদা রঙের প্যান্ট পরিহিত সেই পুরুষ আপনমনে সমুদ্রের তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে বেশ দূরে চলে যায়। তরী যে তার পাশ হতে কখন সড়ে গেলো যেনো টেরও পেলো না।

তরী নিজের মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকায়। এই শীতকালে দূর দূর পর্যন্ত দ্বীপের বুকে বৃষ্টি নামার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবুও যদি প্রকৃতি নিয়ম বদলে বর্ষণ ঘটাতো তবে কেমন হতো? পার্থ কি তবে এই মুহুর্তে দৌড়ে এসে তরীর হাত ধরে বাংলোর দিকে ছুট লাগাতো সেদিনের মতো? পুরো দ্বীপ জুড়ে কি ইলেক্ট্রিসিটি নিশ্চল হয়ে পড়তো? আসতো কি সেই ঝড়ো বেপরোয়া রাত?

তরীর কান মুহুর্তেই গরম হয়ে উঠলো। মনে মনে নিজেকে শুধালো,

“ দিন দিন খুব নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছিস তরী। “

পরমুহূর্তেই তার মস্তিষ্ক বলে উঠে,

“ কিসের নির্লজ্জ টির্লজ্জ? কোনো পরপুরুষ নিয়ে তো আর ভাবছিস না। যাকে নিয়ে ভাবছিস সে তোর নিজেরই স্বামী। এই লোককে তুই চোখ দিয়ে গিলে খেলেও কোনো পাপ নেই। “

তরীর ভাবনার মাঝেই পার্থ আচমকা তার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসলো। দৌড়ে আসার ফলে বার কয়েক হাফ ছাড়লো। অত:পর বলে,

“ হাত দাও তো তরী। “

আচমকা পার্থ এভাবে সামনে এসে পড়ায় তরী হকচকিয়ে উঠে। কিছুক্ষণ পার্থর দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় প্রশ্ন করে,

“ কি? “

পার্থ নিজেই তরীর একহাত টেনে ধরে। অত:পর তার হাতের তালুতে কিছু একটা দেয়। তরী প্রথমে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেও পরে নিজের হাতের তালুতে থাকা তিনটা ছোট শুভ্র ঝিনুককে দেখে খুশি হয়। হাসিমুখে বলে,

“ এতক্ষণ ঝিনুক কুড়াচ্ছিলে? “

পার্থ হাসি চেপে বলে,

“ উহু। নিজেকে সংবরণও করছিলাম। অতি সুন্দর বউয়ের দিকে তাকিয়ে ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙতে চাইছিলাম না। “

পার্থর চাপা হাসি দেখে তরীর শ্যাম বর্ণের মুখশ্রী লজ্জায় লাল হয়। সে তড়িৎ অপর হাতে নিজের জুতো জোড়া তুলে উঠে দাঁড়িয়ে মিছে রাগ দেখিয়ে বলে,

“ মিথ্যুক। “

তরীর কথা শেষ হওয়ার আগেই সে নিজেকে শূন্যে অনুভব করে। দুই হাতে পার্থর ঘাড় জড়িয়ে ধরে বলে,

“ কি করছো? “

পার্থ তরীকে পাজাকোলে তুলে নিয়ে বাংলোর পথে হাঁটতে হাঁটতে প্রাণখোলা হাসি নিয়ে গেয়ে উঠে,

“ সারদি কি রাতো মে,

হাম সোয়ে রাহে এক চাদার মে,

হাম দোনো তানহা হো,

না কোয়ি ভি রাহে ইস ঘার মে। “

এই দফায় আর তরী লজ্জা পায় না। বরং মুগ্ধ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে পার্থর দিকে। তার মুগ্ধতার সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে থাকে পার্থর গুনগুনিয়ে গাওয়া গানের চরণ।

__________

শীত ঋতু বিদায় নিয়েছে সবে ক'দিন হলো। কোনো এক শুক্রবার সন্ধ্যার ঘটনা। পৃথার লেবার পেইন উঠে। খিচুনিযুক্ত ব্যথা তীব্র থেকে তীব্রতর রূপ ধারণ করে। তূর্য ঘাবড়ে যায়। ডেলিভারি ডেট তো পরের মাসে দিয়েছে ডক্টর। এই আগাম পেইনের মানে কি? দিশাহারা তূর্য দ্রুত নিজের পাপাকে ডেকে পৃথাকে নিয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সম্পূর্ণ রাস্তা জুড়ে আগলে রাখে পৃথাকে নিজের বুকে। হুমায়ুন রশীদ গাড়ির লুকিং গ্লাসে ছেলের চিন্তিত মুখশ্রী এবং পুত্রবধূর কান্না দেখে সাবধানের সহিত গাড়ির স্পিড বাড়ায়। পৃথা কান্না জর্জরিত স্বরে বারবার বলে যাচ্ছিলো,

“ আমার আব্বা আম্মাকে কল করুন প্লিজ। আমি মনে হয় আর বাঁচবো না। “

পৃথার যন্ত্রণায় জড়িত কণ্ঠ শুনে তূর্য অসহায় অনুভব করে। ঘাবড়ানো পৃথাকে আশ্বাস দিয়ে বলে,

“ কিছু হবে না তোমাদের। দুজনেই সুস্থ থাকবে ইনশাআল্লাহ। “

ওটির ভেতর নিয়ে যাওয়া হয়েছে পৃথাকে। ডক্টর জানিয়েছে তার নরমাল ডেলিভারির লেবার পেইন উঠেছে তাই তারা নরমালেই চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে সবাই হসপিটালে এসে পৌঁছেছে। তরী ভাগ্যক্রমে আগে থেকেই হসপিটালে উপস্থিত ছিলো। ও তাই পারমিশন নিয়ে ওটির ভেতর নিজেও সামিল থাকছে পৃথার পাশে। তূর্য অশান্ত ভঙ্গিতে ওটির সামনে করিডর জুড়ে পায়চারি করছে। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে উঠছে। সময়ের আগে তার মেয়ের আগমন ঘটার কারণ কি? তূর্য তো পৃথার ব্যাপারে সব নিজ দায়িত্বে হ্যান্ডেল করেছে। তার দ্বারা কি কোথাও ভুল হয়েছে? পৃথা ঠিক থাকবে তো?

তূর্যর ভয়ে ধুকপুক করা হৃদয়টা শান্ত হয় ওটির দরজা খুলে তরীকে বেরিয়ে আসতে দেখে। তরীর কোলে হালকা গোলাপি রঙের টাওয়ালে মোড়ানো একটা ফুটফুটে শিশু। তরী ভাইয়ের দিকে আগে এগিয়ে গিয়ে বাচ্চাকে এগিয়ে দেয়। তূর্য আগে রুদ্ধস্বরে প্রশ্ন করে,

“ পৃথা? “

তরী হেসে শুধায়,

“ আলহামদুলিল্লাহ। ঠিক আছে। “

তূর্যর বুকের ওপর থেকে যেনো বিশাল পাথর সড়ে গেলো। সে মেয়েকে কোলে নিতে গিয়েও থেমে যায়। হুমায়ুন রশীদের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বলে,

“ পাপা ও অনেক ছোট। আমার হাত গড়িয়ে পড়ে গেলে? “

ছেলের এমন কথা শুনে হুমায়ুন রশীদ হাসেন। হাসে বাকিরাও। পার্থ তূর্যর পিঠ চাপড়ে বলে,

“ বুকে আগলে নাও মেয়েকে। কিছু হবে না। “

তূর্য কম্পিত হাতে মেয়েকে তুলে নেয় কোলে। মেয়ে তার ছোট ছোট চোখ মেলে নিজের পাপাকে দেখতে ব্যস্ত। তূর্যর মনে হয় তার মেয়ে তাকে বলছে,

“ হ্যালো পাপা। অগ্রীম এসে চমকে দিলাম তো? “

নিজের মনের উদ্ভট ভাবনার উপর তূর্য নিঃশব্দে হাসে। আফজাল সাহেব মেয়ের জামাইকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,

“ বাচ্চার কানের কাছে আজান দাও বাবা। “

__________

হসপিটাল হতে চারদিনের মাথায় বাড়ি ফিরেছে পৃথা। তার বাবার বাড়ির সবাইও আজ এই বাসায় উপস্থিত। সবাই ব্যস্ত তারিণীকে ঘিরে। হুমায়ুন রশীদ এবং তূর্য মিলে ঠিক করেছে তিনদিন পর পবিত্র শুক্রবারে তারিণীর আকিকার অনুষ্ঠান আয়োজন করবে। সেই বিষয়ে আলোচনা চলছে লিভিং রুম জুড়ে। পৃথা বাড়ি ফিরে কিছুক্ষণ নিচে সবার সাথে বসে ছিলো। তূর্য তাকে বসিয়ে রেখে উপরে রুমে কি যেনো করতে গিয়েছে।

পৃথা যখন নীরবে সাদিকা বেগমের পাশে বসে বিভিন্ন আদেশ বাক্য শুনতে ব্যস্ত তখনই তূর্য উপর থেকে নেমে এলো। শাশুড়ি মায়ের দিকে তাকিয়ে হেসে শুধায়,

“ আমি পৃথা আর তারিণীকে রুমে নিয়ে যাই আম্মা? “

সাদিকা বেগম ব্যস্ত গলায় নাতনিকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,

“ হ্যাঁ বাবা। চলো। “

তূর্য সামান্য ইতস্ত অনুভব করে। মাথা নিচু করে বলে,

“ আমি দুজনকেই সামলে নিতে পারবো আম্মা। “

সাদিকা বেগম সেকেন্ড খানিক চুপ থাকে। অত:পর হেসে তারিণীকে তূর্যর কোলে দিয়ে বলে,

“ আচ্ছা সমস্যা নেই। “

তূর্য হেসে একহাতে তারিণীকে কোলে নিয়ে এবং অন্যহাতে পৃথার হাত ধরে লিভিং রুম থেকে বেরিয়ে আসে। সিঁড়ির কাছাকাছি আসতেই সে তাকিয়ে দেখে আশেপাশে কেউ আছে নাকি। কেউ নেই বুঝতেই তারিণীকে পৃথার কোলে দিয়ে দু'জনকে একসাথে কোলে তুলে নেয়। পৃথা ঘাবড়ে উঠে। শক্ত করে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে মিনমিনে গলায় শুধায়,

“ পড়ে যাবো। প্লিজ নামান। “

তূর্য সিঁড়ি ভেঙে উঠতে উঠতে বলে,

“ পড়তে দিলে তো পড়বে! “

রুমের দরজা আগে থেকেই খোলা ছিলো। তূর্য দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একবার মেয়ে অত:পর স্ত্রীর পানে তাকিয়ে হেসে বলে,

“ ওয়েলকাম টু আওয়ার ফেইরিল্যান্ড। “

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন