ফন্ট সাইজ:
থিম:
ত্রিকোণমিতি

২য় পর্ব

লেখক: আয্যাহ্ সূচনা

ত্রিকোণমিতি ~ ২

রচয়িতা - আয্যাহ সূচনা
দেয়ালঘড়িতে তখন রাত দশটা। লম্বা ডাইনিং টেবিলে রাতের খাবার খেতে বসেছে পুরো শিকদার পরিবার। একটা অদ্ভুত গুমোট পরিবেশ বিরাজমান পুরো ডাইনিংরুম জুড়ে। চামচ আর প্লেটের আওয়াজ ব্যতীত অন্য কোনো আওয়াজ নেই। এর মুখ্য কারণ দুই ভাইয়ের মধ্যকার মনোমালিন্য। কায়সার শিকদার ভীষণ রেগে আছেন কবির শিকদারের ওপর। সেটা নতুন কিছু না। মাঝেমধ্যেই এই রেষারেষি চলে।
কবির শিকদার বারবার ভাইয়ের গোমড়া মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। কিছু বলবেন কি বলবেন না, সেটা ভাবছেন। কিছু বললে যদি আবার খেপে যান তিনি? অগত্যা চুপ রইলেন। শায়লা বেগম ছেলেমেয়েদের পাতে খাবার তুলে দিয়ে নিজেও বসলেন।
গম্ভীর নীরবতার মধ্যে কায়সার শিকদার কায়ার দিকে চেয়ে বললেন,
“ক্লাস টেনের বছরটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ, আম্মা। সামনেই তোমার এসএসসি পরীক্ষা। যদিও তোমাকে বলতে হয় না, তারপরও রিমাইন্ডার দিচ্ছি। এখন থেকে একটু বেশি সময় নিয়ে পড়াশোনা করবে।”
কায়া বড়ো চাচার দিকে চেয়ে মাথা দোলালো। পরপর নিজের খাবারের দিকে মনোযোগী হলো। কায়সার শিকদার আবার বললেন,
“তুমি আমার লক্ষ্মী একটা মেয়ে। এই একবছর নিজের স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দিতে হবে। যদি কোনো কিছুর প্রয়োজন হয় সরাসরি আমাকে এসে বলবে। কারোর অপেক্ষায় থাকবে না।”
কথাটি কায়ার দিকে না, কবির শিকদারের দিকে চেয়েই বললেন কায়সার শিকদার। কবির শিকদার সেটি বুঝতে পেরে আচমকাই খাওয়া থামিয়ে দিলেন। খানিক অনুশোচনা অনুভব করলেন। কিন্তু খাবার তো আর অপচয় করা যাবে না। নয়তো উঠে যেতেন। রেগে নয়, লজ্জায়।
কাশিফ তার বাবার দিকে আড়চোখে তাকালো। বড্ড বেশি প্রশংসা করে ফেলেন তিনি কায়াকে, অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন। নিজের সন্তানের চেয়ে বেশিই বোধহয় ভালোবাসেন। কাশিফ তপ্ত নিশ্বাস ফেলল। বাবার এই স্বভাব বলেকয়ে বদলানো যাবে না। খুব ধীরে ধীরে বদলাতে হবে।
কায়সার শিকদার কাশফিয়ার দিকে চেয়ে বললেন, “এইযে, গুণ্ডা মেয়ে! তোমার রেজাল্টের কী খবর?”
কাশফিয়া ঠোঁট বাঁকা করে তাকালো বাবার দিকে। বলল,
“ক্লাস টেস্টে দশে দশ পেয়েছি, হাহ!”
বলেই মুখ ফিরিয়ে নিল কাশফিয়া। কায়সার শিকদার হালকা হেসে উঠলেন। তার মেয়েকে নিয়ে পারা গেল না আর। কায়া শান্ত নদী, আর সে উত্তাল ঝড়। বড্ড বেসামাল একটা মেয়ে। 
কায়সার শিকদার এক এক করে সব ছেলেমেয়েদের খবরই নিচ্ছেন। রাতের খাবারের সময় এসব আলোচনা নিত্যদিনের। সবার শেষে তার দৃষ্টি গেল কাশিফের দিকে। তিনি গলা ঝাড়া দিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“বড়ো সাহেব, আপনার পড়ালেখার কী খবর?”
কাশিফ ধীরেধীরে ভাত চিবুতে চিবুতে জবাব দিল, “আগামীকাল ফার্স্ট সেমিস্টারের রেজাল্ট আসবে। খবর তখনই জানা যাবে।”
কায়সার শিকদার ধীর গতিতে মাথা দোলালেন। কিয়ৎক্ষণ সময় নিয়ে বললেন,
“হুউউউউম! তবে ইঞ্জিনিয়ারিং হাতের মোয়া না। জিম, ফটোগ্রাফি আর ফুটবল খেলাকে যত সিরিয়াসলি নাও, ঠিক ততটা পড়ালেখাকেও নিতে হবে।”
কাশিফ বাঁকা হেসে বলল, “বাবা, আমি প্রতিটা সেক্টরে পার্ফেক্ট হতে চাই। যেন কেউ আমাকে কারো সঙ্গে তুলনা করতে না পারে। সেটা মাথায় রেখেই কাজ করি আমি।”
কায়সার শিকদার খানিক ভ্রু উঁচু করে তাকালেন ছেলের দিকে। তিনি খুব বুঝেশুনে আচরণ করেন কাশিফের সঙ্গে। এই বয়সটা বড্ড বাজে। উঠতি বয়সে পরিবারের তরফ থেকে যেকোনো অতিরিক্ত চাপ ভবিষ্যতের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
“পার্ফেক্ট হওয়া ভালো। কিন্তু নিজেকে সেরা মনে করা ভালো না। চোখ সবসময় মাটির দিকে রাখবে।”
বাবার কথার পরিপ্রেক্ষিতে কাশিফ জবাব দিল, “শির উঁচু করে হাটবো। মাথা নত কেন করবো?”
“মাঝেমধ্যে মাথা নত করতে হয় ওপরে ওঠার জন্য।”
কাশিফ সরাসরি প্রশ্ন করে বসলো, “আর তুলনা করা?”
কায়সার শিকদার খেতে খেতেই ছেলের দিকে তাকালেন। একজোড়া জ্বলজ্বল করা চোখ, গালে হালকা হালকা চাপ দাড়ি আর ছিপছিপে দেহের গড়ন। তারুণ্যের উত্তাপে রক্ত উষ্ণ হয়ে উঠেছে। ঠাণ্ডা মাথায় হ্যান্ডেল করতে হবে একে। কায়সার শিকদার হালকা হেসে বললেন,
“মাঝেমধ্যে তুলনা ভালো, বড়ো সাহেব। তুলনার মাধ্যমে আপনার মধ্যে আলাদা একটা শক্তি আসবে।”
কাশিফ বলল, “শক্তি জেদ হয়ে এসেছে, বাবা। যেদিন থেকে আপনি আপনার বন্ধুর ছেলে রাশেদের সঙ্গে আমার তুলনা করেছেন। নিজের ছেলেকে বাদ দিয়ে অন্য মেয়েকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।”
“আমাকে হারানোর জন্য সেরা হতে চাও?”
“নিজেকে জেতানোর জন্য হতে চাই।”
কায়ার বুঝতে বাকি নেই অন্য মেয়ে বলতে তাকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। ভাতের প্লেটের ওপরে থাকা হাতটা থেমে গেল তার। মুখে কোনো উদাস ভাব নেই, কোনো রুষ্টভাবও নেই। একটি প্রতিক্রিয়াহীন মুখমণ্ডল খাওয়া বাদ দিয়ে থম মেরে আছে।
কায়সার শিকদার খুব ভালোভাবেই লক্ষ্য করলেন কায়ার মুখ। পরপর ছেলের দিকে চেয়ে বললেন,
“আমার রক্তকে তুমি অন্য মেয়ে বলে উপাধি দিতে পারো না। আজকের আরেকটা লেসন, কথাবার্তা খুব সাবধানে বলবে। শরীরের আঘাত সেরে যায়, মনের আঘাত সারে না। তুমি যা দেবে, নিয়তি তোমাকে তার চেয়ে দ্বিগুণ ফিরিয়ে দেবে। এখন তোমার উঠতি বয়স। আমার কথাগুলো বিষের মতো লাগবে। কিন্তু ২৫ পেরোও, তখন বুঝবে।”
________
খাবার শেষ করেই ঘরে ঢুকলো কাশিফ। শব্দ করে দরজা বন্ধ করা তার রোজকার অভ্যাস। মায়ের হাজার বারণ আর ধমক তাকে থামাতে পারেনি। ঘরে ঢুকেই এসির পাওয়ার ১৬তে দিয়ে দিল। পুরো ঘরে রুম ফ্রেশনার স্প্রে করলো। ল্যাপটপে সফট মিউজিক ওন করে একটানে পরনের নেভি ব্লু টিশার্ট খুলে আয়নার সামনে দাঁড়াল। ট্রাউজারের পকেটে হাত গুঁজে নিজেকেই দেখতে লাগল। সাতমাস হলো জিমে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু শরীরে তেমন কোনো তফাৎ দেখা যাচ্ছে না। তাহলে কি জিম ট্রেইনারের মধ্যে ঝামেলা? হাতের মাসেল, চেস্ট, ব্যাক কোনো জায়গায় দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
খুবই সামান্য এই কারণে মেজাজ খারাপ হতে শুরু করল কাশিফের। পকেটে থাকা ফোন বের করে কল করলো বন্ধু তানিমের কাছে। ফোন রিসিভ হতেই বাজখাঁই গলায় বলে উঠল,
“কী অকাজের জিম ট্রেইনারের হাতে ফেললি আমাকে? সাতমাস যাবত জিম করছি, কোনো পরিবর্তন নেই।”
তানিম হাসতে হাসতে বলল, “ধৈর্যের ফল মিষ্টি হয়, বন্ধু। ধৈর্য ধর।”
“সাতমাস কী কম সময়?”
“সমস্যা জিম ট্রেইনারের না তোর ডায়েটে।”
“আমার ডায়েটে কোনো দোষ নেই, আমার বডিতেও কোনো দোষ নেই। দোষ সব জিম ট্রেইনারের। সে ঠিকমতো ট্রেইন করতে পারছে না আমাকে। আমি নতুন কোনো জিমে ভর্তি হবো। তোর কথা শোনা ভুল হয়েছে আমার।”
“আরেহ, ব্যাটা, শোন…”
বলে কান থেকে ফোন নামিয়ে ফেলল। তানিমের আবছা কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সেসব শুনতে শুনতে নারাজ কাশিফ।
সারাদিনের ক্লাস, খেলা আর জিম। সব মিলিয়ে এই মুহূর্তে ক্লান্ত অনুভব করতে শুরু করেছে কাশিফ। দেহকে আরাম দিতে সম্পূর্ণ বিছানায় হাতপা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। উন্মুক্ত বুক ভারী নিশ্বাসের সঙ্গে ওঠানামা করছে। শরীর তো বিশ্রাম পেল, কিন্তু মস্তিষ্ক? মস্তিষ্কে নানান চিন্তার বিচরণ চলছে। অবিরত চলেই যাচ্ছে। রাশেদের সঙ্গে করা তার তুলনাটা বারবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, কায়ার তাকে চোখে চোখ রেখে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়াটাও সহ্য হচ্ছে না। মেয়েটার উচিত ছিল তাকে ভয় করা। কাশিফ সে ভীত মুখটাই দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি। কাশিফ দাঁত পিষে উত্তপ্ত নিশ্বাস ফেলল। নত না হওয়ার চেয়ে বেশি নত করার জেদ চেপে বসেছে। তবে সেটার জন্য প্রয়োজন কৌশল।
“Just because I was born ordinary doesn't mean I'll stay ordinary.”
________
রাত গভীর হতেই প্রচণ্ড রকমের খারাপ লাগা ঘিরে ধরল কায়াকে। প্রতিদিন রাত এগারোটায় ঘুমিয়ে পড়া মেয়েটা আজ রাত একটা অবধি জেগে আছে। একবিন্দু ঘুম নেই চোখে। পুরো ঘরে সে একা, জানালার পাল্লা চিরে আসা হেমন্তের শীতল হাওয়া শুধু সঙ্গ দিচ্ছে তাকে। এসির বাতাস মাঝেমধ্যে বড্ড যান্ত্রিক লাগে কিশোরী দেহে। হাঁসফাঁস লাগে। তার চেয়ে প্রকৃতির হাওয়া বেশি সতেজ। তাছাড়া শীত আসছে। স্নিগ্ধ, শীতল ঋতু। কিন্তু ঋতুর পালাক্রমে কী মন খারাপের কারণগুলো পরিবর্তন হয়? কারণ তো নিজের জায়গায় স্থির থাকে। বয়ে বেড়াতে হয় সারাটি জীবন। যতক্ষণ না মস্তিষ্ক সেটি ভুলে যায়।
নির্বিকার ভঙ্গিতে মাথার ওপর ঘুরতে থাকা ফ্যানের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বড্ড ক্লান্ত লাগল কায়ার। ঠোঁট কামড়ে উঠে বসল। ঘরের বাতি জ্বালানো যাবে না। কিছুতেই না। বাড়ির বড়োরা দেখলে রাগারাগি করবে। কেন ঘুমোয়নি সে প্রশ্ন করে জেরা করবে। কায়া টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে দিল। পা টিপে হেঁটে নিজের আলমারির সামনে গেল। নিঃশব্দে আলমারি খুলে তৃতীয় তাক থেকে একটি শাড়ি বের করলো। লাল রঙের কাতান শাড়িতে সোনালী কারুকাজ করা। কায়া জানে এর ভিতরে একটা চিঠি আছে। চিঠি সে নিজেই লিখেছিল। সে লিখলেও ভাষাগুলো তার নয়। কায়া শাড়ি আর চিঠিটি নিয়ে পড়ার টেবিলের সামনে আলোর কাছে গিয়ে বসলো। পুরোনো সেই চিঠি খুলে পড়তে লাগল। এ চিঠি শতবারের বেশি পড়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও মন ভরে না। কায়া চায় না মন ভরে যাক। এ চিঠিতে ঠিক প্রথমবারের মতো ঘ্রাণ থাকুক।
চিঠিতে লেখা, “আমি হইলাম গ্রামের মাইয়া। বাপজানে পড়ালেখা করায় নাই। কিন্তু আমার না অনেক শখ আছিল। দুই বেণী কইরা নীল কালারের ড্রেস পইরা ইস্কুলে যাব। ঐটা আর হইল কই? শোন, আমার কায়ানাত, তোর কিন্তু খুব পড়ালেখা করতে হইব। বাপজান যেহেতু বড়লোক ঘরে বিয়া দিছে তাই তোর পড়ালেখা নিয়া আমার টেনশন নাই। তুই আমার স্বপ্নটা পূরণ করিস। আর কারো সামনে কোনোদিন নত হবি না। আমার তো নত হইতে হইছে কারণ আমি গরীব, আমার বাপ গরীব। কিন্তু তোর বাপ কিন্তু বড়লোক। ঠাটবাট নিয়া থাকবি।”
চোখে জমে থাকা পানিগুলো ঝরলো না। অপেক্ষায় রইল অনুমতির। একজোড়া ছলছল করা উদাসীন চোখ শাড়ির চাকচিক্যে ডুবে আছে। কাছে টেনে ঘ্রাণ শুকে নিল। চোখের কয়েকফোঁটা জল শাড়ির মাঝেই ঢেলে দিল। এই শাড়ি বিগত পাঁচ বছরের অশ্রু শুকেছে। যে অশ্রু সম্পর্কে সবাই অজ্ঞাত…
“মা…”
শব্দটি উচ্চারণ করেই কায়ানাত ভাবতে বসলো। সে বাকিদের মতো নয়। তার স্কুলের মেয়েরা চঞ্চল, ছটফটে, দুরন্ত। কিন্তু সে তাদের মতো না। কেন হতে পারলো না সে তাদের মতো? কেন সে মনখুলে কথা বলতে পারে না? কেন সঠিক সময়ে সঠিক প্রতিক্রিয়া দিতে অপরাগ সে? কেন যেন হাসতেও ভয় করে? খুশি হতে পারে না। কেন যেন….
________
সকালের সময়টা বেশ ব্যস্ততায় কাটে শিকদার পরিবারের। আজকের দৃশ্যও কিছুটা এক। ছেলেমেয়েরা স্কুল আর ভার্সিটিতে যাবে, ঘরের কর্তারা যারযার কাজে। শায়লা বেগম ও সাহেরা বেগমের দুহাত অনবরত চলছে। তাদের সাহায্য করছে কায়া। পরোটা, ভাজি, ওমলেট প্লেটে সাজিয়ে টেবিলে সাজিয়ে রাখছে। স্কুল ড্রেস পরে, দুই বেণী করা মেয়েটি প্রতিদিনই এই কাজ করে। বিনিময়ে আদর পায় শায়লা বেগমের কাছে। কিন্তু শায়লা বেগমের আপন মেয়ে ঠিক তার বিপরীত। পিঠে দুইটা ঘা না দিলে মহারানীর ঘুম ভাঙে না। আজও দৃশ্য প্রতিদিনের মতো। স্কুল ড্রেস পরে ডাইনিং টেবিলের ওপর মাথা রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। কাজ করা তার জন্য পাহাড় কাটার সমান।
বাড়ির পুরুষেরাও একে একে খাবার টেবিলে এসে হাজির হলো। কাশিফ ব্যাগ কাঁধে নিয়ে চেয়ার টেনে বসতেই আচমকা সরে গেল কায়া। তার থেকে দূরত্ব নিয়ে আড়াল হয়ে দাঁড়াল। কাশিফ আড়চোখে খেয়াল করেছে বিষয়টা।
সে কায়ার দিকে আড়চোখে তাকাতেই সামনে বসা কায়সার শিকদার বলে ওঠলেন,
“আজ সন্ধ্যায় আমাদের সঙ্গে বাজারে যাবে তুমি। যেহেতু বাড়ির বড়ো ছেলে এসব বাজার সদাই শিখতে হবে। সাপ্তাহিক বাজার করব।”
কাশিফ বিরক্ত মুখে বলল, “এসবও করতে হবে?”
“কেন নয়? উপার্জন করা কি পুরুষের একমাত্র দায়িত্ব? আর কোনো দায়িত্ব নেই?”
“আর নারীদের?”
“নারীদের দায়িত্বটা অনেক সম্মানের। রুক্ষ চারদেয়ালকে ঘরে পরিণত করা নারীদের দায়িত্ব। পাশাপশি নিজেকে গড়ে তোলাও বর্তমান সমাজে অপরিহার্য।”
কাশিফের মাথায় অদ্ভুত বুদ্ধি খেলল। এটাই মোক্ষম সুযোগ কায়াকে ভয় দেখানোর। তার চেয়ে চার চেয়ার দূরত্বে বসেছে বলে কি পার পেয়ে যাবে? কিছুতেই না! কাশিফ বাঁকা হেসে নিজেই নিজের ওটমিল বানাতে বানাতে কায়াকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে বলল,
“নিজেদের গড়ে তোলার আগেই যদি নারীদের মন প্রেমের বাতাসে দোল খায় তাহলে আর হয়েছে!”
কায়সার শিকদার কপাল কুঁচকে তাকালেন, “এখানে প্রেম এলো কোথা থেকে? আর এসব কথা এমনভাবে বলছো কেন?”
কায়ার হাত থেমে গেল। হালকা ভয় অনুভূত হলো। বড়ো চাচা আর বাবার সামনে এসব কথা তাকে ইঙ্গিত করেই বলা হচ্ছে। সে আবার ভুলভাল বলে তাকে নিচু করবে না তো? ভয়টা মুখে প্রকাশ হতে দিল না কায়া। ফের খাওয়া শুরু করল।
কাশিফ স্বল্প হেসে বলল, “এসেছে, বাবা, এসেছে।”
কায়সার শিকদার গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “আজ বলেছো, দ্বিতীয়বার যেন না শুনি এসব কথা। প্রেম এবং ভালোবাসা এসবের একটা নির্দিষ্ট সময় আছে। তিনজনকেই বলছি, তোমাদের সেই নির্দিষ্ট সময় এখনো আসেনি। নিজের পায়ে দাঁড়াবে তারপর নিজেদের জীবনসঙ্গী চুজ করবে। কথাটা যেন মাথায় থাকে।”
কাশিফ জবাব দিল, “আমার মাথায় আছে। আমি ওসবে নেই। মেয়েদের পেছনে ঘোরার মতো ফালতু কাজ আমি করি না, করবোও না। তারা আমার পেছনে ঘুরলে সেটা আলাদা হিসাব। তাছাড়া বাবা, আপনার উচিত বাড়ির মেয়েদের এসব জ্ঞান দেওয়া। মেয়েদের মন বেশিই ওড়ে…”
কায়া মিথ্যে ভণিতা করছে স্বাভাবিক থাকার। নিজের সাথে জোরজবরদস্তি করে মুখ শক্ত করে রেখেছে। অল্প অল্প করে রুটি ছিঁড়ে মুখে তো তুলছে কিন্তু গলা দিয়ে নামছে না। সে কিছুতেই বড়ো চাচা আর বাবার কাছে সারাজীবনের জন্য ছোট হতে চায় না। আর কাশিফ তাকে নত করতেই নেমেছে।
কায়সার শিকদার বললেন, “আমার মেয়েদের আমি বিশ্বাস করি। বিশ্বাস প্রায় বাড়ির ছেলেরাই ভাঙে।”
কায়া খানিক স্বস্তি পেল। কিন্তু কাশিফ দমলো না। নিজের অহংকারী হাসি বজায় রেখে বলল,
“দুঃখিত, বাবা। আপনাকে ভুল প্রমাণ করতে হচ্ছে আমার।”
“কীভাবে?”
কাশিফ কথা ঘুরিয়ে বলল,
“আমার সিজিপিএ ৩.৫৬ আর আপনার প্রিয় বন্ধুর প্রিয় ছেলের সিজিপিএ ২.৮৯।”
কায়সার শিকদার চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,
“ভেরি গুড।”
কবির শিকদার যেন কথা বলার সুযোগ পেলেন। কাশিফের উদ্দেশ্যে বললেন,
“অভিনন্দন, আব্বা। বাকি সেমিস্টারগুলোতেও এই সিজি ধরে রাখবে।”
কাশিফ ছোট চাচাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাবার দিকে তাকাল। বলল,
“আপনার এখন কী মতামত, বাবা? হু ইজ বেটার?”
“রাশেদ আর তুমি দুজনেই ভালো।”
“এটা তো হলো না, বাবা। তুলনা করার সময় আপনি রাশেদকে আগে রেখেছিলেন। এখন প্রশংসার বেলায় দুজন সমান হলাম কী করে?”
কায়সার শিকদার ঠাণ্ডা চোখে তাকালেন ছেলের দিকে। ভাবনায় পর গেলেন। এতটা আত্মঅহংকার কী ভবিষ্যতেও থাকবে? নাকি বয়সের সঙ্গে কেটে যাবে? যদি না কাটে? না কাটলে এটিই ভবিষ্যতে ভয়ংকর রূপ নেবে। কায়সার শিকদার বরাবরের মতোই শান্ত স্বরে বললেন,
“তুমি তোমার জীবনের তৃতীয় পর্যায়ে আছো। শেষ পর্যায় কী জানো? শেষ পর্যায় হচ্ছে নিজের ক্যারিয়ারে সেটেল হওয়া। যেদিন তুমি একজন সফল মানুষ হবে সেদিন এই অহংকার দেখিও, কেমন? এখন খাও।”
কাশিফ দুহাত টেবিলের ওপর ভাঁজ করে সরাসরি বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে দাম্ভিক স্বরে বলল,
“তাহলে সেটাই কথা রইল, আজ থেকে ১০ বছর পর আপনি কাশিফ শিকদারকে একজন সফল মানুষ হিসেবে দেখবেন। আশা করি তখন গর্ববোধ করতে কার্পণ্য করবেন না।”
চলবে….

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন